প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৪
বন্যা সিকদার
”আপনাকে বলেছি না‚ আসবেন না আমার কাছে। তবুও কিসের অধিকারে আসেন? আব্বু চলো‚ এনার একটা কথাও শুনবো না আমি।
উজান মৌ’য়ের কোনো বারণ‚ কোনো নিষেধের তোয়াক্কাই করল না। সে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে মৌ’য়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। তার দুই হাত দিয়ে মৌ’য়ের কাঁধ চেপে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত কাতর স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
“পিচ্চি ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। প্লিজ‚ এমন পাগলামি করো না। আমি তোমায় ছাড়া কীভাবে থাকব‚ বলো তো? চলে যেও না প্লিজ। তোমার যা চাই‚ তুমি যা আবদার করবে সব এনে দেবে এই উজান চৌধুরী‚ তবুও আজ এভাবে চলে যেও না প্লিজ।
মৌ উজানে’র এই আকুল মিনতির একটি কথাও কান দিয়ে শুনল না। তার মনের ভেতর জমে থাকা অভিমানের পাহাড় আজ তাকে বড্ড অন্ধ করে তুলেছে। সে জেনেশুনে দরজার দিকে পা বাড়াতেই উজান এক বিশাল দেয়াল বা ঢাল হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। মৌ ওপাশ দিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করল কিন্তু যখন দেখল সব চেষ্টা বৃথা যাচ্ছে‚ তখন সে নিজের জেদ ধরে রাখতে এক অভাবনীয় কাণ্ড করল। নিজের গায়ের বেনারসি শাড়ির আঁচলটা কোমড়ে শক্ত করে গুঁজে নিয়ে সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে উজান’কে এক ধাক্কা দিল।
কিন্তু উজান মৌ’য়ের সেই পুতুলের মতো ধাক্কায় এক চুল পরিমাণও নিজের জায়গা থেকে সরল না। উল্টো সে মৌ’য়ের দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখল।
ঠিক তখনই মৌ’য়ের বাবা দীর্ঘ পা ফেলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিজের শ্বশুরমশাইকে সামনে দেখেই উজান চট করে মৌ’য়ের হাত ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বিনয়ের সাথে সালাম ঠুকল।
“আসসালামু আলাইকুম শ্বশুর আব্বা।
মৌ’য়ের বাবা জামাতার এই আকস্মিক রূপ দেখে মনে মনে বেশ চমকালেন। ছেলেটি ঝড়ের গতিতে ঘরে এলো কখন‚ ভাঙচুর করল কখন‚ আর এখন এমন সাধু সেজে সালাম দিচ্ছে। তিনি নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে সোজাসাপ্টা বলতে লাগলেন।
”উজান বাবা‚ আমি একজন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী মানুষ। আমি সত্যিই আগে জানতাম না যে‚ তুমি আমার এই মেয়েটাকে সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় আর পরিস্থিতির চাপে পড়ে বিয়ে করেছ। মনে রেখো বাবা‚ আমার মেয়ে আমার মাথার বোঝা নয়‚ ও আমার মাথার মুকুট। আর আমি বেঁচে থাকতে কখনোই আমার মুকুটের সম্মানহানি হতে দেবো না।
আমার মেয়েটাকে তোমার মনে না-ই বা ধরতে পারে কিন্তু ভালোবাসাহীন এক ছাদের নিচে অবহেলায় যে ওকে তোমার কাছে ফেলে রাখব আমি তেমন বাবা নই। আমার মেয়ের পুরো ভবিষ্যৎ এখনও সামনে পড়ে রয়েছে। তাই এখন আমি নিজের অধিকারেই আমার মেয়েটাকে নিয়ে যাচ্ছি। আমি চাই না আমার মেয়ের জীবনটা তোমার এই অবহেলা আর উদাসীনতার জন্য অকালে শেষ হয়ে যাক। ভালো থেকো তুমি।
শ্বশুরমশাইয়ের মুখে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা শুনে উজান বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল। সে মৌ’য়ের দিকে আড়চোখে দৃষ্টিপাত করে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে‚ আজ মৌ যেভাবেই হোক চলে যাবে। কিন্তু এই অবাধ্য‚ ত্যাঁড়োমুখো পিচ্চি মৌ’কে ছাড়া সে নিজে কীভাবে বাঁচবে। তা তো তার নিজেরও জানা নেই। মেয়েটাকে কীভাবে মানাবে‚ এই অবাধ্য মেয়েটা কেন যে তার মনের ভেতরের লুকানো কথাগুলো একটুও বুঝতে চায় না‚ তা ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছে না উজান।
মৌয়ের বাবা আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মৌ’য়ের ডান হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন এবং দরজার দিকে হাঁটতে লাগলেন। মৌ বাবার সাথে যেতে যেতে শেষবারের মতো একরাশ অসহায় চোখ মেলে তাকাল উজানে’র দিকে। তার চোখের সেই শেষ চাহনিতে এক বিন্দু আশা লুকিয়ে ছিল‚ এই শেষ মুহূর্তে হলেও লোকটা হয়তো নিজের সমস্ত পুরুষালি অহংকার আর গাম্ভীর্য বিসর্জন দিয়ে সবার সামনে চেঁচিয়ে বলবে‚ “তোমাকে ভালোবাসি পিচ্চি” কিন্তু উজান চৌধুরীকে সে যতটুকু চেনে‚ তাতে এই অসম্ভব কথাটা ওনার মুখ থেকে বের হওয়া আর আকাশে কুসুম ফোটানো একই কথা।
বাবার হাত ধরে মৌ যখন সদর দরজার দিকে তিন-চার কদম এগিয়ে গেল‚ ঠিক তখনই ঘরের সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে আচমকাই উজান এক লাফে গিয়ে মৌ’কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল এবং গলায় চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল….
“ও শ্বশুর আব্বা গো‚ আমার বিড়ালের বাচ্চার মতো বউ’টাকে নিয়ে যাইয়েন না গো। আল্লাহ‚ আমি বউ ছাড়া কিভাবে থাকবো? আম্মু তোমার ছেলের কেমন জানি লাগছে। বউউউউউউউউউ উম্মাহ।
এই বলে সে সবার সামনেই মৌ’য়ের গালে এক শব্দ করে চুমু বসিয়ে দিল। উজানে’র এমন নজিরবিহীন কাণ্ডকারখানা দেখে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত প্রত্যেকে একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। একজন রাশভারী প্রফেসর সাহেবের মুখ থেকে এমন ‘বিড়ালের বাচ্চার মতো বউ’ ডাক আর বাচ্চাদের মতো কান্না শুনে মৌসুমি চৌধুরী নিজের আঁচলে মুখ লুকিয়ে মিটমিট করে হাসতে লাগলেন। ওদিকে ইফাত এতক্ষণ মেহেরে’র গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাদের এই রোমান্টিক কাণ্ডকারখানা দেখছিল। সে সুযোগ বুঝে মেহেরে’র কানের কাছে মুখ এনে হালকা ফিসফিসিয়ে প্রতিধ্বনিত করে বলল‚
“ভালোবাসি ফুলকন্যা!
ইফাতে’র এই অসময়ের দুষ্টুমিতে মেহেরের’ মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করলেও‚ গুরুজনদের সামনে সে ভীষণ লজ্জা পেয়ে ইফাত’কে নিজের কনুই দিয়ে একটা হালকা গুঁতো মারল। বাড়ির বাকি সকলে হয়তো উজান আর মৌ’য়ের এই ঝগড়া দেখছিল কিন্তু উজানে’র এই নতুন রূপটি সবার কাছেই বড্ড অদ্ভুত ও নতুন লাগছিল। এরই মাঝে মৌ উজানে’র এই শক্ত বাহুডোর থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করে মরিয়া হয়ে উঠল। মৌ’য়ের এই অবাধ্যতায় উজান বড্ড বিরক্ত হলো। সে মৌ’য়ের কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ধমকের সুরে বলল‚
“এই পিচ্চি এমন কেঁচোর মতো মোচড়ামোচড়ি করছো কেন‚ হ্যাঁ? শান্ত হয়ে দাঁড়াও। তুমি কি মনে করেছো হ্যাঁ‚ তুমি চলে যেতে চাইলেই আমি তোমাকে ডানা মেলে উড়ে চলে যেতে দেবো? উজান চৌধুরী নিজের বউ ছাড়া এক সেকেন্ডও থাকতে পারে না‚ জাস্ট মাথায় ঢুকিয়ে নাও। তোমাকে লাগবে তার।
এরপর উজান নিজের চোখের সানগ্লাস ঠিক করে মৌ’য়ের বাবার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে অদ্ভুত সুরে বলে উঠল‚
“ডিয়ার শ্বশুর আব্বা‚ আপনি মানুষটা কিন্তু বিন্দুমাত্র ভালো নন। মেয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন খুব ভালো কথা‚ বসবেন‚ চা-নাস্তা খাবেন‚ ঘুরে বেড়াবেন‚ নিজের বেয়ানদের সাথে বসে দুটো সুখ-দুঃখের গল্প করবেন‚ তারপর শান্তিতে নিজের বাড়ি চলে যাবেন। কিন্তু না। তিনি এসেছেন আমার বুক থেকে আমার এই বিড়ালের বাচ্চার মতো মিষ্টি বউ’টাকে টেনে-হিঁচড়ে আলাদা করতে। আস্ত একটা মির্জাফর আপনি। দেবো না আমি আমার বউ‚ আপনি চলে যেতে বললেই আমি ছেড়ে দেবো নাকি? আমার জন্য নাকি আমার বউয়ের জীবন নষ্ট হচ্ছে‚ সিরিয়াসলি?
আজ ভালো করে শুনে রাখুন ড্যাড আর শ্বশুর আব্বা‚ আমার জন্যই আমার এই বউয়ের কোল আলো করে চৌধুরী বংশের প্রদীপ উজ্জ্বল হবে। আপনি এবার একাই নিজের বাড়ি চলে যান‚ আমার বউ কোথাও যাবে না ব্যস।
আরিফুর চৌধুরী এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি রাগে গটগট করে উজানে’র সামনে এগিয়ে গেলেন। এক ঝটকায় মৌ’কে উজানে’র বুক থেকে টেনে সরিয়ে নিজের পেছনে নিয়ে বেশ কর্কশ কণ্ঠে ছেলেকে ধমকে উঠলেন‚
“উজান অনেক ফাজলামো হয়েছে‚ এবার এই ফালতু ইয়ার্কি বন্ধ কর। মামনী তুমি চলো আমার সাথে।
কিন্তু উজানও দমবার পাত্র নয়। সে চোখের পলকে তার ক্ষিপ্রতা খাটিয়ে আবারও ’মৌকে নিজের চওড়া বুকের মাঝে টেনে নিল। এবার তাদের দুজনের মাঝের দূরত্ব বিন্দু মাত্র অবশিষ্ট রইল না‚ মৌ’য়ের লাল বেনারসির আঁচল উজানে’র সাদা শার্টের বোতামে আটকে গেল। মৌ শুধু ফ্যালফ্যাল করে উজানে’র এই অভূতপূর্ব কাণ্ডকারখানা দেখছিল। সবার সামনে উজানে’র এমন বেহায়াপনা সে আর সহ্য করতে পারছিল না। মৌ এবার বুক কাঁপানো এক চিৎকার দিয়ে উকানে’র দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠল‚
”ছাড়ুন আমায় নির্লজ্জ পুরুষ। থাকব না আমি আপনার মতো এক নিষ্ঠুর মানুষের সাথে‚ করব না আমি আপনার এই ছাইপাশ সংসার। মুখে যখন কোনোদিন নিজের বউ বলে সম্মান দিতে পারেন না‚ তাহলে আমি কিসের লোভে কেন এই বাড়িতে পড়ে থাকব‚ হ্যাঁ? থাকব না আমি একটুও। আপনি তো ভালোই বাসেন না আমায়‚ তাহলে আজ কিসের অধিকারে এভাবে পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন? আব্বু চলো তুমি…ওনাকে ওনার ইগো নিয়েই একলা থাকতে দাও। যাকে ভালোবাসে তাকে নিয়েই থাকুক।
মৌ এবার নিজের জমানো সবটুকু শক্তি দিয়ে এক সজোরে ধাক্কা মেরে উজানে’র বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তার দু-চোখ বেয়ে তখন নোনতা অশ্রুর ধারা অবাধে গড়িয়ে পড়ছে। এতক্ষণ তার মনে খানিকটা শেষ আশা ছিল হয়তো মানুষটা তাকে সত্যিই নিজের করে চায়‚ তবে এখন সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে‚ এই মানুষটা তাকে কেবল একটা দায়িত্বের খাতিরে আটকে রাখতে চায়। মন থেকে কোনোদিনও চায়নি। তাই ওনার জীবনে জোর করে মায়া বাড়িয়ে থাকার আর কোনো মানেই হয় না।
মৌ নিজের ব্যাগটা টেনে নিয়ে দরজার দিকে এক পা বাড়াতে চাইল‚ ঠিক তখনই এক বুক ফাটানো আকুলতা বজ্রকঠিন শব্দের মতো তার কানে এসে বাজল।
“পিচ্চি প্লিজ‚ আমায় এভাবে একা ফেলে চলে যেও না।
মৌ’য়ের পা দুটো সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেল। ঠিক যেন মেঝের সাথে লেপ্টে গেল। তার অবাধ্য পা দুটো আর এক কদমও সামনে এগোতে চাইছে না। মনের এক কোণ থেকে এক গোপন মায়া ফিসফিস করে বলে উঠল ‘ভালোবাসা ছাড়াও তো কত সম্পর্ক টিকে থাকে‚ তবে তুই কেন থেকে যাচ্ছিস না? কিন্তু পরক্ষণেই তার তীব্র আত্মসম্মানবোধ আর মস্তিষ্ক তাকে তীব্রভাবে বাধা দিয়ে বলল ‘যেখানে কোনো ভালোবাসাই নেই‚ সেখানে জোর করে ঘর বাঁধা একদম অসম্ভব। মৌ অশ্রুসজল চোখে আলতো করে পেছন ফিরে তাকাল। সে দেখল‚ উজান একরাশ অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। সেই চাউনি দেখে মৌ’য়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
উজান চৌধুরীকে এতটা অসহায় অবস্থায় সে নিজের জীবনে কখনো দেখেনি। কিন্তু একটা নামহীন‚ উপেক্ষার সম্পর্কে তো সে আর সারাজীবন বন্দি থাকতে পারে না। তাছাড়া‚ উজান তো মনে মনে অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাহলে আজ তাকে কেন এত মায়া দেখিয়ে থেকে যেতে বলছে? উজান বরং তার সেই কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার মানুষকে নিয়েই নতুন করে সুখে ঘর বাঁধুক। মৌ নিজের দু-চোখের নোনা জলটুকু হাত দিয়ে মুছে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ মুচকি হাসি ফুটিয়ে তুলল।
”এমন করে অবুঝের মতো বলছেন কেন প্রফেসর সাহেব? আমি আপনার জীবন থেকে চিরতরে চলে যাচ্ছি‚ এতে তো আজ আপনার সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা। আপনার পথের কাঁটা তো দূর হলো। আপনি এখন কোনো বাধা ছাড়াই আপনার সেই পুরনো ভালোবাসাকে নিজের করে পাবেন।
তাকে নিয়ে মনের মতো করে নতুন সংসার সাজাতে পারবেন। তাহলে আজ আমার জন্য কিসের এত আকুতি‚ কিসের এত লোক দেখানো নাটক? আমি কখনোই আপনার জীবনের বোঝা হয়ে থাকতে চাইনি‚ আর না চেয়েছি আপনাকে কোনো কষ্ট দিতে। আমি জানি‚ এই কদিনে আপনাকে বড্ড বেশি জ্বালাতন করেছি‚ তার জন্য আমি সত্যিই সরি । কথা দিচ্ছি‚ আর কখনো কোনোদিন আপনাকে বিরক্ত করতে এই চৌধুরী বাড়িতে আসব না। অনেক ভালো থাকবেন আপনি।
মৌ নিজের মুখের কথা শেষ করেই উল্টো ঘুরে সদর দরজার দিকে চূড়ান্ত পা বাড়াল। সে যেই মাত্র এক কদম এগিয়ে গেল ঠিক তখনই ঘরের সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে উজান ছুটে গিয়ে সরাসরি মৌ’য়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আচমকা এই কাণ্ডে নিজের অজান্তেই মৌ’য়ের লাল শাড়ির পায়ের পাতাটা উজানে’র সুগঠিত হাঁটুতে গিয়ে ঠেকল। উজান মৌ’য়ের দিকে পরম আবেশে মাথা নিচু করে সামান্য ঝুঁকে পড়ল। তারপর নিজের পকেট থেকে জাদুকরের মতো এক ডায়মন্ডের আংটি বের করে মৌ’য়ের চোখের সামনে তুলে ধরল। তার চোখ দুটো তখন ভালোবাসার গভীর নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। সে অত্যন্ত আদুরে ও নিরেট স্বরে পুরো কক্ষের নীরবতা ভেঙে আওড়াতে লাগল।
“ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি। তাসফিয়া মৌ অনলি মাই প্রপার্টি। আমার তিন কবুল বলে বিয়ে করা বউ। আমার ঘরণী‚ আমার রমণী‚ আমার অর্ধাঙ্গিনী। প্রফেসর উজান চৌধুরীর প্রিয় ওয়াইফি। আপনাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসি মিসেস উজান চৌধুরী।
মৌ নিজের দু-চোখ বড় বড় করে একদম হা করে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। উজানে’র মুখে এতসব ডায়ালগ শুনে তার মাথার সমস্ত শিরা যেন একসাথে কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে নিজের সতেরো বছরের জীবনে ছেলেদের থেকে অনেক প্রপোজাল পেয়েছে কিন্তু এই ভরা মজলিশে‚ নিজের বাবার সামনে বরের দেওয়া এমন পাগল করা প্রস্তাব সে কখনো কল্পনাও করেনি। আর সবকিছুর চেয়ে বড় কথা‚ এই কঠোর মনের লোকটা সত্যি তাকে এত গভীর থেকে ভালোবাসে? তাকে আজ সবার সামনে শুধু নিজের বউ বলেই স্বীকার করেনি বরং নিজের অর্ধাঙ্গিনীর সর্বোচ্চ স্বীকৃতিটুকুও দিয়ে দিল।
উজানের এমন অভূতপূর্ব কাণ্ড দেখে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত মেহের‚ ইফাত‚ মৌসুমি চৌধুরী থেকে শুরু করে মৌ’য়ের স্পষ্টভাষী বাবা পর্যন্ত সবাই একদম চমকে পাথরের মতো তাকিয়ে রইলেন। তারা কেউ এই মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারছেন না যে তারা কোনো মধুর স্বপ্ন দেখছেন নাকি বাস্তব চিত্র চোখের সামনে দেখছেন। মৌ তখনও কোনো নড়চড় না করে আগের মতোই কাঠের পুতুলের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। উজান এবার হঠাৎ নিজের মুখটা সামান্য তুলে তাকাল। মৌ’কে ওভাবে থতমত খেয়ে বোকা বনে যেতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক মনকাড়া প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। অতঃপর সে খানিকটা অভিমানী গলায় ফিসফিস করে।
“কী হলো মিসেস চৌধুরী? এত বড় একজন প্রফেসর সবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ‘ভালোবাসি’ বলল তবুও কি আমার এই ছোট্ট হার্ট আর এই গিফটটা একসেপ্ট করবেন না? নিজের বরকে আর কতক্ষণ ওভাবে ওয়েট করাবেন‚ বলুন তো?
প্রফেসর উজান চৌধুরী পর্ব ৩৩
মৌ তখনও কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে ঘোরের মধ্যে আগের মতোই নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে রইল। উজান আর দেরি না করে এক দীর্ঘ তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। অতঃপর সে নিজেই খাটাস করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। মৌ’য়ের ফর্সা নরম হাতটা পরম যত্ন আর মমতায় নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে‚ তার অনামিকা আঙুলে জ্বলজ্বল করতে থাকা ডায়মন্ডের আংটিটা আলতো করে পরিয়ে দিল। আংটি পরানো শেষে সে মৌ’য়ের কানের একদম কাছাকাছি নিজের উষ্ণ ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল‚
“লাভ ইউ বউজান…আই….
