অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৭
রুপা
আর্য রুমে এসে পুষ্পকে কোথাও দেখতে না পেয়ে। চারপাশে চোখ বুলিয়েও যখন তাকে পাওয়া গেল না, তখন ওয়াশরুমটাও চেক করে দেখল; পুষ্প সেখানেও নেই। এবার ধীরপায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াতেই আর্যর দৃষ্টি থমকে গেল। সে দেখল, পুষ্প খরগোশের ছানা দুটোকে কোলে তুলে নিয়ে আপনমনে গাজর খাওয়াচ্ছে। তার মায়াবী চোখ দুটো বেয়ে অনবরত পানি ঝরছে, যা পুষ্প বারবার নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে; কিন্তু মোছার সাথে সাথেই যেন আরও এক ঝাঁক অবাধ্য অশ্রুকণা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
পুষ্প এবার খরগোশ দুটোকে খাওয়াতে খাওয়াতেই ফুঁপিয়ে বলে উঠল—
– “আচ্ছা, যাদের বাবা-মা থাকে না, তাদের সবাইকে কি আমার মতোই এমন কটু কথা শুনতে হয়? যেভাবে আগে চাচি যখন-তখন কথা শোনাত, আজ ঠিক সেভাবেই ওই দাদিটা কথা শোনালো। কিন্তু উনি আমাকে কথা শোনাতেন, আমার আম্মু-আব্বুকে নিয়ে কেন কথা বললেন? আমার আম্মু-আব্বু তো দুনিয়াতেই বেঁচে নেই, ওনারা আমাকে শিক্ষা দেবেন কী করে?”
পুষ্পর এই নিষ্পাপ আকুলতা আর কথাগুলো শুনে আর্যর বুকের ভেতরটা তীব্র এক হাহাকারে মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটা লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে এসে একা একা কাঁদছে, কারণ মিনারা বেগম ওর মৃত মা-বাবার শিক্ষা নিয়ে কথা তুলেছেন। আর্য যতদূর জানে, পুষ্পর মা বাবা মারা গেছেন আজ থেকে আরও প্রায় দশ-এগারো বছর আগে। আর্য ধীরপায়ে এগিয়ে গেল এবং একদম পুষ্পর পেছনে গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়াল। কারও পায়ের আওয়াজ এবং উপস্থিতি টের পেয়ে পুষ্প দ্রুত নিজের চোখ দুটো মুছে নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেওয়ার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করল।
পুষ্প চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো আর্যকে, পুষ্পর টলমলে অশ্রুসিক্ত আঁকি যুগল দেখে আর্যর বুকের ভিতর আবারো অজানা কারণে প্রলয়ংকারি ঝড় শুরু হলো। এদিকে পুষ্প আর্যকে দেখেও কিছু বলল না। খরগোশ দুটোকে আলতো করে নিজের কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বসা থেকে উঠে সোজা রুমে চলে গেল। পুষ্পর এই সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে যাওয়াটা আর্যর পুরুষালি বুকে বড্ড শক্ত করে বিঁধল। তবুও সে মুখ ফুটে টু শব্দটি করল না; কেবল একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দার রেলিংটা শক্ত করে ধরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। কী করবে সে এখন? মেয়েটার চোখের পানি সহ্য করা যে দিন দিন তার জন্য দুষ্কর হয়ে উঠছে! বুকের ঠিক মাঝখানটায় যেন একটা অদৃশ্য কাঁটা অনবরত বিঁধেই চলেছে। অথচ মেয়েটাকে সান্ত্বনা দেবে—তাও পারছে না; কোথায় যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তাকে আটকে দিচ্ছে। সে না পারছে পেছাতে, আর না পারছে এক কদম এগিয়ে যেতে!
– “তুই মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছিস! কেন বারবার নিজের কাছেই এই সত্যিটা অস্বীকার করছিস?”
হঠাৎ পরিচিত কারও কণ্ঠস্বর ভেসে আসায় চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকাল আর্য। সে দেখল, বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে ইয়াসার! তাকে দেখা মাত্রই আর্যর পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে তীব্রভাবে এই ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলল—
– “অসম্ভব! আমি ওই মেয়েকে কোনোদিনই ভালোবাসতে পারি না। ভালোবাসি না আমি ওকে!”
– “সত্যি ভালোবাসিস না?”
ইয়াসার বাঁকা হেসে বলল— “তাহলে ওর চোখে পানি দেখলে তুই এতটা অস্থির হয়ে পড়িস কেন? ওকে ইভানের সাথে হাসতে দেখে তোর ভেতরের হিংসার আগুন দপ করে জ্বলে উঠেছিল কেন? ও যাতে ভুলেও অন্য কারও বাইকে চড়ে বাড়ি না আসে, তার জন্য ওর কলেজ ছুটি হওয়ার পর প্রতিদিন তুই নিজে ড্রাইভারকে দিয়ে নিজের গাড়ি পাঠাস কেন? ওকে মায়ের পুড়ে যাওয়া ওড়নাটা নিয়ে ওভাবে কাঁদতে দেখে, ঠিক সেরকম ওড়না বানানোর জন্য তুই কেন এভাবে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলি? এত কিছুর পরেও বলবি তুই ওকে ভালোবাসিস না?”
– “নাহ্, ভালোবাসি না আমি ওকে!”
আর্য নিজের মনের সাথে লড়াই করতে করতে চিৎকার করে উঠল— “আমি শুধু একটু খেয়াল রাখছি, তা-ও আম্মুর কথায়! দেখছিস না আম্মু ওকে নিয়ে কতটা প্রটেক্টিভ? আমি শুধু সেই কারণে এসব করেছি। আর ওড়নাটা… ওড়নাটা আমি নিজের হাতে পুড়িয়েছি, তাই ওটা ওকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি মাত্র। আমার কোনো অধিকার নেই একজন মেয়ের কাছ থেকে তার মায়ের শেষ স্মৃতিটুকু এভাবে কেড়ে নেওয়ার। যদিও আমি আগে জানতাম না যে ওটা ওর মায়ের ওড়না ছিল, আমি তো স্রেফ ওর কাপড় পুড়িয়েছিলাম…”
আর্যর কথা শেষ হওয়ার আগেই ইয়াসার তিল পরিমাণ সময় নষ্ট না করে বলে উঠল—
– “আচ্ছা, তুই ওর কাপড় কেন পুড়িয়েছিলি?”
– “কারণ ওই রঙের কাপড়ে ওই মেয়েকে বড্ড বাজে দেখায়!”
– “বাজে দেখানোর কারণটা কী ছিল?”
– “কারণ ইভান ওকে ওই কাপড়ে সুন্দর বলেছিল!”
– “ইভান সুন্দর বলেছিল মানে আসলেই ওকে সুন্দর লাগছিল। কিন্তু তোর ইগো আর হিংসায় সহ্য হচ্ছিল না যে অন্য কেউ এসে তোর অর্ধাঙ্গিনীকে সুন্দর বলুক! তুই ছাড়া অন্য কেউ তাকে সুন্দর বলায় তোর হিংসে হচ্ছিল—এটা কেন অস্বীকার করছিস? মেনে নে আর্য, তুই ভালোবাসিস ওকে। না হলে কিন্তু পরে তোকে বড্ড পস্তাতে হবে!”
– “আমি ভালোবাসি না ওই মেয়েকে! কেন বারবার তুই এক কথা বলছিস?”
আর্য এবার প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু এবার আর ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। আর্য চারদিকে নিজের চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে ভালো করে তাকাল; কিন্তু কোথাও ইয়াসার নামের কেউ নেই! বুঝতে পেরেই আর্যর ঠোঁটে ফুটে ওঠে বিষাক্ত এক হাঁসি তার মানে আবারও তার সেই পুরোনো হ্যালুসেনেশন হচ্ছে। সে এবার পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে লাইটার দিয়ে ধরিয়ে নিল। একের পর এক তীব্র টান দিতে দিতে নিজের মনেই দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড়করে বলল—
– “যেই ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক জীবনটাই কেড়ে নেয়, সেই ভালোবাসার আমার কোনো দরকার নেই। আমি ওই মেয়েকে ভালোবাসি না, বাসি না মানে বাসি না!”
নিশি গেস্ট রুমে বসে রাগে ফুঁসছে। সে এবার ক্ষোভ সামলাতে না পেরে নিজের কোল থেকে বালিশটা তুলে দেওয়ালে ছুড়ে মারল! সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না—এত বছর ধরে সে আর্যকে ভালোবেসে এসেছে, আর আজ কোথাকার কোন দুই দিনের এক অখ্যাত মেয়ে এসে আর্যকে নিজের করে পেয়ে যাবে? সে এটা কিছুতেই হতে দেবে না!
তার আর্যকে চাই-ই চাই, যেকোনো মূল্যে তার আর্যকে দরকার। প্রয়োজন পড়লে ওই মেয়েটাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে হলেও সে আর্যকে নিজের করবে, তাও তার আর্যকে লাগবেই। সে এত সহজে হার মানার পাত্রী নয়। ঠিক এমন সময় রুমে প্রবেশ করলেন মিনারা বেগম। তিনি দরজাটা লক করে রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন—বিছানার চাদর এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, বালিশ মেঝের এক কোণে পড়ে আছে। তিনি দেখেই নিজের নাতনির মনের অবস্থা খুব ভালো করে বুঝতে পারলেন।
তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে নিশির কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
– “রুমের এই অবস্থা কেন করেছিস দিদিভাই?”
নিশি তখনও রাগে ফুঁসছে। সে এবার চড়া গলায় বলে উঠল—
– “দাদি, আমি ভালোবাসি আর্যকে! আর্য কীভাবে পারল ওই অনাথ মেয়েটাকে বিয়ে করতে? ও খুব ভালো করেই জানত আমি ওকে কতটা ভালোবাসি, তাহলে ও এই বিয়েটা করল কীভাবে?”
নিশির মুখে এমন মারমুখী কথা শুনে মিনারা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি এবার নিশিকে খাটের ওপর বসিয়ে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বললেন—
– “দেখ দিদিভাই, আর্যর বিয়ে যখন হয়েই গেছে, এখন আর এসব বলে লাভ নেই। আমি নিজেও মনে মনে চাইতাম আর্যর সাথে তোর বিয়েটা হোক, কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই!”
– “আমি মানি না এই বিয়ে!”
নিশি দাঁত কিড়মিড় করে বলল—
– “আমার তো মনে হয় আর্য নিজেও এই বিয়ে মানে না। যেখানে প্যারিসে থাকার সময় এত সুন্দর সুন্দর, স্মার্ট আর অভিজাত মেয়েদের আর্য এক পলকে রিজেক্ট করে দিয়েছিল; সেখানে এই অজপাড়াগাঁয়ের গেঁয়ো মেয়েটাকে আর্য নিজের বউ বলে মেনে নেবে? অসম্ভব, দাদি!”
– “তুই আসলে কী করতে চাইছিস দিদিভাই?” মিনারা বেগম কৌতূহলী চোখে তাকালেন।
নিশি মুখ ফুটে কিছু বলল না, কেবল তার ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় ও কুটিল হাসি ফুটে উঠল!
প্রতিদিনের মতো আজকেও খুব ভোরে উঠে পুষ্প ফজরের নামাজ আদায় করল। তারপর বারান্দায় গিয়ে খরগোশ দুটোকে খাবার দিয়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িং রুমের সোফায় গরম চা হাতে নিয়ে বসে আছেন মিনারা বেগম। পুষ্প সেদিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ীভাবে ওনাকে সালাম দিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল; যেখানে জেনিফার সরকার আর শেহনাজ সরকার কাজের লোকেদের সাথে সকালের নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কাজের মেয়েটি রান্নাঘর থেকে কফি নিয়ে গিয়ে আর্যর রুমে দিয়ে এল। অথচ, এই কাজটা আগে প্রতিদিন নিজের হাতে করত পুষ্প। কিন্তু পুষ্পর হাত পুড়ে যাওয়ার পর থেকে সে এখন ভারী কোনো কাজই করতে পারে না। এদিকে আজকেও পুষ্পর জায়গায় কাজের মেয়েকে কফি নিয়ে আসতে দেখে আর্যর একদমই ভালো লাগল না; কেমন যেন এক তীব্র অস্থিরতা আর শূন্যতা কাজ করতে লাগলো। আর্যর বারবার মনে হতে লাগল—মেয়েটা তার চোখের আড়াল হলেই বোধহয় একা একা চোখের পানি ফেলবে, ঠিক গতকাল রাতে যেভাবে বারান্দায় লুকিয়ে কাঁদছিল! এই অবাধ্য ভাবনাটা আর্যকে ভেতরে ভেতরে আরও বেশি অস্থির আর অশান্ত করে তুলল।
আর্য অফিসে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ রেডি হয়ে নিল। পরনে তার ধবধবে সাদা শার্ট, কালো দামি ব্র্যান্ডের প্যান্ট; গায়ের স্যুটটা একহাতে ঝুলিয়ে রেখে অন্য হাতে কফির মগটা নিয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে এল। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ আর্যর তীক্ষ্ণ চোখ দুটো গিয়ে পড়ল নিচে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে থাকা মিনারা বেগম আর নিশির ওপর। দুজনে বেশ হেসে হেসে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে।
মিনারা বেগমের ঠোঁটে ওই হাসি দেখা মাত্রই আর্যর চোখের সামনে মুহূর্তেই ভেসে উঠল—গতকাল রাতে বারান্দার অন্ধকারে বসে থাকা পুষ্পর সেই কান্নারত, নিষ্পাপ মুখটা! পলকেই আর্যর শক্ত চোয়াল রাগে আরও বেশি শক্ত হয়ে গেল, মাথার রগগুলো দপ দপ করে চড়ে গেল। সে করিডোর দিয়ে হেঁটে ঠিক তাদের মাথার বরাবর ওপরের রেলিংয়ের কাছে এসে দাঁড়াল। আর্য যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে ঠিক নিচেই ড্রয়িং রুমের সোফা এরিয়া—যেখানে এখন পাশাপাশি বসে আছে মিনারা বেগম আর নিশি। আর্য একবার হাতের কফির মগের দিকে তাকিয়ে দেখল, কফি থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছে। আর্য আর এক সেকেন্ডও কিছু না ভেবে, ঠিক মিনারা বেগমের মাথার ওপর বরাবর ওপর থেকে সেই গরম কফি সোজা ঢেলে দিল!
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ১৬ (৩)
ফুটন্ত গরম কফি মাথার ওপর পড়ার সাথে সাথেই মিনারা বেগম তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন। এদিকে আর্যর চেহারায় কোনো রকম অনুশোচনা বা হেলদোল নেই; সে এবার হাত থেকে কফির খালি মগটাও ছেড়ে দিল, তবে সেটা মিনারা বেগমের মাথায় ফেলল না, পাশে ফেলল। গরম কফির তীব্র ছ্যাঁকায় সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে যন্ত্রণায় চিৎকার আর বিলাপ করতে লাগলেন মিনারা বেগম। এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখামাত্রই আর্যর ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক ও ক্রূর তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের মনের ভেতর দাঁত কিড়মিড় করে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
– “ওই ভীত চোখের পানি যে যে কারণে ঝরবে, ঠিক সেই সেই কারণটাই শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলবে এই আব্রাহাম আর্য সরকার! মাইন্ড ইট।”
