রাগে অনুরাগে পর্ব ২৬ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা
ফারাজের মুখে এমন কথা শুনে বোকার ন্যায় হতবিহ্বল ভাব ধরল তিতলি। একবার ঘাড় নামিয়ে তাকাল নিজের পানে। আর ওমনি একদফা ঝটকা খেল বেচারি ! খুব লজ্জা লাগছে তার। তক্ষুনি দু’হাতে টাইলেসে পড়ে থাকা শাড়ির আঁচল টেনে বুকে তুলল। এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে চলেছে সমস্ত দেহে। দুরুদুরু কাঁপতে থাকা বুকের গতিও নিয়ন্ত্রণে নেই। তার সব দেখে নিলো মনে হয়। খুব লজ্জা লাগছে তার। নত হয়ে শুষ্ক ঢোক গিলছে তিতলি ! প্রাণ উড়ে যাবার যোগাড় বেচারির। পেছন থেকে উপলদ্ধি করল ফারাজ এখনো একই ভাবে পেছনে দাঁড়িয়ে। নড়ছে না। কেন? তিতলিও দাঁড়িয়ে রইলো কাঠকাঠ হয়ে। মনে হলো ফারাজের নেওয়া ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে তার ঘাড়ে। সহসা কোমরে শক্ত ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেলো। তিতলি নড়েচড়ে উঠলো। সুরসুর করে উঠলো সমস্ত কাঁপা দেহ।
তিতলির কাঁপাকাঁপির মাঝেই তৎক্ষণাৎ ফারাজ গভীর কণ্ঠে বললো,
“আমাকে দেখিয়ে নিজের প্রতি আকর্ষন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছো হুমম? এখন আমি কিছু করলে বিষয়টা কিন্তু অন্যদিকে মোড় নিবে।”
তিতলি এবার দাঁড়াতে পারল না লজ্জায়। চোখমুখ খিঁচে এলোমেলো শাড়ি নিয়ে ত্রস্ত পায়ে দৌড় লাগাল ওয়াশরুমের পানে, আর ওমনি পথিমধ্যে শাড়ির বাঁজে পা বাঁধল মেয়েটার! ঘটনাপ্রবাহে আচানক মেঝেতে উল্টে পড়তেই ব্যথায় চোখমুখ কুঁচকে গেল তার। তড়িঘড়ি করে দু’হাতে ভর দিয়ে উঠবার প্রয়াস চালায় বোকা মানবী। কনুইতে এত ব্যা*থা পেয়েছে। হাত দিয়ে আহ*ত স্থান ডলতে ডলতে উঠতে চাইল। ঠিক তখনি একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আচমকা টেনে ধরে মেয়েটার ডান হাত। তার পাতলা ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ধমক দেবার জন্য। গলায় ধমক আটকে রেখে
শাসানো সুরে বললো,
“সমস্যা কি তোমার? আমি দুইটা কথা বলছি বলে গাঁদার মতো দৌড় দিতে হবে? হাতপা ভেঙে পঙ্গু হওয়ার ইচ্ছে থাকলে আমাকে বলতে পারতে।”
মেয়েটা লজ্জায় লাল, নীল, গোলাপী হচ্ছে। মাথা নত করল সে। এই ধারালো নেত্রদ্বয়ে চোখ মিলাতে তার হৃদয় কাঁপে। হাঁসফাঁস করে বলল,
“আপনার কাছে এটা সা..সামান্য মনে হয়?”
“নয়তো কি?”
তিতলি লজ্জায় খাটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। আর এই লোকের কাছে এটা সামান্য মনে হয়। লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বলল,
“আমার লজ্জ..লজ্জা লাগে আপনার সামনে দাঁড়াতে।”
ফারাজের কপালের ভাঁজ শিথিল হলো এবার। বিদ্বিষ্ট চাউনী গভীরতা পেল। কণ্ঠসুরও কেমন তীক্ষ্ণ শুনালো,
“তো? এখনো আমার সামনে আছো কিভাবে?”
“আপ..আপনি তো বলছেন আমি দেখাচ্ছি তাই চলে যাচ্ছিলাম।”
“আমার বউ আমি যখন যা ইচ্ছে বলবো তোমাকে।ফারদার, আমি যতক্ষণ কথা বলবো তোমাকে চুপচাপ সব কথা শুনতে হবে। তার আগে এক পা ও যদি এদিক ওদিক যায়। ফল কিন্তু ভালো হবে না। আন্ডারস্ট্যান্ড!”
তর্জনে গর্জনে সপ্তদশীর কিচ্ছু যায় এলো না।
বরং ফারাজের মুখে বউ শব্দটা শুনে তুলতুলে ভালো লাগায় ভরে গেল বুকটা। বারবার শুনতে ইচ্ছে হয়। কতটা গভীর শুনালো ওই বউ ডাক! এত ভালো লাগে কেন? মনের মধ্যে রাজ্যের সব প্রশান্তি ভীর করে যেন। সে চাই ফারাজ তাকে আদর করে বউ বলে ডাকুক। যেমন, আমার টুনাটুনিদের মা আমার সুন্দরী বউ তুমি কোথায় এভাবে ডাকুক।
একটু যাচাই করতে বলল,
“বউ..বউ মানেন?”
“বউ মানি আর না মানি কাগজে কলমে তুমি আমার বউ আর এটাই তো মানতে হবে তাইনা?”
“আমি জানি আপনি আমাকে ভালোবাসেন।”
“নাথিং!”
তিতলি মুখ ভেঙচি কাটলো। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বললে কি হয়?”
ফারাজ সে কথার জবাব দিলো না। বেয়াদব বউকে সে শাস্তি দিতে বিয়ে করেছে। প্রেমপ্রেম খেলা খেলতে নয়। ভালোবাসা এখন তার সাথে যায় না। ভাবনা বাদ দিয়ে যুবক হুকুম ছেড়ে বলল,
“নেক্সট টাইম থেকে আমি ডাকার সাথে সাথে যেন সামনে হাজির দেখি। দ্বিতীয়বার ডাকতে হলে বিষয়টা কিন্তু শুধু ডাকাতে শেষ হবে না।”
তিতলির নিষ্পাপ জবাব,
“না আসলে কি হবে?”
ফারাজের সোজাসাপটা উত্তর,
“এইমুহূর্তে যা করিনি ত হবে।”
তিতলি ঢোক গিলল।
ফারাজ কপাল কুচকে রেখে স্রেফ বললো,
“তখন তোমার আব্বু যাওয়ার কথা বলায় আমি তো অনুমুতি দিয়েছিলাম যাও নি কেন?”
তিতলি ভাবনায় পড়ল এবাবরের মতো। সে তো ভাল্লুকের জন্য যায় নি। তার আশেপাশে থাকতে খুব ইচ্ছে করে। একটুও দূরে যেতে নয়। লোকটা কি সেটা বুঝে না? আসলে তাকে বুঝে না। থাক! যেহেতু বুঝে না তাই সেও বুঝতে দিবে না। ত্যাড়া কণ্ঠে নাক ফুলিয়ে জবাব দিলো,
“অয়ন ভাইয়ার জন্য যায় নি।”
ফারাজের মেজাজ খরাপ হলো এমন উত্তরে। চি*বুক শক্ত হলো তখনি। চাপা রাগে যেন ঘি পড়ল। বেয়াদব বউকে এখন দুইটা কড়া কথা শুনাতে মন চাইছে। এমনি এমনি তো আর কথা শুনায় না।
শক্ত মুখবয়বে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“রাগাচ্ছো কেন আমায়?”
তিতলি এবারও ত্যাড়া উত্তর দিলো,
“আপনি বলছেন যায় নি কেন তাই উত্তর দিছি।”
ফারাজ এবার পূর্বে কোনো অনুমূতি ছাড়ায় তিতলির নরম কব্জি শক্ত করে বন্দি করল নিজের খসখসে হাতে মুঠোয়। রুঢ় মানব কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“তুমি আসলে ভালো কথা পাওয়ার যোগ্য না। এক্ষুনি আমার সামনে থেকে যাও নয়তো…”
তিতলি কেড়ে নিলো সেটুকু কথা,
“নয়তো…নয়তো কি করবেন আমায়?”
এক অজানা কারণেই যুবকের মাথার তালু গরম হচ্ছে রাগে। অবাধ্য বেয়াদব বউর কতবড় স্পর্ধা। তার সামনে দাঁড়িয়ে পরপুরুষের নাম মুখে নিয়ে আবার মুখে মুখে তর্ক করে। দাঁতে দাঁত চাপল নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টায়। হিসহিসিয়ে বলল,
“কি করবো সেটা রাত হলেই বুঝাবো এখন ছেড়ে দিয়েছি বলে ভেবো না বেঁচে গেছো।”
বলে যুবক তিতলির হাতটা ছাড়ল না যেন ছুড়ল। আর একমুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। আকাশসম রাগ নিয়ে তখনি রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
তিতলি হতভম্বের ন্যায় ফারাজের যাওয়ার দেখলো। রেগে গেল নাকি? রেগে যাক তাকে বুঝেনা যেহেতু রেগে যাওয়ায় ভালো। তারও ভালো লাগছে রাগিয়ে দিতে পেরে।
আজকে রবিবার। এর ভেতরে কেটে গেছে আরো দশটা দিন। ফারাজ তিতলিকে পড়া নিয়ে একবিন্দু ও ছাড় দেয় না। দুদিন আগে থেকে রাতে সময় নিয়ে পড়ানোর শুরু করেছে। কিছু না পারলেই ধমক সাথে খোঁটা লাগানো কথা তো আছেই। আবার বুঝিয়ে দেয় শাসন করে। দুষ্টমিষ্টি খুনসুটি, রাগে অনুরাগে অভিমানে তাদের সুন্দর বিবাহিত জীবন চলছে শ্রাবণধারার মতো।
বৌভাতের পর সবাই চলে গেলেও ফারাজের খালা নাছিমা বেগম মেয়েকে নিয়ে এখনো রয়ে গেছেন। সাথে নানা হুশিয়ার সাহেব আর নানি ছকিনা খাতুন তো আছেনই।
সকাল ১০ টা।
তিতলির রুমে বসে আছে। ফারাজ কলেজে গেছে। কিন্তু তিতলি যায় নি। আজকে বিকেলে বাবার বাড়ি যাবে। কিন্তু ফারাজ যেতে দিচ্ছে না। এ নিয়ে বসেবসে দুঃখ করছে সে। কয়দিন বাবা মাকে দেখে না। তুষার এর ভেতরে তিনদিন এসে দেখে গেছে বোনকে। তাও তিতলির মা বাবা দাদুকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। তখনি ফোন বেজে উঠলো। নিধি কল করেছে। তিতলি ফোন রিসিভ করল,
“হ্যালো।”
নিধি: “কেমন আছিস বেইবি তোকে খুব মিস করি রে। কলেজে আসবি কখন?”
তিতলি: “ভালো নাই। ভাল্লুক আমাকে কোথায়ও যেতে দেয় না।”
নিধি: “আহারে কেন? আমার বেস্টু টা মন খারাপ বুঝি?”
তিতলি মন খারাপের ভান ধরে বলল,
“হুম রে বসে বসে পিঁয়াজ কেটে কান্না করি। দুঃখে কান্না আসেনা! আমি আব্বুর কাছে যেতে চাই এটা ওই লোক বুঝে না। আমিও বুঝবো না তাকে। ”
নিধি: “আচ্ছা বাদ দে হানিমুনের কি খবর? বিয়ের আগে তো হানিমুন হানিমুন বলে মাথা খেয়ে পেলতি।”
তিতলি: “আমার আবার হানিমুন! হানিমুন আমার কপালে নেই রে। আমার কপালে শুধু পড়ালেখা।”
নিধি: “তো পড়বি এটা তো আরো ভালো টাকা ছাড়া বিনা বেতনে প্রাইভেট পড়িস!”
তিতলি: “আচ্ছা রাখ! একটু কান্না করি!”
নিধি: “বাড়িতে আসলে আমাকে বলিস দেখতে আসবো তোকে।”
তিতলি: “আচ্ছা জানু! বলে তিতলি ফোন কেটে দিলো।”
তিতলি নাছিমা বেগমের সাথে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। রুমে মন টিকছে না। ফারিন বেগম কিচেনে। ফারাজের খালা নাছিমা বেগম এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন,
“ফারাজ তো তোমাকে ভালোবাসে না। ও তোমাকে কয়দিন পর ডিভোর্স দিয়ে দিবে।”
তিতলি পাশ ফিরে হিংস্র চোখে তাকালো। এই মহিলা খুব খারাপ। তাকে শুধু কুবুদ্ধি দেয়। তিতলি বিশ্বাস করে না। তার ফারাজ শুধু তার। সে ডিভোর্স দিতে দিবে না মেরে ফেলবে একদম। নতুন বউ হওয়ায় কিছু বলতেও পারছেনা। কারণ তার দাদু বলছে শ্বশুর বাড়ির কেউ কিছু বললে চুপচাপ শুনতে। কিন্তু সে এবার চুপ থাকবে না। কেঁদে দিবে এমন ভাব নিয়ে জবাব দিলো,
“উনি আমাকে ভালোবাসেন।” বলে সেখান থেকে উঠে রুমের দিকে দৌড় দিলো।
আজকে রবিবার। তুষার বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝিলিকের ভার্সিটির সামনে। অফিস ফেলে মেয়েটাকে এক নজর দেখার জন্য চলে এসেছে। তিতলির বৌভাতের পর থেকে আর দেখা হয়নি। তুষার একবার নিজ হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো। ১:০০ বাজে ঘড়িতে। মনে হয় বৃষ্টি আসবে। আকাশে গর্জন দিয়ে বুঝাচ্ছে বৃষ্টি আসার পূর্বাভাস। এর মধ্যে ভার্সিটির ছুটি হলো। শতশত ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে আসছে ভেতর থেকে। তুষারের চোখ শুধু চেনা মুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। প্রায় সবাই চলে যেতেই সহসা চোখ পড়ল কয়েকটা মেয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলতে বলতে বের হয়ে আসছে ঝিলিক। পরনে সাদা ইউনির্ফম। মাথায় হিজাব নেই। তুষারের রাগ হলো। চোখ ছোট করে তাকিয়ে মেয়েটার পথযাত্রা দেখল।
ঝিলিক বান্ধুবির সাথে কথা বলার সময় আচমকা চোখ পড়ল তুষারের উপর। মেয়েটা চোখ নামিয়ে নিলো। বকবক করা মুখটা বন্ধ হয়ে গেলো। পাশ থেকে ওর বান্ধুবি সিয়া বলল,
“কিরে চুপ হয়ে গেলি কেন? তারপর কি হলো বল?”
“কিছুনা!”
বলে ঝিলিক শুকনো অধরযুগল ভিজিয়ে তাকাতে চাইলো তুষারের দিকে। সেদিনের পর থেকে মেয়েটার লজ্জায় রাতের ঘুম হারাম। আগে তো এমন অনুভূতি হতো না। তুষার ভাইকে দেখলেই এগিয়ে সালাম দিতো। এখন এক অদ্ভুত জড়তা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে। পাশে সিয়াকে বললো,
“তুই চলে যা এখন। আমি অটো নিয়ে চলে যাবো।”
সিয়া বুঝলো ঘটনটা। তাই মুচকি হেসে চলে গেলো।
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৬
ঝিলিক সিয়াকে এটা বললেও নিজেই তুষারকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। কিন্তু তুষার ডাকলো,
“হুমম বান্ধুবিকে চলে যেতে বলে এখন আমাকে না দেখার ভান করছো?”
ঝিলিক জিভ কাটলো। পাশ ফিরে এখন দেখেছে এমন ভাব নিয়ে বলল,
“তুষার ভাই আপনি এখানে?”
“হুমম আমি!”
