লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২০
নুসাইবা আরা নুরি
সকাল পেরিয়ে ধরনীতে সন্ধ্যা নামলেও জ্বর৷ কমেনি ইরুর।মাথা যন্ত্রনায় কপালে শিরা গুলো বার বার ফুলে উঠছে।গলা শুকিয়ে এসেছে।টেবিলের উপর বোতলে পানি তবে তা নিয়ে খাওয়ার ক্ষমতা নেই ইরুর।কিছুক্ষন আগেই জ্ঞান ফিরেছে যেভাবে পড়েছিলো সেভাবেই পড়ে আছে।
ইরু কাদতে পারে না।কাদলে পেটে অসম্ভব ব্যাথা লাগছে কাল সন্ধ্যা থেকে কিছুই না খাওয়ার ফলে ইরুর প্রচন্ড খিদে লেগেছে।গলায় এক্টু সর নেই।ইরু কাদে তার এই নির্মম ভাগ্যর জন্য বেচে থাকার ভিষন শখ তার।কিন্তু তার সৎ মা তো আর তাকে বাচতে দিবে না।সে যখন বলেছে খেতে দিবেনা তার মানে দিবেই না।এতে যদি ইরুর মৃত্যু হয় হবে।
ইরু নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজের শরীর টাকে টেবিলের কাছে নিয়ে গেকো।তারপর কাঠের টেবিলের পায়া ঝাকাতেই পানির বোতল টা কাত হয়ে গড়িয়ে পড়লো ইরুর মাথার উপর।ইরু বেদনায় কুকড়ে গেলো।তাও সহ্য করে বোতলে মুখ খুলে এক ঢোক পানি খেতেই বোতল এর পানি ইরুর নাকে মুখে পড়ে ভিষম লেগে যায়।কাশতে কাশতেই ইরু পেট চেপে ধরে গোটো হয়ে যায়।নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে যায় ইরু।আস্তে আস্তে আবারো নিস্তেজ হয়ে যায় শরীর।
ঘড়ির কাটায় রাত এগারোটা দশ।বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে যেতেই ইরু সৎ বোন ইমা দরজা তালা খুলে ভিতরে ঢুকে।এতক্ষন রোকেয়া খাতুন জেগে থাকায় সে আস্তে পারেনি।মা ঘুমাতেই ইমা চাবি চুরি করে এসেছে।এই বাড়িতে লুকিয়ে একমাত্র ইমায় ইরুকে ভালোবাসে।যদিও ইরু এটা জানে।তবে ইমা বাইরের আচরন দেখলে কেও বলবে না তার ইরুর প্রতি মায়া আছে কোনো।
ইমা ঘরে ঢুকে আবার দরজা লাগিয়ে দেয়।হাতে একটা শপিং ব্যাগ ইরুর থেকে তিন বছরের বড় সে।চট্রগ্রাম কলেজ এ অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে।কাল থেকে মায়ের অনাবিক অত্যাচার সে দেখেছে তবে প্রতিবাদ করেনি।কারন করলে রোকেয়া খাতুন আরো মারবে ইরু কে।
ইমা ধীর পায়ে ইরুর বিছানায় গিয়ে বসে মাটিতে সুয়ে আছে ইরু।চুল গুলো এলোমেলো।ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস চলছে।অচেতন অবস্থায় জরের ঘোরে কেপে কেপে উঠছে।ইমা ইরুকে কোনো মতে তুলে বিছানায়।ইরুর জামার হাতা ভিজে গেছে। এক মনে হলো চেঞ্জ করবে আর এক মনে মনে হলো না থাক।তাই আর করেনি।বিছানায় সুইয়ে ইরুকে নিজের সাথে উঠে বসালো।কতক্ষন ডাকার পর ইরু ঝাপসা চোখ জোড়া মেললো।আশে পাশে তাকাতেই ইমা ফিশফিশ করে বলল,
-ইরু।ইরু শুনতে পাচ্ছিস??
-হ্যা কে??
ইমা গায়ে হাত বুজতে পেরেছে গায়ে অসম্ভব জর।তাই আর দেরি না করে শপিং ব্যাগ এ আনা টিফিন বাটিটা বের করলো।খুব সামান্য পরিমান ভাত আর আলু ভাজি ওতে।যাতে রোকেয়া খাতুন বুজতে না পারে সেভাবে নিয়েছে।ইমা জান্তো ইরুর জর আসবে কারন প্রতিবার বৃষ্টিতে ভিজলে ইরুর জর হয়।যদি ইমা বাড়িতে থাকে তবে ইরুর আদর কপালে জোটে।নল্যতো এভাবে বিছানায় পড়ে না খেয়ে দিন কাটায়।
ইমা তাড়াতাড়ি ভাত মাখিয়ে ইরুর গালে তুলে দেয়।ইরু ওয়াক তুলে তা দেখে ইমা পানি খাইয়ে দেয়।খুব জোর করে কয়েক গাল ভাত খাইয়ে দিলো।তারপর আগে থেকে আনা ব্যাথার আর জ্বরের ওষুধ জোর করে খাইয়ে দিলো ইরুকে।তারপর ইরুর কপালে একটা চুমু খেয়ে শপিং এ ব্যাগ এ থাকা পাউরুটির প্যাকেট টা ইরুকে দেখিয়ে বিছানার দেয়ালের পাশের কোনায় তোশকের নিচে রাখলো যাতে রোকেয়া খাতুনের চোখে না পড়ে।তারপর ইরুর পানির বোতলে পানি ভোরে ইমা চলে গেলাও রুম থেকে যাওয়ার আগে ইরুর গায়ে খেতা দিয়ে দিয়েছে।
ঘরে তালা দিয়ে চাবি যেখানে ছিলো সেখানে রেখে বাটিটা সুন্দর করে ধুয়ে মুছে রেখে ইমা নিজের ঘরে চলে এলো উপরে সে পাষান হলেও ভিতরে সে ইরুর বড় বোনের মতোই।একজন বোন কি পারে তার ছোট বোন কষ্ট মেনে নিতে তাই রাতের আধারে উপকার টুকু করলো।ইরু ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখ দুটো খুলে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-দুনিয়ার সব সুখ তোমার হোক আপা।তোমার মতো বোন পেয়ে আমি আল্লাহর কাছে কৃতঙ্গ।আমি জানতাম তুমি আসবে।
ইরুর চোখ বুজে এলো।কথা গুলো জড়িয়ে এলো।সারাদিন খালি পেটে জরের ঘোরে অচেতন হয়ে ঘুমানোর ফলে এখন পেটে একটু খাবার পড়তেই আবারো চরম।ঘুম এসে ধরা দিলো ইরুর চোখে।ইরু দিন দুনিয়া ভুলে তলিয়ে গেলো ঘুমের দেশে।
রাত আটটার আগেই শ্রেয়সীকে বাড়িতে দিয়ে যায় মেহেরাজ।তখনও আলতাফ শেখ বাড়িতে ফেরেনি।তোহা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো সাথে খাদিজা খাতুন ও ছিলো।মেহেরাজ ভদ্রতার খাতিরে খাদিজা খাতুনকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে।খাদিজা খাতুন ভিষন খুশি হয় মেহেরাজের ব্যাবহার দেখে।মেহেরাজ কে বাড়ির ভিতরে ডাকলেও মেহেরাজ যায়নি।তাড়া দেখিয়ে চলে এসেছে তোহার হাতে শ্রেয়সী কে তুলে দিয়ে।আসার আগে শ্রেয়সী ইরুর দের বাড়িতে গেছিলো।তখন ইরুর মা বলছে ইরু নাকি নানা বাড়িতে বেড়াতে গেছে।তব শ্রেয়সীর বিশ্বাস হয়নি।শ্রেয়সী যতদুর যানে ইরু কোনোদিন ওর নানা বাড়িতে যায় না।তাহলে হটাৎ গেলো।বেশি না ভেবে চলে আসে আবার মেহেরাজের সাথে।
শ্রেয়সী কে রেখে মেহেরাজ সোজা ফাহিমদের বাড়িতে চলে যায়।সেখানে ফাহিমের আগেই তৈরি করে রাখা ফাইল টা নিয়ে নেয় মেহেরাজ।আজ শ্রেয়সীর ভুল ভাঙালো এবার আসল কাজ করবে।যেহেতু মেহেরাজের চতুর মন বলছে এর ভিতরে বিশাল ঘাপলা আছে সেহেতু আগেই সতর্ক থাকা ভালো।
ফাহিমের মা সাহিদা খাতুন রাতে খাবার খেয়ে যাওয়ার জমা অনুরোধ করলেও মেহেরাজ শোনে নি।কারন সে জানতো তার মা না খেয়ে বসে আছে তার অপেক্ষায়।আর রেস্টুরেন্টে খেয়ে এম্নিতেই মেহেরাজের পেট ভরে আছে তাই না খেয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায় মির্জা বাড়ির উদ্দেশ্যে।
ঘড়ির কাটায় রাত বারোটা। টিক টিক শব্দে তা জানান দিচ্ছে।মেহেরাজ বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো এতক্ষন।হটাৎ মেহেরাজের মোবাইলে ম্যাসেজের একটা নোটিফিকেশন আসে।মেহেরাজের ভ্রু জোড়া কুচকে যায় এতো রাতে কে নক দিলো।মেহেরাজ ল্যাপটপ বন্ধ করে মোবাইল হাতে নেই।তারপর লক খুলে ম্যাসেন্জারে প্রবেশ করতেই প্রথম আইডি টা চোখে পড়ে ❝ভুয়া পুলিশ❞ মেহেরাজের নাম টা দেখে ভিষন হাসি পেলো হুট করে।নিজেকে সামলিয়ে নিক নেম টা ডিলেট করলো এটা অনেক আগে দেয়া।নিক নেম ডিলেট করতে গিয়ে নিজের নামের দিকে চোখ যেতেই মেহেরাজের ভ্রু জোড়া আরো কুচকে গেলো।তোহা তার নাম সেভ করে রেখেছে ❝সাতার জানা সমুদ্রের প্রানী❞ লাইক সিরিয়াসলি সে প্রানি।বন্ধুর বোন বলে এমন অপমান।আর সে সাতার না জানলে নৌবাহিনীতে চাকরি কে দিলো।
মেহেরাজের ভাবনার মাঝেই আবারো মেসেজ আসার শব্দ হলো।মেহেরাজ নাম টা ডিলেট করে সিন করতেই তোহার করা ম্যাসেজ চোখে পড়লো প্রথমে সালাম দিলেও পরে লিখেছে,
-এই তোর সাহস কি করে হয় আমার নিকনেম ডিলেট করার??
মেহেরাজ একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।শ্রেয়সীর ভাবি ভাবতেই মেহেরাজ টাইপিং করলো,
-তার আগে বল তুই শ্রেয়সীর ভাবি মানে বুজলাম না কাহিনী কি??
মেহেরাজের ম্যাসেজ এ তোহা হাহা রিয়েক্ট দিয়ে বলল,
-তুই ভাই সমুদ্রে থাকিস ৩৬৪ দিন তুই কিভাবে কাহিনী বুজবি??
মেহেরাজ ভ্রু জোড়া আরো কুঞ্চিত করে বিরক্ত হয়ে টাইপিং করল,
-মজা করিস না।
-আচ্ছা ওয়েট গ্রুপে এড দেই তাহলে বুজবি আর দেখা করিস সব বলবো।
-কিসের গ্রুপ।
-ওয়েট।
ম্যাসেজ টা আসার সাথে সাথেই মেহেরাজ কে একটা ম্যাসেন্জার গ্রুপে এড দিলো।মেহেরাজ সেখানে ঢুকার পর আরো অবাক।সেখানে ফাহিম অলরেডি টেক্সট করছে।তুহিন আছে তোহা আছে আরো দুই তিন জন ফ্রেন্ড আছে তাদের।হাই স্কুল লাইফ এর একটা ফ্রেন্ড সার্কেল।যেহেতু মেহেরাজ একটু গম্ভীর সভাবের তাই সে এতটা গুরুত্ব রাখেনি।তবে বাকি সবাই ওকে মনে রেখেছে।
গ্রুপ থেকে বেরিয়ে মেহেরাজ তোহাকে ম্যাসেজ করে,
-তোরা সব এক সাথে আছিস কবে থেকে।আর আমি একমাত্র জানিনা।বাহ।
মেহেরাজ কথায় তোহা এবার সিরিয়াস হয়ে টাইপিং করে,
-আসলে দোস্ত এই আইডি আমি চালাই না।এটা সিক্রেট আইডি।আর আমি আগে জানতাম তুই শ্রেয়সীর হাজবেন্ড তবে ফাহিম এর কাছে তোর কথা শুনলাম তখন বুজে গেছি সব।আর বাকি টুকু আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি শ্রেয়সীর ভুল ভাঙাতে।আর দেখলাম তো আজ বাড়িতে আসার পর থেকে ননদিনী বেশ লজ্জা পাচ্ছে??
তোহার কথায়৷ মেহেরাজ বলে,
-তুই কবে বিয়ে করলি তুহিন তো বিয়ে করেনি।আর তোকে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলো আমাকে বললি ও না তোরা।
-আসলে বিয়েটা সম্পুর্ন পরিকল্পিত দোস্ত।তুই জানিস দেশের অবস্থা কি।আর আমরা গোপন একটা মিশনে আছি।সব বলবো তোকে সময় মতো।এখন শুধু মনে রাখ আমি তোর বউ এর বড় ভাবি মানে তোর ও ভাবি।সম্মান দে দোস্ত ভাবি ডাক।
-হুস।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৯
মেহেরাজ গ্রুপে ঢুকে সবার সবাইকে মেনশন দিয়ে ম্যাসেজ দিলো।এক এক করে সবাই সিন করা শুরু করলো।তোহা আর তুহিন এক বছরের ছোট ভাই বোন।তবে একই ক্লাসে পড়েছে।তবে তোহাকে দেখলে বোজা যায়না ওর বয়স কত।আর হাই স্কুল লাইফ থেকে তোহার সাথে মেহেরাজের বন্ধুত্ব যদিও মেহেরাজ এখন দীর্ঘ সময়ের জন্য সমুদ্রের থাকে তাই কথা হয় না বললেই চলে।তবে বন্ধুরা ওর বন্ধুরা ওকে ভুলে যায়নি।কিংবা মেহেরাজ ও কাওকে ভুলতে পারেনি।
