রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৪ (২)
সোহানা ইসলাম
জারা খুব খুশি মনেই খাবারের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে অফিসের ভেতরে ঢোকে। গেটের সামনে দাঁড়াতেই দারোয়ান তাকে চিনে ফেলে। আগেও দু’বার এসেছে সে, কিন্তু আজ আসাটা অন্যরকম। আজ সে শুধু একজন অফিস ভিজিটর না—আজ সে এসেছে ভালোবাসা আর অভিমান দুই হাতে নিয়ে।দারোয়ান তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়,
__“আসসালামু আলাইকুম, ম্যাডাম।”
জারা একটুও অহংকার না রেখে হালকা হাসি দিয়ে মাথা নুইয়ে উত্তর দেয়,
__“ওয়ালাইকুম সালাম আঙ্কেল ।”
এই ছোট্ট মুহূর্তটাই তার মনে কেমন একটা অস্বস্তি তৈরি করে। ‘ম্যাডাম’ শব্দটা তার কাছে ভারী লাগে। সে তো শুধু আরমানের জারা—এত সম্মান তার জন্য নয়, সে জানে।
অফিসের ভেতরে পা রাখতেই আরেক দৃশ্য।রিসেপশন থেকে শুরু করে করিডোর—যেখান দিয়েই যায়, সবাই উঠে দাঁড়ায়।
__“গুড মর্নিং, ম্যাডাম।”
__“আসসালামু আলাইকুম, ম্যাডাম।”
একসাথে এতগুলো সম্মান পেয়ে জারার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত রকম কুঁকড়ে ওঠে। সে মাথা নুইয়ে উত্তর দিতে দিতে ভাবে— এই সম্মান যদি আরমান একটু আগেই দিতো, তাহলে হয়তো আজকের সকালটা এত ভারী লাগতো না।
ঠিক তখনই সামনে দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে রাশেদ আসে। খুব সিরিয়াস মুখ, কপালে ভাঁজ। কিন্তু জারাকে দেখেই থমকে যায়। চোখ দুটো বড় হয়ে যায় বিস্ময়ে।
__“আরে… ম্যাডাম! আপনি কখন এলেন?”
রাশেদ তাড়াতাড়ি ফোন কেটে এগিয়ে আসে। তার গলায় অবাক হওয়া আর সম্মান একসাথে মিশে আছে। জারা পেছন ফিরে তাকায়। পরিচিত মুখটা দেখে একটু স্বস্তি পায়।
__“আরে ভাইয়া, এত ফর্মালিটি কেন? আপনি তো সবসময় ভাবি বলেন।”
রাশেদ হেসে ফেলে,
__“ঠিক আছে ভাবি। অফিসে অভ্যাস হয়ে গেছে।”
জারা হালকা হাসে, তারপর আসল প্রশ্নটা করে,
__“উনি কোথায়?”
এই প্রশ্নটা করার সময় তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। ভয় না—বরং এক ধরনের শঙ্কা। আজ যদি মুখোমুখি হয়, সে কী বলবে? আবার যদি দেখা না হয়?রাশেদ একটু ইতস্তত করে বলে,
__“স্যার এখন একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিংয়ে আছেন। খুব বড় ক্লায়েন্ট। আপনি চাইলে স্যারের কেবিনে বসুন, আমি এখনই ডেকে আনছি।”
রাশেদ ঘুরতে যাবে, ঠিক তখনই জারা তাড়াতাড়ি তাকে থামায়।
__“না না, ডেকে আনতে হবে না।”
রাশেদ অবাক হয়ে তাকায়।জারা শান্ত গলায় বলে,
__“এখন চলে এলে যদি কাজের ক্ষতি হয়, সেটা ঠিক হবে না। আপনি সময় বুঝে শুধু বলে দিয়েন আমি এসেছি—এইটুকুই যথেষ্ট।”
এই কথাগুলো বলতে গিয়ে জারার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, নেই জোর। আছে শুধু একজন স্ত্রীর পরিণত বোঝাপড়া। রাশেদ সম্মান নিয়ে মাথা নেড়ে বলে,
__“ঠিক আছে ভাবি।”
সে নিজ হাতে জারাকে আরমানের কেবিনের দিকে নিয়ে যায়। কেবিনের দরজা খুলে দেয়।
__“আপনি বসুন।”
জারা ঢুকে পড়ে। দরজাটা বন্ধ হতেই কেবিনের
ভেতরের নীরবতা তাকে ঘিরে ধরে।এই কেবিনে সে আগেও এসেছে। সবকিছু পরিচিত—বড় টেবিল, ফাইলের গন্ধ, জানালার পাশে রাখা চেয়ারের পাশে ছোট একটা গাছ। কিন্তু আজ সবকিছু আলাদা লাগে। যেন এই ঘরটাও আজ একটু গম্ভীর। জারা আরমানের চেয়ারের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে গিয়ে সেই চেয়ারে বসে পড়ে।
চেয়ারটা আরামদায়ক, কিন্তু আজ সে আরাম খুঁজছে না। সে খুঁজছে একটা অনুভূতি—যেটা সে গত রাতে পায়নি। চোখ পড়ে টেবিলের ওপর রাখা ফ্রেমের দিকে। তাদের বিয়ের একটা ছবি। সে ছবি দেখে জারার ঠোঁটে হালকা হাসি আসে, আবার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
__“এটা দেখেও আপনার কিছু মনে পরেনি স্বামীজান?…”
নিজের মনেই ফিসফিস করে। খাবারের ব্যাগটা টেবিলের পাশে রেখে সে জানালার দিকে তাকায়। বাইরে ব্যস্ত অফিস, মানুষজন দৌড়াচ্ছে, ফোনে কথা বলছে। আর এই ঘরের ভেতরে সে একা বসে আছে—ভালোবাসা আর অভিমান নিয়ে।
তার মনে পড়ে সকালবেলার কথা। ঘুম থেকে উঠে আরমানকে না পাওয়া, কিছু না বলে চলে যাওয়া। আজ যদি সে সত্যিই ভুলে গিয়ে থাকে?একবার মনে হয় উঠে চলে যাবে। আবার মনে হয়—না, সে এসেছে। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।ঘড়ির কাঁটা ধীরে ধীরে এগোয়। প্রতিটা মিনিট যেন একটু বেশি ভারী।জারা গভীর শ্বাস নেয়।সে রাগ করে আসেনি।সে অভিযোগ নিয়ে আসেনি।সে এসেছে ভালোবাসা নিয়ে।আর এখন সে শুধু অপেক্ষা করছে—এই ভালোবাসার উত্তরটা কি সে আজ পাবে?
নিশ্চুপ করিডোর পেরিয়ে রাশেদ ধীরে ধীরে মিটিং রুমের দরজার সামনে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে আরমানের কণ্ঠ ভেসে আসছে—গম্ভীর, আত্মবিশ্বাসী, সিদ্ধান্তে অটল। বড় মিটিং চলছে, সে বোঝে। তবু এই মুহূর্তটা উপেক্ষা করা যায় না। আজকের দিনটা অন্যরকম। তাই অনুমতি না নিয়েই সে দরজাটা অল্প করে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। মিটিং টেবিলের চারপাশে সবাই বসা। বড় স্ক্রিনে প্রেজেন্টেশন চলছে। আরমান কথা বলছিলেন—ঠিক তখনই চোখে পড়ে রাশেদকে। এক ঝলকে চোখ কুঁচকে যায়, হাত তুলে মিটিং থামান।
__“এক মিনিট,”
গলার স্বরে বিরক্তি নেই, আছে কর্তৃত্ব।সবাই চুপ করে যায়।আরমান চেয়ার থেকে সামান্য এগিয়ে এসে রাশেদের দিকে তাকায়।
__“সব ঠিকঠাক করেছিস তো, রাশেদ?”
রাশেদ এক সেকেন্ড থমকে যায়। সে আসল কথা বলতে এসেছে, অথচ মুখে বেরোয় অফিসিয়াল জবাবই।
__“ওই দিকে সব রেডি, স্যার। কিন্তু—”
__“কিন্তু না,”
আরমান একেবারে কেটে দেন। চোখে কঠোরতা।
__“কোনো কিন্তু শুনতে চাই না। কোনো সমস্যা হলে জাহেদকে নিয়ে যা। আমি কোনো গণ্ডগোল এলাউ করব না।”
রাশেদের বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সে আবার মুখ খুলতে চায়।
__“না না স্যার, সেসব কিছু না। আসলে—”
___“রাশেদ,”
আরমানের কণ্ঠ এবার আরও নিচু, আরও শক্ত।
__“মিটিং চলছে। এখন কিছু শুনতে চাই না। জাহেদের সাথে যা।”
পাশে বসা জাহেদ বিষয়টা বুঝতে পারলো। আরমানের নির্দেশে উঠে দাঁড়ায়। রাশেদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বলে—চল।রাশেদ শেষ চেষ্টা করে। ঠোঁট নড়ে, শব্দ বেরোতে চায়—
__“স্যার, জা—”
__“Enough,”
আরমান আর একবার তাকান।
__“Later.”
এই এক শব্দেই সব শেষ। রাশেদের কথা আর শোনা হয় না।জাহেদ রাশেদের হাতের কনুই চেপে ধরে তাকে নিয়ে বের হয়ে যায়। দরজাটা বন্ধ হতেই মিটিং রুম আবার আগের মতো গম্ভীর হয়ে ওঠে। প্রেজেন্টেশন আবার শুরু হয়। সবাই নোট নিচ্ছে, প্রশ্ন করছে।
কিন্তু আরমানের মন আর আগের জায়গায় নেই।
চোখ স্ক্রিনে থাকলেও মন যেন কেবিনের দিকে সরে গেছে। অজান্তেই কলমটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরতে থাকে। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি বুকের ভেতর খোঁচা দিতে শুরু করে। কেন জানি না, রাশেদের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছে—ওর সেই থেমে যাওয়া কথা, অসম্পূর্ণ বাক্য।
‘কিন্তু’ শব্দটা বারবার কানে বাজে। আরমান নিজের উপর বিরক্ত হয়। আজ কেন সে এতটা খিটখিটে? কেন কোনো কথাই শুনতে চাইছে না? অথচ সে জানে, রাশেদ অকারণে মিটিং ডিস্টার্ব করার মানুষ না।এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়—ও কিছু বলতে চাইছিল। গুরুত্বপূর্ণ কিছু।কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে শক্ত করে নেয়। মিটিং শেষ না করে ওঠা যাবে না। দায়িত্ব আগে।সে আবার কণ্ঠ শক্ত করে আলোচনা চালিয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেয়, ডেডলাইন দেয়, কাগজে সই করে।তবু ভেতরের অস্বস্তিটা যায় না।কেবিনের দিকে, অজানা কোনো অপেক্ষার দিকে, তার মন বারবার টান খায়—যেন কেউ নীরবে বসে আছে, কিছু না বলে, শুধু অপেক্ষা করে।আর আরমান জানেই না—এই মুহূর্তে তার কেবিনে, তার চেয়ারে বসে, ঠিক এমনই একজন অপেক্ষা করছে।
নীরব কেবিনে বসে থাকতে থাকতে জারার শরীরটা যেন শক্ত হয়ে আসছিল। আরামদায়ক সোফাটা এখন আর আরাম দিচ্ছিল না। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে—কাঁটাগুলো কেমন নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। লাঞ্চ টাইম শেষ হয়েছে অনেক আগেই, তার ওপর আরও প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে। অথচ সে এখানে বসে আছে প্রায় দু’ঘণ্টা।
এই দুই ঘণ্টা শুধু অপেক্ষা নয়—এই দুই ঘণ্টা তার ভালোবাসা, যত্ন, পরিশ্রম, সবকিছুর পরীক্ষা নিচ্ছে।
সে উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকায়। মানুষজন ব্যস্ত, কেউ হাসছে, কেউ ফোনে কথা বলছে। সবার জীবনে যেন স্বাভাবিকতা আছে। শুধু তার ভেতরটা অস্থির। আবার ফিরে এসে সোফায় বসে। খাবারের ব্যাগটার দিকে তাকায়। ভেতরে এখনো উষ্ণতার রেশ আছে—হাত পুড়িয়ে রান্না করা খাবার, ভালোবাসা মাখানো, বিশেষ দিনের জন্য বানানো। আজ তাদের ম্যারেজ এনিভার্সারি। এই দিনটায় সে ভেবেছিল, আরমান অন্তত একবার হাসবে, বলবে—“তুমি এসেছো লক্ষী বউ ?”
কিন্তু কিছুই হয়নি। আর অপেক্ষা করতে পারে না সে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর রাগ একসাথে বিস্ফোরণ ঘটাতে চায়। “লস হলে হোক,” মনে মনে বলে জারা। “মিটিং ডিস্টার্ব হলে হোক। আমি আর বসে থাকব না।” খাবারের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে সে কেবিন থেকে বের হয়। সোজা কনফারেন্স রুমের দিকে যায়। দরজা খুলে দেখে—খালি। এক মুহূর্তে কপাল কুঁচকে যায়। কোথায় গেল?
সে দ্রুত বেরিয়ে এসে এক মহিলা স্টাফকে থামায়।
__“আপনার স্যার কোথায়?”
মহিলাটি ভদ্রভাবে উত্তর দেয়,
__“স্যার ক্লায়েন্টদের সাথে ওই রুমে লাঞ্চ করছেন।”
এই এক বাক্যেই যেন জারার মাথার ভেতর বাজ পড়ে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।লাঞ্চ করছে? ক্লায়েন্টদের সাথে? এই সময়? তার হাত পুড়িয়ে বানানো খাবারের কোনো দাম নেই? দুই ঘণ্টার অপেক্ষার কোনো মূল্য নেই? রাগে দাঁত চেপে ধরে সে। পা কাঁপছে, কিন্তু থামে না। গজগজ করতে করতে ওই রুমের দিকে এগোয়। প্রতিটা পা যেন আগুনের ওপর পড়ছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক সেকেন্ডও থামে না—ঠাস করে দরজাটা খুলে দেয়।
দরজা খোলার শব্দে ভেতরের সবাই একসাথে তাকায়। মুহূর্তের মধ্যে সময় থমকে যায়। সবার চোখ বড় বড়। বিশেষ করে আরমানের। জারা যা দেখে, তাতে তার মাথায় রক্ত উঠে যায়। আরমান বসে আছে—দুইজন ছোট ছোট কাপড় পরা মেয়ের মাঝে।টেবিলে খাবার, চারপাশে মানুষ। দৃশ্যটা তার চোখে আগুন ঢেলে দেয়।
হাতের খাবারের ব্যাগটা মেঝেতে পড়ে যায়। শব্দটা যেন তার বুকের ভেতরেও পড়ে। মনে হয় কেউ বুকের মাঝখানে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। আরমান হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।
__“মানজারা! তুমি?”
এই এক ডাকেই জারার ভেতরের বাঁধ ভেঙে যায়। রাগে দুঃখে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে।সে আর কিছু ভাবেনি।
সে আর যুক্তি করেনি। সে শুধু স্বামীকে অন্য মেয়ের মাঝে দেখেছে। চুল ধরে এমন জোরে টান দেয় যে আরমানের মাথা পিছনে হেলে যায়।আরমানের চুল ধরে টানতে টানতে চিৎকার করে ওঠে,
__“হারামি! নির্লজ্জ!গোলামের পোত! কাল থেকে আমাকে অবহেলা করছিস আর আজ হাঁপ পেন্ট পরা মেয়েদের মাঝে বসে খাবার খাচ্ছিস। আমাকে তোর মানুষ মনে হয় না। এতো কষ্ট কেন দিচ্ছিস।বান্দির বাচ্চা !”
রুমে শ্বাস নেওয়ার শব্দও থেমে যায়। জারা’র মুখে গালি শুনে সাথে সাথে রোহান জিভ কাটে। আসিফ খান, আরিফ খান হা করে তাকিয়ে থাকে। ছেলের বউয়ের দিকে। গালি দিচ্ছে এইভাবে? আসিফ খান প্রথমে বুঝতেই পারেন না কী হচ্ছে। তিনি যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাথর হয়ে যান। চোখ দুটো বড় হয়ে যায়, মুখ আধখোলা। নিজের ছেলের দিকে তাকান, তারপর আবার জারার দিকে।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই জারা আরমানকে চুল ধরে টানতে টানতে মাটিতে বসিয়ে দেয়। আরমান হতভম্ব হয়ে বলে,
___“বউ, আগে আমার কথা শোন—”
__“কি শুনবো?”
জারা প্রায় কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে,
__“সকাল থেকে হাত পুড়িয়ে রান্না করেছি। দুই ঘণ্টা ধরে বসে আছি। আমার কোনো দাম নেই? একদমই নেই?”
আরমান অবাক হয়ে বলে,
__“দুই ঘণ্টা?”
__“নাটক করছিস? গোলামের পোত? ” জারার চোখে আগুন।
__“রাশেদ ভাইয়া বলেনি আমি এসেছি?”
এই কথায় আরমান থমকে যায়। তার মাথায় হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে—মিটিং রুমে রাশেদ কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু সে শোনেনি। নিজেই থামিয়ে দিয়েছিল। তার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।
__“বউ… আমি সত্যিই জানতাম না,” কণ্ঠটা নরম হয়ে আসে। “আমি জানলে কখনো—”
জারা তার চুল ছেড়ে দেয়, কিন্তু চোখের আগুন নেভে না।
__“মানলাম আপনি জানতেন না। তাই বলে এই হাঁপ পেন্ট পরা, অর্ধ-উলঙ্গ মেয়েদের মাঝে বসে থাকবেন?”
আরমান যেন কথা হারিয়ে ফেলে।
__“জান… ওরা বিদেশি ক্লায়েন্ট। এিশ কোটি টাকার ডিল হয়েছে বলে সৌজন্যতার জন্য—”
__“ তোর সৌজন্যতা তোর কাছে রাখ।”
জারা আর কিছু বলে না। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে। কোনো নারীই তার স্বামীর পাশে অন্য নারী সহজে সহ্য করতে পারে না—বিশেষ করে এমন দিনে। সে শ্বশুরের দিকে তাকায়।
__“আব্বু, আপনি এসব সাপোর্ট কীভাবে করলেন?”
তারপর রোহানের দিকে,
__“ভাইয়া, আপনি এখানে ছিলেন। তাহলে ওনাকে বললেন না কেন? আমি জানলে কষ্ট পাবো!”
চারজন বিদেশি ক্লায়েন্ট বোঝার চেষ্টা করছে, কিন্তু পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। জারা মহিলা দু’জনের দিকে তাকাতেই আবার তার রাগ বিস্ফোরণ ঘটে। কিন্তু জারা শুনছে না। সে এবার মেয়েদের দিকে ঘুরে যায়। চোখে এমন হিংস্রতা, যেন কেউ তার বাচ্চা কেড়ে নিতে এসেছে।
__“তোরা কারা?”
চেঁচিয়ে ওঠে সে।
__“আমার স্বামীর গা ঘেঁষে বসে আছিস কেন?”
একজন মেয়ে কিছু বলতে গেলে জারা এক ঝটকায় তার চুল মুঠো করে ধরে।
__“চুপ! তোর মুখ খুলতে কে বলেছে?”
ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়—একটা নয়, পরপর দুইটা।
মেয়েটা চিৎকার করে ওঠে। চেয়ার উল্টে যায়। অন্য মেয়েটা উঠে দাঁড়াতে গেলে জারা তাকেও ছাড়ে না।
দু’জনের চুল ধরে একসাথে টানে।
__“তোরা কি জানিস ও কার?”
গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে জারা।
__“ও আমার স্বামী! আমার স্বামীজান!”
ঠোঁট কামড়ে ধরা কান্না, রাগ আর অপমান একসাথে বিস্ফোরণ হয়।একজন মেয়ের ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বের হয়। অন্যজন মেঝেতে পড়ে যায়, হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে। জারা আবার বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। একাই দু’জনের চুল ধরে টানে, চড় বসায়। রুমে হইচই পড়ে যায়। মেয়েগুলো চিৎকার করছে, ইংরেজিতে কিছু বলছে। চুল এলোমেলো, ঠোঁটের কোণে রক্ত।
রোহান হতভম্ব। রুমের সবাই হতভম্ব। জারার এই রূপটা দেখে আরমান এক সেকেন্ডেই বুঝে যায়—
আজ বউ ভয়ংকর রেগে আছে। মানে, “চুপ থাকলে বাঁচবে” টাইপ রাগ। মনে মনে সে ঢোগ গিলে ফেলে ।রোহান আরমানের দিকে তাকায়। দৃষ্টি বলছে,
__“আহারে আরমান, আজ তুই শেষ। একেবারে শেষ।”
আরমানের মাথার ভেতর কথা চলতে থাকে—
__“দোষ তো পুরোপুরি ওর না… একটু আমারও আছে। মানে… একটু না, বেশ খানিকটাই। মিটিং, ক্লায়েন্ট, লাঞ্চ—সব ঠিক আছে। কিন্তু বউকে জানানোটা কি এমন কঠিন ছিল? ফোনটা কি শুধু শেয়ার বাজার দেখার জন্য?”
সে আবার ভাবে,
__“আচ্ছা, জারা রাগ করলে এমন ভয়ংকর কেন লাগে? অন্যদিন এই রাগটাই তো কিউট লাগে। আজ কেন মনে হচ্ছে বাঘিনী সামনে দাঁড়িয়ে আছে?এই রাগে যদি বউ আমায় অফিস থেকেই ডিভোর্স দিয়ে দেয়? কিন্তু একটা জিনিস মানতেই হবে—আমার বউটা ভয়ংকর ভালোবাসে বলেই এমন করছে। আর ভালোবাসার রাগ… ওটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।”
চোখ তুলে জারার দিকে তাকায় আরমান। জারা আবার মেয়েদের দিয়ে তেড়ে যেতে আরমান দৌড়ে এসে জারাকে শক্ত করে ধরে।
__“বউ। আমার সোনা বউ ! থামো! প্লিজ!”
কিন্তু জারার রাগ থামে না। সে আবার তেড়ে যায়।আরমান সামনে এগিয়ে আসতেই— থাপ্পড়। শব্দটা এত জোরে যে সবাই চমকে ওঠে।
__“আমাকে ছুঁবি না!তোর হাঁপ পেন্ট পরা ক্লায়েন্টদের সাথে বসে থাক!”
জারা চিৎকার করে বলে,
__“এই মেয়েদের সামনে আমার দিকে হাত বাড়াবি না!”
বিদেশি ক্লায়েন্টরা ভয় পেয়ে একপাশে সরে গেছে। তারা কিছু বুঝছে না, শুধু পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পাচ্ছে। জারা আবার মেয়েদের দিকে তাকায়।
দাঁত চেপে বলে—
__“আমার সামনে থেকে বের হ। আর কোনোদিন আমার স্বামীর আশেপাশে দেখলে—আমি ছাড়ব না। সোজা খুন করে ফেলবো কুত্তার বাচ্চা। ”
রুমে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। রোহান দ্রুত ক্লায়েন্টদের বাইরে নিয়ে যায়। আসিফ খান, আরিফ খান বারবার বলছেন,
__“জারা মা, শান্ত হও।”
কিন্তু শান্ত হয় কীভাবে? শরীর কাঁপছে, চোখ জ্বলছে।
জারা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে,
__“আমাদের ম্যারেজ এনিভার্সারি ভুলে গেছেন, সমস্যা নেই। কিন্তু আপনি বলুন—একজন স্ত্রী হয়ে স্বামীর পাশে অন্য মেয়েকে কীভাবে সহ্য করি?”
আরমান তার বাহু ধরে। কণ্ঠ ভেঙে আসে।
__“আমার লক্ষী বউ… একটু শান্ত হও। আমার কথা শোন।”
জারা এক ঝটকায় আরমানের হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দেয়। স্পর্শটুকুও যেন সহ্য হচ্ছে না তার। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানিটা আঙুলের পিঠে মুছতে মুছতে সে এক মুহূর্তও পেছনে না তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও পা দুটো থামে না।
আরমান হতভম্ব হয়ে এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হুঁশ ফিরে পেয়ে ছুটে যায় জারার পেছনে।
__“মানজারা!আমার লক্ষী বউ! শুনো প্লিজ!”
কণ্ঠে অনুনয়, ভয় আর অপরাধ একসাথে মিশে যায়।
অফিসের করিডোর পেরিয়ে লিফট, তারপর নিচতলা। কর্মচারীরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। আরমান কিছুই দেখছে না। তার চোখে শুধু জারা—বোরকা এলোমেলো, চোখ লাল, মুখে গভীর কষ্ট।
অফিসের বাইরে পৌঁছাতেই দেখে জারা গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসছে।
__“মানজারা,বউ আমার, এক মিনিট দাঁড়াও!”—
আরমান প্রায় চিৎকার করে ওঠে।
কিন্তু জারা শোনে না। দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দেয়। ড্রাইভারকে কিছু একটা বলে। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটা সামনে এগিয়ে যায়।আরমান রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।হাত দুটো শূন্যে ঝুলে পড়ে।আজ প্রথমবার তার মনে হয়—বউটা শুধু রেগে যায়নি…ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখে। তারপর রাশেদ কে কল করে। ওর সাথে কিছু কথা বলে কল কেটে দিয়ে অফিসে চলে আসে।
ড্রইংরুমে তখন সবাই ছিল। ফিহা আর মিম মেঝেতে বসে রিয়াতকে নিয়ে খেলছিল—কখনো ওকে দৌড় করাচ্ছে, কখনো দু’হাত তুলে ধরে “পাখি পাখি” খেলাচ্ছে। রিয়াত হেসে হেসে লাল হয়ে যাচ্ছিল। পাশে সোফায় বসে জেসমিন বেগম জেরিনের চুলে তেল দিচ্ছিলেন, কখনো দমকে বলছিলেন, “চুপ করে বস, নইলে চোখে চলে যাবে।” আর এক কোণে ফারিয়া বেগম চশমা চোখে সুয়েটার বুনছিলেন, সুতো টানতে টানতে মুখে শান্ত একটা ভাব।
হঠাৎ দরজার শব্দ, তারপর জারার কান্নাভেজা মুখ।
হিজাব এলোমেলো, চোখ লাল, হিজাব একপাশ কাঁধ থেকে নেমে গেছে। এমন অবস্থা দেখে এক সেকেন্ডের জন্য কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না।
__“জানু?”—ফিহা সবার আগে উঠে দাঁড়াল।
মিমের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। রিয়াতও যেন বুঝে গেল কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, সে খেলা থামিয়ে জারার দিকে তাকিয়ে রইল। ফারিয়া বেগম হাতের সুই-সুতো নামিয়ে রেখে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। গলায় ভয় আর মায়ের মমতা একসাথে মিশে গেল।
__ “কি হয়েছে জারা মা? এমন করে কাঁদছিস কেন?”
কিন্তু জারা কারো দিকে তাকাল না। কারো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এই কান্না শুধু চোখের নয়—ভেতরের কিছু ভেঙে গেছে।
__“জারা, দাঁড়া!”—জেসমিন বেগম ডাকলেন।
__ “জানু কি হইছে? ”—মিম এগিয়ে এলো।
কিন্তু জারা থামল না। সিঁড়ি ভেঙে দৌড়ে উঠে গেল ওপরে। সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। কিছু সময় আগেও যে মেয়েটা হাসিমুখে খাবার নিয়ে অফিসে গেলো, সে কীভাবে এমন হয়ে ফিরল—কেউই বুঝতে পারছিল না।
__“চল, দেখি কি হয়েছে।”
ফারিয়া বেগম শাড়ির আঁচল সামলে সিঁড়ির দিকে এগোলেন। সবাই তার পেছনে পেছনে দৌড়াতে লাগল। ওপরে উঠেই দেখা গেল জারা নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। ভেতর থেকে খিল লাগানোর শব্দ।
__“জারা, দরজা খোল মা।” ফারিয়া বেগম দরজায় টোকা দিলেন।
__“কি হয়েছে বল, আমরা তো আছি।”
ভেতর থেকে জারার কান্নাভেজা, কাঁপা গলা ভেসে এলো
— “আমাকে কেউ বিরক্ত করবে না। কাউকে না। না হলে এই খান বাড়ি আমি জ্বালিয়ে দেব।”
কথাগুলো এমন তীব্র ছিল যে সবাই একসাথে কেঁপে উঠল। জারার মুখ থেকে এমন কথা কেউ কখনো শোনেনি। মিম ফিসফিস করে বলল,
__“এত রাগ করে আছে কেনো?… আজ তো মনে হচ্ছে সত্যিই কিছু হয়েছে অফিসে ।”
ফিহার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। সে রিয়াতকে কোলে তুলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফারিয়া বেগম আর দেরি করলেন না। হাতে কাঁপুনি নিয়ে ছেলের নম্বরে কল দিলেন। কল যেতে যেতে সবার বুক ধকধক করতে লাগল। একটু পর ওপাশ থেকে আরমানের কণ্ঠ ভেসে এলো।
__“হ্যালো, আম্মু?”
ফারিয়া বেগমের গলা ভারী হয়ে এলো,
__“আরমান, “জারার কি হয়েছে? ও কাঁদছে কেন? এমনভাবে বাড়িতে ঢুকেছে যে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।দরজা বন্ধ করে বসে আছে ”
ওপাশ থেকে এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর আরমানের গলায় একরাশ ক্লান্তি আর চাপা রাগ। __“তোমার ছেলের বৌয়ের কিছু হয়নি, আম্মু। যা হওয়ার… আমাদেরই হয়েছে।”
__“মানে?” ফারিয়া বেগম হতভম্ব।
আরমান একটু তেতো হেসে বলল,
__“মানে, ম্যাডাম আজ অফিসে ঝড় তুলে দিয়ে গেছে।”
সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।ফারিয়া বেগমের গলা শুকিয়ে এলো।
__“ঝড় মানে?”
__“ওর জন্য প্রায় ত্রিশ কোটি টাকার ডিল হাতছাড়া এখন আল্লাহকে ডাকো, আমাদের নামে কোনো কেস না হয়।”
ফারিয়া বেগম যেন বসে পড়বেন এমন অবস্থা। __“কেস? কিসের কেস? জারা কি করেছে?”
আরমান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
__ “আমাদের বিদেশি মহিলা ক্লায়েন্টদের… আধমরা করে গেছে।”
ড্রইংরুমে যেন বোমা ফাটল।জেসমিন বেগম চিৎকার করে উঠলেন। মিমের মুখ হা করে গেল।
__“কি?!”
আরমান বলল, গলায় অদ্ভুত এক ধরনের হাসি।
__“তাদের অপরাধ কি যানো? তারা শুধু আমার পাশে বসে লাঞ্চ করছিল।”
ফারিয়া বেগম কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনি হাসবেন, না কাঁদবেন—কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। একদিকে ভয়, আরেকদিকে বউয়ের এই আগুনরূপ—দুটো একসাথে মাথায় ঢুকছিল না।
এই ফাঁকে ফিহা আর মিম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।
__ “ভাবি তো দেখি আসলেই বাঘিনী,”
জেরিন চাপা গলায় বলল। ফিহা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল, কিন্তু পরমুহূর্তেই মুখে হাত চেপে ধরল—পরিস্থিতি যে মোটেও হাসির নয়, সেটা মনে পড়তেই। আরমান আবার বলল,
__“আম্মু,” প্লিজ, ওকে দেখে রেখো। আর আমি যা বলে এসেছি তাই করো। গন্ডগুলো কোরো না এখন।”
__“আচ্ছা,” ফারিয়া বেগম নিস্তেজ গলায় বললেন।
কল কেটে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না। শুধু দরজার ভেতর থেকে ভাঙচুরের আওয়াজ আসছিল—কিছু একটা ছুড়ে ফেলার শব্দ, তারপর কান্না।জেসমিন বেগম ফিসফিস করে বললেন,
__“ইয়া আল্লাহ,” এমন তো আগে কখনো হয়নি।”
ফারিয়া বেগম দরজার সামনে গিয়ে আবার ডাকলেন, __“জারা মা, দরজা খোল। যা হয়েছে আমরা ঠিক করব।”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর নেই। শুধু কান্না আর কিছু ভাঙার শব্দ। মেয়েটা সেই সকালে একটু পায়েস খেয়েছে। এখনো খাবার খায়নি। ফারিয়া বেগম ভাবলেন, হয়তো খাওয়ার কথা শুনলে দরজা খুলবে। __“মা, কিছু খেয়ে নে। সারাদিন কিছু খাসনি।”
কোনো সাড়া নেই।মিম বলল,
__ “জানু রিয়াত তোর সাথে খেলবে। খুব কান্না করছে সে।”
নীরবতা। ফিহা দরজার কাছে গিয়ে বলল,
__ “জানু বের হয়ে আয়,।আজ তুই রিয়াতের সাথে খেল আমি কোনো বাদা দিব না।”
ভেতর থেকে শুধু জারার গলা ভেসে এলো— __“আমাকে একা থাকতে দে।”
সময় গড়াতে লাগল। সন্ধ্যা নামল। ঘরে অদ্ভুত এক আতঙ্কের পরিবেশ। কেউ টিভি চালাল না, কেউ হাসল না। সবাই শুধু দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। মাঝে মাঝে আবার ভাঙচুরের শব্দ, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
__“এটা তো মহা বিপদ,” জেসমিন বেগম চাপা গলায় বললেন।
__ “আরমান ভাইয়া আসলে ভালো হতো,”
ফিহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু আরমান আসতে দেরি। আর ভেতরে, বন্ধ দরজার ওপাশে, জারা একা—কান্না, রাগ, অপমান আর ভালোবাসার জটের মধ্যে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। আর বাইরে, পুরো খান বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে এক অজানা ঝড়ের অপেক্ষায়।
রাত ঠিক দশটা। খান বাড়ির বাগানটা যেন আজ আলাদা কোনো স্বপ্নের দেশে রূপ নিয়েছে।
চারপাশে ছোট ছোট উষ্ণ লাল,হলুদ আলো—মাটির কাছাকাছি পুঁতে রাখা বাল্ব, গাছের ডালে ঝোলানো ফেয়ারি লাইট, ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে লুকোনো নরম আলো—সব মিলিয়ে বাগানটা ঝিকমিক করছে, কিন্তু চোখে লাগার মতো নয়। যেন আলো নয়, আলোয় মোড়া অনুভূতি। মাঝখানের বড় আমগাছটার চারদিকে গোল করে ঝুলছে আলো, তার নিচে একটা ছোট মঞ্চ। মঞ্চের পেছনে আলো দিয়ে লেখা—
“Happy Marriage Anniversary”
অক্ষরগুলো জ্বলছে নিঃশব্দে, কিন্তু তাদের আলো যেন বুকের ভেতর ঢুকে পড়ে। চারপাশে সাদা আর গোলাপি ফুলের সাজ। গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেবি ব্রেথ—সব মিলে এমন গন্ধ, যা রাতের ঠান্ডা বাতাসে আরও নরম হয়ে উঠেছে। মাটিতে পাতা সবুজ ঘাসের ওপর রাখা হয়েছে ছোট ছোট গোল টেবিল, সেগুলোর ওপরে কাচের জারে মোমবাতি, ফুল ভাসানো পানির বাটি। কোথাও কোথাও সাদা পর্দা ঝুলছে, বাতাসে দুলছে আস্তে আস্তে।
সব কিছুই নিখুঁত।সব কিছুই… শুধু একজন ছাড়া।
খান বাড়ির সবাই বাগানে উপস্থিত। জেসমিন বেগম হালকা গোলাপি শাড়িতে, চুল গুছানো, চোখে চিন্তার ছায়া। ফারিয়া বেগম গাঢ় নীল শাড়িতে, গলায় মুক্তোর হার, মুখে হাসি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা, কিন্তু চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।
মিম আর ফিহা দু’জনেই হালকা রঙের থ্রি পিস পরেছে, আজ একটু বেশিই চুপচাপ। জেরিন সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চোখ বারবার বাড়ির দিকেই যাচ্ছে।
রোহান সন্ধ্যার দিকে জিনিয়াকে নিয়ে এসেছে। জিনিয়া সাদা ফ্রকে, চুলে ছোট ফুলের ক্লিপ। তার কোলে নোর—এত আলো দেখে আজ আর ঘুমের নামগন্ধ নেই। বড় বড় চোখে চারপাশ দেখছে, হাত নেড়ে আলো ধরতে চাইছে।
আর রিয়াত—ওকে তো কোলে রাখাই যায় না। একবার নামালেই ঘাসের দিকে দৌড়। আলো, ফুল, মানুষ—সবকিছুই ওর কাছে খেলনা। ফিহা বারবার ধরছে, আবার ছেড়ে দিচ্ছে, আবার ধরছে।
সবাই সাজগোছ করা। সবাই প্রস্তুত।
শুধু আরমান… গম্ভীর। কালো পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা—দেখতে নিখুঁত। কিন্তু মুখে কোনো উৎসব নেই। চোখে ক্লান্তি, কপালে ভাঁজ। সে বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, হাত দুটো পকেটে ঢোকানো, যেন নিজেকে সামলে রাখছে।ফারিয়া বেগম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বললেন,
__“আরমান… আমরা কত বললাম। কত ডাকলাম। জারা দরজাই খুলল না। বাইরে আসতে রাজি হচ্ছে না।”
আরমান গভীর একটা শ্বাস ফেলল। এমন শ্বাস, যেন ভেতরে জমে থাকা রাগ, অপরাধবোধ, অসহায়ত্ব—সব একসাথে বেরিয়ে এলো।গলা চাপা কিন্তু তীক্ষ্ণ,
__“তোমরা কেউ কোনো কাজের না। সন্ধ্যা থেকে এতো মানুষ চেষ্টা করেও একজন মানুষকে রুম থেকে আনতে পারছো না?”
জেসমিন বেগম কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
মিম নিচের দিকে তাকাল। ফিহা ঠোঁট কামড়ে রইল।
জাহেদ এগিয়ে এসে বলল,
__“তাহলে তুমি যাও ভাইয়া। হয়তো তোমার কথায়—”
আরমান সাথে সাথে বলে উঠল,
__“বউ আমাকে সামনে পেলেই কাঁচা চিবিয়ে খাবে।”
কথাটা বলেই সে নিজেই একটু তেতো হাসল।এই হাসির ভেতরে ভয় আছে, অপরাধ আছে, আবার ভালোবাসাও আছে। রোহান পাশ থেকে বলে উঠল,
__“হাওয়া ফুস হয়ে গেছে তোর।”
আরমান চোখ তুলে তাকাল,
__“এতো পাকামি না করে গিয়ে বউটাকে এনে দে। যে করেই হোক।”
রোহান এক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হালকা একটা হাসি।
__“এটা আমার বাম হাতের কাজ।”
বলেই সে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একসাথে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে রোহানই যেন শেষ ভরসা। ফারিয়া বেগম দুই হাত জোড় করে ফিসফিস করে বললেন,
__“আল্লাহ, আজকের দিনটা যেন নষ্ট না হয়।”
আরমান আবার চোখ ফেরাল আলো ঝলমলে বাগানের দিকে। এই সাজ, এই আয়োজন—সবই জারার জন্য। এই আলো, এই ফুল—সবই ওর মুখের হাসির অপেক্ষায়। কিন্তু বাড়ির ভেতরে, বন্ধ দরজার ওপাশে যে ঝড় চলছে— সে ঝড় থামানো কি সত্যিই এত সহজ? বাগানের বাতিগুলো জ্বলতেই থাকে।
ফুলের গন্ধ বাতাসে ভাসে। সবাই অপেক্ষা করে।
একজন মানুষের জন্য।
রোহান দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা বন্ধ। ভেতরে নিস্তব্ধতা, শুধু মাঝে মাঝে কান্নার চাপা শব্দ। রোহান গভীর শ্বাস নিল। নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করল—আজ বোমা ফাটাতে হবে। না হলে আজকের রাতটা খান বাড়ির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ফেইল হিসেবে লেখা থাকবে। মনে মনে একটা প্ল্যান সাজাল। নিজের ভেতরের অভিনেতাকে জাগাল। পরক্ষণেই ফাত করে কান্নার অভিনয় শুরু।
__“ও ভাবি গো—ভাবিইই গো—তাড়াতাড়ি বের হন গো!”
গলা কাঁপছে, নিশ্বাস ভাঙছে, যেন সত্যিই দুনিয়া
শেষ। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। রোহান আরও জোরে কাঁদে,
__“আরমান একি কাণ্ড করলো গো! ভাবিইই—সব শেষ গো!”
এই কান্না দরজার ভেতরে থাকা জারার বুকে এসে যেন ছুরি চালিয়ে দিল। সে তখনো বোরকা পরা অবস্থায়, বিছানার এক পাশে গুটিসুটি হয়ে বসে। চোখ ফুলে গেছে কান্নায়। মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা ঘুরছে। রোহানের কান্না শুনে বুকটা হু হু করে ওঠে।
আরমান আবার কী করলো? জারা তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। বোরকাটা ঠিকও করে না। এসে তেকে কান্না করছে এখনো বোরকাও খুলে নাই। সোজা দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলে,
__“ও… ওনি কী করেছে ভাইয়া?”
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রোহান মনে মনে হেসে ওঠে।
প্ল্যান কাজ করছে।সে আবার কান্নার অভিনয় বাড়িয়ে দেয়।
__“ভাবি… আরমান বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে গোহহ!”
এই কথাটা শুনেই জারার মাথার ভেতর যেন বিকট শব্দে কিছু ভেঙে গেল।
__“ক… কী?”
জারার গলা বেরোয় না। শব্দটা যেন গিলে ফেলে তার বুক। রোহান থামে না।
__“বড় আম্মুর সাথে তর্ক করছে বাড়িতে ঢুকার জন্য। আম্মু ঢুকতে দিচ্ছে না। বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে!”
এই কথা শুনে জারার পায়ের নিচের মাটি সরে যায়। মাথা ঘুরে ওঠে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। তার স্বামী… দ্বিতীয় বিয়ে? মাথার ভেতর মুহূর্তে হাজারো ছবি— আরমান অন্য কাউকে বউ বানাচ্ছে,
তার হাতে মেহেদি, অন্য কারো নামে হাসি।
চোখ ছলছল করে ওঠে। কিন্তু ঠিক পরক্ষণেই ভেতর থেকে এক ভয়ংকর জেদ উঠে আসে। চিৎকার করে বলে
__” আমার স্বামী মানে আমার স্বামী। অন্য কেউ এসে আমার জায়গা নেবে—এটা আমি হতে দিব না। বান্দির বাচ্চা কে আমি আজ জন্মের বিয়া তেতই দিয়ে করামু। ”
জারার এমন কথা শুনে দরজার বাইরে দাড়িয়ে থাকা রোহাম কেপেঁ উঠে। ঝড়ের বেগে দরজা খুলে দেয় জারা। রোহান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, ভেজা চোখের অভিনয় নিয়ে। জারা এক সেকেন্ডও থামে না। রোহানকে পাশ কাটিয়ে বোরকা সামলাতে সামলাতে সিঁড়ির দিকে দৌড়।
নিচে নামার শব্দে পুরো বাড়ি যেন কেঁপে ওঠে। রোহান হতভম্ব।
__“ভাবি—ভাবি দাঁড়ান—!”
কিন্তু জারা শোনে না। সে সোজা কিচেনের দিকে যায়।
রোহান পিছন পিছন ছুটে আসে। জারাকে কিচেনে ঢুকতে দেখে হঠাৎ থেমে যায়। তার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। জারা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কিচেন থেকে বের হয়। হাতে—একটা বড়, চকচকে বটি। এই দৃশ্য দেখে রোহানের মাথায় হাত।
__“ আমি একটু বেশিই বলে ফেলেছি…”
সে দৌড়ে এসে জারার সামনে দাঁড়ায়।
__“ভাবি—বটি দিয়ে কী করবেন?”
জারা চোখ লাল করে তাকায়।
__“আজ কুরবানী দিব বান্দির বাচ্চা কে ।”
এই কথা বলে সে আবার দৌড়। সোজা বাড়ির বাইরে।
রোহান ছুটে আসে, কিন্তু জারার রাগের সামনে সে যেন ধ্বংসীনি হয়ে গেছে। বাইরে এসে জারা থামে। চারপাশে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না।ক্ষিপ্ত গলায় বলে,
__“ভাইয়া! ওরা কোথায়?”
রোহান তুতলাতে থাকে।
__“বা… বাগানে আছে ভাবি।”
এই কথাই যথেষ্ট। জারা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। বাগানের দিকে দৌড়। বাগানটা তখন আলোয় ঝলমল করছে। ফুল, বাতি, সাজ—সব আছে।
আর তার মাঝখানে—আরমান। কালো পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা। এত সুন্দর করে সাজা। এই দৃশ্য দেখেই জারার মাথায় আগুন ধরে যায়। রোহানের কথা সে একেবারে বিশ্বাস করে ফেলে। চারপাশে আর তাকায় না। আলো, মানুষ—কিছুই দেখে না। সে বটি হাতে আরমানের দিকে তেড়ে যায়।
__“আজ তোকে আমি মেরে ফেলবো—!”
রোহান চিৎকার করে ওঠে,
__“আরমান পালা ভাই! পালা! ভাবি ক্ষেপে গেছে। ”
আরমান সামনে তাকিয়েই আত্মা কেঁপে ওঠে।
চোখের সামনে—বোরকা পরা জারা, হাতে বটি, চোখে আগুন। সে উল্টো দিকে দৌড়। জারা তার পিছনে।
বাগানে উপস্থিত সবাই হা করে তাকিয়ে আছে। কি হচ্ছে—কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। আরমান দৌড়াতে দৌড়াতে চেঁচায়,
__“শালা ! তুই আমার বউকে কী বলেছিস!”
জারা দৌড়াতে দৌড়াতে গালি দেয়,
__“তোকে আমি দ্বিতীয় বিয়ে করাব ভালো করে ? হারামির বাচ্চা!”
এই গালিতে খান বাড়ির বড়রা পর্যন্ত স্তব্ধ। ফারিয়া বেগম হাত মুখে চেপে ধরেন। জেসমিন বেগম চোখ বড় বড় করে তাকান। আরমান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
__“বউ! তুমি এসব কী বলছো?”
জারা চিৎকার করে,
__“নাটক করিস না! রোহান ভাইয়া বলেছে তুই আবার বিয়ে করেছিস! আজ তোকে মেরে আমিও মরবো!”
এই কথায় সবাই একসাথে রোহানের দিকে তাকায়।
রোহান তখন একপাশে দাঁড়িয়ে, বোকা একটা হাসি দিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে।
__“এটা… এটা শেষ উপায় ছিলো,আমার দোষ নেই।”
আরমান দৌড়াতে দৌড়াতে গালি দেয়,
__“তুই আমার জীবন শেষ করে দিলি আজ। একবার তোকে আমি হাতের কাছে পাই রোহান। তোকে শেষ করে ফেলবো!চৌরাস্তায় যদি আমি তোকে লেংটা করে দাড়ঁ না করিয়েছি আমার আরমান না। ”
জাহেদ আর রাশেদকে দৌড়ে যায় জারা হাত থেকে বটি নিতে। রাগের বসে হঠাৎ কোপ দিয়ে বসতে পারে।
জাহেদ আর রাশেদ জারাকে ভাবি ভাবি বলে ডাকছে।আর বলছে, রোহান যা বলেছে সব মিথ্যা। আসিফ খান আর আরিফ আজ এতো গালি খেছে ছেলের বৌয়ের কাছে থেকে? আর এক সপ্তাহ কিছু না খেলেও চলবে তাদের। মিম আর ফিহা ও দৌড়ে যায়।কিন্তু শাড়ি পরে এতো দৌড়াতে পারছে না। রিয়াত জেসমিন বেগম এর কোলে। মাকে দৌড়াতে দেখে সে কি খুশি। খিলখিল করে হাসছে।
আরমান দৌড়াতে দৌড়াতে এসে মায়ের পিছনে লুকায়।জারা এসে থামে।
__“আম্মুর পিছনে লুকাচ্ছিস কেনো? সামনে চয়! আজ তোকে কেটে নদীতে বাসিয়ে দিব আমি।বিয়ে করবি তুই। তোর বউ কই? আজ একে কুরবানী দিব আমি। ”
আরাম হাঁপাচ্ছে। ফারিয়া বেগম ছেলেকে আগলে বলে
__“ মা শান্ত হ। রোহান মিথ্যা কথা বলেছে। ”
__“ তোমার ছেলে হাঁপ পেন্ট পরা মেয়ের সাথে বসতে পারে। তারমানে বিয়েও করতে পারে। আম্মু তুমি সরো আজকে ওকে শেষ করে ফেলব।”
জিনিয়া রাগে ফুঁসতে থাকে।
__“তোমার মাথা ঠিক আছে রোহান? জারাকে এসব বাজে কথা বলে ভয় দেখালে কেন ?”
রোহান অসহায় হয়ে দু’হাত তোলে।
__“আমি জানতাম না এতো দূর যাবে বিষয়টা।”
রোহান আবার অসহায় মুখে দুই হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে।
__“ভুল হয়ে গেছে ভাবি, সত্যিই ভুল হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাকে রুম থেকে বের করাই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য।”
ঠিক তখনই জাহেদ এগিয়ে আসে।পরিস্থিতি বুঝে সে এক মুহূর্তও দেরি করে না। জারার হাত থেকে বটি শক্ত করে ধরে নেয়।
__“এইটা দে ভাবি, আগে শান্ত হও।আজ রক্ত নয়, কেক কাটার দিন।”
বটি হাতছাড়া হতেই যেন জারার শরীরের শক্তিটুকুও বের হয়ে যায়। সে থমকে দাঁড়ায়। জারার চোখ তখনও বিস্ময়ে ভরা। চারপাশে আলো, মানুষ, সাজ, হাসি—সবকিছু যেন মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। একটু আগেও যে বুকের ভিতর আগুন ছিল, এখন সেখানে শুধু একটি প্রশ্ন—
__“সবটা কি নাটক ছিল?”
তখনই রোহান সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখটা পুরোপুরি অপরাধবোধে ভরা। রোহান গলা নামিয়ে বলে,
__“ভাবি… সরি। সত্যি সরি। মিথ্যা বলেছি। সবটাই মিথ্যা। আপনাকে রুম থেকে বের করার জন্য করেছি। আজ আপনাদের এনিভার্সিডি। আরমান সন্ধ্যা থেকে সব এরেঞ্জমেন্ট করে বসে আছে। ভাবছিলাম সারপ্রাইজ দেবো… কিন্তু বিষয়টা যেনো হরর মুভি হয়ে গেল।”
চারপাশে হালকা হাসি ফেলে। কিন্তু জারা তখনো হাসতে পারে না। এই কথাগুলো শুনে জারা যেন পাথর হয়ে যায়। সে একবার জিনিয়ার দিকে তাকায়, একবার জাহেদের দিকে, তারপর চারপাশে—আলো, ফুল, মানুষ, ব্যানার, কেক। সবকিছু যেন তার মাথার উপর দিয়ে বয়ে যায়। এতক্ষণ যে রাগে বুক ফেটে যাচ্ছিল, সেটা হঠাৎ করেই ভয় আর লজ্জায় বদলে যায়।
ঠিক তখনই আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
সব হৈচৈ থেমে যায়। তার চোখে রাগ নেই, আছে গভীর ক্লান্তি আর ভালোবাসা। সে জারার সামনে দাঁড়ায়। জারা অবাক নয়নে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ ছলছল, মুখে কিছু বলার শক্তি নেই।
আরমান নরম কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলে,
___“আজ তুমি আমাকে জন্মের শিক্ষা দিয়েছো বউ।”
জারা চমকে ওঠে।জারা তাকায়—অবাক চোখে, ভেজা চোখে, ভাঙা মনে। আরমান হালকা নিশ্বাস ফেলে বলে,
__“বউ… আজ তুমি আমাকে এমন সব শব্দ শিখাইছো, যেগুলো আমি জীবনে পড়িনি। আর যে পরিমাণ গালি দিয়েছো… আমার বাপ-দাদাও জীবনে এতো গালি খায় নাই।””
চারপাশে চাপা হাসি। জারা মাথা নিচু করে ফেলে। চোখে জল। কিন্তু জারার মুখে হাসি আসে না। সে মাথা নিচু করে ফেলে। চোখের কোণে পানি জমে। মাথা নিচু করেই ফুপাতে থাকে। আরমান আর দেরি না করে এক পা এগিয়ে গিয়ে জারাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
__““এই বউ… এই বউ কান্না করছো কেন সোনা?”
গলায় আদর।
__“রোহান মজা করছে জান। আমার লক্ষী বউ কাঁদে না।”
এই কথা শুনেই জারার বাঁধ ভেঙে যায়। সে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। দুই হাত দিয়ে আরমানকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। জারা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
__“আমি ভয় পেয়েছিলাম… ভাবছিলাম আপনি আমাকে ছেড়ে দেবেন, অন্য কাউকে পছন্দ করবেন। বিয়ে করে নিবেন..!”
আরমান নিজের কপালের সাথে ওর কপাল ঠেকিয়ে নরম গলায় বলে,
__“এই যে, পাগলি, আমি যদি অন্য দিকে তাকাতাম, তুমি কি এখনও আমার বুকের ভিতর থাকত?”
সবাই নিঃশব্দ। ভালোবাসার মুহূর্তে কেউ কিছু বলে না। জারা একটু আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
__“আপনি ভুলেন?”
আরমান জারার চোখ মুছে দিয়ে বলে,
__“এই দিনটা কি ভুলে যাওয়ার মতো দিন নাকি? আমি তোকে বিয়ে করেছি, এইটা কি ক্যালেন্ডার থেকে মুছা যায়?”
জারা মাথা নাড়ে, আবার কেঁদে ফেলে—এবার খুশির কান্না। ঠিক তখনই বাজি ফাটে। আকাশ আলোয় ভরে যায়। চারপাশে “হ্যাপি এনিভার্সারি” ধ্বনি। সবাই স্টেজের দিকে যায়। জারা আর আরমান মাঝখানে দাঁড়ায়। আরমান পাশ থেকে এটা ফুলের বোকে হাতে নেয়। গাঢ় লাল গোলাপে ভরা তোড়াটা যেন আগুনরঙা ভালোবাসার প্রতীক। প্রতিটা গোলাপ টাটকা, পাপড়িগুলো মোলায়েম আর ঘন সাজানো। মাঝখানে সাদা ছোট ছোট ফুল দিয়ে সুন্দর করে লেখা— “বউ”। লালের মাঝে সাদার সেই লেখা তোড়াটাকে শুধু সুন্দর নয়, গভীর অর্থবহ করে।আরমান হাটু গেড়ে কণ্ঠে গভীর ভালোবাসা নিয়ে বলে,
__“ বউ তুমি রাগ করো, অভিমান করো, ঝড়ের মতো তেড়ে আসো—তবুও তোমাকেই আমি চাই। কারণ এই রাগের ভেতরেই তোমার ভালোবাসা লুকানো। তুমি ছাড়া আমার ঘর ফাঁকা, আমার দিন অসম্পূর্ণ।”
আরমান একটু হেসে, আবার একটু গম্ভীর হয়ে জারার দিকে তাকায়।
__“একজন মানুষ অফিসে কোটি টাকার ডিল হারালেও শান্ত থাকতে পারে, কিন্তু বটি হাতে বউ দৌড়ালে… ওটা আলাদা লেভেলের ভয়! কারণ জানো কেন? ওই রাগটা ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু না। কেউ যদি এতটা ভালো না বাসে, সে কি স্বামী বিয়ে করেছে বলে এই ভাবে বটি নিয়ে স্বামীকে মারতে আসে? তবে একটা অনুরোধ—পরের বার রাগ করলে চপ্পল নিও, বটি না। আমি তোমাকে হারাতে চাই না… এই সুন্দর মুখের গালিও সহ্য করে বাঁচতে চাই।”
জারা হেসে কেঁদে একসাথে আরমানকে জড়িয়ে ধরে।
সবাই হাততালি দেয়। কেক কাটা হয়। আরমান হঠাৎ পকেট থেকে একটি চাবি বের করে জারার হাতে দেয়।
জারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
__“এইটা কী?”
আরমান হেসে বলে,
__“এইটা তোমার। তোমার নামে কেনা ছোট্ট একটি স্বপ্ন।”
আরমান জারাকে Yamaha R15 V4 (ম্যাট ব্ল্যাক) বাইকটাই গিফট করেছে। বাগানের এক কোণে সাজানো বক্সটা ফিতা দিয়ে সুন্দরভাবে বাঁধা ছিল। ছোট ছোট বাতি আর ফুলের আলোয় পুরো দৃশ্য যেন এক স্বপ্নের মতো। আরমান বক্সটা জারার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসল। বাগানের এক কোণে রাখা বক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে চকচকে Yamaha R15 V4– বের হয়। আরমান হেসে বলে,
__“আমার বউ তো এখন বাইক চালাতে পারে একদম প্রফেশনালের মতো, তাই ভাবলাম এই R15-টাই তোমার জন্য ঠিক হবে।”
জারা প্রথমে আনন্দে উল্লসিত হল। সে দৌড়ে এসে আরমানকে জড়িয়ে ধরল, চোখে উজ্জ্বল আনন্দ। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কানে কানে বলল,
রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৪
__ “আমি তো আর বাইকের শখ নেই, স্বামীজান।”
আরমান কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
__ “কেনো সোনা?এটা পছন্দ হয় নি?”
জারা হাসিমুখে, একটু লজ্জা মিশিয়ে বলল,
__ “ পছন্দ হয়েছে কিন্তু এখন অন্য শখ মাথায় চেপেছে। আমাদের ছোট্ট প্রাণটা, আমাদের বাচ্চার কথা।”
