বজ্রমেঘ পর্ব ৪০
ফাবিয়াহ্ মমো
রাত নেমেছে। যে গর্জন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, সেখানে পদত্যাগ যেন সময়ের দাবি। রাত দুটোর দিকে একটি দলকে ভেতরে ডাকা হলো। এই আন্দোলনের মূখ্য আহ্বায়ক ছিল শামস রেজা। নেতৃত্বে থাকা কজন শিক্ষার্থী নিয়ে ভেতরে ঢুকল। শ্রেষ্ঠা ভিসির লজে ঢুকতে ঢুকতে একবার পিছু তাকাল। নাযীফের দিকে চোখ ইশারা করল। নাযীফ ধীরে মাথা নাড়াল। শাওলিন বুঝল ভেতরে যদি কিছু হয়, ফ্রন্টে দাঁড়াবে সোহানা। রক্তশীতল অনুভূতি হলো শাওলিনের। পাশ থেকে কেউ একজন বলল,
– যদি ব্ল্যাকমেইল করে, ডাইরেক্ট ভেতরে ঢুকব!
আরেকজন চাপা গর্জন করে বলল,
– একটা সাইরেন! যুদ্ধ ঘোষণা করতে দেরি হবে না। তারপর যা হবে, ডু অর ডাই।
শাওলিন কথাগুলো শুনল। এই ক্যাম্পাসে আসার পর সক্রিয় আন্দোলনে এই প্রথম যোগ দিল। হঠাৎ বাম বাহুতে টোকা পেল। চমকে পাশে তাকাল শাওলিন। যুদ্ধের কথা বলা মেয়েটা এক বোতল ঠাণ্ডা পানি এগিয়ে বলল,
– গলা শুকায়ছে না?
শাওলিন পানিটা নিয়ে হাসল। মেয়েটাও মুচকি হাসি দিয়ে মেয়েদের ভেতর ঠাণ্ডা পানি বন্টন করতে লাগল। শাওলিন খেয়াল করল টোটব্যাগে ফোন বাজছে। বোতলটা হাতে নিয়ে কিছুটা দূরে গেল শাওলিন। ফোনটা বের করতেই দেখল রেবেকার কল। দুপুর আড়াই থেকে একের পর এক কল দিয়ে চলেছে। শাওলিন কানে ফোন চেপে বলল,
– হ্যালো, মণি।
কথাটা মাটিতেও পড়তে পারেনি। ককর্শ কণ্ঠে রেবেকা গর্জে উঠল,
– সাহস দেখে কিছু বলার ভাষা পাচ্ছি না।
শাওলিন ওড়নায় হাত মুঠো করে বলল,
– আপনি ভুল আশঙ্কা করছেন। এটা রাজনীতির জন্য না, একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ মণি।
– চুপ করো! আমাকে শেখাতে এসো না। তোমার যে বয়স সে বয়স আমিও পেরিয়েছি। নিজেকে বিরাট কিছু ভাবাতে চাও?
শাওলিন অবাক কণ্ঠে বলল,
– আমি বিরাট কিছু ভাবব কেন? আমার ক্যাম্পাসে একটা অন্যায় হচ্ছে, আমি প্রতিবাদ করব না?
– আর মানুষ নেই? ক্যাম্পাসে কী তুমি একা? যাদের এইসব অন্যায় লাগে, তাদের মিছিল। তুমি এসবে নাম ঢুকিয়ে টার্গেট হচ্ছ কেন? বাসায় ফিরো!
শাওলিন কথা বলল না। চোখের সামনে দুটো দৃশ্য দেখতে পেল। মাঠের একদিকে ছেলেরা এশার সালাতে দাঁড়িয়েছে। ইমামতি করছে স্নাতক চতুর্থ বর্ষের এক যুবক। আল্লাহু আকবর ভেসে এল। মাঠের অন্যদিকে বাকিরা নিজেদের মতো প্রতিবাদ চালাচ্ছে। কেউ মাঠ ছাড়বে না। শাওলিন শান্তভাবে ঢোক গিলে কান বদলাল। ফোন অন্যহাতে ধরে বলল,
– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। আর আপনি ঢাবির প্রাক্তন ছাত্রী। রাখি মণি।
কল কেটে দিল শাওলিন। পূর্বের জায়গায় ফিরে এসে বসল। অন্যদিকে রেবেকা ঠোঁটদুটো ফাঁক করে ফেলেছে। ধপ করে সোফায় বসে পড়ল সে। ঢোক গিলে ভাবছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ইতিহাস হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের কারিগর। সক্রিয় আন্দোলন রক্তে ঢুকে গেলে মৃত্যুভয় থাকে না।
ধানমণ্ডি, রাত আড়াইটা। অভিজাত এলাকাটা নির্জন থমথমে। দুটো নেড়ি কুকুর ঘেউউ স্বরে ডাকছে। মর্তুজা মেনশনের দোতলা থেকে উঁকি দিয়ে দেখল তাশফিয়া। পড়ার টেবিলে বসে কলেজের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় বাড়ির নিচতলায় বিকট শব্দ হলো। চমকে চেয়ার থেকে ঘুরে তাকাল তাশফিয়া। বুকে তিনবার থুথু দিয়ে ভয় দূর করল। নিচতলা থেকে কান ফাটানো স্বরে টেলিফোন বাজছে। তাশফিয়া জানে এটা ওর বাবা আনোয়ার মর্তুজার স্টাডিরুম থেকে আসছে। দ্রুত নিচে নামতেই ঘুম চোখে আনোয়ারকে হেঁটে যেতে দেখল তাশফিয়া। আনোয়ার মর্তুজা ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন। তাশফিয়া একবার ভাবল নিচে নামবে, কিন্তু পরমুহুর্তে মাঝ সিঁড়ি থেকে উপরে যেতে উদ্যত হলো। সবে এক পা উঠিয়েছে, এমন সময় ভয়ানক চিৎকার ভেসে এল। তাশফিয়া ভয়ে নিচে তাকাতেই বুঝল কণ্ঠটা বাবার! ধপ ধপ করে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল তাশফিয়া। আনোয়ার মর্তুজা মেঝেতে বসে আছেন। টেলিফোন তার থেকে নিচে ঝুলছে। তাশফিয়ার মনে কু ডাক দিল। দৌড়ে বাবার পাশে বসে শুধাতে লাগল,
– বাবা, কী হয়েছে? বাবা, বলো না!
আনোয়ার যেন মূর্তি বনে গেছেন। পিঠ সোফায় হেলান দিয়ে আছে। তাশফিয়া টেলিফোনের দিকে তাকিয়ে ওটা আগের জায়গায় রাখল। নিরুপায় হয়ে এক দৌড়ে মা, চাচি সবাইকে ডেকে জড়ো করল। আনোয়ার মর্তুজার চিৎকারে সবারই ঘুম ভেঙে গেছিল। স্টাডিরুমে পৌঁছে সবাই জানতে পারল তাহমিদ আর নেই। ঢাকার একটি হোটেলে আত্মহত্যা করেছে। মৃতদেহের পাশে একটি সুইসাইড নোট মিলেছে। সেখানে লেখা,
‘ আমি আর নিতে পারছি না। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তোমরা ভালো থেকো। ‘
ভোর সাড়ে চারটায় অ্যালার্ম বেজে উঠল। শব্দটা বন্ধ করল শোয়েব। রাতটা নির্ঘুম কাটল। তার পূর্ণ মনোযোগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। খবর পাচ্ছিল ভিসি পদত্যাগ করেনি। তবে শিক্ষার্থীদের সমস্ত দাবি মেনে নিয়েছে। অনৈতিক অর্থ বাজেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাণ্ডে যুক্ত হবে। ঠিক এমন সময় একটা অদ্ভুত কল এল। ইউএস থেকে কল আসার আগে ইঙ্গিত পায়, কিন্তু এই কল কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ড্রেসিংটেবিলের কাছ থেকে ফোনটা তুলল শোয়েব। নাম্বারটা দেখে ফোন কানে ধরল। এক মিনিট কোনো কথা বলল না। তারপর ওপাশ থেকেই গম্ভীর স্বরে কেউ বলল,
– এতো রাতে কল দেয়ার ইচ্ছে ছিল না।
শোয়েব শান্ত ভাবে বলল,
– সমস্যা নেই।
– তাহমিদ আত্মহত্যা করেছে। ব্যাপারটা খুব ডিস্টার্বিং।
– ডিস্টার্বিং হওয়া স্বাভাবিক। কারণ সে আত্মহত্যা করবে না।
– আলামত এটাই বলছে সে আত্মহত্যা করেছে।
– মিথ্যা আলামত সাজানো খুব কঠিন কিছু না।
– আপনি এই ঘটনাকে মার্ডার বলছেন?
– সন্দেহ নেই।
– ডিজিএফআই কিছু আঁচ করেছে। তাদের লিষ্ট থেকে কিছু লোক নিরাপদে কাভার পাচ্ছে। এটা কাকতালীয় হতে পারে না।
– আমাকে কী করতে হবে?
– প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলবেন না। একবার সন্ধান পেলে নাম নিশানা ঘুচিয়ে ফেলবে।
শোয়েব নিরুত্তর থাকল। কিছুক্ষণ ভাবনা সেরে বলল,
– পাঁচ মিনিট শেষ হচ্ছে। কল কেটে দাও তাশরিফ। নিজের প্রাণ ঝুঁকিতে ফেলো না।
– শেষ কথা। কাল এবং পরশু সাবধানে থাকবেন। যেকোনো সময় কিছু ঘটে যেতে পারে।
বিশেষ ফোনটি কেটে দিল তাশরিফ। শোয়েব ব্যবহৃত ফোনটি ক্লোজেটের লকআপে রেখে দিল।
পরদিন সকাল থেকে আকাশ কালো। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ব্যস্ত সড়কে হাঁটুজল পানি। পানি কেটে একের পর এক গাড়ি ঢুকে যাচ্ছে ধানমণ্ডির মর্তুজা মেনশনে। শোকের মাতম পরিবেশ ভারি করেছে। কিছুক্ষণ পরপর নারী গলার আহাজারি ভেসে আসছে। ময়নাতদন্তের পর লাশবাহী সাদা অ্যাম্বুলেন্সে তাহমিদের মরদেহ চলে এসেছে। রেবেকা খবর পেয়ে সিলেট থেকে রওনা দিয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন আসতে একদিন লাগবে। জানাজা সম্পন্ন হবে আগামীকাল বাদ জোহরে। খবরটা পেয়ে যায় শাওলিন। হলে নিজের রুমে শুয়ে আছে। ঐশ্বর্য দুটো স্যালাইন পানিতে গুলে ওকে এক বোতল দিল,
– এটা খা। তোকে আমার স্কুটিতে করে বাসায় দিয়ে আসব নে।
শাওলিন এক লিটারের সবুজ বোতলটা নিল। স্যালাইনের পানিটা ঢকঢক করে খেয়ে ঐশ্বর্যের দিকে বলল,
– তুই বাসায় যাবি না? হল তো ছাড়তে বলল।
ঐশ্বর্য নিজের বোতলটা নিয়ে বিছানায় বসল। মাথা না সূচক নেড়ে বলল,
– অর্পার বাসায় যাব। অর্পার বাপ-মা গ্রামে গেছে। ওখানে দেদারসে কদিন স্টে করা যাবে।
– আঙ্কেল শুনলে?
ঐশ্বর্য চোখ তুলে তাকাল। কঠোর চোখে তাকাতে গিয়ে নরম হয়ে গেল। মেঝেতে চোখ রেখে বলল,
– শুনলে আরকি? হাতখরচের টাকা বন্ধ করে দিবে। দিক গা। ওই বালের টাকা আমি চু*!
গালিটা শুনে শাওলিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
– গালিটা যাকে দিলি সে শুনল?
ঐশ্বর্য ব্যথিত চোখ তুলে তাকাল। রাগে কণ্ঠস্বর কাঁপতে কাঁপতে বলল,
– ওই লোক বাপ নামের কলঙ্ক! আমার চোখের সামনে আম্মুকে কুত্তার মতো মারতো। আম্মুকে গালাগাল দিতো। তার দোষ কী ছিল? আম্মু শুধু বলতো, যার তার সাথে শুইতে না। মদ খাইতে না। ওই শূয়ো*টা তারপরও শুইতো। মদ খাইতো!
শাওলিন বালিশে মাথা রেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরাল। ঐশ্বর্য ভালো নেই। ছোটো থেকে বাবা-মায়ের বিরূপ দাম্পত্য ওর ছোট্ট মনে দাগ কেটেছে। ঐশ্বর্য ওর বাবাকে ঘৃণা করে। চরম ঘৃণা। ওর বাবার জন্যই মা ওকে ছেড়ে অন্য সংসারে চলে গেছে। সেখানে ঐশ্বর্যের জায়গা নেই। শাওলিন বহুক্ষণ পর বামের বেডে তাকাল। ঐশ্বর্য এখনো মাথা নিচু করে বসে আছে। মৃদু স্বরে ডাকল,
– ঐশ্বর্য,
ঐশ্বর্য ধীরে মাথা উঠাল। শাওলিন স্থির গলায় বলল,
– তুই টিউশন শুরু কর। অর্পার ছোটো ভাইকে তুই পড়াতে পারিস। হাতখরচের টাকা নিজে উপার্জন করলে তোকে কারো কাছে হাত পাততে হবে না।
ঐশ্বর্য থম ধরে বসে রইল। চোখদুটো অশ্রুতে টলমল করছে। শাওলিন তর্জনী তুলে ঐশ্বর্যের বেডে একটা প্যাকেটে দেখিয়ে বলল,
– সিগারেট ছেড়ে দে। যে সার্কেলটাকে বন্ধু মানিস ওরা সুখের মাছি। এরা সুখ ফুরালেই হারিয়ে যাবে।
ঐশ্বর্য একপলক সিগারেটের প্যাকেট দেখল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল,
– কিন্তু সিগারেট না খেলে খুব যন্ত্রণা হয়, জানা।
– ওটা নেশা। নেশা কাটানোর ঔষুধ শুধুমাত্র জেদ। এই জেদ তোর ভেতর আছে। তোর বাবাকে দেখিয়ে দে, জেদের নেশাটা কেমন। হার মানিস না ঐশ্বর্য। পারবি।
ঐশ্বর্যের দুচোখ ঝরঝর করে অশ্রু ঝরাল। কিন্তু নিঃশব্দে চুপ করে রইল। শাওলিনের দিকে হাসি দিল। শাওলিন কিছু বলল না।
ইনকোর্স, আন্দোলন, হল দখলের অস্থিরতায় চোখের পলকে দিনগুলো কেটে গেল। নিত্য এই ঘটনায় শাওলিন অপ্রকাশ্য এক মানসিক চাপে আক্রান্ত হলো। মাঝে তাহমিদের আত্মহত্যার খবর এবং সেখানে গিয়ে রেবেকার কটুক্তি আচরণ ওকে রেহাই দিল না। শ্রেষ্ঠা ছাত্ররাজনীতিতে সেদিনের পর আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে গেছে। নাযীফ আজও স্বীকার করেনি তার ক্যামেরায় কী ছিল। রোজা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। প্লাটলেটস নেমে হাসপাতালে ভর্তি। শেষ ইনকোর্স পরীক্ষাটা কাল। শাওলিন পরীক্ষার পর হল ছেড়ে কলাবাগানের ফ্ল্যাটে ফিরবে। রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। রুমে ঐশ্বর্য মৃদু ভলিউমে গান বাজাচ্ছে। গানটাও করুণ সুরের। ঐশ্বর্য গুনগুন সুর তুলে বলল,
– জানা, একটা কথা বলতে চাই। তুই মানবি?
শাওলিন মুখের ওপর দুহাতে গল্পের বই ধরেছিল। বই সরিয়ে বলল,
– কী?
– ভাইয়ার ছবি তো দেখালি না?
শাওলিন বিয়ের তথ্য ঐশ্বর্যকে দিয়েছে। রুমমেট হবার দরুন ঐশ্বর্য কিছু ঘটনা বুঝতে পারতো। শ্রেষ্ঠা বা সোহানা সৎ থাকলেও রোজা গল্পের আসরে গোপনীয়তা রক্ষা করতো না। শাওলিন ফোন হাতে নিল। অনেক খুঁজেও স্বামী মানুষটার কোনো ছবি পেল না। কী লজ্জার কথা! বিয়ের একটা ছবিও ফোনে নেই। লজ্জায় মাথা কুটে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে চেক করল। হঠাৎ একটা ছবি কীভাবে যেন পেয়ে গেল। ছবিটা দেখেই গা কাঁটা দিতে লাগল। দুপাটি দাঁত শক্ত করল শাওলিন। নীল চোখদুটো! দ্রুত ফোনটা ঐশ্বর্যকে দিয়ে বলল,
– ছবি।
ঐশ্বর্য কপাল কুঁচকে শাওলিনকে দেখল। ছবিটা দেখেই কেমন জানি অস্থির হয়ে গেছে। ঐশ্বর্য ফোন হাতে নিয়ে গান বদলাল। শাওলিন দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে আছে। মুখের ওপর বই ধরে থাকলেও কানে নতুন গানটা শুনছে। শাওলিন মৃদু গলায় বলল,
– কেজিএফ ছবির এই গানটা আমার মুখস্ত। তোর এটা পছন্দ নাকি?
ঐশ্বর্য বিছানায় বসতে বসতে বলল,
– মেহবুবা গানটা শুনলেই ভালো লাগে। মনেহয় কল্পনার জগতে ভেসে যাচ্ছি।
শাওলিন মুচকি হাসলো। তবে কানে ঐশ্বর্যের হর্ষধ্বনি শুনতে দেরি হল না। অদ্ভুত আশ্চর্যে বলল,
– তোর স্বামীর চোখ এতো সুন্দর! কার জেনেটিক বৈশিষ্ট্য পেয়েছে?
শাওলিন কথাটা শুনে কেঁপে উঠল। মনে হলো প্রশংসাটা অন্য কাউকে করল না, ওকেই করল যেন। শোয়েবের কণ্ঠ, চাহনি, রাগ, অভিমান, ভালোবাসা সমস্ত কিছু ভেসে উঠল মনের পর্দায়। বিছানায় বসে শাওলিনকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরা। ঘামে ভেজা মাথায় শাওলিনের আঙুল ডুবিয়ে আদর। শাওলিন হাতের আঙুলগুলো দেখল। কতদিন তাকে স্পর্শ করেনি? কত সময়? ঐশ্বর্যের গলা আবার শুনতে পেল,
– সুপুরুষ ব্যক্তি। আমি সবুজ চোখ দেখেছি। কিন্তু নীল চোখ প্রথম দেখলাম।
শাওলিন পাশ ফিরে ঐশ্বর্যের দিকে তাকাল। হঠাৎই প্রশ্নটা করে বসল,
– নীল চোখ বাংলাদেশী কারো হয়?
ঐশ্বর্য ফোন থেকে চোখ তুলে বলল,
– হতে পারে, যদি পূর্বপুরুষদের কারো এই জেনেটিক সিম্পটম থাকে।
শাওলিন অন্যমনষ্ক হলো। ঐশ্বর্য ওর বিছানা থেকে শাওলিনের বিছানায় বসে বলল,
– একটা কথা বলি? জাস্ট আমার অবজারভেশন। আর কিচ্ছু না।
শাওলিন ভ্রম ভেঙে তাকাল। ঐশ্বর্য ছবিটার ভেতর চুলের কাট দেখিয়ে বলল,
– চুলের এই স্টাইলটাকে বলে ক্রু কাট। কানের আর ঘাড়ের দিকটা একদম ছাঁটা থাকে।
ঐশ্বর্যের কথায় শাওলিনের কপাল কুঁচকাতে থাকল। ঐশ্বর্য একটু থেমে আবার বলল,
– পরনে স্কাই ব্লু শার্ট। একটা ভাঁজ পর্যন্ত নেই। পায়ের জুতা ফুল পলিশড। মনে হচ্ছে একদম নতুন জুতা। এটা ডিসিপ্লিনের ইঙ্গিত।
শাওলিন ভ্রুঁ কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছিল। ছবিটা তুলেছিল নাযীফ। জিদানের ক্যামেরা থেকে হঠাৎ ছবিটা ক্লিক করেছিল। কালচে সবুজ জীপের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে শোয়েব। আকাশি নীল শার্ট। কালো প্যান্ট। চুলের কাটটা ভালোমতো দেখল শাওলিন। ঐশ্বর্য আঙুল দিয়ে ডানহাতে কিছু কড়া পরা দাগ দেখিয়ে বলল,
– ডানহাতের এই দাগগুলো আমার নির্লজ্জ বাপের হাতেও আছে।
শাওলিন চমকে বলে উঠল,
– এই দাগগুলো কীসের কারণে হয়?
ঐশ্বর্য সামান্য থামল। শাওলিনের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
– আমার বাবার হাতেও ঠিক এমন দাগ ছিল। পরে জানতে পারছিলাম, সারাক্ষণ অস্ত্র ব্যবহার করলে অনেকের এমন হয়।
শাওলিন জানে, বনবিভাগ থেকে বন্দুকের সাইলেন্স আছে। এটা খাগড়াছড়ি থাকতে দাদীর মুখে শুনেছিল। কিন্তু বন্দুক নিয়ে কখনো বেরুতে দেখতো না। এটা আশ্চর্য! ঐশ্বর্য শাওলিনের হাত ঝাকুনি দিয়ে বলল,
– কী রে! কী ভাবছিস?
শাওলিন চঞ্চল চোখে তাকাল। মনে দ্বিধার ঝড় নিয়ে বলল,
– যারা বন্দুক চালায়, তাদের হাতে এরকম দাগ পড়ে না? উনি ফরেস্ট অফিসার। বন বিভাগে কর্মরত।
ঐশ্বর্য কোনো কথা বলল না। কী যেন বলতে গিয়ে আঁটকে গেল। ছবিটায় আবার তাকিয়ে অদ্ভুত গলায় বলল,
– জানি না। হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।
শাওলিন চুপ করে রইল। ঐশ্বর্য আর কোনো কথা বলল না। নিজের বেডে ফিরে গান বদলাল। শাওলিন মনে মনে আকাশ-পাতাল ভেবে চলল। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা… খ্রিস্টানদের সঙ্গে চলা… পরিবারের সঙ্গে মিল নেই… পার্বত্যাঞ্চলে চাকরি… হাতে বিশেষ অস্ত্রের দাগ এতসব কিছু কাকতলীয় হতে পারে না। মনের গহীন থেকে শাওলিন প্রশ্ন করল, আপনি কে, ফারশাদ? আপনার অতীতের অংশ কোথায়? কেন সে অংশ সবাই ঢাকছে?
রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আকাশে টিমটিম করে ফুটছে নক্ষত্র। নির্জন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার উচ্ছলতা। ঐশ্বর্য ফোন স্ক্রল করছে। বিছানায় টেবিলল্যাম্প জ্বেলে, উপুড় হয়ে শুয়ে, শাওলিন টপিক সামারি লিখছে। এমন সময় রোকেয়ার নাম্বার থেকে অদ্ভুত কল এল। শাওলিন ভ্রুঁ কুঁচকে দেখল রাত তিনটারও বেশি বাজে। ওই বাড়িতে কিছু হলো নাকি? ভয়ে বুকটা সংকুচিত হয়ে গেল। শাওলিন ঝটপট কলটা ধরে কানে ঠেকাল। কিন্তু সহসা থমকে গেল। স্তব্ধ হতে হতে শোয়া থেকে উঠে বসছিল শাওলিন। রোকেয়া ওপাশ থেকে কল করে যা শোনাচ্ছে, তাতে গায়ের পশম কাঁটার মতো ফুটল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড শুধু নিস্তব্ধতা। তারপর ধীরে ধীরে একেকটা নোট ভেসে এল। কেউ খুব যত্ন করে পরিচিত একটা সুর ছুঁয়ে যাচ্ছে। টাচ লেগে লাউড স্পিকার চালু হতেই সারা রুমে সুরটা ছড়িয়ে গেল। ঐশ্বর্য ধড়াস করে উঠে বসে বলল,
বজ্রমেঘ পর্ব ৩৯
– পিয়ানো বাজাচ্ছে কে?
শাওলিন মূর্তিবৎ চোখে স্থির। কোনো কথা বলল না। ঐশ্বর্যের দিকে চেয়ে ফোনের দিকে ফিরে তাকাল। বুকের ভেতর এমন ধুকপুক হচ্ছে, যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে ছিঁটকে যাবে। ঠোঁট কাঁপছে। ঐশ্বর্য চরম বিস্ময়ে মুগ্ধচোখে বলল,
– ঈশ্বর! এটা… এটা তো মেহবুবার সুর!
শাওলিনের ঠোঁট নড়ল না। শুধু ফোনটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
