Home রাগে অনুরাগে রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭
সুহাসিনি ফাতেহা

ঝিলিক লজ্জায় কোনো কথা খুঁজে পেল না।
চুপচাপ সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। বুকের ভেতরটা কেমন দ্রিমদ্রিম আওয়াজে কাঁপিয়ে তুলছে। অদ্ভুত এক অনুভূতি। এই অনুভূতি নামও অজানা। শুধু তুষার ভাইয়ের সামনে এলেই শুরু হয়। মনে হয় যেন আশেপাশের সব মানুষজন চলে আসবে সে আওয়াজে। তার উপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামা শুরু হয়েছে ধরনীজোড়ে। আর বেশিক্ষণ থাকলে নিশ্চিত ভিজে যাবে। তখন মায়ের বকা খেতে হবে। ঝিলিক যখন এসব চিন্তায় বিভোর ঠিক তখনি ভেসে এলো পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠসুর,

“তো ঝিলিক, আমি বুঝি আপনার চলে যাওয়া দেখার জন্যই এখানে দাঁড়িয়ে আছি?”
ঝিলিকের ত্রস্ত পাজোড়া থেমে যায় মুহূর্তেই । বেশিদূর যেতে পারেনি। সবে দুপা সামনে এগিয়েছে। থেমে না গেলেই যেন নয়। লোকটার কণ্ঠসুর এত মারাত্মক শুনায় যে ঝিলিকের বুক কাঁপে। নিজের অজান্তেই হাঁটা থামিয়ে দেয়। তুষার বাইক স্টার্ট দিয়ে খুব ধীর গতিতে মেয়েটার পেছন পেছন এসে পাশে থামাল। পাশে ফিরে তাকাল মেয়েটার মুখ চোখাচোখি।
ঝিলিক চোখ নামিয়ে নিলো। আগে তো তুষার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে এমন লাগতো না। এখন কেন এমন হয়। হাঁসফাঁস করে বলল,
“কেন.. কেন দাঁড়িয়ে আছেন আপনি?”
তুষারের সোজাসাপটা উত্তর এলো,
“অবশ্যই আপনাকে দেখতে।”

ঝিলিকের বুকের ভেতরে ঢু*কে গেল ওমন লোভনীয় কথাটা। এমন কথা কখনো শুনছে সে? মনে করতে পারছে না ঠিক। ঝিলিকের ভাবনার মাঝেই তুষার স্রেফ বলল,
“বৃষ্টি আসবে মনে হয়। আপনি আমার পেছনে বসবেন?”
ঝিলিক যেন আশা করেনি এমন কথা। অবিশ্বাস নিয়ে ঠিক ততটাই দ্রুত জবাব দিলো,
“না..না আমি অটো দিয়ে চলে যাবো।”
তুষার ঝিলিকের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে চোখ ছোট করে তাকিয়ে থেকে শাসনের সুরে বলল,
“হিজাব কই আপনার?”
ঝিলিক সহসা জিভ কাটলো। লোকটা এতকিছু খুঁজছে কেন তার? তার দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চয়। সে চোখে চোখ মিলাতে না পেরে বলল,
“আসলে….”
“কোনো আসল নকল মানবো না। কাল থেকে হিজাব ছাড়া ভার্সিটিতে আসবেন না।”
“আচ্ছা।”

“বাইকে উঠে বসুন এখন আপনি কোনো অটো পাবেন না।”
ঝিলিক বাইকে ছড়তে খুব ভয় পায়। এই বাইকে ছড়েই তার বাবার মৃত্যু হয়েছে। বাইক দেখলেই বাবার রক্তা*ক্ত দেহ চোখের সামনে ভেসে উঠে। কি ভয়ঙ্কর ছিলো। চারবছর হয়ে গেলেও ঝিলিক আজও বাবার চেহারা ভুলতে পারে না। চোখ নামিয়ে বলল,
“আমার বাইকে ছড়তে খুব ভয় করে।”
“আমি থাকতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই ঝিলিক। আপনি উঠুন! বৃষ্টি আসলে তখন কিন্তু ভিজবেন। জ্বর আসবে কিন্তু।”
ঝিলিক ভাবনায় পড়ে গেল। তুষার ভাইয়ের তাকে নিয়ে এত চিন্তা? তার জ্বর আসা নিয়ে ভাবছে কেন? কত জ্বর নিয়ে দিন কাটিয়েছে। এখন কি বাইকে উঠবে? না উঠলে উনি যদি রাগ করেন। ঝিলিক চুপচাপ তুষারের পেছনে উঠে মাঝে ব্যাগ রেখে বসলো।
তুষারের গম্ভীর মুখে হাসি ফুটলো কেন জানি। তৃপ্তির হাসি। মিররে একবার মেয়েটার ভয়ার্ত মুখের পানে চেয়ে বলল,

“ধরে বসুন না হলে কিন্তু পরে যাবেন।”
ঝিলিক লজ্জয় মরে যাচ্ছে। এইপ্রথম কোনো পুরুষ মানুষের পাশাপাশি বসেছে। অদ্ভুত শিহরণ কাজ করছে সমস্ত দেহে। কাঁপা গলায় বলল,
“ধ..ধরে বসেছি তো।”
“কই ধরে বসেছেন আমি বাইক স্টার্ট দিলে পড়ে গেলে তখন কি হবে?” —- বলে তুষার আর একমুহূর্ত দেরি না করে বাইক স্টার্ট দিলো সাথে সাথেই।
ভয়ে রীতিমত ঝিলিকের গা কাঁটা দিয়ে আসে। সব ভুলে আচমকা সামনের যুবকের শক্ত পিঠ খামছে ধরল। তারপর বলিষ্ঠ কাধ। দুরুত্ব কমলো আগের তুলনায়। তুষার মিররে সব দেখল কিন্তু কিছু বলল না। শান্তি! খুব ধীর গতিতে বাইক নিয়ে গন্তব্য পৌঁছালো। পথিমধ্যেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টিতে না ভিজার জন্য বাইকে করে এসেও ভিজতে হলো তাদের।

ঘড়ির কাঁটায় বিকেল চারটা।
তিতলি শাশুড়ি আম্মুর রুমে শাড়ি পরেছে। বাবার বাড়ি যাবে। ফারাজকে কালকে বলেছে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। কিন্তু জেদি তিতলি যাবেই যাবে। তার আব্বু আম্মুকে না দেখলে বোধহয় মরেই যাবে। সেদিন আব্বু আম্মুকে দেখে ফারাজের লোভে যেতে মন চাই নি। কিন্তু এখন তো দেখে না। ভিডিও কলে দেখলেও মন মানেনা।
ফারিন বেগম পুত্রবধুকে শাড়ি পরিয়ে গলায়,হাতে,কানে, স্বর্ণের গয়না পরিয়ে দিয়েছেন। চোখ জুড়িয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে মা। আমার ছেলে দেখলে চোখ ফিরাতে পারবে না।”
অন্যসময় হলে তিতলি ঠোঁট প্রসারিত করে হাসতো। কিন্তু এখন তার হাসতে ইচ্ছে করে না। ভাল্লুকের উপর রেগে আছে। আজ আসলে একদম কথা বলবে না। চারটা বেজে গেছে এখনো আসে নি।
ফারিন বেগম আবার বললেন,
“ফারাজ যদি তোমাকে কখনো ধমক দেয় সোজা আমার কাছে এসে বলবে ছেলেটা একদম দাদার মতো হয়েছে। তোমার দাদাশ্বশুরও এমন ছিলো।”
তিতলি এবার একটু হাসলো। বলল,

“আচ্ছা আম্মু।”
ফারিন বেগম পুত্রবধুকে একটানা হাসিমুখে ও বললেন,
“তুমি আসার পর থেকে খান বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। আগে একা একা মনে হতো সকাল কাটছে না সকাল কাটলে দুপুর কাটছে না। আমি জানি তোমার মা বাবার জন্য কাঁদছো, মন খারাপ করো না। দেখবে ফারাজ ঠিক তোমাকে নিয়ে যাবে প্রথমে রাগ দেখাবে। কিন্তু তোমার জেদের কাছে আমার ছেলে হার মারবে।”
বলে ফারিন বেগম বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।
নাছিমা বেগম সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কয়দিনে যা বুঝলেন, মেয়েটা বোকাসোকা। যা বলে বিশ্বাস করে নেয়। বোনকে চলে যেতে দেখে মুখ বেঁকিয়ে আস্তে করে বললেন,
“ফারাজকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বাদ দাও ফারাজ আমাকে নিজ মুখে বলছে তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে আমার মেয়ে নীলাকে বিয়ে করবে। এবার বাবার বাড়ি গিয়ে আর না আসলে তোমারই মঙ্গল। সাবধান থাকো।”
তিতলি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। হাসিখুশি মুখমণ্ডল মুহুর্তেই আঁধারে পরিনত হয়েছে। ঠোঁটের হাসিটুকু হারিয়ে ফেলেছে। বুকটা ধুক করে উঠছে ক্ষনে ক্ষনে। চোখ দুটো পানিতে ভিজে উঠেছে। গলা ধরে এলো,
“মিথ্যা…..”
“মিথ্যা বলছি না আর ফারাজ তো তোমাকে দেখতে পারে না এটা তো তুমিও জানো মিথ্যা বলার কি আছে?”
তিতলি আর দাঁড়াতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে রুমের দিকে দৌড় দিলো।

ফারাজ খান কলেজ থেকে এসেছেন। কলেজে আজকে একটু বেশি কাজ ছিলো। অনেক টায়ার্ড ফিল করছেন। এইমুহূর্তে গোসল করার চেয়ে উপরে কিছু নেই। রুমে ঢুকেই সর্বপ্রথম তার বেয়াদব বউটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলালো। তীক্ষ্ণ হলো যুবকের চোখের চাহনি। দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কোথায় যাচ্ছো?”
তিতলি কোনো উত্তর করল না। ফারাজের দিকে ঘুরে তাকাল না পর্যন্ত। ভাবখানা এমন সে ফারাজের কথা শুনেনি। কিছুক্ষণ পরপর বুক কাঁপিয়ে নাক টানছে। সপ্তদশীর পেল্লয় মুখখানা এমন যেন ছুঁয়ে দিলেই কেঁদে দিবে। খালা শাশুড়ির কথাগুলো শুনার পর থেকে কেঁদেকেটে ভাসিয়ে ফেলেছে। ফারাজের কথার উত্তর না দিয়ে শাশুড়ির পরিয়ে দেওয়া স্বর্ণ গুলো খুলে ড্রেসিন টেবিলে খুলে রেখে দিচ্ছে।
ফারাজ স্থির দৃষ্টিতে বেয়াদব বউয়ের পুরো মুখ অবলোকন করে। কান্নার দাপটে পুরো মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। চোখ ফুলে উঠেছে। ফারাজের রাগী চেহারা পরিবর্তন হলো মুহূর্তেই। গলায় ধমক আটকে রেখে বলল,
“কাঁদছো কেন?”

তিতলি এবারও কিছু বল
লো না। ফারাজ রেগে যাচ্ছে । ফোঁস করে শ্বাস নিলো। বেয়াদব বউ তার রাগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এবার সে পূর্বে কিছু জিজ্ঞেস করা ছাড়ায় তিতলির সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। পেশিবহুল হাতের সাহায্যে একটানে বেয়াদব বউকে নিজের সামনে দাঁড় করালো। বা হাতে তিতলির কোমর টেনে নিজের সাথে চেপে ধরল পুরোপুরি । ডান হাতে থুতনি উঁচু করে প্রশ্ন করে,
“কথা বলছো না কেন? আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি!”
তিতলি কেঁপে উঠল। পিটপিট করছে আঁখিদুটি।
তার চোখজোড়া লাল হয়ে গিয়েছে। তাও ফারাজের দিকে তাকালো না। চোখ বন্ধ করে রাখলো। অভিমানে তার কন্ঠে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে,
“আমি কথা বলবো না।”
“রাগিয়ো না আমায়। যখন যেটা প্রশ্ন করবো সাথে সাথে এন্সার চাই।”
“আমি কে আপনাকে রাগানোর?”
“থাপ্পড় খেতে ইচ্ছে করছে?”
“মারেন আমি কিছু বলবো না।”

ফারাজ নিজের রাগ কমানোর জন্য দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় আনমনে। যতটা পারল ঠিক ততটাই শান্ত হয়েই বলল,
“কি হয়ছে?”
তিতলি ফুঁপিয়ে কাঁদে। মাথা নিচু তার।
“আপনি…আমাকে…”
“হু আমি তোমাকে….”
তিতলি এতো চেষ্টা করেও বাক্যটি মুখ দিয়ে বের করতে পারছেনা। পুনরায় মুখ খুলল। পারছেনা! ফারাজকে খুব ধৈর্যবান দেখাল। চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। তিতলি অস্পষ্ট স্বরে শুধালো,’
“ডি…ডিভ!”
“সম্পূর্ণ কথা শুনতে চাই একসাথে।”
তিতলি চুপ হয়ে গেলো। কাঁদতে কাঁদতে আগের কথাটা অর্ধেক রেখেই বলল,
“আপনি…আপনি আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন?”

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৬ (২)

ফারাজের মুখের ভাব বদলে গেল মুহূর্তেই। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেল। গম্ভীর সুদর্শন মুখখানায় আচমকা শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে মুখ নামালো মেয়েটার কানের কাছে। অতঃপর হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“আমার থেকে তোমার কোনো মুক্তি নেই। গোটা এক জনম আমার সাথে কাটাতে হবে। দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই! আমি হতে দিবো না।”

রাগে অনুরাগে পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here