Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১১

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১১

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১১
তোনিমা খান

বৈবাহিক সম্পর্কের সবচেয়ে প্রথম শর্ত হলো—স্বচ্ছতা, একে অপরের প্রতি ভরসা রাখা এবং নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখা। কথায় আছে একটা ছোট্ট ফাটল বড় চিড় ধরানোর জন্য যথেষ্ট। তেমনি সম্পর্কে একটু লুকোচুরি ঠিক কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে তা বিন্দুর মূর্ছা যাওয়া বিধ্বস্ত বদন দেখেই আন্দাজ খুব সহজেই আন্দাজ করে ফেলল সুপ্ত।
সুপ্তর স্বভাবসুলভ শান্ত মুখশ্রীতে উদ্বেগ। ফুটপাতে আচমকা জ্ঞান হারানো মেয়েটির গাল চাপড়ে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“বিন্দু? বিন্দু শুনতে পাচ্ছো?”
বিন্দু পুরোপুরি চেতনাহীন বুঝে সুপ্ত তড়িৎ গতিতে তাকে কোলে তুলে নিয়ে পাশের রেস্তোরাঁয় ঢুকে গেল। কয়েকবার পানির ঝাপটা দিতেই কিছুক্ষণ বাদ বিন্দুর জ্ঞান ফিরল।
সে ঝাঁপসা নেত্রে আশেপাশে তাকাতেই দেখল অচেনা কতগুলো মানুষ উঁকি দিয়ে আছে তার উপর। সে চকিতে উঠে বসল। রেস্তোরাঁর বাকি মানুষগুলো সরে গেল। সুপ্ত তার মাথায় হাত রেখে বলল,
“ধীরে ওঠো। তোমার শরীর দূর্বল।”

বিন্দু ঘাড় উঁচু করে দৃষ্টি রাখল সুপ্তর মুখপানে। লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে। সে একবার কাউকে দেখলে আজীবন তার মুখ মনে থাকে। উপরন্তু সে জানে এই মানুষটা তালহারের খুব কাছের। সুপ্ত তার চাহনি দেখে বলল,
“চিনতে পারোনি? অবশ্য চেনার কথাও না। তুমি প্রায় তিন বছর আগে আমায় একবার রান্না করে খাইয়েছিলে। এরপর আর তোমার বর আমাদের দ্বিতীয়বার দেখা করার সুযোগ দেয়নি।”
বিন্দু অস্ফুট স্বরে বলল,
“সুপ্ত শাহরিয়ার।”
সুপ্তর ঠোঁটের কোনে ক্ষীণ হাসি।
“ইটস্ রিয়্যালি এমেইজিং এন্ড আ’ম ফিলিং ভেরি স্পেশাল, বিন্দু। তুমি আমায় চিনে ফেলেছো।”
বিন্দু সৌজন্য হাসল। শাড়ির আঁচল আরেকটু ঠিক করে নিয়ে বলল,
“আমি তো রাস্তায় ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে কী হলো…বুঝতে পারলাম না।”
“তুমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে।”
“আপনাকে ধন্যবাদ সাহায্য করার জন্য।”

“ওটা আমার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়তো তুমি খুব দূর্বল আর ভেঙে আছো।”
সুপ্ত পাশের সোফাটিতে বসে বলল। ততক্ষণে ওয়েটার একটা ফ্রেশ ঠান্ডা ম্যাংগো জুস নিয়ে এসেছে।
সুপ্ত সেটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ম্যাংগো জুস! তোমার পছন্দের খেয়ে নাও দ্রুত। এরপর এই ইলেক্ট্রোলাইটটা খাবে।”
সুপ্ত খুব যত্ন সহকারে ইলেক্ট্রোলাইট আর জুসটা এগিয়ে দিয়ে বলল। বিন্দুর শরীর এতটাই খারাপ লাগছিল যে সে দ্বিরুক্তি করেনি। এক ঢোকে জুসটা খেয়ে নিলো।
সুপ্ত তার আপাদমস্তক দেখেতে দেখতে বলল,
“এখন ভালো লাগছে?”
বিন্দু মাথা দোলালো। সুপ্ত নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তোমাকে অনেক বিধ্বস্ত লাগছিল। কিছু হয়েছে?”
“তেমন কিছু হয়নি।”

বিন্দু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল। সে যা ভাঙার এক মাস আগেই ভেঙে গিয়েছিল। আজকের দৃশ্য তার জন্য খুব একটা চমকপ্রদ ছিল না। কিন্তু আজ কেন তার শরীর এতটা ভেঙে পড়ল?
তার দেহ তখনো স্ট্যাবল মনে হচ্ছিল না। হাত পা কাঁপছিল।
“কিন্তু আমি তো জানি অনেক কিছু হয়েছে।”
সুপ্ত আধখাওয়া সিগারেট ঠোঁটে গুঁজল। সিগারেটের দূর্বিসহ গন্ধে বিন্দু খুক খুক কেঁশে উঠল। সুপ্ত নির্বিকার সিগারেটটা পায়ে পিষে ফেলল। অনুতাপের সুরে বলল,
“হেই স্যরি! আমার মাথায় ছিল না তোমার শ্বাসকষ্ট রয়েছে।”
বিন্দু কিছুটা স্বস্তিবোধ করতেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমার শ্বাসকষ্ট রয়েছে, ম্যাংগো জুস পছন্দ এতকিছু আপনি কী করে জানেন? আমাদের মাত্র একবার দেখা হয়েছিল তাও অনেক বছর আগে।”
সুবিশাল আকাশে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা তারা যেমন স্নিগ্ধ আলো ছড়ায় তেমনি সুপ্তর চোখে স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতা দেখাগেল। সুপ্ত স্মিত হেসে বলল,

“আমি তো এটাও জানি যে তোমার লিলিফুল পছন্দ।”
সুপ্ত হাত বাড়িয়ে পাশের চেয়ার থেকে একটা লিলিফুলের তোড়া তার দিকে বাড়িয়ে দিল। বলল,
“আসার পথে দেখে ভালো লাগল তাই কিনে নিলাম। এখন মনে হচ্ছে তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালো হলো। ফুলগুলো ওয়েস্ট হবে না।”
কিন্তু বিন্দু তৎক্ষণাৎ নাকচ করে বলল,
“দুঃখিত, আমি সবার থেকে ফুল নেই না।”
সুপ্তর এগিয়ে দেয়া হাতটি থেমে গেল। সে এক পলক ফুলগুলোকে দেখে সেখানেই রেখে দিল। সোফায় পিঠ এলিয়ে দিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“ইম্প্রেসিভ! এখন বলো দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”
“আপনি মনেহয় সবটাই জানেন। আমি আবার বলে আপনাকে বিরক্ত করছি না।” বিন্দু কৃত্রিম হেসে বলল। সুপ্ত মাথা দোলালো।
“তুমি তো জানো তালহার কতটা চাপা আর জেদি স্বভাবের। ছোটথেকে এগুলোই করে এসেছে। নিজের কাজ সম্পর্কে কারোর কাছে কোনো প্রকার কৈফিয়ত দিতে সে নারাজ। যা ইচ্ছা তাই করে বেরিয়েছে। প্রাচীর সাথেও এমনটাই করেছে। আমি এগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত!”
বিন্দু কপাল কুঁচকে নিলো “প্রাচী” নামটি শুনে। অস্ফুট স্বরে বলল,

“প্রাচী?”
সুপ্তর চোখেমুখে চমৎকার উৎকণ্ঠা দেখাগেল। উৎসাহের সাথে বলল,
“তালহার কী প্রাচীর কথা বলেনি তোমায়? একটাসময় তালহারের একান্ত ব্যক্তিগত নারী ছিল সে। তবে সেটা অতীত।”
বিন্দুর মিহি স্বরে বলল,
“আমি দেখেছি তাকে এবং তার কথাও শুনেছি। প্রাচী আর আপনি তার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলেন।”
বাসা পরিবর্তন করার সময় সে তালহারের পুরোনো জিনিসপত্রের ভেতর একটা ছবি পেয়েছিল। যেখানে তালহার, সুপ্তর মাঝে প্রাচী নামক মেয়েটি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তখুনি তালহার বলেছিল। এটাও বলেছিল সে খুব কাছের বন্ধু।
সুপ্তর ঠোঁটের কোনা আলতো বেঁকে গেল। স্মিত হেসে বলল,
“সিরিয়াসলি! ও এটা বলেছে তোমাকে? ও আজ ও স্বীকার করল না প্রাচী ওর শুধু বন্ধু ছিল না।”
বিন্দু তার কথা ছিনিয়ে নিলো। বলল,
“বন্ধু ছিল না বরং তার পরিবারের মতো ছিল। প্রাচী আপু অনাথ ছিলেন। তালহার আর আপনি ই তার সবকিছু ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাকে তালহারের কারণেই মেরে ফেলা হয়। যার জন্য তালহার নিজেকে দ্বায়ী করে। ওটা এর থেকে বেশি কিছুই ছিল না।”

সুপ্তর মুখে তখনো এঁটে আছে একফালি হাসি। সেভাবেই ধিমি কণ্ঠে বলল,
“আমরা তিন বন্ধু ছিলাম, বিন্দু। আমরা একসাথে সাতটি বছর কাটিয়েছি।”
বিন্দুর মুখের রঙ বিলীন হয়ে যেতে লাগল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
“অবশ্যই। কিন্তু ওটা যদি বন্ধুর থেকে বেশিও হয় তবুও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।”
“তোমার সত্যিই কোনো সমস্যা হচ্ছে না?”
“নাহ। অতীত সবার থাকে। আমিও ছোটবেলায় একজনকে খুব পছন্দ করতাম। তাতে কী বা যায় আসে। এখন আমার কাছে আমার স্বামীই সব।”
বিন্দু খুব সাবলীলভাবেই দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল। সুপ্তর দৃষ্টি ভীষণ গভীর আর সরু। যেন সে বিন্দুকে নয় বরং মিসেস তালহারকে দেখছে। বলল,
“সে কী সত্যিই এখনো তোমার স্বামী আছে?”
বিন্দু চমকে উঠল। চোখেমুখে কিয়ৎকাল পূর্বের থাকা দৃঢ়তা মুহুর্তেই হারিয়ে গেল।
সুপ্ত পুনরায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি তার ভুলগুলো ক্ষমা করে দিয়েছ?”
“না, কোনোদিন না। কিন্তু এটা পুরোটাই আমার আর আমার স্বামীর ব্যক্তিগত বিষয়। আমি এটা নিয়ে কারোর সাথে কথা বলতে চাই না।”
বিন্দু দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল।
দারুচিনি রঙা চোখদুটো অযথাই উজ্জ্বলতা হারায়। সুপ্ত স্মিত হেসে বলল,
“আমি এমনি একজন স্ট্রং মেয়েকেই দেখতে চেয়েছিলাম। ইটস রিয়্যালি নাইস টু সি ইউ এজ মিসেস তালহার। অতীত আমাদের জীবনে শুধুই স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু সেগুলো বর্তমানকে নষ্ট করার অধিকার রাখে না।”
বিন্দু মাথা দোলালো। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
“আমায় এখন যেতে হবে। আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগল। হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। ভালো থাকবেন।”
“ভবিষ্যত কে জানে? দেখা হতেও পারে।”
সুপ্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল। পরপরই উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“তোমায় অসুস্থ লাগছে। তুমি কী একা যেতে পারবে? আমি পৌঁছে দিয়ে আসি।”
বিন্দু নাকচ করল।

“প্রয়োজন নেই। আমি একা চলতে শিখে গিয়েছি।”
সুপ্ত মৃদু হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। এটা আমার কার্ড রাখো। কখনো যদি সমস্যায় পড়ো নির্দ্বিধায় একটা ফোন করবে। তোমার সব সমস্যার সমাধান নিয়ে হাজির হবো।”
বিন্দু কার্ডটি নিলো না। বলল,
“ধন্যবাদ তবে এটার প্রয়োজন নেই।”
“জীবন অনিশ্চিত, বিন্দু। প্রয়োজন কখন এসে হাজির হবে তুমি বুঝবেই না। এটা রাখো। রাখতে তো সমস্যা নেই। মনে করবে, এই কার্ড তোমার সব সমস্যার সমাধান।”
বলেই সে জোরপূর্বক বিন্দুর হাতে কার্ড ধরিয়ে দিল। বিন্দুর নিজের খালি হাত দেখে মনে পড়ল সে তার ক্লাচার হারিয়ে ফেলেছে। সে কার্ডটা নিয়ে বলল,

“আমার ক্লাচারটা হয়তো রাস্তায় ফেলে এসেছি। আমি আসছি।”
বলেই সে দ্রুত বেরিয়ে গেল রেস্তোরাঁ থেকে। সে যেতেই সুপ্ত সোফায় পিঠ এলিয়ে দিল। স্থির দৃষ্টি টেবিলে পড়ে থাকা লিলিফুলগুলোর দিকে। কিয়ৎকাল দেখতে দেখতেই সে হাত বাড়িয়ে ফুলগুলোকে পাশে রাখা ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিল।
নীলক্ষেতের সেই রাস্তায় আবার এগিয়ে যেতেই কবির ছুটে আসল। ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল,
“ম্যাডাম ঠিক আছেন আপনি? আপনার ব্যাগ রাস্তায় পড়েছিল কেন? আপনি কোথায় ছিলেন?”
বিন্দু রক্তিম নেত্রে তাকে এক পলক দেখে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল। কবির ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। একদিকে সংসার ভেসে যাচ্ছে আর অন্যদিকে স্যার নির্বিকার তার কাজ করছে।
সে বিরক্ত হয়ে আবার বিন্দুর পিছে পিছে গেল। এতক্ষণ স্যারের সাথে কথা বলছিল।

অম্বর তমসাবৃত। সংসারী বিন্দুর সহজ সুন্দর দুনিয়াটা অচিরেই ছলনা, মুখোশে আবৃত এক বিষাক্ত ধরণীতে পরিণত হয়েছে।
বাহিরে বজ্রঝড়ের তীব্র হুঙ্কার। দরজার কপাটের ঠিক ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির পানে চেয়ে বিন্দু স্মিত হাসল। তার চোখ তখনো রক্তিম আর টলটলে। অভিযোগ, যন্ত্রণা, ঘৃণায় কাতর মেয়েটি ভীষণ ক্লান্ত। উপহাসের সাথে বলল,
“তালহার মুজাহিদ কী কৈফিয়ত দিতে এসেছে?”
তালহার নিরুদ্বেগ দরজা আঁটকে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখে চোখ রেখে বলল,
“কৈফিয়ত সেদিন ও দেইনি আজ ও দেব না। শুধু এতটুকু বলব, আমার স্ত্রী আমার ব্যক্তিগত দুনিয়া। তার কোনো সংযোগ নেই আমার পেশাগত জীবনের সাথে। নিজেকে ওই জীবনের সাথে জড়িও না। এখানে সবাই এক একটা মুখোশধারী পিশাচ। এমনকি তোমার স্বামীও।”
“তাহলে আপনি স্বীকার করে নিচ্ছেন আপনি মুখোশধারী এক বিশ্বাসঘাতকতা? চরিত্রহীন?”
“ওটা সম্পূর্ণ আমার পেশাগত দুনিয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কিন্তু দিনশেষে তোমার কাছে ফিরে আসা মানুষটা একজন সৎ, দায়িত্ববান স্বামী। যে তার স্ত্রীর জন্য পুরো দুনিয়া থেকে নিজের দৃষ্টি সংযত রাখতে জানে।”
বিন্দুর চোখমুখ ঠিকরে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। “দৃষ্টি সংযত রেখে অন্য মেয়েকে বুকে জায়গা দেয়ার মতো সৎ স্বামী, তাই তো?”

তালহারের চোখেমুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। ত্যক্ত সুরে বলল,
” বিগত তিন বছর তুমি ঠিক কী কারণে সংসার করেছিলে বলতে পারো? না কখনো ভালোবাসি বলেছি? না কখনো কোনো কৈফিয়ত দিয়েছি? আর না তুমি আমার কাজের বিষয়ে কিছু জানতে? তবে কিসের ভিত্তিতে সংসার করেছিলে?”
বিন্দুর নাকের পাটা ফুলে উঠল। টলটলে নেত্রে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ভরসার ভিত্তিতে। অন্তত এতটুকু জানতাম দিনশেষে বাড়ি ফেরা মানুষটা একান্তই আমার স্বামী। কোনো মুখোশধারী বিশ্বাসঘাতক না।”
তালহার চোয়াল শক্ত করে বলল,
“তবে আমার মনে হচ্ছে তোমার সেই ভরসা ভীষণ নড়বড়ে ছিল। একটু হাওয়া লাগতেই যেই ভরসার খুঁটি ভেঙে যায় সেই ভরসার কোনো মূল্য নেই। আমি আজ ও বলছি, দিনশেষে বাড়ি ফেরা মানুষটা একান্তই তোমার স্বামী। জীবনকে জটিল বানিও না, বিন্দু।”
সহসা বিন্দুর চেপে রাখা রাগ উপচে বেরিয়ে এলো। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,

“জটিল বানাচ্ছেন আপনি। আমার জবাব চাই।”
“বলো কী জবাব চাই?”,তালহার একই রকম চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
“মেঘ কে?”
“আমার কাজ।”
“আমি কে?”
“আমার ঘর।”
“সেই ঘর যেখানে দিনশেষে আমায় ফিরতেই হবে। এবং আমি ফিরবোই।”
তালহার পুনরায় বলল।
বিন্দু ক্রন্দনরত চোখে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। ভেজা কণ্ঠে বলল,
“আপনি কী বলছেন তবে আমি ওই ছবি, ওই চ্যাট, আজকের দেখা ওই মুহুর্ত ভুলে যাব? কিন্তু আপনাকে দেখলে আমার চোখের সামনে ওইসব জীবন্ত হয়ে ওঠে।”
“আর কতভাবে বললে তুমি বিশ্বাস করবে? নাকি বিশ্বাস করতেই চাইছ না।”
“ভরসা একবার ভেঙে গেলে তা জোড়া লাগানো অনেক কঠিন। প্রমাণ ছাড়া আমি বিশ্বাস করছি না।”
বিন্দু চোখের পানি মুছে নিলো। কিন্তু তার মাঝে বিশ্বাস করার ইচ্ছা ছিল আজ। তালহার নিজেও সেটুকু আঁচ করতে পারল।
সে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বিন্দুর দিকে এগিয়ে দিল।

“মেঘের পরিচয় এবং ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড। সে সেই ফ্যামিলির মেয়ে, যেই ফ্যামিলির একজন দেশের বড় একটি করাপশনের সাথে যুক্ত।”
“কিন্তু এতে মেঘের কী প্রয়োজন?”
“আমরা আমাদের কাজে সফল হওয়ার জন্য যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। আশাকরি এতটুকু যথেষ্ট তোমার সো কল্ড ভাঙাচোরা ভরসা জোরা লাগানোর জন্য। এর বাইরে কোনো আউট সাইডারকে আর কিছু জানানো আমার জন্য বিপদজনক।”
বলেই তালহার তার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে নিলো। বিন্দু মিইয়ে গেল। তালহার হাত ঘড়ি দেখে আবার বলল,
“এক সপ্তাহ পর তুমি বাড়িতে ফিরে যাবে। ততদিন নিজেকে সামলে চলবে।”
বিন্দু কোনো প্রত্যুত্তর করল না সে তখনো তালহারকে পরোখ করতে ব্যস্ত। তালহার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বোলাতে বোলাতে বলল,
“ভাত হবে? খিদে পেয়েছে!”
বিন্দু নিস্তেজ চাহনিতে তাকে এক পলক দেখে ভাত আনতে গেল। সে যেতেই তালহার দ্রুত পাশের চেয়ারে রাখা বিন্দুর ফোনটা নিয়ে কিছু একটা করল। এবং সেটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিল। বিন্দু ভাত নিয়ে আসে।
তালহার থমথমে মুখে বলল,

“খাইয়ে দেয়া যাবে?”
“দুঃখিত।”
বলেই বিন্দু ভাতটা চেয়ারে রেখে অন্য রুমে চলে গেল। তালহার প্লেটটির দিকে এক পলক চেয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
দরজা খোলার শব্দে বিন্দু চকিতে বেরিয়ে আসল। ভাতটি সেভাবেই ফেলে রাখা। খায়নি। বিন্দুর বুকের ভেতর অস্বস্তি বোধ হলো। খুব খিদে পেয়েছিল বলেই তো ভাত খেতে চেয়েছিল। সে কী করে এমন অমানুষের মতো কাজ করল? ক্রোধ কী একজনের খিদের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
নিজের উপর ভীষণ রাগ হলো বিন্দুর।
তালহার ত্রস্ত পায়ে গাড়িতে ঢুকেই বলল,
“সামথিং ইজ ফিশি, কবির।”
প্যাসেঞ্জার সিটে বসা কবির উন্মুখ হয়ে শুধালো,
“আপনি কী তার ফোনে কিছু পেয়েছেন, স্যার?”
তালহার গাড়িটা গেট থেকে বের করতে করতে বলল,
“নাহ। আমি বাসায় গিয়ে আরো একবার চেক করব। কিন্তু বিন্দুর আচরণে অদ্ভুত কিছু ছিল।”
“স্যার, আমি শিওর কিছু আছে তার ফোনে। সে আজ সকালে কোচিং করিয়ে গাউছিয়া মার্কেট থেকে কিছু কেনাকাটা করে। তারপর রিকশা নিয়ে বাড়ির পথেই যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ করেই সে আবার রিকশা ঘুরিয়ে নীলক্ষেত চলে যায়। আর ঠিক সেইখানে যায় যেখানে আপনি আর মেঘ ছিলেন। এটা কাকতালীয় হতেই পারে না।”

তালহার গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। ধিমি কণ্ঠে বলর,
“আমার ব্যক্তিগত জীবন আর ব্যক্তিগত নেই। এখানে হয়তো তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ঢুকে পড়ছে। আমার সংসারের ভাঙনকে নিজের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। আমার যত দ্রুত সম্ভব বিন্দুকে এগুলো থেকে দূরে সরাতে হবে।”
বিন্দু দরজা আঁটকে নিজের বিছানার কাছে এলো। ম্যাট্রিসের নিচ থেকে নিজের নতুন কেনা বাটন ফোনটা বের করে চিন্তিত লোচনে দেখল।
তালহার তাকে মিনটর করে তাই বিরক্ত হয়ে এই ফোনটা কিনেছিল ক’দিন আগে। কিন্তু এই নাম্বার তো মা আর আপা ছাড়া আর কারোর কাছে নেই। তবে?
সে সকালে আসা সেই মেসেজটা ওপেন করল যার ভিত্তিতে সে নীলক্ষেত গিয়েছিল। ছোট্ট একটা মেসেজ।
“আপনার স্বামীর স্বচ্ছতা যাচাই করুন।”
লেখাটার পরে নীলক্ষেতের সেই জায়গাটার এড্রেস লেখা ছিল।
বিন্দু গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। তবে কী তাদের সম্পর্কে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করতে চাইছে?
কিন্তু তার ব্যক্তিগত বিষয়ে সে কখনোই তৃতীয় ব্যক্তির হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না। সে দ্রুত নিশিকে ফোন করল। রিসিভ হতেই বলল,

“নিশি, আমি ফিরে যাব তালহারের কাছে।”
“হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত?”
“সামথিং ইজ ফিশি, নিশি। কেউ আমাদের বিচ্ছেদে ইন্ধন জোগাচ্ছে। কিন্তু কোনো তৃতীয় ব্যক্তির অধিকার নেই আমাদের সম্পর্কের মাঝে ঢোকার।”
বিন্দু মিইয়ে যাওয়া স্বরে বলতে বলতেই টেবিলে রাখা ছোট্ট আয়নাটি মুখের উপর ধরল।
চোখের নিচে কালচে দাগ, খাবারে অরুচি, মর্নিং সিকনেস। বিন্দুর চোখ দুটো ঝাঁপসা হয়ে আসল। সবটা নির্দেশ করছে তার মাঝে হয়তো কেউ আছে। তার হাতটি আলতো করে ঠেকলো নিজের উদরে।
“তাকে আরো একবার ভরসা করতে হবে আমায়। কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেব না আমার জীবনে হস্তক্ষেপ করার।”
বিন্দুর এই সিদ্ধান্ত কী অটল থাকবে? নাকি যার কারণে সে আরো একবার ভরসা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই আরো একবার ভরসা ভাঙার কারণ হবে?

অফিসের একটি কক্ষে আলো জ্বলছে। কম্পিউটারের সামনে বসে আছে মেহমেদ আর তালহার। মেঘ বলেছিল সে এক সপ্তাহ পর আসবে। কিন্তু মাহির চৌধুরী দেশে এসেছে। তাও এই গভীর রাতে।
“আপনার কী মনে হয় মিস মেঘ মিথ্যা বলেছে আমাদের কাছে?”, মেহমেদ শঙ্কিত কণ্ঠে বলল।
“উঁহু, মেঘ নিজেও জানত না মাহির চৌধুরী এত তাড়াতাড়ি দেশে আসবে।”
মেহমেদ ফিরে তাকায় তালহারের শিথিল মুখপানে। অনেক দিনের চেপে রাখা কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, একটা কথা বলি?”
“বলুন।”
“হাউ কুড ইউ টলারেট মিস মেঘ? আপনি আর মেঘ দু’জন দুই মেরুর মানুষ।”
“আপনি কেন টলারেট করেন?”
তালহারের পাল্টা প্রশ্নে মেহমেদ অপ্রস্তুত বলল,

“আমি তো কাজের জন্য আর সে আপনার…”
“আমার ভালো বন্ধু।”
তালহার ব্যগ্র কণ্ঠে বলতেই মেহমেদ কপাল কুঁচকে তাকালো। তালহার তার চোখে চোখ রেখে বলল,
“আপনিও যেই কারণে টলারেট করেন আমিও সেই কারণেই করি। কিন্তু সে একটা ভালো মেয়ে।”
মেহমেদ বুঝে উঠতে পারল না। অবুঝ কণ্ঠে বলল,
“মানে স্যার, আপনিও তাকে কাজের জন্য টলারেট করেন?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমি তো ভেবেছিলাম আপনি…”
মেহমেদের কথা ফুরিয়ে এলো। তালহার ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী?”
“না মানে স্যার…!”
“কাজে মনোযোগ দিন, মেহমেদ। যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ হবে, তত কম মেঘকে টলারেট করতে হবে।”
মেহমেদ বাকরুদ্ধ! সে জানত স্যার কতটা অনুভূতিহীন কঠোর। কিন্তু এতটা জানত না। স্যার কী তবে শুধুই কাজের জন্য মেঘের সাথে সখ্যতা রাখছে? তবে তো এটা অন্যায়!
সে বিমর্ষ মুখে আবার কাজে মনোযোগ দিল। উপর মহল থেকে তাদের উপর চাপ আসছে। আর এক সপ্তাহ যদি বন্দরগুলোতে তেল শিপমেন্ট বন্ধ থাকে তবে এটা বিরাট লসের কারণ হবে।
“আমরা কী এক সপ্তাহের মধ্যে কেস সলভ করতে পারব, স্যার?”
“আমরা না করতে পারলেও আমাদের দিয়ে করিয়ে ছাড়বে। আপনার কী মনে হয় মাহির চৌধুরী এত ইমার্জেন্সি কেন দেশে এসেছে?”

“অবশ্যই আমাদের থামাতে।”
“হ্যাঁ। আমাদের কেস আশি পার্সেন্ট এখানেই সলভ করা‌ শেষ, মেহমেদ। আমাদের এখন শুধু মাহির চৌধুরীকে কাস্টিডিতে নেয়ার কারণ চাই। এখন যা করার তা মেঘ করবে শুধু। এরপর মাহির চৌধুরী পুরোটা আমাদের কবজায়। জ্বালানি আর খনিজ সম্পদ পাচারের মূল হোতা আমাদের কাছে থাকলে পুরো প্রক্রিয়া বিকলাঙ্গ হয়ে পড়বে। তখন মূল ঘাতক নিজে থেকেই সামনে আসবে।”
বলেই তালহার টেবিলের আরেকপাশে থাকা ল্যাপটপের পজ করা টক শো টি আবার চালু করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পরিপাটি শান্তশিষ্ট নরম অবয়ব। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা এবং ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডঃ জিন্নাহ। যে কি-না খুব নম্রতা আর দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করছে কী করে বিগত বছরগুলোতে জ্বালানি আর খনিজ সম্পদ দেশের উন্নয়নের জন্য কাজে লাগানো হচ্ছে।
তালহারের মুখে বাঁকা হাসি। মেহমেদ স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল,
“আপনি কেন তাকে টার্গেট করে আছেন স্যার? সে এই পর্যন্ত এই কেস নিয়ে একটুও টু শব্দ করেনি। সে যদি সবকিছুর পেছনে থাকে তবে এতদিনে সেই এই কেস বন্ধ করিয়ে দিতো। শুধু শুধু মাহির‌ চৌধুরীর ভরসায় কেন বসবে? সে যথেষ্ঠ ক্ষমতাধর! এতকিছু হয়ে গেলেও একটা মানুষ চুপ থাকবে এটা অসম্ভব!”
তালহার মৃদু হেসে বলল,

“সে হয়তো ভাবছে আমরা তার কিছুই করতে পারব না। তাই সে নিজের খোলোস ছেড়ে বের হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে না। আর টার্গেট করতে সমস্যা তো নেই, মেহমেদ।”
মেহমেদ সায় জানালো। তাদের রাতটা অফিসেই কেটে গেল।
ঘুম থেকে উঠেই মেঘ অলস কদমে লিভিং রুমে আসলো। কিন্তু সোফায় পাপার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি মুখ দেখে সে চেঁচিয়ে উঠল।
“বাবা!”
মাহির চৌধুরী চমকে পিছু ফিরে তাকালেন। মুহুর্তেই তার ঠোঁটে স্নেহমাখা হাসি ফুটে উঠল।
“মেঘ! আমি অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য!”
মেঘ ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। মাহির চৌধুরী প্রশান্তির এক নিঃশ্বাস ফেলে তাকে জড়িয়ে নিলো। এই মেয়েটি এক টুকরো মেঘের মতো তার মধ্যে শীতলতা নিয়ে আসে। সে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এবার আমি আমার আমানত তোর থেকে নিয়ে নেব, মাহিম।”
মাহিম চৌধুরী ভাইয়ের কথায় স্মিত হাসল। মেয়েকে বলল,
“মেঘ, বাবার জন্য চা নিয়ে এসো। সে বাইরে যাবে। তোমাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল।”
মেঘ চঞ্চল কণ্ঠে বলল,

“কিন্তু বাবা কখন আসল? তোমার তো এক সপ্তাহ পর আসার কথা ছিল।”
মাহির চৌধুরী মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রেখে বলল,
“একটু জরুরী কাজ আছে, মা।”
“আচ্ছা।”
মেঘ চা আনতে গেল। সে তার বাবাকে পাপা ডাকে আর চাচাকে বাবা ডাকে। পাশাপাশি তাদের দু’টো দালান।
মেঘ যেতেই মাহিম চৌধুরী বলল,
“আপনার আমানত বলেই আমি আজ পর্যন্ত তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা করিনি, ভাইজান। কখন নেবেন একবার শুধু বলুন। আমি তো রাজী।”
মাহির চৌধুরী প্রগাঢ় হেসে বললেন,
“হাতে একটা কাজ আছে ওটা শেষ করে। ততদিনে মুঈন ইউকে থেকে আসুক।”
তার দুই ছেলে। বড় ছেলে মুঈনের জন্য বহু আগে থেকে মেঘকে পুত্রবধূ হিসেবে ঠিক করে রেখেছেন তিনি। বংশের একমাত্র মেয়েকে অন্যের ঘরে পাঠানোর সাহস তার নেই। মাহিম ও বড় ভাইকে আর তার সিদ্ধান্তেকে শ্রদ্ধা করে।

মেঘ চা নিয়ে আসল। সকলে একসাথে চা পান করে মাহির চৌধুরী বলল,
“চলো, বাবা তোমার জন্য উপহার এনেছি সেগুলো নিয়ে আসবে।”
“ওকে, ওকে।”
মেঘ কাঠবিড়ালীর ন্যায় লাফাতে লাফাতে চলল বাবার হাত ধরে। মাহির চৌধুরী রুমে ঢুকে একটা লাগেজ তার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলল,
“এখানে আমার মা যা যা বলেছিল সব আছে।”
“ওহ্ থ্যাংক ইউ, বাবা।”

মেঘ আনন্দিত চিত্তে বলে সেখানেই ব্যাগ খুলতে বসে পড়ল। মাহির চৌধুরী দ্বিধা নিয়ে বললেন,
“এখানে বসেই খুলবে?”
“হ্যাঁ, কেন সমস্যা হবে তোমার?”
“না আম্মা। তুমি তবে থাকো এখানে। বাবার জরুরী কাজে বাইরে যেতে হবে।”
“আচ্ছা তুমি যাও।”
মাহির চৌধুরী পাঞ্জাবি বদলে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। সে বের হতেই মেঘের চোখমুখ সতর্ক হয়ে উঠল। সে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। কখনো একটা মিথ্যা কথা না বলা মেয়েটা আজ কত বড় কাণ্ড করতে এসেছে।
সে চাচার পুরো ঘরে তল্লাশি চালালো। একটা ল্যাপটপ আর একটা পিসি পেল শুধু। তখুনি তার ফোন বেজে উঠল। তালহারের ফোন। সে রিসিভ করেই বলল,
“তালহার, আমি তোমার ফাইলগুলো খোঁজার চেষ্টা করছি। বাবার ল্যাপটপ পেয়েছি।”
কিন্তু প্রেক্ষিতে তালহার উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
“মেঘ তুমি কাবার্ডের প্রথম স্তরটি খুঁজে দেখোনি।”
মেঘ পিলে চমকে কাবার্ডের দ্বিতীয় স্তরের দিকে তাকালো। সেটি অনেক উচ্চতায় থাকায় সে চেক করেনি। আশ্চর্য হয়ে বলল,

“তুমি কী করে জানলে কাবার্ডের প্রথম স্তর চেক করিনি?”
তালহার কপালে আঙুল ঘঁষলো। এখন কী জবাব দেবে? সে কথা ঘুরাতে বলল,
“তুমি একটু তাড়াতাড়ি করো না কাজটা। আমি তোমায় আবার একটু পরে ফোন দিচ্ছি।”
তালহার ফোন কেটে দিল। মেঘ অবুঝ পানে চেয়ে তাকালো। সে টুল এনে কাবার্ডের প্রথম স্তর চেক করল। একটা কাঁধের ব্যাগ পেল। সেটি অনাগ্রহে খুলতেই দেখল সেখানে আরো একটা ল্যাপটপ। মেঘ আরেকদফা আশ্চর্য হলো।
“এই ল্যাপটপ তো আগে দেখেনি। হয়তো নতুন কিনেছে বাবা। কিন্তু তালহার কী করে জানল আমি প্রথম স্তর চেক করিনি?”
মেঘ বিড়বিড় করল। সবটা যেন তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সে তখনো জটিল তালহারকে বুঝে উঠতে পারেনি। অথচ আশা রাখে সে তালহার মুজাহিদের যোগ্য জীবনসঙ্গী হবে। দীর্ঘশ্বাস….!
বহুক্ষণ বাদ সে পিসি আর দুইটা ল্যাপটপ নিয়ে আরেকদফা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে এইসব বিষয়ে পারদর্শী নয়। সে কলে থাকা তালহারকে বলল,

“তালহার এখানে সব জায়গায় লক করা। এমনকি একটা ফাইল ও এনক্রিপ্ট করা। এতগুলোর পাসওয়ার্ড আমি কী করে জোগাড় করব? বাবা আমায় খারাপ চোখে দেখবে। তার চেয়ে বরং আমি বাবার সাথে কথা বলি। সে নিশ্চয়ই তোমায় প্রয়োজনীয় তথ্য দেবে।”
তালহার চিন্তিত লোচনে কপালে আঙুল ঘঁষলো। বলল,
“ওয়েট, তুমি পারবে না। তার চেয়ে বরং আমি আসি? আমি শুধু আমার প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য নিয়েই চলে আসব।”

“তুমি? এখানে অনেক সিকিউরিটি আর ক্যামেরা থাকে, তালহার।”
“ক্যামেরার বিষয়টা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। বাকিটা কী তুমি একটু ম্যানেজ করতে পারবে না?”
মেঘ ভীতসন্ত্রস্ত দৃষ্টি ফেলে মাথা চুলকালো। অতঃপর রাজী হলো,
“আচ্ছা আসো। আমি ব্যবস্থা করছি। কোথায় বুক ফুলিয়ে আমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে! তা না করে তুমি চোরের মতো প্রথমবার আমার বাড়িতে আসছ। তুমি অদ্ভুত তালহার!”
তালহার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিন্তু মেহমেদের মুখ অস্বাভাবিক কালো ছিল। সে চঞ্চল মেয়েটির চঞ্চলতায় বিরক্ত হলেও কখনোই ঘৃণা করে না। বরং মেয়েটির চঞ্চলতা নিয়ে কেউ খেলা করলে তার কষ্ট লাগবে ভীষণ!
দুপুর দুইটা নাগাদ। সকলে তখন এক প্রহরের ঝাঁকি সামলে বিশ্রাম নিচ্ছে। মাহির চৌধুরী রাত ছাড়া বাড়ি ফিরবে না। উপরন্তু বিদ্যুৎ আর নেটওয়ার্ক সিস্টেমে হঠাৎ ত্রুটি দেখা যাওয়ায় সকলেই বোর হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

বিছানায় পা গুটিয়ে বসে নখ খুঁটছে মেঘ। ভয়ার্ত দৃষ্টি বাবার পিসি আর ল্যাপটপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে থাকা তালহারের দিকে। সে স্বভাবসুলভ পুরো আপাদমস্তক ঢেকে আছে। শুধু চোখদুটো দেখাচ্ছে।
মেঘ ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল,
“হয়েছে তালহার?”
ফাইল ট্রান্সফার হচ্ছে। লোডিং এ সত্তর পার্সেন্ট দেখা যাচ্ছে। তালহার স্মিত হেসে বলল,
“আর দুই মিনিট।”
“তাড়াতাড়ি করো। এখানে দুই মিনিট পর পর মেইডরা আসে।”
বলতে না বলতেই একজন মেইড মাহির চৌধুরীর দরজায় কড়া নাড়ল।
“ম্যাম, এ.সি তো চলছে না আমি কী আরেকটা চার্জার ফ্যান এনে দেব আপনাকে?”
মেঘ বদ্ধ দরজার ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলল,
“আরে ঘুমিয়ে পড়েছি আমি। বিরক্ত করো না। আই পি এস এর ফ্যান তো চলছে।”
“তাতে ইদানিং কম বাতাস হচ্ছে ম্যাম। তাই বলছিলাম।”
“তুমি যাও তো।”

মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল। একশ পার্সেন্ট শেষ। তালহারের মুখে বিজয়ের হাসি। সে পেনড্রাইভটা বের করে নিয়ে সব আবার আগের মতো করে রাখল।
মেঘের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার সুরে বলল,
“থ্যাংক ইউ মেঘ। তুমি জানো না তুমি ঠিক কত বড় সাহায্য করেছ।”
মেঘের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বলল,
“এই মেঘ অলওয়েজ তোমার সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত। এখন তাড়াতাড়ি বের হও।”
সে যেভাবে ঢুকেছিল ঠিক সেভাবেই পেছনের গেট থেকে বেরিয়ে গেল। আর এই পুরোটা সময় মেঘ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে সহায়তা করেছে। তালহার গেট পেরুতেই মেহমেদ চোখে সানগ্লাস পড়ে নিলো। সতর্ক দৃষ্টি ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“কাজ হয়েছে স্যার? ভূতত্ত্ববিদ আনোয়ার ফারুকের ফাইলগুলো পেয়েছেন?”
তালহার স্মিত হেসে বলল,
“আনোয়ার স্যারের ফাইল, তার ময়নাতদন্তের আসল রিপোর্ট সহ বিগত দশ বছরের জ্বালানি উত্তোলনের সঠিক পরিমাপ সবটা পেয়েছি। এমনকি সেই নাম ও পেয়েছি যেই নামের পেছনে আমি হন্য হয়ে ঘুরেছি।”
মেহমেদ কৌতুহলী গলায় বলল,

“আপনি কী ডঃ জিন্নাহ এর কোনো সংযোগ পেয়েছেন?”
তালহার মাথা নাড়লো,
“হ্যাঁ। আমি অনেক আগে থেকেই জানতাম সে বিদেশি কর্পোরেট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আসছে। জ্বালানির ভুল রিজার্ভের হিসাব অনুমোদন করেছেন। আর বছরের পর বছর ধরে বৈজ্ঞানিক মতামতকে বিকৃত করে আসছেন। এবার শুধু সব কটাকে টেনে হেঁচড়ে জনসম্মুখে আনার পালা।”
মেহমেদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু কোথাও না কোথাও তার বুকে কিছু চুবছিল। হয়তো কিছু সময়ের ব্যবধানে কারোর চঞ্চলতা হারিয়ে যাবে।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১০

“স্যার, এই তালহার মুজাহিদের স্ত্রী। নাম বিন্দু। একটা কোচিং এ কর্মরত অবস্থায় আছে। এই একজন ই আছে যার প্রতি পরিবারের থেকেও বেশি দূর্বল তালহার মুজাহিদ। সে খুব চতুরতার সাথে তাকে নিজের থেকে দূরে লুকিয়ে রেখেছে। মাঝেমধ্যে লুকিয়ে গভীর রাতে দেখা করে। সে নিজেকে খুবই চতুর ভাবে! কিন্তু সে আসলে বোকা‌। আমরা তো তার উপর কখনো নজর ই রাখিনি। রেখেছিলাম তার পরিবার আর স্ত্রীর উপর।”
ম্যানেজারের কথায় মাহির চৌধুরীর ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে বিন্দুর ছবিটা হাতে নিলো। আহামরি কোনো সুন্দরী নারী নয়। তবে সাধারণের মাঝে অসাধারণ এক আকর্ষণীয় নারী।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here