Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৮

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৮

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৮
জেরিন আক্তার

প্রাণেশা স্নিগ্ধর ডাকে রুমে ফিরে দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে রইলো। যা দেখে স্নিগ্ধ গম্ভীর হয়ে বসে আছে।
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে বলল,
“কি হয়েছে ডাকলেন কেনো? কিছু বলবেন?”
স্নিগ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কেনো ডাকা বারণ নাকি? আসতে মনে না চাইলে চলে যাও।”
প্রাণেশা শয়তানি হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো। স্নিগ্ধর দুই-গালে হাত রেখে হেসে বলল,
“রাগ করে আছেন এখনও। সরি আর রাগ করে থাকবেন না প্লিজ। অনেক মিস করেছি আপনাকে।”
স্নিগ্ধ ভাবুক চোখে তাকিয়ে রইলো। তখন তো ওকেও রাগী রাগী ফেসে কিচেনে বসে থাকতে দেখলো এই এখন আবার এতো ভালো হলো কি করে? হতেও পারে, ভালোবেসেই হয়তো এমন করে।
প্রাণেশা স্নিগ্ধর কপালে চুমু খেয়ে বলল,

“সরি বলেছি তো, এখনও কথা বলবেন না?”
স্নিগ্ধ হেসে প্রাণেশাকে জড়িয়ে ধরলো। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে বলল,
“আপনার জন্য একটা সারপ্রাইস আছে।”
স্নিগ্ধ মাথা তুলে তাকিয়ে বলল
“কি সারপ্রাইস জান?”
“চোখটা বন্ধ করে হা করুন। একটা জিনিস এনেছি খাওয়াবো।”
স্নিগ্ধ চোখ বন্ধ করে মুখ খুলতেই প্রাণেশা একটা মরিচ দুইভাগ করে মুখে পুড়ে দিলো। স্নিগ্ধ না বুঝে চিবাতেই ঝাল লাগতেই ও চোখ খুলে তাকালো। আর ওমনেই প্রাণেশাকে কাছে টেনে ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে দিলো। এক মিনিট পরেই প্রাণেশাকে ছেড়ে দিয়ে পানির গ্লাস হাতে নিলো। ঠোঁট যেনো জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। আর অন্যদিকে প্রাণেশার দৌড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
স্নিগ্ধ সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে দুটো চকলেট বের করে খেয়ে নিলো, সাথে পানিও খাচ্ছে। আস্তে আস্তে ওর ঝালটা কমে আসছে। কিন্তু প্রাণেশা?
স্নিগ্ধ ওয়াশরুমে এসে প্রাণেশাকে দেখলো ও শুধু ঠান্ডা পানি দিয়ে কুলকুচি করছে।
মিনিট পাঁচেক পরে হাপাতে হাপাতে বের হলো প্রাণেশা। এমনে ও ঝাল খেতে পারে কিন্তু এই ঝালটা অসহ্য ঝাল।
স্নিগ্ধ ওকেও খাওয়ার জন্য চকলেট দিলো। কিন্তু সে ধৈর্যটাও যেনো প্রাণেশার নেই। স্নিগ্ধ রুম থেকে বেরিয়ে নিচে এলো। কিচেনে ঢুকে ফ্রিজ থেকে আইস আর ঠান্ডা পানি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে কিচেন থেকে বের হলো। রাজিয়া বেগম জিজ্ঞাসা করলেন,

“কি হয়েছে স্নিগ্ধ?”
স্নিগ্ধ যেতে যেতে বলল,
“তোমার বউমা কাঁচা মরিচ খেয়েছে।”
রাত ৯ টার দিকে….
স্নিগ্ধ রাতের খাবার খেয়ে রুমে এলো। প্রাণেশা রুমে আসেনি। সেই যে রাগ করে চলে গিয়েছে এরপরে স্নিগ্ধও আর ডাকার সাহস পায়নি। তবে সাড়ে ৯টা বাজার সাথে সাথে ও রুম থেকে বেরোলো। ড্রইং রুমে এসে দেখলো সেখানে শুধু সিয়াম একা বসে ফোনে কথা বলছে। ও আবার উপরে চলে এলো। সুবহার রুমেই ওকে পেলো।
স্নিগ্ধ সুবহার রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে দেখে শ্বাস ছেড়ে উঠে ওর সামনে এলো। স্নিগ্ধ ওর হাত ধরে নিয়ে গেলো।
নিজেদের রুমে আসতেই প্রাণেশা স্নিগ্ধর শার্ট ধরে টান দিয়ে একটু ঘেঁষে দাড়িয়ে বলল,

“আমার কথা শুনুন।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“বলো।”
প্রাণেশা সন্দীহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“সুবহাকে কি কিছু বলেছেন এর মধ্যে? নাকি বকাঝকা করেছেন?”
স্নিগ্ধর নিরেট কণ্ঠে বলল,
“কই তেমন কিছু তো বলা হয়নি ওকে।”
প্রাণেশা ভাবুক গলায় বলল,
“তাহলে ওর চুপচাপ থাকার কারণ কি?”
স্নিগ্ধও নিজেও ভাবুক গলায় বলল,
“ঠিক বলেছো। আমিও তাই ভাবছি। কালকে ওর সাথে কথা বলে দেখবো কি হয়েছে। এখন শুয়ে পড়ো।”
প্রাণেশা ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে শুয়ে পড়লো। স্নিগ্ধ দরজা লাগিয়ে এসে শুলো তবে প্রাণেশার থেকে অন্যদিক ঘুরে। প্রাণেশা স্নিগ্ধকে ঘেঁষে শুলো কিন্তু স্নিগ্ধ তাও ফিরলো না। এরপরে প্রাণেশা একটু রাগ করেই স্নিগ্ধকে ধাক্কা দিয়ে অন্যদিক ফিরলো। স্নিগ্ধ বলল,
“আরে ধাক্কা দিচ্ছ কেনো? কাজ করছি ফোনে।”
প্রাণেশা কিচ্ছু বলল না। চাদর মুড়ি দিয়ে শুলো। মিনিট পাঁচেক পরে স্নিগ্ধ ফোন রেখে কাছে প্রাণেশাকে এনে বলল,

“ফোনে কাজ করছিলাম একটু। এই ঘুরো আমার দিকে।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে ঘুরে ওর বুকে মুখ গুজে শুলো। স্নিগ্ধ স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে মুচকি হেসে ওর কপালে চুমু খেলো।
সকালে স্নিগ্ধর ঘুম ভাঙতেই প্রাণেশাকে পাশে না পেয়ে উঠে বসলো। হয়তো ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়েছে। স্নিগ্ধ ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। ড্রইং রুমে ওর চাচি কোহিনুর বেগম সিয়ামকে বকছেন। রাত করে বাড়ি ফিরে এর জন্য। স্নিগ্ধ এগিয়ে গিয়ে ওকে বাঁচাতে বলল,
“সিয়াম আয়তো আমার সাথে, কাজ আছে।”
সিয়াম এটাই চেয়েছিলো যে ওকে কেউ এই বকার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিক। ও কোহিনুর বেগমকে বলল,
“আসছি মা, তোমার বকা পরে শুনবো।”
কোহিনুর বেগম স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে শুধানো গলায় বললেন,
“বাবা এই ছেলেটাকে তোর সাথে সাথে রাখবি। ওর বন্ধুদের সাথে একটু মিশতে দিবি না।”
স্নিগ্ধ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে ছোট মা।”
স্নিগ্ধ সিয়ামকে নিয়ে চলে যেতে যেতে প্রাণেশার দিকে তাকালো। প্রাণেশা ওর দিকে তাকাতেই স্নিগ্ধ চোখ মারলো। প্রাণেশা মুচকি হেসে মাথা নত করে রইলো।

কয়েকদিন পরে….
দিনটা শুক্রবার,
আজকে স্নিগ্ধদের বাড়িতে সৌরভদের বাসার সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। যেহেতু সৌরভ রিসেপশনে আসেনি তাই ওকে আনার জন্য এতো আয়োজন।
স্নিগ্ধ আর সিয়াম সকাল সকাল টুকটাক বাজার করে আনলো। আর বড় বড় জিনিসগুলো সাঈদ রেজা চৌধুরী আর ড্রাইভার এনেছে।
সব রান্না রাজিয়া বেগম আর কোহিনুর বেগমই করলেন। প্রাণেশা শুধু পায়েস রান্না করেছে।
দুপুরের দিকে আরশাদ খান, সৌরভ, নাহার বেগম, ইভা, রোকেয়া বেগম এলেন। সবাই এসে তাদের চোখের মনি প্রাণেশাকে খুঁজছে। ইভা মশকরা করে স্নিগ্ধকে বলল,
“দুলাভাই আমার বোন কই? কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন আমাদের থেকে?”
স্নিগ্ধসহ সবাই ওর কথায় হেসে উঠল। পরে স্নিগ্ধ বলল,
“তোমার বোন রুমে শাওয়ার নিচ্ছে। এতক্ষনে মনে হয় বের হয়েছে। তোমরা বসো আমি ওকে ডেকে নিয়ে আসছি।”

স্নিগ্ধও উপরে এলো। প্রাণেশা চুলগুলো আঁচড়ে নিচ্ছিলো। স্নিগ্ধ বলল,
“সৌরভ, ইভারা চলে এসেছে। তোমাকে ডাকছে।”
এই শুনে প্রাণেশা পেছনে ফিরে হাসি মুখে বলল,
“এক্ষুনি যাচ্ছি।”
প্রাণেশা মাথায় ঘোমটা টেনে চলে যাবে ঠিক তখনই স্নিগ্ধ ওর হাতটা টেনে ধরলো। অতঃপর প্রাণেশার মুখপানে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে ঘোমটাটা সরিয়ে দিলো। প্রাণেশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ প্রাণেশার পেছনে দাড়ালো। আলতো হাতে ওর চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ব্লাউজের ফিতেটা বেধে দিয়ে ঘাড়ে ছোট্ট করে চুমু দিলো।
প্রাণেশা হালকা কেঁপে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল। স্নিগ্ধ মুচকি হেসে ওর চুলগুলো ঠিক করে মাথায় ঘোমটা টেনে দিলো।
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে ঘুরে মুচকি হেসে ওর গালে চুমু দিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ স্যার।”
“হুম এবার চলুন ম্যাডাম।”
দুজনেই নিচে নেমে এলো। বোনকে এতদিন পরে দেখে সৌরভের মুখে হাসি ফুটে উঠল। প্রাণেশা কাছে গিয়ে বলল,

“কেমন আছো ভাইয়া?”
সৌরভ ওকে ধরে বলল,
“অনেক ভালো আছি। তু্ই কেমন আছিস?”
“ভালো। তোমার শরীর কেমন?”
“ভালো।”
আরশাদ খান সুবহাকে দেখছেন। সুবহা এক কোণে দাঁড়িয়ে ইভার সাথে কথা বলছিলো। মেয়েটার মুখটা কেমন মলিন। সৌরভের দিকেও তাকাচ্ছে না। অবশ্য আরশাদ খান জানেন দুজনের মধ্যে কি হয়েছে। এরপরে সুবহা ইভাকে সাথে নিয়ে উপরে গেলো।
খাবার খাওয়ার সময়,,
সৌরভের খাওয়া প্রায় শেষ, তখন খেয়াল করলো ওর শার্টে মাংসের ঝোল লেগে গিয়েছে। সাদা শার্টে আরও ফুটে উঠেছে। সৌরভ টিস্যু দিয়ে মুছছিলো। সাঈদ রেজা চৌধুরী বললেন,

“তুমি আগে খাওয়া শেষ করো এরপরে শার্ট পাল্টে নিও।”
ইভা বলল,
“ভাইয়া তো জামাকাপড় আনেনি।”
সৌরভ দাঁত চেপে মনে মনে বকছিলো ইভাকে।
স্নিগ্ধ বলল,
“সমস্যা নেই ইভা। ভাইয়ার সাইজের শার্ট আছে। ওখানে থেকেই একটা পড়বে। এই প্রাণেশা ভাইয়াকে নিয়ে রুমে যেও।”
সৌরভ খাওয়া শেষ করে উঠে দাড়ালো। প্রাণেশা সৌরভের হাত ধরে নিজের রুমে এলো। কাভার্ড খুলে স্নিগ্ধর একটা শার্ট বের করলো। নতুন শার্ট, প্যাকেটই খোলা হয়নি। সেটাও সাদা রঙের। সৌরভ নিজের শার্টটা খুলে এইটা পড়ে নিলো। প্রাণেশা শার্টটা বাস্কেটে রেখে বলল,
“তুমি শুয়ে রেস্ট নাও ভাইয়া।”
“হুমম।”
সৌরভ বিছানায় বসে পুরো রুমটা দেখছিলো। ভালোই পরিপাটি। পাশে দেখলো দুটো ফুলদানিতে গোলাপ। সৌরভ জিজ্ঞাসা করলো,

“এতো গোলাপ দিয়ে করিস কি?”
প্রাণেশা হেসে বলল,
“আমি কিছুই করি না। উনি এনে দেয়। আমি বলি এতো গোলাপ দিয়ে কি করবো? সে বলে কিছু না করলেও রেখে দিতে।”
এই মুহূর্তে প্রাণেশাকে ডাক দেয় স্নিগ্ধ,
“প্রাণেশা নিচে এসো। খেয়ে যাও।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে বলল,
“পরে খাবো আপনি খেয়ে আসুন।”
স্নিগ্ধ জোর গলায় বলল,
“তোমাকে আসতে বলেছি এসো।”
স্নিগ্ধর প্রাণেশার প্রতি এই ভালোবাসা দেখে সৌরভ মুগ্ধ না হয়ে পারলো না। তবে ওর বড্ড ভয় হয়। যদি ওর বোনকে কিছু বলে।
সৌরভ ভাবাভাবি বাদ দিয়ে প্রাণেশাকে বলল,
“তু্ই খেয়ে আয় আমি রেস্ট নেই।”
প্রাণেশা চলে গেলো। সুবহাকে ওর রুম থেকে বের করে সাথে নিয়ে খাবার টেবিলে বসলো।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৭

বিকেলে বড়রা বাদে সবাই ছাদে এসে বসলো আড্ডা দিবে। প্রাণেশা সৌরভকে বলে এসেছে, ও আসছে। সুবহাকেও বলে এসেছে।
এদিক থেকে সৌরভ এলো ছাদের সিঁড়ির গোড়ায় আর সুবহাও এলো। দুজনেই মুখোমুখি হলো।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here