রাগে অনুরাগে পর্ব ২৪
সুহাসিনি ফাতেহা
দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট পর অবশেষে খান বাড়ির মেইন গেইটের সামনে একে-একে চারটা গাড়ি থামল। বাড়ির ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা “বউ আসছে! বউ আসছে!” বলে চিল্লাতে শুরু করল। চারদিক হইহল্লোড় ও আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
সব গাড়ি গেইটেই থেমে গেলেও ফারাজের গাড়িটা প্রায় ভেতরে ঢুকে গেল। গাড়ি থামার পাঁচ মিনিট পাড় হয়ে গেলেও ফারাজ বউ নিয়ে গাড়ি থেকে নামছে না দেখে বাইরে ফিসফিস শুরু হলো।
আলভী গাড়ির জানালায় টোকা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “নাদান শিশুটার সাথে গাড়িতে বাসর করার চিন্তা করছিস নাকি ? তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আয়।”
ফারাজ এখনো স্ত্রীর মুখ দেখেনি। সুযোগ পেয়ে চাইছিল ঘোমটা তুলে একটু দেখবে বেয়াদব বউটাকে। দেখতে গিয়েও আবার দেখল না। দেখার জন্য অনেক সময় পরে আছে। সবার ফিসফিস শুনে সোজা বউ নিয়ে গাড়ি থেকে নামল । কোলে করেই নামল। এই মুহূর্তে তার গম্ভীর মুখটা কেমন তীক্ষ্ণ হয়ে আছে। বিয়ে করেছে এটা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝা দায়। ভাবখানা এমন যেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধ সেরে অবশেষে জয়ী হয়ে এসেছে।
বিধিবাম, দুপা এগাতেই তিতলি কোলের ভেতরে নড়চড়ে উঠল। মনে হলো সে শূন্য ভাসছে। পিটপিট করে আঁখিদুটি মেলল। মস্তিষ্ক জোড়ে প্রতিধ্বনিত হলো তার বিয়ে হয়ে গেছে। কথাটা মনে আসতেই সপ্তদশীর হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করল। কারো কোলে আছে এটা বুঝতেই নামার জন্য হাত-পা ছুটাছুটি করল। মেরুন রঙা দোপাট্টা ভেতরে সব কেমন ঘোলাটে দেখাচ্ছে। মানুষটাকে দেখার জন্য খুব করে চাইল, কিন্তু কান্না করার ফলে ঝাপসা চোখে ঠিকঠাক দেখতে পেল না। তবুও নামার জন্য আগন্তুকের শক্তপোক্ত হাতে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিমটি কাটল।
বেয়াদব বউকে কোলের মাঝে ব্যাঙের মতো লাফাতে দেখে ফারাজ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে নিল। বিড়বিড় করে আওড়াল, “সুখে থাকতে যেহেতু ভূতে কিলায়। আজ সব ভূতের নখ গোড়া থেকে কেটে দিবো। মাইন্ড ইট!”
তিতলি পরপর আরো তিনবার একই কাজ করল। ফারাজ কি এমন বেয়াদব মেয়েকে কোলে নিয়ে হাঁটবে। সদর দরজার সামনে এসে ধপাস করে নামিয়ে দিলো।
আকস্মিক তাল সামলাতে না পেরে দুর্বল তিতলি পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে নত মুখে দাঁড়ালো।
নতুন বউয়ের আগমনের অপেক্ষায় ফারিন বেগম সহ ফারাজের খালা,মামি,চাচি,,ফুপুরা,বিয়ে বাড়ি থেকে আগে আগে চলে আসা কাজিনদের বউরা সবাই সদর দরজার সামনে একত্র হলো। কারো হাতে বরণডালা,আবার কারো হাতে ফুলে ভর্তি ঝুড়ি, আর কারো হাতে মিষ্টি।
ঝিলিকের মা জিসা বেগম কাঁটাচামচে মিষ্টি নিয়ে নতুন বউয়ের মুখের সামনে ধরলেন,
“মিষ্টিটা খাও দেখি মা। শ্বশুরবাড়িতে ঢুকার আগে মিষ্টি মুখ করে ঢুকো। এটা খান বাড়ির নিয়ম।”
ফারাজ খান এসব নিয়মকানুন দেখতে দেখতে বিরক্ত। ছোট থেকেই দেখে আসছে। মিষ্টি খাওয়ালে নাকি নতুন বউরা মিষ্টি হয়ে যায়।
এসব ও বিশ্বাস করতে হবে, ভাবা যায়?
তার বেয়াদব বউ তিতাই থাকুক।
ফারাজ বিরক্তির রেশ ধরে জিজ্ঞেস করল,
“মিষ্টি খেলে মানুষ মিষ্টি হয়ে যায়- এসব থিওরি তোমাদের কে দিয়েছে ফুফুমনি? আমি এসব নিয়ম কানুন মানি না সামনে থেকে সরো।”
ফারাজ কথাটা বললেও সবার গিজগিজ আওয়াজের মাঝে নিজের কথাটা হাওয়ার মতো ভেসে গেল যেন। তা দুর্বল তিতলির কান পর্যন্ত পৌঁছালো না। ফারিন বেগম ছেলের দিকে তাকিয়েই বুঝলেন ছেলে বিরক্ত তাই ধমক দিয়ে বললেন,
“তোর জন্য বাড়ির নিয়ম কানুন বন্ধ হবে না। তোর মন চাইলে তুই চলে যা বৌমাকে আমরা বরণ করে ঘরে তুলবো।”
পেছন থেকে আলভী খোঁচা মেরে বলল,
“আমার বিয়ের সময় আমি সব নিয়মকানুন মানছি। মিষ্টি আমার বউও খায়ছে আমিও খাইছি।
এখন তোকেও খেতে হবে।”
ফারাজ পেছনে ফিরে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল আলভীর দিকে। আলভী একটুও ভয় না পেয়ে মেকি হেসে বলল,
“তোরে আমি ভয় পায় নাকি? বুইড়া হয়ে বিয়ে করছিস আবার এখন সিরিয়াল নাটকের অভিনয় করছিস? ফুপুমনি যা বলছে তা কর। না হলে খায়লে দে তোর মিষ্টিটা আমি খেয়ে ফেলি এমনিতে আমার ডাইবেটিস কমে গেছে।”
আলভীর বউ সুমি কনুই দিয়ে আলভীকে খোঁচা দিলো। ইতিমধ্যেই ফরহাদের থেকে শুনেছে আলভী বিয়েতে মেয়েদের পেছনে লাইন লাগিয়েছে। এটা শুনার পর থেকে স্বামীর উপর রেগে আছে সুমি। আজকে রুমে গেলে সত্যি ঝাড়ুর বারি একটাও মাটিতে পরবে না।
বউয়ের রাগ দেখে আলভী একদম চুপ হয়ে গেল। আজকে মনে হয় কিছুমিছু হয়ে যাবে। মনের ভেতর থেকে বলে উঠে, আল্লাহ রক্ষা করো এই দজ্জাল বউর হাত থেকে আজকের মতো বাঁচাও।
ফারিন বেগমের আনন্দের যেন শেষ নেই। আজকে থেকে সুখে দুঃখে কথার বলার একজন সঙ্গি পেয়েছেন। ছেলে থাকলে থাকুক না থাকলে নাই। তাই ছেলেকে বললেন,
“তুই এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চলে যা তোর নিয়মকানুন মানতে হবে না।”
ফারাজ কিছু বলতে গিয়েও পরমুহূর্তে বউকে রেখেই বড় বড় কদম ফেলে সবাইকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল।
ড্রয়িংরুমে বুড়ো-বুড়িরা সোফায় বসে বসে পান চিবুচ্ছেন। ফারাজের নানি ছকিনা খাতুন আর নানা হুশিয়ার সাহেব নাতিকে একা ঢুকতে দেখে বললেন,
“নাতবউটারে একলা ফালায় থুইয়া ঘরে ঢুকি গেলি ক্যান? বিয়ার নিয়ম-কানুন সব ভুইলা গেলি নাকি? মাস্টারি করিস বর-কনে এক লগে ঘরে ঢুকা লাগে এইডা জানোস না?”
ফারাজ নানাভাইয়ের কথা শুনে ঘাঁড় ঘুরে তাকায়। হুশিয়ার সাহেবের বয়স ৮০ বছর । এ বয়সে এসেও কথার জোর এখনো কমেনি। বুড়ো ভ্রু কুঁচকে আছেন। ছকিনা খাতুন তো রীতিমতো কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ফারাজ বিরক্তি চেপে রাখল। নানা-নানিকে সম্মান করে ছোট থেকেই। দাদা-দাদির আদর না ফেলেও নানা-নানির আদর পেয়ে বড় হয়েছেন। নানা-নানির কথা ফেলতে পারে না। এখন আবার তার নানা-নানি কোন নাটক শুরু করবে কে-জানে।
তাই বলল,
“সবাই কোলে করে নিয়ে আসবে তোমরাও সেখানে গিয়ে যোগ দাও। আমাকে জোর করো না।”
ছকিনা খাতুন ধমকে ওঠেন,
“যোগ দিবো মানি কিরে নাতি ? বউ আনছিস আদর করে একলগে ঘরে আইবি না? তোর নানা তো আমারে এহনো কোলে লইয়া হাঁটে। তুই এত বড় ধামড়া শরীর লইয়া নাতবউরে কোলে কইরা আনতে পারিস না? যা বউরে লইয়া আয়।”
ফারাজের কপালের রগ দপদপ করে। বিয়ে করেও শান্তি নেই। যার জন্য তার এত অশান্তি তাকেও সে শান্তিতে থাকতে দিবে না। তার সাথে অশান্তি নিয়ে গোটা জনম কাটাতে হবে। এদিকে এই বুড়ো-বুড়িদের নিয়মকানুনের ঠ্যালায় সে অতিষ্ঠ। মুখে কিছু না বলে আবার পা বাড়ায় সিঁড়ির দিকে।
ছকিনা খাতুন আবারও ডেকে বললেন,
“এই নাতি দাঁড়া কইতাছি। বউরে কোলে কইরা ঘরে লইয়া আয়। তোর নানা আমারে বিয়ার দিন কোলে তুলছে যে আর নামায় নাই।”
হুশিয়ার সাহেব পাশ থেকে বললেন,
“হ ঠিকই কইছে তোর নানি। ৫৬ বছর আগে কোলে লইছি যে এহনো লইতে ইচ্ছা করে তাই কান্ধে লইয়া বেড়াই। তুই জোয়ান পোলা বউরে কোলে লইয়া ঘরে ঢুইকতে পারিস না?”
ফারাজের সহজ স্বীকারোক্তি,
“পারবো না।”
ছকিনা খাতুন সিঁড়ির দিকে তেড়ে আসলেন,
“পারবি না মানে কি? হুশিয়ার সাহেবের নাতি হইয়া এই কথা কইতে পারিস।”
নানা-নানির কথা শুনে ফারাজের খুব হাসি পেলো তবে হাসলও না। হনহনিয়ে চলে গেল। তার নানার বাড়ি টাঙ্গাইল। তাই কথাবার্তা এমন। ফারাজ রুমে গিয়ে গায়ের কোট-পাঞ্জাবি খুলে সোজা ওয়াশরুম থেকে গোসল সেরে এসেছে। এই গোসলটায় যেন এই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল। দেহের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গিয়েছে। খিটখিটে মেজাজটা আগের তুলনায় অনেকটা ফুরফুরে লাগছে। শার্ট প্যান্ট পরে বিছানায় বসে একমনে কিছু একটা ভাবল।
পিচ্চি মেয়েটা কি এখনো জানে না বিয়েটা যে তার সাথেই হয়েছে? তাকে কি না চিনে বিয়ে করে ফেলেছে নাকি? এখন যদি তার জায়গায় অন্য কেউ হতো? ভেবেই এক অজানা কারণেই যুবকের মাথার তালু গরম হচ্ছে রাগে। অবাধ্য বেয়াদব মেয়ের কতবড় “স্পর্ধা” তাকে জ্বালিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখে। এর শেষ তো সে দেখেই ছাড়বে।
তিতলিকে বরণ করে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসানো হয়েছে। আশেপাশের সমস্ত মানুষ বউ দেখতে চলে এসেছে। তাকে ঘিরে বসে আছে সকল
আত্মীয়-স্বজনরা। সবাই বউ দেখে চলে যেতেই ফারাজের নানা নানি নাতবউকে দেখার জন্য সেখানে বসলো। পাশ থেকে ঝিলিকের মা জিসা বেগম তিতলির ঘোমটা তুলে পরিচয় করিয়ে দিলেন,
“এরা হচ্ছে তোমার নানা-শ্বশুর আর নানি-শাশুড়ি সালাম দাও।”
তিতলি চোখের সামনে দুজন বুড়ো-বুড়িকে দেখতে পেলো বুড়িটা একদম তার দাদুর মতো। তিতলি মা বাবা ভাই দাদু সবার কথা আবার মনে পড়ল। তার দাদু বলছে সেখানে গিয়ে সবাইকে সালাম দিতে। সম্মান করতে। মেয়েটা ফুঁপিয়ে উঠল। গাঁঢ় কাজল দেওয়া চোখজোড়া কাঁদার ফলস্বরপ আরো বেশি মায়াবী দেখাচ্ছে। নিজেকে সামলিয়ে তিতলি ভাঙা গলায় সালাম দিলো,
“আস…আসসালামু আলাইকুম।”
ফারাজের নানি ছকিনা খাতুনও নানা হুশিয়ার সাহেব হাসিমাখা মুখে বললেন,
“ওয়ালাইকুমুস সালাম।”
ছকিনা খাতুন তিতলির গাল টেনে দিয়ে বললেন,
“মাশাআল্লাহ নাতবউ তো ভারী মিষ্টি গো। আমার নাতির পছন্দ আছে কইতে অইবো।”
হুশিয়ার সাহেব বড় গলায় বললেন,
“দেখতে অইবো না নাতিটা কার। হুশিয়ার সাহেবের নাতি। ”
পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ফারাজের খালা নাছিমা বেগম। কথাটা শুনে মুখ বাঁকালেন। তিনি চাইতেন মেয়ে নীলাকে ফারাজের সাথে বিয়ে দিতে। কিন্তু হলো টা কই? তার মেয়ে ফারাজকে ভাইয়ের চোখে দেখে। ভাইয়ের সাথে ওসব কথা ভাবতেই পারে না। মেয়েকে নিয়ে আর পারেন না নাছিমা বেগম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিতলির খোঁত খুঁজতে শুরু করলেন। কিছুই খুঁজে ফেলেন না। যথেষ্ট সুন্দরী তবে একটু খাটো আছে। মুখ বেঁকিয়ে বললেন,
“বউতো বেশি লম্বা না। আরেকটু লম্বা হলে ভালো হতো না আম্মা।”
ছকিনা বেগম সেটা শুনে মেয়েকে বললেন,
“বেশি লম্বা হইবার দরকার নাই নাছিমা। নাতবউকে অনেক ভালা লাইগছে।”
নাছিমা বেগম মুখ বেঁকিয়ে সেখান থেকে চলে গেলেন।
ইতিমধ্যেই তুষার,সিয়াম,নিধি,সহ তিতলির কাজিন হিমু ওদের প্রথমবারের মতো মেহেমানদারি করা শেষ। হড়েক রকমের নাস্তা পানি খেয়ে সকলে ক্লান্ত। তুষার সোফায় বসা বোনের দিকে এক পলক তাকালো। বুকের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো তার বোনকে জোর করে বিয়ে দিলো। বোনের মতামত নেওয়ার দরকার ছিলো একবার। কিন্তু ওটাও ভাবছে ফারাজ ভাইয়ের কাছে আদরের বোনটা অনেক ভালো থাকবে। তাই ওতটা ভাবলোও না।
আফজাল খান এতক্ষণ রুমে ছিলেন। ছেলের বিয়ে থেকে এসে প্রেসার বেড়ে গেছে। হাঁটতে পারছেন না। এখন একটু ভালো লাগাতে তুষারের পাশাপাশি বসলেন। চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ গল্প করলেন।
রাত বাড়তে থাকল। ঘড়িতে রাত বারোটা। সব আচার অনুষ্ঠান আর বাসর ঘর সাজানো শেষে তিতলিকে নিয়ে আসা হলো ফারাজের রুমে। বাসর ঘর সাজিয়েছে আলভী নিহাদ ,আর ফারাজের বন্ধু শাওন মিলে। সাদা বিছানার মধ্যেভাগে গোলাপ দিয়ে লাভ বানিয়ে ভেতরে লেখেছে “T+F”। সাদা গোলাপ লাল গোলাপ সহ বিভিন্ন সুগন্ধি জাতীয় ফুল দিয়ে পুরো রুমটাকে ফুলের দোকান বানিয়ে ফেলেছে। আলভী ইচ্ছে করেই এমনটা করেছে।
একজন মহিলা গ্লাসে ভর্তি দুধ এনে টেবিলে রেখে তিতলির উদ্দেশ্যে হাসিমাখা মুখে বললেন,
“টেবিলে দুধের গ্লাস রেখে গেলাম। এগুলো তোমার স্বামী আসলে খেতে দিও।”
তিতলি অবুঝের মতো উপর নিচ মাথা নাড়ালো।
ভদ্রমহিলা সেটা দেখে মুচকি হেসে বললেন,
” আর শুনো, স্বামী যা করতে চাই করতে দিবে। কিছু বললে সুন্দর করে উত্তর দিবা মুখে মুখে তর্ক করবা না। তোমার স্বামী কিন্তু অনেক রাগী।”
এই রাত সম্পর্কে আরো কিছু কথা বুঝিয়ে দিয়ে ভদ্রমহিলা মহিলা চলে গেলেন। তিতলি ঠিক চিনলো না। কিন্তু মনে হলো কোথায় যেন দেখেছে দেখেছে। তার ওসব ভাবার সময় নেই। দাদুর কথা গুলো শুধু মনে আসছে। ভয়ে ক্রমান্বয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে শরীর। পাঁচদিন আগেও কি চিন্তা করছিল তার কারো সাথে বিয়ে হয়ে যাবে? হাটুতে ভর দিয়ে বসে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
বাসর ঘরের বাহিরে দাড়িয়ে আছে খান বাড়ির সকল নমুনারা। শুধু ফারাজের আসার অপেক্ষায়। মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিবে আজ। আলভী,নিহাদ,শাওন,তাসফি সহ আরো কয়েকজন কাজিন মিলে দরজা আটকে দাড়িয়ে আছে। আজ টাকা না দিলে কিছুতেই বাসর ঘরে ঢুকতে দিবে না।
দীর্ঘক্ষণ বাহিরে থাকার পর অবশেষে ফারাজের মনে হলো এবার রুমে যাওয়া হোক। বেয়াদব বউটা একা একা রুমে কি করে দেখতে হবে না? কিন্তু রুমের সামনে আসতেই দরজার সামনে এভাবে সবাইকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এভাবে লাইন ধরে সবাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
সবাই ফারাজের কথা শুনে মুখ চেপে হাসতে লাগলো। আলভী হাসি থামিয়ে বলল,
“ঢুকতে দিবো আগে টাকা দে।”
ফারাজ রাগ দেখিয়ে বলল,
“টাকা দিবো মানে?”
“বাসর ঘর কি এমনি এমনি সাজায়ছি? টাকার বিনিময়ে বাসর ঘর পাবি।”
“আমি তোদের বাসর ঘর সাজাতে বলছিলাম। রুমটা নষ্ট করে দিছিস দেখি সর।”
আলভী নিহাদ, শাওন একসাথে বলে উঠল,
“বলছি তো আগে ৮০ হাজার টাকা দে। নাহলে বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসর রাত কাটনোর স্বপ্ন দেখ। তোর বউ ভেতরেই থাকবে।”
ফারাজ চোখ ছোট করে তাকাল। বিরক্তির সুরে আওরায়‚
“বউ আমার, রুম আমার বাসর ঘরও আমার তোদের কেন টাকা দিবো?”
সবাই একসাথে বলে উঠল,
“কথা না বাড়িয়ে টাকা বের কর। টাকা দিলে তোরই।লাভ। বউর কাছে যেতে পারবি।”
ফারাজ বিরক্ত ভঙ্গিতে দাঁতে দাঁত চেপে প্যান্টের পকেটে হাত দেয়।
এটা দেখে আলভী ব্যঙ্গ করে বলে,
“ওরে ভাবির কাছে যাওয়ার কি তাড়া! টাকা দিতে বলছি আর পকেটে হাত দি দিলি বাহ বাহ তবে শোন একটু আস্তে করিস বুঝিস তো নাদান শিশু।”
ফারাজ কিছু না বলে একটা কাগজে মুড়ানো প্যাকেট বের করে আলভীর হাতে দিয়ে বলল,
“নে এখানে এক লাখ আছে সবাই ভাগ করে আর গুলো আমাকে ফিরিয়ে দিস।”
টাকা ভেবে সবাই ফারাজকে জায়গা করে দিল। ফারাজ ভেতরে ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে পুরো রুমে একবার চোখ বুলালো।
ওইদিকে বাহির থেকে ওরা সবাই দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলল,
“দরজা খোল বলছি না হলে আজ তোকে বাসর করতে দিবো না। প্যাকেটের ভেতরে সাদা কাগজ ঢুকিয়ে দিয়ে বলতেছিস এক লাখ টাকা আছে।”
নিহাদ ও শাওন বলল,
” ফারাজ ভাই অনেক চালাক। মনে হয় আগে থেকে জানতো আমাদের প্ল্যানটা। তাই কাগজের প্যাকেট বানিয়ে ভেতরে কাগজ ঢুকিয়ে আনছে।”
আলভী ও হেরে যাবে না। ফারাজের থেকে কিভাবে টাকা হাতিয়ে নিতে হয় সেটা সেও দেখে নিবে। আরো কিছুক্ষণ দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে সবাই চলে যায়।
এদিকে ফারাজ রুমে ঢুকে বউকে না দেখে কপাল কুঁচকে এদিক ওদিক তাকায়। এই বেয়াদব বউ আবার কোথায় গেলো? ওয়াশরুমের দিকে দরজা বাহির থেকে বন্ধ। দরজা দিয়ে সে এখন ঢুকলো। তাহলে গেল কই? সহসা চোখ পরে খাটের নিচে বেরিয়ে আছে একহাত লম্বা শাড়ির আঁচল । যুবক ভ্রু কুঁচকে নেয় কৌতুকে। গম্ভীর সুদর্শন মুখখানায় আচমকা শ্লেষাত্মক ভাবভঙ্গি ধরে রেখে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“বুদ্ধিমত বউ আমার, লুকোচুরি যেহেতু খেলছেন, লুকানোর সময় নিজের সাথে শাড়ির আঁচলও নিয়ে গেলে ধরা পরার কোনো চান্স থাকতো না। এত বড় খাট থাকতে খাটের নিচে গিয়ে লুকিয়ে আছে তার বউকে আসলে নোবেল দেওয়ার দরকার।”
তিতলি ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। দমবন্ধ লাগছে সব। শাড়ির আঁচল বাহিরে আছে এই খেয়ালটা তার মাথায় নেই। মাথার চুল খুলে গিয়ে বিক্ষিপ্ত আকারে আছড়ে পড়ছে চোখেমুখে । গরম লাগছে তার উপর শাড়ি পরা। এতটুকু নিচু জায়গাতে আর একমুহূর্ত থাকলে সে মরে যাবে। খাটের নিচ থেকে লোকটাকে দেখতে চাচ্ছে কিন্তু শুধু হাটু থেকে পা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। পুরুষালী লোমশযুক্ত ফর্সা পা দেখে কোনো সুদর্শন পুরুষই মনে হলো। পা ফর্সা হলে কি হবে মুখতো বুড়ো।
আচমকা ফারাজ নিচু হয়ে আঁচল নিয়ে হাতের মুঠোয় পেঁচাতে শুরু করল। তিতলি বুঝতে পেরে ভেতর থেকে টানতে থাকল। কেঁদে দিবে এমন ভাব নিয়ে খাটের নিচ থেকে ফুঁপিয়ে বলল,
“আ…আমি…আমি আপনাকে স্বামী হিসাবে মানি না। আমি ডির্ভোস চাই।”
ফারাজের হাত থেমে যায় কথাটা শুনে। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে বাসর ঘরে ঢুকেছে। এ কথাটা শুনে যুবক রাগে ফেটে পড়ে। বেয়াদব বউটারে এখন কি করতে মন চাই? আগে বের করে আনুক শুধু তারপর ডিভোর্স কিভাবে দেয় সেটা প্র্যাক্টাকালি বুঝিয়ে দিবে। হাতের মুঠোয় আঁচলটা নিয়ে জোড়ে এক টান দিল।
তিতলি কেঁদে দিয়ে নাক টেনে বলল,
“ও..ছাড়ুন । আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি আপনি আমাকে ছোঁবেন না একদম।”
ফারাজ খাটের নিচে নিচু হয়ে তিতলির হাত ধরে টান দিল। তিতলি ভয়ে চোখমুখ খিঁচে ফেলল।
হাত ছাড়ানোর জন্য মেয়েটা অচেনা স্বামীর হাতে কামড় বসিয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আপনি আমার দেহ পাবেন কিন্তু মন পাবেন না।”
ইদুরের দাঁতের জোর আছে। ফারাজের লোমশযুক্ত হাতে দাগ করে ছাড়ল। পুরোপুরি বাইরে এনে ফারাজ কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
মন চাইনা আমার দেহও চাই না যেটা আমার সেটা আমারই সো চাওয়া পাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই উঠে না।
সহসা চেনা কণ্ঠস্বর শুনে সপ্তদশী চমকাল,
ভড়কাল,বিস্ময়,হতবিহ্বল, বাকরুদ্ধ, হকচকিত, স্তব্ধ হয়ে গেল। হিংস্র রমনী তড়িৎ গতিতে চোখ তুলে তাকাল। আপনাআপনি তিরতির করে কাঁপতে থাকা অধরযুগল ফাঁক হয়ে অস্পষ্ট গলায় শুধাল,
“আপ..” সম্পূর্ণ শব্দ উচ্চারণ করতে পারল না।
স্বপ্ন দেখছে সে? এটা স্বপ্ন। এখনই মিলিয়ে যাবে। আকস্মিক কোমরে কারো শক্ত আঙুলের ছোঁয়ায় তিতলির কোমরের নরম চামড়ায় এক অদ্ভুত শিরশিরানি অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। শিরশিরানি টা কেমন অসহ্য বেদনা দিলো তাকে সহ্য করল না তার ছোট্ট শরীর। হুট করেই উঠে দাঁড়িয়ে মুখবয়বে অবিশ্বাস নিয়ে মেয়েটা বলে উঠল,
“আপনি আমার বাসর ঘরে কি করছেন ? আমার স্বামী কোথায় ? কি করছেন তার সাথে?”
ফারাজ শক্ত মেজাজে বলল,
“বিয়ে করেছি বাসর ঘরে থাকবো না তো কি মহাকাশে থাকবো বেয়াদব।”
তিতলি বিশ্বাস করে না একথা। একদম বিশ্বাস করে না। তার তো অন্যকারো সাথে বিয়ে হয়েছে। এই লোক মিথ্যা বলছে। বউ ডিভোর্স দিয়ে দিছে তাই তাকে ভাগানোর চিন্তা করছে না তো। গলা ছেড়ে দিয়ে বলল,
“আমার স্বামীর সাথে কি করছেন আপনি? আমি আপনাকে আমি ছাড়বো না।”
ফারাজ তিতলির মুখ চেপে ধরে। বেয়াদব বউ চিল্লিয়ে বাড়ির সব মানুষ নিয়ে আসবে। মুখ চেপে ধরে ফিসফির করে বলল,
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩
“চুপ! একদম চুপ।”
“না চুপ হবো না। আমি চিল্লাবো।”
যুবক একমুহূর্ত দেরি না করে তিতলিকে টেনে হিঁচরে কাঁধে তুলে নিলো।
“ছাড়ুন! ছাড়ুন! আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন।”
“শাস্তি দিতে।”
ফারাজ পুরো রুমের ভেতরে এদিক-ওদিক হেঁটে এসে তিতলিকে সোজা বিছানায় ধপাস করে ফেলে দিলো।
