আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘আর তার কারণ শুধু এটাই, আমি রেজাউল হকের ছায়ায় বড়ো হয়েছি। তাই তো?’ ঠোঁটের কোনে দীধিতির শ্লেষের হাসি।
চেয়ারে হেলান দিয়ে জাকির শেখ নিঃশঙ্কোচ চোখে ওর দিকেই চেয়ে আছেন। সে চাউনিও গভীর৷ কথাটা শোনার পর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, ‘রেজা শুধু আমার ভাইকেই তছনছ করেনি, স্মরণ। নাওফিলের জীবনটা এলোমেলো হওয়ার পেছনেও রেজা অনেক দায়ী। ওর মৃত্যুর পরও ওকে আমি বা আমার পরিবার ঘৃণা করাটা বাদ দিতে পারিনি।’
-‘কিন্তু একটা কথা বলুন তো, জায়িন মাহতাব এবং আয়মান মেহরিন যে জগতে বাস করত। সেই জগতটা কি আপনার ছেলেকে সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন দিতো? সে নিজেও কি জায়িন মাহতাবের পাপের সাম্রাজ্যের পরবর্তী উত্তরাধিকার হত না? তাহলে রেজাউল হকই যে দায়ী আপনার ছেলের জীবনটা এলোমেলো হওয়ার পেছনে, এই কথাটা কতটুকু যৌক্তিক শোনালো? না ভাববেন না, আমি রেজাউল হকের পক্ষপাতী করছি। কেবল যৌক্তিক এবং অযৌক্তিক চিন্তাগুলো আলাদা করার চেষ্টা করছি।’
ক্ষণিকের জন্য জাকির সাহেবের মুখখানা থমথমে হয়ে উঠল। রেজার পক্ষপাতী না করেও দীধিতি রেজাকেই নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছে! কিন্তু ও কি শোনেনি নাওফিলের কাছে, নাওফিল শৈশবকাল থেকে কত যাতনা সহ্য করেছে আপন-পর, সকলের কাছে? ওকে তাই জিজ্ঞেস করলেন জাকির, ‘জাদকে ছোটোবেলা থেকে বড়োবেলা কী কী সইতে হয়েছে আত্মীয়, সমাজ, সবখানে, তা কি কখনো জানায়নি তোমাকে ও?’
হঠাৎই দীধিতির মনে পড়ে গেল, বিয়ের পর বলা নাওফিলের নিজের ছোটোবেলার নানান স্মৃতিকথা। বলল, ‘জানিয়েছিল কবার, আপনি তার জন্য কতটা স্ট্রিক্ট ছিলেন।’
মুচকি হাসলেন জাকির, ‘আচ্ছা। তাহলে কেবল আমাকে নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল জাদ!’
-‘তা না’, একটু অপ্রস্তুত অভিব্যক্তিতেই বলল দীধিতি, ‘ছোটোবেলাটা তার খুব একটা সুখময় ছিল না। কারণ, জায়িন মাহতাবের সত্য সারা দেশে জানাজানি হওয়ার পর বাইরের মানুষগুলোর কাছে তাকেও ভালো-মন্দ আচরণ পেতে হয়েছে। এসব নিয়েই দুঃখপ্রকাশ করার সময় বলেছিল আপনিও তাকে সেভাবে কাছে টানতেন না।’
-‘হ্যাঁ, এ কথাগুলোই শুনতে চেয়েছিলাম। রেজা আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সকল এভিডেন্স-প্রুফ প্রশাসনের হাতে তুলে দিলো আর নিজেকে পুরোদস্তুর লয়্যাল অফিসার দেখাল। ওর দেওয়া তথ্য প্রমাণ সকল নিউজ চ্যানেলে সর্বক্ষণ টেলিকাস্ট করা হয়েছে প্রায় প্রতিটিদিন। ওকেও দেখানো হয়েছে সারা দেশের মানুষের কাছে ব্রেভ অ্যান্ড অনেস্ট অফিসার হিসেবে। নিদারুণ একটা সময় পার করতে হয়েছিল তখন আমার পরিবারকে। আত্মীয়, বন্ধু, বাবার বিজনেস পার্টনার, প্রতিবেশী, কেউই বাদ ছিল না বাড়ি বয়ে এসে এ নিয়ে সহমর্মিতা আর সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে কটূক্তি আর ধিক্কার প্রকাশ করতে। যেটা অবশ্য জায়িনের পরিবার হয়ে আমাদের প্রাপ্যই ছিল। তবুও সেসব প্রতিদিন সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না৷ ধৈর্যের বাধ ভেঙে আসত মাঝেমধ্যে। সেখানে আমার জাদ ওই বাচ্চাকাল থেকে এসব সয়ে এসেছে কতটা কঠিন হৃদয় নিয়ে৷ কঠিন হৃদয় বলছি কারণ, ওর বয়সে এত বুলিং কোনো বাচ্চা মুখ বুজে সহ্য করতে পারে না। কান্নাকাটি, ঝগড়াঝাটি, চিৎকার-চেঁচামেচি অথবা বাবা-মা কী করেছে, এসব জানতে চাওয়ার জন্য জেদ ধরা, এর কোনোটাই ও করেনি। যেদিন খুব বেশি কষ্ট পেত, সেদিন দাদা-দাদির কাছে খোঁজ করত নিজের বাবা-মায়ের। আর শুধু ওর চিন্তা করেই মিহাদ, নিহাদ, ফিহা, এদের কারোর কিছু উপলক্ষেই বাড়িতে কোনোরকম প্রোগ্রামের আয়োজন করত না বাবা। প্রোগ্রামে যত মানুষই আসত সবাই-ই ওকে নিয়ে দুঃখ প্রকাশ, করুণা, আফসোস-আক্ষেপ, এসবের ছুতোয় ওর কাছে জায়িন, আয়মানকে নিয়ে তিক্ত মন্তব্য করে বসত।’ কথাগুলো শেষে চোখদুটো বুজে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন জাকির।
আজও নাওফিলের কষ্টে ডুকরে উঠল দীধিতির ভেতরটাও। নিজের শৈশবও খুব বেশি সুখের ছিল না ওর। তবে রেজা যতদিন ছিল ওর জীবনে, ততদিন মানুষটা ওকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে সব সময়। আবার ঝুমুর নিজের মেয়ের মতো ভালো না বাসলেও তথাকথিত সৎ মায়ের মতো নিষ্ঠুর আচরণও করেননি। তাই বলা যায়, বাবার স্নেহ ভালোবাসা যতখানি পেয়েছে ও, তা নাওফিল পেয়েছে নিজের অগোচরে। ওর মতো করে অনুভব করার ভাগ্য অন্তত হয়নি৷ কিন্তু অদ্ভুতভাবে ওদের দুজনের ভাগ্যলিপি বিধাতা কেন যেন বেশ মিল রেখেছেন।
নীরবতার ভেতর দুজনের সময় গেল বেশ কিছুক্ষণ। নাওফিলের জীবনটাকেই উলটে পালটে মানসপটে ভাসাচ্ছিলেন জাকির সাহেব৷ আর দীধিতি স্মৃতিচারণ করছিল ওদের দুজনের কাটানো পাঁচ মাসের সংসারকে। এর মাঝেই জাকির সাহেব মৌনতা কাটিয়ে উঠলেন, ‘জাদ তোমার খারাপ চায়নি, স্মরণ। তোমাকে ও কোন পরিস্থিতিতে পড়ে একা ছেড়েছে, তা তো বোধ হয় নিহাদের থেকে জেনেছ।’
-‘হ্যাঁ, জেনেছি’, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দীধিতি ক্ষোভিত গলায় বলল, ‘তারপর আমার সঙ্গে আপনার ছেলের নিকৃষ্ট আচরণগুলোও দেখেছি। আমার প্রেগন্যান্সির বানোয়াট খবর দিয়ে কিরণ যখন তাকে ডেকে আনল, আসার পর আমাকে অ্যাবোর্শন করানোর জন্য সে যে জানোয়ারের মতো আচরণটা করেছিল, তা আমি বেঁচে থাকতে ভুলব না৷’
এ ব্যাপারগুলো জাকির সাহেবের অজানা। মাহতাব সাহেবের সামনে দীধিতির সঙ্গে কাগজে কলমে বিচ্ছেদ ঘটানোর পর থেকে নাওফিলকে তিনি অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যেতে দেখেছিলেন। তখন ওকে নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়াটা করার জন্য একাই ছেড়ে দিতে হয়েছিল। সে মুহূর্তে তাওসিফ, ইয়াসিফ, কারও সঙ্গেই কথাবার্তা হত না ওর। তবে এসবের ভেতরই একবার তাওসিফ দীধিতিকে নিয়ে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল ওকে। সেদিন দেখেছিলেন তিনি, দীধিতি নামটা শোনা মাত্রই নাওফিল অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বসেছিল ভাইকে। যে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করতে দেখা যায় মূর্খ, উগ্র শ্রেণীর পুরুষদের। তা ছেলের মুখে প্রথমবার শুনে সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন জাকির, দীধিতির প্রতি তুখোড় রাগ তার ছেলের মধ্যে। আর এজন্যই তখন হয়ত অমানবিক আচরণ করে বসেছিল মেয়েটার সঙ্গে। সেসব বিষয়ে আর জিজ্ঞাসাবাদ করলেন না তিনি দীধিতিকে৷ কিছু বিষয় একান্তই ওদের। অন্যায়, অপরাধ যেহেতু করেছে নাওফিল, তার সাজা আর প্রায়শ্চিত্তটাও ওকেই করতে হবে৷ এই মুহূর্তে তার দায়িত্ব কেবল ছেলে মেয়ে দুটোকে কাছাকাছি নিয়ে আসা।
-‘আচ্ছা, আসল কথাই ফিরি৷ আমার মনে হলো আমাকে নিয়ে কিছু বিষয় তোমার কাছে ক্লিয়ার করা দরকার৷ আশা করছি, বিরক্ত হবে না তা শুনতে৷’ বললেন জাকির সাহেব। কিন্তু দীধিতি উত্তরে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না৷ ওর নীরবতার মধ্যেই হেসে উঠে বললেন তিনি, ‘এই বুড়ো বয়সেও আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে৷ এ কথা বোধ হয় জানো না।’
খবরটায় একটু অবাক হয়েছে সত্যিই দীধিতি৷ তবে নিশ্চুপই থাকল সে। জাকির নিজের মতো করেই বলে গেলেন, ‘আমি জাদের বায়োলজিক্যাল প্যারেন্ট নই যেমন। তেমন মাহতাব শেখও আমার বাবা নয়, চাচা।’
-‘জানি।’ ভার কণ্ঠে স্বীকারোক্তি দিলো দীধিতি।
-‘ও হ্যাঁ, তুমি তো ছিলে বেশ কিছুদিন শেখ বাড়িতে। জানারই কথা৷ এ খবর কি জানো, আমার এক্স ওয়াইফই তোমার আর জাদের ক্ষতি করে যাচ্ছিল?’
-‘হুঁ, ইয়াসিফ ভাই অনেক কথায় বলেছে আমাকে।’
-‘আচ্ছা বেশ৷ খুশির শাস্তির ব্যবস্থা জাদের দাদাই নিয়েছে। সেই সাথে আমাকেও বাড়িছাড়া হতে হয়েছে৷ এরপর জাদও আমার সঙ্গেই থাকতে শুরু করে। তবে সব সময় না। আজ চার বছর হলো ওই বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন। মা কান্নাকাটি করে বিধায় জাদ মাঝেমধ্যে মাকে নিয়ে আসত ঢাকায়৷ এখন তো মা বিছানাশয্যা। তো যেটা বলতে চাইছি। মানে তুমি আসার পরই যে উদ্দেশ্যে প্রথম প্রশ্নটা রেখেছিলে, তার জবাবটাই দিচ্ছি৷ যতকাল আমি জাদের দাদার অধীনে ছিলাম, ততকাল আমার অনেক বর্ডারলাইন ছিল৷ বলা উচিত, বাড়ির শান্তি, মায়ের শান্তির জন্যই অনেক কিছু ছাড় দিয়ে চলেছি, ছেড়ে দিয়েছি, জাদের দাদার কথামতো সব করতে হয়েছে। কিন্তু এখন আর আমার কোনো সীমারেখা নেই। আর না পরিবারের শান্তি বজায় রাখার দায়বদ্ধতা। আমার ছেলের ভালোর জন্য সিদ্ধান্তটা নিতেও আমি এখন স্বাধীনভাবে নিতে পারি। আমার মনে হয়েছে, আমার ছেলেকে সুরক্ষিত রাখার অদম্য চেষ্টাটা তুমিই করতে পারবে। তাই গানম্যান সুপারিশে তুমি নারী হলেও তোমার নামটাই উল্লেখ্য ছিল।’
মাথা ঝুঁকিয়ে হাসল দীধিতি। সে হাসি দেখে জাকির সাহেব বুঝলেন, তাকে কটাক্ষ করেই হাসিটা দিচ্ছে মেয়েটা। কিন্তু কিছুই বললেন না তিনি। তাকে এখন চড়া সুরে অপমান করা হলেও তা তিনি নীরবেই হজম করবেন। কারণ, সেটা তার প্রাপ্য।
-‘আপনি এখন স্বাধীন বলেই আপনার ছেলের জীবনে আমাকে প্রবেশের অনুমতি আর সুযোগ দিচ্ছেন। এটাই তো বললেন?’
জবাব দিলেন না জাকির। দীধিতি তার জবাবের প্রত্যাশাও করল না৷ সে বলতে থাকল, ‘আর যখন মাহতাব শেখের অধীনে ছিলেন, তখন পুতুল ছিলেন। তাই আমার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে দেখেও মেনে নিয়েছিলেন আপনারা।’ কথাটার পরই দীধিতির হাসি মুছে গেল, ‘আমি নিজেকে এতিমই ভাবি। আমার মাথার উপর কোনো প্রতাপশালী বাবার হাত নেই কিংবা আমি হয়ত বাস্টার্ড। এজন্যই আমাকে আপনারা ইচ্ছে অনুযায়ী ব্যবহার করার সাহসটা রাখছেন, আমার সঙ্গে অন্যায় করার সুযোগটাও পেয়েছেন৷ আজ যদি আমি আপনাদের মতো কোনো প্রতাপশালী পরিবারের মেয়ে হতাম, তাহলে কি আমাকে নিয়ে যা খুশি করার চিন্তা করতে পারতেন, স্যার?’
-‘বাস্তব সত্য। কখনোই পারতাম না।’ অনায়াসেই স্বীকার করলেন জাকির। আর বললেন, ‘তবে সেদিন যদি তুমি ডকুমেন্টসগুলো জাদের ওপর রাগ দেখিয়ে পুড়িয়ে না ফেলতে, যদি জাদের থেকে নিজের বাবা মায়ের পরিচয়টা শুনতে, তাহলে আজ তুমি তাদের কারও কাছেই থাকতে। হয়ত ভালো থাকতে।’
-‘যে লোভে প্রিজন ভ্যানে উঠতে হলো আমাকে, জেলেও ঢুকতে হলো, স্বামী আর ঘর ছাড়া হতে হলো৷ তার প্রতি আর কোনো আগ্রহ নেই আমার৷ অন্তত আপনাদের সহায়তা নিয়ে নিজের পরিচয় জানার আগ্রহ নেই৷ আটাশটা বছর যেভাবে পিতৃ মাতৃ পরিচয়হীন হয়ে কাটাতে পারলাম, এরপরের সময়গুলোও পারব। যদি ভাগ্যে থাকে তাদেরকে চোখে দেখার, তবে দেখব৷ কিন্তু তাদেরকে খুঁজে পাওয়ার আর সেই ইচ্ছেটা নেই।’
কিছু আর বলার মতো পেলেন না জাকির। দীধিতির কাঠিন্য মুখপানে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলেন, ‘তোমার বাবার কাছ পর্যন্ত যদি পৌঁছতে পারতাম, চার বছর আগে আমিই তোমাকে তার হাতে তুলে দিতাম। কে জানে, স্যামুয়েলের এক্সাক্ট নিবাস এখন কোথায়! তবে সে আমার ভাইটার সব থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল। অন্তত একবার হলেও তার সাক্ষাৎ আমি চাই।’
-‘আপনার সঙ্গে কনফারেন্স সাড়তে গিয়ে যে নাওফিল শেখের দেওয়া স্কেজিউল মিস করে গেলাম, স্যার।’ হাত ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে বলে উঠল দীধিতি।
জাকির সাহেব তা আগেই লক্ষ করেছেন। কারণ, সময় অতিক্রম হওয়ার পর থেকে নিজের সাইলেন্ট রাখা ফোনে তার অস্থির, অধৈর্য ছেলেটা লাগাতার কল করে যাচ্ছে। তিনি তা ইচ্ছাকৃতই অবহেলা করে যাচ্ছেন। দীধিতির সঙ্গে আলোচনাটাও যে গুরুত্বপূর্ণ।
-‘আমি ম্যানেজ করে নেব ওকে। তুমি টেনশন নিয়ো না।’
-‘টেনশন?’ কথাটা পুনরাবৃত্তি করে দীধিতি মুচকি হেসে বলল, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের কি কখনো টেনশন নেওয়ার দরকার পড়ে? তাদের তো খালি অর্ডার ফলো করতে হয় চুপচাপ।’
-‘তুমি প্রচণ্ড রেগে গেছ আমাদের বাপ-ছেলের ওপর, তাই না?’
-‘রেগে যাব কেন?’
-‘রাফিয়ান রাফির পরিবর্তে হঠাৎ করেই নাওফিল শেখের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হলো যে?’
-‘আসলে আমরা যা প্রত্যাশা করি না, যা চাই না, তাই যদি ঘটে যায়৷ সেক্ষেত্রে তো রাগ, বিরক্তি কাজ করবেই৷’ কথাটার পরই দীধিতি কপট বিনয়ী সুরে বলল, ‘তবে আপনি টেনশন নেবেন না, স্যার। আমি আমার রেসপন্সিবিলিটি ভুলব না কখনই৷ তাছাড়া আপনি আর আপনার ছেলে আমার গর্হিত অন্যায়ের পরও সেদিন শুধু আমার ক্যারিয়ারের চিন্তা করেই আসামির খাতাতে আমার নামটা তুলতে দেননি৷ ইয়াসিফ ভাইয়ের মাধ্যমে আমাকে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছেন৷ আপনাদের এত মহানুভবতায় আমি সব সময়ই কৃতজ্ঞ। আর সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব নাওফিল শেখের খেয়াল রাখার। তাহলে আজ আসি? আর প্রথমদিনেই আমাকে ছুটি দিচ্ছেন, স্যার?’
-‘হ্যাঁ, দিচ্ছি।’ মৃদু হেসে বললেন জাকির, ‘আমার সঙ্গে তোমার কথাবার্তা দীর্ঘ সময়ের হবে, তা আমি জানতাম। এসো তাহলে। ইনশা আল্লাহ দেখা হবে আবার।’
ঘাড় নেড়ে দীধিতি বিদায় জানিয়ে উঠে পড়ল।
বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল দীধিতির। গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে দাঁড়াতেই কেয়ারটেকারসহ দুজন ছেলেকে দুহাতে কতগুলো ব্যাগপ্যাকসহহ আরও নানান জিনিস সমেত এলিভেটরের সামনে দেখে জিজ্ঞেস করল কেয়ারটেকারকে, ‘কী এগুলো, জামাল চাচা? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন এসব?’
-‘আসসালামু আলাইকুম, ম্যাডাম।’ লম্বা করে সালামটা দিয়ে জামাল জানালেন, ‘আপনার পাশের ফ্ল্যাটটা নতুন যে ফ্যামিলি কিনছে, এইসব তাগের জিনিস। ইনডোর আর ব্যালকনির কাজ শেষ হইলো আজকে৷’
নাওফিলের থেকে পাওয়া ডুপ্লেক্সসহ এই বারোতলা বাড়ির খবরাখবর দীধিতি খুব একটা রাখে না। কারণ, প্রথমে তো এই বাড়িটা সে নিতে আগ্রহী ছিল না একেবারেই। কিন্তু ইয়াসিফের মতো ঘাগু অফিসারের যুক্তিতর্কের প্যাঁচে পড়ে আজ দশদিন হলো সে নিজের প্রাপ্য গ্রহণ করেছে। তাই এতদিন এ বাড়ির যাবতীয় দায়িত্ব ইয়াসিফ আর এই জামাল লোকটিই সামলে এসেছে৷ আর প্রতি মাসে প্রাপ্ত ভাড়ার টাকাটা ইয়াসিফ ঠিকই ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করে দিয়েছে। তাই কবে কে ফ্ল্যাট কিনল, কোন ভাড়াটিয়া এলো বা গেল, কিছুই ওর জানা নেই। আপাতত জানার ইচ্ছাও হলো না। ইয়াসিফ যতদিন পারে, ততদিন সামলাক।
নিজের বাসায় ঢুকে ক্লান্ত শরীরটাকে কিছুক্ষণ জিরাতে দিলো বিছানায়৷ বাইরে অত্যধিক গরমে গায়ের শার্টটা ভিজে যেমন দুর্গন্ধ আসছে গা থেকে, তেমন চিটচিটে হয়ে আছে পুরো শরীর। ডাস্ট এলার্জি কারণে চুলকাচ্ছেও যেখানে সেখানে। আর না পেরে শুয়ে থেকেই শার্টটা খুলে ছুঁড়ে ফেলল সে মেঝেতে। প্রায় উন্মুক্ত শরীরে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে, দু হাত দুদিকে মিলে, চোখ বুজে ভাবতে থাকল পৃথিবীর সব থেকে পাষাণ পুরুষটির কথা। মানসপটে সেই পুরুষকে শেষ দেখার মুহূর্তটা ভেসে উঠল। মস্তিষ্কে দাপাতে থাকল তার নিক্ষেপ করা সেই কথাগুলো– যা ওর ভেতর থেকে সমস্ত প্রেমকে শুষে নিয়েছে। চারটা বছর ধরে ওই নিষ্ঠুর কথাগুলো দীধিতি অক্ষরে অক্ষরে মনে রেখেছে বলেই আজ জীবনটা এগিয়ে গেছে ওর। নয়ত এই বিশাল পৃথিবীতে স্বজন ছাড়া মানুষ হয়ে সে একা টিকিয়ে রাখত পারত কি নিজেকে? কবেই ভেঙে গুড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যেত সে। এজন্য হলেও নাওফিল শেখের সামনে দাঁড়িয়ে আন্তরিক সুরে কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করবে।
আচমকা গরম অনুভব হতেই বদ্ধ চোখ জোড়া মেলল দীধিতি। সারা ঘর তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার দেখে আঁতকে উঠল সে। লোডশেডিং হলো না-কি? হলেও আইপিএস চালু হয়নি কেন এখনো? উঠে বসে বিছানার ওপর ফোনটা খুঁজল সে৷ কিন্তু পেলো না। কোথায় রেখেছে? ওহ, মনে পড়ল, বাসায় ঢুকেই পানি খেতে ডাইনিংয়ে যাওয়ার সময় ফোনটা ভুলে ডাইনিং টেবিলে রেখে চলে এসেছে সে৷ বিরক্তি নিয়ে নিকষ আঁধারে আঁধারে হাতড়াতে হাতড়াতে ঘরের দরজা অবধি এলো আর সেই সাথে উপলব্ধি করল অন্ধ মানুষগুলোর পরিস্থিতি।
দরজার বাইরে পা বাড়ানোর সঙ্গেই স্পষ্ট অনুভব করল দীধিতি, একদম ওর মুখোমুখি কারও উপস্থিতি৷ আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠল ওর। নিস্তব্ধ ঘরে ওর সন্নিকটে দাঁড়ানো আগন্তুকের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ কানে আসতেই চেঁচিয়ে উঠল ও, ‘কে এখানে?’ কোনো উত্তর এলো না। উপরন্তু অজ্ঞাত ব্যক্তির কদম বাড়ানোর শব্দ পেলো এবার। তখন মাথায় এলো নিজের পরিচ্ছদের কথা। দ্রুত ঘরের মাঝে পিছিয়ে এলো দীধিতি৷ নিজের গানটা সেন্টারটেবিলের ড্রয়ারে রেখেছে সে দশটা মিনিট পূর্বেই৷ সেখানে পৌঁছনোর আগে দরজা আটকে দিতে চাইল সে। কিন্তু দুর্ভাগ্য! ব্যক্তিটি ততক্ষণে ঢুকে পড়েছে ঘরে। দরজা তার গায়ের সঙ্গে লাগতেই সে আটকে ধরল দরজাটা।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৬৪
দীধিতি ঠেলাঠেলি করেও তার শক্তির সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারল না যখন, তখন চিৎকার করে শত্রুর অস্তিত্বকে আন্দাজ করে লাথি কষে বসল৷ তাতে হিতে বিপরীত হলো আরও। শত্রু অবশ্যই ওর গতিবিধি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। এমন আক্রমণ হতে পারে, তা যেন জানতই সে৷ তাই তো নিজে সরে দাঁড়িয়ে দরজাটা এগিয়ে দেয় ওর সামনে৷ ফলাফল যা ঘটার তা-ই ঘটল। বেজায় চোট পেলো দীধিতি ডান পায়ে৷ অর্থাৎ নিজ থেকে কোনো আঘাত না করেও শত্রু ওকে কিছুটা আহত করে ফেলল কিংবা কিছুক্ষণের জন্য দুর্বল করে ফেলল ওকে।
