কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৯
আরিফা তাসনিম তামু
নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে রৌদ্র। এমন সময় মনে হল কেউ একজন তার কেবিনে ডুকেছে।ভিতরে ডুকা ব্যক্তি কে দেখে।রৌদ্র পুরো অফিস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল ।এতে অপর ব্যক্তির যেন কিছু হল না সে একপাশে রাখা সোফায় আরাম করে পায়ে উপর পা তুলে বসছে।এই দিকে বসের এমন গগন কাঁপানো চিৎকার শুনে দরজার সামনে সব স্টাফরা এসে ভীর জমিছে।ইয়াশ দৌড়ে এসে বলে
—স্যার আসব.?
রৌদ্র নিজেকে সামলিয়ে বলল
—আসো
ভিতরে ডুকে ইয়াশের চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে।চেয়ারসহ নিচে উল্টে পড়ে আছে রৌদ্র।
—একি স্যার আপনি নিচে কি করছেন?
— নাচচ্ছি দেখছো না? তুমি নাচবে আসো দুজন একসাথে নাচি।কোমড় দুলিয়ে।
ইয়াশ চোখ ডোলে আবারও রৌদ্রের দিকে তাকাল নাহ।স্যার তো উল্টে পড়ে আছে। সে স্পট দেখছে।কিন্তু স্যার যে বলল নাচাচ্ছে।
— কিন্তু স্যার আমি তো দেখতে পাচ্ছি আপনি উল্টে পড়ে আছেন.?
এমনিতেই উল্টে পড়ে কোমড়ে ব্যথা পেয়েছে হালকা।তার উপর এই বদলের কথা শুনে মেজাজ টাই বিগড়ে গেলো রৌদ্রের।দাঁত দাঁত পিষে বলে
— আহাম্মক তোমার চাকরি আমি নট করে দিব আজই। দেখছো পড়ে গিয়েছি না তুলে বলদের মতো উল্টা পাল্টা বকছো.?
ইয়াশ রৌদ্রের প্রথম কথায় অতো মাথা ঘামল না।কারণ গত ৪ বছর ধরে এমন কোনো দিন নাই। যে তার চাকরি নট করা হয় নাই।তাই সে তড়িঘড়ি করে এসে রৌদ্র কে তুলে।
—আচ্ছা ইয়াশ আমি যা দেখছি তুমি কী তাই দেখছো.?
—আপনি কী কী দেখছেন স্যার..?
— এখানে কি হুবহু মানুষদের মতো দেখতে কাউকে দেখছো.?,
— হুবহু মানুষের মতো তো দেখতে আপনাকেই দেখছি স্যার আর তো কিছু দেখছি না।
— আমি হুবহু মানুষের মতো দেখতে হলে তুমি কী বাঁদরের মতো দেখতে.?
নিজের বোকা কথায় জিব কাটে ইয়াশ।স্যার তো মানুষই দেখতে আবার মানুষের মতো কীভাবে হবে?ইয়াশ রে একদিন তোর চাকরি সত্যি সত্যি নট করে দিবে রে।
—কী ভাবছো এতো.?
—না মানে স্যার আপনি পড়লেন কীভাবে? মানে চিৎকার করেছিলেন যে ইয়ে মানে ভয় পেয়ে ছিলেন নাকি।
—এতো ইয়ে মানে ইয়ে বলতে হবে না।তুমি দেখতে চাও আমি কীভাবে পড়েছি.?
—না মানে স্যার আপনি তো আমর বস আপনার সুবিধা অসুবিধা দেখার দায়িত্ব তো আমারই।তাই কোনো সমস্যা হল কিনা সেটাই জানতে চাচ্ছি আপনি না বললে সমস্যা নেই।
রৌদ্র এবার ইয়াশকে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিয়ে বলে।
—এখানে বসো।
ইয়াশ বসে ভেবে কাজের কিছু বলবে।
—সোফার দিকে তাকাও।
ইয়াশের ভ্রু কুঁচকে আসে। আজকে স্যারের হয়েছে টা কী। তবুও সে তাকাল তাকাতেই রৌদ্রের মতো সেম অবস্থা তারও হলো। চিৎকার করে লাফিয়ে সেও চেয়ার থেকে পড়ে গেলো।
—এবার বুঝলে আমি কীভাবে পড়লাম.?
ইয়াশ বুকে হাত দিয়ে বড় বড় করে শ্বাস নিতে নিতে বলে
—জ্বী স্যার আর এতো সুন্দর করে না বললেও পরাতেন না মানে মুখে বললেই বুঝতাম তাই বলে এভাবে.?
রৌদ্র হাসতে হাসতে বলে।
—মুখে বললে শক্তি খরচ হতো তুমি ভালো করে বুঝতেও না।তাই সেম ভেবে বুঝিয়ে দিলাম।নাও এবার উঠো।
বলে রৌদ্র হাত বাড়িয়ে দিল। ইয়াশ বহু কষ্ট উঠে দাড়াল কোমড়টা ভেঙে গেলো মনে হয়।রৌদ্র এবার সোফায় বসা ব্যক্তি সামনে গিয়ে মাথায় টোকা দিয়ে বলে।
— এতো বাঁদরামি কোথায় থেকে শিখেছিস.?
আহি এবার মুখের উপর থেকে সাদা হিজাবটা সরাল।সাদা বোরকা সাদা হিজাব তার উপর পিছনের হিজাবটা মুখের উপর ফেলে মুখ ডাকা।যে কেউই হঠাৎ দেখলে ভয় পাবে।রৌদ্র আর ইয়াশের ক্ষেত্রে ও তা-ই হয়েছে।আহি ভাইয়ের কথার উওর না দিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে।রৌদ্র বোনকে গাল ফুলাতে দেখে বলে
—আমার বনুপাখিটার কী হয়েছে.?
আহি গাল ফুলিয়ে বলে
—আমি কত আশা নিয়ে আসলাম তোমাকে ভয় দেখাব কিন্তু তুমি তো ভয় ফেলে না উল্টো আমাকে চিনে ফেললে।
রৌদ্রের মুখটা দেখার মতো হয়েছে।ভয় পেয়ে চেয়ার সহ নিচে পড়ে কোমড়ে ব্যথা ফেলো তার পর ও তার বোন বলে কিনা তাকে ভয় দেখাতে পারে নি।আবার এটার জন্য গালও ফুলিয়ে রেখেছে।হায় এই কষ্ট কাকে দেখাবে রৌদ্র। এই দিকে আহির কথা শুনে ইয়াশ মনে মনে বলে
—যেমন ভাই তেমন বোন।বোনে ভয় দেখিয়ে কোমড় ভেঙ্গে দিয়েও মন ভরে নি।আর ভাই নিজের কোমড় ভেঙ্গেছে বলে আমার টাও ভেঙ্গে দিল।দুইটাই একি নৌকার মাঝি।
ইয়াশের মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলো।ব্যথায় টান টান করছে।ইয়াশ অসহায় চোখে দুই ভাই বোনের দিকে চেয়ে আছে।রৌদ্র এবার বোন কে একহাত জড়িয়ে ধরে দুঃখী ভাব করে বলে
—এমন ভয় দেখিয়েছিস ভাইয়ার কোমড়টায় ভেঙ্গে দিয়েছিস। এখন কী এই কোমড় ভাঙ্গাকে কেউ বউ দিবে?আমার আর বিয়ে হবে না রে বনু। তুই ভাবি পাবি না।
বলেই রৌদ্র নাক টানে যেন সে সত্যি সত্যি কষ্ট পাচ্ছে। ইয়াশ স্যারকে কাঁদতে দেখে টিস্যু এগিয়ে দেয়। টিস্যু দেখে রৌদ্রের ভ্রু কুচকে আসে।সে কী সত্যি কাঁদছে নাকি?নাকের পানি চোখের পানি কী বের হয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে?কই তার তো এক পোটা চোখের পানিও পড়েনি।তাহলে এই আহাম্মক টা তাকে টিস্যু দিচ্ছে কেন?এখন না নিলেও তার বোন বুঝে যাবে সব।আগে টিস্যু নিয়ে মিছামিছি চোখের পানি মুছা যাক পরে এটারে দেখে নিব।রৌদ্র ইয়াশের দিকে খেয়ে ফেলার মতো তাকিয়ে টিস্যু টা।নিয়ে শুধু শুধু চোখ মুছচ্ছে।স্যারকে এভাবে তাকাতে দেখে ইয়াশ বিড়বিড় করে বলে।
—যাক বাবা আমি আবার কী করলাম? ভালোর জন্য টিস্যু দিলাম কোথায় একটু কৃতজ্ঞতা জানাবে তা না চোখ দিয়ে যেন খেয়ে ফেলবে। এজন্য কারো উপকার করতে নেই।
বলেই ইয়াশ মনে মনে ভেংচি কাটল। আহি এতক্ষণ চুপচাপ ভাইয়ের নাটক দেখছিলো।সে বুঝে পায় না তার ভাই কোন মাটি দিয়ে বানানো?কই তার মা কিংবা বাবা দুজনেরই মধ্যে কেউই তো এত নাটকবাজ না
—ভাইয়া তুমি টিভিতে নাটকে ডুকে গেলেও তো পারো। বিশ্বাস দারুণ অভিনয় করতে পারবে।সবাই আমাকে দেখে বলবে ওই দেক অভিনেতা রাদিফ খান রৌদ্রের বোন যাচ্ছে।
বোনের কথা রৌদ্র খুক খুক করে কেঁশে উঠল।যাক বাবা বুঝে ফেলল?না পারার কিছুই নেই তারই তো বোন।তবে এই পর্যায় এসে ইয়াশ একটা মস্ত বড়ো ভুল করে ফেলেছে।আহির কথায় ইয়াশ হেঁসে ফেলেছে।এটাই যেন তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।রৌদ্র তাকাতেই তার হাসি মাখা মুখটায় আঁধার নেমে আসে।ইয়াশের খুব অসহায় লাগছে নিজেকে মনে মনে বলে
— যেখানে হাসি দিলে বিপদ সেখানেই কেন বার বার হাসি পায় মাবুদ.?
—যেমন স্যার তেমন তার পিএ দুটাই একি নৌকার মাঝি।অবশ্য কথায় আছে না সঙ্গে দোষে লোহা ভাসে। তাই হলো ইয়াশ ভাইয়ের উপর আমার ভাইয়ার সাইড এফেক্ট পড়ছে তাই না ইয়াশ ভাই।
ইয়াশ খুশি মনে বলে
—জ্বি জ্বি বোন তুমি ঠিক বল”
আর বলতে পারল না নিজের হুঁশ ফিরে আজকে স্যার তাকে সত্যি সত্যি তার চাকরি খেয়ে দিবে।স্যারের ভাষা যেটাকে বলে নট করে দিবে।ইয়াশ ভুলেও তার স্যারের ঠিক তাকাল না। একটু হাঁসার চেষ্টা করে বলে
—হে হে না না বোন স্যার অনেক ভালো।আমার স্যারের ভিতর কোনো ভেজাল নেই।আচ্ছা তুমি বসো আমি তোমার জন্য ঠান্ডা কিছু পাঠাচ্ছি। আসি স্যার।
—যাও পরে দেখে নিচ্ছি।
পরে আর কী দেখবে। পরের টা পরে দেখা যাবে। এখন তো পালানো যাক। অনুমতি পেয়ে ইয়াশ একপ্রকার দৌড়ে বের হয়ে গেলো।আহি হেঁসে উঠল।
—যাই বলো না কেনো ভাইয়া।ইয়াশ ভাই কিন্তু দারুণ একজন মানুষ।
রৌদ্র বোনের কথায় হেঁসে বলে।
—হুম সহজ সরল আর বিশ্বস্ত ওর হাতে কোটি টাকার কাজ দিয়েও আমি নিশ্চিত থাকতে পারি।আচ্ছা বাদ দে আগে বল কার সাথে আসলি।
—একাই এসেছি তোমার সাথে খান বাড়িতে যাব।বাড়িতে আপুইকে কল দিয়ে ছিলাম আম্মুরা নাকি বাড়ি চলে গিয়েছে।আমার আম্মু কাকিয়ার কথা মনে পড়ছে খুব তাই এখানে আসলাম তোমার সাথে জাব।
—বুলাম তবে একা আসলি কেনো আমি তো যেতাম আনতে। যদি কোনো বিপদ হতো.?
—একটা ক্লাস হয়নি তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়েছে তাই চলে আসলাম।২০ মিনিটের পথ কিছুই হতো না।
—আমাকে কল দিতি নিয়ে আসলাম।আচ্ছা যাই হোক এমন আর কখনো করবি না।আদ্র শুনলে বকবে।যা ফ্রেশ হয়ে আয়।
আহি উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমে যেতে যেতে বলে
—আমার ফোনটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তুমি একটু আপুইকে কল দিয়ে বলতো বিকালে শালুকে নিয়ে খান বাড়িতে যেতে।বলবে আমি বলেছি।
বলেই ওয়াশরুমে ডুকে গেলো আহি।রৌদ্র কী করবে কল দিবে নাকি দিবে না ভাবতে ভাবতে কল দিয়েই দিল।কিন্তু ওপাশ থেকে বার বার একি কথা বলছে”আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তা এই মুহুর্তে ব্যস্ত আছে।এই কথা শুনে রৌদ্র মোবাইল টা পাশের ঢিল মেরে ফেলে বিড়বিড় করে বলে
—ভালোবাসা শেষ তো
তাই এখন ব্যস্ত…”
এই দিকের ইয়ানার ওর বান্ধবীদের সাথে দেখা করার কথা ছিল। মাঝ পথে এমন হওয়ায় আর যায় নি।তাই ওরা সবাই নেওয়াজ বাড়িতে এসে হাজির।এই মুহূর্তে সবাই ইয়ানার রুমে গালে হাত দিয়ে বসে আছে।কারণ একটু আগে ইয়ানা ওর বিয়ের ব্যপারে সব বলেছে।কিন্তু জামাইর নামটা এখনো বলেনি।বিয়ের বিষয়টাও বলতো না ওর ঠোঁটের অবস্থা দেখে সব গুলো পেচিয়ে ধরেছে।এক প্রকার বাদ্য হয়ে বলা।সব শুনে সব গুলা এখন গালে হাত দিয়ে বসে আছে।প্রিতি বলে উঠল
কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৮
—আচ্ছা যা হওয়ার তা হয়ে গেছে এখন বল দুলাভাই কী করে..?
ইয়ানা হতাশার সুরে গেয়ে উঠল —
গুলিস্তানের মোরে বইসা বন্ধু
বেঁচে পান “~
কেসেড বাজাইয়া শুনে মমতাজেরই গান
গুলিস্তানের মোরে বইসা বন্ধু
বেঁচে পান~”
কেসেড বাজাইয়া শুনে মমতাজেরই গান
