মহামায়া পর্ব ৪৭
তুশকন্যা
রেস্টুরেন্টের ভারী কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশের হিটারের আরামদায়ক উষ্ণতা এক লহমায় গা ছুঁয়ে গেল। বাইরের হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা আর তুষারপাতের প্রকোপ যেন নিমেষেই উধাও।
আনায়া অবাক দৃষ্টিতে চারপাশ চেয়ে চেয়ে দেখল। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী জার্মান রেস্টুরেন্ট। এর অন্দরসজ্জা জুড়ে প্রাচীন কাঠের দেয়াল, ভারী আসবাবপত্র, ধ্রুপদী তৈলচিত্র আর দেয়ালে ঝুলানো মৃগনাভির স্মারক। ভেতরের আলো বেশ মৃদু; হলদেটে আর সোনালি আভার এক অদ্ভুত মিশ্রণ পুরো পরিবেশকে থমথমে ও রহস্যময় গাম্ভীর্যে মুড়ে রেখেছে।
মধ্যরাতের এই প্রহরে রেস্টুরেন্টের ভেতরের পরিবেশটা বেশ ভারী ও নিস্তব্ধ। হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র গ্রাহক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন বিভিন্ন টেবিলে। এক কোণে কয়েকজন মাঝবয়সী জার্মান ভদ্রলোক অত্যন্ত নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে কী যেন আলোচনা করছেন। অন্য এক টেবিলে একাকী এক নারী কাচের গ্লাসে রেড ওয়াইন নিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে আছেন। কালো স্যুট পরিহিত ওয়েটাররা অত্যন্ত নিখুঁত ও নিঃশব্দ পায়ে, কোনো আওয়াজ না করে এদিক-ওদিক যাতায়াত করছে।
আনায়া ধীর পায়ে কেনীথের পাশে চলতে চলতে চারপাশের সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। এখানকার মানুষগুলোর প্রত্যেকেই নিজেদের মাঝে নিচু স্বরে আলাপনে মগ্ন। অথচ দুজন ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের অবিন্যস্ত চোখগুলো তাদের ওপর এসে থমকে গেল। রক্তলাল গাউন পরা, উষ্কখুষ্ক চুলের এক সুশ্রী রমণী আর তার হাত শক্ত করে ধরে রাখা ব্ল্যাক ট্রেঞ্চ কোটের সেই রাশভারী, দীর্ঘদেহী পুরুষ—যাদের যুগলবন্দী এই আলো-আঁধারিতেও তীব্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
একজন ওয়েটার কেনীথকে দেখামাত্রই যেন চিনে ফেলল। তবে এই নতুন মেয়েটি তার পরিচিত নয়। তবুও সে তড়িঘড়ি করে অত্যন্ত বিনীতভাবে মাথা নুইয়ে দুজনকে রেস্টুরেন্টের একটু ভেতরের দিকের একটা নির্জন, বিলাসবহুল টেবিলের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। কেনীথ নিজের কোটটা খুলে চেয়ারের একপাশে রেখে, আনায়াকেও ইশারায় বসতে বলল। দুজনে মুখোমুখি হয়ে বসতেই মাঝখানের ব্যবধানটুকু এক অদ্ভুত নীরবতায় ভারী হয়ে উঠল।
লালচে কাঠের তৈরি টেবিলটিতে মৃদু আলোর প্রতিফলন ঘটছে। গা এলিয়ে বসার পর কেনীথ নিজের কালো শার্টের হাতাদুটো আলগা করে দ্রুততর গুটিয়ে নিল। অতঃপর অত্যন্ত স্থির শান্ত ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে চাইল।
কেনীথ টেবিলের ওপর রাখা মেনুকার্ডের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে, অত্যন্ত গম্ভীর-নিরেট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কী খাবি?”
আনায়া মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে জানালার কাচের ওপারে জমে থাকা নিকষ অন্ধকারের দিকে তাকাল। কেনীথের কণ্ঠস্বরের কর্তৃত্বপরায়ণ তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা অদ্ভুত অধিকারবোধের সম্বোধনটা তার কান অব্দি পৌঁছালেও সে নিজের ভেতরের মান-অভিমানটুকু সস্তা করতে চাইল না। চোয়াল সামান্য শক্ত করে, অত্যন্ত উদাসীন তবে অনমনীয় গলায় বলল,
“আমার কোনো কিছু খাওয়ার ইচ্ছে নেই। আপনার যদি ক্ষুধা লেগে থাকে, তবে আপনি খেতে পারেন।”
কেনীথ তার এই জবাবে কোনো ত্বরিত প্রতিক্রিয়া দেখাল না। সে নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর দৃষ্টিতে আনায়াকে আপাদমস্তক একবার মেপে নিল। এরপর আর কোনো বাক্যব্যয় না করে সামান্য হাত উঁচিয়ে একজন ওয়েটারকে ইশারা করল। পরিচারকটি ক্ষিপ্র গতিতে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াতই কেনীথ জার্মান ভাষায় অত্যন্ত দ্রুত এবং সাবলীলভাবে বেশ কিছু খাবারের অর্ডার দিয়ে দিল। তবে আনায়া খেয়াল করল, কেনীথের প্রতি ওয়েটারের মনোভাব অত্যাধিক আন্তরিক।
অর্ডার দেওয়া শেষ করে কেনীথ পুনরায় আনায়ার দিকে তাকাল। তার মুখের অবয়ব পাথরের মতো শক্ত। সে প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন থাকলে ওইদিকের ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আয়।”
আনায়া ভেতরে ভেতরে চটে রইলেও, এই গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে আর নতুন করে কোনো বিবাদ তৈরি করতে চাইল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে, গুমরো মুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং নির্দেশিত ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থা দেখে সে নিজেই বেশ অবাক হলো। আর কালবিলম্ব না করে দ্রুত ঠাণ্ডা পানির ঝাপটায় মুখের ক্লান্তি দূর করল। চুলের এলোমেলো গোছাগুলো হাত দিয়ে টেনে কিছুটা ঠিকঠাক করে নিলেও, তার অবাধ্য মনটা বারবার কিছুক্ষণ পূর্বে ঘটে যাওয়া গাড়ির ভেতরের তীব্র সংবেদনশীল স্পর্শের আবেশে শিউরে উঠছিল। কেনীথের অবাধ্য আঙুলের ছোঁয়া যেন এখনও তার উন্মুক্ত উদরে আগুনের মতো বিচরণ করছে। আনায়া দুহাতে নিজের পেটটা চেপে ধরে কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মিনিট দশেক পর আনায়া আবারও ফিরে আসতেই, পুরো টেবিল দেখে তার চোখ জোড়া বিস্ময়ে চড়কগাছ হলো। সে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সামান্য কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পুরো টেবিল যেন নানান পদের খাবারে উপচে পড়ছে। ঐতিহ্যবাহী জার্মান সসেজ, স্ট্যু, সুগন্ধি থিক স্যুপ, সাথে ধোঁয়া ওঠা রোস্টেড মিট আর হরেক রকমের ব্রেড বা রুটি সাজানো। এই মধ্যরাতে মাত্র দুজন মানুষের জন্য এত বিপুল পরিমাণ খাবারের আয়োজন দেখে আনায়া অবাক হয়ে ভাবল—এত খাবার কে খাবে? লোকটা আসলেই কি পাগল?
কেনীথ ততক্ষণে নিজের ফোনটা টেবিলে রেখে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে স্যুপের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। আনায়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চোখের ইশারায় তাকে বসতে বলল। আনায়া ধীরপায়ে চেয়ার টেনে বসল বটে, কিন্তু তার দৃষ্টি তখনও খাবারের পাহাড়ের দিকেই নিবদ্ধ। সে আর নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে থমথমে গলায় প্রশ্ন করল,
“এত খাবার কেন অর্ডার করেছেন? এসব কে খাবে?”
কেনীথ চামচ হাতে নিয়ে অত্যন্ত মন্থর গতিতে চোখ তুলে তাকাল। গম্ভীর্যের সাথে উত্তর দিল,
“খাওয়া শুরু কর, বাকিটা দেখছি।”
—“খাবার অপচয় করা ঠিক না।”
—“আমি তো আর কাউকে পুরোটা শেষ না করে যেতে দিচ্ছি না।”
কেনীথের শান্ত অভিব্যক্তির অর্থ বোঝামাত্রই আনায়া ভ্রুযুগল কুঁচকে বলল,
—“আমি তো আগেই বলেছি, আমি কিছু খাব না!”
কেনীথ এবার চামচটা বাটির পাশে কিছুটা শব্দ করে নামিয়ে রাখল। টেবিলের ওপর দুই হাত আড়াআড়ি করে রেখে, সে শরীরের উপরিভাগটা সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে আনায়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। অত্যন্ত ধীরস্থিরে কড়া শাসনের সুরে প্রশ্ন ছুড়ল,
—“এখন কি তোকে খাইয়ে দিতে বলছিস?”
আনায়া তার প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে আমতাআমতা করে বলল,
—“আপনি কেনো আমায় খাইয়ে দেবেন, আমার কি হাত নেই নাকি?”
—“তবে খা!”
কেনীথ শান্ত সুরে ত্যাছড়া ঢঙে ভ্রু উঁচিয়ে বলল। কোনো উপায় না দেখে, প্রচণ্ড ক্ষোভ ও গুমরে থাকা অভিমান নিয়ে আনায়া স্যুপের বাটিটা নিজের দিকে টেনে নিল। পুরো টেবিল জুড়ে আবারও থমথমে নীরবতা নেমে এলো। শুধু চামচ আর চিনা মাটির বাসনের মৃদু ঠুনঠুন শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আনায়া নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন ছুড়ল,
—“আপনি কি এখানে প্রায়-ই আসেন?”
কেনীথ মুখ না তুলেই ধীরস্থিরে খেতে খেতে প্রত্যুত্তর করল,
—“হুম!”
—“একাই আসেন?”
—“না, সবসময় একা আসা হয়না৷ কখনো কখনো সাথে পাভেল অথবা সুইঠিও থাকে।”
আনায়া দুদন্ডের জন্য খাওয়া থামিয়ে ভাবল, সুইঠিটা যেন কে! পরমুহূর্তেই মনে পড়ল, কেনীথ হয়তো ইমানির কথা বলছে। আনায়া আবারও খাওয়া শুরু করে, প্রশ্ন করল,
—“ওহ!…কিন্তু আপনারা তো আবার সেলিব্রিটি মানুষ। এসব জায়গায় হুটহাট চলে আসেন, প্রবলেম-ট্রবলেম হয়না?”
—“এই রেস্টুরেন্টটা অনেক পুরোনো। খেয়াল করে আশেপাশে দেখলেই দেখা যাবে, মাঝরাতেও এখানে উঠতি-বয়সী কোনো আহাম্মকদের আনাগোনা নেই। আর না আছে কোনো মিডিয়ার ঝামেলা। এখানে সচারাচর যারা আসে, তারা হয় অতিসাধারণ এবং সবসময় নিজেদের মাঝেই ব্যস্ত থাকে; অন্যদের নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের নেই। সবমিলিয়ে এইজন্য এই জায়গাটা আমরা প্রেফার করি।”
আনায়া কেনীথের কথামতো আঁড়চোখে চারপাশটা একবার দেখে নিল। আসলেই তো! বেশিরভাগ মানুষজনই প্রবীণ জার্মান; মধ্যবয়স্ক নয়তো খুব সাধারণ বেশভূষার কর্মব্যস্ত লোকজন। আশেপাশের কাউকে নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা নেই। কিন্তু কেনীথের একটা কথা আনায়ার কাছে ঠিকই খটকা লাগল। সে চোখদুটো সরু করে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
—“আরেহ্ বাহ, সবই বুঝলাম কিন্তু আহাম্মক কাদের বললেন তা ঠিক বুঝলাম না। আপনাদের জন্য পাগলামি করা ফ্যানেরা আহাম্মক?”
—“উঁহু, সবাই নয়। তবে বেশিরভাগই এক; উন্মাদ, উগ্র। আর যারা ভক্তির নামে কারো জীবনে সমস্যার সৃষ্টি করে তাদের আহাম্মক বলাই শ্রেয়!
আনায়া আর এ বিষয়ে কথা বাড়ানোর সুযোগ পেল না। সে খেতে খেতে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল,
—“মাঝেমধ্যে বাহিরের খাবার খাওয়া ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত কোনোকিছুই ঠিক না। যদিও এখানকার খাবারের মান ভালোই মনে হচ্ছে কিন্তু তবুও…শত হোক, বাড়ির খাবারের চেয়ে ভালোকিছু তো আর হয়না।”
আনায়া মিনমিন করে কথাগুলো আওড়াল ঠিকই তবে কেনীথ প্রত্যুত্তর করতে কিছুটা সময় নিল,
—“তা ঠিক, কিন্তু সুইঠির পক্ষে সবসময় পসিবল হয়না অফিস-বাড়ি দুটো একসাথে হ্যান্ডেল করা। যেহেতু রান্নার দায়িত্ব পুরোটাই ওর ওপর, সেক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে আমাদের এখানেই আসতে হয়।”
কেনীথের কন্ঠস্বর শান্ত ও গম্ভীর। আনায়া এবার ভিন্ন কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়াসে ওষ্ঠদ্বয় ভিজিয়ে নিয়ে স্পষ্ট সুরেই বলল,
—“এতো কষ্ট না করে, একটা বিয়ে করে নিলেই তো হয়। বয়স তো আর কম হয়নি আপনার!”
কথাটা মন থেকে উগড়ে দিলেও, আনায়া এবার মিনমিন করতে লাগল উত্তরের আশায়। কিন্তু রমণীর চাওয়া অনুযায়ী কেনীথ বিশেষ একটা প্রতিক্রিয়াও দেখাল না। বরং খাওয়ার একাগ্রতা বজায় রেখেই বলল,
—“হ্যাঁ সেটাই ভাবছি—দেখেশুনে এবার একটা বিয়ে করেই ফেলব।”
মূহুর্তেই আনায়া স্তব্ধ হয়ে গেল। আক্রোশে হাতের কাঁটা চামচাটা শক্তহাতে মুঠোয় চেপে ধরে, প্লেটের মিটবলের উপর গেঁথে দিল। শান্ত মুখটা ফুঁসে ওঠার সাপের মতো ভেতরে ভেতরে হিসহিস করতে লাগল। দাঁত কিড়মিড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কেনীথের দিকে তাকিয়ে রইল। অথচ কেনীথ এতোটাই নির্বিকার যে, প্রত্যুত্তর করেও একটিবারের জন্যও সে খাবার হতে নজরটা অব্দি তোলেনি।
আনায়া নিজেকে শান্ত করতে ব্যর্থ হওয়ায়, ক্ষিপ্র হাতে কাঁটাচামচের আগায় গেঁথে যাওয়া মিটবলটা মুখে দিল। কেনীথের দিকে একটিবারের জন্যও নজর না সরিয়ে, এমনভাবে খাবারটা চিবোতে লাগল যেন সে মিটবল নয় বরং সম্মূখে নির্লিপ্তে বসে থাকা আস্ত মানুষটাকেই চিবিয়ে খাচ্ছে।
এদিকে কেনীথ হঠাৎ মুখ তুলল। আনায়ার ক্ষিপ্ত মুখটার দিকে একঝলকের জন্য তাকিয়েও, তার মাঝে বিশেষ কোনো ভাবান্তর হলো না। বরং নিজের খাওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত স্বাভাবিক, স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে কিছু কিছু খাবার বেছে নিজে থেকেই আনায়ার প্লেটে তুলে দিল। আনায়া চকিতে চমকে তাকাতেই, কেনীথ মৌখিক কোনো কথা ছাড়াই চোখের ইশারায় তাকে ওটাও শেষ করার হুকুম দিল।
আনায়া নিজেকে যথাসাধ্য চেষ্টায় শান্ত রাখল। দুর্ধর্ষ পুরুষের চোখের ধারালো আদেশ অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা বা সাহস কোনোটিই তার হলো না। সে বাধ্য হয়ে মুখ নামিয়ে চামচ চালাতে লাগল।
তবে একটা সময় পর গিয়ে আনায়ার হুঁশ হলো, খাবারগুলো পেটে পড়তেই তার অবশ হয়ে আসা শরীরটায় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে। তবে সে মনে মনে কেনীথের প্রতি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েই রইল।
খাওয়ার একপর্যায়ে, অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো আর বেখেয়ালির কারণে অসাবধানতা বশত আনায়ার ঠোঁটের কোণে কিছুটা খাবার লেগে গেল। যা সে নিজেও তা টের পায়নি। কিন্তু কেনীথ প্রতিবারই খাওয়ার পাশাপাশি, আঁড়চোখে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে তার প্রতিটা নড়াচড়া লক্ষ করছিল।
কেনীথ পুরোপুরি শান্ত ও স্বাভাবিক থেকে, টেবিল থেকে একটি টিস্যু পেপার তুলে নিল। আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেনীথ হাত বাড়িয়ে হঠাৎ তার দিকে ঝুঁকে পড়ল। আনায়া স্তম্ভিত দৃষ্টিতে মুখ তুলে তাকাতেই, কেনীথ অত্যন্ত আলতো তবে দৃঢ়ভাবে তার ঠোঁটের কোণ মুছে দিল।
হঠাৎ এমন ঘনিষ্ঠ, যত্নশীল কিংবা সংবেদনশীল আচরণে আনায়া পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার সমগ্র অস্তিত্ব যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে হিম হয়ে গেল। কেনীথের মুখাবয়ব একদম ভাবলেশহীন ও স্বাভাবিক থাকলেও তার এই আকস্মিক স্পর্শ আনায়াকে চরম অস্বস্তি ও এক অদ্ভুত আবেশের জালে ফেলে দিল। সে দ্রুত নিজের চোখ নামিয়ে নিল; তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন তখন এতটাই দ্রুততর হচ্ছিল যেন এখনই তা বুকের পিঞ্জর হতে বেরিয়ে আসবে।
কিছুক্ষণ পর কেনীথ নিজের খাওয়া শেষ করল। সে প্লেটটি সামান্য সরিয়ে রেখে, দুহাত টেবিলের ওপর গুটিয়ে আমোদ ঢঙে বসল। এরপর আর কোনো খাবার বা অন্য কিছুতে মন না দিয়ে, একমনে আনায়ার চুপচাপ খাবার খাওয়া দেখতে লাগল। তার নিগূঢ় সম্মোহনী ও স্থির চাউনি সরাসরি আনায়ার প্রতিটা অভিব্যক্তির ওপর নিবদ্ধ রইল।
আনায়া খাবার মুখে তুলতে গিয়েও কেনীথের এই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট আন্দাজ করতে পারল। তীব্র অস্বস্তি, আড়ষ্টতা আর অজানা এক লজ্জায় তার কান ও গাল দুটো লালচে হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে সে ভাবছিল, এই অসভ্য লোকটার সাথে আর কখনো কথাবার্তাও বলবে না, সেই মেয়েই এখন তার সামান্য চাহুনিতেও গলে যাচ্ছে। ছিঃ ছিঃ, এক বান্দার মায়ায় পড়ে কতটাই না অধঃপতন হয়েছে তার—ভাবতেই যেন আনায়ার মেজাজ বিগড়ে যায়।
নিজেকে এই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে সামলাতে না পেরে আনায়া মাথাটা আরও নিচু করে ঝুঁকিয়ে ফেলল; যেন কেনীথের সেই পুরুষালি গভীর চাউনি থেকে নিজের মুখটা কোনোমতে আড়াল করা যায়। সে প্লেটের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্থির হয়ে, মন্থর গতিতে চিবোতে লাগল। পুরো রেস্টুরেন্টের থমথমে পরিবেশের মাঝে তাদের টেবিলেই যেন, এই নীরব রসায়ন আর রুদ্ধশ্বাস টানাপোড়েন আরও বেশি তীব্রতর হয়ে উঠেছে।
ভোজনপর্ব প্রায় শেষ পর্যায়ে। খেতে খেতে আনায়ার পেট ফুটে ঢোল হয়েছে যেন। তবুও কেনীথ জোরজবরদস্তি করে নির্লিপ্ত ঢঙে, একটা পর একটা খাবার তার প্লেটে তুলে দিচ্ছে। আনায়া ভরা পেটেও মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে, হাফসাফ করে অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেনীথ থামছে না। তার কথা একটাই, খাবার যেন নষ্ট না হয়।
আনায়া এবার অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। কিছুটা বিরক্তির সাথে ফোলা গালে খাবার চিবোতে চিবোতে বলল,
“আপনি কি আমার সাথে কোনো প্রতিশোধ নিচ্ছেন? এভাবে খাইয়ে খাইয়ে মারবেন নাকি আমায়?”
কেনীথ চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে, ফোন স্ক্রল করছে। তার খাওয়াদাওয়ার পর্ব বহু আগেই শেষ। আনায়ার কথা শুনেও, ফোন থেকে নজর সরাল না কেনীথ। বরং চোয়াল শক্ত করে নির্লিপ্ত সুরে একই বাণী আওড়াল,
“খাবার যেন নষ্ট না হয়।”
আনায়ার এবার চোখের কোণে পানি জমে গেল। ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে, আমি আর খাবো না।”
কন্ঠস্বরে ভিন্নতা দেখে, কেনীথ এবার মুখ তুলল। আনায়ার নাজেহাল দশা দেখে, কিছুটা হাসি পেলেও তা সে প্রকাশ করতে নারাজ। মাথাটা কিঞ্চিৎ কাত করে, কিছু চিবোনোর ভঙ্গিতে মুখটা বেশ কিছুক্ষণ মন্থর গতিতে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে, আমোদিত ঢঙে আনায়ার আপাদমস্তক পরখ করল সে।
রমণীর গালদুটো ফুলে উঠেছে; ঠিকমতো মুখ নাড়িয়ে চিবোতেও পারছে না। চোখ-মুখও নাজেহালে শুঁকিয়ে গেছে। দুহাতের মুঠোয় থাকা ছুরি-কাটাচামচকে সৈন্য বেশে টেবিলের উপর দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আর ভেজা চোখদুটো দুটো যেন কেনীথকেই চিবিয়ে খাওয়ার ভঙ্গি করেছে।
কেনীথ এবার আর তাকে জোর করল না। জোরজবরদস্তি করে হলেও সব খাবারই প্রায় শেষ করে ফেলেছে আনায়া। কেনীথ দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলল,
“যথেষ্ট হয়েছে, আর খেতে হবে না।”
আনায়া তার কথায় মুখ ফুলিয়ে শান্ত হলো। হাতের চামচগুলো নামিয়ে রেখে, পানি খেতে লাগল। পানি খেতে খেতে হঠাৎ আনায়ার মনে হলো,তার সারা গা গুলিয়ে উঠছে। খাবার যেন সব গলা অব্দি পুরো হয়েছে। নড়াচড়ায় কিছুটা অস্বস্তিবোধ করায় সে হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে, চেয়ারেই গা ছেড়ে বসে রইল। কিন্তু হঠাৎ দৃষ্টি নিচে নামাতেই সে একপ্রকার আঁতকে উঠল।
—’সেরেছে! এটা পেট নাকি ড্রাম। এমন ভাবে ফুলে উঠেছে যেন আমি এখনই চার বাচ্চার মা হতে চলেছি। অথচ দেখো, যে তন্ত্র-মন্ত্র করবে সেই ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরই কোনো খবর নেই।”
মিনমিন করে কথাগুলো মনের অন্তরালে আওড়িয়েই আনায়া চোখ তুলে কেনীথের দিকে তাকাল। কেনীথ ততক্ষণে ওয়েটার ডেকে টেবিল ক্লিন করিয়ে, বিল দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু এতেই আনায়া হঠাৎ বাঁধা দিয়ে বসল। হুট করে চাপা স্বরে তেড়ে উঠে বলল,
“এক সেকেন্ড! আমার বিল আমি দেবো, আপনি কেন দিচ্ছেন?”
আনায়া বাঁধায় দাড়িয়ে থাকা ওয়েটার কিংবা কেনীথ দুজনেই থমকে গেল। ওয়েটার বেচারা ভাষা না বোঝায় দুজনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে৷ আনায়া তাতে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে, নড়েচড়ে বসল। কেনীথের দিকে তাকাতেই দেখল, সে চোয়াল শক্ত করে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আনায়া। আনায়া চোখের পাপড়ি ঝাপটে রয়েসয়ে আমতাআমতা করে বলল,
“এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন? বললামই তো, বিল আমিই দেবো…”
আনায়া আর নিজের কথাটুকু সম্পন্ন করতে পারল না। বরং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে কেনীথ অচিরেই চাপা গম্ভীর্যের সাথে দাঁত পিষে ধমকে উঠল,
“কানের নিচে থাপ্পড় খেতে চাস?”
মুহূর্তেই আনায়া স্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে গেল। চোখমুখ শুকিয়ে থমথমে হলো। আর কিছু বলার সুযোগও হলো না। ততক্ষণে কেনীথ অত্যন্ত স্বাভাবিক গম্ভীর্যের সহিত ওয়েটারের সাথে হিসেব-নিকেষ চুকিয়ে নিয়েছে।
সটানভাবে উঠে দাঁড়িয়ে, চেয়ারের পাশ থেকে নিজের কোটটা হাতে তুলে নিল কেনীথ। চলে যাবার সময় হয়েছে বুঝতেই, আনায়াও হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু সহজাত চপলতায় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে, হঠাৎ তার একটা পা উল্টে জুতোয় ঝামেলা বেঁধে গেল।
—”আহ্, ধূর এটা আবার কি হলো।”
আনায়া বিরক্তিতে চেয়ারে বসে পড়ে, নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু ফুলে ওঠা ডুমডুমে পেট নিয়ে, নিচের দিকেই ঝুঁকতেই তার দম ফুরিয়ে এলো। কেনীথ ভেবেছিল, হয়তো আনায়া নিজেই সমস্যাটা সামলে নিবে। কিন্তু মিনিট অর্ধেক অতিক্রমের পরও, আনায়া একইভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে গেল। কেনীথ পাশ থেকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা খেয়াল করতেই, হঠাৎ অপ্রত্যাশিত এক কাজ করে বসল।
আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কেনীথ পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে তার মুখোমুখি বসল। দুহাত বাড়িয়ে আনায়ার পা-টা টেনে নিল।
—“আরে,আরে, এটা কি করছেন?”
আনায়ার উদ্বিগ্নতায় কেনীথের কোনো বিশেষ ভাবান্তর হলো না। সে তার জুতোর বেল্টটা ঠিকঠাক করে লাগিয়ে দিতে দিতে, গুরুগাম্ভীর্যের সাথে বলল,
—“রাত দেড়টা বাজে। সারারাত আমি এখানে পড়ে থাকতে পারব না।”
বলেই সে নিজের কাজ সমাপ্ত করল। আর একমুহূর্তও দেরি না করে হঠাৎ আগে আগেই চলে যেতে পা বাড়াতে লাগল কেনীথ। পেছন হতে আনায়া পেটে দুহাত চেপে এগোতে এগোতে, তার ভাবমূর্তি পরখ করল। হঠাৎ কি যেন ভেবে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আসলেই আপনি একটা বদমাশ!… বজ্জাত রেড কোথাকার!”
খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ। ভেতরকার পরিপাটি উষ্ণতার রেশ গায়ে মেখে আনায়া রেস্টুরেন্টের বাইরে পা রাখল। কিন্তু ঠান্ডা হিমের বাতাস তার হাড়-গোড় যেন এক মূহুর্তেই কাঁপিয়ে তুলল। গায়ে কোনো শীতের পোশাকও নেই। স্কার্ফ একটা কিনেছিল, সেটাও হয়তো ঐ ঝোপঝাড়ের মাঝে কোথায়ও পড়ে গিয়েছে। ভাবতেই আনায়ার মনটা খানিক খারাপ হলো। এদিকে তুষারও পড়ছে অনবরত। রেস্টুরেন্টের ভেতর ঠান্ডার প্রকোপ বুঝতে না পারলেও, এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে।
কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা হয়েছে পেটভর্তি খাওয়া-দাওয়ায়। ভারী খাবার আর সাথে এতক্ষণের মানসিক ধস্তাধস্তির ক্লান্তি মিলেমিশে তার চোখের পাতায় তখন একরাশ ঘুম নেমে এসেছে। অতিরিক্ত খাওয়া হয়ে যাওয়ার কারণে সে নিজের ফুলে ওঠা পেটটা একহাতে চেপে ধরে অলস ভঙ্গিতে হেলেদুলে গাড়ির দিকে এগোতে লাগল। ঘুমের তীব্র আবেশে মুখটা হাঁ হয়ে যাচ্ছে বারবার। দু-তিনবার কষিয়ে হাই তুলে সে কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ থমকে গেল। আচমকা পেছন থেকে কেনীথ তার অবস্থা দেখে দ্রুততর গা হতে কোটটা খুলে তার গায়ের উপর জড়িয়ে দিল। ক্লান্তিতে আনায়া শুরুতে কিছুটা চমকে গেলেও, পরক্ষণেই সে নিজেকে গুটিয়ে তটস্থ করল।
—“অস্বস্তি হচ্ছে?”
আধোঘুমে আনায়ার হুমড়ি খেয়ে পড়ার দশা হয়েছে। পাশ থেকে হঠাৎ কেনীথের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে, আনায়া ঢেকুর তুলতে তুলতে দুহাতে পেট চেপে ধরে ঠোঁট উল্টে আওড়াল,
—“খাওয়া-দাওয়া বোধহয় একটু বেশিই হয়ে গিয়েছে। নড়তে পারছি না আমি।”
কেনীথ আর কিছু বলল না। রমণীর এলোমেলো পায়ের বিচরণ দেখে কেনীথ দ্রুত তাকে পেছন থেকে আগলে ধরে এগিয়ে নেবার চেষ্টা করল। দরজাটা কোনোমতে খুলে দিতেই আনায়া দ্রুত ভেতরে ঢুকে সিটে গিয়ে ধপাস করে বসে পড়ল।
ভেতরে বসেই আর কোনো বাছবিচার না করে সে সিটের কুশনে মাথাটা এলিয়ে দিল। শরীরটা একপাশে কিছুটা হেলে পড়তেই তার আধো বোজা চোখ দুটো যেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। আনায়ার এই নুয়ে পড়া, অবসন্ন অবস্থা দেখে কেনীথ ড্রাইভিং সিটের দরজা খোলার আগেই বাইরে ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়াল। তার গম্ভীর মস্তিস্কে এক সুক্ষ্ম দ্বিধা খেলা করছে।
সাধারণত অতিরিক্ত খেয়ে হাঁসফাঁস করলে রিফ্রেশমেন্টের জন্য আইসক্রিম বা ঠাণ্ডা কিছু বেশ কাজে দেয়; কিন্তু এখন প্রায় রাত বাজে দেড়টা। মাঝরাতে এই জায়গায় তো আইসক্রিম পাওয়া সম্ভব নয়। তেমনি এই কনকনে ঠাণ্ডায় আনায়াকে আইসক্রিম খাওয়ানোটাও তো ঠিক হবে না। সফট-ড্রিংঙ্ক পাওয়া গেলেও বেশিরভাগই এলকোহলযুক্ত।
কেনীথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে ড্রাইভিং সিটে এসে বসল। পাশে তাকিয়ে দেখল, আনায়া ততক্ষণে দুই চোখ প্রায় বুজে ফেলেছে। একটা হাত পেটের ওপর চেপে ধরে কুঁকড়ে আছে। কেনীথ আর কথা না বাড়িয়ে আনায়ার দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ল। উদ্দেশ্য তার সিট বেল্ট লাগানো হলেও, হঠাৎ চোখবুঁজে থাকা রমণীর গলার ভাঁজে নজর পড়তেই সে থমকে গেল। হলদেটে আলোতেও কুচকুচে তিলটা রমণীর গলার ভাঁজে জ্বলজ্বল করছে। এ যেন কেবল তিল নয় বরং কোনো দাম্ভিক পুরুষের অতি গোপনীয় দূর্বলতার প্রতীক। যা সহসাই তাকে অস্থির করে তুলেছে। কেনীথ অজান্তেই শুষ্ক ঢোক গিলল। আনায়া চোখ খোলার আগেই আবার দ্রুততর নিজেকে সামলে নিল।
নিস্তেজ রমণীর গায়ের ওপর দিয়ে সিটবেল্টটা টেনে এনে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে ক্লিপটা আঁটকে দিল। বেল্ট পরানোর এই মুহূর্তেটুকুতে কেনীথের উষ্ণ নিশ্বাস আনায়ার মুখের ওপর প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়তেই সে সামান্য নড়েচড়ে উঠল। কেনীথ তার মুখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত নিচু ও গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—“রিফ্রেশমেন্টের জন্য কিছু খাবি?”
আনায়া কোনোমতে নিজের ভারী হয়ে আসা চোখের পাতা দুটো মন্থর গতিতে খোলার চেষ্টা করল। কেনীথের কণ্ঠস্বর যেন তার কানের পর্দায় খুব দূর থেকে ভেসে আসছে। সে অবিন্যস্ত চুলে মাথাটা এদিক-সেদিক নেড়ে একপ্রকার হাফসাফ করতে করতে জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
—“আরো খাবো? জোর করে যতগুলো খাবার খাইয়েছেন… তাতে আমার পেট ফেটে যাচ্ছে।”
কেনীথ আর কথা না বাড়িয়ে আনায়ার কাছ থেকে সরে এলো। দু-হাতে গাড়ির স্টিয়ারিংটা শক্ত করে চেপে ধরে এক বুক ভারী শ্বাস ত্যাগ করল। আনায়ার এমন উপচে পড়া পেট আর বাচ্চাদের মতো নালিশ করার ভঙ্গি দেখে তার ধারালো ওষ্ঠকোণে এক সুক্ষ্ম রেখা ফুটে উঠল। সে সোজা সামনের উইন্ডশিল্ডের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্তস্বরে রাশভারী গলায় বলল,
—“চুপচাপ বসে থাক, বেশি নড়াচড়া করিস না। আই হোপ, কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আনায়ার ততক্ষণে আর কোনো প্রত্যুত্তর করার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি বা ইচ্ছে—কোনোটাই অবশিষ্ট ছিল না। কেনীথের শেষ কথা ক’টি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সে এক গভীর, অতল ঘুমের ঘোরে তলিয়ে গেল।
কেনীথ পুনরায় এক ভারী শ্বাস ফেলে অত্যন্ত ধীর গতিতে গাড়িটা স্টার্ট দিল।
এক্সিলারেটরে পায়ের চাপ সে এতটাই নিয়ন্ত্রণে রাখল যেন গাড়ির গতি কোনোভাবেই অত্যন্ত ধীর আর মসৃণ সীমা অতিক্রম না করে। একদিকে সে মনে মনে চাইছিল যেন এই ধীর গতির কারণে আনায়ার শান্ত ও গভীর ঘুমের বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত না ঘটে, ঠিক তেমনি তার অবচেতন মনের অন্য কোনো এক কোণে হয়তো চাইছিল—আনায়ার বাড়ি অব্দি পৌঁছানোর এই সংক্ষিপ্ত পথটা যেন আজ রাতে আরেকটু দীর্ঘ হয়; আরেকটু সময় যেন এই নিকষিত আঁধারে মেয়েটি তার একদম কাছাকাছি থাকে।
অথচ এত কিছুর মাঝে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন কেনীথের ভেতরের সেই যান্ত্রিক পুরুষটিকে বারবার তাড়া করে বেড়াচ্ছিল—সে জেনে-বুঝেও কেন এই মেয়ের জন্য নিজের সব নিয়ম ভাঙছে? কেন এই অযাচিত টান? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। তবে কেন সে বারবার এতোটা দূর্বল হয়ে যাচ্ছে?
তবে আজ রাতে আর সেই জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নকে খুব একটা গুরুত্ব দেবার ইচ্ছে হলো না তার। সে সব ভাবনা একপাশে সরিয়ে, চলন্ত গাড়ির ফ্রন্ট মিররে নয়তো পাশে ফিরে বেখেয়ালি মেয়েটার ঘুমন্ত ছোট্ট মুখটা দেখতে লাগল। আনায়ার রেশমি চুলগুলো মুখের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, মাথাটা অলসভাবে একপাশে হেলে পড়েছে; একখানা হাত পেটের কাছে শক্ত করে চেপে অন্য হাতটা সিটের ওপর আলগাভাবে ছড়িয়ে রেখেছে সে। ঠিক ছোট বাচ্চাদের মতো অবোধ ভঙ্গিতে ঘুমানোর দশা দেখে কেনীথ নিজের অজান্তেই এক চিলতে মুচকি হাসল।
আনায়া যে সম্পূর্ণ গভীর ঘুমে ডুবে গিয়েছে, তা কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার নিস্তরঙ্গ ও শান্ত নিশ্বাসের শব্দে কেনীথ নিশ্চিতভাবে টের পেল। গাড়িটা অটো-লেনে রেখে সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের বাম হাতটা বাড়িয়ে দিল। অত্যন্ত আলতোভাবে সে আনায়ার পা-দুটো একত্রে টেনে তুলে নিজের শক্ত উরুর ওপর এনে রাখল। রমণীর পায়ে থাকা জুতো দুটো খুলে দেওয়ার জন্য সে একহাতে অত্যন্ত সাবধানে কাজ করতে লাগল—যেন সামান্যতম টানেও তার তন্দ্রা না ছুটে যায়।
ধীরে ধীরে একহাতে কালো বেল্টগুলো খুলে জুতোজোড়া নিচে একপাশে সরিয়ে রাখল সে। আনায়ার খালি শ্বেতশুভ্র পা-দুটো কেনীথ তার নিজের কোলের ওপর আরেকটুখানি টেনে নিল। ঘুমের ঘোরেই পায়ের নিচে এরূপ স্বস্তিদায়ক অবস্থান পেয়ে আনায়া বেশ আমোদের সাথে তৃপ্তিময় এক ভঙ্গিতে সিটের ওপর নিজের গা-টা আরও খানিকটা এলিয়ে দিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন রইল।
একহাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে রেখে, অন্যহাতে অনবরত তার কোলের ওপর থাকা পা-দুটো ধীরে ধীরে আলতোকরে টিপে দিতে লাগল। মেয়েটা সারাদিন এদিক-সেদিক টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। অথচ নিজের শরীরের খেয়াল একটুও রাখে না! অবশ্য এই অবাধ্যতা আর বেখেয়ালি স্বভাব তো নতুন কিছু নয়। কেনীথ পরিচিত এসবের সাথে। যার ফলে এক অতিমাত্রায় দাম্ভিক ব্যক্তিত্বের মানুষ হয়েও, অর্ধাঙ্গিনীর পা-টিপে দিতেও তার নূন্যতম দ্বিধা হচ্ছে না। আর না দ্বিধা হচ্ছে, আনমনা হয়ে পা-দুটো নিজের বুকে অব্দি ঠেকাতে। বরং ইতিমধ্যে সে ভেবে চলেছে কিছু পুরোনো স্মৃতি।
আজ থেকে বহু বছর আগের দিনগুলোতেও, সারাদিন-রাত টইটই করে খেলাধুলা শেষে যখন রাতে ঘুমানোর পালা আসত—তখন ভিভিয়ান নাম উগ্র ছেলেটারও কোল ঘেঁষে শুয়ে রূপকথার গল্প শোনার অবদার করার পাশাপাশি ছোট্ট তারা প্রায়শই তাকে আধো-আধো কণ্ঠে বলত—‘বাইয়া, পা ব্যাতা করে; একতু টিপে টিপে দাও!’
তখনও তার ছোট্ট তারার এই আবদারগুলো না করার সুযোগ পেত না কেনীথ। সেই সুদূর অতীতে জীবনটা বোধহয় সত্যিই ভীষণ গোছানো ছিল; যা পরবর্তীতে নিকষিত ঝড়ে সবকিছু তোলপাড় করে দেয়। কিন্তু এখন সময় বদলেছে, সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে আজ তা এক জটিল ও রহস্যময় মোড় নিয়েছে; অথচ এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও কেনীথ নিজের অজান্তেই সেই পুরোনো অভ্যাসের টানে হারিয়ে গেছে। ওদিকে আনায়াও যেন চেনা হাতের সেই বিশ্বস্ত স্পর্শ অবচেতনেই টের পেয়ে আরও নিশ্চিন্তে, পরম শান্তিতে গভীর থেকে গভীরতর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি ক্রমশই হাইওয়ের এক নিস্তব্ধ মোড় অতিক্রম করে চলেছে। চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো উঁকি দিয়ে যাচ্ছে গাড়ির কাচ গলে।একটা সময় পর, কেনীথের হাতের স্পর্শ আরও গভীর হলো।
ঘুমন্ত রমণীর পা-দুটো টেনে নিয়ে, সহসা নিজের প্রশস্ত বুকের কাছে ঠেকাল কেনীথ; একহাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে কার ড্রাইভ করতে করতেই আচমকা রমণীর শ্বেতশুভ্র ডানপায়ের পাতার কিনারায় আলতোকরে নিজের তপ্ত ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে চুমু খেল সে। পরমুহূর্তেই বিরল লালচে মণীর মোহময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে আনায়ার অগোছালো ঘুমন্ত রূপটা একঝলক দেখে নিল। সাধারণত মনস্ফূট খানিক বেশি আমোদিত রইলে সে যেই গানটা গেয়ে থাকে, আজও ঠিক বহুদিন পর কেনীথ তার গাড়ির মিউজিক প্লে লিস্টে সেই গানটাই প্লে করল। আনায়ার পায়ের পাতায় আলতোভাবে নাক-মুখ ঘসতে ঘসতেই, তার ওষ্ঠকোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। স্পিকার হতে ভেসে আসা সুরের তাল মিলিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে মৃদু গুঞ্জনে গাইতে লাগল,
‘Naaee Naaeera Naaraa
NaaaraNaaae,nara nara
naara naa nee______
Jhuki Teri Palko Mein
Mil Jaaye Mujhe Panah
Palke Ghire Aansu Bhari
Reh Jaaye Mere Nishan____’
কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত, বদ্ধ গাড়ির ভেতরে সেই সুর ও আবেশ মাখানো মুহূর্তটুকু খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারল না। কেনীথ নিজের ভেতরের এক অদ্ভুত আকর্ষণে মত্ত হয়ে আনায়ার পায়ে আরেকখান চুমু খাওয়ার জন্য ওষ্ঠাধর সামান্য নিচু করতেই ঘটল চরম এক অঘটন!
কেনীথের স্পর্শে ঘুমের ঘোরে আনায়ার পায়ে সুরসুরি লেগেছিল নাকি সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছে—তা অস্পষ্ট রইলেও, হঠাৎ সে উন্মাদের মতো নিজের পা-টা ছুড়ে মারল সোজা সামনের দিকে। আর তার সেই অবাধ্য ডান পা-খানা কেনীথের হাত থেকে ফস্কে সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়ল কেনীথের মুখ বরাবর—একেবারে সোজা বাংলায় যাকে বলা হয় কষিয়ে লাত্থি!
”ঠাস!”—করে এক আকস্মিক শব্দ হতেই কেনীথের মাথাটা এক লহমায় পেছনের সিটের কুশনে গিয়ে ঠেকল। কিন্তু কেনীথ তখন হুড়মুড়িয়ে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ির গতি সামলাতে ব্যস্ত হলো। ততক্ষণে অবশ্য মুহূর্তের মাঝেই গাড়ির ভেতরের সকল মায়াবী আবেশ কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে। সজোরে লাগা সেই আকস্মিক লাথির চোটে কেনীথের নাক-মুখের একপাশে বেশ খানিকটা চোট লাগায়, মুহূর্তেই সেখান থেকে সামান্য তাজা রক্ত অব্দি বেরিয়ে এলো।
মহামায়া পর্ব ৪৬
কেনীথ চরম বিরক্তিতে আর রাগে নিজের ধারালো ভ্রুযুগল কুঁচকে ফেলল। নিজের হাতটা নাক-মুখের চোট পাওয়া অংশে ছোঁয়াতেই দেখল, সামান্য গাঢ় লাল রক্ত তার আঙুলের ডগায় লেগে আছে।
কেনীথ এইপর্যায়ে চরম অতিষ্ঠ ও ত্যক্ত ভঙ্গিতে দীর্ঘ, ভারী শ্বাস ত্যাগ করে, পাশে মুখ ফিরিয়ে ঘুমন্ত রমণীর দিকে তাকাল। অথচ আনায়ার মাঝে বর্তমানে জাগতিক কোনো খেয়ালই নেই। সে লাথিটা মেরেই খানিকটা নড়েচড়ে অন্যপাশে গা-টা এলিয়ে দিয়ে,বেশ নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। কেনীথ তার ভ্রুযুগল অতিমাত্রায় কুঁচকে ফেলল; ললাটে ভাজ ফেলে ড্যাশবোর্ডের টিস্যুবক্স হতে ব্যস্ত হাতে দুখান টিস্যু তুলে নিল। আনায়ার দিক থেকে নজর না ফিরিয়েই, মু’খের র’ক্তটুকু মুছে নিল। দাঁতে দাঁত পিষে অত্যন্ত ত্যক্তসুরে বিড়বিড় করে আওড়াল,
”ঘুমের মধ্যেও এতো নড়ে মেয়েটা! হাহ… কবে যে বড় হবে! এখনও সেই আগের মতোই রয়ে গেছে, ইডিয়ট!”
