রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৩ (২)
সোহানা ইসলাম
“ স্যার… আমার মিমের কিছু হবে না তো?”
গাড়ির ভেতর বসে রাশেদ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করছিল। ড্রাইভিং সিটে আরমান, হাত স্টিয়ারিংয়ে শক্ত। তার চোখ সামনে, কিন্তু বাক্যের ভেতরে ছিল দৃঢ়তা।
__“কিছু হবে না। সব ঠিক হবে। মিম শক্ত মেয়ে। ভয় পাস না।”
পাশে বসে জাহেদ রাশেদের কাঁধে হাত রাখে।
__“দোয়া কর… আল্লাহ রক্ষা করবেন।”
কিন্তু তাতে কি রাশেদের ভয় কমে? না।তার চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে মিমের মুখটা—সেই বড় বড় চোখ, সেই হাসি।যেন সমস্ত পৃথিবী যদি কেউ হয়ে থাকে, সেটা মিম। আরেকটা গাড়ি পিছনে আসে। তাতে আসিফ খান, আরিফ খান। দুই গাড়ি যেন প্রতিযোগিতা করছে—কেউ একজনের জীবনের জন্য দৌড়।
হাসপাতালের ফটক পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র বিশ মিনিট, কিন্তু রাশেদের কাছে যেন সেটা ছিল বিশ ঘণ্টা। গাড়ি থামা মাত্রই রাশেদ দরজা খুলে দৌড়ে ভেতর ঢোকে।হাসপাতালের করিডোরের ওপর দিয়ে দৌড়াতে থাকা রাশেদের জুতা থেকে ঠকঠক শব্দ ভেসে আসছিল। যেন প্রতিটি শব্দ তার বুকের ধুকপুকানিকে আরও জোরে প্রতিধ্বনিত করছিল। অফিস থেকে খবরটা পাওয়ার পর তার মাথা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। কতটা ভয় সে পেয়েছিল, কতটা আতঙ্কে তার বুক ভেঙে যাচ্ছিল—তা বোঝার জন্য তার মুখের দিকটা মাত্র একবার দেখলেই যথেষ্ট ছিল।
তার পেছনে সবাই ছুটে আসে। ওটি রুমের সামনে বসে আছে—ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম, জারা, ফিহা। কারো মুখে রঙ নেই। সবার চোখে অপেক্ষার ভয়ানক চাপ। রাশেদ পৌঁছানো মাত্রই দম ছাড়ে ফারিয়া বেগম তাকে বসায়
—“বস বাপ। পানি খা । সব ঠিক আছে।”
কিন্তু রাশেদ বসে থাকতে পারে না। তার বুক যেন চাপা আগুনে জ্বলছে। সে বারবার কেঁপে ওঠা গলায় বলে,
—“যদি… মিমের কিছু হয়… আমি বাঁচবো না বড় আম্মু… আমি বাঁচবো না…আমার মস্তিষ্ক খালি লাগছে..!”
ফারিয়া বেগম চোখ ভিজে গেলেও শক্ত কথা বলেন
—“চুপ কর । আল্লাহর উপরে ভরসা রাখ। সব ঠিক আছে। এমন কথা মুখে আনবি না।”
রাশেদের ঠোঁট কাঁপছিল। মাথা নিচু হয়ে আসছিল।
তার অপরাধবোধ, ভয়… সব একসাথে আঘাত করছিল। কেনো সে মিমের এই সময় টায় পাশে থাকতে পারলো না। সেই রাতে সে বুঝল—ভালোবাসা মানে শুধু হাসি নয়, মাঝরাতে হাসপাতালের করিডোরে বসে হৃদপিণ্ড থেমে যাওয়ার মতো আতঙ্ক নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকা।
এদিকে আরমান চারদিকে তাকিয়ে জারাকে খুঁজে পায়। মেয়েটা ফিহার কাঁধে মুখ গুঁজে কাঁদছে।
আরমান এক ধাপ এগোতেই জারা তাকায়, চোখ ভিজে। দৌড়ে এসে তার বুকে মাথা ঠেকিয়ে বলে
— “ও স্বামীজান… আমার জানু ঠিক হয়ে যাবে তো? ও অনেক… অনেক কষ্ট পাচ্ছিলো…”
জারার কণ্ঠে কান্না থেমে থেমে, কিন্তু শব্দগুলো ধারাল। ফিহাও পাশে বসে চোখ মুছছিল। জাহেদ এসে ফিহাকে নিজের কাছে এনে সান্ত্বনা দেয়।
জেসমিন বেগম বলেন
—“আরমান, মেয়ে দুটুকে বাইরে নিয়ে যা।সেই কখন থেকে বসে বসে কান্না করছে। ”
আরমান জারার দিকে তাকায়।জারা মাথা নাড়ে কান্না আটকাতে না পেরে
—“আমি যাবো না। আমি এখানে থাকবো। জানুর কিছু হলে… আমি…”
__“ঠিক আছে, যাবো না। চুপ করো এখন।”
মৃদু ধমক দিয়ে জারাকে পাশেই বসায় সে হাসপাতালের পরিবেশ ছিল থমথমে। পথে রোগীদের পরিবার, জরুরি সতর্কতা শব্দ, নার্সদের ব্যস্ত পদচারণা— সব মিলিয়ে যেন ভরা উত্তেজনার এক ঘূর্ণি বাতাস চারপাশে বইছিল। সময় যেন এগোচ্ছে না। দশ মিনিট, পনেরো মিনিট— একেকটা মুহূর্ত সবার বুক কেঁপে উঠছে।
রাশেদ আবার উঠে দাঁড়ায়। ওটি রুমের লাল আলো জ্বলছে। সে দরজার দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করে
—“আল্লাহ… আমার মিমকে রক্ষা করো।”
তার চোখে জল।সে সারা পৃথিবীর কাছে একটাই প্রার্থনা করছিল।এই মুহূর্তে সে বাপ হবার অপেক্ষায় নয়—সে শুধু চাইছিল স্ত্রী বেঁচে থাকুক।চারপাশের পুরুষরা—আসিফ খান, আরিফ খান, আরমান—
কারো মুখেই স্বস্তি নেই। তারা শক্ত দাঁড়িয়ে আছে শুধু এক কারণ— বিকল হয়ে গেলেও পরিবারের পুরুষরা শক্ত থাকতে পারে সেই সাহস দেখানোর জন্য।
একসময়…
হঠাৎ—ওটি রুমের ভেতর থেকে শোনা যায়— একটা ছোট্ট বাচ্চার কান্না। প্রথমে ক্ষীণ… তারপর জোরে… স্পষ্ট। করিডোরে যেন আলো ঝলসে উঠলো। সবার চোখে বিস্ময়, স্বস্তি, আনন্দ। ফারিয়া বেগম আলহামদুলিল্লাহ বলে হাত তুলে দোয়া করেন।
জেসমিন বেগম চোখ মুছেন।
রাশেদ দু’হাত মুখে রেখে হাউমাউ করে কাঁদে।
এটা দুর্বলতার কান্না নয়— এটা এমন কান্না যা বুকের ভেতর ভালোবাসা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বেরিয়ে আসে।
__“আল্লাহ… ধন্যবাদ…”
তার সুর ভিজে, কাঁপা— কিন্তু তাতে ছিল অশেষ কৃতজ্ঞতা। ঠিক তখনই এক নার্স এসে জানায়
—“ছেলে হয়েছে।”
সবাই যেন শ্বাস নিচ্ছিল প্রথমবারের মতো।
নার্স বলে
—“পেসেন্ট বলেছেন বেবিকে আগে বাবার কোলে দিতে।”
রাশেদ স্থির দাঁড়িয়ে আছে।তার হাত কাঁপছে। চোখে জল।ঠোঁট শুকনো। কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত আলো।
নার্স ছোট্ট, নবজাতকটাকে তার কোলে রাখে। মুহূর্তে দুনিয়া যেন থেমে যায়। সেই ক্ষুদ্র প্রাণ— কোমল চামড়া, ছোট আঙুল, ভেজা চোখ— রাশেদের বুক ভেঙে যায়। সে যেটা আগে ভাবতো— স্ত্রী ছাড়া বাঁচতে পারবে না— সে বুঝলো— আজ থেকে আরেকটা প্রাণ তার সাথে জুড়ে গেল।
___“মিম… আমার মিম ঠিক আছে?”
সে নার্সকে প্রশ্ন করে। নার্স হাসে বলে,
—“হ্যাঁ। পেসেন্ট সুস্থ আছে। নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। কিছু সময় পর আপনারা দেখতে পারবেন।”
সেই এক বাক্য যেন অন্ধকার রাতের মাঝে সূর্যের আলো হয়ে আসে। রাশেদের হাত কাঁপতে দেখে ফারিয়া বেগম বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বলেন
—“এ একদম তোর মতো হয়েছে রাশেদ ! কান্না করছিস কেনো রাশেদ? এখন তো বাপ হয়েছিস!”
রাশেদ মাথা নিচু করে হাসতে হাসতে কাঁদে—
__“খুশির কান্না… বড় আম্মু… খুশির…”
এক এক করে সবাই বাচ্চাকে স্পর্শ করে দেখে। ছায়মা মিমের খরব পেয়েই ভাইকে নিয়ে হাসপাতালে চলে আছে। জারা তো বাচ্চার হাত টিপে ধরে চমকে যায়
—“কি ছোট আর নরম হাত!”
তার চোখে স্বপ্ন, বিস্ময়, হিংসা ও মায়া—সব একসাথে। যে এতো সময় কান্না করছিলো সে এখন একদম শান্ত হয়ে গেছে। জারা আরমানের দিকে তাকায়। আরমান তার দিকে তাকিয়ে বোঝে—
ওর চোখে লেখা—“আমাদের কবে ?”
জারা কোলে নিতে যায় তার আগেই ফিহা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সরাসরি ঘোষণা করে,
— “ওকে আমার কাছ থেকে কেউ নেবে না।”
জাহেদ হেসে বলে
— “ বেবিকে ভালো করে দেখতে দাও আমি আবার মিষ্টি আনতে যাবো।”
জাহেদ বেবিকে দেখে চোখ জুড়িয়ে নেয়। তারপর খুশি মনে মিষ্টি আনতে চলে যায়।
আসিফ খান কাছে এসে বাচ্চার কানে আজান দেয়—
করিডোরে নামাজের ধ্বনি মিলেমিশে যায় নবজাতকের কাঁদুনির সাথে। ছায়মা গাল ফুলিয়ে বলে
— “মামি ফিহা বেবিকে দিতে চায় না আমাকে!”
জেসমিন বেগম হেসে বলে
— “ সবাই নিবে এক এক করে। সময় তো আছে।”
কিন্তু কে শুনে কার কথা। বেবি একজন কিন্তু কোলে নেওয়ার মানুষের অভাব নেই। বাচ্চা টাকে পেয়ে বাড়ির সবাই কতো খুশি।কারোর কোনো হিংসা নেই। রাশেদ দরজার সামনে দাড়িয়ে সব দেখে। মনে মনে ভাবে “ আমার মতো অনাত এক ছেলে এতো সুন্দর পরিবার পাবো কল্পনা ও করিনি। আল্লাহ মা বাবা নিয়ে গেছে, কিন্তু আমার জন্য কি সুন্দর পরিবার তৈরি কীে দিয়েছে। ”
জারা ফারিয়া বেগম এর কাছে এসে বসে। ফারিয়া বেগমের আঁচল ধরে বলে
__“শাশুড়ী আম্মা ফিহা কে বলো না আমার কাছে দিতে। ”
জারা’র এমন বাচ্চাসুলব কথা শুনে সবাই হেসে উঠে। আরমান তাকিয়ে আছে তার লক্ষী বউয়ের দিকে। তার বউ বাচ্চা কতো ভালোবাসে। ফারিয়া বেগম বেবি কে ফিহার কাছ থেকে নিয়ে জারা কোলে দেয়। জারা তো বেবিকে কোলে নিয়া মহা খুশি। ছায়মা জারা’র পাশে বসে বেবির হাত ধরে। এমন সময় আরমানের ফোনে কল আসে। রোহান ভিডিও কল করেছে। আরমান কল রিসিভ করে বেবিকে দেখায়। জিনিয়া আর জেরিন তো সেই খুশি। রোহান মঝা করে বলে
__“আমার মেয়ে হলে রোহানের ছেলের সাথে বিয়ে দিব..!”
রাশেদ হাসে ওর কথায়। কিন্তু মিমের চিন্তা ওর মাথা থেকে নামছে না।রোহান আরও কথা বলে কল কেটে দেয়। বেবি নিয়ে এমন হাসির মাঝে আবার করিডোরে শান্তি নেমে আসে। হাসপাতালে এতো মানুষ থেকে কি করবে তাই আরিফ খান আর আসিফ খান বাড়ি চলে যান। জেসমিন বেগম ও যান। মিমের জন্য খাবার নিয়ে আবার আসবেন তিনি। মেয়েটার শরীর এখন খুব দূর্বল। ওরা তিন জন আট টায় হাসপাতাল থেকে বের হয়।
রাশেদের হাতের তালু এখনও কাঁপছে। বাচ্চাকে সবাই কোলে নিয়েছে, চুমু খেয়েছে, আদর করেছে—কিন্তু তার চোখ বারবার সেই ওটি রুমের দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। মিম… সেখানে শুয়ে আছে। সে জানে মিম কতটা ব্যথা সহ্য করেছে। সে জানে প্রতিটি সেকেন্ড ওর জন্য যুদ্ধ ছিল। তবুও সে অপেক্ষা করছে। নার্স এসে বলেছে—পাঁচ মিনিট পর দেখা করা যাবে। পাঁচ মিনিট! আজ যেন পাঁচটা বছর মনে হচ্ছে।
ফারিয়া বেগম বললেন,
__“চোখের পানি মুছ বাবা। হাসি নিয়ে ওর সামনে যেতে হবে। মেয়েটাকে দেখে ওকে শক্তি দিস। ওও খুব ভয় পেয়েছিল।”
রাশেদ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। কিছুক্ষণ পর নার্স এসে বলল,
__“পেসেন্টের সাথে দেখা করতে পারেন।”
সেই কথাটা যেন মুক্তির দরজা খুলে দিল। রাশেদ বাচ্চাকে ফারিয়া বেগমের হাতে দিয়ে এগিয়ে গেল। রাশেদ কে মন মরা হয়ে থাকতে দেখে আরমান বলে বেবিকে কোলে নিতে।
রাশেদরের পদক্ষেপ ধীরে—চোখে অশ্রু, মুখে হাসি।
ওটি রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে সাদা আলো। ওষুধের গন্ধ।
মনিটরের বীপ—টানা শব্দ। সেই আলোতে শুয়ে আছে মিম। ক্লান্ত।চোখ আধা বন্ধ। চুল এলোমেলো। কিন্তু ঠোঁটে—হালকা হাসি। সে মা হয়েছে। মিম চোখ খুলতেই দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে রাশেদকে। তার চোখে জল ভিজে উঠল।
__“রাজ বাবু…”
একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দে ছিল—ভয়, ব্যথা, সাহস, ভালোবাসা, জয়। রাশেদ এগিয়ে গেল,বিছানার পাশে বসে তার হাতের তালু ধরে রাখল নিজের হাতে।
মিমের হাত ঠান্ডা। মনিটরের বীপের শব্দ শুনে ওর বুক কেঁপে উঠল।
__“তুমি ঠিক আছো?”
কণ্ঠ কাঁপছে, তবুও তিনি জোর করল।মিম হালকা হেসে বলল,
__“আমি ঠিক আছি.. বেবিকে কোলে নিয়ে ছিলেন…”
রাশেদের চোখ লাল। ঠোঁট কাপছে। যেনো কান্না আটকানোর চেষ্টা। মাথা নাড়িয়ে মিমের কথার জবাব দেয়। মিমের চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে বলল,
__“আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল… যদি…”
কথা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।রাশেদ তার হাত চুমু খেল।
__“না… তোমার কিছু হবে না। তুমি আমার শক্ত মিম।”
মিম গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
__“ আমি শুধু চাইছিলাম তুমি বাচ্চাটাকে প্রথমে দেখো। ওকে কোলে নাও। কারণ তুমি… তুমি আমার সবথেকে বড় শক্তি।”
রাশেদের চোখ ডুবে গেল অশ্রুতে। সে মিমের কপালে চুমু খেল।
__“তুমি জানো না… যদি তোমার কিছু হতো… আমি জীবিত থাকতাম না। আমি শ্বাসই নিতে পারতাম না।”
মিম কাঁপা গলায় বলল,
__“আমি জানি। তাই তো যুদ্ধ করলাম। আমাদের সন্তান… আমাদের ভালোবাসার ফল…”
এমন গভীর মুহূর্তে নার্স বাচ্চাকে নিয়ে এলো।
সে বলল,
__“বাচ্চার খিদে পেয়েছে ।”
বাচ্চার ক্ষুদ্র কান্না মিমের ঠোঁটে আসল হাসি আনল।
ও চোখ ভিজে উঠল আনন্দে।মিম মৃদু কন্ঠ বলে,
__“ওকে আমাকে দাও…”
নার্স বাচ্চাকে মিমের কোলের ওপর রাখল। মিমের হাত কাঁপল প্রথম স্পর্শে,মায়ের স্পর্শ।তার বুকটা ভরে গেল—ব্যথা, ক্লান্তি, ভয়—সব মিলিয়ে বদলে গেল আনন্দে।রাশেদ তাকিয়ে থাকে। তার চোখে বিস্ময়—
এটা তার সন্তান!তার রক্ত! তার জীবনের ফল! মিম বাচ্চার মাথায় চুমু খেয়ে বলল,
__“তুমি জানো… আমি অনেক ব্যথা পেয়েছি। কিন্তু এই এক ফোটা কান্না… তোমার কান্না আমার সব ব্যথা ভুলিয়ে দিয়েছে বাবা। তুমি তো আমাদের দুজনেই শক্তি ।”
রাশেদ হাত বাড়িয়ে বাচ্চার হাত ধরল।অতটুকু নরম হাত! এ যেন কাগজের মতো। কাপড়ের মতো।জীবনের মতো। সে বলল,
__“ধন্যবাদ, মিম… আমাকে বাবা বানানোর জন্য।”
মিম বলল,
__“ধন্যবাদ তোমাকে আমার জীবন কে তোমার ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ করার জন্য ”
ওদের দুজনের কান্না,ভালোবাসা,এক কোলের নতুন প্রাণ—হাসপাতালের সাদা আলোয় মিশে গিয়েছে।
পরবর্তী দুদিন হাসপাতালের প্রতিটা ঘণ্টা কেটেছে উল্লাসে। কেউ এসেছে দেখে গেছে, কেউ বাচ্চার ছবি তুলেছে,কেউ গিফট নিয়ে এসেছে, কেউ দোয়া করেছে। রাশেদ হাসপাতালের করিডোরে রাত কাটিয়েছে।রাত জেগে থেকেছে। নার্সকে বার বার জিজ্ঞেস করেছে
— “মিম ঠিক আছে তো?বাচ্চা কেঁদে কেন?তাকে দুধ খাওয়াতে পারবে?”
সবার মুখে হাসি— ও যেন নতুন বাবাদের সবচেয়ে সাধারণ ভয়গুলো করছে। মিম ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলত,
__“এত ভয় কেনো পান ?”
আর সে বলত,
__“কারণ তোমরা আমার সব কিছু ।”
হাসপাতাল দুদিন থাকার পর ডাক্তার মিমকে চেক আপ করে বলল,
__“পেসেন্ট সুস্থ। ডিসচার্জ করা যাবে।যদি চায় তো আজকেই নিয়ে যেতে পারে।”
যেহেতু এখন মাএ দুপুর। তাই ফারিয়া বেগম সিদ্ধান্ত নেন মিমকে বাড়ি নিয়ে যাবেন। সেখানে সবাই মিলে মিম আর বেবি দেখাশোনা ভালো করে করতে পারবে। আজকে হাসপাতালে ফিহা, জেরিন, জারা, ছায়মা সবাই এসেছে শুধু জিনিয়া ছাড়া। রোহান জিনিয়াকে একে বারে দৌড়ঝাপ করতে দেয় না। রোহানের কথা বেবি কে বাড়িতে আনলে তারপর দেখবে, কোনো নড়াচড়া চলবে না। জিনিয়ার প্রথমে মন খারাপ হলেও পরে ভাবে রোহানই ঠিক। আরমান জাহেদ রোহান ওরা অফিসে চলে যায়। অফিসে যাওয়ার আগে হাসপাতালে ওদের নামিয়ে দিয়ে যায়। যেহেতু মিমকে বাড়ি নিয়ে যাবে তাই রাশেদ ড্রাইভার কে কল করে বলে গাড়ি নিয়ে আসতে। রাশেদের এখন ছুটি।সে মিম আর বেবিকে সময় দিচ্ছে।
সময় কেমন আশ্চর্য… স্রোতের মতো চলে যায়। আজ থেকে দুই মাস আগের দিনগুলো যেন মাত্র গতকাল। সেই তড়িঘড়ির হাসপাতালে যাওয়া, রাশেদের কান্না, মিমের ব্যথা, তারপর ছোট্ট রিয়াত রাজের কান্না—সেসব এখন মধুর স্মৃতি। রাশেদের ছেলের নাম রিয়াত রাজ রাখা হয়। নামটা যেন মিম-রাশেদের সারা জীবনের স্বপ্নকে ধারণ করে আছে। রাশেদ রাজ্যের রাজা হবে না, কিন্তু তার ছেলে রিয়াত—হবে তার গর্বের রাজ।
রাশেদের ছেলেকে নিয়ে বাড়ির সবাই হইচই করে। কে কোলে নিবে। এই নিয়ে মাঝে মাঝে ঝগড়া হয়ে যায়। রাশেদের ছেলেকে সবাই এতো এতো গিফট করে। ছেলেরা বেবিকে কোলে নিতে পারে না ঠিক মতো। তাই তারা কোলে নিতে যায় না। যদি কোনো ভাবে বেবি ব্যথা পায়। কিন্তু বেবির জন্য বাড়ি ভর্তি এখনোই এতো এতো খেলনা এনে বরে রাখে। বাড়ির সবার মাঝে মিম নিজেই ছেলেকে ভালো করে নিজের কাছে রাখতে পারে না। শুধু একটু খাওয়ানের সময় কাছে পায়। অবশ্য মিমের ভালোই লাগে। জারা আর ফিহা তো রাতেও বেবির কাছে থাকতে চায়। তারা দু’জন বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করে। মিম বসে তাদের ঝগড়া দেখে। সে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করে জারা আর ফিহার মতো দুজন বান্ধবী পেয়েছে।
জিনিয়ার ডেলিভারি সামনে। ডাক্তার আগেই বলেছেন মেয়ে হবে। সবাই তাই অপেক্ষায় আছে। কিন্তু অপেক্ষার সাথে সাথে আছে ভয়ও। জিনিয়া এখন আর ঠিকভাবে হাঁটতে পারে না। বিছানা থেকে উঠলেই হাঁপিয়ে যায়। একটু হাঁটলেই তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ফারিয়া বেগম আর জেসমিন বেগম দিনরাত তার দেখাশোনা করেন। রুম বদলায় না।একা থাকতে দেয় না। জারা ফিহা, জেরিন, মিম প্রায় প্রতিদিনই ছেলেকে কোলে নিয়ে তার রুমে বসে থাকে।আড্ডা দেয়। হাসায়। উৎসাহ দেয়। ছায়মা বাড়ি চলে গেছে। সে কিছু দিন পর পরই আসে।
রোহান আজ বাড়িতে। এই সময় টায় রোহান জিনিয়াকে একা থাকতে দিবে না। যদিও বাড়ির সবাই আছে তারপরও ওর মান মানতে চায় না।। রাশেদ আরমান আর জাহেদ অফিসে। কাজের চাপ তাদের উপর দিয়ে বইছে। দুপুরের সময়।বাড়িটা শান্ত। ফিহা আর জারা কলেজে। জেরিন স্কুলে।
ঘরে হালকা রোদ। জিনিয়া উঠে বসে। মুখে ক্লান্তি—চোখে ভয়। মাকে ডাক দিয়ে আনে।জেসমিন বেগম মেয়ের ডাক শুনে দৌড়ে আসেন
—“আম্মু… আমি গোসল করবো।”
জেসমিন বেগম বলে,
—“ ঠিক আছ। আয় আমি করিয়ে দেই। ”
__“আমি একা করতে পারবো তুমি একটু চুলে সেম্পু করে দাও। ”
রোহান তৎক্ষণাৎ দরজার সামনে দাঁড়ায়।
বলে,
—“আম্মু আপনি যান আমি আছি।” তার চোখে ভয়। ডাক্তারের কথা তার মনে গেঁথে আছে— বেশি নড়াচড়া করা যাবে না।
জেসমিন বেগম চলে যান। রোহান জিনিয়া কে চুলে সেম্পু করে দেয়। জিনিয়া গোসল শেষ করে। হঠাৎ মনে পড়ে—“হায়! তাওয়াল আনিনি।”
জিনিয়া বলে,
—“রোহান… তাওয়ালটা এনে দিবেন ।”
রোহান দৌড়ে যায়।যাওয়ার আগে বলে
__“টুলে বসে থাকো আচ্ছি আমি! ”
এই এক মুহূর্ত।শুধু কয়েক সেকেন্ড। এবং সেই এক সেকেন্ডেই—সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। জিনিয়ার পা পিছলে যায়। টালি ভিজে ছিলো। ধপ করে পড়ে যায় সে। প্রথমে পরে যাওয়ারআওয়াজ হয়,এরপর চিৎকার—
—“আআআহ! রোহান…!”
তার চিৎকারে শিউরে ওঠে পুরো ঘর। রোহানের বুকের ভেতর আগুন ধরে যায়।তাওয়াল ফেলে সে দৌড়ে আসে—
—“চাঁদ সুন্দরী কি হইছে তোমার? ”
ওয়াশরুমে ঢুকতেই দেখে—জিনিয়া মেঝেতে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে গেছে ফ্লোর। রোহানের মুখ সাদা।জিনিয়ার মাথা নিজের কোলে নিয়ে সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
—“আমার চাঁদ… সুন্দরী! চোখ খোলো প্লিজ!”
জিনিয়া কান্নায় কাঁপছে— শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
—“রোহান… আমার মেয়ে… বাঁচান। ওকে বাঁচান…”
তার কণ্ঠ এত দুর্বল—যেন শেষ হওয়ার আগে কিছু বলতে চাইছে।রোহান আর সহ্য করতে পারে না। সে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে।
—“আম্মু ! তাড়াতাড়ি আসেন!!আমার চাঁদ সুন্দরী..!”
তার চিৎকারে ঘর কেঁপে ওঠে। ফারিয়া বেগম দৌড়ে আসে। তার চোখে ভয় জমে।
—“আল্লাহ… জেসমিন! তাড়াতাড়ি আয়!”
জেসমিন বেগম ছুটে আসে।দৃশ্যটা দেখে তার গলা আটকে যায়।
—“আল্লাহ আমার মেয়ে? রক্ত কেনো..? কি হয়েছে??”
ফারিয়া বেগম..
__“এতো কতা না বলে ওকে ধর। কাপড় চেঞ্জ করা। সময় নেই।”
দু’জনে মিলে দ্রুত কাপড় বদলায়। মিম ছুটে আসে।
কিন্তু বাচ্চা তার কোলে। সে ভয়ে কাঁপছে।
—“আপু… জিনিয়া আপু…”
ভয়ে মিমের কান্না দেখে—রিয়াত ও কেঁদে ওঠে।
ফারিয়া বেগম বলে,
—“তুই সাবধানে থাকিস। বাইরে যাবি না। ওর ঠান্ডা লেগে যাবে।”
রোহান গাড়ি বের করে। আঙিনা পর্যন্ত দৌড়ে আসে।কোলে করে জিনিয়াকে নিয়ে যায়। জিনিয়ার ব্যথা বাড়ছে। সে চিৎকার করছে—
—“আমার মেয়েকে …বাঁচান। ”
জিনিয়াকে গাড়িতে বসিয়ে রোহান দ্রুত ইঞ্জিন চালু করে। কাঁপা হাতে ফোন বের করে। প্রথম ডায়াল—
আরমান। ফোন ধরতেই রোহানের কণ্ঠ ভেঙে যায়।জিনিয়া অবস্থা সব জানায়।
আরমান অফিসে। কিন্তু এক সেকেন্ড দেরি করে না।
—“আমি আসছি। হসপিটালে নিয়ে যা।”
খবর শুনে সবার মুখে আতঙ্ক। সবাই দ্রুত রওনা হয়।আসিফ খানও ভয় পেয়ে যায় মেয়ের খবর পেয়ে। দুই ভাই আরমানদের সাথে হাসপাতালে চলে আসে।
হাসপাতালের সামনে হর্ণ বাজাতে বাজাতে আসে রোহান। ওরা ছুটে আসে। রোহান গাড়ি থেকে নেমে জিনিয়াকে কোলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে ভিতরে যায়।
—“ডাক্তার!! ডাক্তার!! আমার স্ত্রীকে বাঁচান!”
নার্স ও স্টাফরা দৌড়ে আসে। জিনিয়াকে স্ট্রেচারে নিয়ে যাওয়া হয়। রোহান দৌড়ে ওটির সামনে যায়।
—“আমার চাঁদ… আমার মেয়ে…”
সে মাটিতে বসে পড়ে। চুল দু’হাতে ধরে টান মারে।
__“এসব আমার জন্য হয়েছে? আমি ওর খেয়াল রাখতে পারি নাই! ” বলেই আবার কান্না করতে থাকে।
জেসমিন বেগম ওর কান্না করছেন। আরেক দিকে রোহান। ফারিয়া বেগম কাকে সামলাবেন। তারও তো কষ্ট হচ্ছে মেয়ের জন্য। কিছু সময় পর আরমানরা আসে। জাহেদ দৌড়ে এসে মাকে বলে
__“আম্মু জিনিয়া..জিনিয়া কেমন আছে.?” তার কন্ঠ কাঁপছে।
জেসমিন বেগম ছেলে জড়িয়ে ধরে কান্না করে।
__“আমার মেয়ে। ”
আসিফ খান আর আরিফ আসে একটু পর।
__“আমার মেয়ে..! রোহান আমার মেয়ে কোথায়..? ” বলেই তিনি দুর্বল পায়ে এগিয়ে এসেন। আরিফ ভাইকে সামলে নেয়।
আরমান এসে তাকে রোহানকে ধরে বলে
—“রোহান! নিজেকে সামলা..কিছু হবে না ওর !”
রোহান আরমানের গলায় মুখ লুকিয়ে বলে—
—“ভাই… আমি তাকে হারাতে পারবো না। আমার চাদঁ সুন্দরী… আমার সব…ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেয় ভাই। ”
আরমান তাকে কি বলে শান্তনা দিবে। বোনের জন্য তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। রাশেদ আসে।রোহানের হাত ধরে।
—“ভাই… ভেঙে পরবেন না। সব ঠিক হবে।”
কিন্তু রোহানের চোখে শুধু আতঙ্ক।ভয়। মৃত্যুভয় প্রথম বার তাকে এমন করে কাঁপিয়েছে। সময় যাচ্ছে।মিনিট—মনে হচ্ছে ঘণ্টা। দু’ঘণ্টা পর— ওটির ভেতর থেকে বাচ্চার কান্না। সবাই দাঁড়িয়ে যায়। আশ্চর্যের মতো শান্তি নামে। রোহান কান্নায় ঢলে পড়ে।
একজন নার্স বাইরে আসে।মুখে স্বস্তি— কিন্তু কণ্ঠে সতর্কতা।
—“মা-বাবা দু’জনই সুস্থ। তবে মা খুব দুর্বল। রক্ত ক্ষরণ হয়েছে অনেক। এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছে, তাই চিন্তা করবেন না ।”
এটা শুনে সবার মন থেকে পাথড় নামে। রোহানের শ্বাস আটকে বলে,
—“আমি দেখবো? আমি আমার চাঁদ সুন্দরী কে দেখবো”
নার্স কঠিন গলায় বলে—
—“এখন না। বেডে শিফট হবে ছয় ঘণ্টা পর।”
তারপর আরেকজন নার্স বেবিকে নিয়ে আসে।রোহান তাকায়—চোখ ভরে যায়।কাঁদতে কাঁদতে বলে—
—“চাঁদ… আমার চাঁদ…আম্মা? ”
এই টুকু বলে থেমে যায়। বাচ্চা কে নিতে চায় না। সে দৌড়ে গিয়ে আবার ওটি রুমের দিকে যায়।সে কোলে নিতে চায় না। আরমান ধমক দেয়—
__“ ওকে নিচ্ছিস না কেনো?”
রোহান কিছু বলে না। সবাই বেবি কে দেখে। কিন্তু মনে শান্তি পায় না। মেয়ের চিন্তায় সবার মাথা নষ্ট। বেবি কে জেসমিন বেগম নিয়ে বসে আছেন। আরমান বলে
__“ছোট আম্মু ওর কাছে দাও..!রোহান ওকে সাবধানে কোলে নেয়।”
রোহান মাথা নোয়ায়।জেসমিন বেগম মেয়েকে রোহানের কোলে তুলে দেয়।
—“আমি… আমি সাবধানে নেবো।”
আরমান তার হাত ঠিক করে দেয়।বাচ্চা রোহানের কোলে এসেই কান্নায় ভেঙে পড়ে।রোহান মেয়ের মাথায় চুমু দিয়ে বলে,
—“আমি তোমার বাবা আম্মা। কিন্তু বাবা যে ভালো নেই। তোমার আম্মু আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে আম্মা। তোমার আম্মু কে বলো না তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আমার কাছে চলে আসতে। তোমার আম্মু আমার সবকিছু… ওকে ছাড়া আমি শ্বাস নিতে পারি না। তুমি এসেছো আমার ঘর আলো করে, কিন্তু তোমার আম্মু ছাড়া এ আলোয় আমি বাঁচতে পারব না । ”
হাসপাতালের হলঘর নীরব হয়ে যায়। সন্ধ্যায় জারা, ফিহা, জেরিন এসে হাজির। মিমও আসে। সবাই বাচ্চাকে দেখে। সবার চোখে জল। কিন্তু রোহান শুধু একটাই কথা বলে—
—“আমি আমার স্ত্রীকে চাই। ”সে ওটি রুমের কাছ থেকে এক বিন্দু ও সরে না।
পরের সকাল।ছয় ঘণ্টা পর জিনিয়াকে বেডে শিফট করা হয়।এখন সবাই দেখা করতে পারবে। রোহান ঢোকার সময় তার চোখে অশ্রু জমে যায়।জিনিয়া দুর্বল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে
__“রোহান..! ঠিক আছেন আপনি?”
রোহান এসে চুপচাপ বসে জিনিয়ার মাথার কাছে। মাথা নত।
__“ ঠিক নেই। আজ যদি তোমার কিছুও হয়ে যেত… আমি মরে যেতাম। কেনো এতো কষ্ট দাও আমায়?”
জিনিয়া ক্লান্ত কণ্ঠে হাসতে চেষ্টা করে, কিন্তু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
__ “আমি ভয় পেয়েছিলাম রোহান। আমার মেয়েটাকে… আমি অনুভব করছিলাম সে কাঁদছে আমার ভেতর থেকে। আমাকে বলছে আম্মু আমাকে বাঁচাও।আমি ভাবছিলাম ওকে আর বাহিরের আকাশ দেখাতে পারবো তো?”
রোহান হাত দিয়ে জিনিয়ার চোখের পানি মোছে।
__ “তুমি আমাকে আর ভয় দেখাবে না। আমি এক পলক তাওয়াল আনতে গিয়েছিলাম… যদি জানতাম আমি যেতাম না। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না।”
__”না, রোহান… তোমার দোষ না। নিয়তি ছিল। তুমি তো পাশে ছিলে। আমার চিৎকার শুনে যে ভাবে দৌড়ে এলে… আমি জানি, আমাকে তুমি আগলে রাখতে চাও, জীবন দিয়ে।”
রোহান কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলে,
__”আমি তোমাকে হারানোর ভয় পাই। যখন তোমাকে মেঝেতে রক্তে ভেজা অবস্থায় দেখি… আমি বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার পৃথিবী ভেঙে যাচ্ছে।”
জিনিয়া দুর্বল হাত তুলে রোহানের গাল স্পর্শ করে।
___”তুমি পাগল। আমি তোমার জন্যই লড়েছি। আমার মেয়ের জন্য… আর তোমার ভালোবাসার জন্য।”
রোহান মাথা নিচু করে হালকা কাঁদতে থাকে।
__ “আমি প্রতিজ্ঞা করছি… তোমাকে আর কখনো একা থাকতে দেব না। হাঁটতে হলে আমি কোলে নিয়ে হাঁটাবো। দাঁড়াতে হলে আমি কাঁধ দেবো।সব কিছু আমি করে দিব, তবুও চোখের সামনে রাখব।”
__ “ওই ছোট্ট রাজকন্যাকে দেখেছো? তোমার মতো হয়েছে তাই না??” জিনিয়ার বেডের পাশে ছোট বেবি টলিতে ঘুমিয়ে আছে তাদের রাজকন্যা।
__ “হ্যাঁ… কিন্তু ওর হাসিটা তোমার মতো। আর ওর প্রথম কান্নাটা… যেন আমাকে বলছে—‘বাবা, মা’কে শক্ত করে ধরে রেখো।মা কষ্ট পাচ্ছে ।’”
জিনিয়া হাসে, কষ্ট মেশানো হাসি।
__ “রোহান, তুমি জানো… আমি মরে গেলেও তোমার বুকে মাথা রেখে মরতে চাইতাম।”
রোহান হালকা ধমক দিয়ে বলে—
__ “ওসব কথা বলবে না। তুমি আমার জীবন। আমার শ্বাস। আমি চাই তুমি সুস্থ হও। আমাদের মেয়েকে বড় করো। ওকে বলো তার বাবা কত পাগল মা’কে নিয়ে।”
__ “চল, প্রতিজ্ঞা করি… কোনো ভয়কে আর জায়গা দেব না।”
__ “প্রতিজ্ঞা। তুমি, আমি, আর আমাদের সিতারা নূর। আমরা তিনজন মিলেই একটা পৃথিবী বানাবো।”
জিনিয়া চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে
__”ভালোবাসি তোমায়…”
রোহান তার কপালে চুমু খেয়ে বলে
— “শব্দের বাইরে ভালোবাসি। জীবন, শ্বাস, আত্মা দিয়ে।”
এ দুজনের হাত জড়িয়ে থাকে। ক্লান্তি, কান্না, ভয়—সব মিলিয়ে জন্ম নেয় গভীর শান্তি।তারা দুজন দুজনকে দেখে নিশ্চিত হয়—এ ভালোবাসা ভাঙবে না কখনো।সবাই এসে জিনিয়ার সাথে দেখা করে।
পাঁচ দিন পর জিনিয়াকে বাড়ি নেওয়া হয়। ঘর সাজানো হয়। ফুল, বেলুন, আলো। জিনিয়ার কোলেও এসেছে একটা মেয়ে— সিতারা নূর। তার নাম যেন জিনিয়ার চোখের আলো আর রোহানের ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। রোহান তার কথা রেখেছে। যেদিন রাশেদের ছেলেটা জন্ম নিলো, তার মুখে প্রথম কথা
—”ওর মেয়ে হলে রাশেদের ছেলের সাথে বিয়ে দেবো।”
রোহান সেই কথা মনে রেখেছে। শুধু মনে নয়—সবার সামনেই বলেছে। এবং আশ্চর্যের বিষয়? পুরো পরিবার সেই কথাকে সম্মতি দিয়েছে। হাসি-মজা করে রিয়াত আর সিতারার বিয়ে পাকাপাকি করে রাখা হলো— ভবিষ্যতের দায়িত্ব আর রসিকতা মিলিয়ে।রোহান রিয়াতের নামে একটা বাড়ির লিখে দেয়। মেয়ের জামাই কে আগেই যৌতুক দিয়ে রাখছে।রাশেদ নূর কে সর্ণের জুয়েলারি দেয়। একেবারে মাথা থেকে পা পর্যন্ত। তারা যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হবে তখন তাদের ঝাগঝমক ভাবে বিয়ে হবে।
বাড়িতে এখন আনন্দ, আলো, হাসি—তখনই হঠাৎ জীবনে পাল্টে দেওয়া এক নতুন অধ্যায় আসে। মিম আর জিনিয়া সন্তান কে দেখার জন্য জারা’র মা বাবা আর জোহান এসেছে।আসেনি শুধু জাহির। মিমের মা বাবাও আসে। ফিহার বাবা মাকেও ইনভাইট করা হয় কিন্তু ওর ছোট বোন অসুস্থ বলে আসেনি। ওরা এসেছে আজ তিন দিন। আজ বাদে কাল চলে যাবে। জোহান তো রিয়াত আর নূরের কাছ থেকে সরছেই না। কিন্তু সে রোহানের উপর খুব রেগে আছে। তার কিউটি গার্লকে কতো কষ্ট পেতে হলো হিংসুটে ভাইয়ার জন্য।
আরমান জোহানকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে। এখন বিকেল। রাশেদ রোহান ওরা বাড়িতে। জাহেদ অফিসে। আজ একটা মিটিং আছে এটা ও বাবার সাথে সামলে নিবে। তাই ওরা যায় নি। জোহান আইসক্রিম খাচ্ছে। অনেক দিন পর ওর মমিসিং দুলাভাই কে পেয়ে খুব আনন্দ করছে। আরমান ওর আবদার অপূর্ণ রাখে না।
জোহান আইসক্রিম শেষ করে বড় গম্ভীর ভঙ্গিতে হাত পেছনে নিয়ে হাঁটছে। মনে হচ্ছে যেন কূটনৈতিক মিশনে এসেছে। আরমান হাঁটছে ঠিক পিছনে। হঠাৎ জোহান গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
__“দুলাভাই…”
আরমান ভ্রু তুলে তাকাল
—“হুঁ?”
জোহান আবার বলল,
___“তুমি কি জানো, আমি অনেক বড় হয়েছি। এখন আমি পৃথিবীর সব সমস্যা বুঝি।”
আরমান মুচকি হেসে বলে,
__“তা বুঝলাম। তুই এখন আন্তর্জাতিক নেতা?”
জোহান গর্ব করে বলে,
__“হ্যাঁ, আমি ক্লাসে ডিবেট করি। স্যার বলেন, আমার কথা শুনলে মন্ত্রীদের হার মানায়।”
আরমান নাটকীয় বিস্ময় দেখায়,
__“ও মা! তাই নাকি? এখন বুঝি দেশ চালানোর দায়িত্বও নেবি?”
জোহান মাথা দোলায়,
__“হ্যাঁ। তবে আগে একটা কথা ঠিক করতে হবে।”
__“কি কথা?”
জোহান গুরুত্ব দিয়ে বলে,
__“বুনোর সাথে বেশি উঁচু স্বরে বকা দিবে না। বউকে ভয় দেখালে সংসার টিকে না। আমার স্যার বলেছে।”
আরমান থমকে দাঁড়িয়ে জোহানের দিকে তাকাল—
__“ওইটা তোর স্যার না। ওইটা তোর আপুর ডায়লগ।”
জোহান মুখ বাঁকায়,ওর চাল ধরে ফেলেছে,
—“হয়তো… কিন্তু সত্য তো!”
আরমান হাসি আটকাতে পারে না।তারপর জোহান আবার শুরু করে,
__“আরও বলছি দুলাভাই। মেয়েদের সাথে যেমন আচরণ করবো, আম্মু বলে সেটা ফেরত আসে। তাই তুমি আপুকে প্রতিদিন তিনটা জিনিস বলবে…”
_“কি?”
জোহান আঙুল গুনে বলে
—“এক—তুমি সুন্দর।
দুই—তুমি রাগ করলে কিউট লাগে।
তিন—যা খুশি শপিং করো।”
আরমান চোখ বড় বড় করে বলে
—“তোর আপুই কি তোরে ব্রেনওয়াশ করছে?”
জোহান গর্ব করে বলে
—“আমার ট্যালেন্ট!”
আরমান আবার হাঁটা শুরু করে।জোহান এবার সাইলেন্ট হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর গম্ভীর স্বরে বলে
—“আর একটা কথা…”
__“আবার?”
_“একদিন আমি বিয়ে করলে, আমার বউকে আমি তোমার মতো ট্রিট করবো না। আমি জেন্টলম্যান। রাগ দেখাই না।”
আরমান থামল, জোহানের মাথায় আলতো চাপড় দিয়ে বলল
—“চিন্তা করো না পটল। আগে একটা বউ পাও… তারপর বড়দের পরামর্শ দিও।”
জোহান নাক সিঁটকায়—
__“আমি বউ পাবো… আমার ফ্যান আছে স্কুলে।”
আরমান হেসে বলে—
__“হ্যাঁ, হ্যাঁ। মহল্লার ছোটখাটো হিরো।”
জোহান গলা চড়ায়
—“ছোটখাটো না! আমি জোহান। আমার এন্ট্রি হলে সবাই চুপ!”
আরমান জোহানকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে ঢোকে। গেট পেরোনোর সাথেই ড্রইং রুম থেকে কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসে। ভেতরে বড়রা সবাই বসে আছে—ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম, আসিফ খান, আরিফ খান।জারা আর মিমের বাবা- মা পরিবেশটা বেশ গম্ভীর, বোঝাই যাচ্ছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
আরমান জোহানের হাত ধরে ড্রইং রুমেই ঢুকে পড়ে। জোহান চারপাশে তাকিয়ে একটু বিরক্ত মুখ করে, বড়দের কথা তার একদমই ভালো লাগছে না। ঠিক তখনই সে উপরের দিকে তাকিয়ে নূর আর রিয়াতের কথা মনে করে। সুযোগ বুঝে সে আরমানের হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে যায়।
আরমান পেছন থেকে শুধু বলে,
__“ধীরে যা, পড়ে যাস না।”
জোহান অবশ্য শোনে না। একদম রাজপুত্রের মতো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যায়। আরমান নিচেই বসে পড়ে। মারজিয়া বেগম একটু বিরক্ত গলায় বলেন,
__“এই ছেলে তো এক জায়গায় বসতেই পারে না।”
আরমান হালকা হেসে বলে,
__“ওর বয়সটাই এমন, আম্মু। বড়দের আলোচনা ওর কাছে শাস্তি মনে হয়।”
ড্রইং রুমে তখন জাহিরের বিয়ের কথা নিয়ে
আলোচনা চলছে।সেখানে ছায়মার বাবা মাও আছে। মারজিয়া বেগম বলছেন, ছেলে এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, সব গুছিয়ে নিয়েছে, বিয়ের সময় হয়ে গেছে। আসিফ খান মাথা নেড়ে বলেন,“ আগে দায়িত্বশীল হওয়াটাই আসল, সেটা জাহির হয়েছে।
আরমান চুপচাপ বসে সব শোনে। মাঝে মাঝে ছায়মার দিকে তাকায়।ছায়মা ওর মায়ের সাথে বসে আছে। রোহান রাশেদ আরমানের দিকে তাকায়।
জাহির—এখন আর আগের সেই বেখেয়ালি ছেলে নেই। মাছের খামার, নিজস্ব ব্যবসা—সব মিলিয়ে সে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। মারজিয়া বেগম ছেলের বিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।
ছায়মা চুপচাপ বসে সব শোনে। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত জ্বালা করে। সে প্রতিজ্ঞা করেছিলো দুর্বল হবে না। ভালোবাসা শব্দটা সে ভুলে গেছে মনে মনে। কিন্তু অনুভূতি কি কখনো সত্যিই মরে? তবুও জীবন গুছিয়ে নেওয়া ভালো। সে কে যে ওর জন্য জাহিরের জীবন থেমে থাকবে?
আরমান শান্ত স্বরে বলে,
__“ ছায়মা দেখ তো মানজারা কী করে..? ”
ছায়মা মাথা নিচু করে উঠে যায়। পা ফেলে সিড়ির দিকে। আরমান ইচ্ছে কারেই ছায়মাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। কোনো এক বিষেশ কারণে। ড্রইং রুমে কথা হয় আলোচনা হয়।সবাই সবার মত প্রকাশ করে। রাত পেরিয়ে যায়। সকাল হতেই মিম আর জারার বাবা মা ইসলাম পুড় গ্রামের জন্য রওনা হয়। জোহান তো যেতেই চায় না রিয়াত আর নূর জন্য। বাড়িতে সে একা। আগে বুনো ছিলো। এখন কেউ নেই। ভাইয়া ও নিতে চায় না ও ছুটো বলে। তবুও জোহান পুকুর পারে গিয়ে মাছ দেখে। সেখানে ছোট ঘর আছে।
সময় প্রবাহ মান। চোখের পলকে আরও চার মাস কেটে যায়।এখন রিয়াত বসতে পারে। একটু একটু হামাগুড়ি দেয়। নূর আর রিয়াত খান বাড়ি মাতিয়ে রাখে। বাড়িতে হইচই বেরে গেছে। নূর আর একটু বড় হলে ওরা চলে যাবে। রোহান বলেছে এখানে অনেক দিন ধরে আছে। নূর একটু শক্ত হলে তারপর ওদের বাড়ি নিয়ে যাবে। রাশেদ আর রোহান এখন বেয়াই।রোহান রিয়াত কে মেয়ের জামাই ছাড়া বলে ডাকে। রিয়াত অনেক গুলো মুলো। নূরও কম না। জিনিয়ার মতো সুন্দর হইছে। রোহান তাকে চাঁদ বলে ডাকে। আর বাড়ির সবাই নূর।
ভোর পাঁচটা। শীতের সকাল। কুয়াশা ঝুলে আছে গাছের পাতায়, নরম তুলোর মতো। ফজরের নামাজ শেষে জারা উঠে দাঁড়াল বারান্দায়। চাদরের মতো কুয়াশা ঢাকা রাস্তা দেখে তার মন কেমন অদ্ভুত আলোড়িত হয়। এমন শান্ত সকাল তাকে সবসময়ই টানে।
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৩
সে হাসিমুখে ভেতরে গিয়ে আরমানকে ডাকে।
আরমান তখনো গভীর ঘুমে। চুল এলোমেলো, মুখে শান্তি। জারা তো এই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেই সময় থমকে যায়। সে সামান্য ঝুঁকে নরম সুরে বলে,
__“উঠুন স্বামীজান । আজ বাইরে কুয়াশা করেছে অনেক । হাঁটতে যাবো।”
আরমান বিরক্ত চোখ মেলে তাকায়।তার ভ্রু কুঁচকে আছে, যেন ভাবছে—এত ভোরে বের হবার কি দরকার! কিন্তু জারার মুখে যে স্নিগ্ধতা, চোখে শিশুর মতো উত্তেজনা—সেসব দেখে বিরক্তি গলে পানি হয়ে যায়।
__“যাবো না,”
