জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১০
তোনিমা খান
কোচিং এ ধারাবাহিকভাবে ক্লাসের পর ক্লাস হচ্ছে। তন্ময় আর তার বন্ধুরা তখনো ঝিমাচ্ছে কোচিং এর শুনশান কমন রুমে। অনু কাঁদতে কাঁদতে বিন্দুকে বলল,
“কেউ কিছু করতে পারবে না, আপু। উনি অনেক ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ ও। অনেক বছর ধরে এমন করে আসছে। কিন্তু কেউ তার কিচ্ছু করতে পারেনি।”
বিন্দু বুকে হাত গুঁজে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত স্বরে বলল,
“তোমায় আমি বললাম না তুমি কাল পরীক্ষা দেবে আর ওই লম্পট কিছু করতে পারবে না? আপুর উপর একটু ভরসা করো আর কান্না থামাও।”
অনু ছলছল চোখে বলল,
“আমি পারছি না আপু।”
বিন্দু রাগান্বিত স্বরে বলল,
“এটাই সমস্যা! এই কথাগুলো তোমায় আরো আগে জানানো উচিত ছিল। সেখানে তুমি আজ জানাচ্ছো আর বোকার মতো কাঁদছ। দরকার পড়লে পড়াশুনা ছেড়ে দেব তবুও কেন একজন লম্পটের কাছে নিজের সম্মান নষ্ট করব? এতটুকু সাহস হয়নি? পড়াশুনা কী সম্মানের থেকে বেশি?”
অনু হতচকিত তাকালো বিন্দুর দৃঢ় মুখপানে। সে স্বভাবতই একটা ভীতু মেয়ে। এমন চিন্তা কখনোই আসেনি তার মাথায়। তার মাথা নিচু হয়ে যায়। বিন্দু রাগান্বিত দৃষ্টিতে বাকি সাতজন মেয়ের দিকে তাকায়। কঠিন গলায় বলল,
“শিখে রাখো ওর থেকে। এমন ভীতু হলে প্রতি পদে পদে মানুষ পায়ে পিষে যাবে। কেউ তোমার ভালোথাকা, সম্মানের পরোয়া করবে না। তার থেকে সোচ্চার হও। আগে নিজের সম্মান, সুখ আর ভালোথাকা নিশ্চিত করতে হবে তারপর বাকিসব; বুঝেছ?”
সকলে নত শির মাথা দোলালো। বিন্দু আরোকিছু বলতে যাবে তার আগেই পেছন থেকে একটি গুরুগম্ভীর আওয়াজ শোনাগেল।
“বদ বুদ্ধি দেয়া শেষ হলে আমরা কী কাজের কথায় আসতে পারি মহামান্য?”
তালহারের কণ্ঠে বিন্দু অভিব্যক্তিহীন পিছু ফিরে তাকালো। কালো স্যুট প্যান্ট, কালো মাস্ক, কালো সানগ্লাস পরিহিত লোকটিকে দেখতে কোনো হাই প্রোফাইলের স্মাগলার লাগছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে বিন্দু তাকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবতেই পারছ না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“বদ বুদ্ধি বলতে আপনি কী বুঝিয়েছেন?”
তালহার সানগ্লাসটা খুলে তন্ময় আর তার বন্ধুদের দিকে তাকালো। বলল,
“এটাই যে, পরিস্থিতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া কিংবা নিজেকে সরিয়ে নেয়ার চিন্তা করা কোনো সমাধান নয়। কারণ জীবনে অনেক সমস্যা আসবে। তোমরা কত সমস্যা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে? তার চেয়ে সমস্যার মূল কোথায় আর কে? এটা খুঁজে বের করো। আর নিজের হাতের কাছে যা পাবে তা দিয়ে শক্ত হাতে ডিফেন্ড করো। সমস্যাকে গোড়া থেকে উপরে ফেলো। তবুও পালানোর মতো বদ বুদ্ধি নেবে না কারোর থেকে।”
বলেই তালহারের দৃষ্টি স্থির হলো বিন্দুর উপর। বিন্দু শীতল চাহনি পেলে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
“আমার হাতের কাছে একটা ভাঙা ক্রিকেট ব্যাট আছে। আমি এটা দিয়ে ডিফেন্ড করি? গোড়া থেকে সমস্যা উপরে ফেলি?”
মাস্কের ঠিক উপরে থাকা সরু হ্যাজেল ব্রাউন চোখদুটোতে উপহাস দেখা গেল। তালহারের এক পা এগিয়ে এসে চাপা স্বরে বলল,
“আগে সমস্যাটা খুঁজে বের করুন।”
বিন্দুও একই রকম চাপা স্বরে বলল,
“সমস্যাটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
“সমস্যাটা আপনার মস্তিষ্কে মিসেস তালহার। ক্রিকেট ব্যাট ওঠান আর সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিজের মাথায় একটা বাড়ি দিন।”
বিন্দু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল সরু চোখদুটো পানে। লোকটির চোখে উপহাস!
কক্ষের কেউ তালহারকে না চিনলেও তন্ময় ঠিকই চিনল তাকে। সে একবার দেখেছিল যখন বিন্দু আপু তাদের অন্য কোচিং এ ক্লাস করাত। সে মৃদু অবাকের সুরে বিন্দুকে বলল,
“আপু উনি?”
বিন্দু তার প্রশ্নবিদ্ধ চোখের পানে তাকালো। স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“উনি একজন সিনিয়র ইন্টেলিজেন্স অফিসার। আমাদের সাহায্য করতে পারবেন।”
তন্ময় মাথা দোলালো। কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস হলো না। একজন প্রতারক এখনো কেন তার সাথে জুড়ে আছে?
“কিন্তু স্যার বলেছে আমি যদি আইনের সাহায্য নেই তবে সে আমার অবস্থা খারাপ করে দেবে আপু।”
অনু আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে উঠল। বিন্দু রেগে কিছু বলার আগেই তালহার শান্ত স্বরে তাকে বলল,
“নিশ্চিন্তে বাড়িতে গিয়ে একটা ঘুম দাও আর ঘুম থেকে উঠে পরীক্ষার প্রস্তুতি নাও। ওই শিক্ষককে তুমি আর কখনোই তোমার জীবনের আশেপাশেও দেখবে না। এমনকি তোমার কলেজেও না।”
অনুর চোখে খুশির ঝিলিক।
“সত্যি স্যার?”
তালহার নীরবে মাথা দোলালো। অনু বলল,
“কিন্তু আপনি তো অনেক বড় অফিসার। আপনাকে দেয়ার মতো ফিস আমার কাছে নেই।”
তন্ময়ের বেজায় মেজাজ খারাপ হলো। এই মেয়ের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া ছাড়া সব বুদ্ধি আছে। তালহারের চোখে মৃদু উজ্জ্বলতা দেখা গেল। সে ঘাড় কাত করে তাকালো বিন্দুর শক্ত মুখপানে। বলল,
“ফিসের চিন্তা করো না। ফিস তোমাদের আপু দিয়ে দেবে।”
“আপু কেন দেবে? আর আপনি শুধু শুধু কেন আমায় সাহায্য করছেন?”
অনু অবুঝ কণ্ঠে শুধালো।
এই পর্যায়ে তালহার মাস্ক খুললো। আঁটসাঁট চোয়াল, ফর্সা মুখে ছেঁটে রাখা কালো কুচকুচে দাঁড়ি, সরু দুটি হ্যাজেল ব্রাউন চোখ ঠিক যেন রেনেসাঁ যুগের কোনো ইতালীয় চিত্রকরের ক্যানভাস থেকে উঠে আসা এক নিখুঁত পুরুষালী অবয়ব। সকলে কিয়ৎকাল তার পুরুষালী সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে গেল।
তালহার স্মিত হেসে বলল,
“আমি তোমাদের আপুর হাজব্যান্ড। তোমার আপুর বোধহয় সাহস হচ্ছে না আমার পরিচয় দেয়ার। তাই আমিই দিলাম। তোমরা আমারো ছোট ভাই বোনের মতো। সব বিপদে আমায় পাশে পাবে ইনশাআল্লাহ। এখন ওই প্রফেসরের ডিটেইলস দাও।”
অনু সহ সকলে হাঁ হয়ে বিন্দুর দিকে তাকালো। আপুর হাজব্যান্ড উনি? তবে আপু কেন বলে সে ডিভোর্সি? তবুও কেউ টু শব্দটি করল না। আর না বিন্দুর মাঝে কোনো উদ্বেগ দেখা গেল।
অনু জড়তা নিয়ে সকল ডিটেইলস দিল। তালহার মৃদু হেসে বলল,
“এখন তোমরা বাড়িতে চলে যাও। নিশ্চিন্তে নিজেদের কাজে মনোযোগ দাও।”
“আপনি কী সত্যি বলছেন স্যার?”
অনু আবারো ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল। তালহার স্মিত হেসে তার মাথায় হাত রাখল। বলল,
“এমন কেস সলভ করা আমাদের আধা ঘন্টার কাজ। এত চিন্তা করো না। আগামীকালকের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নাও। আর মাথা উঁচু করে পরীক্ষার হলে যাবে।”
শত ভয় যেন এক নিমিষেই মিলিয়ে গেল। অনু চোখ মুছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বেরিয়ে গেল বন্ধুদের সাথে। রুম খালি হতেই বিন্দু তার সামনে এসে দাঁড়ালো। চোখে চোখ রেখে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তালহার পেশাগত কণ্ঠে কাটকাট সুরে বলল,
“আপনার কাছে দশ মিনিট সময় আছে, মহামান্য। এডভান্স হিসেবে সুন্দর করে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খাবেন ঠিক ঠোঁটে। দশ মিনিট অতিক্রম করলে কিন্তু আমি এডভান্স গ্রহণ করব না আর এই কাজ ও করব না।”
বিন্দু আশ্চর্য না হয়ে পারল না। চাপা আক্রোশের সাথে বলল,
“আপনি আমার সাথে প্রতিশোধ নিচ্ছেন? আমি আপনার থেকে যত দূরে যেতে চাচ্ছি, আপনি আমায় তত যন্ত্রণা দিতে চান, তাই তো?”
তালহার নির্বিকার পিছে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে ঘাড় শক্ত করে বলল,
“আপনার কাছে সাত মিনিট আছে। সময় অতিক্রম করলে আমি কিন্তু কোনোভাবেই কাজ করব না। আর আপনি জানেন আমি যা বলি তা করেই ছাড়ি।”
বিন্দু রাগে টলটলে নেত্রে বলল,
“কখনো ভাবিনি আপনার এই রূপগুলোও দেখতে হবে।”
“আমিও ভাবিনি। কিন্তু আপনি জোর করে আমার এই রূপ গুলো নিজের সামনে এনেছেন। আর ছয় মিনিট।”
বিন্দু আর তর্কবিতর্ক করল না। এগিয়ে তালহারের বুটের উপর নিজের দুই পা রেখে গলা জড়িয়ে ধরল। অনুভূতিহীন ঠোঁট ছোঁয়ালো রুক্ষ ওষ্ঠপানে। কিন্তু মুহুর্তেই সে অনুভব করল ছুঁয়েই দূরে সরে আসার পরিকল্পনাটা একদম ভেস্তে গিয়েছে। কোমরে আঁটকে গেল দু’টো শক্তপোক্ত বেরিবাঁধ। একে অপরের ওষ্ঠদ্বয়ের শৌখিন বোঝাপড়া অচিরেই ক্ষিপ্ত বোঝাপড়ায় পরিণত হয়েছে। একটাসময় সকল জেদ, রাগ ক্লান্ত ভঙ্গিমায় মিলিয়ে গেল। বিন্দুর বদ্ধ চোখের পল্লব ভিজে উঠল। শুরুটা সে করলেও শেষটা তালহার মুজাহিদ করেছে।
বিন্দু রাগে দুঃখে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শক্ত হাতের মুঠোয় তখনো তালহারের কোটের কলার। তালহার দৃষ্টি নত করে। একহাতে নারীটিকে আগলে নিয়ে অন্য হাতে তার কপালে পড়া এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিল। তার দৃষ্টিতে এখন আর আগের মতো কঠোরতা নেই, নেই কোনো গাম্ভীর্যতা। আছে শুধুই দিনশেষে বিন্দুর কাছে ফেরা সেই চিরচেনা তালহার মুজাহিদের শীতলতা।
বিন্দু মুখ তুলে তাকায়। দু’জনের দৃষ্টি মিলতেই বিন্দু ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলল,
“এডভান্স এটা হলে আসল ফিস কী?”
চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিতে দিতে তালহার স্মিত হাসল। মাথা নুইয়ে রাগান্বিত নারীটির ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“অনেকদিন পেট ভরে ভাত খাইনা। কবির সন্ধ্যায় বাজার দিয়ে আসবে। মন দিয়ে রান্না করবে। আমি রাতে আসব। রান্নার উপর যেন রাগ ঝাড়া না হয়।”
বলেই সে ছেড়ে দিল। পুনরায় মাস্ক সানগ্লাস আর পিক্যাপ পড়ে সতর্কতার সাথে বেরিয়ে গেল কোচিং থেকে। বিন্দু চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল সেথায়। তালহারের উপর রাগটুকু বিলীন হয়ে যায় অনুর কথা ভেবে। যেভাবেই হোক না কেন অনুকে তো বিপদ থেকে বাঁচাতে পেরেছে। আর যাই হোক তালহারের যোগ্যতার উপর তার কোনো সন্দেহ নেই। ঘরে যে সাজিয়ে রাখা তালহারের অজস্র অর্জন।
টর্চার সেলের গুমোট নীলচে আলোয় আলোকিত কক্ষটিতে সূর্যের এক ছটা আলো তো দূরের কথা, সতেজ হাওয়াও ঢুকতে পারছে না। প্রফেসর জুলফিকার আহমেদ বদ্ধ অবস্থায় অনবরত গুঙিয়ে যাচ্ছেন। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে সে পুনরায় গর্জে উঠল,
“আমায় কোন সাহসে একজন শিক্ষককে এখানে তুলে এনেছেন?”
তালহার মেহমেদকে নির্দেশনা দিচ্ছিল। জুলফিকারের গর্জনে সে চকিতে ফিরে তাকালো। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কী বললি? শিক্ষক?”
বলতে বলতেই সে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে সপাটে এক চড় বসালো। জুলফিকার মাথা তুলতে পারল না তন্মধ্যেই আরো চারটা চড় পড়ল তার দুই গালে। তার মাথা ঘুরতে লাগল। তালহার তার চোয়াল চেপে ধরে বলল,
“শিক্ষক না, বল লম্পট। স্টুডেন্টদের ব্লাকমেইল করা? উত্তেজনা বেশি তাই না? আজকে সব উত্তেজনা আমরা কমিয়ে দেব।”
“মেহমেদ কাজ শুরু করুন।”
তালহার চলে যায় রুমের বাইরে। মেহমেদ আর টর্চার সেলে কর্মরত লোকজন কাজ শুরু করল। একের পর এক বৈদ্যুতিক শকে জুলফিকার আহমেদ ক্রমেই নুইয়ে পড়লেন।
ঠিক গ্লাসের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা তালহার তখন ব্যস্ত ছিল তার ফোনের সকল ডেটা বের করার জন্য। কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করতে থাকা একজন কর্মকর্তা স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তালহারকে বলল,
“স্যার, ফোনে যা কিছু এভিডেন্স ছিল সব ফাইল আকারে ট্রান্সফার করে দিয়েছি আপনাকে।”
“গুড, সৈকত।”
বলেই তালহার ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘড়ি দেখল। দুপুর দুইটা বাজে তখন। সে আবার কক্ষের ভেতর ঢুকল। কক্ষের ঠিক মাঝবরাবর উল্টোভাবে ঝুলছে জুলফিকার। প্রায় অচেতন। সে হাত জাগিয়ে মারতে বারণ করল আর নামাতে বলল।
জুলফিকার কে আবার চেয়ারে বাঁধা হলো। তালহার তার সামনের চেয়ারে পা তুলে বসল। জিজ্ঞেস করল,
“কত মেয়ের সাথে এমন কাজ করেছিস?”
জুলফিকারের ঠোঁটের কোনা বেঁয়ে রক্তমিশ্রিত লাল গড়িয়ে পড়ছিল। সে আধো আধো নয়ন মেলে তাকায়। হিসহিসিয়ে বলল,
“তুই কে? তোর চৌদ্দ গুষ্টির জীবন যদি আমি জাহান্নাম না বানিয়েছি তবে আমার নাম জুলফিকার না। আমি কে জানিস না তুই। আমার কিছু হলে…”
তার বাক্যটি শেষ হওয়ার আগেই তালহার ক্ষিপ্ত হাতে তার চোয়াল বরাবর এক ঘুষি মারল। কলার চেপে ধরে মাথা নুইয়ে বলল,
“ভেবেছিলাম তোর দম ফুরিয়েছে। অপরাধ স্বীকার করে ভালো পথে চলে এলে আমি তোর ইমেইজ বাঁচিয়ে দিতাম। তুই শালা ফুট! কতদিনে সূর্যের আলো দেখিস তা আমি দেখে নেব। আমার চৌদ্দ গুষ্টির কথা ভুলে যাবি।”
সে বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। ফোন লাগায় সাংবাদিক ‘এস’ লেখা নাম্বার টিতে। রিসিভ হতেই বলল,
“শাজিদ, আপনার বিকালটা চমৎকার কাটানোর জন্য একটা চমৎকার নিউজ আছে।”
শাজিদ ফিচলে হেসে বলল,
“আপনি যখন বলেছেন তখন নিশ্চয়ই চমৎকার হবে স্যার। তাড়াতাড়ি পাঠান।”
“একদম ফুল ডিটেইলস প্রকাশ করতে হবে শাজিদ। উপর মহল থেকে যতক্ষণে আদেশ আসবে ততক্ষণে মিডিয়ায় এটা ছড়িয়ে পড়বে। এরপর চাইলেও সরাতে পারবে না।”
শাজিদ নির্বিকার বলল,
“আরে স্যার, উপর মহলের চাপ না নিতে পারলে আজ এত বছর এই কাজে থাকতে পারতাম না। আপনি পাঠান। কোন জমিদার আমি তার শেষ দেখে নেব।”
তালহার মৃদু হেসে তাকে ধন্যবাদ জানালো। শাজিদ তার কাজে সাহায্য করছে বছর দুই হবে। বেশ জনপ্রিয় এক সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করে সে। সবচেয়ে চমৎকার যেই গুণটি আছে তা হলো অকুতোভয় আর সৎ।
অনু কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। অতিরিক্ত চিন্তা আর ভয়ে তার জ্বর এসেছে। সে কোনোভাবেই নিজেকে সামলাতে পারছে না।
তার মা জলপট্টি সরিয়ে নিয়ে বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বললেন,
“পরীক্ষার আগে ওনার যতসব জ্বর এসে হাজির হয়। সব বাহানা! সারাবছর বই পড়বে না আর পরীক্ষার সময় ভয়ে অসুস্থ হয়ে পড়বে। পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে দিতে হয়।”
অনুর বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
“আহ্, মেয়েটার জ্বর আর তুমি কেমন আচরণ করছ? কেউ কী ইচ্ছে করে জ্বর আনে?”
“তোমার মেয়ে ইচ্ছা করেই আনে।”
অনুর মা খেকিয়ে উঠে বলল। অনু ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। বাবা মাকে কী করে বলবে তার প্রতিটা মুহুর্ত কী বিভৎস কাটছে। অনুর বাবা পাশের বসার ঘরে গিয়ে বসলেন। টিভি ছেড়ে খবর দেখতে লাগলেন। তখুনি সংবাদমাধ্যমে বলতে শুরু করল প্রফেসর জুলফিকার আহমেদ নামক এক প্রফেসরের কীর্তিকলাপ। অজস্র ভিডিও, নোংরা মেসেজ, ছাত্রীদের করা ব্ল্যাকমেইল সবকিছুর প্রমাণ একে একে টিভির পর্দায় উঠে আসল। প্রতিটা ভিডিওতে ভিক্টিমকে না দেখা গেলেও জুলফিকার আহমেদকে স্পষ্ট দেখা গেল।
সবশেষে জানালো প্রশাসন তাকে দ্রুত আইনের আওতায় নিয়েছে এবং চাকরি থেকে বহিস্কার করা হচ্ছে।
নিজের ঘর থেকে সেই খবর শুনে অনু অবিশ্বাস্য বদনে ছুটে বের হলো। বসার ঘরে যেতেই তার বাবা অবাক হয়ে বলল,
“উনি না তোদের ডিপার্টমেন্ট হেড।”
অনু জবাব দিল না। সে নির্বাক ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে টিভির পর্দায়। অনুর বাবা পুনরায় মেয়েকে ডাকলেন,
“এই অনু। উনি এইসব করতেন? তোকে কখনো বিরক্ত করেনি তো?”
অনু এবারেও জবাব দিতে পারল না। বরং তার বাবাকে অবাক করে দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার বাবা ছুটে এসে মেয়েকে আগলে নিলেন।
“কী হলো, কী হলো? কাঁদছিস কেন? শরীর বেশি খারাপ করছে?”
অনু কাঁদতে কাঁদতে না বোধক মাথা নাড়লো। একটা নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে লেপ্টে গেল বাবার বুকে। ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলল,
“আমার শরীর একটুও খারাপ করছে না আব্বু। বরং অনেক ভালো লাগছে। আমার জ্বর ভালো হয়ে গিয়েছে, দেখো আব্বু।”
অনু বাচ্চাদের মতো হাসতে হাসতে বাবার হাতটি কপালে ঠেকালো। তাপে পুড়ছে মেয়েটির দেহ। অথচ সে বলছে জ্বর ভালো হয়ে গিয়েছে। অনুর বাবা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
আর অনু?
যেন বহুদিনের ডানা-ভাঙা পাখিটি হঠাৎ নতুন ডানা ফিরে পেয়েছে। বুকভরা অবর্ণনীয় আনন্দ, মুক্তির উচ্ছ্বাস আর নতুন কলঙ্কহীন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সে আকাশের বুকে ডানা মেলে উড়ে চলল। একসময় যে কলঙ্কের কালো ছায়া তাকে গ্রাস করেছিল, তা ধীরে ধীরে সময়ের স্রোতে মুছে যাবে। সম্মান হারিয়ে ফেলায় আর কোনো ভয় নেই। অতীতের সব পঙ্কিলতা, অপবাদ আর যন্ত্রণাকে পেছনে ফেলে আজ সে সম্পূর্ণ মুক্ত—নিজের আলোয়, নিজের আকাশে।
কোচিং গ্রুপে সকলে তখন জয়েন ভিডিও কলে। অনু আনন্দে রীতিমতো লাফাচ্ছে। তন্ময় সহ বাকি চৌদ্দজনের মুখে প্রগাঢ় হাসি। বিন্দু বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সকলের উল্লাস দেখল আর বুকভরে দোয়া করে দিল। জীবনের প্রতিটা বাঁধা পেরিয়ে তারা এভাবেই মুক্ত পাখির মতো উড়ুক।
কিন্তু সে? না আছে মুক্তি আর না আছে স্বস্তি। সে কোথায় একটু শান্তি খুঁজবে? যার মাঝে শান্তি খুঁজত সে যে আজ ভীষণ অচেনা। সে এই তালহারকে সত্যিই চেনে না। হয়তো কোনোদিন সংসারের চার দেয়াল ছাপিয়ে সে তালহারকে দেখেইনি। তাই চিনতে পারছে না।
রাত তখন প্রায় নয়টা। বিন্দু তখনো পড়াশুনা করছে। কিন্তু ইদানিং সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হলো তার ইউরিনের বেগ বেড়েছে। দুই মিনিট পর পর ইউরিনের চাপে সে ত্যক্ত। বারবার চেয়ার টেবিল ছেড়ে উঠতে তার ভীষণ অলসতা অনুভব হয়। শরীরটা ইদানিং বেশ আরামপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন আর সংসারের ভার নেই যে!
ওয়াশরুম থেকে বের হতেই তার দৃষ্টি মলিন হয়ে যায়। রুমের এক কোনায় কবিরের রেখে যাওয়া বাজারগুলো সেভাবেই পড়ে আছে। তার কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয় তালহারের অবসাদগ্রস্ত কণ্ঠ।
“অনেকদিন পেট ভরে ভাত খাইনা।”
এতটুকু বাক্য বিন্দুর মস্তিষ্কে প্রদাহ বাড়াতে লাগল। সে চাইলেই উপেক্ষা করতে পারে না ওই মানুষটাকে আর তার আবদারকে। অথচ বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে।
নিজের উপর হাসল বিন্দু। আর পড়তে বসল না। বরং কোমরে ওড়না বেঁধে বাজারগুলো ঘাঁটতে লাগল। সেখানে অর্ধেক তালহারের পছন্দের খাবার রয়েছে আর অর্ধেক তার পছন্দের।
সে তালহারের পছন্দের খাবারগুলোই রান্না করতে নিলো। দুই ধরণের মাছ আছে সেখানে। মাছ কাটতে গিয়ে তার মনে হলো আজকে মাছ থেকে একটু বেশি আষ্টে গন্ধ আসছে। কিন্তু তালহার তো কখনো মরা মাছ কিনবে না। তবে মাছ থেকে এত গন্ধ কেন আসছে? সে নাক মুখ কুঁচকে মাছ কেটে রান্না করল, কালো জিরা ভর্তা করল, গরুর মাংস রান্না করল, সাথে গরম ভাত। এগুলো রান্না করতে করতেই বারোটা বেজে গেল। বিন্দুর শরীরে আর কুলোয় না। সে ধপ করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আর রান্না করতে পারবে না। যা পেরেছে তাই খাবে নয়তো না।
সে শোয়ার পনেরো মিনিটের মাথাতেই কলিং বেল বাজল। দরজা খুলতেই ভেসে উঠল ক্লান্ত একটি মুখ। তালহার কোনোরূপ ভূমিকাহীন ভেতরে ঢুকে তার হাতে গায়ের কোর্টটা ধরিয়ে দিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
বিন্দু কোর্ট হাতে কপাল কুঁচকে তাকালো ওয়াশরুমের পানে। এই লোক তার শান্তির নীড়টাকে দিনে দিনে নিজের সংসার বানাচ্ছে। সে রেগেমেগে দরজা আঁটকাতে যাবে তখুনি তার পায়ে নরম কিছুর ছোঁয়া লাগল। বিন্দু পায়ের দিকে তাকাতেই তার চোখমুখে উচ্ছ্বাস নেমে এলো। প্রিশা পা গুটিয়ে বসে আছে সেথায়।
“প্রিশা? মাম্মি?”
বিন্দু অস্ফুট স্বরে বলেই খপ করে তাকে কোলে তুলে নিলো। তার চোখদুটো অচিরেই ছলছল করে উঠল। সে উন্মাদের মতো প্রিশার চোখেমুখে চুমু দিতে লাগল। ঘর ছেড়ে আসার সময় এই একটা প্রাণের জন্য তার করুণা হয়েছিল ভীষণ! তার একাকী জীবনে সন্তানের অভাব পুরণ করত এই ছোট্ট প্রাণীটি।
বিন্দু উল্লাসে মেতে উঠল। সে প্রিশাকে আদর করতে করতে বলল,
“আমার মা কেমন আছে? মাম্মিকে কী চিনেছ? দুপুরে কী খেয়েছিলে? পেটে তো কিছু নেই। মাম্মির হাতে খাবে?”
প্রিশা একটা মেয়ে। আদুরে মেয়ে যাকে বলে। সে পনেরোদিন বয়স থেকে বিন্দুর সাথে থাকে। সে কী করে তার মাকে ভুলে যাবে? এই মায়ের অপেক্ষায় অপেক্ষায় যে তার দিন কাটত। প্রিশা নিরুদ্বেগ বিন্দুর গাল গলা চাটতে লাগল। আর বিন্দু ছলছল নেত্রে তাকে খাওয়াতে লাগল।
তালহার বের হলো দশ মিনিট বাদ। ।তার পরনে সাথে করে আনা টিশার্ট ট্রাউজার। তখন মেঝেতে সুসজ্জিত লোভনীয় সব খাবার। আর শীতল পাটির এক কোনায় মা মেয়ে বসে খাচ্ছে। সে সোজা গিয়ে বসে পড়ল তাদের পাশে। নির্বাক খেতে শুরু করল। বিন্দু আড়চোখে তাকে দেখে প্রিশার পাতে আরো কিছু মাছ মাংস তুলে দিল।
কিন্তু সে নিজে ওসব কিছুই খেলো না। সে তার দুপুরের রান্না করা ডাল ভাত লেবু কচলে খেয়ে উঠে গেল। তালহার একমনে খেতে খেতে তার কার্যকলাপ অবলোকন করল আর চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। খাবারের সাথে আবার কিসের রাগ?
প্রিশা আর তালহার কে চেনে না। সে লেজ নাড়াতে নাড়াতে মায়ের পিছু পিছু চলে গেল। বিন্দু হাত মুখ ধুয়ে এসে তালহারের উদ্দেশ্যে কঠোর গলায় বলল,
“খেয়েদেয়ে চলে যাবেন। আমায় এক কথা দ্বিতীয়বার বলা লাগে না যেন।”
বলেই সে রুমে ঢুকে গেল। ভাঙা দরজা চেয়ার দিয়ে আঁটকে রাখল। নিজের বিছানায় শুয়ে প্রিশাকে বুকের উপর রাখল বিন্দু। আদর করে বলল,
“মাম্মির কাছে ঘুমাও। ওই খচ্চর লোক একা চলে যাক।”
প্রিশা মায়ের বাধ্যগত মেয়ে। সে বুকের উপর চার পা গুটিয়ে শুয়ে রইল। আর বিন্দু মুখের উপর বই ধরে মনোযোগ সহকারে পড়তে লাগল। কিন্তু আদোতেই তার মনোযোগ সেখানে রয়েছে?
ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় চেয়ার দিয়ে চাপিয়ে রাখা দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে ফেলল তালহার। বিন্দু চকিতে মুখের উপর থেকে বই সরায় চেয়ারটা উল্টে পড়ে যেতেই। গর্জে উঠে বলল,
“এটা কোন ধরণের আচরণ? আপনি এখানে কী করছেন? আপনাকে না বাড়িতে যেতে বললাম?”
তালহার ভ্রু কুঁচকে এদিক ওদিক তাকালো বৈদ্যুতিক সুইচগুলো দেখতেই তার দৃষ্টি স্থির হলো। সে গটগট করে হেঁটে গিয়ে লাইট অফ করে দিল। বিন্দুর রাগ এবার তুঙ্গে।
“বারবার আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না, তালহার। আপনি রান্না করতে বলেছিলেন, আমি করেছি। এখন চুপচাপ নিজের ঘরে যাবেন।”
বিন্দু নড়তে পারছিল না বুকের উপর ঘুমিয়ে থাকা প্রিশার কারণে। কিন্তু প্রিশার জন্য তার মনে উপচেপড়া মায়া থাকলেও, তালহার নামক কট্টর ব্যক্তির একটু কম মায়া ছিল।
তালহার নির্বাক এগিয়ে এসে প্রিশাকে বিন্দুর বুক থেকে সরিয়ে পাশে শুইয়ে দিল। আর নিজে বিন্দুর বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। বিন্দুর হাত দু’টো টেনে নিজের মাথায় টেনে নিয়ে তালহার চোখ বন্ধ করে নিলো। শ্রান্ত কণ্ঠে আদেশের সুরে বলল,
“আই নিড সাম স্লিপ। হাত সরাবে না মাথা থেকে।”
বিন্দু শক্ত হয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু তার চোখ টলটল করছে। এটা তার জন্য নতুন নয়। বিগত তিন বছর তালহারের দিনের শেষ এভাবেই তার বুকে হতো। আর তার মনে হতো সে পুরো দুনিয়া জিতে গিয়েছে। কিন্তু সেটা নিছকই ভ্রম ছিল। সে ধিমি কণ্ঠে বলল,
“একজনকে ভালোবেসে আরেকজনের বুকে মাথা রেখে শুতে একটুও দ্বিধাবোধ হয় না, তালহার?”
তালহার নিরুত্তর। ক্লান্ত বিন্দুর চোখের কার্নিশ বেয়ে নোনাজল গড়ালো। অনুনয়ভরা কণ্ঠে বলল,
“এতটা নির্লিপ্ত থাকবেন না, তালহার। বুকে জমা শেষ আশাটুকু যদি ঘৃণায় পরিণত না হোক। একবার ঘৃণা জন্মালে ভালোবাসার আর মূল্য থাকবে না তালহার।”
কিন্তু বরাবরই কোনো হুমকি তালহার মুজাহিদকে কাবু করতে পারে না। না কর্মক্ষেত্রে আর না ভালোবাসার ক্ষেত্রে। সে শুধু এতটুকু জানে কী করে নিজের ভাগে ষোলো আনা ঠিক রাখা যায়। বুকে আঁছড়ে পড়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস। মিনিটের মাঝেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় তালহার। যেন বহুদিনের ঘুম পুষিয়ে নিচ্ছে।
আর বিন্দু? তার মন একটু একটু করে বিষিয়ে যেতে লাগল। মানুষটার কাছে কী তার কোনো অনুভূতির বিন্দুমাত্র মূল্য আছে?
পরদিন চোখ খোলার পর আর তালহারকে পেল না বিন্দু। কিন্তু প্রিশা তার পাশেই শুয়ে ছিল।
দুদিনে আর দেখা হলো না। বিন্দুর নিবন্ধনের পরীক্ষার সময় এগিয়ে এসেছে আর তার ব্যস্ততাও ততটাই বেড়ে গিয়েছে। তালহার মুজাহিদকে সে সাময়িক ভুলে গেল।
মেঘ মা মরা এক ছন্নছাড়া উদাসীন মেয়ে। আদর বলতে চাচি আর পরিবারের সব পুরুষদের থেকেই পায়। যা তাকে আহ্লাদী, বেপরোয়া বানিয়েছে। কিন্তু তবুও কোথাও না কোথাও একটা শূন্যস্থান থেকেই যায়। মেয়েটি চাতক পাখির মতো এমন কারোর ভালোবাসা চায় যার পুরো পৃথিবী হবে সে। দিনশেষে মেঘ নাম চঞ্চল পাখিটিকে বুকে জাপ্টে ধরে বলবে,
“এত দুষ্টুমি করো না। এখন আমার বুকে ঘুমাও।”
আর তার এই শূন্যস্থান টি পূরণ করার স্বপ্নকে আরো জোরদার করে তালহার মুজাহিদের আগমন। তালহার তার স্বপ্ন পুরুষ হয়ে আসে। যাকে সে কোনোভাবেই হারাতে চায় না। তাই তো বন্ধুত্বের মাত্র দুই মাসের মাথায় সে তালহারকে বিয়ের কথা বলে। তালহার তখন স্মিত হেসে নাক করে বলে,
“আমরা খুব ভালো বন্ধু। এটাই সুন্দর!”
তখন মেঘ গম্ভীর গলায় বলেছিল,
“একটা মেয়ে আর একটা ছেলে কখনো বন্ধু হয় না। চলো বিয়ে করি তারপর ভালো বন্ধু থেকে ভালো জীবনসঙ্গী হয়ে উঠব।”
প্রেক্ষিতে বরাবরের মতোই তালহার নীরব থাকে। আর এখন এই বিয়ের টপিক মেঘের মুখে লেগেই থাকে।
সেদিন বৃহস্পতিবার। নীলক্ষেতের ফুটপাতের বইয়ের দোকানগুলোতে মৃদুমন্দ ভীড়। পিক্যাপ, মাস্ক আর সানগ্লাস পরিহিত তালহার গাড়ি থেকে নেমে সোজা হাতের ডান দিকের এক সাড়িতে এক ঝাঁক দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।
সাড়ির দ্বিতীয় দোকানের সামনে বোরখা পরা একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে বই দেখছে। সে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। চিরচেনা সুবাসে মেঘ চকিতে পাশে ফিরে তাকালো। নিকাবের আড়ালে তার চোখের উজ্জ্বলতা বাড়তে লাগল। তালহার কপাল কুঁচকে বলল,
“এ কী তুমি আবার কবে থেকে বোরখা পরতে শুরু করেছ?”
“যখন থেকে তোমার মতো মানুষকে ভালোবেসেছি। আমার বাড়ির লোক যদি জানে আমি কোনো গোয়েন্দাকে ভালোবাসি তবে আমায় মেরে ফেলবে। তাই এখন থেকে তোমার সাথে যেদিন দেখা করব সেদিন বোরখা পরে আসব।”
তালহারের মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল।
“আমার সাথে কেন দেখা করতে হবে?”
“কারণ আমরা…
“আমরা খুব ভালো বন্ধু, মেঘ।”
মেঘ ফোঁস করে বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলল।
“জানি জানি! কিন্তু একজন ভালো বন্ধুই একজন ভালো জীবনসঙ্গী হতে পারে।”
তালহার ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
“কেন ডেকেছো?”
“চমৎকার খবর দিতে। তুমি কী জানো বাবা আসছে এই সপ্তাহে। আশা করা যায় আমি দ্রুতই তোমার রিসার্চের প্রয়োজনীয় তথ্য এনে দিতে পারব। আর তোমার প্রমোশন হয়ে যাবে শিঘ্রই।”
“আমি জানি।”, তালহার নিরুদ্বেগ বলল। মেঘ কৌতুহলী গলায় বলল,
“কীভাবে?”
“তোমার বাবা একজন জনপ্রিয় নেতা।”
“তা অবশ্য ঠিক।”, মেঘ ভাবুক কণ্ঠে বলে আবার বই দেখতে শুরু করল। সে কিছু বই নেয়ার জন্যই এসেছে। সেদিন মেহমেদের ফালতু কথায় তার বেজায় মেজাজ খারাপ হয়েছিল। কিন্তু আজ তা আর নেই। তালহারের স্ত্রী থাকবে কী করে? যদিও তালহারের ঘর দেখে তার এক মুহুর্তের জন্য মনে হয়েছিল ওটা কোনো মেয়ের যত্নে গড়া সংসার!
সে কিছু বই নিলো। পে করতে গেলে তালহার তাকে থামিয়ে দিল। আর নিজেই বিল দিয়ে দিল। মেঘের মুখে হাসি ফুটে উঠল। তালহার যতক্ষণ তার সাথে থাকে তার খুঁটিনাটি সব দিকে খেয়াল রাখে। এইযে না বলতেই কেমন দায়িত্ববান সঙ্গীর ন্যায় তার বিল দিয়ে দিল। যেন এটা তার দায়িত্ব।
বিল দিতে গিয়ে তালহার নিজেও কিছু বই দেখল। মেঘ বলল,
“তুমি বই পড়ো?”
“নাহ।”, তালহার একটা বই হাতে নিতে নিতে জবাব দিল। “দ্য কাইট রানার” বইটির নাম। বিন্দু বই পড়তে ভালোবাসে। সে ওটা নিয়ে নিলো।
“এটা তবে কার জন্য নিয়েছ?”
“আমার একটা বুকশেলফ আছে সেটার জন্য।”
“সাজিয়ে রাখার জন্য?”, মেঘ বিদ্রুপ করে বলল। তন্মধ্যেই তালহারের ফোন বাজলো। কবিরের ফোন। তালহার ব্যস্ত ভঙ্গিতে রিসিভার কানে ঠেকায়।
“হ্যাঁ কবির, বলো।”
কিন্তু তাকে মৃদু ভড়কে দিয়ে কবিরের আতঙ্কগ্রস্ত কণ্ঠ ভেসে আসল।
“স্যার, আপনি এই মুহূর্তে যেখানে আছেন সেখান থেকে দ্রুত সরে যান।”
তালহার কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন কী হয়েছে?”
“প্রশ্ন করার সময় নেই স্যার। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরুন। নয়তো এ জীবনে আপনার ঘর সংসার আর করা হবে না।”
ঘর সংসার শুনতেই তালহার কিছুটা চমকালো। কিন্তু তার মুখশ্রী আগের মতোই শান্ত ছিল। সে কোনোপ্রকার বিচলন ছাড়াই দ্রুত ফোন কেটে ফোনের আরেকটা ইন্টারফেস বের করল। ভেসে ওঠা ইন্টারফেসে ট্রাকারের লাল দাগটি নীলক্ষেতের ঠিক সেই জায়গাটি নির্দেশ করছে, যেখানে এই মুহূর্তে সে আর মেঘ দাঁড়িয়ে আছে। তালহার চোখ বন্ধ করে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। বিরক্তি নিয়ে আওড়ালো,
“ওহ্ শিট!”
সে চোখ খুললো আর ধীরস্থির পিছু ঘুরে তাকালো। ভীড় পেরিয়ে ঠিক পাঁচ হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটির উপর তার দৃষ্টি স্থির হয়। সে আজ লাল টুকটুকে শাড়ি পড়েছে। তাকে দেখতে ঠিক এক টুকরো জ্বলন্ত লাভার মতো লাগছে।
জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৯
বিন্দু হাতের ক্লাচারটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি। বেদনাভরা চাহনি। শেষ আশাটুকু ও শেষ হয়ে যাওয়ার গ্লানি চোখেমুখে। লোকটা কত যত্ন, ভালোবাসার সাথে তার সঙ্গে প্রতারণা করে!
