Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩১

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩১

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩১
সুমি চৌধুরী

পরদিন সকালে হায়দার শেখ ফিরে এলেন। সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে হাসিমুখে কথা বলে তিনি বৃষ্টিকে নিয়ে চলে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যেই রূপার মনটা যেন পাথর হয়ে গেল। এতদিন বৃষ্টির সঙ্গে কাটানো সময়, তার উপস্থিতিতে গড়ে ওঠা অদ্ভুত অভ্যাস সবকিছু এক নিমিষে গভীর শূন্যতায় পরিণত হলো। চারপাশটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছে। বুকের ভেতর অজানা এক ছটফটানি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে কলেজের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল রূপা।

এভাবেই কেটে গেল কয়েকটি মাস। এই অল্প সময়েই অনেক কিছু বদলে গেল। বাঁধন এখন প্রায় সবসময়ই রূপার দিকে নজর রাখে। তার চলাফেরা, কথা বলা, কোথায় যাচ্ছে সবকিছুতেই যেন এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। এমনকি ছোট ছোট বিষয় নিয়েও সে অধিকার ফলাতে শুরু করেছে।বিষয়টা রহমান পরিবারের সবার নজর এড়ায়নি। ভাই হিসেবে শাসন করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু বাঁধনের আচরণ যেন সেই সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। কখনো কখনো মনে হয়, একজন স্বামীও হয়তো তার স্ত্রীর ওপর এতটা কর্তৃত্ব দেখায় না। এ নিয়ে পরিবারের সবার মনেই অস্বস্তি আর সন্দেহের জন্ম নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই নিজেদেরই বুঝিয়ে নেয় হয়তো ভাই হিসেবে বাঁধন একটু বেশিই দায়িত্বশীল, তাই এমন করছে।এদিকে রূপাদের ফাইনাল পরীক্ষা একেবারে দরজায় কড়া নাড়ছে। আর মাত্র কয়েকদিন পরই পরীক্ষা। তবুও সে ডেলিভারির কাজ চালিয়ে গেছে। নিজের পরিশ্রমের প্রতিটি টাকা জমিয়ে অবশেষে বৃষ্টির কাছে নেওয়া সমস্ত টাকা ফিরিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের সেই দায় থেকে অবশেষে মুক্ত হয়েছে রূপা। আশ্চর্যের বিষয়, বাঁধন জানত যে রূপা ডেলিভারির কাজ করছে। কিন্তু সে এ নিয়ে একবারও কোনো প্রশ্ন করেনি, বাধাও দেয়নি। যেন কোনো অজানা কারণে নীরব থাকাকেই সে বেছে নিয়েছিল।

বিকেলের নরম আলোয় কলেজ ছুটি হলো। নাদিয়া, কেয়া আর বৃষ্টির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রূপা একটি রিকশায় উঠে বসল। আজ তার মনটা অদ্ভুত রকমের হালকা। কারণ কলেজের আসন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সে কবিতা আবৃত্তির জন্য নিজের নাম লিখিয়েছে। বহুদিন পর নিজের কোনো ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিতে পেরে তার ভেতরে এক অন্যরকম আনন্দ কাজ করছে।রিকশা থেকে নেমে বাসার সামনে এসে রূপা লক্ষ্য করল, দারোয়ানকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হয়তো খেতে গেছে, কিংবা ওয়াশরুমে।সে চারদিকে একবার তাকাল।পুরো জায়গাটা অস্বাভাবিকভাবে নির্জন। চারপাশে কেমন যেন কবরের মতো নিস্তব্ধতা। হালকা বাতাস গাছের পাতাগুলোকে দুলিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু সেই শব্দটুকুও যেন নীরবতার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে।অদ্ভুতভাবে এই নির্জনতাই রূপার মনকে আরও প্রফুল্ল করে তুলল। সে নিজের অজান্তেই ঠোঁটভরা হাসিতে খিলখিল করে উঠল। তারপর দু’হাত সামান্য ছড়িয়ে, শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে কয়েক পা নেচে উঠল যেন বহুদিন পর নিজের ভেতরের মুক্ত পাখিটাকে আবার খুঁজে পেয়েছে। খুশিতে নাচতে নাচতে এতটাই মগ্ন হয়ে গেল যে চারপাশের সবকিছু ভুলে গেল। বুকের ভেতরে জমে থাকা আনন্দ যেন আজ আর কোনো বাঁধ মানতে চায় না। মৃদু বাতাসে দুলে উঠছে হিজাবের প্রান্ত, আর সেই বাতাসের ছন্দে নিজের অজান্তেই ঘুরে ঘুরে নাচছে রূপা। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে নিষ্পাপ এক হাসি। এই মুহূর্তে পৃথিবীটা যেন শুধু তারই।

অন্যদিকে, বাড়ির বাগানে হাঁটতে বের হয়েছিল বাঁধন। ভালো লাগছিল না কিছু, তাই একটু নির্জনতায় সময় কাটাতে বাগানে এসেছিল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর বাড়ির ভেতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় সে। ঠিক তখনই তার চোখ যায় বাড়ির মূল গেটের দিকে।আর পরমুহূর্তেই থেমে যায় বাঁধন।চোখ বন্ধ করে নিজের ছোট্ট পৃথিবীতে হারিয়ে নাচছে রূপা।নাচের তালে তালে হিজাবটা আলগা হয়ে কাঁধের দিকে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই তার।মেয়েটা এতটাই মগ্ন যে তার প্রতিটি ঘূর্ণন, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস অজান্তেই যে কারও হৃদয়ে ঝড় তুলে দিচ্ছে। অথচ সে নিজেই বুঝতে পারছে না, কেউ একজন নিঃশব্দে তার সেই উচ্ছ্বাসে হারিয়ে যাচ্ছে।নিঃশব্দে এগিয়ে আসে বাঁধন।কোনো শব্দ না করে দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে গেটে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে সামনে থাকা অষ্টাদশীর দিকে। গভীর, নিশ্চুপ সেই দৃষ্টিতে যেন লুকিয়ে আছে শত না-বলা কথা। চারপাশের নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে ওঠে, অথচ সেই নীরবতা ভাঙার প্রয়োজনও বোধ করে না বাঁধন।নাচতে নাচতে একসময় গোল হয়ে ঘুরে সামনে তাকাতেই থমকে গেল রূপা।বুকের ভেতরটা পরিচিতভাবে ধক করে উঠল।

বাদামি চোখজোড়া স্থির হলো গেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটির দিকে।পুরুষটির শরীরে জড়িয়ে আছে আকাশি রঙের শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। গোটানো হাতার নিচে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দৃঢ় দুটো বাহু। পরনে ধবধবে সাদা জিন্স, পায়ে সাদা স্নিকার্স, বাঁ হাতে রুপালি ডায়ালের ঘড়ি। বিকেলের শেষ আলো এসে পড়েছে তার মুখের একপাশে, আর অন্য পাশটা ডুবে আছে হালকা ছায়ায়। আলো-ছায়ার সেই মিশেলে মানুষটাকে যেন আরও গম্ভীর, আরও দুর্বোধ্য, আরও মোহময় লাগছে।ইস পুরুষটাকে এতটা মোহময় লাগছে কেন।হঠাৎই মস্তিষ্ক কাজ করে রূপার।সে নেচেছে আর সবটাই দেখে ফেলেছে বাঁধন। লজ্জা আর ভয়ে এক মুহূর্তও সময় নেয় না। দুই হাতে ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, ধরা পড়ে যাওয়া কোনো দুষ্টু বাচ্চার মতো মাথা নিচু করে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।

অষ্টাদশীর হঠাৎ দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার মানেটা প্রথমে বুঝতে পারে না বাঁধন।কপালটা সামান্য কুঁচকে আসে তার।কী হলো? এভাবে দৌড়ে পালাল কেন?কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে সে। তারপরই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটু আগের দৃশ্যটা। চোখ বন্ধ করে প্রাণ খুলে নাচছিল রূপা। আর তাকে দেখামাত্রই লজ্জায় দৌড়ে পালিয়ে গেল।পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ফুটে ওঠে এক চিলতে দুষ্টু হাসি।লজ্জা পেয়েছে।মনে মনে কথাটা বলেই ধীর পায়ে গেটের বাইরে এসে দাঁড়ায় বাঁধন। একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। আশপাশটা একেবারে নিরিবিলি। মৃদু বাতাসে দুলছে গাছের পাতাগুলো। ঠিক সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ঘুরে ঘুরে নাচছিল রূপা।দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে বাঁধন।তারপর হঠাৎই নিজের অজান্তে রূপার নাচের ভঙ্গিটা নকল করে এক পাক ঘুরে ওঠে।নিজেই নিজের কাণ্ডে মুচকি হেসে আবারও ঘুরে দাঁড়ায়।পা দুটো যেন আপনাআপনিই ছন্দ খুঁজে নেয়। এক পা সামনে, এক পা পেছনে। কাঁধ দুলিয়ে, মাথা হালকা ঝাঁকিয়ে ঠিক রূপার মতো করেই নাচতে শুরু করে বাঁধন।নাচতে নাচতেই গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে।

“যদি চাস মনের ঘোরে আমায় বেঁধে রাখ না”
“ভালোবেসে অক্টবেশে আমার সাথে চল না”
“যদি বলি তোরে আমি দেবো ফুলের মালা”
“তবে কি মিঠাবী আমার প্রেমের জ্বালা”
গানের তালে তালে দুই পা স্টাইল করে এগিয়ে যায় বাঁধন। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে দুষ্টু এক হাসি। তারপর মুখ তুলে তাকায় রূপার ঘরের বারান্দার দিকে।চোখের দৃষ্টিটা মুহূর্তেই নরম হয়ে আসে।বারান্দার দিকেই তাকিয়ে আবারও গেয়ে ওঠে।
“তোকে না পেলে আমি যাবো মরে”
“তোরই লাগে দিলে করে ধাক ধাক রে”
“বন্ধু তোরে চাই আমি নিশি আধারে”
“ভালোবাসা দেব তোরে যতনও করে”

অন্যদিকে, বাঁধনকে নিজের করে নেওয়ার জেদটা যেন দিন দিন আরও প্রবল হয়ে উঠছে শান্তার। কিন্তু কোনোভাবেই পাত্তা দিচ্ছে না বাঁধনের কাছ থেকে। যেন রূপার মোহে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেছে মানুষটা। শান্তা সামনে থাকুক কিংবা দূরে, তার দৃষ্টি যেন খুঁজে ফেরে শুধু একজনকেই। বাসায় শান্তার বিয়ের কথাও জোরেশোরে চলছে। যে কোনো দিন পাত্রপক্ষ তাকে দেখতে চলে আসতে পারে। বিষয়টা যতই ভাবছে, ততই অস্থির হয়ে উঠছে সে। কারণ নিজের হৃদয়টা যে অনেক আগেই বাঁধনের কাছে হার মেনেছে।নিজের মনেই একরকম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে শান্তা।যেভাবেই হোক, বাঁধনকে নিজের করেই ছাড়বে সে।কিন্তু কীভাবে।যে পুরুষ তাকে কানা কড়ির সমান মূল্যও দিচ্ছে না, তাকে নিজের করে পাওয়া কি এতটাই সহজ।মনটা আরও ভারী হয়ে ওঠে শান্তার।মন খারাপ হলেই প্রায় তার বেস্ট ফ্রেন্ড তৃষার বাসায় চলে আসে সে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। চুপচাপ গিয়ে বসে আছে তৃষার ঘরের বিছানায়। মুখজুড়ে বিষণ্নতার ছাপ, চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা।ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার নিয়ে বের হয় তৃষা। ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতেই চোখ পড়ে বিছানায় বসে থাকা শান্তার দিকে। শান্তার মুখটা দেখেই বুঝে যাচ্ছে, ভেতরে ভেতরে কিছু একটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পাশে বসে তৃষা।

—-” কী হয়েছে? তোকে এতটা মনমরা লাগছে কেন?”
দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে শান্তা।
—-” কোনোভাবেই বাঁধনকে নিজের দিকে টানতে পারছি না। আমাকে তো সে বিন্দুমাত্র গুরুত্বই দিচ্ছে না।”
শান্তার প্রতিটি কথা মন দিয়ে শোনে তৃষা। কারণ বাঁধনকে ঘিরে শান্তার অনুভূতির শুরু থেকে শেষ সবটাই জানা আছে তার।কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ কী যেন ভাবতে থাকে সে।তারপর ধীরস্বরে বলে,
—-” তার মানে বাঁধন তার সৎবোনের প্রতিই আসক্ত।”
মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় শান্তা।
—-” দোস, কিছুই বুঝতে পারছি না। বাসায় আমার বিয়ের কথা চলছে। যে কোনো সময় পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। অথচ আমার কিছুই ভালো লাগছে না।”
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে তৃষা।হঠাৎই যেন মাথায় কোনো বুদ্ধি খেলে যায় তার।ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে শয়তানি এক হাসি। চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে অদ্ভুত এক আনন্দে।শান্তার দিকে তাকিয়ে রহস্যময় কণ্ঠে বলে।

—-” মন খারাপ করিস না, দোস একটা উপায় আছে।”
কৌতূহলী দৃষ্টিতে তৃষার দিকে তাকিয়ে বলে শান্তা,
—-” কী উপায়?”
মুচকি হেসে শান্তার দিকে তাকিয়ে বলে তৃষা,
—-” তোর কাছে কী বাঁধনের কোনো ছবি আছে?”
মাথা নেড়ে বলে শান্তা,
—-” হ্যাঁ, আছে। কেন?”
ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসিটা আরও গাঢ় করে বলে তৃষা,
—-” তাহলে মন দিয়ে শোন।”
অতঃপর ধীরে ধীরে নিজের পরিকল্পনাটা খুলে বলে তৃষা। কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে শান্তা। পরিকল্পনার শেষটুকু শুনতেই বিস্ময়ে বড় হয়ে যায় তার চোখ। পরক্ষণেই আনন্দে জড়িয়ে ধরে তৃষাকে।উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে।
—-” দোস, বিশ্বাস কর, এমন বুদ্ধি আমার মাথাতেই আসেনি। তুই সত্যিই অসাধারণ!”
একজন আরেকজনের দিকে তাকাতেই ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একই রকম শয়তানি হাসি।পরমুহূর্তেই ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে দুই বান্ধবীর সেই রহস্যময় হাসি।

কলেজ থেকে ফিরে শাওয়ার নিয়েই গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল রূপা। ঘুম ভাঙতেই দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে, সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে।পাশ ফিরে তাকাতেই কপাল কুঁচকে আসে তার।ক্যান্ডি নেই।মুহূর্তেই ঘুমটা উড়ে যায়। এলোমেলো চুলে বিছানা থেকে উঠে পড়ে রূপা। তাড়াহুড়ো করে পুরো রুমে খুঁজতে শুরু করে। বিছানার নিচে, টেবিলের পাশে, পর্দার আড়ালে, এক কোণ থেকে আরেক কোণ, কিন্তু কোথাও ক্যান্ডির দেখা মেলে না।একই এলোমেলো চুলে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে আসে সে।ড্রয়িংরুমে বসে হাজি রহমানের সঙ্গে কোনো একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছে আকাশ। এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে সে।অস্থির পায়ে আকাশের সামনে এসে বলে রূপা,
—-” ভাইয়া, আমার ক্যান্ডিকে দেখেছ?”

রূপার এলোমেলো চুল আর ঘুমভাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে আসে আকাশের। বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
—-” না, দেখিনি। কিন্তু তুই এমন এলোমেলো চুলে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন?”
আকাশের কথার কোনো উত্তর না দিয়েই আবার নিজের রুমে ফিরে আসে রূপা। পুনরায় পুরো রুম খুঁজে দেখে, কিন্তু এবারও কোথাও ক্যান্ডির দেখা মেলে না।ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে সে।ঠোঁট দুটো অভিমানে ফুলিয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলে,
—-” ক্যান্ডি সোনা, কোথায় তুমি?”
ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করে রজনী রহমান। ফ্লোরে বসে থাকা রূপাকে দেখে কপাল কুঁচকে এগিয়ে আসে তিনি। এলোমেলো চুল আর অস্থির চেহারা দেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে রজনী রহমান,
—-” কী হয়েছে তোর, এভাবে ফ্লোরে বসে আছিস কেন? আর মাথার চুলের এই অবস্থা কেন?”
ঠোঁট ফুলিয়ে, চোখের জল সামলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে জবাব দেয় রূপা,
—-“ক্যান্ডিকে পাচ্ছি না।”
রজনী রহমানের হঠাৎ মনে পড়ে যায়, একটু আগে খরগোশটাকে তিনি বাঁধনের রুমের করিডোর দিয়ে যেতে দেখেছিলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন,

—-“ক্যান্ডিকে তো আমি বাঁধনের রুমের দিকে যেতে দেখেছিলাম।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে রূপার দুচোখ বড় বড় হয়ে উঠে। বাঁধনের রুমের দিকে? বাঁধনের রুমে মানে! সত্যি সত্যি আবার সে বাঁধনের রুমে ঢুকে পড়েনি তো? এর আগে একবার সে ওখানে গিয়ে বাঁধনের ল্যাপটপটা ভেঙে ফেলেছিল,এখন যদি আবার গিয়ে সে নতুন কিছু তছনছ করে, তবে তার মরণ নিশ্চিত!এক মুহূর্তও আর দেরি করল না রূপা। রজনী রহমানকে কিছু বলার প্রয়োজনও বোধ করল না সে, উষ্কখুষ্ক এলোমেলো চুলেই দৌড় শুরু করল বাঁধনের রুমের দিকে।পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন রজনী রহমান। মেয়ের এমন তাড়াহুড়ো আর বাঁধনের নাম শুনলেই তার অস্থির হয়ে ওঠার ভঙ্গিটা তিনি লক্ষ্য করলেন। মেয়েটা যেন ইদানীং তাকে বড্ড বেশি এড়িয়ে চলে, আগের মতো আর মা-মা বলে জড়িয়ে ধরে না । এই দূরত্ব আর রূপার আচরণ নিয়ে রজনী রহমানের মনে সন্দেহের মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করল।

বাঁধনের রুমের সামনে এসে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় রূপা। ভেতরটা নিস্তব্ধ, ছায়াময়। আশেপাশে চোখ বোলালেও ক্যান্ডির কোনো অস্তিত্ব নেই। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে, তবুও অদ্ভুত এক টানে সাহস সঞ্চয় করে ভেতরে পা রাখে সে। বেডের নিচে, টেবিলের কোণায়, ওয়ারড্রোবের ওপর তন্ন তন্ন করে খোঁজে। হঠাৎ এক মায়াবী, মোহনীয় শিস দেওয়ার শব্দ ভেসে আসে। শব্দটা যেন হাড় হিম করা কোনো সুরের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে। শিসের উৎস বাঁধনের ব্যালকনি। নিঃশব্দে পা টিপে টিপে সেদিকে এগোয় রূপা।
ব্যালকনিতে পা রাখতেই দৃশ্যটা দেখে পাথর হয়ে যায় সে। ছায়ামাখা চেয়ারে বসে আছে বাঁধন। তার কোলে সেই ল্যাপটপ, যা রূপারই কিনে দেওয়া। সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাঁধনের দুই হাতের মাঝে বন্দী ক্যান্ডি। খুব সাবধানে, প্রায় আচ্ছন্ন ভঙ্গিতে খরগোশটার মাথায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে সে, আর ঠোঁট বাঁকিয়ে বাজাচ্ছে সেই শীতল শিস। ক্যান্ডিটা যেন বাঁধনের জাদুতে আচ্ছন্ন হয়ে পরম আরামে চোখ বুজে আছে। রূপার দিকে না তাকিয়েই শীতল গলায় বলে বাঁধন।

—-“খুব পোষেছিস দেখি ওকে।”
কণ্ঠস্বর শুনেই কেঁপে ওঠে রূপা। পরক্ষণেই এক তীব্র বিস্ময় গ্রাস করে তাকে লোকটা বুঝতে পারল কীভাবে? কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্ন করে।
—-“আমি এসেছি আপনি বুঝলেন কীভাবে?”
ধীরগতিতে ঘাড় ঘুরিয়ে রূপার দিকে তাকায় বাঁধন। অষ্টাদশীকে দেখেই তার চোখের মনি যেন স্থির হয়ে যায়। আজ রূপা পরেছে হালকা বেগুনি রঙের ফ্রক স্টাইলের থ্রি-পিস সালোয়ার কামিজ। কামিজ ও ওড়নার একই রঙের আভিজাত্য আর প্যান্টের ফ্লোরাল প্রিন্ট তার শরীরে এক স্নিগ্ধ মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে। হাঁটু ছাপানো লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে তার ঘাড়, মুখ আর কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। ঘুমের রেশ কাটেনি চোখে, এক অদ্ভুত নেশা ভরা চাহনি। পৃথিবীর সব মোহ যেন এই মেয়েটির মুখেই কেন্দ্রীভূত। যতোই দেখছে, ততোই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে বাঁধন।কিছুক্ষণ পর নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকিয়ে মুখটা পাথরের মতো গম্ভীর করে ফেলে সে। রূপার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি যেন বিদ্ধ করে।

—-“চুল এইভাবে এলোমেলো করে ঘুরছিস কেন?”
চোখ কচলাতে কচলাতে জবাব দেয় রূপা।
—-“ঘুমিয়ে ছিলাম তো, তাই।”
উঠে দাঁড়ায় বাঁধন। ক্যান্ডিকে কোলে নিয়ে রূপার ঠিক মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। শরীর থেকে ভেসে আসা তীব্র, পুরুষালি ঘ্রাণ অষ্টাদশীর নাকের ভেতর আছড়ে পড়ে। সেই সম্মোহনী উপস্থিতিতে বরাবরের মতোই অবশ হতে থাকে রূপা। তার চোখের গভীরে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বাঁধন।
—-“পরীক্ষা কবে তোর?”
মাথা নিচু করে অস্ফুট স্বরে জবাব দেয় রূপা।
—-“সামনে মাসের ২ তারিখ থেকে।”
এক মুহূর্ত চুপ থেকে বাঁকা হাসে বাঁধন। কণ্ঠস্বর যেন বিষের মতো ভারী হয়ে আসে।

—-“প্রিপারেশন কেমন? নাকি তীর মেরে আর ডেলিভারির কাজ করে শুধু টাকা আয়ই করেছিস?”
হুট করে নিজের গোপন দুটো সত্য শুনে ভয়ে কুঁকড়ে যায় রূপা। অবাক হওয়ার কোনো সুযোগ পায় না সে, কারণ বাঁধনের শ্যেন দৃষ্টি থেকে কিছুই আড়াল করা সম্ভব নয়।ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে বাঁধনের। ক্যান্ডিকে কোলে নিয়ে ব্যালকনির সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়। রূপার চোখে চোখ রেখে শীতল, ভারী কণ্ঠে বলে।
—“রূপ, তোকে দেখতে সাধারণ মনে হলেও তুই কিন্তু আসলে সাধারণ মেয়ে নয়। টু আন্ডারএস্টিমেট ইউ উড বি আ বিগ মিসটেক। তোকে সাধারণ ভাবা মানে নিজেকে বোকা প্রমাণ করা।”
কোনো জবাব দেয় না রূপা। বুকের ভেতরটা ড্রাম বাজিয়ে শেষ করে দিচ্ছে তার, প্রতিটা স্পন্দন যেন পাঁজরের হাড় চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে তার, নিথর হয়ে জমে বরফের মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। পুনরায় ধীর পায়ে এগিয়ে আসে বাঁধন। অষ্টাদশীর ঠিক নাকের ডগায় গরম নিঃশ্বাস ফেলে কর্কশ কণ্ঠে বলে।

—“ইউ আর রিয়েলি গ্রেট এট আর্চারি। খুব ভালো তীর মারতে জানিস তুই, আমাকে শেখাবি?”
অবাক হয়ে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলে রূপা।
—- “আপনি তীর মারা শিখবেন?”
বাদামি অষ্টাদশীর চোখের ভেতর জ্বলন্ত দৃষ্টি ফেলে ধারালো কণ্ঠে বলে বাঁধন।
—-“হুম, শেখাবি?”
রক্ত হিম হয়ে আসে রূপার। এই পুরুষটার চোখের চাহনি প্রতিটি স্নায়ুকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে পাথরের মতো নিথর দাঁড়িয়ে থাকে সে। চোয়াল শক্ত করে নিষ্ঠুর কণ্ঠে বলে বাঁধন।
—- “আর ইউ গনা অ্যানসার মি?”
ভীতু কণ্ঠে বলে রূপা।
—- “আপনি কেন তীর মারা শিখবেন? আপনি নিজেই তো গোটা জেলার এসপি? শহরের মানুষ এমনি আপনাকে দেখে কাঁপবে।”

এক কদম এগিয়ে গিয়ে রূপার অস্তিত্ব নিজের ছায়ায় ঢেকে ফেলে বাঁধন। ক্রুর কণ্ঠে বলে।
—- “ডোন্ট গেট টু স্মার্ট। আরেকবার যদি পাল্টা প্রশ্ন করিস, তবে চড়িয়ে সব দাঁত ফেলে দেবো।”
চমকে গিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলে রূপা। চোখ দুটো জলে টলমল করে, কাঁপা কণ্ঠে বলে।
—- “আমার ক্যান্ডিকে দিন, চলে যাবো।”
কণ্ঠস্বর নিচে নামিয়ে এনে হিমশীতল কণ্ঠে বলে বাঁধন।
—- “আই এম নট গিভিং ইট ব্যাক।
—- “কেন?”
রূপার চোখের গভীরে বিষাক্ত দৃষ্টি রেখে ধীর কণ্ঠে বলে বাঁধন।
—- “আই ডোন্ট নিড টু এক্সপ্লেইন মাইসেলফ। সেটার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না আমি, এখন যা এখান থেকে।”
দৃঢ় কণ্ঠে বলে রূপা।

—- “আমার ক্যান্ডিকে দিন, নিয়ে চলে যাবো।”
বাঁধন চোখের পলকেই ক্যান্ডিকে নিজের হাতে তুলে নেয়। শীতল, গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—- “দেব না।”
বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলে রূপা,
—- “কিন্তু কেন?”
চোয়াল শক্ত করে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তোলে বাঁধন। গভীর, অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে বলে,
—- “এগেইন প্রশ্ন? তোকে তো যেতে বলেছি। কানে যায়নি? এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
জেদি কণ্ঠে বলে রূপা,
—- “আমি আমার ক্যান্ডিকে নিয়েই যাবো।”
কথাটা শেষ হতেই ঝড়ের বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁধনের হাতের দিকে। কিন্তু বাঁধন যেন আগেই প্রস্তুত ছিল। বিদ্যুৎগতিতে হাতটা মাথার অনেক ওপরে তুলে ধরে সে। ক্যান্ডি এক নিমিষেই রূপার নাগালের বাইরে চলে যায়।তাচ্ছিল্যের হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে বাঁধনের ঠোঁটে।

—- “ট্রাই টু টেক ইট। নিয়ে যেতে পারলে নিয়ে যা।”
ক্যান্ডিকে পাওয়ার জন্য একের পর এক লাফ দিতে থাকে রূপা। এলোমেলো চুলগুলো বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে, তবুও থামছে না সে। হাত দুটো বারবার ওপরে ছুঁড়ে দিচ্ছে, কিন্তু প্রতিবারই কয়েক ইঞ্চির জন্য ব্যর্থ হয়ে নিচে নেমে আসছে।কাতর কণ্ঠে মিনতি করে বলে,
—- “প্লিজ আমার ক্যান্ডিকে দিয়ে দেন।”
বাঁধন আরও একটু হাত উঁচু করে। চোখেমুখে স্পষ্ট তৃপ্তির ছাপ।
—- “ইউ কান্ট রিচ মি।”

রূপা বারবার লাফিয়ে ক্যান্ডিকে ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করেই চলেছে, আর বাঁধন নির্মম আনন্দ নিয়ে ক্যান্ডিকে তার হাতের নাগালের অনেক ওপরে ধরে রেখেছে।এই পুরো দৃশ্যটা দূর থেকে হিংসাভরা চোখে দেখছে শান্তা।রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। হাতের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে মুঠোবন্দি হয়ে যায়। নখের চাপ নিজের তালুতেই বসে যায়, কিন্তু সে টেরও পায় না।বাঁধনের খোঁজে তার রুমে এসেছিল শান্তা। সেখানে না পেয়ে ব্যালকনির দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে এই দৃশ্য।মুহূর্তেই যেন শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটে ওঠে।রাগে, হিংসায় হিংসায় পাথরের মতো স্থির হয়ে যায় সে।দাঁতে দাঁত চেপে, বিষমাখা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে,

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩০

—- “খুব আনন্দ করে নিন, বাঁধন ভাইয়া। কাল থেকে আপনার জীবনে এন্ট্রি হবে আমার। রূপা, আমি জানি তুইও বাঁধনকে পছন্দ করিস। কিন্তু আফসোস হারাতে চলেছিস তোর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে। তোর সেই প্রিয় মানুষের হৃদয়ের আসল জায়গাটা দখল করে নেব আমি। জাস্ট আজকের রাতটা ওয়েট কর।”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here