রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৪
সোহানা ইসলাম
‘ আমি যাবো না ’
বলে আরমান আবার কম্ফোর্ট জড়িয়ে শুয়ে পরে। জারা বিরক্তির শ্বাস ফেলে। এই লোকটা এমন সময় উঠতেই চায় না। কমড়ে হাত দিয়ে কিছু সময় আরমানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আরমান কে উঠে না দেখে সে আবার ডাকে,
__“স্বামীজান… উঠুন…”
কোনো সাড়া নেই।জারা ঠোঁট কামড়ে বিরক্ত মুখ করে।আবার বলে—
__“বিন্দুমাত্র নড়ে না বান্দা…”
সে এবার সরাসরি বালিশ টেনে ধরল। কানের কাছে চিৎকার দিয়ে ডাকে।আরমান গুঙিয়ে ওঠেবলে,
—“কে? কি? কার বাড়ি আগুন লেগেছে?”
জারা রাগে চোখ বড় করে বলে,
—“কুয়াশা হয়েছে!”
আরমান ভুরু কুঁচকে বলে,
__“আহা! কুয়াশা হয়েছে তো? তাই বলে কি ভোরে মানুষের ঘুম ভাঙাতে হবে?”
জারা হাত কোমরে রেখে বলে,
__“আপনি ওঠুন। আমরা হাঁটতে যাবো।”
__“হাঁটতে?” আরমান নাটুকেপনার ঢঙে বলে,
—“এই শীতে? দাঁত থাকবে না।”
জারা ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
__“আপনি যাবেন না.?”
__“ জুয়ান কালে আমি দাঁত ভাঙতে চাই না। ”
__“ ঠিক আছে, আমি একাই যাবো…”
এটা বলেই সে নাটকীয়ভাবে মুখ ঘুরায়।এটা দেখেই আরমান চোখ ছোট করে বলে—
__“তুমি একা যাবে?”
__“হ্যাঁ।”
__“আমার সুন্দরী বউ, কুয়াশার মাঝে রাস্তায় একা যাবে?তার থেকে ভালো কম্বলের নিচে আসো, মিলেমিশে শুয়ে থাকি।দাঁত বাঁচান, বউকে চুমু খান!”
__“ হ্যাঁ! যাবোই।”
আরমান কম্বল সরিয়ে উঠে বসল।
__“না! যাবে না।”
__“যাবো।”
__“বলো কার সঙ্গে যাবে?”
__“একাই।”
আরমান আবার কম্বল গায়ে দিয়ে বেডে গুলো হয়ে বসে বলল—
__“বউ, আমারও কিন্তু রাগ হতে পারে।”
জারা মুখ ছোট করে বলে,
—“হোক।”
আরমান দাঁত চেপে বলে,
__“তোমার সাহস কত বড়? আমার রাগ কে পাওা দেও না?”
জারা মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে
__“আমার ভালো লাগে…আপনার রাগ দেখতে…”
এই কথা শুনে আরমান থমকে গেল।তার বুকের রাগ গলে মধু হয়ে গেল। সে জারার দিকে দুহাত উচু করে তুলে ধরে—
__“এত খুনসুটি? এই চোখদুটো দিয়ে ঠিকই আমার রাগ গলিয়ে দিলো হাফ ইঞ্চি বউ আমার ।”
জারা লাজুক হাসে।কিন্তু সে জানে না, এই বিরোধ তার জেদ নয়; এটা জারার সোহাগের জন্য রাখা পথ। জারা বিছানায় উঠে তার কোলে উঠে বসে।স্বামীজানকে পটাতে হবে।তাই টুপ টুপ করে ঠোঁট ছোঁয়ায় গালে। হিসেব করে নয়—নির্মল মধুর স্পর্শে। আরমান জানে—এটা তার হারার জায়গা। সে মুহূর্তেই গলে যায়। জারা নরম স্বরে বলে,
__“আমার স্বামীজান কত সুন্দর! বলিউডের হিরোও হার মানে তার সামনে।”
এত প্রশংসা শুনে আরমান হাসে। তার বুক ভরে ওঠে।এই ভাবে বলে কীভাবে সে না করে। জারা’র কোমড় জরিয়ে ধরে বলে,
__“ঠিক আছে…যাব রানী সাহেবা । তবে আগে বোরকা আর গরম কাপড় পরে নাও।”
জারা দ্রুত আলমারি খুলে কালো বোরকা পরে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হিজাব পরে নেয়। এখন শুধু নিকাব পড়া বাকি। সে সেটাই বাঁধতে যাচ্ছে—
হঠাৎ আরমান এগিয়ে এসে হাত থেকে নিকাব নিয়ে নেয়। জারা বিস্মিত হয়ে তাকায়—তার চোখে বিস্ময়, লাজ, আদর—সব একসাথে।আরমান বলে,
__“আমি পরিয়ে দেবো।”
এই মুহূর্তে জারা নিজেকে কতটা মূল্যবান লাগছে, সে শব্দে প্রকাশ করতে পারে না। আরমান ধীরে ধীরে নিকাব পরায়।সেটা হয় কোনো উত্তেজনা দিয়ে নয়…
ভালোবাসায়। জারা আরমানের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ তার সরছে না।
__“আমার স্বামীজান এতো সুন্দর কেনো আল্লাহ? আমি নিজেই চোখ ফিরাতে পারি না।এই সুন্দর বেডা সম্পূর্ণ আমার খোদা..? ”
আরমান তার ছোট্ট লক্ষী বউয়ের কথা শুনে নিঃশব্দে হাসে। কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__“এসব কথা বলে প্রতিবার আমাকে পটিয়ে নাও। বড্ড পেকে গেছো সোনা তুমি..!”
জারা খিলখিল করে হাসে। দু’হাতে ঝাপটে দরে আরমানকে। নিকাব পরিয়ে আরমান জারার কপালে চুমু খায়—শব্দ করে।
জারা চোখ বন্ধ করে অনুভব করে—এটাই শান্তি। তার পর আরমান শাওয়াল জড়িয়ে দেয়।আর নিজেও জ্যাকেট পরে নেয়। সাথে জারা’র জন্য একস্ট্রা গরম কাপড় নিয়ে নেয়। সে যানে বাইরে অনেক ঠান্ডা পরেছে। শাওয়াল দিয়ে জারা’র শীত মানবে না।
দুজন প্রস্তুত। বাড়ির দরজা খোলা হয়। ঠান্ডা বাতাস এসে দুজনের গালে ছুঁয়ে যায়। রাস্তায় কোনো মানুষের ভিড় নেই। লাইটপোস্টগুলোর নিচে কুয়াশা মিশে যেন আলোর কুয়াশা তৈরি করছে।
দুজন হাতে হাত ধরে হাঁটে। পা ফেলার শব্দটাও স্পষ্ট শোনা যায়। রাস্তায় নরম শীতের হাওয়া, দূরে আযানের ক্ষীণ ধ্বনি—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন রোমান্সের ছবি। আরমান মজা করে বলে,
__“লোকজন দেখলে ভাববে আমরা পালিয়ে যাচ্ছি বা চুরি করতে বের হয়েছি”
জারা হেসে ফেলে। তার চোখের হাসি কুয়াশা ছেদ করে বেরিয়ে আসে। রাস্তায় বের হতেই শীতল বাতাস আঘাত করে। জারা হাত দুটি বুকে জড়িয়ে নেয়।
আরমান সাথে সাথে নিজের সাথে আনা জ্যাকেটা ওর গায়ে দিয়ে তার হাত সহ পুরো শরীর ঢেকে দেয়।
__“এখন কাপছো কেনো?না করেছিলাম আসতে?”
জারা চোখ বড় করে বলে,
__“একদম আব্বা গিরি দিখাবেন না। জামাই জামাইয়ের মতো থাকুন?”
আরমান গম্ভীর মুখ করে বলে,
__“স্বামী বলেই অধিকার আছে।”
জারা মুচকি হেসে বলে,
__“অধিকার আপনি বিছানায় দেখাবেন,বাইরে নয়।”
আরমান থমকে দাঁড়ায়—চোখ বড় বড় করে বলে,
__“এই মেয়ে… তুমি!”
সে হেসে জারার গাল টেনে দেয়।
__“শুধু বিছানায়? আমি তো বাইরে একটুও কম না।”
জারা লজ্জায় মাথা নিচু করে বলপ,
__“চুপ। এমন কথা রাস্তায় বলবেন না।”
আরমান হেসে—জারা নিঃশব্দে হাসে।এই আত্ম বিশ্বাসে সে গর্ব বোধ করে। চায়ের দোকানে বিতর্ক
দোকানের পাশে দাঁড়ায়। আরমান অর্ডার করে—
__“দুই কাপ গরম চা!”
জারা হাত গরম করতে কাপের কাছে ধরে।চোখে চোখ মেলে। আরমান বলে—
__“বউ ঠোঁট কাঁপিও না? আমার কেমন যানি লাগছে?”
জারা চোখ পাকায়—
__“ফাজলামি করবেন না।”
__“আমি সিরিয়াস।”
জারা চুপ হয়ে যায়। সে চায়ের ভাপের মাঝে তাকিয়ে থাকে আরমানের দিকে। চারপাশে কুয়াশা। গাছের ডাল নুইয়ে আছে।তারা চা খাওয়া শেষ করে আবার হাটে। জারা আরমানের হাত শক্ত ধরে বলে,
__“ স্বামীজান, আমাদের মাঝে একজন তৃতীয় ব্যক্তি আনলে কেমন হয়..?”
আরমান জারা’র কথায় মানে বোঝতে পারে। জারা বাচ্চার কথা বলতে চাইছে। সে যে একটা বেবি চায় না তা নয়। সে নিজেও চায় তাদের ছোট্ট একটা বেবি আসুক ঘর জুড়ে। আরমান জারাকে ডাক্তার দেখিয়েছিল। বাচ্চার কথা উঠলেই আরমানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা নেমে আসে। বাইরে থেকে সে যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক, ভেতরে ভেতরে ভয়টা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। ডাক্তারের কথা সে এক মুহূর্তও ভুলতে পারে না। পরিষ্কার করে বলা হয়েছিল—এই অবস্থায় জারা মা হলে তার জীবনের রিস্ক আছে। ওজন যেখানে অন্তত পঞ্চাশ কেজি হওয়া দরকার, সেখানে জারার ওজন মাত্র ঊনচল্লিশ। শুধু ওজনই না, আরও কিছু শারীরিক সমস্যা আছে, যেগুলো ডাক্তার খুব সাবধানে, গোপনীয়ভাবে তাকে বুঝিয়ে বলেছেন। সেসব কথা আরমান কাউকে জানাতে পারে না, জারাকেও না।
এই গোপন ভয়টাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। সে চায় না, জারা নিজের শরীর নিয়ে আতঙ্কিত হোক। জারা যখন বাচ্চার কথা বলে, তখন তার চোখে যে আনন্দ আর স্বপ্ন ঝিলমিল করে, সেটা ভাঙতে আরমানের বুক ফেটে যায়। সে হাসে, কথা ঘুরিয়ে নেয়, আদর করে চুপ করিয়ে দেয়। কিন্তু রাতে, একা হলে, সেই হাসির আড়ালে জমে থাকা দুশ্চিন্তা তাকে ঘুমোতে দেয় না।প্রায় রাতেই জারাকে বুকে নিয়ে সুয়ে থাকে কিন্তু ওর চোখে ঘুম দড়া দেয় না।
আরমান জানে, যদি কিছু হয়ে যায়, সে নিজেকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারবে না। তার কাছে জারা মানে শুধু স্ত্রী নয়—তার নিঃশ্বাস, তার আশ্রয়, তার পুরো পৃথিবী। একটা বাচ্চার জন্য সে জারাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না, কখনোই না। সময় লাগুক, যত্ন লাগুক, চিকিৎসা লাগুক—সব মেনে নেবে। কিন্তু আগে জারাকে সুস্থ হতে হবে, শক্ত হতে হবে। এই অপেক্ষাই এখন আরমানের সবচেয়ে বড় লড়াই, আর সবচেয়ে নিঃশব্দ ভালোবাসা। এবার আরমান জারা’র কথা বোঝেও না বোঝার মতো করে বলে,
__“ আমাকে আবার বিয়ে করানোর চিন্তা করছো লক্ষী বউ? তাহলে ভালো হবে..! ”
আরমানের কথা শুনে জারা’র মাথায় আগুন ধরে যায়। ক্ষিপ্ত চোখে তাকিয়ে বলে,
__“আমিও তাই ভাবছি। তাই তো কামাড়ের দোকানে ১০ ইঞ্চি সাইজের চাকু বানাতে দিয়েছি..! ”
আরমানের মুখ ভোতা হয়ে যায়। সে কল্পনাও করে নি বউ তাকে এই ভাবে জবাব দিবে। কন্ঠ শুনে বোঝা যাচ্ছে বউ তার খুব রেগে আছে। আর একটা বেশি কথা বললে এখানে মেরে রেখে চলে যাবে। জারা দম নিয়ে বলে—
__“আপনার কি কখনো ভয় হয়?”
__“কিসের?”
__“একদিন সব পাল্টে যাবে? আমরা বদলে যাবো?”
আরমান দৃঢ় স্বরে বলে,
__“জীবন পাল্টাবে। সময় পাল্টাবে।আমাদের ঘরেও পরিবর্তন আসবে। কিন্তু…”
সে জারার হাত ধরে—“তোমার জায়গা—আমার বুক,সেটা কখনো পাল্টাবে না।”
জারা চোখ নামিয়ে বলে,
__“যদি আমি বদলে যাই?”
__“তাও।”
__“যদি রাগ করি?”
__“ভালোবাসা দিয়ে রাগ ভাঙ্গিয়ে নেবো।”
__“যদি দূরে চলে যাই?”
__“ধরে আনবো।আমার হৃদয় খাচায় শক্ত করে বন্দি করে রাখব। ”
__“যদি আপনাকে ভালোবাসা বন্ধ করে দেই?”
__“অসম্ভব। কারণ মাছ কখনো পানি না ছুয়ে বাঁচতে পারে না। ”
জারা কেঁদে ফেলে। আরমান মৃদু হাসে। জারা’কে নিজের সাথে আগলে নিয়ে বাড়ির দিয়ে হাটতে থাকে। বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ আরমান থেমে যায়। রাস্তার পাশে একটা খেজুরগাছ। গাছের মাথায় বাঁশ বেঁধে একজন লোক খেজুরের রস নামাচ্ছে। সাদা, হালকা ঘন তরলটা পাত্রে পড়ছে টুপটাপ করে। চারপাশে মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।আরমান গাছটার দিকে তাকিয়ে জারাকে বলে,
__“খেজুরের রস খাবে বউ ?”
জারা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলে না। চুপচাপ গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে কৌতূহল, আবার একটু সন্দেহও। তারপর সে ধীরে ধীরে আরমানের কাছে ঝুঁকে আসে। খুব আস্তে, কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে,
__“খেজুরের রস খেতে কেমন হয় স্বামীজান?”
আরমান এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। এমন প্রশ্নে সে পুরো অবাক। তার চোখ বড় হয়ে যায়, ঠোঁটে হাসি চলে আসে।
__“তুমি খেজুরের রস কখনো খাওনি?”
জারা সঙ্গে সঙ্গে আরমানের বাহুতে আলতো চিমটি কাটে। আবার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে,
__“আস্তে বলুন। মানুষ শুনলে লজ্জা ।”
আরমান হেসে ফেলে। এই মেয়েটার যুক্তিবোধ নিয়ে সে মাঝেমাঝেই সন্দেহে পড়ে যায়। সে জারার হাত ধরে গাছটার দিকে নিয়ে যায়।
খেজুরগাছের নিচে লোকটা সর নামাচ্ছে। সর পড়ার শব্দটা জারার কানে ঢুকতেই সে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। একটু ভালো করে তাকিয়ে হঠাৎ গম্ভীর গলায় বলে,
__“আমাকে ঠকানো হচ্ছে।”
আরমান চমকে ওঠে।
__“মানে?”
জারা গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে,
__“এইটা গাছ। এখান থেকে সর নামছে। আপনি বলছেন খেজুরের রস। আমাকে গাছের রস খাইয়ে খেজুরের নাম দিচ্ছেন!”
আরমান কয়েক সেকেন্ড বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। এই মেয়ে কী বলছে, সে নিজেও বুঝে উঠতে পারে না।
__“এইটাই খেজুরের রস,” সে ধীরে বলে।
জারা মুখ বাঁকিয়ে ফেলে। চোখে পানি জমে ওঠে। হঠাৎ ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না শুরু।
__“আমি গাছের রস খাব না। আমি খেজুরের রস খাব!”
রাস্তার মাঝখানে তার বউ কান্না করছে। সকালবেলা মানুষজন তাকাচ্ছে। আরমানের মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে তো শুধু সর খাওয়াতে চেয়েছিল, এখন দেখা যাচ্ছে সংসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর বিক্রি করা লোকটা এগিয়ে এসে নরম গলায় বলে,
__“মা, রস গাছ থেকেই নামানো হয়। এইটাই খেজুরের রস।”
জারা মাথা নেড়ে বলে,
__“না। খেজুর থেকে রস বের হবে। গাছ থেকে কেন হবে?আপনিও আমার স্বামীজানের সাথে ঠকাতে চাইছেন? ”
আরমান গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। বোঝানোর চেষ্টা করে,
__“শোন, খেজুরে রস হয় না। রস গাছ থেকে আসে।”
জারা একেবারেই বিশ্বাস করে না। সে কান্নার সুরে বলে,
___“আপনি আমাকে বোকা বানাচ্ছেন। আমি গাছের রস খাব না। আমি বাড়িতে গিয়ে আব্বুর কাছে বিচার দিবো..!”
বলেই আবার কান্না করতে থাকে। আরমানের রাগ একটু একটু করে উঠতে থাকে। সকালবেলা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে, বউ কান্না করছে—এ দৃশ্য তার জন্য ভয়ংকর। সে এক হাঁড়ি সর নিয়ে নেয়। কোনো কথা না বলে জারার সামনে ধরে।
__“খা।”
জারা চুপ করে থাকে। আরমান জারার গাল চেপে ধরে রস নিয়ে সরাসরি জারার মুখে ঢুকিয়ে দেয়। জারা স্তব্ধ। চোখ বড় বড় করে দাঁড়িয়ে থাকে। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ থেকে জিভ দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে। তারপর তার চোখ চকচক করে ওঠে।
__“মিষ্টি…স্বামীজান মিষ্টি গালে..?” বলেই লাফিয়ে উঠে।
আরমান হাত কোমরে দিয়ে তাকিয়ে বলে,
__“এখন কান্না করছিস না কেন আবাল মেয়ে?”
জারা তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বলে,
__“আমি তো জানতামই না গাছের রস এতো ভালো।”
জারা দাঁত বের করে হেসে ফেলে। সেই হাসিটা এতটাই নিষ্পাপ যে আরমান নিজেও আর রাগ ধরে রাখতে পারে না। দুজনেই হেসে ওঠে।
শেষে আরমান দুই হাঁড়ি খেজুরের রস কিনে নেয়। জারা হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে রসের হাঁড়ির দিকে তাকায়, যেন কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে।
বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে আরমান ভাবে—এই মেয়েটাকে সামলানো সহজ না। কিন্তু এই বোকামি, এই সরলতা, এই কান্না-হাসিই তো তার সংসারের সবচেয়ে বড় সুখ।
খান বাড়িটা আজ কেমন নিঃশব্দ। অনেক দিন সবাই একসাথে থাকলেও কারও মন ভালো নেই। হাসি আছে, কথা আছে, কিন্তু তার ভেতরে একটা ভারী চাপা কষ্ট জমে আছে। নূরের চলে যাওয়ার দিন—এই কথাটাই যেন সবার বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসে আছে।
রোহান ধীরে ধীরে জিনিয়ার পাশে এসে দাঁড়ায়। জিনিয়া নূরকে কোলে নিয়ে বসে আছে। চোখ দুটো লাল, কিন্তু শক্ত থাকার চেষ্টা করছে। খান বাড়িতে সে অনেক দিন থেকেছে, সবাইকে নূরকে খুব ভালোবাসে। এখন আবার নিজের ঘরে ফেরার পালা, অথচ মনটা কিছুতেই মানছে না।রোহান নীরবতা ভাঙে,
—“ আম্মু, জিনিয়াকে নিয়ে আমি আবার আসব। বেশি দিন না।”
আসিফ খান এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন। কথাটা শুনে হঠাৎ রেগে ওঠেন,
—“ তাহলে যাওয়ার দরকার কী ছিল? শুধু আমাদের কষ্ট দিছো। আমাদের নানু ভাইটাকে নিয়ে চলে যাচ্ছো!”
__“অনেক দিন তো হলো আব্বু। এখন নিজের ঘরে ফিরা ভালো। আপনারা যাবে, আমরা আবার আসবাে। এই ভাবে চলতে থাকলে আর কারো কষ্ট হবে না। আপনাদের যখন ইচ্ছে নূর আর চাঁদ সুন্দরী কে দেখতে চলে যাবেন। ”
ঘরে একটা ভারী নীরবতা নেমে আসে। কেউ কিছু বলে না। ঠিক তখনই ছোট্ট রিয়াত হামাগুড়ি দিয়ে রোহানের পায়ের কাছে চলে আসে। ছোট ছোট হাত দিয়ে পায়ের পাজামা আঁকড়ে ধরে। রোহানের বুকটা কেঁপে ওঠে। সে ঝুঁকে পড়ে রিয়াতকে কোলে তুলে নেয়। হালকা হাসি এনে বলে,
—“ কী জামাই বাবা, বউকে যেতে দিতে চাও না?”
কথাটা যেন রিয়াত বুঝে ফেলে। হঠাৎ ওর মুখ কুঁচকে যায়, চোখ ভিজে ওঠে, তারপর ভ্যাঁ করে কান্না শুরু করে দেয়। কান্নার শব্দে সবার বুকটা হু হু করে ওঠে।
রাশেদ দ্রুত এগিয়ে এসে রিয়াতকে কোলে নেয়। বুকের সাথে চেপে ধরে, পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। রিয়াত একটু চুপ হয়, কিন্তু মুখে আঙুল ঢুকিয়ে বড় বড় চোখে নূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন কিছু একটা বুঝতে পারছে, অথচ কিছুই বোঝে না।
জিনিয়া আর থাকতে পারে না।নূর কে মিমের কোলে দিয়ে সে রিয়াতকে নিজের কোলে নিয়ে নেয়। চোখে পানি জমে ওঠে।
—“ বাবা, আমাদের সাথে যাবে?”
এই কথাটা শুনে রিয়াতের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কান্না থেমে যায়। ছোট্ট হাত নেড়ে যেন সম্মতি জানায়। জিনিয়ার ঠোঁট কাঁপে, চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে। জারা পাশে দাঁড়িয়ে আর সহ্য করতে পারে না।
—“ আপু, কিছু দিন পর যাও না। এত তাড়াতাড়ি গেলে মনটা মানবে না।”
ফিহাও জোর দিয়ে বলে,
—“ হ্যাঁ আপু, নূরটা আর একটু বড় হোক। তারপর যাও।”
মিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। তার কোলে নূর। নূরের ছোট মুখটা মিমের কাঁধে লেগে আছে। জিনিয়া অসহায়ভাবে তাকায়,
—“ তোমরা এমন করলে কীভাবে যাবো? গেলে কষ্ট, না গেলেও কষ্ট।”
এই সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আরমান বলে ওঠে,
—“ রোহান, যাওয়ার হলে তাড়াতাড়ি যা। শুধু শুধু সবার ইমোশন নিয়ে খেলা করিস না।”
কথাটা কড়া হলেও ভেতরে একটা চাপা কষ্ট লুকানো। সবাই সেটা বুঝতে পারে। ঠিক তখনই জাহেদ এসে বলে,
—“ আমাদের নূর মা-কে রেখে তোমরা চলে যাও। আমরা সবাই মিলে তোমাদের থেকে ভালো দেখাশোনা করতে পারবো নূর মা’কে। ”
আরমান এসে নূরকে কোলে তুলে নেয়। নূর আরমানের কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে থাকে। দৃশ্যটা দেখে জারার বুকের ভেতর কেমন একটা টান লাগে। ওর স্বামীজান বাচ্চাদের কত ভালোবাসে! নূরকে যেভাবে আগলে ধরে আছে, চোখে-মুখে মায়া। জারার হঠাৎ মনে হয়—এই মানুষটাই আবার তাকে বাচ্চা নিতে দেয় না। মনে মনে বলে ওঠে, “খারাপ লোক।”
সে উঠে এসে আরমানের পাশে দাঁড়ায়। নূরের ছোট্ট হাত আরমানের শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে। জারা চোখ সরাতে পারে না।তাদের ঘরে একজন আসলে নিশ্চয় স্বামীজান তাকে খুব ভালোবাসবে। আঘলে রাখবে।
ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম দুজনেই এগিয়ে এসে বলেন,
—“ যাওয়ার হলে আগেই বের হয়ে পড়ো বাবা। দেরি করলে কষ্ট আরও বাড়বে।”
রোহান মাথা নোয়ায়,
—“ আচ্ছা আম্মু।”
এরপর যেন সব কিছু খুব দ্রুত ঘটে। ব্যাগ গুছানো হয়, দরজার কাছে সবাই জড়ো হয়। কেউ কাউকে ঠিক করে বিদায় জানাতে পারছে না। চোখে চোখ পড়লেই পানি এসে যাচ্ছে।
বাড়ির বাইরে সবাই দাঁড়িয়ে। আকাশটা আজও স্বাভাবিক, কিন্তু খান বাড়ির মানুষগুলোর মন ভারী মেঘে ঢাকা। রিয়াত হঠাৎ আবার কান্না শুরু করে দেয়। এবার আর থামছেই না। জিনিয়া বুকের সাথে চেপে ধরে, রোহান মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তবু কান্না থামে না।
গাড়ি ছাড়ার আগে আরমান, জাহেদ আর রাশেদ বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নেয়। অফিসে যেতে হবে। এই বিদায়ের দৃশ্য আর দেখা তাদের পক্ষে সম্ভব না।
জিনিয়া শেষবারের মতো বাড়িটার দিকে তাকায়। খান বাড়ি শুধু একটা বাড়ি নয়—এটা এখন তার আবেগ, তার শিকড়। জিনিয়া রিয়াতকে মিমের কাছে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।
জিনিয়া চোখ মুছে নূরকে কোলে নেয়।নূরের দিকে তাকিয়ে বলে,
__“আবার আসব আম্মু..!”
গাড়ি ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। খান বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কেউ কথা বলে না। শুধু নীরবতার মধ্যে রিয়াতের কান্নার রেশটা রয়ে যায়—যা অনেকক্ষণ পরেও যেন থামতে চায় না।
নয়টার একটু পরেই বাড়ির গেট খুলে যায়। অফিস থেকে ফেরা গাড়ির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন একটু নড়ে ওঠে। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে আরমান, জাহেদ আর রাশেদ ভেতরে ঢোকে। ভেতরে ঢুকতেই ডাইনিংয়ে হালকা হাসির শব্দ।
জারা আর ফিহা আগেই খেয়ে নিয়েছে, সেটা সবার চোখ এড়ায় না। জারা একেবারে তাড়াহুড়ো করে ভাতের শেষ লোকমাটা মুখে পুরে উঠে দাঁড়ায়। ফিহা ওর পেছন পেছন। দু’জনের চোখে একটাই লক্ষ্য—রিয়াত।
এই দৃশ্য দেখে টেবিলে বসে থাকা সবাই হেসে ফেলে।
জেরিন মুখ ফুলিয়ে বলে,
— “রিয়াতকে আমার কাছে দেয় না। ওরা দু’জন মিলে টানাটানি করে। ওরা কি ছোট নাকি!”
জেসমিন বেগম হেসে বলেন,
— “তুইও আগে খেয়ে নে, তারপর যা। মন খারাপ করলে চলবে?”
মায়ের কথায় জেরিন দ্রুত খাওয়া শেষ করে উপরে চলে যায়। কিন্তু উপরে গিয়ে দেখে জারা আর ফিহা আগেই রিয়াতকে দখল করে ফেলেছে। ওদের হাসি, কথা, বাচ্চামোতে পুরো ঘর ভরে গেছে।
নিচে meanwhile, আরমানরা ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে। খাওয়ার টেবিলে বসে আরমান বারবার ফোনের দিকে তাকায়। প্লেট থেকে ভাত তুলে মুখে দিতেই আরমানের চোখ চারদিকে ঘোরে। একবার, দু’বার। তারপর কপাল কুঁচকে যায়।
— “মানজারা কোথায় আম্মু ?”
ওর গলার স্বরে অজান্তেই একটু অধৈর্য ঢুকে পড়ে।
এই প্রশ্নের রেশ কাটতে না কাটতেই জাহেদও চার পাশে তাকায়।
— “ফিহাও তো নেই দেখছি?গেলো কোথায় সব!”
ফারিয়া বেগম হাসি চেপে রেখে বলেন,
— “ওরা দু’জন আগেই খেয়ে নিয়েছে। রিয়াতের কাছে গেছে।”
এই কথা শুনে আরমান আর জাহেদ একসাথে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। জাহেদ নাক সিটকায়।
— “আবার রিয়াত?এই আন্ডা এসে আমাদের বউকে আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে!”
আরমান হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলে,
— “এই বাড়িতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ওই একটিই।”
ফারিয়া বেগম মজা করে বলেন,
— “ওদের দোষ কি বল । রিয়াত থাকলে ওদের আর কিছু মনে থাকে না।”
ডাইনিং টেবিলে হালকা হাসির রোল পড়ে যায়। কিন্তু আরমান আর জাহেদের মনে তখন থেকেই একটাই চিন্তা ঘুরতে থাকে— খাওয়া শেষ করে বউ আনতেই হবে।
শেষমেশ উঠে রুমে যায়। দরজা খুলেই কপাল কুঁচকে যায়। ঘর ফাঁকা। বউ নেই। এক মুহূর্ত দেরি না করে বুঝে যায়—মিমের ঘর।রিয়াতের কাছে। সে রুম থেকে বের জারাকে আনতে ঠিক তখনই পাশের রুম থেকে জাহেদ বের হয়। ওর মুখেও একই বিরক্তি।
— “এইটা কী ভাইয়া ? শীতকাল বউ-স্বামী স্বামী করবে, তা না করে গিয়ে বাচ্চা নিয়ে খেলছে।”
আরমান হেসে ফেলে।
— “এই বাচ্চাটাই এখন ওদের জীবন। আমার এখন ওদের কাছে বিরক্ত, বোঝলি?”
তবু দু’জনেই একসাথে রাশেদের ঘরের দিকে হাঁটা দেয়। হাঁটতে হাঁটতে জাহেদ বলে,
— “কিন্তু ছাড় দেওয়া না। অনেক হয়েছে।”
রাশেদের ঘরে ঢুকেই এক অদ্ভুত দৃশ্য। বিছানার মাঝখানে রিয়াত। ওর এক পাশে জারা, অন্য পাশে ফিহা। দু’জনেই রিয়াতের হাত-পা ধরে গান গাচ্ছে, মুখে অদ্ভুত শব্দ করছে। রিয়াত খিলখিল করে হাসছে।
ঘরের কোণে সোফায় বসে থাকা রাশেদ আর মিম দু’জনেই ক্লান্ত, কিন্তু মুখে হাসি। রাশেদের চোখে স্পষ্ট অনুনয়—আপনাদের বউ নিয়ে যান, প্লিজ।
আরমান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
— “মানজারা, রুমে আসো।”
জারা তাকিয়েও দেখে না। বরং রিয়াতকে আরও কাছে টেনে নেয়।
— “আমি এখন রিয়াতের সাথে খেলছি, ডিস্টার্ব করবেন না।”
জাহেদ ফিহাকে ডাকে।
— “ফিহা, চল।”
ফিহাও একই কথা,
— “বিরক্ত না করে যান এখান থেকে ।”
আরমান আবার বলে,
— “মানজারা, আসবে নাকি?”
জারা এবার মাথা ঘুরিয়ে বলে,
— “না।”
একদম পরিষ্কার, নির্লজ্জ ‘না’।ফিহাও বলে,
— “আমিও যাবো না।”
এই উত্তর দু’জন স্বামীর মাথায় আগুন লাগিয়ে দেয়।
জাহেদ দাঁত চেপে বলে,
— “রাশেদ ভাই, রিয়াতকে ঘুম পাড়াও।”
এই কথায় জারা আর ফিহা দু’জনেই চমকে ওঠে।
— “না না, এখন না।ও এখন খেলছে!”
আরমান এবার গম্ভীর কণ্ঠে জারাকে বলে
— “অনেক হয়েছে। চলো।”
জারা রিয়াতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
— “আমি যাবো না। আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন।”
ফিহা তো আরও এক ধাপ এগিয়ে।
— “আমরা এখানে থাকবো। আপনি চাইলে গিয়ে ঘুমাতে পারেন জাহেদ খান।”
এই কথা শুনে জাহেদের মুখ লাল।
— “এই সব নাটক বন্ধ কর।”
আরমান আর জাহেদ আর সময় নষ্ট করে না। এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আরমান জারাকে কোলে তোলে। জারা হাত-পা ছুঁড়তে থাকে।
— “ছাড়ুন! আমি চিৎকার করবো!”
ফিহা জাহেদের গলায় ঝুলে পড়ে।
— “আমি যাবো না! আমি যাবো না!”
রিয়াত অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর নিজেও কান্না শুরু করে। এই পুরো দৃশ্য দেখে মিম হেসে ফেলেন। রাশেদ মাথা নেড়ে বলে,
— “এদের আল্লাহ ধৈর্য দিক।”
শেষমেশ জারা আর ফিহাকে কোলে করেই রুমে নেওয়া হয়। দু’জনের মুখ ভার। রুমে এসে জারা বালিশে মুখ গুঁজে বসে।
— “রিয়াত কাঁদছে।”
আরমান ক্লান্ত গলায় বলে,
— “ওর মা আছে।”
আরমান এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। রুমের দরজাটা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জারার বুকটা কেঁপে ওঠে। বাইরে হাসি–ঠাট্টা ছিল, কিন্তু এই ঘরের ভেতর বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে। আরমান সামনে দাঁড়িয়ে আছে, জ্যাকেটটা খুলেও রাখেনি। চোখে সেই চেনা রাগ—যেটা জারা খুব ভালো চেনে, আবার ভয়ও পায়।
__“এইভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?গিয়ে শুয়ে পরো?”
আরমানের গলা ঠান্ডা, কিন্তু সেই ঠান্ডার নিচে আগুন।
জারা কিছু বলে না। সে জানে, এই মুহূর্তে একটা শব্দও ভুল হলে আগুনে ঘি ঢালা হবে।আরমান হঠাৎ গলা চড়িয়ে বলে ওঠে,
__“সারাদিন অফিসে মাথা ফাটিয়ে কাজ করি আর রাতে এসে দেখি আমার বউ ঘরে নেই। কার কাছে?রিয়াতের কাছে গিয়ে বসে আছে। আমার কাছে না।আমি খেলাম কি খেলাম না তা দেখার প্রয়োজন মনে করে না। ”
জারার চোখে পানি জমে ওঠে।
__“আমি তো—”
__“থামো।” আরমান হাত তুলে থামিয়ে দেয়।
__“ব্যাখ্যা চাইনি। ক্লান্ত লাগছে এসব শুনতে।”
সে এক পা এগিয়ে এসে জারার সামনে দাঁড়ায়। এত কাছ থেকে রাগী আরমানকে দেখলে জারার বুকটা কুঁচকে যায়।
__“আমি কি এতটাই অদৃশ্য? আমাকে চোখে পরে না? এতো অবহেলা করছো কেনো?মানলাম রিয়াতকে তুমি ভালোবাসো তাই বলে আমাকে এতো অবহেলা করতে হবে? ” আরমানের কণ্ঠে অভিযোগ, অপমান, হাহাকার—সব একসাথে। জারার গলা ধরে আসে।
__“আমি ইচ্ছে করে—”
__“ইচ্ছে না করলেও ফল তো একই,” আরমান হঠাৎ জারার কাঁধে হাত রাখে, তারপর এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়।
__“সবসময় অন্যদের জন্য সময় আছে, শুধু আমার জন্য না। কই আমি তো তোমাকে কখনো এমন উপেক্ষা করি না। তোমার এক কথায় আমি সব করতে রাজি। আর তুমি? আচ্ছা থাকো আর তোমার কাছে সময় চাইবো না ।”
এই ধাক্কাটা শুধু শরীরে না, জারার মনে লাগে। সে দুই পা পিছিয়ে যায়। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
__“আমি শুধু বাচ্চাদের ভালোবাসি বলেই কি এমন রাগ?” জারার কণ্ঠ ভেঙে যায়।
আরমান আর দাঁড়ায় না। ঘুরে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ে, তারপর শুয়ে পড়ে একা, পিঠ ফিরিয়ে।
__“আর কথা বাড়িয়ো না,” ঠান্ডা স্বর।
জারার মনে হয় কেউ বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা টেনে বের করে নিল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার পর ধীরে ধীরে বোঝে—সে সত্যিই কাউকে অবহেলা করেছে। সে জানে, সে বাচ্চা ভালোবাসে। সে জানে, সে মাতৃত্বের টানে দুর্বল। কিন্তু তার স্বামীজান কি সেটা জানে না?তারপরও…এভাবে রাগ?এভাবে দূরে ঠেলে দেওয়া? জারা চোখ মুছে ধীরে ধীরে এগোয়। বিছানার অন্য পাশে শুয়ে পড়ে। মাঝখানে বিশাল এক দূরত্ব।
সে হাত বাড়িয়ে আরমানের বাহু ছুঁতে যায়। এক সেকেন্ড। আরমান সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ঝাঁকিয়ে সরিয়ে দেয়।
__“ আমাকে মাফ করে দিন আর এমন করবো না স্বামীজান! ”
__“রিয়াতের কাছেই যাও,” রাগী কণ্ঠ।“আমার কাছে আসার দরকার নেই।”
এই কথাটা জারার ভেতর কেটে যায়। তবুও সে চুপ থাকে। কান্না চেপে রাখে। কারণ এখন সে বুঝেছে—
এই রাগ আসলে জেলাসি। সে ধীরে ধীরে আরমানকে জড়িয়ে ধরে, পিঠে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলে,
__“আমি কাউকে আপনার জায়গায় বসাইনি…কখনো না।”
আরমান শরীর শক্ত করে রাখে।
__“আমাকে বোঝানোর দরকার নেই।”
জারা চোখ বন্ধ করে সাহস সঞ্চয় করে।
__“আমরা একটা বেবি নিলে কেমন হয়?”
এই কথায় আরমান হঠাৎ ঘুরে বসে।
__“এই কথা আবার না,”রাগ তীব্র।“আমি আগেই বলেছি।”
__“কেন?” জারার গলা কাঁপে।
আরমান দাঁত চেপে বলে,
__“কারণ আমি তোমাকে হারাতে চাই না। এই আলোচনার এখানেই শেষ।”
জারা মাথা নিচু করে নেয়।নরম স্বরে বলে,
__“ঠিক আছে। আপনার কথা মেনে নিলাম।”
সে আর কিছু বলে না। শুধু একবার ঘড়ির দিকে তাকায়। বারোটা দশ। হার্টটা হঠাৎ চুপসে যায়।আজ তো…আজ তো তাদের দ্বিতীয় ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি।
আরমান কিছু বলল না। একটা কথাও না। জারার মনে হলো—সে হয়তো ভুলে গেছে। আরমান আবার উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ে, জারার দিকে পিঠ দিয়ে। স্পষ্ট করে বলে না, কিন্তু তার শরীরটাই বলে দেয়—আমি এখনও রেগে আছি।
জারা আর কিছু করার চেষ্টা করে না। সে ধীরে ধীরে কাঁথার ভেতরে ঢুকে পড়ে। চোখ বন্ধ করে।মনের ভেতর প্রশ্ন ঘুরতে থাকে— সে কি সত্যিই খুব খারাপ বউ? ভালোবাসা কি ভাগ করা যায় না? চোখের কোণে জমে থাকা পানি বালিশ ভিজিয়ে দেয় আরমান পাশ ফিরেও টের পায়। কিন্তু কিছু বলে না। দু’জনের মাঝখানে রয়ে যায়— রাগ, অভিমান, না বলা কথা, ভুল বোঝাবুঝি। একসময় ক্লান্ত জারা ঘুমিয়ে পড়ে।
চুপচাপ। নিঃশব্দে। আরমান তখনও জেগে।চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। তার রাগের নিচে লুকানো থাকে ভয়—
সে যদি সত্যিই একদিন দূরে সরে যায়?
ঘর অন্ধকার। আলো নিভে গেছে অনেকক্ষণ আগেই, কিন্তু আরমানের ভেতরের অস্থিরতা নিভছে না। পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে আছে সে, চোখ বন্ধ, অথচ ঘুম নেই। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পাশে জারা শুয়ে আছে—নীরব, কুঁকড়ে। তার শরীরের ভঙ্গি দেখলেই বোঝা যায়, সে আজ নিজের ভেতর অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। একটু আগেও যে মেয়েটা কাঁদছিল, এখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু আরমানের চোখ এড়ায় না।
এই দৃশ্যটা তাকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খায়। রাগটা আসলে রাগ নয়—ভয়। হিংসা। নিজেকে উপেক্ষিত মনে হওয়ার যন্ত্রণা। আরমান ধীরে ঘুরে জারার দিকে মুখ করে। খুব সাবধানে হাত বাড়ায়, যেন শব্দ হলেও ভেঙে যাবে এমন কিছু ছুঁতে যাচ্ছে। জারার হাত ঠান্ডা। নিজের হাত দিয়ে ঢেকে দেয় সে। তারপর আরেকটু কাছে টানে।
জারা ঘুমের মধ্যে নড়ে ওঠে। অভ্যাসের মতোই আরমানের বুকের দিকে গুটিয়ে আসে। এই ছোট্ট অভ্যাসটাই আরমানকে ভেঙে দেয়। সে জারাকে আরও কাছে টেনে নেয়। বুকের সঙ্গে চেপে ধরে। নিজের শ্বাসটা তার চুলে মিশিয়ে দেয়। মনে পড়ে যায়—এই মেয়েটাই তার পৃথিবীর কেন্দ্র, অথচ সে-ই আজ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছে।
আরমান জানে, সে আজ জারাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। কথা দিয়ে, আচরণ দিয়ে। সে জানে, জারা বাচ্চা ভালোবাসে। সে জানে, রিয়াতের সঙ্গে খেলতে গিয়ে জারার মনটা কীভাবে নরম হয়ে যায়। কিন্তু সে এটাও জানে—ডাক্তারের কথাগুলো এখনও তার মাথার ভেতর ঘুরে বেড়ায়। জারার শরীর, ওজন, দুর্বলতা—সবকিছু মিলিয়ে ভয়টা তাকে গ্রাস করে।
ভালোবাসা কখনও কখনও এমন ভয় তৈরি করে, যেটা রাগ হয়ে বেরিয়ে আসে।
আরমান কপাল নামিয়ে জারার চুলে ঠোঁট ছোঁয়ায়। কোনো শব্দ নেই। শুধু দীর্ঘ এক নিশ্বাস। তার হাতটা জারার কোমরে শক্ত হয়, যেন হারিয়ে না যায়।
ঘড়ির কাঁটা অনেক আগেই বারোটা পেরিয়েছে। সে জানে—আজকের দিনটা জারার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সে কিছু বলেনি। ইচ্ছে করেই। কারণ যদি বলত, হয়তো এই নীরবতাটা থাকত না, এই শান্তি টুকুও না। জারা’র মাথায় আবার চুমু দিয়ে বলে
__“আমি ভুলিনি সোনা। তুমি কষ্ট পেয়েও না। তোমার স্বামীজান তোমার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করছে।”
জারা ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে, আরও কাছে আসে। আরমান তখন বুঝতে পারে—সব অভিমান, সব অভিযোগের পরেও এই মেয়েটা তার কাছেই ফিরে আসে।সে চোখ বন্ধ করে।এই মুহূর্তে আর কোনো রাগ নেই। শুধু ভয় আর ভালোবাসা একসাথে মিশে আছে।
আরমান জারাকে শক্ত করে ধরে রাখে।এই নীরবতাই তার ক্ষমা। এই স্পর্শই তার ভালোবাসা।
এদিকে রুমের দরজাটা বন্ধ হতেই ফিহা আচমকা থেমে দাঁড়াল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা রাগটা যেন আর ধরে রাখা গেল না। সে তার শীতের জামাটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলল, তারপর ঘুরে জাহেদের দিকে তাকাল। চোখ দুটো জ্বলছে, ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরা।
__“আপনি এটা করলেন কেন?”
ফিহার গলা কাঁপছে, কিন্তু তাতে ভয় নেই—শুধু রাগ।
জাহেদ কোটটা খুলে চেয়ারে রাখছিল। ফিহার কথা শুনে সে থেমে যায়।
__“কী করেছি?”
ফিহা তীব্রভাবে বলে ওঠে,
__“রিয়াতের কাছ থেকে আমাকে জোর করে টেনে আনলেন কেন? আমি ওর সাথে খেলছিলাম।”
জাহেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে জানত, এই প্রশ্ন আসবে।
__“রাত অনেক হয়েছে, ফিহা।”
__“রাত হলে কী? আমি কি আপনার সম্পত্তি যে যখন খুশি টেনে নিয়ে যাবেন?”
এই কথাটা জাহেদের গায়ে লাগে। সে গম্ভীর হয়ে যায়।
__“অব্যই তুমি সম্পত্তি। তাই নিয়ে এসেছি। কি করবে এখন। ”
ফিহা হেসে ওঠে, কিন্তু সেই হাসিতে কষ্ট।
__“ আপনি আমাকে এমনভাবে নিয়ে এলেন যেন আমি কোনো দোষ করেছি! ”
সে বিছানার ধারে বসে পড়ে।
__“আপনি জানেন, আমি রিয়াতকে কত ভালোবাসি।”
জাহেদ একটু নরম হয়।
__“আমি জানি।”
__“না, আপনি জানেন না।”
ফিহা চোখ মুছে নেয়।
___“আপনি শুধু দেখেছেন আমি ওর সাথে আছি। একবারও ভাবেননি, আমি কেন সেখানে থাকতে চাই।”
জাহেদ কাছে আসে।
__“আমি শুধু চাইনি তুমি আমাকে এড়িয়ে যাও।”
ফিহা অবাক হয়ে তাকায়।
__“এড়িয়ে যাওয়া?”
তার গলা নরম হয়ে আসে।
__“আমি কি আপনাকে এড়িয়ে গেছি?”
জাহেদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে,
___“আজ সারাদিন কাজের পর যখন দেখি তুমি আমার পাশে না থেকে ওখানে… তখন মাথাটা ঠিক ছিল না।”
ফিহা উঠে দাঁড়ায়।
__“তাহলে রাগ দেখাবেন?”
জাহেদ চোখ নামিয়ে নেয়।
___“আমি ভুল করেছি।”
এই স্বীকারোক্তিটা ফিহাকে থামিয়ে দেয়। রাগ পুরো যায় না, কিন্তু ধার কমে। সে ধীরে বলে,
__“আপনি যদি বলতেন—‘ফিহা, এসো’—আমি নিজেই আসতাম।”
জাহেদ কাছে এসে দাঁড়ায়।
__“আমি বলেছিলাম ম্যাডাম। আপনি কি যেনো বলেছিলেন। এইটুকু সময়ের মাঝে ভুলে গেলেন?”
__“কি বলেছি?”ফিহার গলায় এবার কৌতূহল।
জাহেদ খুব নিচু স্বরে বলে,
__“আপনাকে বিরক্ত যেনো না করি। ”
ফিহা চুপ করে যায়। সে বুঝতে পারে—এই রাগের ভেতরে আসলে অধিকারবোধ আর ভালোবাসার ভয়।
সে আবার বসে পড়ে।
___“আপনি জানেন, আমি এমন না।”
জাহেদ তার সামনে বসে।
__“জানি। কিন্তু তবুও রাগ করেছি। কারণ তুমি আমার।”
এই কথাটা ফিহার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, যেন চোখের জল দেখা না যায়।
__“আপনি মাঝে মাঝে খুব বেশি জেলাস হন।”
জাহেদ হালকা হাসে।
__“হই। কারণ আমি তোমাকে খুব বেশি চাই।”
ফিহা এবার আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারে না।
__“তাহলে আমাকে এমন করে টানবেন না। কথা বলবেন।”
জাহেদ মাথা নেড়ে বলে,
__“ঠিক আছে।”
সে আলতো করে ফিহার হাত ধরে। এবার ফিহা ছাড়ায় না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ফিহা ধীরে বলে,
__“রিয়াত কে আমার খুব ভালো লাগে। কি সুন্দর ছোট ছোট হাত পা। গাল দুটু টমেটোর মতো।”
জাহেদ নরম স্বরে উত্তর দেয়,
__ তাই ।”
ফিহা তাকায়।
__“হুম! আর আপনি রাগ করলেন?”
জাহেদ একটু কাছে সরে আসে।
__“কারণ আজ রাতে আমি তোমাকে চাইছিলাম। শুধু তোমাকে। ”
এই কথাটা ফিহার মুখে লাজুক হাসি এনে দেয়।
__“এভাবে বললে কি হয় না?”
জাহেদ কপাল ঠেকায় তার কপালে।
__“হয়। কিন্তু আমি দেরিতে বুঝি।”
ফিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সব ঝগড়া যেন ধীরে ধীরে গলে যায়। জাহেদ এবার তাকে টেনে নেয় নিজের দিকে।
__“এখন রাগ আছ?”
ফিহা মাথা নাড়ে।
__“একটু।”
জাহেদ হাসে।
__“এই একটুটা আমার প্রাপ্য।তুমি চাইলে আমার দুজন মিলে তিন জন হতে পারি ।”
ফিহা তার বুকে মুখ লুকিয়ে দেয়।
__“আপনার প্রস্তাব আমি মানাবো না।”
জাহেদ কানে কানে বলে,
__“তোমাকে মানাতে আমার সারাজীবন লাগলেও রাজি।”
ফিহা চোখ বন্ধ করে। তার বুকের ভেতর আর অশান্তি নেই।লাইটটা নিভে যায়। দুজন পাশাপাশি শুয়ে পড়ে।জাহেদ হাত রাখে ফিহার মাথায়।
___“ঘুমাও।”
ফিহা ফিসফিস করে বলে,
__“আপনি পাশে থাকলে এমনিতেই ঘুম আসে।”
রাগ, ঝগড়া, অভিমান—সব পেছনে পড়ে থাকে।
এই রাতে, ভালোবাসা আবার জিতে যায়।
ভোরের আলোটা পর্দার ফাঁক গলে ঘরের মেঝেতে এসে পড়তেই জারা নড়েচড়ে উঠল। খুব হালকা একটা ঘুম ছিল, যেন মনটা সারা রাত জেগেই ছিল। চোখ মেলার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রথম স্বাভাবিক কাজ পাশে হাত বাড়ানো। কিন্তু হাতটা গিয়ে পড়ল শূন্যতায়। জারা হালকা ভ্রু কুঁচকে চোখ পুরো খুলল। বিছানার অন্য পাশটা একেবারে ঠান্ডা। কেউ নেই। বালিশটা গুছানো, কম্বলটা ভাঁজ করা। সবকিছু খুব পরিপাটি, খুব নির্লিপ্ত। আরমান নেই। এক মুহূর্তে বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠল। সে উঠে বসে চারপাশে তাকায়, যেন ভুল দেখছে। ঘড়ির দিকে চোখ যায়—সকাল নয়টা বেজে পনেরো।
“এত সকাল হয়ে গেছে ?”নিজের মনেই প্রশ্নটা উঠে আসে।
গত রাতের দৃশ্যগুলো একে একে মনে পড়ে যায়। আরমানের রাগ, মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকা, নিজের বলা না বলা কথাগুলো, আর সেই বিশেষ দিনের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর চেপে বসে।
আজ তাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। এই দিনটার জন্য জারা কত কিছু ভেবেছিল। খুব বড় কিছু না—শুধু একটা কথা, একটা হাসি, একটা আলতো স্পর্শ। কিন্তু লোকটা একবার ডাকও দিয়ে গেল না। “এত রাগ?” চোখের কোণে পানি জমে আসে। সে বিছানা থেকে নামে। পায়ের নিচে ঠান্ডা মেঝে লাগে, কিন্তু ভেতরের শূন্যতা তার থেকেও ঠান্ডা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকায়। চোখ দুটো একটু ফোলা, কিন্তু কান্নার দাগ নেই। সে কাঁদেনি—অন্তত চোখে জল ফেলেনি। জারা জানে, এই নীরবতাটাই সবচেয়ে কষ্টের। বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়। পানির শব্দে মাথার ভেতরের কোলাহল ঢেকে যায় না। বারবার একটা কথাই ঘুরে ফিরে আসে— সে কি সত্যিই ভুলে গেছে?
নিজেকে সামলে নেয়। আজ সে দুর্বল হতে চায় না। আজকের দিনটা সে নষ্ট করবে না। নিচে নামতেই বাড়ির পরিবেশে একটা আলাদা উষ্ণতা টের পায়। ডাইনিং টেবিলের চারপাশে সবাই বসে আছে। তাকে দেখামাত্রই একসাথে কথা উঠল।
“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি!“আল্লাহ তোদের খুব সুখে রাখুক।” বললেন ফারিয়া বেগম,
জারা এক মুহূর্ত থেমে যায়। এতগুলো মানুষের ভালোবাসায় বুকটা হালকা হয়ে আসে। সে হালকা হাসে, মাথা নুইয়ে সালাম দেয়।
__“ধন্যবাদ।”
কিন্তু এই হাসির আড়ালে একটা চাপা কষ্ট রয়ে যায়—যার জায়গাটা আরমানের জন্যই খালি। ফারিয়া বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, হাতে গরম পায়েসের বাটি।
__“আয় মা, তোর জন্য বানিয়েছি।”
জারা অবাক হয়ে তাকায়।
__“আম্মু… এত কষ্ট করলে?”
ফারিয়া বেগম স্নেহভরা চোখে তাকান।
__“এটা কষ্ট না আনন্দ?”
জারা বসে পড়ে। পায়েসের প্রথম চামচ মুখে দিতেই গলার কাছে একটা দলা পাকায়। মিষ্টিটা খুব সুন্দর, কিন্তু চোখ ভিজে উঠতে চায়।একটু চুপ করে থেকে সে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
__“আম্মু… তোমার৷ ছেলে কখন বের হয়েছে?”
ফারিয়া বেগম উত্তর দেন,
__“এক ঘন্টা হবে। অফিসে জরুরি কাজ ছিল নাকি। কেন, তোকে বলে যায়নি?”
জারা হালকা হাসে।
__“না, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম।তাই হয়তো ডাকেনি।”
এই কথার আড়ালে কতটা কষ্ট লুকানো, সেটা সে ছাড়া আর কেউ জানে না। আজকের দিনে মানুষটা তার চোখে চোখ রেখে একটা কথাও বলল না—এই ভাবনাটা তাকে ভিতরে ভিতরে ভেঙে দিচ্ছে। পায়েস শেষ করে সে বাটি নামিয়ে রাখে।
__“আম্মু, আজ আমি রান্না করবো।”
ফারিয়া বেগম আপত্তি করেন।
__“না মা, আজকের দিনটায় তুই বিশ্রাম কর।”
জারা দৃঢ় গলায় বলে,
__“আমি ওনার জন্য রান্না করে অফিসে নিয়ে যাবো।”
এই কথায় ফারিয়া বেগম আর বাধা দেন না।
__“ঠিক আছে। আমরা হেল্প করবো।”
রান্নাঘরে ঢুকে যায় জারা। হাত চলতে থাকে, কিন্তু মন পড়ে থাকে অন্য জায়গায়। সে জানে, সে হয়তো অনেক সময় বাচ্চাদের নিয়ে মেতে থাকে। সে জানে, আরমান হয়তো নিজেকে একা মনে করে। কিন্তু তার ভালোবাসাটা কি কেউ বোঝে না? সে বাচ্চা ভালোবাসে। খুব ভালোবাসে। এটা কি অপরাধ?
রান্না শেষ হলে খাবার গুছিয়ে দেওয়া হয়। জারা রেডি হতে ওপরে যায়। শাওয়ার নেয়, বোরকা পরে। আয়নায় একবার নিজেকে দেখে মনে হয়—আজ সে একটু আলাদা। হয়তো মনটাই আলাদা।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৩ (২)
খাবার হাতে নিয়ে সে গাড়িতে ওঠে । রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে সে ভাবে—তাকে দেখে স্বামীজান নিশ্চয় খুশি হবে। তাহলে সব অভিমান ভেঙে যাবে।
অফিসে পৌঁছে সে গাড়ি পার্ক করে। বুক ধুকপুক করে। খাবারের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে ভেতরে ঢোকে।
আজ সে শুধু একটা কথা শুনতে চায়—“ভুলে যাইনি।”
