লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৬
নুসাইবা আরা নুরি
-কিছু না আম্মু।
নাহিদা খাতুনের কথায় মেহেরাজ ভাবনা থেকে বের হয়ে উত্তর দেয়।তারপর খাওয়া শুরু করে।তবে মনের মাঝে খচখচানি করতে শুরু করেছে।তার মনের কথা ভুল না হলে তাদের তো এতো সহজে রাজি হওয়ার কথা ছিলো না এর ভিতরে কি কোনো কিন্তু আছে।মেহেরাজ খেতে খেতে হটাৎ মনে হলো সকাল থেকে বাবাকে দেখেনি তাই নাহিদা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-আম্মু আব্বু কোথায়??
মেহেরাজের কথায় নাহিদা খাতুন অবাক হয়।ভাবতেও পারেনি ছেলে তার এতো তাড়াতাড়ি রাগ অভিমান ভুলে যাবে।মাকে কিছু বলতে না দেখে মেহেরাজ ভ্রু জোড়া কুচকাতেই নাহিদা খাতুন বলেন,
-কি হচ্ছে আল্লাহ জানে।একের পর এক ঝামেলা।পুলিশ নিখোঁজ হয়েছে।যেখানে মানুষ নিখোঁজ হলে পুলিশ খুজে বের করে সেখানে পুলিশ নিখোজ হয়েছে।সাথে আবার একজন আর্মি ও।তাই তোর আব্বুর ডাক পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।
-ওহ আচ্ছা।
মেহেরাজ মাথা ঘামাতে চায় না।তবুও মন মানে না।দেশের একজন রক্ষাকর্তা আর সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাও তার কাছে দায়িত্ব। মেহেরাজের মনে প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে।হুট করে হচ্ছে টা কি।মেহেরাজ খেয়ে হাত ধুয়ে।নাহিদা খাতুনের দেওয়া ধোঁয়া উঠা গরম কফির কাপ টা নিয়ে উপরে চলে যায়।উপরে গিয়ে ফাহিম কে কল দিতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়ের কন্ঠ ভেসে আসে।মেহেরাজের ভ্রু কুচকে যায়।নাম্বার আবার চেক করে বলে,
-এটা ফাহিমের নাম্বার না??
-জ্বি ভাইয়া।
-ফাহিম কোথায়??আর তুমি কে??
-ভাইয়া শাওয়ার নিচ্ছে।আর আমি মাহিয়া।ভাইয়ার ছোট বোন।আর আপনি মেহেরাজ ভাইয়া তাইনা??
-জ্বী।কেমন আছেন ভাইয়া??
-আলহামদুলিল্লাহ।তুমি।
-আলহামদুলিল্লাহ।
মেহেরাজের কেমন যেনো লাগছে কথা বলতে।যদিও মাহিকে সে দেখেছে অনেক আগে।এখন কেমন তা দেখেনি।তবে কথা বলতে কেমন বাধছে।কারন সে মনে প্রানে একমাত্র শ্রেয়সীর।আর শ্রেয়সীর ই থাকবে সব সময়।হটাৎ কিছু একটা মনে হতেই মেহেরাজ মাহিকে উদ্দেশ্যে করে বলে,
-ফাহিম বের হলে বলবা।আমি ফোন দিয়েছিলাম আর্জেন্ট দরকার।
কথাটা বলে সাথে সাথে কল কেটে দিলো মেহেরাজ।মেয়েদের সাথে বরাবরই কম কথা বলে সে।আর এ তো আবার সে কবে দেখেছে অচেনার মতো।মেহেরাজ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ল্যাপটপ নিয়ে বারান্দার দিকে হাটা শুরু করে।
শ্রেয়সী কালকেও সারা রাত কেদেছে।কাল যখ রাতে সে নিচে গিয়েছিলো মায়ের ডাকে তখনই আলতাফ শেখ বিয়ের কথা বলেছেন।শ্রেয়সী রাজি না হলে ধমকেছেন।শ্রেয়সী নিজের বাবাকে ভয় পায়।তাই আর কথা বাড়াতে পারেনি তবে মনে মনে একদম ভেঙে পড়েছে।যেই মানুষটার চরিত্র খারাপ তার সাথে কি সংসার করা যায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কারোর সাথে কথা বলেনি শ্রেয়সী।তাতে কারোর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।তোহা অনেকবার শ্রেয়সী কে খাওয়ার কথা বললেও শ্রেয়সী যখন খাইনি তখন আলতাফ শেখ শ্রেয়সী খাবার বন্ধ করে দিতে বলেছেন।বাবার এমন আচরনে শ্রেয়সী অবাকের উপর অবাক হয়েছে।যে বাবা সে না খেলে আদর করে গালে তুলে খাওয়াতো সে কিনা বলছে খাওয়া বন্ধ করে দিতে।
শ্রেয়সীর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।কাল থেকে ইরুর ফোন বন্ধ।রাতেও ভিষন ঝড় বৃষ্টি হয়েছে।শ্রেয়সী জানে ইরু তার আচরনে কষ্ট পেয়েছে কিন্তু শ্রেয়সী ইরু কে সরি বলে সব ঠিক করবে কিভাবে।তার উপর আবার এই ঝামেলা।শ্রেয়সী হাটূর উপর হাত ভাজ করে তার উপর মাথা দিয়ে বসে আছে।লম্বা চুল গুলো বিছানায় ছড়িয়ে।
ঠিক সে সময় তোহা ঘরে এসে শ্রেয়সীর মাথায় হাত রাখে।শ্রেয়সী বুজতে পারে কে এসেছে।এই একটা মানুষ সকাল থেকে তার পিছু ছাড়ছেই না।শ্রেয়সী মাথা উচু করে তাকায় তোহার দিকে।তোহা শ্রেয়সীর দিকেই তাকিয়ে ছিলো।শ্রেয়সী ফোলা চোখ আর ভেজা মুখ দেখে তোহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
-বুজলে ননদিনী আমাদের জীবন এমন একটা গোলকধাধা যেটা কখন কোন রাস্তার সামনে তোমায় এনে দাড় করাবে তুমি বুজতেও পারবে না।তবে বুদ্ধিমতীর মতো সেই রাস্তা দিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়া ভালো।কড়ন ভাগ্য নিজে থেকেই তোমাকে সেই রাস্তার সামনে এনে দাড় করিয়েছে।
তোহার কথা শুনে শ্রেয়সী হাতের তালু দিজে চোখের কোনা মুছে বলে,
-তাই বলে ভাবি যে আমাকে কলঙ্ক মাখালো তার জীবনে আবারো জাবো।তাও মানতাম যদি লোকটা চরিত্রহীন কাপুরুষ না হতো।আমার তো ভাব্লেই ঘৃনা করে ভাবি।
-তুমি হয়তো ভুল জানো।হয়তো বা ছেলেটাকে নিয়ে তোমার মনে একটা ভুল ধারনা ঢুকে গেছে তাই এমন হচ্ছে??
-না ভাবি ওই লোক আসলেই কাপুরুষ। নিজের খালাতো বোনের সাথে রুম শেয়ার ও করেছে তাহলে তার চরিত্র কেমন হবে??
শ্রেয়সীর কথায় তোহা আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে তারপর বলে,
-তুমি দেখেছিলে??
-মানে??
-যে ছেলেটা তার খালাতো বোনের সাথে রুম শেয়ার করেছে??
তোহার কথায় কিছুটা বিব্রত হয় শ্রেয়সী তারপর বলে,
-এটা কিভাবে দেখবো ভাবি।
-তাহলে বলছো যে??
-শুনেছি সেদিন অগোচরে অনেকের কথায় কানে এসেছিলো।আর ভাইয়া ও তো বলেছে খালাতো বোনের সাথে সম্পর্ক ছিলো।
শ্রেয়সীর কতগায় তোহা নিজের মাথার কাপড় টা একটু টেনে দেয় ভালো করে।তারপর শ্রেয়সীর হাতের উপর হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বলে,
-আজ একটা কথা বলছি।ভাবি হয়ে না বড় বোন হয়ে।যতক্ষন না নিজের চোখে দেখবা ততক্ষন দুনিয়ার প্রতিটা মানুষ বল্লেও বিশ্বাস করবা না কোনো কথা।কারন মানুষের সভ্বাব একটু সুজোগ পেলেই তার নামে খারাপ কথা রটানো আর মানুষের কান ভার করা।
তোহা থামে।শ্রেয়সীর মাথা নিচু।তোহা আবারো বলে,
-আমি জানিনা ছেলেটা কেমন এমনকি তাকে দেখি ও নি কোনোদিন।তাও একটা কথা বলবো।ছেলেটা যদি সত্যিই চরিত্রহীন হতো আর তোমাকে ডিভোর্স দিতো তার কাজিন সিস্টার এর জন্য। তাহলে কোনোদিন ই ফিরে আসতো না তোমার খোজে।আর আম্মু তো বললো ছেলেটা ডিভোর্স দেই নি।সব তার পরিবার নিজের সম্মান রক্ষার জন্য করেছে।।
তোহার শেষ কথায় চমকে তাকায় শ্রেয়সী তোহার দিকে।মুখের ভাব মুর্তি অবাক হওয়ার মতো।শ্রেয়সী অবাক হওয়া শুরে বলে,
-মানে কি আবোলতাবোল বলছো এসব ভাবি??
-কেন আম্মু তোমাকে বলেনি??তোমার ভাইয়া কাল রাতে বললো আবার আম্মু ও তো সকালে বললো তুমি জানো না??
শ্রেয়সী তোহার কথায় দুদিকে শুধু মাথা নাড়ে মানে সে যানে না।শ্রেয়সীর মনে পড়ে কাল ইরু বার বার বলছিলো তার কথা একবার শোনার কথা।সে জা ভাবছে সব ভুল।তাহলে ইরু ও কি সব জানে।আর তাকে সব বলতে চেয়েছিলো।তাহলে লোকটাকে নিয়ে যা ভাবতো তা কিছুই না।
শ্রেয়সী কে হটাৎ ভাবনায় বিভোর হতে দেখে তোহা শ্রেয়সীর হাতে ধাক্কা দিয়ে বলে,
-কি হলো ননদিনী কি ভাবছো??
তোহার ধাক্কায় শ্রেয়সী ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসে।তোহার হাত ধরে বলে,
-এগুলো কি সত্যি ভাবি??
-হুম ওই জন্যই তো তোমাকে বললাম নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত কিছু বিশ্বাস করবা না।আর কখোনো কখোনো সামনে থাকা মানুষটার মুখ থেকে না শোনা পর্যন্ত।মনে রাখবা ননদিনী মানুষের কথায় ভেঙে পড়লে আপন জনদের ভুল বুজলে তুমি হেরে যাবে।আর তুমি মানুষের কথা কানে না তুলে নিজে যেটুকু শুনবে বুজবে দেখবে সেটুকু থেকে সিদ্ধান্ত নিবে তখন তুমি জিতে যাবে।
ফাহিম গোসল করে বেরিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখে মেহেরাজের একটা কল উঠে আছে আবার ৪ মিনিটের একটা কথা বলার টাইমিং ও আছে।কার সাথে কথা বলল ভাবতে ভাবতেই ফাহিম কল লাগায় মেহেরাজের নাম্বারে।মেহেরাজ হয়তো ফাহিমের কলের অপেক্ষাতেই ছিলো।
ফোন ভাইব্রেট হওয়ার সাথে সাথে মেহেরাজ রিসিভ করে।কল রিসিব হওয়াই ফাহিম বলে,
-কল দিয়েছিলি??
-হুম।
-কোনো দরকার??
-হুম।
মেহেরাজের হুম করা দেখে ফাহিনের চোখ ছোট ছোট হয়ে যায়।গলা খাকারি দিয়ে বলে,
-সমস্যা কি হুম হুম করছিস কেন??আর কার সাথে কথা বলছিলি ৪ মিনিট??
ফাহিমের কন্ঠ শুনে মেহেরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপ টা অফ করে দেয়।একটা ফাইল রেডি করছিলো ও এতক্ষন ধরে।তাই কথা বলতে পারেনি।মেহেরাজ এবার গম্ভীর কন্ঠে ছোট করে বলে,
-রাজি হয়ে গেছে??
-কে??
-শ্রেয়সীর পরিবার!
মেহেরাজের কথায় ফোনের ওপাশে থাকা ফাহিম চিল্লিয়ে উঠে বলে,
-কীইইই??
-হুম।
-আসলেই?
মেহেরাজ এবার গম্ভীর কন্ঠে বলে,
-সকাল সকাল মজা করার মাইন্ড এ নেই আমি।তোকে একটা কাজ এ ফোন দিয়েছি।
-বল।কিন্তু আমার এখোনো বিশ্বাস হচ্ছে না।
ফাহিমের কতগার পিঠে মেহেরাজের তপ্ত শ্বাসের শব্দ ভেসে এলো।মেহেরাজ এবার ফাহিমের উদ্দেশ্যে বলল,
-আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে এর ভিতরে বড় কোনো ঘাপলা আছে।যত যাই হোক কাল শ্রেয়সীর ভাইয়ের মুখ দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিলো।আর আজ কিভাবে রাজি হয়ে গেলো।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ১৫
-আমিও এই কথাটাই বলতাম দোস্ত।কাল ওই সিয়াম যেভাবে আলতাফ শেখ এর হাত চেপে ধরলো তখনই বুজেছি সে রাজি না।তাহলে পরে কেন রাজি হলো।
-হুম তোর হোয়াইটসআ্যপে একটা ফাইল পাঠিয়েছি।ওটা পড়ে রেডি করে দিস তো কালকের ভিতরে।আর__
মেহেরাজের কন্ঠ আটকে আসে।কিভাবে বলবে সে।তাও নিজের লজ্জা টা দূরে সরিয়ে বলেই ফেলল,
-শ্রেয়সীর পারসোনাল নাম্বার টা একটু ম্যানেজ করে দিস।
