Home রৌদ্রময় বালুচর রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫
সোহানা ইসলাম

আরমান জারার দিকে তাকিয়ে সবটা বুঝে ফেলেছে। বাইকের চাবি হাতে নিয়ে জারা যেভাবে ফিসফিস করে বলেছিল, “এখন অন্য শখ মাথায় চেপেছে”—এই কথার মানে বোঝার জন্য আরমানের খুব বেশি বুদ্ধি খরচ করতে হয়নি। সে মনে মনে হেসে ওঠে।
আমার বাচ্চা বউ… লক্ষী বউ… আমার রাগী, দুষ্টু, মিষ্টি রানী সাহেবা… তার মনে একের পর এক ভাবনা খেলা করতে থাকে।
জারা এখনো নিজেই পুরোপুরি বোঝে না সে কী চায়, কী অনুভব করছে। কিন্তু আরমান বোঝে। এই মেয়েটার চোখে যে লাজ, কণ্ঠে যে কাঁপুনি—ওগুলো শুধু ভালোবাসা নয়, তার চেয়েও গভীর কোনো ইচ্ছার ইঙ্গিত। তবুও আরমান কিছু প্রকাশ করে না। কিছু অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে মুখে আনতে নেই—সময় দিলে সেগুলো আরও সুন্দর হয়। সে হালকা গলায় কথা ঘুরিয়ে দেয়

— “বউ… তুমি এখনো বোরকা খুলোনি কেন?”
জারা তখনো বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে। কথাটা শুনে ঠোঁট উল্টে শিশুর মতো মুখ বাঁকায়।
— “আপনার সঙ্গে রাগ করে ছিলাম তো… আর কান্না করতে করতে ভুলেই গিয়েছিলাম।”
এই কথায় আরমান হেসে ফেলে। সেই হাসিতে কোনো ঠাট্টা নেই, আছে আদর।
— “এখন রাগ কমেছে, সোনা?”
জারা চোখ নামিয়ে মাথা নাড়ে। না বলার মতো করে না—আবার পুরোপুরি হ্যাঁও না। সেই আধা-লাজুক ভঙ্গিটাই আরমানের সবচেয়ে প্রিয়। আরমান বাইকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— “একবার চালিয়ে দেখো তো, বউ।”
জারা একটু ইতস্তত করে।
— “এখন?”
— “হুম। আমার বউ যা পারে, সবাইকে দেখুক।”
জারা আর কিছু না বলে চাবি নেয়। বাইকে স্টার্ট দিতেই ইঞ্জিনের শব্দ বাগান ভরিয়ে তোলে। সে ধীরে ধীরে বাইক চালায়। এক চক্কর… তারপর আরেকটা।
বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তাকিয়ে থাকে। জারার চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখে হালকা হাসি। এই জারা সেই মেয়েটা নয়, যে কিছুক্ষণ আগে কাঁদছিল। এই জারা একজন শক্ত মনের নারী।
জারা এসে থামতেই চারদিক থেকে হাততালি। জাহেদ দুই হাত তুলে চেঁচিয়ে ওঠে,

— “ব্রাভো ভাবি! একদম পারফেক্ট!”
জারা লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলে। ঠিক তখন ফারিয়া বেগম সামনে এগিয়ে আসেন। গলার স্বরে মায়ের শাসন আর আদর একসাথে।
— “অনেক রাত হয়ে গেছে। এখন সবাই ভেতরে চলো। যা করার, বাড়ির ভেতরেই করবে।”
সবাই এক এক করে বাড়ির দিকে যেতে থাকে। হাসি, ফিসফাস, ছোট ছোট কথা—সব মিলিয়ে পরিবেশটা হালকা হয়ে আসে। কিন্তু রোহান যখন ভেতরে ঢোকার জন্য পা বাড়ায়, ঠিক তখনই আরমান গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,

— “তুই ঢুকবি না।”
রোহান থমকে যায়। মুখের রং একেবারে ফ্যাকাশে।
— “মানে? কেন ভাই?”
আরমান চোখ কুঁচকে তাকায়।
— “তুই জানিস না কেন? আজ তোর জন্য আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা ছিলো।”
রোহানের গলা শুকিয়ে আসে।
— “আমি তো… তোর উপকার করছিলাম ভাই।”
জিনিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
— “একদম ঠিক কাজ করেছো ভাইয়া। ওর শাস্তি হওয়া দরকার ছিল।”
রোহান বিরক্ত হয়ে তাকায়।
— “চাঁদ সুন্দরী, তুমি ওর হয়ে কথা বলছো কেন?”
জিনিয়া নির্বিকার মুখে বলে,
— “কারণ এটা তোমার শাস্তি।”
রোহান এবার শেষ চেষ্টা করে। কণ্ঠে কৃত্রিম অসহায়ত্ব, — “ভাই, আমার বউ আর আমার মেয়ে আমাকে ছাড়া রাতে ঘুমাতে ভয় পায়।”
জিনিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
— “মিথ্যা কথা।”
আরমান বাঁকা হাসে। একটুও দয়া দেখায় না। দরজার হাতলে হাত রেখে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
রোহান বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার ওপর রাতের আকাশ, সামনে বন্ধ দরজা, আর মনে একটাই কথা—আজ বাঁচলাম না। ভেতরে আরমান ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে। তার বুকের ভেতর এখনো একটা নরম উষ্ণতা। আজকের রাতটা সে কখনো ভুলবে না।

জারা আয়নার সামনে বসে আছে। ঘরটায় উষ্ণ আলো, জানালার বাইরে রাতের নীরবতা। তার চোখে এখনো কান্নার ছাপ, কিন্তু সেই কান্নার ভেতর লুকিয়ে আছে লাজুক একটা আনন্দ। ফিহা, মিম আর জিনিয়া—তিনজনই আজ যেন বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে এসেছে। আজ তাদের বান্ধবী শুধু জারা নয়, আজ সে একজন নতুন করে সাজা বউ। ফিহা প্রথমেই ঘোষণা দিল,
— “ আজ কোনো আপত্তি চলবে না। আমরা যেমন করে সাজাবো,তুই শুধু চুপচাপ বসে থাকবি।এটা দিব না। ওটা দিব না। এসব চলবে না ।”
জারা হাসতে হাসতে বলে,
— “আমি তো এমনিতেই কিছু বলার সুযোগ পাই না।”
মিম সঙ্গে সঙ্গে কটাক্ষ ছুড়ে দেয়,

— “ওহ! অফিসে গিয়ে যে ঝড় তুলে এসেছিস, সেই মানুষ এখন নিরীহ সাজছে!”
ঘর ভরে হাসির রোল পড়ে যায়। জারা লজ্জা পেয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। জিনিয়া আলমারি খুলে সাবধানে শাড়ি বের করে। গাঢ় মেরুন রঙের ভারী সিল্ক শাড়ি, সোনালি জরির কাজ এত নিখুঁত যে আলো পড়তেই ঝিলমিল করে ওঠে। জিনিয়া দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— “এইটা পরবে, খুব সুন্দর লাগবে,”
মিম বলে,
— “এই শাড়িতে দেখলে তোর স্বামীজান শ্বাস নিতে ভুলে যাবে।”
জারা চোখ বড় বড় করে তাকায়।
— “এতো ভারী! আমি সামলাতে পারবো তো?”
ফিহা হেসে বলে,
— “সামলাতে পারবি না তো কি হইছে আমরা আরমান ভাইয়া আছে না?”
জারা লাজুক হাসে। শাড়ি পরানোর কাজ শুরু হয়। এক এক করে ভাঁজ, আঁচল ঠিক করা—সবকিছু খুব যত্ন করে। শাড়ির সঙ্গে পরানো হয় গাঢ় সবুজ ব্লাউজ, যার পিঠে সূক্ষ্ম নকশা। তারপর গহনার পালা।
মিম বাক্স খুলে বলে,

— “এই হারটা আরমান ভাইয়া নিজে পছন্দ করেছে।”
ভারী সোনার হার, মাঝখানে ছোট ছোট হীরের কাজ। কানে ঝুলে যায় মিলিয়ে দুল। হাতে চুড়ি—সোনালি আর লাল রঙের মিশেল। কপালে ছোট টিপ, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে নরম গোলাপি রঙ। শেষে চুল খোলা রেখে হালকা ঢেউ খেলানো করে সাজানো হয়। মাথার এক পাশে ছোট সাদা ফুল গোঁজা। সব শেষ হলে তিনজন একসাথে পিছিয়ে দাঁড়ায়। ফিহা মুগ্ধ হয়ে বলে,
— “আল্লাহ!আমার জানু, একেবারে সিনেমার নায়িকা লাগছে।”
মিম হেসে যোগ করে,
— “আরমান ভাইয়া আজ বুঝবে—রিস্ক নিয়ে বিয়ে করেছে।”
জিনিয়া একটু নরম গলায় বলে,
— “সত্যি বলছি জারা, আজ তুমি খুব সুন্দর লাগছো।”
জারা আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়।
— “ তাকিও না, আমার অস্বস্তি লাগছে।”
তিনজন একসাথে বলে ওঠে,
— “ এই কেউ তাকাবে না।ওর দিকে শুধু ভাইয়া তাকাবে!”

হাসাহাসির মধ্যেই তারা জারাকে নিয়ে বের হয়।করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে জারার বুক ধুকধুক করতে থাকে। নিজের রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই ফিহা দরজার হাতল ঘোরায়। দরজা খুলতেই জারা চমকে ওঠে। পুরো রুমটা যেন রূপকথার মতো সাজানো। মেঝে থেকে ছাদ—সবখানে নরম আলো। দেয়ালের পাশে ছোট ছোট বাতি, জানালার ধারে সাদা পর্দার ফাঁকে গোলাপ আর রজনীগন্ধার মালা। বিছানার উপর লাল আর সাদা গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বড় করে লেখা—“I LOVE YOU” বিছানার চারপাশে মোমবাতির আলো নাচছে। বাতাসে ফুলের গন্ধ। জারা অবাক হয়ে ফিসফিস করে বলে,
— “এসব… কখন করলে?”
মিম হাসতে হাসতে বলে,
— “যখন আপনি ওই পাশের রুমে কান্না করতে ব্যস্ত ছিলেন।”
ফিহা যোগ করে,

— “আর আমাদের ওপর সন্দেহ করছিলেন যে আমরা নাকি আপনাকে জ্বালাই।”
জারা লাজুক হাসে। চোখ ভিজে আসে, কিন্তু এইবার সেটা আনন্দের। জিনিয়া মজা করে বলে,
— “এখন কাঁদবেন না। আজ কাঁদার কোটা শেষ।”
তারা জারাকে বিছানায় বসায়। মিম হঠাৎ বলে ওঠে, — “শোন, একটা কথা বলবো?”
জারা ভয় পেয়ে বলে,
— “কি?”
— “আজ আর কোনো বটি নিয়ে দৌড়ানো চলবে না।”
ঘর ভরে হাসি পড়ে যায়। জারা মুখ ঢেকে বলে,
— “প্লিজ! এটা আর তুলো না।”
ফিহা ঠাট্টা করে বলে,
— “আমরা তো শুধু ভাবছি—আগামীতে ঝগড়া হলে আরমান ভাইয়া কে কী নিয়ে দৌড়াবে!”
জারা বালিশ ছুঁড়ে মারতে যায়।

— “খুব বেশি কথা বলছো সবাই !”
তিনজনই হাসতে হাসতে দরজার দিকে এগোয়। ঠিক তখনই দরজার বাইরে কাশির শব্দ। সবাই থেমে যায়।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আরমান। মুখে মিটমিটে হাসি।
— “আমি কি ঢুকতে পারি?”
সেই শব্দে ঘরের ভেতরের হাসি–ফিসফিস থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।মিম সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলে উঠল,
__“ওই তো! ভাইয়া চলে এসেছে।”
ঘরের ভেতরে জারা তখন বিছানার এক কোণে বসে আছে। গুমটা টেনে ধরেছে শক্ত করে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে। কেন যেন মনে হচ্ছে—সব অনুভূতি আজ নতুন, অচেনা, অথচ ভীষণ আপন।
জিনিয়া দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দৃঢ় গলায় বলে,
__“ভাইয়া, এখন ঢুকতে পারবে না।”
বাইরে দাঁড়িয়ে আরমান অবাক গলায় বলে,
__“কেনো?”
ফিহা কোমরে হাত রেখে দুষ্টু ভঙ্গিতে বলে,
__“আমাদের কষ্টের পারিশ্রমিক লাগবে।সারাদিন কষ্ট করেছি।”
আরমান পাঞ্জাবির পকেট উল্টে দেখিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে,
__“পকেট খালি। ক্যাশ নেই।”
মিম চোখ কুঁচকে বলে,
__“তাহলে রুমে আসার অনুমতি নেই।”
আরমান দরজার গায়ে হালকা ঠোকর মেরে ফিসফিস করে বলে,
__“শোনো, আমার বউ আদর পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। প্লিজ ডিস্টার্ব করো না। কাল তোমরা সুদে-আসলে পেয়ে যাবে।”

এই কথা শুনে তিনজন একসাথে হেসে উঠল। হাসির শব্দে ঘরটা ভরে গেল। বিছানার কোণে বসে থাকা জারা লজ্জায় আরও কাচুমাচু হয়ে যায়। মনে হচ্ছে, বুকের ভেতরের কথা গুলো যেন মুখের কাছে এসে আটকে আছে। কান দুটো গরম হয়ে উঠেছে।
ফিহা আবার বলে,
__“ভাইয়া, আপনি কিন্তু খুব চালাক হয়ে গেছেন।”
আরমান হাসিমাখা কণ্ঠে উত্তর দেয়,
__“চালাক না হলে তোমাদের পিছনে বসা রমণীকে সামলাবো কীভাবে?”
মিম খোঁচা দিয়ে বলে,
__“জানু কে লজ্জা দিতে আপনি বেশ মজা পাচ্ছেন, না?”
আরমান দরজার ওপাশ থেকেই বলে,
__“লজ্জা মানায় ওকে। লজ্জা পেলে আরও সুন্দর লাগে।কিন্তু মাঝে মাঝে একটু শর্টসার্কিট হয়ে যায় আর..কি।”
এই কথা শুনে জারা গুমটার ভেতর মুখ ঢেকে ফেলে। বুকের ভেতর কেমন একটা ঢেউ ওঠে।
জিনিয়া মুচকি হেসে বলে,

__“ঠিক আছে ভাইয়া। আমরা যাচ্ছি।কাল সকালে কিন্তু… মনে থাকবে।”
ফিহা দরজার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো বলে,
__“ ভাইয়া আমাদের নিরাশ করবে না ।”
তিনজন হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। দরজার বাইরে তাদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে।
আরমান ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে আসে। শুধু হালকা আলো, ফুলের সুবাস আর দু’জন মানুষের নিঃশব্দ উপস্থিতি।
আরমান ধীরে পায়ে এগিয়ে এসে জারার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে।
এই দৃশ্য দেখে জারা চমকে উঠে। এক মুহূর্তে উঠে যেতে চাইলেও নিজেকে সামলে নেয়। চোখ নামানো, বুকের ভেতর টানটান অনুভূতি। আরমান খুব আস্তে, যেন ভয় পায় শব্দ হলে এই মুহূর্ত ভেঙে যাবে—ধীরে ধীরে জারার গুমটা তোলে। আলোয় ভেসে ওঠে জারার মুখ। লাজুক চোখ, কাঁপা ঠোঁট, ভেজা দৃষ্টি।
এক ঝলক দেখেই আরমান বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে উল্টে পড়ে যায়।
জারা প্রথমে ভয়ে আঁতকে ওঠে। তারপর বুঝতে পেরে খিলখিল করে হেসে ওঠে। সেই হাসিতে ঘরটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি আরমানকে টেনে তুলে বসায়।

__“এইসব কী করছেন আপনি!”
আরমান উঠে বসে হাসতে হাসতে বলে,
__“বউ, এমন রূপ সহ্য করা কঠিন। হৃদয়টা সামান্য নাটক করেই ফেলল।”
জারা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। চোখের কোণে পানি জমে ওঠে। আরমান আর দেরি করে না। সে জারাকে জড়িয়ে ধরে। খুব শক্ত করে নয়—আশ্রয়ের মতো, নিরাপত্তার মতো। তারপর কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলে,
__“ভালোবাসি বউ। খুব ভালোবাসি।”

এদিকে শীতের রাতটা খান বাড়ির সামনে আজ অন্যরকম। কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে পুরো উঠোন। বাতাসে এমন এক ঠান্ডা, যেন হাড়ের ভেতর ঢুকে বেঁকে বসেছে। বাড়ির গেটের সামনে একা একা পায়চারি করছে রোহান। পা দুটো জুতো ভেতরেও জমে গেছে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাঁটছে, কিন্তু ঠান্ডা যেন নাছোড়বান্দা। গলা মুঠো করে বারবার চিৎকার করছে—
___“চাঁদ সুন্দরী—ই—ই—ই!”
কেউ সাড়া দেয় না।আবার চিৎকার—
__“চাঁদ সুন্দরী।আমার ভালো বউ ! দরজা খোল।শীত গালে অঙ্গে বউ চায় লি***!”
কুয়াশার ভেতর দিয়ে তার গলার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে। ঠান্ডা বাতাসে তার শরীর এমনভাবে বেঁকে গেছে, মনে হচ্ছে লোকটা নিজেই একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত কাঁপছে। দাঁত কাঁপছে। তবু মুখ থামছে না।

__“এই বাড়িতে কেউ মানুষ না! জামাই মানুষকে কেউ এভাবে বাড়ির বাহিরে দাড় করিয়ে রাখে ?
একটু থেমে আবার চিৎকার করে,
__“শশুড় আব্বা—আ—আ! এখন তো আমি আপনাদের বাড়ির জামাই!আমি এই বাড়িতে জামাই হয়ে এসেছি না কি শত্রু হয়ে বোঝি না তো বা*ল?”
কোনো উত্তর নেই। রোহান এবার রাগে নিজের কপালে হাত চাপড়ে বলে,
__“এই বাড়ির মানুষজন মনে হয় সবাই বিবেক বন্ধ করে ঘুমায়। একটা দরজা খুলতে এতো সময় লাগে?”
রোহান আবার হাঁটা শুরু করে। কখনো গেটের কাছে, কখনো বারান্দার সামনে। মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে
—“আরমান শালা! নিজে বউ নিয়ে প্রেম করছে আর আমাকে কুকুরের মতো বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে!”
সে হাঁটতে হাঁটতে গজগজ করে—
__“সব দোষ ওই আরমানের।শা*লা বিয়ে করেই মানুষটা পাগল হয়ে গেছে। আমাকে শাস্তি দিচ্ছে!আমি কী এমন অপরাধ করেছি।হ্যাঁ?”
ঠান্ডায় এবার তার নাক লাল হয়ে গেছে। হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে আবার চিৎকার—

__“আরমান! তুই যদি পুরুষ হোস, তাহলে দরজা খুল শা*লা! না হলে বদ দোয়া দিবো কিন্তু? এই শীতে তোর টুনটুনি অচল হয়ে যাবে শা*লা! দরজা খুল? ”
হঠাৎ সে গলা চড়িয়ে চিৎকার করে বলে,
—“এই আরমান! শুনতে পাচ্ছিস না? তোর জন্যই আমি এখানে বরফ হয়ে যাচ্ছি!”
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই।রোহান রেগে গিয়ে গালাগাল শুরু করে।
__“এমন শ্বশুরবাড়ি বানাইছি যে এসে কুকুরের মতো রাত কাটাতে হয়! এই বাড়ির মানুষজনের হার্ট নাই নাকি?”
ঠিক তখনই মিনিট পাঁচেক পর বাড়ির ভেতর থেকে শব্দ আসে। দরজার চেইন খোলার আওয়াজ। ধীরে ধীরে দরজা খুলে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরিফ খান। গায়ে উলের শাল, মুখে বিরক্তির ছাপ, চোখে ঘুমের লেশ। আরিফ খান কড়া গলায় বলেন,
__“এই রাতবিরেতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বখাটে ছেলেদের মতো চিৎকার করছো কেন?”
রোহান সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ায়।
__“ওহ! এখন দরজা খুললেন? আমি ভাবছিলাম হয়তো এই বাড়িতে মানুষ নাই, শুধু দেয়াল আছে!”
__“ বখাটে ছেলেদের মতো করো না? ”
রোহান যেন এই কথার অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ফেটে পড়ে—

__“বখাটে! বাহ! এই বাড়ির জামাইকে বখাটে বলছেন? শশুড়র বাড়ির মানবতা আজ কোথায়?”
আরিফ খান কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলেন,
__“জামাই হলেই কি এমন কাণ্ড করতে হবে?”
রোহান এক পা এগিয়ে এসে দাঁত চেপে বলে,
__“এখনো যে আপনাদের নামে জামাই নির্যাতনের কেস করি নাই, এটাই আপনাদের সাত কপালের ভাগ্য!”
এই কথা শুনে আরিফ খান চোখ বড় করে তাকান।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলেন,
__“কেস না করে আমাদের উদ্ধার করেছো বাপ।”
রোহান থেমে যায় এক সেকেন্ড। তারপর ব্যঙ্গ করে হেসে বলে,
__“উদ্ধার? আপনাদের উদ্ধারই করেছি ? আমাকে এই ঠান্ডায় দাঁড় করিয়ে রেখে আপনারা নিজেরা উষ্ণ ঘরে ঘুমাচ্ছেন—এটাই উদ্ধার?”
আরিফ খান গলা শক্ত করে বলেন,
__“এই বাড়িতে শৃঙ্খলা আছে। শাস্তি আছে।”
রোহান হাত ছুড়ে বলে,

__“এই শাস্তির আইন কে বানিয়েছে? আরমান?”
আরিফ খান ধীরে দরজা পুরো খুলে একপাশে দাঁড়িয়ে বলেন,
__“ভিতরে আসো। বাইরে দাঁড়িয়ে নাটক কোরো না।”
রোহান ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ভিতরে ঢোকে, কিন্তু মুখ বন্ধ করে না।
__“নাটক? আপনাদের ছেলের নাটক দেখেছেন আজ? আমাকে বাইরে ফেলে দিয়েছে।বাড়ির জামাই কে একটুও সম্মান দেয় নি !”
আরিফ খান হাঁটতে হাঁটতে বলেন,
__“তুমি আজ যা করেছো, তার জন্য এটা খুব হালকা শাস্তি।”
রোহান থমকে দাঁড়িয়ে বলে,
__“আমি কী করেছি?ওকে সাহায্য করেছি! ওর বউকে রুম থেকে বের করার জন্য!”
আরিফ খান ঘুরে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলেন,
__“সাহায্য আর ভয় দেখানোর মধ্যে পার্থক্য আছে, রোহান।”
রোহান গলা চড়িয়ে বলে,
__“ভয়? আমি তো ভাবিকে হিরো বানাতে চেয়ে ছিলাম!কিন্তু বটি হাতে দৌড়ালো—ওইটা তো সিনেমার দৃশ্য।আমি তো এসব করতে বলি নি !”
আরিফ খান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন,
__“এই বাড়িটা সিনেমার সেট না!”
রোহান হাত তুলে বলে,

__“ঠিক আছে, সেট না। কিন্তু আপনাদের বড় ছেলে আমাকে গেটের বাইরে রেখে দিয়েছে। এটাকে কী বলে?”
আরিফ খান ঠান্ডা গলায় উত্তর দেন,
__“শিক্ষা।”
রোহান হেসে ওঠে—একদম তিতা হাসি।
__“এই শিক্ষা যদি আমার বাবার বাড়িতে দিতো, তাহলে এই বাড়ির দরজা আজ বন্ধ থাকতো।”
আরিফ খান থেমে যান। চোখে এক ঝলক কড়া দৃষ্টি।
__“হুমকি দিচ্ছো?”
রোহান সঙ্গে সঙ্গে বলে,
__“হুমকি না। বাস্তবতা।”
দু’জনের মাঝে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।তারপর আরিফ খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
__“চলো, ভেতরে চলো। বাইরে দাঁড়িয়ে এইসব কথা মানায় না।”
রোহান আবার হাঁটা শুরু করে। ঠান্ডায় পা দুটো ঠিকমতো চলছে না। হাঁটতে হাঁটতে বলে—
__“আজ যদি আমার বউ আর মেয়েকে না দেখতাম, তাহলে সত্যিই কেস করতাম।”
আরিফ খান বিরক্ত হয়ে বলেন,

__“তোমার মেয়ে ঘুমাচ্ছে। আর বউ তোমার জন্যই রেগে আছে।”
রোহান হঠাৎ থেমে বলে,
__“জিনিয়া রেগে আছে?”
আরিফ খান কটমট করে তাকান।
___“তুমি এখনো সেটা বুঝো না?”
রোহান মাথা চুলকে বলে,
__“আমি তো শুধু একটু নাটক করেছিলাম।”
আরিফ খান গম্ভীর গলায় বলেন,
__“এই বাড়ির মেয়েদের চোখের পানি নাটকের জিনিস না।”
রোহান একটু চুপ করে যায়। তারপর নিচু গলায় বলে,
__“ঠিক আছে। একটু বেশি হয়ে গেছে।”
তারপর আবার মুখ ফিরিয়ে বলে,
__“কিন্তু ঠান্ডাটা তো আমার দোষ না!”
আরিফ খান বিরক্ত হয়ে বলেন,
__“ভিতরে এসে চা খাও। তারপর কথা হবে।”
রোহান চোখ উজ্জ্বল করে বলে,
__“চা?”
তারপর ফিসফিস করে যোগ করে,

__“এই প্রথম আপনাকে ভালো লাগছে শশুড় আব্বা।”
আরিফ খান মুখ ঘুরিয়ে বলেন,
__“বেশি কথা বলো না।”
রোহান শেষবারের মতো বলে,
__“মনে রাখবেন, আমি চুপ থাকি বলেই ঝামেলা কম। নইলে এই বাড়িতে আজ মিসাইল চলতো!”
আরিফ খান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
__“আল্লাহ, এই মাথা মোটা জামাইটাই আমার কপালে ছিল!”
দু’জন ঝগড়া করতে করতে ঘরের ভেতরে ঢুকে যায়।
কুয়াশা আর ঠান্ডা বাইরে রয়ে যায়। কিন্তু খান বাড়ির ভেতরে তখনও হাসি, বিরক্তি আর সম্পর্কের উষ্ণতা জমে থাকে।

এদিকে ঘরের ভেতর বাতাস একেবারেই আলাদা।
বাইরে কুয়াশা, ঠান্ডা আর চিৎকার—আর ভেতরে আরমান আর জারা’র মধ্যে তুমুল ঝগড়া। জারা বিছানার এক পাশে বসে আছে। গাল ফুলিয়ে, দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে। চোখে বিরক্তি, ঠোঁটে জেদ। আরমান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, হাত দুটো পকেটে ঢোকানো। মুখে সেই চেনা ঠান্ডা হাসি—যেটা দেখলেই জারা আরও রেগে যায়।
~~একটু আগের ঘটনা ~~
ঘরের ভেতরটা তখন নিস্তব্ধ, আলো-আঁধারির এক নরম আবেশ। জানালার পর্দা দিয়ে ঢুকে পড়া হালকা বাতাসে জারার লাল টুকটুকে শাড়ির আঁচল একটু একটু করে নড়ছিল। আরমানের চোখ বারবার সেদিকেই আটকে যাচ্ছিল। বউ তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে—চুল এলোমেলো, চোখে লাজুক আভা, মুখে চাপা উত্তেজনা। এমন দৃশ্য দেখেও যে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে, সে মানুষ নয়।
আরমান নিজের অজান্তেই জারাকে টেনে নিজের বুকে জাপ্টে ধরে। মুহূর্তেই চারপাশের সব শব্দ হারিয়ে যায়। দুজনের নিঃশ্বাস, বুকের ভেতরের দ্রুত ছুটে চলা হৃদস্পন্দন—সব মিলিয়ে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। জারা সামান্য কেঁপে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে আরমানের বুকের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়।মুহূর্তটা ছিল নিখুঁত, গভীর, একান্ত।
আরমান তখন পুরোপুরি রোমান্টিক মুডে। লাল শাড়ি, জারার শরীরের উষ্ণতা, পরিচিত ঘ্রাণ—সবকিছু মিলে তার সংযমের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। সে জারাকে আরও কাছে টেনে নেয়, যেন এই মুহূর্তটুকু কোনোভাবেই হাতছাড়া না হয়। ঠিক তখনই জারা বলে উঠে,

__“ আমাদের একটা বেবি হলে কেমন হতো স্বামীজান ?”
সে জারাকে ছেড়ে একটু সরে বসে। চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
—“ এই আবার শুরু করলে? ” গলার স্বরটা একটু কড়া হয়ে আসে।
একটু সময়, একটু মুহূর্ত… সেটাও কি থাকতে পারে না?জারা চমকে যায়। এমন স্বর সে আশা করেনি। আঁচলের কোণা শক্ত করে ধরে সে চুপ করে বসে পড়ে। আরমান বিরক্ত ভঙ্গিতে চুলে হাত বুলায়।
—“ এই যে আমি একদম অন্য মুডে ছিলাম বা*ল, আর তুমি এসে হঠাৎ বেবি ঢুকিয়ে দিলে। জানো, এতে মুডের বারোটা বাজে?
জারা ঠোঁট কামড়ে ধরে। চোখ নামানো, গলায় চাপা কষ্ট।ফিসফিস করে বলে,
—“ আমি তো খারাপ কিছু বলিনি… ”
আরমান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। রাগটা পুরোপুরি রাগ নয়, বিরক্তি আর অসহায়তার মিশেল।
—“ খারাপ বলছো না, কিন্তু সময়টা ভুল। সব কথার একটা সময় থাকে, বউ। এখন আমি স্বামী, প্রেমিক—সব একসাথে হতে চেয়েছিলাম। তুমি আমাকে সরাসরি বাবা বানিয়ে দিলে।
জারা লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কান গরম হয়ে ওঠে।

—“ আমি… বুঝিনি।”
আরমান একটু নরম হয়, কিন্তু ধমকের রেশটা রেখে দেয়।
—“ আগে নিজে একটু বড় হও, নিজের যত্ন নাও। তারপর এসব কথা। এখন চুপচাপ আমার কাছে আসো। আর কোথায় যেনো ছিলাম আমরা? ভুলে গেছি? আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। অবশ্য আমার জন্য ভালো ।”
আরমান জারার দিকে এগিয়ে আসে। ঘরের নরম আলোয় দু’জনের ছায়া মিলেমিশে যায়। সে জারার হাত ধরে নিজের কাছে টানে, আঙুলে হালকা চাপ। জারার শ্বাস একটু এলোমেলো হয়ে যায়। আরমান কপালের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে যেতেই জারা হঠাৎ থামে। একটু সাহস জুগিয়ে ফিসফিস করে আবার বাচ্চা নেওয়ার কথা তুলে। আরমান বিরক্ততে চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। জারার এটা দেখে বুকে আঘাত লাগে। জারা নাক টানতে টানতে বলে,

__“ আপনি তার মানে বেবি চান না?”
__“মানজারা! বার বার এক কথা শুনে ভালো লাগছে না। বুঝতে পারছিস না নাকি? এতে আমার কাজে বাদা পড়ছে। মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। আমি দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি না—আমি শুধু এখন না বলছি। সময় লাগে, প্রস্তুতি লাগে, শরীরটা আগে ঠিক হতে হবে। আবেগ দিয়ে সব হয় না। তুই কেন বুঝতে চাস না? আমি চাই বলেই তো ধৈর্য ধরছি। কিন্তু এই মুহূর্তে এই চাপ, এই জেদ—এগুলো আমাকে বিরক্ত করছে। আজ না মানে কখনো না—এমন না। কিন্তু আজ নয়। তুই যদি এখনো জোর করিস, তাহলে আমি আর কথা বাড়াব না। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি—বেবি নেওয়া এখন সম্ভব না।”
__“আপনার এই ব্যবহার… আমি আর মানতে পারছি না!”
জারা ফিসফিস করে বলল, বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ। আরমানের কপাল কুঁচকে যায়, কণ্ঠে আরও কঠোরতা।

__“তুই বুঝিস না নাকি, আমি আমার ধৈর্য হারাতে চাই না, কিন্তু তোর এই আবদার আমাকে আরও রাগাচ্ছে।মানজারা বুঝ একটু বউ আমার খুব অসুস্থি লাগছে। প্লিজ এসব কথা বাদ দিয়ে কাছে আয়। আমার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া সব কিছু গরম করে দে বউ। খুব আদর দিব তোকে পাক্কা প্রমিজ। যা একবার খেলে বার বার বার খেতে মন চায়, এমন করে।বউ কেন বুঝিস না, আমার ধৈর্যেরও সীমা আছে।”
জারা চোখের জল মুছতে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু মনে মনে আরমানের কথাগুলো আঘাত করছে। আরমান চলে আসে, ঘনিষ্ঠ হতে চায়, কিন্তু স্পর্শ করতে যাওয়ার আগে হঠাৎ জারা ধীরে ধীরে আরমানকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়, হাত রেখে দূরে ঠেলে। চুপচাপ বসে থাকে, চোখে হাহাকার, মুখে লজ্জা আর মন খারাপের ছাপ। আরমান কিছুটা বিরক্ত হয়, কিন্তু বুঝতে পারে—জারার হৃদয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জারার শরীর থেকে দূরে থাকলেও, মনে মনে আরমানও কষ্ট অনুভব করে, কারণ তার কথা যেন বারবার ওর কাছে আঘাত হয়ে ফিরে আসে। আরমান বউয়ের রাগ, খাবার লাগা বোঝতে পারে। তাই বউকে একটু স্বাভাবিক করতে আরমান গম্ভীর গলায় বলে,
__“শোনো মানজারা! আমি আগেই বলছি। তোমার ওজন যদি আগের থেকে পাঁচ কেজি বাড়ে, তাহলেই বেবি নেওয়ার প্ল্যান করব। না বাড়লে—এই টপিক এখানেই শেষ।”
জারা সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।

__“ সত্যি…? ”
__“ হুমমম! ”
__“ তাহলে তো পাক্কা আমি আজ আপনার কাছ থেকে বেবি নিয়েই ছাড়ব। কারণ আমার নিজের উপর বিশ্বাস আছে। আমার ওজন অনেক বেড়েছে।”
জারদর এতো আত্নবিশ্বাস দেখে আরমান কটাক্ষ করে বলে,
__“ এই পাঠ কাঠি শরীরে আবার ওজন বাড়বে? ”
গাল আরও ফুলে ওঠে।
__“কি? আমার ওজন বাড়েনি বলতে চাচ্ছেন?”
আরমান মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। জারা নিজের দিকে তাকিয়ে, শাড়ির আঁচল ঠিক করে বলে,
___“আমি তো সাহেলা আন্টির মতো মোটা হয়ে গেছি! দেখুন না ভালো করে!”
আরমান মাথা কাত করে, চোখ চিকন করে জারাকে দেখে।সে নির্লিপ্তভাবে বলে—
__“কই?আমি তো কিছুই দেখছি না।”
এই কথায় জারা যেন আগুন।সে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
__“আপনি তো কানা! চোখে দেখেন না! আমার দিকে ভালো করে তাকালে ঠিকই দেখতে পেতেন, হুমম!”
আরমান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। জারার সামনে দাঁড়িয়ে, খুব শান্ত ভঙ্গিতে তার ঠোঁটের এক কোণে আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে বলে,

__“আমি তোমাকে যে ভাবে, যে নজরে দেখি…
তুমি যদি সেটা আন্দাজ করতে পারতে— তাহলে আমার সামনে এই লাল টুকটুকে শাড়ি না পরে লোহার কাপড় পরে আসতে।”
জারা কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে ওর চোখ বড় হয়ে যায়। বুক ধড়ফড় করে। সে আরমানের বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে বলে,
—“অসভ্য! নির্লজ্জ লোক একটা! আপনার নজর এত খারাপ, আমি সত্যিই জানতাম না!”
আরমান একটুও বিচলিত হয় না। বরং হালকা হাসে।সে ঠান্ডা গলায় বলে—
__“বউদের দিকে স্বামীর দৃষ্টি সবসময়ই খারাপ থাকে।আমার বলেও তা ভিন্ন নয় । আমাকে বকো। মারো। তবুও এই দৃষ্টি ভালো করব না।”
জারা আর কিছু বলতে পারে না।এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। শ্বাসের শব্দ ভারী হয়ে আসে। তারপর হঠাৎই গলার স্বর নরম হয়ে যায়।
__“ও স্বামীজান…?”
আরমান চোখ তুলে তাকায়।
__“হুমম?”
জারা একটু লজ্জা, একটু জেদ, একটু আবদার মিশিয়ে বলে—

__“আমার কিন্তু বেবি লাগবেই।”
এইবার আরমানের মুখের ভাব বদলে যায়। হাসি মিলিয়ে গিয়ে গম্ভীর হয়ে ওঠে।সে স্পষ্ট করে বলে—
__“তাহলে,ওজন মাপার মেশিন নিয়ে এসো।”
একটু থেমে আবার বলে,
__“পঁয়তাল্লিশ কেজি না হলে খবর আছে।”
এই কথা শুনে জারা যেন খুশিতে উতফুল্ল।চোখ চকচক করে ওঠে। সে হেসে বলে,
__“আচ্ছা!”
এই বলে সে প্রায় দৌড়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, ওজন মাপার মেশিন আনতে। আরমান একা ঘরে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে অদ্ভুত এক হাসি।সে নিজের মনেই বলে,
__“এই মেয়েটা…একদম পাগলী। লক্ষী বউ আমার। অল্পতেই কতো খুশি। কিন্তু টিকবে না ।”
কিছুক্ষণ পরেই জারা ফিরে আসে। হাতে সেই পুরনো ওজন মাপার মেশিন। সে মেশিনটা মেঝেতে রেখে বলে
—“দেখুন এবার!”
আরমান চেয়ারে বসে, হাত গুটিয়ে বলে,
__“মাপো।”
জারা জুতো খুলে, শাড়ির আঁচল সামলে মেশিনের ওপর দাঁড়ায়। এক চোখ বন্ধ, এক চোখ খোলা।
কাঁটা নড়েচড়ে ওঠে। হঠাৎই—“টক!”মেশিনটা কাঁপে, তারপর একদম থেমে যায়। জারা ভ্রু কুঁচকে তাকায়।

__“এইটা কী?”
আরমান উঠে এসে মেশিনে পা দিয়ে দেখে।
__“অচল।”
জারা অবাক।
__“মানে?”
আরমান নির্লিপ্তভাবে বলে,
__“মানে,তোমার বেবির প্ল্যানও আপাতত অচল।”
জারা হতভম্ব।ওজন মাপার কাঁটাটা ধীরে ধীরে থেমে গেল। ঘরটা হঠাৎ খুব নীরব হয়ে উঠল। জারা নিচে তাকিয়ে রইল। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর ফিসফিস করে বলল
—“মাএ দুই কেজি…?”
আরমান কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। জারা আবার কাঁটার দিকে তাকাল। যেন বিশ্বাস করতে চাইছে না।

__“শুধু… দুই কেজি?”
এইবার তার গলাটা কেঁপে উঠল। চোখের কোণে পানি জমতে শুরু করল। সে হঠাৎ করেই শাড়ির আঁচল টেনে মুখ ঢেকে ফেলল। “ফেস… ফেস…” নিশব্দে কাঁদতে শুরু করল। কান্নাটা খুব জোরে না, কিন্তু এমন— যেটা দেখলে বুকের ভেতর মোচড় দেয়। আরমান এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে গেল।
এই মেয়ে কি নিজের শরীরের কন্ডিশন বোঝে না?
এত যে “বেবি, বেবি” করে— বেবি হলে তো তাকে সামলাতে গিয়েই নিজেই উল্টে পড়বে। খাবার ঠিকমতো খায় না। ঘুম ঠিকমতো হয় না। একটু কষ্ট হলেই ভেঙে পড়ে। এসব কথা তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। কিন্তু মুখে আনে না। সে জানে— এই কথাগুলো বললেই জারা ঝড় তুলবে। কান্না দ্বিগুণ হবে।
আরমান ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার ধারে বসে।জারা তখনো আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছে। নাক টানার শব্দ হচ্ছে। আরমান হালকা বিরক্তির সুরে, কিন্তু চোখে মায়া রেখে বলে—
__“এই যে… হাফ ইঞ্চি বউ? ”
বলে আরমান আলতো করে জারার আঁচলটা নামিয়ে দেয়।
__“এই শাড়ির আঁচলটা স্বামীকে বেঁধে রাখার জন্য,নাক পরিষ্কার করার জন্য না।”
এই কথা শুনে জারা হঠাৎ থেমে যায়। এক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে থাকে। তারপর লজ্জায় হাসফাস করতে থাকে। লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে।
__“আপনিও না…”
কান্নার মাঝেই ঠোঁট কেঁপে হাসি আসে। আরমান ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের পানি, লাল হয়ে থাকা নাক— সব মিলিয়ে জারাকে আরও ছোট, আরও নরম লাগছে।

__“এদিকে তাকাও,”
আরমান নরম গলায় বলে।জারা ধীরে তাকায়। মুখে লাজুক আবাস।
__“আমার কাছে আসো, লজ্জা পাওয়ার ব্যস্তা করে দিই।”
জারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরমান ওকে টেনে নেয়। জাপ্টে ধরে বিছানায় শুইয়ে ফেলে।হঠাৎ এই নড়াচড়ায় জারার বুক ধক করে ওঠে।সে অস্পষ্ট স্বরে বলে—
__“এই…!কি করছেন?”
আরমান উত্তর দেয় না। শুধু ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। জারার মাথাটা তার বুকের ওপর এসে পড়ে কানের কাছে হৃদস্পন্দনের শব্দ। ধুকধুক…ধুকধুক…
জারা চুপ হয়ে যায়। এই বুকের শব্দটা সে চেনে। এই নিরাপত্তাটা সে চেনে।
__“দুই কেজি মানেই কিছু না?”
আরমান ধীরে বলে
—“শরীরটা সুস্থ থাকাই বড় কথা।বেবি কোনো খেলনা না, মানজারা।”
জারা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর আস্তে বলে,

__“ কিন্তু আমি ভয় পাই না স্বামীজান ।”
আরমান হালকা হেসে ওর কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
__“আমি পাই,তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে আমি ভয় পাই।”
জারার চোখ ছলছল করে ওঠে।সে গলা ভারী করে বলে,
__“আপনি এমন করে বললে, আমার কান্না আরও আসে।মনে হয় আপনাকে খুব কষ্ট দিচ্ছি আমি। অপরাধী মনে হয় নিজেকে ।”
আরমান ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। জারা কপালে ছোট ছোট চুল গুলো কানের পিছনে ঘুজে দেয়। ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে বদলে যায়। কুয়াশার ঠান্ডা যেন জানালার বাইরে আটকে থাকে। ভেতরে শুধু উষ্ণতা। জারা হঠাৎ মাথা তুলে বলে,
—“আপনি আমাকে আবাল বলছিলেন মনে মনে, তাই না?”
আরমান থমকে যায়।সে অবাক হয়ে বলে,

__“কি করে বুঝলে?”
জারা নাক কুঁচকে বলে,
—“আপনার চোখ এমন সময় সব বলে দেয়।”
আরমান হেসে ফেলে।
__“আবালই তো,আমার বউ বলে কথা।”
জারা ঠোঁট উল্টে বলে—
__“তাই বলে এমন?”
আরমান শান্ত স্বরে বলে,
—“এমনই,কারণ তুমি আমার আবাল বউ।”
জারা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে হাত বাড়িয়ে আরমানের পাঞ্জাবির বোতামটা আঁকড়ে ধরে।সে ফিসফিস করে বলে,
__“ও স্বামীজান?”
__“হুমমম?”
__“আমি ভয় পাই না সত্যি,”
আরমান বুকের ওপর হাত রেখে বলে

—“ আমি চাই তুমি ভয় পাও। এসব রেখে আর একটু কাছে আয় জান। খুব বউ বউ পাচ্ছে আমার। এখন এই শীতের রাতে বউ বিলাস না করলে শীত কাল কলঙ্কের হবে। ”
জারা লাজুক তবুও খিলখিল করে হেসে উঠে। দুজনের মাঝখানে আর কোনো কথা থাকে না। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। উষ্ণতা। আর একে অপরের উপস্থিতি। আরমান জারার দিকে মনোযোগী চোখে তাকাল। শীতের রাত, রুমের নরম আলো, ফুলের সুবাস—সবকিছু যেন তাদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তকে আরও উষ্ণ করে তুলেছে। জারা লাজুক তবু খিলখিল করে হাসল। দুজনের মধ্যে আর কোনো শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের হালকা ছন্দ, স্পর্শের উত্তেজনা, এবং একে অপরের উপস্থিতির উষ্ণতা।
আরমান ধীরে ধীরে জারার কোমর ধরে আঁকড়ে ধরল। জারার শরীর স্বাভাবিকভাবে তার দিকে ঝুঁকছে। শাড়ির মলাট হালকা করে সরানো হলো, আরমানের চোখে গভীর আকর্ষণ। নিঃশ্বাস মিলেমিশে একটি আবেশ তৈরি হচ্ছে। জারা লাজুক হলেও তার চোখে উষ্ণতা, ঠোঁটে অল্প হাসি।
তার হাত জারার গাল ধরে, গায়ে স্পর্শ। জারার হৃদয় কাবু হয়ে গেল। আরমানের নিঃশ্বাস, স্পর্শের তীব্রতা এবং শরীরের উত্তেজনা—আরমান শাড়ির আঁচলকে ধীরে সরিয়ে দিল, জারার কোমল গায়ের ঘ্রাণে সে উন্মাদ হয়ে উঠলো। জারা শিহরণে কণ্ঠে বললো,

—“সাবধান স্বামীজান ।”
নিজের কাজে বাদা পেয়ে আরমান বিরক্ত হয়ে জারা’র গারে কামড় বসিয়ে দেয়। জারা হালকা চিৎকার করল, আনন্দ আর নরম ব্যথা একসাথে অনুভব করে।
__“ আহ্ ব্যথা লাগে স্বামীজান! ”
আরমান সে সব কথা কানে নেয় না। কিন্তু তার গলায় উচ্ছ্বাস এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। আরমান গালের কাছে নাক ঘষে দিল, হালকা চুমু দিল, আর জারার কোমল গায়ে আবার কামড় দিয়ে বললো,
—“শীতে একটু স্পর্শেই ব্যথা হবে, বউ। তুমি এটি সহ্য করে নাও, এই ব্যথায় আনন্দ পাবে বউ।”
জারা হাত দিয়ে আরমানকে টেনে আরও কাছে টেনে নিলো। দুইজনের শরীর একে অপরের সঙ্গে মিলিত, নিঃশ্বাস মিলিত, উষ্ণতা ছড়িয়ে রুমে আবেশ তৈরি করল। আরমান ধীরে চুমু দিল, কপালে, গালের কাছে, চোখে চোখ মিলিয়ে। জারা বারবার কাবু হয়ে গেলো, উষ্ণতার ছোঁয়া ও নিঃশ্বাসের ছন্দে সে হারিয়ে গেলো। আরমানের চোখে প্রেমের স্ফুলিঙ্গ।
তাদের নিঃশ্বাস, স্পর্শ এবং শরীরের উত্তেজনা একে অপরের প্রতি আকর্ষণ আরও দৃঢ় করছে। জারা আরমানের কাছে লিপ্ত, আরমান আলতো করে তার কপালে চুম্বন দিয়ে ভালোবাসার নিঃশ্বাস ছড়াচ্ছে। রোমান্টিকতা, উষ্ণতা এবং ঘনিষ্ঠতার এই মুহূর্ত যেন তাদের হৃদয়কে এক অবিস্মরণীয় আবেশে ডুবিয়ে দিয়েছে।

সময় পেরিয়েছে অনেক দিন। দেখতে দেখতে প্রায় পাঁচ মাস। এই সময়টার ভেতর দিয়ে জারা ধীরে ধীরে বদলে গেছে—শরীরেও, মনেও। আগের মতো দুর্বল নেই সে। আরমান নিজের দায়িত্বে জারাকে নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, ওষুধ খাওয়ানো, ঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া—সবই করেছে। বাড়ির সবাই পাশে আছে, তবু সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা যেন আরমানই কাঁধে তুলে নিয়েছে।
আরমান আগেই বলে রেখেছিল—যদি জারা নিজের ওজন আর স্বাস্থ্য ঠিকভাবে বাড়াতে পারে, তবেই তারা বাচ্চার কথা ভাববে। সেই কথাটাকে জারা হালকা করে নেয়নি একদমই। বরং অদ্ভুত এক জেদ নিয়ে সে নিজেকে বদলাতে শুরু করে। নিয়ম করে ডাক্তার দেখানো, সময়মতো ওষুধ খাওয়া, ঠিকঠাক খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম—কোনো অনিয়মই রাখেনি।

শুরুর দিকে কষ্ট লাগলেও ধীরে ধীরে শরীর সাড়া দিতে শুরু করে। আয়নায় তাকালে নিজেকেই নতুন লাগে তার। আগের সেই ফ্যাকাসে মুখটা নেই আর। গালে রক্ত চলাচল বেড়েছে, ত্বকে এসেছে আগের থেকে বেশি উজ্জ্বলতা। সবচেয়ে বেশি বদলেছে জারার গাল দুটো—টমেটোর মতো টুকটুকে আর ফোলা ফোলা।
আরমান সেটা প্রথম খেয়াল করেছিল। তারপর থেকে যেন সেটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে। সুযোগ পেলেই জারার গাল টেনে দেয়, কখনো দুপাশ থেকে চেপে ধরে, কখনো মজা করে বলে—“ এই গাল দুটুর আলাদা করে যত্নে রাখতে হবে।চুমু খাওয়ার জন্য শুধু। ” জারা প্রথমে লজ্জা পায়, পরে রাগ দেখায়, আবার শেষমেশ নিজেই হেসে ফেলে। ওর ভেতরে এক ধরনের তৃপ্তি কাজ করে—আরমানের চোখে নিজের এই বদলটা ধরা পড়ছে, সেটাই যেন সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
জারার শরীর এখন আগের তুলনায় ভালো। স্বাস্থ্য ফিরছে ধীরে ধীরে। তবু তাকে দেখলে এখনো গুলোমুলো লাগে। যেন শরীরটা নিজের মতো ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে সময় নিচ্ছে। আর এই সময়েই রিয়াত পুরো বাড়িতে দৌড়ে বেড়ায়। ছোট্ট পা,উচ্ছ্বাসে ভরা হাসি—তার পেছনে কখনো দাদু’রা, কখনো জারা ‘রা। বাড়িটা যেন সারাক্ষণ প্রাণে ভরপুর।

সন্ধ্যার দিকে জারা শাশুড়ির রুমে এসে বসে। ফারিয়া বেগম তখন চেয়ারে বসে মাগরিবের পরের হালকা বাতাস নিচ্ছেন। জারা পাশে বসে গল্প জুড়ে দেয়—কখনো রিয়াতের দুষ্টুমি, কখনো রান্নাঘরের কথা, কখনো নিছকই কিছু না। কথাগুলো স্বাভাবিক হলেও জারার ভেতরটা অদ্ভুত অস্থির।
কেন জানি আজকাল কিছুই ভালো লাগে না তার। মনটা সারাক্ষণ বিরক্তিতে ভরা। সামান্য কথাতেই মুড বদলে যায়। নিজেরই অবাক লাগে—কেন এমন হচ্ছে? আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, আরমান যেন এখন তার চোখের বিষ। লোকটার কথা শুনলেই বিরক্ত লাগে। পাশে থাকলে অকারণ রাগ জমে ওঠে। অথচ আরমান আগের মতোই—শান্ত, সহনশীল, যত্নশীল।
আরমান এসব বুঝেও কিছু বলে না। চুপচাপ সহ্য করে যায়। জারার মুড সুইং, বিরক্ত মুখ, কথা না বলা—সবকিছু।সে ভাবে হয়তো তার কোনো ভুল, সময় দেয় না বলে বউ এমন রাগ করে।তবুও সে জারা’র সাথে উচু গলায় কথা বলে না। সবসময় আগলে রাখে, জারা দোষ করলেও, আরমানের সাথে চিল্লাপাল্লা করে। এসবকিছু সহ্য করে নেয়। যেন জানে, এই সময়টা ঝড়ের মতো, কেটে যাবে।
ফারিয়া বেগম এসব খেয়াল করেন। তিনি শুধু শোনেন, দেখেন। কিছু বলেন না। কারণ তিনি জানেন, কিছু সময় প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অপেক্ষা করাই ভালো।
গল্প শেষ করে জারা যখন রুম থেকে বেরোতে যায়, হঠাৎ মাথাটা ঘুরে ওঠে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসে। দরজার পাল্লা শক্ত করে ধরে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দেয়। বমি বমি ভাব উঠে আসে। ঠিক তখনই ফারিয়া বেগম বিষয়টা বুঝতে পেরে দ্রুত এগিয়ে আসেন। জারাকে ধরে বসান। কণ্ঠে উদ্বেগ, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক সতর্কতা।

—“কি হইছে মা?”
জারা মাথা নিচু করে ধীরে বলে,
—“জানি না আম্মু… আজকাল কিছুই ভালো লাগে না। সারাক্ষণ বিরক্ত লাগে। আর বমি আসে।”
এই কথায় ফারিয়া বেগমের মনে কেমন একটা খটকা লাগে। বুকের ভেতরে যেন পুরোনো কোনো স্মৃতি নড়ে ওঠে। তিনি কিছু প্রকাশ করেন না। শুধু শান্তভাবে জারার চোখে-মুখে পানি দেন। তারপর নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেন। জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তিনি লক্ষ করেন—এই ক্লান্তি, এই বিরক্তি, এই অস্বস্তি—সবই খুব পরিচিত। অনেক বছর আগে তিনি নিজেও এমনটাই অনুভব করেছিলেন।
জারা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। শরীরটা হালকা লাগে, আবার ভারীও। মাথায় ফারিয়া বেগমের হাতের উষ্ণতা তাকে একটু শান্ত করে।

ফারিয়া বেগম মনে মনে কিছু একটা ভেবে মৃদু হেসে ওঠেন। সে হাসি বাইরে প্রকাশ পায় না। তিনি জানেন, এখনই কিছু বলা ঠিক হবে না। সময় হলে সব নিজে থেকেই পরিষ্কার হবে।
রাতে অফিস থেকে ফিরে আরমানের শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত। দিনের পর দিন কাজের চাপ, মিটিং, হিসাব—সব মিলিয়ে মাথাটা ভার হয়ে আছে। গেট পেরিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকতেই ক্লান্তি কিছুটা হালকা হয়ে যায়। ঘরের ভেতর একটা আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য। ফিহা আর জেরিন মেঝেতে বসে খেলনা ছড়িয়ে রিয়াতকে নিয়ে খেলছে। ছোট্ট রিয়াত কখনো দৌড়াচ্ছে, কখনো হেসে গড়িয়ে পড়ছে।
আরমানকে দেখামাত্রই রিয়াতের চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। খেলনা ছেড়ে দিয়ে টলমল পায়ে দৌড়ে আসে। এসে আরমানের পা জড়িয়ে ধরে, মাথা তুলে আদো আদো গলায় বলে ওঠে,
__“তাত্তু!”
আরমান হেসে নিচু হয়ে রিয়াতকে কোলে তুলে নেয়। গালে আলতো করে চুমু খায়, নাকে নাক ঠেকায়। রিয়াত খিলখিল করে হেসে ওঠে। এই ছোট্ট ছেলেটা রাশেদের হলেও আরমানের সঙ্গে তার একটা অদ্ভুত আত্মিক টান তৈরি হয়ে গেছে। রাশেদ পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের এই কাণ্ড দেখে মুচকি হাসে। জাহেদও সবে এসে দাঁড়িয়েছে।
কিছুক্ষণ রিয়াতকে নিয়ে দুষ্টুমি করে আরমান। তার পর তাকে ফিহার কোলে দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। কিন্তু আজ অদ্ভুত ব্যাপার—বউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। নিচে নেই,ড্রইংরুমেও নেই। কয়েকদিন ধরেই জারার আচরণ সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। কখনো খুব চুপচাপ, কখনো হঠাৎ বিরক্ত, আবার কখনো এমন ক্লান্ত যেন সবকিছু তার ওপর ভার হয়ে এসেছে।
রুমে ঢুকে আরমান ফ্রেশ হয়ে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটার দিকে তাকায়। ভেতরে ভেতরে একটা অজানা চিন্তা তাকে ঘিরে ধরে। কাপড় বদলে নিচে নেমে আসে। ছোট আম্মুকে দেখে প্রশ্ন করে,

__“মানজারা কোথায়?”
ছোট আম্মু মৃদু হেসে বলে,
__“তোর মায়ের ঘরেই আছে। একটু অস্বস্তি লাগছিল।”
এই কথা শুনেই আরমানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। সে আর দেরি না করে ধীর পায়ে উপরে উঠে যায়। মায়ের রুমের দরজায় এসে থেমে যায়। ভেতরের দৃশ্যটা দেখে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
জারা গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো আধবোজা। ফারিয়া বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। সেই স্পর্শে জারার মুখটা একটু শান্ত দেখাচ্ছে। এই দৃশ্যটা আরমানের কাছে অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগে। নিজের অজান্তেই বুকের ভেতরটা নরম হয়ে আসে। এই বাড়িতে তার বউ নিরাপদ, আদরে ঢাকা—এটাই তার সবচেয়ে বড় শান্তি।
আরমান ধীরে সামনে এসে দাঁড়ায়। ফারিয়া বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন।
__“কী রে, দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আরমান একটু লাজুক গলায় বলে,
__“আম্মু… আমার বউটাকে কি এখন নিয়ে যেতে পারি?”
ফারিয়া বেগম হেসে বলেন,

__“পাঁজি ছেলে একটা। নিয়ে যা, তোর বউকে।”
এই কথায় আরমানের মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে এগিয়ে গিয়ে জারাকে কোলে তোলে। জারা চোখ মেলে তাকায়, একটু অবাক হয়, আবার কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে দেয়। আরমান খুব সাবধানে তাকে নিজের রুমে নিয়ে আসে। যেন তার শরীরটা কাচের তৈরি—একটু জোর হলেই ভেঙে যাবে।
বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আরমান নিজেও পাশে শুয়ে পড়ে। জারাকে বুকে টেনে নেয়। কোনো কথা বলে না। শুধু অনুভব করে তার নিঃশ্বাস, শরীরের উষ্ণতা।জারা ক্লান্ত হলেও এই নিরাপত্তার ভেতর নিজেকে ছেড়ে দেয়।
আজ সে খুব ক্লান্ত। শরীরটা যেন কথা শুনছে না। আরমান বুঝতে পারে, এই ক্লান্তি শুধু শরীরের না—মনেরও। সে জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কোনো প্রশ্ন করে না, কোনো উপদেশও না। শুধু পাশে থাকে।
জারা চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। বুকের ভেতরটা কেমন এলোমেলো। নিজের অজান্তেই হাতটা আরমানের শার্ট আঁকড়ে ধরে। আরমান সেটা টের পায়। আরও কাছে টেনে নেয় তাকে। এই নীরবতা, এই ঘনিষ্ঠতা—এটাই এখন তাদের প্রয়োজন। জারা তার বুকে মাথা রেখে শান্ত হয়ে আসে। আজকের রাতটা কোনো প্রশ্নের না, কোনো সিদ্ধান্তের না। শুধু বিশ্রামের। শুধু নিরাপত্তার। শুধু একে অপরের পাশে থাকার।

পরের দিন সকালবেলা। ভোরের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকেছে। ঘরের ভেতরটা শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির মাঝেও এক ধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করছে। আরমান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছে। শার্টের বোতাম লাগানো শেষ, প্যান্ট পরা, এখন শুধু টাই বাঁধা বাকি। জারা সামনে এসে দাঁড়ায়। খুব মনোযোগ দিয়ে আরমানের গলায় টাই বেঁধে দিচ্ছে। হাতের আঙুলগুলো একটু কাঁপছে। মুখটা ভার হয়ে আছে—চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে চাপা অভিমান।
আরমান সেটা লক্ষ্য করে। টাই বাঁধা শেষ হতেই জারাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। বুকে জড়িয়ে ধরে নরম গলায় বলে,
— “কি হয়েছে বউ?”
জারা মুখ তুলে তাকায় না। গলা ভারী হয়ে আসে। —“আমি লক্ষ্য করছি, আপনি আমাকে আগের মতো ভালোবাসেন না।”

এই কথা শুনে আরমানের মনে হয়, সে যদি পারত, নিজের মাথা নিজেই মাটিতে ঠুকিয়ে দিত। প্রতিদিন, ঠিক প্রতিদিনই এই একই কথা। সে বাড়িতে না থাকলেও ফোনে শোনে, থাকলেও শোনে। যত ব্যস্তই থাকুক, যত ক্লান্তই থাকুক—এই অভিযোগটা যেন জারার নিয়মিত অভ্যাস হয়ে গেছে।
আরমান ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে।বউ তার ভালোবাসার দিকে আঙ্গুল তুলে। সে হতাশ হয়, কিন্তু সেটা দেখায় না। জারার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলে,
— “আমি আমার বউকে খুব ভালোবাসি। এমন ভালোবাসি, যা কখনো পরিমাপ করা যায় না। কোনো শব্দে প্রকাশ করা যায় না।”
কিন্তু জারা ঠিক উল্টোটা ধরে নেয়। গাল ফুলিয়ে বলে,
— “শব্দে প্রকাশ করেন না বলেই তো আমাকে আপনি ভালোবাসেন না। এই কথা আবার স্বীকারও করলেন, শয়তান লোক।”

আরমান আর পারে না। নিজের কপালে এক থাপ্পড় মারে। হতাশ হয়ে কোনো কথা না বলে রুম থেকে বের হয়ে যায়। নিচে গিয়ে নাস্তা করে। রাশেদ আর জাহেদ নাস্তা শেষ করে। তিনজন একসাথে অফিসের জন্য বের হয়ে যায়।
পেছনে পড়ে থাকে জারার ভারী মন। দুপুরের দিকে বাড়িটা আবার একটু প্রাণ ফিরে পায়। রিয়াত ঘরের ভেতর ছোটাছুটি করছে। জারা মেঝেতে বসে ওর সাথে খেলছে। পাশে ফিহাকে শর্ত দিয়ে বসিয়ে রেখেছে—যেন সে কোথাও না যায়।ওর একা থাকতে ভালো লাগে না। ফিহা মুখ গুমড়া করে বসে আছে। সেই কখন তার হিসু** পেয়েছে। জারা’র শর্তের জন্য উঠতে পারছে না । জারা’র হাতে আচার, মাঝে মাঝে আচার মুখে দিচ্ছে, মাঝে মাঝে রিয়াতকে খেলা দেখাচ্ছে।
মিম তখন ফারিয়া বেগমের সাথে রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। রিয়াতকে সামলানোর কোনো চিন্তা নেই—পুরো বাড়ি তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

হঠাৎ করেই জারার পেটটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। মুখে অদ্ভুত একটা স্বাদ আসে। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সে উঠে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু মাথা ঘুরে যায়। দৌড়ে বেসিনের দিকে যেতে গিয়েই বমি করে ফেলে। শরীরটা দুর্বল হয়ে আসে। পা আর সাপোর্ট দিতে পারে না। সে সোজা ফ্লোরে পড়ে যায়।
ফিহা সব দেখে দৌড়ে আসে। জারাকে ধরে ফেলে, চিৎকার করে সবাইকে ডাকে। সেই মুহূর্তেই জারা ফিহার গায়ের ওপরেও বমি করে দেয়। কিন্তু ফিহা একটুও বিচলিত হয় না। নিজের কাপড়ের কথা ভুলে গিয়ে জারাকে শক্ত করে ধরে রাখে। মিম, ফারিয়া বেগম, জেসমিন বেগম —সবাই ছুটে আসে।
জারাকে ধরে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ফ্রেশ করানো হয় তাকে। পরিষ্কার কাপড় পরানো হয়। বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হয়। ঘরের ভেতরটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত রকম নীরব হয়ে যায়। জারার পাশে সবাই বসে থাকে।ফারিয়া বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। মুখে চিন্তার রেখা, কিন্তু চোখে অন্য কিছু—একটা পরিচিত অনুভূতি। তিনি পরিবারের ডাক্তারকে ফোন করেন। ডাক্তার বলেন, তিনি আসছেন। এই অপেক্ষার সময়টা যেন কারো কাছেই সহজ না। ফিহা বিছানার পাশে বসে আছে, জারার হাত ধরে। মিম বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। ফারিয়া বেগম চুপচাপ বসে আছেন, কিন্তু তার চোখে চিন্তার সাথে সাথে একটা মৃদু আশা লুকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে পৌঁছান। চেক-আপ করেন। প্রেসার, পালস—সব দেখেন। জারার দিকে ভালো করে তাকান।

__“ পিরিয়ড হয়েছে এই মাসে? ”
জারার শরীর দূর্বল থাকলেও আনন্দের শহীদ খুশিতে গদগদ হয়ে উত্তর দেয়,
__“ দুই মাস ধরে হয় না। কি যে ভালো গালে আমার। পিরিয়ডের ব্যথা নেই। কোনো ঝামেলা নেই! আহ্ শান্তি । ” ওর কথার ধরণ বলে দিচ্ছে সে পিরিয়ড না হওয়ার খুশিতে নাচতে চাইছে এখন।
জারা’র কথা শুনে ভেবাচেকা খেয়ে যায়। বলে কি মেয়ে। ফারিয়া বেগম যেনো বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
__“ কি বলছিস এসব তুই জারা? ”
জেসমিন বেগম একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,
__“ এই মেয়ে একথা আমাদের জানাস নি কেনো?”
জারা বলে,
__“ কি জানাবো? ”
ওর কথা শুনে সবার মন চাচ্ছে পানিতে জাপ দিতে। ডাক্তার সব শুনে তারপর ব্যাগ থেকে একটা ছোট প্যাকেট বের করেন। বেবি কিট। বললেন,
— “এটা পরীক্ষা করতে হবে।”

ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন বাতাস থেমে যায়। সবাই অদ্ভুত ভাবে জারার দিকে তাকায়। জারা নিজেও একটু অবাক হয়। মিম আর ফিহা জারাকে ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হয়।
বাইরে সবাই অস্থির হয়ে বসে থাকে। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে। কারো চোখে ভয়, কারো চোখে আশা, কারো চোখে অজানা আনন্দের ঝিলিক।
ফারিয়া বেগম চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়েন।
মিনিট পাঁচ… দশ… সময়ের প্রতিটা সেকেন্ড যেন ভারী হয়ে আসে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৪ (২)

তারপর দরজার খুলার শব্দ হয় । জারা ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে। হাতে ছোট্ট একটা কিট। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখ দুটো ভেজা। সবাই একসাথে উঠে দাঁড়ায়।
ঘরের ভেতর নিঃশ্বাসের শব্দও যেন শোনা যায়।
জারা কয়েক কদম এগিয়ে আসে। তার হাতে ধরা কিটটাই যেন এই মুহূর্তে পুরো ঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। সবাই তাকিয়ে থাকে। ফলাফলের দিকে।

রৌদ্রময় বালুচর পর্ব ৭৫ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here