Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৯

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৯

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৯
নুসাইবা আরা নুরি

শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ নিজ থেকেই বলে,
-আমার কথায় মনে হয় আপনার আন ইজি ফিল হচ্ছে বা লজ্জা লাগছে।যদি আমার ধারনা ভুল না হয়।তাহলে বলতে পারেন প্রসঙ্গ বদলাবো।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী নিজেকে কিছুটা শক্ত করলো তারপর মেহেরাজের দিকে তাকালো।গভীর সমুদের ন্যায় চোখ জোড়া তার দিকেই সিমাবদ্ধ।শ্রেয়সী চোখ সরিয়ে নিলো।তারপর শান্ত স্বরে বলল,

-আসলে আমি মেয়েটা ছোট থেকে সবার আদরে বড় হয়েছি।কষ্ট কি বা কারোর খোচা মেরে বলা কথা কি তা কোনোদিন বুঝি নি।তবে আপনার সাথে যখন আমার বিয়ে হলো তখন কিন্তু বাবার কথাতেই রাজি হয়েছিলাম কারন বাবাকে যেমন ভয় পাই তেমন ভালোবাসি আমি।ভাইয়া বাবা আমাকে শাসন করলেও প্রচন্ড ভালোবাসেন এটা আমি অস্বিকার করতে পারবো না।আমি বিয়েটা করে নিলাম আপনাকে না দেখেই।তবে আপনি যখন আমাকে রেখে চলে গেলেন সেদিন বুজলাম খারাপ লাগা কি।আর আশে পাশের মানুষ গুলোর খোচা মেরে বলা কথা গুলো কতটা বেদনা দায়ক।আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে এমনকি পরিবার আমার চরিত্র নিয়েও কথা বলে সকলে।তাও অতটা খারাপ লাগেনি যতটা লেগেছিলো যখন দেখলাম আপনি ডিভোর্স পাঠিয়েছেন।যাকে কখোনো দেখলাম না কবুল বলে গ্রহন করলাম তাকে তালাক নামায় স্বাক্ষর করে ত্যাগ করলাম।পরে শুনলাম আপনার এফেয়ার আছে আপনার কাজিনের সাথে।

এটুকু বলে থামলো শ্রেয়সী কথা জড়িয়ে আসছে তার।পুরোনো ক্ষত জেগে উঠছে।মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে এক দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে মুখের ভাব ভঙ্গি বোঝার উপাই নেই।শ্রেয়সী আবার বলল,
-তারপর থেকে আপনাকে ঘৃনা করা শুরু করলাম।একটা মানুষ কতটা খারাপ হলে বিয়ের দুই দিন পরে একটা মেয়েকে ডিভোর্স দেয় তাও আবার কাজিনের সাথে প্রেম বলে।তাহলে বিয়ে কেন করলো।তখন থেকে মাথাতে কাপুরুষ আর চরিত্রহীন কথাটা গেথে যায়।আমার কাছের মানুষ গুলো ও আমাকে ডিভোর্সি মেয়ে বলেছিলো কতটা কষ্ট আমি সহ্য করেছি আপনি বুজবেন না হয়তো।তারপর কাল ভাবি আমার অনেক ভুল ধারনা ভেঙে দেয় আর প্রশ্নের মুখোমুখি করে যার যুক্তি নেই কোনো।ফলে আপনার সাথে দেখা করতে বলে।এটুকুই।
শ্রেয়সী থামে।চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়তে নিতেই মেহেরাজ হাত বাড়িয়ে টিস্যু দিয়ে তা মুছে দেয়।শ্রেয়সী চমকে গিয়ে মেহেরাজের দিকে তাকাতেই মেহেরাজ ঠান্ডা কন্ঠে বলে,

-আপনার কথা গুলো ঠিক।তবে আপনি যে কারনে আমাকে ঘৃনা করেছেন সেটা ভুল।প্রথমত বিয়েটা আমি পরিবার ইচ্ছাতেই করি।কিন্তু বিয়ে তো বিয়েই পরিবার আর নিজের ইচ্ছা হোক আমি মেনে নিয়েছি।হ্যা আমিও আপনাকে সেদিন দেখেনি।তবে সেদিন আমার ডাক পড়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন ছিলো।জানেন কিসের মিশন শত্রু দেশের থেকে নিজের দেশকে রক্ষার।অবৈধ অস্ত্র হাত থেকে বাচানোর।আমরা যখন ডিফেন্স এ জয়েন করি তখন আমাদের লক্ষ্য থাকে দেশকে রক্ষা করা।তাই আমি সেদিন সভ ভুলে চলে গিয়েছিলাম এতে আমার দোষ আমি জানি।নতুন বউ কে রেখে যাওয়া অবশ্যই দোষের তার মনের উপর প্রভাব পড়বে সেটা তখন মাথায় খেলেনি আমার।আর খেললেও উপাই থাকতো না।তার পর এই আট মাস পর বাড়ি ফিরে জানতে পারি আমার পরিবার নিজের সম্মান রক্ষার্থে ভুয়া ডিভোর্স পেপার দিয়েছে আপনাদের।এখানে তাদের সম্মান বাচলেও আমি কিন্তু নিচু হয়ে গেছি অনেকের চোখে।আর বললেন কাজিন এর কথা।নাবিলা আমার খালাতো বোন।বাড়িতে আসলে দু একবার কথা হয়েছে আর আমি বাড়িতে আসি না তেমন এতে যদি কেও অন্য কিছু মনে করে আমার বলার কিছু নেই।তারপর যখন জানলাম আপনার সাথে আমার ডিভোর্স হয়নি তখন আপনার খোজ লাগালাম আর অবাক করার বিষয় কলেজে দেখা সেই মেয়েটাই আপনি।যখন আপনার সামনে আসলাম সেদিন তখন বুজলাম কত টুকু ঘৃনা করেন আপনি আমাকে।

মেহেরাজ থামে।অপরাধ বোধে শ্রেয়সীর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।মেহেরাজ টিস্যু এগিয়ে দেয় শ্রেয়সীর দিকে।খাবার চলে এসেছে।মেহেরাজ খাবারের দিকে একবার তাকিয়ে শ্রেয়সীর উদ্দেশ্যে বলে,
-আমি জানি না আপনার মনে লাগা ক্ষত গুলোকে কখোনো পুরন করতে পারবো কিনা।তবে আপনার সম্মান কে আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো।আর এটাও কথা দিতে পারবো যে আমার জীবনে পদার্পন করার পর আর আপনার চোখ থেকে কখোনো এক ফোটা অশ্রু গড়াবে না।আর আপনার অনুমতি যদি পায় তাহলে মনের ক্ষত গুলোকেও ভালোবাসা দ্বারা পুরন করে দিবো।
মেহেরাজের শেষ কথায় শ্রেয়সী কিছুটা লজ্জা পায়।মেহেরাজ তা বুজতে পারে।শ্রেয়সী টিস্যু দিতে চোখ মুছে নেই।মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে খাবার এগিয়ে দিয়ে খাওয়া শুরু করতে বলে।তবে শ্রেয়সীর ভিষন লজ্জা লাগে।এতো দিনের যে ভুল নিয়ে মানুষটাকে ঘৃনা করে এসেছে সে আসলে অতটাও খারাপ না।
শ্রেয়সীকে চুপ করে থাকতে দেখে মেহেরাজ আবারো বলে,

-খাওয়া শুরু করেন।সি ফুড ঠান্ডা হলে মজা পাবেন না।
মেহেরাজ কথায় শ্র‍েয়সী লজ্জা রাঙা কন্ঠে মিন মিন করে বলে,
-আপ্নি শুরু করেন??
মেহেরাজের কানে কথাটা গেলেও মেহেরাজ শ্রেয়সীকে লজ্জা দেওয়ার জন্য বলে,
-বিড়ালের বাচ্চা*র মতো মিনমিন করে কথা বলছেন অশু*র
কথাটা বলে মেহেরাজ দাত জিভ কাটে শ্রেয়সী মেহেরাজের দিকে তাকায় চোখ।মেহেরাজ বোকা একটা হাসি দিয়ে বলে,
-আপনার আব্বু কি কিছু খাওয়ায় নাই।আগের দিন তো সেই চিল্লালেন রাস্তার মাঝে আজকে কথা কোথায় গেছে??
মেহেরাজের কথায় সত্যিই লজ্জা পায় শ্রেয়সী।মাথা নিচু করে নেই।ওইদিনের কথাটা ভাবতেই লজ্জায় মেহেরাজের দিকে তাকাতে পারছে না।সেদিন সবার মাঝে কিভাবে অপমান করলো সে মেহেরাজ কে।

তিন নাম্বার গোডাউনের সামনে এসে একটা কালো গাড়ি থামে।দুরের সমুদ্রের বাতাস এখানেও বইছে।চারিপাশ কেমন মাছের আশ আশ গন্ধ।হলুদ আলো জলছে তিন তলা সমান টিনের বিশাল গোডাউনের চারিপাশে।সিয়াম গাড়ি থেকে নেমে চারিদিকে তাকিয়ে ভেতরে ছেলে গুলোকে বলতেই বাচ্চা দুটোকে বস্তা থেকে বের করে কাধে নিয়ে বের করে। তারপর সিয়ামের পিছু পিছু গোডাউনে ঢুকে।
গোডাউনের ভিতর বিশাল কারবার।চিনির বস্তা ভরা হচ্ছে কন্টেনার এ বিশাল বিশাল কন্টেইনার ট্রাক এর উপর রাখা।সিয়াম সেদিকে না গিয়ে পাশের ছোট্ট দরজা দিয়ে প্রবেশ করে।পিছন সাইটে চলে যায়।সেটা আনাম মিয়ার অফিস।চেয়ারে বসে পান চিবাচ্ছে আনাম মিয়া।পরনে প্রতিদিনের মতো সাদা পাঞ্জাবি।
সিয়াম সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে সালাম দেই।আনাম মিয়া সালামের উত্তর দিয়ে বসতে বলে।সিয়াম বসে তার পাশের চেয়ারেই বসে আছে রফিক মিয়া।টেবিলের উপর দশ লক্ষ টাকা ক্যাশ রাখা।সিয়াম কাহিনী বুজে যায়।তবে সিয়াম সেদিকে না তাকিয়ে আনাম মিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,

-চাচাজান ও ন*ডিগোর কাহিনী খ*তম করে দিয়েছি।জেন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়াই দিছি।আর এই যে কচি মাল দুইটা।
কথাটা বলে হাত বাধা মুখে টেপ মারা রমা আর রহিদ কে টেনে আনে আনাম মিয়ার সামনে এক ছেলে সিয়ামের ইশারায়।আনাম মিয়া বাচ্চা গুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,
-কামের কাম করছো ভাতিজা এইবার।এই জন্য তোমারে আমার এতো পছন্দ।
-কি বলেন যে চাচাজান।
আনাম মিয়া এবার ফোন বের করে কাওকে কল দিয়ে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে যেতে বলে।তারপর সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলে,
-ভাই আসে নাই কেন ভাতিজা??
-আব্বা আসলে দোকান বন্ধ হয়ে যাবে।তার উপর কিছুদিন পর আবার বোনের বিয়ে আব্বা বিয়ের কার্ড নিয়ে আসবেনি আপনারে দাওয়াত দিতে??
-আবার বিয়া দিবা??
-হো চাচাজান।
সিয়াম এ বিষয় কথা বাড়াতে চাই না।আর যাই হোক তার কাছে তিনটা নারীর গুরুত্ব সব থেকে বেশি।তার মা,,তার স্ত্রী,,আর তার আদরের বোন।তাই কথা ঘুরানোর জন্য বলে,

-চাচাজান মা*ল গুলোকে কবে পাঠাবেন??
-আজ রাতে??
-পঞ্চাশ টা হয়েছে??
-হুম ভাতিজা চরের এক এতিম খানার সব বাচ্চা গুলোকে কিনে নিয়েছি। পরে এতিম খানায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছি যাতে সবাই ভাবে আগুনে পুড়ে মরছে সব।
-ভালোই বুদ্ধি আপনার চাচাজান।
-বুদ্ধি না থাকলে কি আর এই পথে কোটি টাকার ব্যাবসা করতে পারতাম??
সিয়াম উঠে পড়ে।সকালে আগে ফির‍্যে হবে তাকে।সিয়াম কে উঠতে দেখে আনাম মিয়া নিজের ক্যাশ বাক্স থেকে ত্রিশ লাখ টাকা ক্যাশ এগিয়ে দিয়ে বলে,

– আগের মা*লের হিসাবের ৪০% ভাইরে কইয়া দিও।
-আচ্ছা চাচাজান।তাহলে আজ আসি।দরকার পরলে আবার ফোন দিয়েন??
-আইচ্ছা।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৮

সিয়াম টাকা গুলো কাধ ব্যাগে পুরে নেয়।মুলত টাকা নিতেই এসেছিলো যাওয়ার আগে কাদতে থাকা বাচ্চা গুলোর দিকে একবার তাকায়।তাদের আজ চিনির কন্টেইনার এর ভিতরে অংশে এক বিশেষ সেল এ ভরে মায়ানমারে পাচার করে দিবে।বাচ্চা গুলোর জন্য সিয়ামের এক মনে খারাপ লাগ্লেও অন্য মনে ভালো লাগে।কড়া একটা দাম পাওয়া যায় প্রতি পিস এর।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here