Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯৬ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৬ (৩)

দাহশয্যা পর্ব ৯৬ (৩)
Raiha Zubair Ripti

দুদিন পর মেহরিনের মেডিক্যাল এক্সাম। মোতালেব ভুঁইয়া এক্সামের দিন সকালে রওনা দিবে। মেয়েকে কথা দিয়েছে মেয়ে তার পরীক্ষা দিয়ে এক্সাম হল থেকে বের হয়েই বাবাকে দেখতে পারবে৷ সেদিন তানভীরের এক্সাম আছে। সেজন্য মোতালেব ভুঁইয়া ইমন কে বলেছে নিয়ে যেতে। ইমন ঢাকাতেই আছে এখন। আজ সকালেই মায়ের ফোন পেয়ে ছুটে এসেছে। মেহরিন বললো শুধু শুধু ইমন ভাইকে ঝামেলায় ফেলার কি দরকার? তিনি ব্যস্ত মানুষ। মেহরিন একাই চলে যেতে পারতো। কিন্তু মোতালেব ভুঁইয়া জানালেন ইমনের আপত্তি নেই এতে। সে মতিঝিল এসে তাকে নিয়ে যাবে। মেহরিন আরো কয়েকটা কথাবার্তা বলে ফোন কেটে দিলো।

ঢাকা মেডিকেলের শিশু বিভাগে সকাল থেকেই রোগীর ভিড়। করিডোরজুড়ে উদ্বিগ্ন স্বজনদের ছোটাছুটি, কোথাও শিশুদের কান্না, কোথাও আবার ডাক্তারদের ব্যস্ত পদচারণা। সেই ব্যস্ততার মাঝেই সারারাত জ্বরে কাতরানো ছোট্ট ইহরামকে বুকে আগলে বসে আছ ঊর্মি। কান্নায় চোখদুটো লাল হয়ে আছে তার। ছেলের কপালে বারবার হাত রেখে আল্লাহর কাছে শুধু একটি দোয়াই করছিল, যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে তার সন্তান।
রাজনৈতিক একটি জরুরি কাজে ইব্রাহিম ঢাকার বাইরে থাকায় এই কঠিন মুহূর্তে পাশে থাকার সুযোগ হয়নি তার। ইতি বেগম তড়িঘড়ি করে ইমনকে ফোন করেছিলেন। ভাগ্নের অসুস্থতার কথা শোনামাত্র এক মুহূর্তও দেরি করেনি ইমন। নিজের সব কাজ ফেলে ছুটে এসে বোন আর ভাগ্নেকে নিয়ে এসেছে হাসপাতালে।
ডাক্তারের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে। ইহরামের শরীরে ভাইরাল জ্বর ধরা পড়েছে। প্রেসক্রিপশনে শেষ লাইনটি লিখে ভদ্রমহিলা ডাক্তার মাথা তুলে তাকালেন। একবার ইমনের গম্ভীর, চুপচাপ মুখের দিকে, আরেকবার কান্নাভেজা চোখে বসে থাকা ঊর্মির দিকে তাকালেন৷ তারপর প্রেসক্রিপশন টা এগিয়ে দিলেন ইমনের দিকে। ইমন প্রেসক্রিপশনটা হাতে নিয়ে একবার দেখে নিতে নিতে ডক্টরকে বিনীত গলায় বলল,

“ জ্বরটা খুব হঠাৎ করেই অনেক বেশি উঠেছে। রাতে কয়েকবার খিঁচুনি হওয়ার মতো কাঁপছিল। আর কোনো টেস্ট লাগবে না তো? ”
ডক্টর টা মুখের মাস্ক খুলতে খুলতে উর্দু, বাংলা মিশ্রণে বলে উঠলো,
“ আরে মিস্টার, আপ টেনশন মাত লিজিয়ে। বাচ্চা ছোট হ্যায়, ইস উমরে ভাইরাল ফিভার অনেক কমন বাত। টাইম মতো মেডিসিন, পানি, আর মায়ের দুধ বা লিকুইড দিলেই ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। লেকিন,আপকো ভি একটু খেয়াল রাখতে হবে। বিবি একা একা বাচ্চা সামলাতে সামলাতে তো একদম রো দিয়া। উসকো একটু রেস্ট দিন, হেল্প কিজিয়ে। এমন টাইমে শওহরের সাপোর্ট বহুত জরুরি হোতা হ্যায়। ”
ইমন সাথে সাথে মাথা তুলে তাকালো ডক্টেরর দিকে।
এতক্ষণ সে খেয়াল করে নি ডক্টর কে। সেভাবে তাকায় নি বললেই চলে। দুধে-আলতা গায়ের রঙ? না এটাকে দুধে আলতা বলা চলে না। দুধে আলতা গায়ের রঙ তো মেহরিনের। এই ডক্টর অতিরিক্ত সাদা ফর্সা। শরীরে রগ দেখা যায়। টানা হরিণচোখ, ঘন ভ্রু, সুঠাম নাক আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি আভা। গলায় পরিচয়পত্র ঝুলছে। পরনে পরিষ্কার সাদা এপ্রন। মেয়েটা বাঙালী নয়। সেজন্য চেহারায় পাকিস্তানি মেয়েদের স্বতন্ত্র সৌন্দর্যের ছাপ স্পষ্ট। নেমপ্লেটে লেখা-

Akhi Qureshi
Medical Intern
ঊর্মিও চমকালো ডক্টরের মুখে এমন বাক্য শুনে। ইমন দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। তার মেজাজ এখন সপ্তম আকাশে। এটাকে ডক্টর বানিয়েছে কে? ভাই বোন কে কি না স্বামী স্ত্রী বানিয়ে দিলো! অসহ্যকর। কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইল। তারপর গলা খানিক শক্ত করে, ভদ্রতার সহিত বলল,
“ এক্সকিউজ মি, ডক্টর। ”
“ ইয়েস। ”
“হাসপাতালে একজন রোগী বা রোগীর স্বজন সম্পর্কে কোনো ধারণা করার আগে নিশ্চিত হওয়াটা ভালো। বিশেষ করে সামনে দাঁড়িয়ে মন্তব্য করার আগে। আর ও আমার স্ত্রী নয়… আমার ছোট বোন। আর বাচ্চাটা আমার ভাগ্নে। ”
ডক্টর আখি থমকে গেলেন। সচারাচর বাবা মাই আসে তার কেবিনে বাচ্চা দের নিয়ে। সেজন্য এদেরও দম্পত্তি ভেবে ওভাবে বলে দিয়েছিল। তার উচিৎ ছিলো জিজ্ঞেস করে নেওয়াটা তাদের সম্পর্ক টা কি। উনি পেসেন্টের কি হয়। নিজের ভুল অভিজ্ঞতা টাকে স্বীকার করে অ্যাপোলজি চেয়ে ডক্টর আখি বললেন,

“ ওহ্ আই অ্যাম… সরি। সো সরি। মুঝসে গলতি হো গয়ি। আসলে আপ দোনোকে একসাথে দেখে আমি অ্যাসিউম করে ফেলেছিলাম। আই শুড নট হ্যাভ ডান দ্যাট। ”
ইমনও আর বিষয়টা বাড়াল না। বিরক্ত লাগছে। এই পরিস্থিতিতে যারা পড়ে তারা জানে এটা কতটা খারাপ অনুভূতি দেয়।
“ আসছি। ভবিষ্যতে আর এমন ভুল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। ”
আখি মাথা নেড়ে মৃদু হাসলেন।
“ শিওর। অ্যান্ড থ্যাঙ্ক ইউ ফর কারেক্টিং মি। ”
ইমন চলে গেলো কেবিন থেকে বোন আর ভাগ্নে কে নিয়ে। ডক্টর আখি স্পষ্ট দেখতে পেলো লোকটার চোখ মুখে তাকে নিয়ে একটা বিরক্তিকর ভাব।
গাড়িটা অনেকক্ষণ ধরে শহরের কোলাহল পেরিয়ে এখন একদম নিঃশব্দ, শূন্য রাস্তার দিকে চলে এসেছে। দু’পাশে লম্বা গাছ, মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়। চাঁদের আলোয় সবকিছু যেন আরও বেশি নির্জন, আরও বেশি অচেনা লাগছে।
সামনের সিটে বসা বাশার সুলতান একটু অস্থির হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর সে আর থাকতে পারল না।

“ কোথায় যাচ্ছি আমরা? ”
ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা সোলেমান একবার পাশে তাকালো, তারপর গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে থামলো।
“ গাড়ি থামাইলি ক্যা?”
সোলেমান সিট বেল্ট খুলতে খুলতে জবাব দিলো,
“ এক নম্বর পাইছে চাচা৷ ”
বাশার সুলতান বিরক্ত হয়ে বলল,
“ বাড়ি থেকে বের হবার আগে করে বের হবি না? ”
“ তখন করার কথা মনে ছিলো না। ”
“ যা তাড়াতাড়ি করে আয়, বেশি দূরে যাইস না আমারে একা ফেলে।”
সোলেমান দরজা খুলে নেমে পড়ল। চারপাশে তাকিয়ে দেখল। মানুষ বলতে কিছু নেই, শুধু বাতাস আর গাছের পাতার শব্দ। হঠাৎই সে গুনগুন করে একটা গান ধরল,

যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে
চাঁদ উঠেছিল গগনে।
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে
কী জানি কী মহা লগনে!
গানের সুরটা ভেসে যাচ্ছে ফাঁকা রাস্তায়। সে ধীরে ধীরে আরও একটু দূরে চলে গেল।
ঝোপের ভেতর দাঁড়িয়ে প্যান্টের চেইন টা খুলে পানির মেশিন অন করতেই, রাস্তার বাঁক থেকে কয়েকটা ছায়া বেরিয়ে এল।
তিনজন ছেলে। চেহারায় অস্থিরতা, চোখে লোভ আর নিত্যদিন করা কর্মের অভ্যাসের ঠান্ডা সাহস। তাদের একজন সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে ছুরি বের করে সোলেমানের পেটের কাছে ধরতেই সোলেমান ঘুরে তাকানোর সময় প্রস্রাব গিয়ে ছিটকে পরলো তাদের একজনের গায়ে। সোলেমান ওহ শ্যিট বলে অন্য দিকে ঘুরে তাকাতেই একজন বললো,

“ তোর কাছে যা আছে সব বের কর।”
সোলেমান রিলাক্স ভাবে প্রস্রাব করতে করতে জবাব দিলো,
“ কিছু নাই আমার কাছে। সব চাচার কাছে আছে। ”
“ কোথায় তোর চাচা? ”
“ ঐ তো সামনে। গাড়িতে। উনার থেকে চেয়ে নেন। উনার শরীর আবার দয়ার সাগর৷ চাওয়া মাত্রই সব কিছু দান করে দেয়। ”
একজন উঁকি দিয়ে দেখলো সত্যি সত্যি একটা গাড়ি আছে। আর ঐ গাড়ির ভেতর একজন বয়স্ক লোক।
তারা সোলেমান কে ছেড়ে দ্রুত গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির কাছে গিয়ে তারা দরজা খুলে ভেতরে তাকাল। বাশার সুলতান ভরকে গেলো তিনজন অপরিচিত বখাটে মুখ দেখে। একজন কড়া গলায় বলল,
“টাকা-পয়সা বের কর। সব বের কর।”
বাশার সুলতান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“এ্যাই এভাবে কথা বলছো কেন? কে তোমরা? দূরে যাও।”
কিন্তু পরের মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে গেল। একজন তার কলার ধরে টান দিল।
“বেশি কথা বলবি না। যা আছে দে।”
বাশার সুলতান কিছু করতে যাওয়ার আগেই আরেকজন তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। গাড়ির ভেতরটা মুহূর্তে উত্তেজনায় ভরে উঠল। বাশার সুলতান কে টেনে গাড়ি থেকে বের করে উড়াধুরা মেরে তার সব টাকা পয়সা হাতিয়ে নিতে শুরু করলো। এমন এমন শক্ত মার তার শরীরে পড়ছে যে সে চিৎকার করে সোলে কে ডাকতে লাগলো,

“ ও সোলেমান, কই রে তুই? কোনে গেলি মুতবার। মুতা বন্ধ করে আমারে বাঁচা বাপ। ওরে আল্লাহ রে আমার কোমর টা দিলো ভাইঙ্গা খা**কির ছাওয়াল রা। তাড়াতাড়ি আয় রে সোলেমান। বাঁচা আমারে আগে। পরে মুতিছ। ”
সোলেমান তখনও দূরে, গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে গান গাইতে গাইতে কাজ সারতে ব্যস্ত। তার কান অব্দি যাচ্ছে না বাশার সুলতানের কথা৷
মিনিট বিশেক পর সোলেমান উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলো। গাড়ির কাছাকাছি আসতেই সোলেমান থমকে দাঁড়িয়ে গেল। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কাগজপত্র, গাড়ির দরজা খোলা, আর রাস্তার ধারে কুঁকড়ে পড়ে আছেন বাশার সুলতান। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“ইয়া আল্লাহ! চাচা!”
সে দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। বাশার সুলতানের মুখে-চোখে ধুলা, ঠোঁট ফেটে রক্ত জমে গেছে। শ্বাস চলছে, তবে কষ্টে। সোলেমান দু’হাতে তাকে ধরে ঝাঁকাতে লাগল।
“চাচা! এই চাচা! কী হইছে? কে করছে এই অবস্থা? কথা বলো! ”
বাশার সুলতান কষ্টে চোখ মেলে তাকালেন। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না। শুধু অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিস করলেন,

“ডা… ডাকাত…”
সোলেমান চারদিকে আতঙ্কিত চোখে তাকাল, যেন এখনো কাউকে খুঁজছে।
“হায় আল্লাহ! আমি যদি আরেকটু আগে আসতাম! আমাকে ডাকলে না কেনো? ”
এ ছেলে কি বলে! তাকে নাকি বাশার সুলতান ডাকে নি! ওরে হারামজাদা তার চিল্লানি তে জঙ্গলের সব পাখি বিরক্ত হয়ে উড়ে গেছে। আর তুই বলিস সে তোকে ডাকে নি!
“ চাচা, কিছু হবে না। আমি আছি।”
সে তাড়াতাড়ি বাশার সুলতানকে কাঁধে ভর দিয়ে কোনোমতে দাঁড় করাল। বৃদ্ধ লোকটা ব্যথায় ককিয়ে উঠলেন।
“আস্তে… কোমরটা… শেষ কইরা দিছে…”
“ধরো চাচা, একটু কষ্ট করো। আগে হাসপাতালে যাই। পরে পুলিশে খবর দিচ্ছি।”
কোনোমতে তাকে ধরে গাড়ির সামনের সিটে বসালো সোলেমান। তারপর দ্রুত দরজা বন্ধ করে নিজেও ড্রাইভিং সিটে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল।
সুনশান নিস্তব্ধ রাস্তায় গাড়িটা এবার আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ছুটতে লাগল। সোলেমানের মুখজুড়ে উদ্বেগের ছাপ, বারবার সে পাশ ফিরে তাকাচ্ছে।

“চাচা, চোখ বন্ধ করবে না। আমার সাথে কথা বলো। আর একটু… আর একটু গেলেই হাসপাতাল।”
বাশার সুলতান ব্যথায় গোঙাতে গোঙাতে শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। সোলেমান স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে এক্সিলারেটরে চাপ বাড়িয়ে দিল। যত দ্রুত সম্ভব তাকে হাসপাতালে পৌঁছাতেই হবে। চাচা মরে গেলে তার জীবন বৃথা। তার প্রানের চাচাআআ।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এসে গাড়িটা হঠাৎ করেই ব্রেক কষে থামাল সোলেমান। দরজা খুলেই সে চিৎকার করে উঠল,
“ এ ভাই কেউ আছেন? আমার চাচাকে বাঁচান।”
তার চিৎকারে কয়েকজন ওয়ার্ডবয় আর নার্স দ্রুত ছুটে এল। স্ট্রেচারে করে বাশার সুলতানকে নামানো হলো। সাদা আলোয় ভরা ইমার্জেন্সি করিডোরের ভেতর দ্রুত ঠেলে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে।
একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক দ্রুত রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করতে শুরু করলেন।
“ব্লাড প্রেসার কমে গেছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত আছে। অক্সিজেন দিন। আইভি লাইন খুলুন। সিবিসি, ব্লাড গ্রুপিং, এক্স-রে আর সিটি স্ক্যানের প্রস্তুতি নিন।”
একজন নার্স সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে দিল। আরেকজন হাতে ক্যানুলা বসিয়ে স্যালাইন চালু করল। অন্যজন জমে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে ক্ষতগুলো জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে দেয়।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। Royal Australian Air Force Joint Operations Centre থেকে বেরিয়ে আসার পরও পুরো পথজুড়ে একটাও কথা বলেনি এজওয়ান। গাড়ির ভেতরে শুধু ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন আর বাইরের ঝাপসা আলো।
মাহি কয়েকবার তাকিয়েও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। স্ক্রিনে দেখা সেই মুখোশধারী মানুষটার বিকৃত হাসিটা যেন এখনও কানে বাজছে।
“I’ll make you beg. You’ll call for your father…”
কিন্তু এজওয়ানকে এসবের চেয়েও বেশি ভাবাচ্ছিল একটি বিষয়। লোকটা তার নাম জানে। এটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ভিডিওতে সে যেভাবে এজওয়ানকে উদ্দেশ্য করে কথা বলেছে, তাতে স্পষ্ট সে অনেক দিন ধরেই এজওয়ানকে পর্যবেক্ষণ করছে। গাড়িটা ধীরে ধীরে এজওয়ানের বাড়ির সামনে এসে থামল। এজওয়ান গাড়ি থেকে নেমেই থমকে দাঁড়াল। দরজার ঠিক সামনে ছোট্ট একটি কালো ধাতব কেস পড়ে আছে। কোনো ঠিকানা নেই।কোনো প্রেরকের নাম নেই। শুধু ওপরের দিকে লাল রঙে আঁকা একটি বিকৃত হাসিমুখ।
“এটা এখানে কে রাখলো?”

মাহির প্রশ্নের উত্তর এজওয়ান দিল না। সে কেমনে জানবে এটা কে রাখছে এখানে! কোমরের হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে পুরো চারপাশে নজর বুলিয়ে নিল।অন্ধকার বাগান। খালি রাস্তা। কোথাও কেউ নেই। তারপর কব্জির ঘড়ির ভেতরে থাকা স্ক্যানার চালু করল। কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল,
NO EXPLOSIVE DETECTED. কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। এজওয়ান ধীরে ধীরে কেসটা তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল।
ড্রইংরুমের আলো নিভিয়ে শুধু বড় টেলিভিশনটা চালু করল এজওয়ান। কেস খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল একটি কালো মেমোরি কার্ড। কার্ডটা টিভির মিডিয়া সিস্টেমে প্রবেশ করাতেই স্ক্রিন কালো হয়ে গেল। তারপর ঘররররর,ঘ্যাঁআআআর। আবার সেই বিকৃত শব্দ। মাহি ভ্রু কুঁচকে ফেললো। অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল সেই পরিচিত অবয়ব। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাক।কালো গ্লাভস। কালো মাস্ক। চোখের জায়গায় কালো ভিসর। এবারও এক ফোঁটা চামড়াও দৃশ্যমান নয়। সে কয়েক সেকেন্ড নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বিকৃত কণ্ঠে হেসে উঠল।

“Hello… Captain Ajwan…”
এজওয়ান স্থির। এই বাইন**দ আবার কি বলার জন্য এটা পাঠিয়েছে? মাহি তাকিয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে ।
মনস্টার আবার বলল,
“No… I should correct myself. Not just Captain. Secret Intelligence Officer Ajwan.”
মাহির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস নিয়ে এজওয়ানের দিকে তাকাল।
” আপনি ..!”
এজওয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি শুধু স্ক্রিনে। মনস্টারের বিকৃত হাসি আরও জোরালো হলো।
“Surprised? Did you really think your little secret would stay buried forever?”
সে ধীরে ধীরে ক্যামেরার আরও কাছে এগিয়ে এল।
“Your intelligence organisation did an excellent job hiding you. Excellent. but not perfect.”
এজওয়ানের চোখে এবার ক্ষীণ বিস্ময় ফুটে উঠল। কুত্তার বাচ্চা মরা কুত্তার গু খেয়ে হয়তো এজওয়ানের পেছনে লেগেছে। মনস্টার আবার বললো,

“Ajwan Sultan a remarkable name. But your arrogance is far greater than your reputation. They call you a genius.The man who builds impossible systems. The man who breaks impossible codes. The man who never fails a hunt. How amusing.
মনস্টার ধীরে ধীরে ক্যামেরার দিকে তার মিডেল আঙুল তুলে ধরে বলল,
“ But this time.You’re not the hunter. You’re the prey. And I’m the predator. You’ve spent your whole life hiding behind different identities. Differentiated uniforms. Different faces. But no mask can hide your scent from me. Right now. You’re asking yourself one question. How does he know? Keep thinking. Question everyone. Doubt everyone. Every second you waste looking over your shoulder. brings me one step closer. Death? No. Death would be mercy. I’m going to destroy your pride. Break your confidence. And prove to the world.That the great Ajwan. was never that great. Search every city. Hack every network. Deploy every soldier you have. You won’t find me. until I decide you deserve to. The game has already begun, Ajwan. And I’ll be the one writing the ending. See you very soon. If you live long enough. ”

ভিডিও শেষ। ঘর নিস্তব্ধ। মাহি ধীরে ধীরে এজওয়ানের দিকে ফিরলো।
” আপনি অস্ট্রেলিয়ার ইন্টেলিজেন্সেও কাজ করেন! কত পরিচয় আপনার! আর কি কি লুকিয়ে রেখেছেন আমার থেকে? আর কত বিস্ময় হওয়ার বাকি? ”
এজওয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলো। এই পরিচয় ডিপার্টমেন্টের জানে হাতে গোনা কয়েকজন। পৃথিবীর অন্য কারও আর জানার কথা নয়।
“এই পরিচয় আমার পরিবারও জানে না।”
“তাহলে ও জানলো কীভাবে?”
এজওয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার মাথার ভেতরে তখন দ্রুত হিসাব চলছে। রাত প্রায় একটা। অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার ভূগর্ভস্থ অপারেশন সেন্টারে ঢুকেই এজওয়ান নিজের পরিচয়পত্র স্ক্যান করল। একে একে তিনটি নিরাপত্তা দরজা খুলে গেল। ডিরেক্টর, ডেপুটি ডিরেক্টর এবং কয়েকজন সিনিয়র অফিসার ইতোমধ্যেই কনফারেন্স রুমে উপস্থিত। ভিডিওটি সবাইকে দেখানো হলো। ভিডিও শেষ হওয়ার পর পুরো কক্ষে নীরবতা। ডিরেক্টর ধীরে বললেন,

“এটা অসম্ভব…”
এজওয়ান শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“অসম্ভব নয়।”
সবাই তার দিকে তাকাল। সে টেবিলের ওপর হাত রাখলো।
“আমার গোপন পরিচয় জানে মাত্র আটজন মানুষ।”
“আমি,আপনি,আর বাকি ছয়জন। এর বাইরে কেউ জানে না।”
রুমের ভেতর চাপা গুঞ্জন উঠল। ডিরেক্টর বললেন,
“তুমি কী বলতে চাইছো?”
এজওয়ান ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমাদের মধ্যেই একজন তথ্য পাচার করছে।”
একজন সিনিয়র অফিসার প্রতিবাদ করলেন,
“অসম্ভব।”

এজওয়ান তার দিকে তাকালও না। সে বড় স্ক্রিনে উপস্থিত ছয়জনের সার্ভিস রেকর্ড, লগইন হিস্ট্রি এবং অপারেশন অ্যাক্সেস একে একে খুলে দেখাতে লাগল। সবাই যখন একাধিক নাম নিয়ে আলোচনা করছে, তখন এজওয়ানের চোখ আটকে গেল একজনের ওপর। ড্যানিয়েল ক্রস।সাইবার অপারেশন বিশ্লেষক। মাত্র তিন মাস আগে বদলি হয়ে এসেছে। ফাইলে সব ঠিকঠাক। কিন্তু,একটি ছোট্ট অসঙ্গতি। প্রতিটি গোপন অপারেশনের ফাইল সে প্রয়োজনের তুলনায় গড়ে সাত মিনিট বেশি সময় খুলে রেখেছে। কেন? কেউ খেয়াল করেনি। এজওয়ান করেছে। সে কিছু বলল না। মনে মনে শুধু একটি নাম লিখে রাখল। Daniel Cross.

পরদিন সকাল। ড্যানিয়েল নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছে। সে জানেও না, তার কফির কাপ নামানোর মুহূর্তে এজওয়ান পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তার ল্যাপটপের নিচে নখের চেয়েও ছোট একটি স্বচ্ছ চিপ বসিয়ে দিয়েছে।
চিপটি এজওয়ানের নিজের তৈরি। কোনো বাজারে এর অস্তিত্ব নেই। এটা শুধু লোকেশন ট্র্যাক করে না। এটি আশপাশের ওয়্যারলেস সিগন্যাল, এনক্রিপ্টেড ডাটা ট্রান্সফার এবং অস্বাভাবিক নেটওয়ার্ক কার্যকলাপও নীরবে রেকর্ড করে। কেউ বুঝতেই পারবে না। এজওয়ান ধীরে ধীরে হেঁটে নিজের বাড়িতে ফিরে এল। তারপর নিজের ফোনে বিশেষ অ্যাপ চালু করলো। স্ক্রিনে একটি মাত্র সবুজ বিন্দু জ্বলে উঠল। তার নিচে লেখা,TARGET CONNECTED.
এজওয়ানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে খুব আস্তে বলল,

” আমার ধারণা যদি সত্যি হয়… তাহলে তুমিই আমাকে মনস্টার অব্দি নিয়ে যাবে। ”
এরিমধ্যে এজওয়ান খবর পেলো কেউ তার বাবাকে মেরেছে। মনস্টারের কাজ নয় তো? হতেও পারে। অস্বাভাবিক নয়। বাবার এই অবস্থার খবর শুনেই তৎক্ষনাৎ সোলেমান কে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছে,
“ হ্যালো,হ্যালো ভাইজান, বাবা এখন কেমন আছে? কে মারছে তারে? কোন বাইন**দের এত বড় সাহস হয়?”
সোলেমান কন্ঠ খাদে নামিয়ে মন মরা হয়ে বলল,

“ জানি না রে। কত শত্রু যে তোর বাপ জুটিয়ে বসে আছে। মেরেছে হয়তো তাদের মধ্যকার কোনো বাইন**দ। তুই চিন্তা করিস না। আমি সব সামলে নিব। এনজয় ইয়্যুর ম্যারিড লাইফ। সব ঝামেলা সামলানোর জন্য সোলেমান আছে না? ”

দাহশয্যা পর্ব ৯৬ (২)

“ খোঁজ পেয়ে জানাও আমায়। কলিজা বের করে নিয়ে আসবো। ”
“ আমিই বের করে নিয়ে আসবো। তোর হাত নষ্ট করার কি দরকার? নিজের বউয়ের কলিজার ভেতর জায়গা বানানোর চেষ্টা কর। এখন রাখি। চাচার অপরাধী দের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। ”
সোলেমান ফোনটা কেটে শিস বাজাতে বাজাতে চলে গেলো হসপিটাল থেকে।

দাহশয্যা পর্ব ৯৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here