আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৫
ইসরাত জাহান দ্যুতি
পেছনে বসা মেয়েদুটোকেও যে ঘটনার বিবৃতি দিতে হবে, তা যেন দু ভাই ভুলেই গিয়েছিল। দীধিতির চিৎকারে সেই বোধ জাগ্রত হলো ওদের।
-‘স্যরি স্যরি’। দ্রুত কৈফিয়ত দিলো নাওফিল, ‘যে লোকটাকে দেখলে তার নাম উইলিয়াম। অদ্ভুতভাবে স্যামুয়েল টেলরের জ্যেষ্ঠ ছেলের নামও লিয়াম। লিয়ামেরই বিশ্বস্ত একজন দেহরক্ষী লোকটা৷ আমাদের ফলো করছিল গত তিনদিন ধরে। কেন করছিল তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ? এখন সময় হয়েছে তোমার ড্যাড আর ব্রাদারের মুখোমুখি হওয়ার। আমাদের তাদের কাছেই যেতে হচ্ছে এখন।’
কথাগুলো শুনে দীধিতি সামনে চলা কালো গাড়িটাকে দেখল একবার। জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে মায়ের বাসায় আসার কথা না তার?’
-‘হয়ত তোমার মায়ের মুখোমুখি হতে চাননি তোমার বাবা।’ বলল ইয়াসিফ।
তারপরও দীধিতির চেহারা থেকে চিন্তা সরছে না দেখে নাওফিল আশ্বস্ত করল, ‘যেতে যেতে আমি ডেভিডসনকে ইনফর্ম করে রাখছি তো। সহজেই আমাদের খুঁজে পাবে। সে ব্যবস্থা না করে যাচ্ছি না। টেনশন কোরো না তুমি।’
বিকাল ৪:৩০ টা।
তিন ঘণ্টা জার্নির পর একটা খামার বাড়িতে এসে পৌঁছল ওরা। লোকালয় থেকে বেশ দূরে। অনেক জায়গা নিয়ে ঘোড়ার খামারটা করা হয়েছে৷ খামারের মাঝখানে বিশাল এক কটেজ। উইলিয়াম গাড়ি থেকে নেমে অপেক্ষা করতে থাকল নাওফিলদের জন্য।
ওরা একে একে গাড়ি থেকে নেমে চারপাশের সবুজ মাঠে বিচরণ করা ঘোড়াগুলোকে দেখে প্রশংসা না করে পারল না। প্রায় সবগুলো ঘোড়ায় দারুণ বলিষ্ঠ। মাভিশা বলে উঠল দীধিতিকে, ‘এদরকে হর্স রাইডিংয়ের জন্য ব্যবহার করে মনে হয়।’
-‘তা-ই মনে হচ্ছে।’ অন্যমনস্ক গলায় জবাব দিলো দীধিতি।
উইলিয়াম এসে ওদের কটেজের দিকে যেতে ইশারা করল। সাদা রঙের কটেজের বারান্দায় তখনই দেখা গেল সোনালী চুলের এক সুপুরুষকে। ওরা যত এগোচ্ছে, ততই ছেলেটির চেহারা পরিষ্কার হচ্ছে। পরনে জিন্স আর সাদা শার্ট। উচ্চতায় নাওফিল, ইয়াসিফের মতোই৷ এমনকি শরীরটাও নাওফিলের মতোই ব্যায়ামপুষ্ট পেশিবহুল। কাছাকাছি আসার পর ওরা সবাই আন্দাজ করে নিলো, ছেলেটা স্যামুয়েল টেলরের পরবর্তী প্রজন্ম লিয়াম টেলর। তবে দীধিতির সাথে চেহারার মিল না থাকলেও নীল চোখ আর সোনালী চুলের মিলটুকু অকৃত্রিম।
বারান্দার মেঝেটা কাঠের। একসঙ্গে সবাই উঠতেই খটখট আওয়াজ হলো। দাম্ভিক হাসি ফুটিয়ে লিয়াম নাওফিলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো হঠাৎ। ‘নাওফিল শেখ!’ নামটা উচ্চারণ করল বটে। কিন্তু শোনাল সেটা ন্যাওফিল শেইখ।
-‘ইয়া, নাইস টু মিট ইউ, লিয়াম।’ হাতটা ধরে মৃদৃ ঝাঁকি দিলো নাওফিল।
-‘আশা করছি আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি। উইলি পথপ্রদর্শক হিসেবে ভালো ছিল নিশ্চয়ই?’
-‘হ্যাঁ, খুবই ভালো ছিল। যতটা না ছিল ইনভাইটার হিসেবে।’ মৃদু হেসে খোঁচাটা মেরে দিলো নাওফিল।
লিয়ামকে অবশ্য অপ্রস্তুত হতে দেখা গেল না তাতে। উলটে হো হো শব্দে হেসে ব্যাপারটাকে হালকা দেখানো চেষ্টা করল যেন। ভেতরে নিয়ে এলো ওদের। সবার সঙ্গে আলাপ সাড়তে সাড়তেই ওদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করল সে। নাওফিল আর ইয়াসিফ নিশ্চিন্তে ভরপেট খেয়ে নিলেও দুশ্চিন্তায় দীধিতি তেমন কিছু মুখে পুরতে পারল না। মাভিশাও তাই৷ তবে সে হুইস্কি পেয়ে সন্তুষ্ট হলো খুব।
লিয়ামের বয়সটা সহজে অনুমান করতে পারছে না নাওফিল৷ বয়সে দীধিতির থেকে ছোটোই হবে। কিন্তু কতটা ছোটো? পেশিবহুল শরীর আর দীর্ঘ উচ্চতার জন্য তো তাকে নিজের বয়সীই দেখাচ্ছে৷ আর বেশ কৌতুক করতেও জানে ছেলেটা। ওদেরকে বিনোদন দেবার জন্যই কি স্যামুয়েল ছেলেকে দায়িত্বে রেখেছেন? তিনি কোথায়? ডাকটা তো তার তরফ থেকেই এসেছে। না-কি লিয়াম টেলরের? হঠাৎ করে একটু বিভ্রান্তে পড়ে গেল নাওফিল। স্যামুয়েল কি আদৌ আছেন অস্ট্রেলিয়াতে?
প্রায় ঘণ্টাখানিকের আড্ডার পর নাওফিল আসল কথা পাড়ল। ‘তোমার ড্যাড কোথায়, লিয়াম? এভাবে আমাকে ডেকে নিয়ে আসার বিশেষ কারণটা জানা দরকার যে।’
হাতের হুইস্কির গ্লাসটায় চুমুক দিতে থাকল লিয়াম নির্বিকারভাবে৷ ওটা শেষ হলে তারপর নাওফিলের দিকে তাকিয়ে আগের মতোই হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমার কথা কয়েকবার শুনেছি ড্যাডের কাছে৷ তোমাকে দেখেছিও দূর থেকেই। জেনেছিও দূর থেকেই। এবার মনে হলো তোমাকে কাছ থেকে দেখি, জানি।’
-‘শুনে ভালো লাগল।’ লিয়ামের রহস্যময় সুরের কথাগুলোকে পাত্তা না দিয়ে বলল নাওফিল, ‘কিন্তু আমি তোমার ডাকে সাড়া দিয়েছি তোমার ড্যাডের কারণে। খারাপ শোনালেও বলতে হচ্ছে, তোমার মতো খুব একটা ইন্ট্রেস্টেড ছিলাম না তোমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।’
ধপ করে আগুন নেভার মতোই লিয়ামের হাসিটাও আচমকা উধাও হয়ে গেল। তবে তা কিঞ্চিৎ সময়ের জন্যই। নাওফিলের সূক্ষ্ম অপমানটা ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই হজম করে বলল, ‘আমার সঙ্গ কাউকে বোরিং পারে এমনটা ভাবতেই পারছি না, ম্যান৷ একটু বেশিই আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলাম মনে হয়।’
-‘নাহ’, হাসল নাওফিল। ‘তোমার আত্মবিশ্বাসে কোনো খুঁত নেই, ব্রো। সময়টা অবশ্যই উপভোগ করছি আমরা। কিন্তু আমাদের ঘোরাঘুরির প্ল্যানিংটা চেঞ্জ করতে হয়েছে এখানে আসার জন্য। আরও সময় বাড়ালে আজকের পুরো দিনটাই আমার সঙ্গীদের নষ্ট হবে।’
গল্পের ফাঁকে ইয়াসিফ পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে নিয়েছে। ওদেককে কোনো ফাঁদে ফেলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত এমনটা মনে হয়নি। কিন্তু লিয়াম ছেলেটা ইচ্ছাকৃতই সাসপেনশন রেখে কথা বলছে। নাওফিলের জন্য খানিকটা তুচ্ছজ্ঞানও প্রকাশ পাচ্ছে তার হাবেভাবে। কেন করছে, তাও বুঝতে পারছে ইয়াসিফ কিছুটা। হয়ত নাওফিলের প্রতি অনেকটা হিংসাত্মক মনোভাব থেকে। নিশ্চয়ই বাপের কাছে নাওফিলকে ঘিরে অনেক প্রশংসা শুনতে হয়েছে। যেটা কোনো সময়ই পছন্দ করেনি সে।
নাওফিলের চরিত্রের অন্যতম একটা দিক হলো প্রচণ্ড রহস্য করে কথা বলে সামনের মানুষটির স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি করা অথবা বিরক্ত করে তোলা। পরবর্তীতে মানুষটিকে কোমল আচরণ দিয়ে নিজের প্রতি তাকে আস্থাবান হতে বাধ্য করা। দেখা যায় যে উদ্দেশ্যে এ কাজটি করে থাকে ও, বেশিরভাগ সময়ই সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে ওর। ইয়াসিফ নিশ্চিত, স্যামুয়েল অবশ্যই নাওফিল সম্পর্কে গভীরভাবেই পড়াশোনা করেছেন। তাতে নাওফিলের মাঝে যে গুণাবলি পেয়েছেন এবং তা তাকে এতটাই সন্তুষ্ট করেছে যে, যার কারণে ছেলেকে নিশ্চয়ই সব সময় তেমনটা হতে বলেছেন। ফলাফল, লিয়ামের মাঝে এতে দিনে দিনে নাওফিলের জন্য হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু স্যামুয়েল কি ছেলেকে এ উপদেশ দেননি, মানুষের সাইকোলজি বুঝে তারপর তাকে সেভাবেই ট্রিট করতে হয়? নিশ্চয়ই তিনি জেনেছেন, নাওফিল মানুষের সাইকোলজি বোঝার জন্য পড়াশোনাটাও করেছে। তাহলে ছেলেকে কেন পড়াশোনা করাননি? না করিয়েই পাঠিয়ে দিয়েছেন ওদেরকে সামলানোর জন্য!
লিয়াম বুঝল, নাওফিল মোটেও নার্ভাস হচ্ছে না তার আচরণে। বরঞ্চ তাকে অগুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে সে। ওর সঙ্গীদের মাঝে কেবল নীল চোখের মেয়েটির মধ্যেই কিছুটা বিরক্তি আর চিন্তা টের পাওয়া যাচ্ছে। সেদিন ভিডিয়ো কনফারেন্সে এই মেয়েটিকে নিয়ে আলোচনা করতে দেখেছে লিয়াম বাবা আর বাবার বন্ধুদের। কারণ, মেয়েটির সঙ্গে বাবার মুখের আদল মিলে যায় খুব। মূলত এর জন্যই নাওফিলকে ডেকে আনা। কিন্তু লিয়াম আদতে চাইছে না, এই মেয়েটিই বহু বছর আগে বাবার হারিয়ে যাওয়া মেয়েটি বলে প্রমাণিত হোক।
-‘ওকে, ব্রো। বুঝতে পারছি তোমরা আসলেই বিরক্ত হচ্ছ আমার সঙ্গতে। তাহলে একটু বোসো৷ দেখি ড্যাডের হাতের কাজ শেষ হলো কি-না।’
লিয়ামের শেষের বাক্য পুরো শেষ হতে না হতে তখনই কটেজের ব্যাকইয়ার্ড থেকে ভেতরে কাউকে আসতে দেখা গেল৷ সেদিকে দীধিতির নজরই আটকাল আগে। ওর চোখে-মুখের উদ্বিগ্নতা লক্ষ করে সবাই-ই তাকাল সেদিকে।
মাথায় একটা কাউবয় হ্যাট, পায়ে কালো বুট। সারা বোতাম খুলে রাখা সেপিয়া রঙের শার্টের নিচে কালো টি-শার্ট আর ডেনিম প্যান্ট পরনে পুরুষটির। আর ঠোঁটের ফাঁকে সিগার। বুটের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে, লোকটি এত সময় মাঠে ছিল৷ হাঁটতে হাঁটতে পেছনে ঘাস, মাটির ছাপ ফেলে আসছে সে মেঝেতে।
লিভিংরুমে ওদের সকলকে চোখে পড়া মাত্রই সিগারটা ঠোঁট থেকে হাতে নিলো, মাথার হ্যাটটাও খুলে ফেলল। হ্যাটের ছায়া না থাকায় এবার তার মুখটি একদম স্পষ্ট হলো সবার কাছে। কারও আর সন্দেহ নেই, তারা অস্ট্রেলিয়ার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন বড়ো মাপের মাফিয়ার মুখোমুখি এই মুহূর্তে। স্যামুয়েল টেলর! নাওফিলের সঙ্গে বাকিরাও চমকাল বেশ। সবাই এই মানুষটিকে কল্পনা করেছিল নিশ্চয়ই পঁয়ষট্টি বছর বয়সের একজন বৃদ্ধ রূপে! কিন্তু বদলে দেখতে পাচ্ছে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী একজন ব্যক্তিকে। একহারা গড়ন, চওড়া কাঁধ, শক্ত চোয়াল, নিষ্ঠুর একজোড়া নীল চোখ, মাথাভর্তি চুল, হাঁটার ভঙ্গিমাও তাগড়া যুবকদের মতোই। কে বলবে লোকটি লিয়াম, দীধিতির মতো বয়সী দুটো ছেলে-মেয়ের বাবা? না, তিনটি ছেলে-মেয়ের বাবা স্যামুয়েল টেলর। এদিক থেকে জেরিন ইসলামই বরং পিছিয়ে।
নাওফিল উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হলো। কারণ, ওর দিকেই এগিয়ে আসছেন তিনি৷ বুঝতে পারছে, কাছে আসা মাত্রই বুকে জড়িয়ে ধরবেন ওকে। তাই এগিয়ে গেল ও-ও। মুখে প্রশস্ত এক হাসি টেনে ওকে আলগোছে জড়িয়ে ধরলেন স্যামুয়েল৷ পিঠে আলতো চাপড় দিতে দিতে ভরাট গলায় বললেন, ‘শেষবার তোমাকে বুকে নিয়েছিলাম যখন তুমি তিন অতিক্রম করেছিল। কেমন আছ, মাই সান?’
-‘আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছ, টেলর?’
নাওফিলকে হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকালেন স্যামুয়েল। তারপর চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল তার। হাসলেন আবারও৷ ‘তোমার মনে আছে আমাকে কী বলে ডাকতে?’
নাওফিলও হাসল। ‘তোমাকে আমি শেষবার দেখেছি যখন আব্বু আর আম্মুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে তুমি এয়ারপোর্টে।’
-‘গড!’ সত্যিই চোখদুটো যেন বিস্ময়ে কপালে উঠে এলো স্যামুয়েলের। ‘মাই সান, তুমি…! তোমার মনে আছে? অন্তত উনত্রিশ বছর আগের কথা! ও মাই গড! তুমি চিনতে পেরেছিলে আমাকে? তোমার মম আর ড্যাডের সঙ্গে আমিও ছদ্মবেশ নিয়েছিলাম, তাই না? তাহলে চিনেছিলে কীভাবে?’
-‘তোমার কণ্ঠ তো একই ছিল, তাই না?’ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল নাওফিল। নিজের বোকামি বুঝতে পেরে আরও প্রশস্ত হাসি ফোটালেন স্যামুয়েল। ‘ইউ আর ট্রুলি আ জিনিয়াস ম্যান! কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি এটাও ভুলে গিয়েছিলাম যে কাদের জিন বহন করছ তুমি। যারা টিকে থাকার সুযোগ পেলে আজ নিশ্চিত কিংবদন্তি উপাধি পেত।’ বলতে বলতেই দীধিতির সুশ্রী মুখপানে চোখ পড়ল তার। হাসিটাও ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকল।
নাওফিল আর স্যামুয়েলের পুর্নমিলনীর মাঝে এত সময় কেউই খেয়াল করেনি দীধিতির অভিব্যক্তিগুলো৷ বাবাকে চিনতে পেরে প্রথমে বাকিদের মতো সেও বিস্মিত হলেও এখন সেই বিস্ময় দূর হয়ে ধীরে ধীরে কেমন যেন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা বিরাজ করছে ওর চেহারায়। লোকটি ওর বাবা। অথচ বাবা মেয়ের মাঝে সৃষ্টি হওয়া সেই বিশেষ অনুভূতিটা আসছে না কেন? লোকটি এখনও যথেষ্ট তারুণ্যপূর্ণ বলেই কি? না-কি এই লোকটি ওর মায়ের ধর্ষক এবং তার সেই অন্যায়েরই ভ্রুণ ছিল ও? বারবার এই বিষয়টিই মাথায় খোঁচাচ্ছে দীধিতির। চার ঘণ্টা আগেও মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না ও স্যামুয়েলের মুখোমুখি হওয়ার। তারপর যখন বলল নাওফিল তার কথা, তখন থেকেই কেমন এক আচ্ছন্নতা পেয়ে যায় ওর। সেই আচ্ছন্নতা এখানে এসে কেটে গেলেও এই মুহূর্তে যেন আবারও সে ওই ঘোরেই চলে গেছে। এজন্যই হয়ত বাবাকে এত কাছে পেয়েও বিশেষ অনুভূতি বলে কোনো কিছু অনুভব হচ্ছে না। অথচ মায়ের বেলায় এমনটা হয়নি।
দীধিতির দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থেকেই স্যামুয়েল মৃদুস্বরে স্বগতোক্তি করে উঠলেন, ‘হোয়াই মাই সিমিলারিটি উইথ হার?’
ব্যাক ইয়ার্ডে ঘাসগুলো অনেক বড়ো হয়ে গিয়েছিল বলে স্যামুয়েল নিজেই সেগুলো কেটেছেন সারা বিকেল। একটা টি টেবিলের সঙ্গে গোটা কয়েক চেয়ার পেতে রাখা। চারপাশে সামান্য উচুঁ করে কাঠের বেড়া দিয়ে ব্যাক ইয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করা। বেড়ার ওপাশেই সবুজ মাঠ। এই মুহূর্তে সেই খোলা মাঠের শেষ সীমান্তেই দৃষ্টি নিবদ্ধ তিনটি মানুষের। সেখানে আকাশে সন্ধ্যারাগ দেখা যাচ্ছে৷ তা দেখতে দেখতেই স্যামুয়েল কথা বলে যাচ্ছেন নাওফিল আর দীধিতির সঙ্গে। ওদের দুজনের মাঝে বসে আছেন তিনি পরাস্ত সৈনিকের মতো৷ ‘আমি এ জীবনে বহু খোয়ানো জিনিস ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আমার প্রথম সন্তানকে ফিরে পাবো, এ আশা করিনি। আমাকে ঋণী করে দিলে, মাই বয়।’ শেষে তার কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ল নাওফিলের জন্য।
-‘কেন করেননি?’ জিজ্ঞেস করে বসল দীধিতি চকিতেই, ‘আপনার যে প্রতাপ, তার দ্বারা কি আমাকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল?’ কথাটা বলে দীধিতি নিজেই চমকাল। রুক্ষ শোনাল নিজের কানেই কথার সুরটা। জন্মদাতার কাছে সে। অথচ চেয়েও পারছে না এক ফোঁটা আবেগের ডাকে সাড়া দিতে। আরও মনে হচ্ছে, মানুষটির এই স্নেহ যেন খুব মেকি।
দীধিতির বিকারশূন্য অভিব্যক্তি সেই তখন থেকেই। সেখানে অকস্মাৎ আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে না দেখে নাওফিল প্রথমে দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। ভেবেছিল, একের পর এক চমকগুলো সামলাতে গিয়ে বোধ হয় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে ও৷ যার জন্য স্বাভাবিকতার বদলে অস্বাভাবিক নীরবতা পেয়ে বসেছে৷ কিন্তু সে সংশয় দূর হলো স্যামুয়েল যখন ওর পরিচয় শুনে ওকে বুকে টেনে নিলেন। সে মুহূর্তেই দীধিতির চেহারার অস্বস্তিটুকু ধরা পড়ে নাওফিলের চোখে। এবং তাতেই বুঝতে পারে, বাবাকে নিয়ে ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছে ওর মাঝে।
মেয়ের দিকে ফিরে চাইলেন স্যামুয়েল। নরম গলায় বললেন, ‘তোমার রাগ আর অভিমান খুবই যৌক্তিক, সোনা।’
-‘আপনি ভুল বুঝছেন৷ আমি দুঃখিত, আমি ঠিক রুডলি বলতে চাইনি।’ খানিকটা হাসতে চেষ্টা করে বলল দীধিতি।
-‘তাহলে আমাকে ড্যাড বলে ডাকছ না কেন?’
জবাবটা দিতে পারবে না দীধিতি। অধিকন্তু ওর ভেতরের অস্বস্তিটা আরও বাড়বে। সেটা বুঝতে পেরে নাওফিল বলে উঠল, ‘ওর একটু বিশ্রামের ব্যবস্থা করলে ভালো হত। আজকের জন্য একদমই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। ওকে একটু সময় দাও, টেলর।’
-‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ।’ তারপরই খুব তাড়া নিয়ে স্যামুয়েল ডাকলেন একজন পরিচারককে। দীধিতির জন্য বরাদ্দ করা রাখা ঘরটাই ওকে নিয়ে যেতে বলে নাওফিলকেও বললেন, ‘তুমিও গিয়ে রেস্ট করো। আমরা আবার ডিনারে দেখা করব।’
-‘না প্লিজ, টেলর৷’ মুচকি হেসে বলল নাওফিল, ‘আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার লেডির কেয়ার নিলেই চলবে।’
-‘আর তোমার লেডি আমার হারিয়ে আবার ফিরে পাওয়া আদরের সন্তান।’ যোগ করলেন স্যামুয়েল নাওফিলের কথার শেষেই। তারপরই দীধিতির দিকে ফিরে ওর কাঁধ জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন ওর মাথার পাশে। ‘আমি তোমাকে পেয়ে বিস্ময় আর আনন্দে দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলাম, তিয়া৷ তোমার বিশ্রাম প্রয়োজন, তা মাথাতেই আসেনি। যাও, ঘরে গিয়ে ছোট্ট একটা ঘুম দাও৷ ড্যাড ডিনারে তোমার জন্য অপেক্ষা করবে।’
মুচকি হেসে দীধিতি উঠে দাঁড়াল৷ নাওফিলের দিকে তাকাতে নাওফিল একবার পলক ফেলে ভরসাপূর্ণ হাসি উপহার দিলো ওকে৷ স্বামী আর জন্মদাতাকে পেছনে ফেলে চলে এলো সে। যে মানসিক দ্বন্দ চলছে আর মনে দ্বিধার ঝড় বইছে, তা থেকে কিছুক্ষণের জন্য এবার পরিত্রাণ মিলবে। আর বাবা নামের এই মানুষটিকে নিয়ে শুরু থেকে এ পর্যন্ত সবটা ভাবার মতো সময়টাও পাবে৷
ওকে পেছন থেকে অপলক দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন স্যামুয়েল। অভাবনীয়ভাবে তখনই নাওফিল প্রকৃত সত্যটা বলল, ‘তুমি তোমার তিয়ার অপেক্ষায় আর ছিলে না, টেলর।’ বলার পর অনুরোধের আড়ালে নির্দেশ রাখল সে, ‘এই কথাটা আপাতত ওকে বুঝতে দিয়ো না, কেমন?’
মুহূর্তেই তাকালেন স্যামুয়েল৷ কপট বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘না না, এমনটা বিশ্বাস কোরো না, জান। আমার প্রথম সন্তান ও। ওকে আমি সব সময় ভালোবেসেছি।’
-‘কত বছর পর আমাকে কেউ জান বলে ডাকল!’ নস্টালজিক হয়ে উঠতে চাইলো যেন নাওফিল। বিষণ্ণ হাসল তারপরই। ‘থ্যাঙ্কিউ সো মাচ, ম্যান।’
-‘তোমার সঙ্গে দেখা না করলেও তোমাকে আমি ভুলিনি কখনও।’ নাওফিলের কাঁধ জড়িয়ে স্যামুয়েল সান্ত্বনার সঙ্গে বললেন৷
-‘হ্যাঁ, সেটা তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুঝতে পেরেছি।’
কথাটা নাওফিলের বাঁকা ছিল, তা স্যামুয়েল বুঝল কি-না কে জানে। তিনি আগের প্রসঙ্গে ফিরলেন দ্রুত। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ, জান?’
মুচকি হাসল নাওফিল। জিজ্ঞেস করল, ‘লিয়াম কতদিনের ছোটো স্মরণের থেকে?’
-‘দু বছর। কেন জিজ্ঞেস করছ?’
শেষ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল নাওফিল, ‘আর লিয়ামের বোন?’
-‘লিনা? তিয়ার থেকে তিন, সাড়ে তিন বছরের ছোটো হবে হবে হয়ত।’ কৌতূহল চোখে চেয়েই জবাব দিলেন স্যামুয়েল।
-‘স্মরণকে হারানোর দু বছরের ব্যবধানে তুমি আবার বাবা হওয়ার আনন্দ পেয়েছ।’ অকপটেই বলে চলল নাওফিল, ‘তবে স্মরণকে ভুলতে পারোনি তখনও। তারপর হঠাৎ করেই তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হলো। পুনরায় মেয়ের বাবা হলে।’ এতটুকু বলার পর ও গম্ভীর হয়ে উঠল। স্যামুয়েল কিছু বলার জন্য মুখ খুলছিলেন। সে সময়ই নাওফিল কথার রাশ টেনে ধরল আবার, ‘লিনাই আস্তে আস্তে তোমার হৃদয়ে স্মরণের জায়গা করে নেয়৷ দুই ছেলে-মেয়ে আর নিজের কর্ম নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলে তুমি। সেই ফাঁকে ধীরে ধীরে ভুলতে থাকলে তোমার প্রথম সন্তানকে। আর এজন্যই বাংলাদেশ গিয়ে সেই সন্তানকে খুঁজে বের করার সময় আর আগ্রহ কোনোটাই হয়নি তোমার।’
স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন স্যামুয়েল। নাওফিলের চোখ-মুখের কাঠিন্যতা দেখে আর কোনো কথা বললেন না, কপটতার আশ্রয়ও নিলেন না। অনেকটা সময় নীরবতা কাটল তাদের মাঝে৷ পশ্চিমের আকাশে অস্তরাগ মুছে গিয়ে এখন আঁধার ঘনাচ্ছে সেখানে, পাখপাখালির কিচির-মিচিরও থেমে হারিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় স্যামুয়েল মৌনতা কাটিয়ে ক্ষীণ গলায় বলে উঠলেন, ‘এটাই কি বাস্তবতা না, জান?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৪
-‘এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাটা বুঝতে এত দেরি করলাম কী করে? এতগুলো বছর যে জেরিন ইসলাম নয়, আমি নজরবন্দি থাকতাম। এই সহজ হিসাবটা কষতে পারলাম না আমি!’ জবাবটা মুখে নয়, বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে আপন মনেই ভাবল নাওফিল।
