ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৯
মেহজাবিন নাদিয়া
জেবার মুখে এমন পরিস্থিতিতে কিছুমিছু করার অফার শুনে আরিশান মৃধার গম্ভীর মুখের পাথুরে ভাবটা যেন এক মুহূর্তের জন্য চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ওনার কানের লতি দুটো সামান্য লালচে আভা ধারণ করল। এই মেয়েটার মুখে কোনো ফিল্টার নেই, কোনো রাখঢাক নেই! যখন যা মনে আসে, একদম তিরের মতো ছুড়ে দেয়। আরিশান মৃধা নিজের ভেতরের অস্বস্তিটুকু লুকিয়ে একটা কড়া ধমক দিতে যাবেন, ঠিক তখনই ঘটল অঘটনটা।হঠাৎ করে রুমের কোনা থেকে একটা ডানাওয়ালা তেলাপোকা উড়ে এসে সোজা জেবার ওড়না গলে ওর জামার ওপর বসল।
জেবা খেয়াল করতেই ওর চোখের মণি দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে রোমান্সের ভূত মাথা থেকে কর্পূরের মতো উবে গিয়ে সেখানে ভর করল আতঙ্ক। ও এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশেও আর কোনো চিন্তাভাবনা না করে, ব্যাঙের মতো একটা লাফ দিয়ে বিকট চিৎকার জুড়ে দিল-
_”ওরে বাবারে! খেয়ে ফেলল রে!তেলাপোঁকা…বাঁচান..!”
চিৎকার করতে করতেই ও ডিরেক্ট আরিশান মৃধার গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওনার কোমরে দুই পা আর গলায় দুই হাত পেঁচিয়ে বানরের মতো ঝুলে পড়ল।
হুট করে এমন আকস্মিক আক্রমণের শিকার হয়ে আরিশান মৃধা ভারসাম্য হারাতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন। ওনার শক্ত দুহাতে জেবার কোমরটা আগলে ধরতে বাধ্য হলেন। জেবা তখনো ওনার কোল ঘেঁষে চোখ-মুখ কুঁচকে ওনার ঘাড়ে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে অনবরত কাঁপছে আর বিড়বিড় করছে,
_”মরে গেলাম, ওটা আমার জামায় উঠেছে! মেরে ফেলুন ওটাকে, প্লিজ!”
আরিশান মৃধার বিরক্তির পারদ এবার একদম তুঙ্গে চড়ল। একটা সামান্য তেলাপোকার জন্য এই মেয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে দিয়েছে!ওনি জেবার পিঠে একটা আলতো চাপ দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
_”ছাড়ো জেবা! কী শুরু করেছ এসব? নামো নিচে!”
_”না, আমি নামব না! নিচে ডাইনোসর ঘুরছে, আমি নামলেই কামড়ে দেবে!” জেবা ওনার গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো জেদ ধরল।
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার এই জেদি আর অলস বউকে এখন জোর করে নামাতে গেলে ও আরও বেশি চিৎকার করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে। অগত্যা ওনি আর কোনো উপায় না পেয়ে জেবাকে ওই অবস্থাতেই কোলে শক্ত করে চেপে ধরলেন। ওনার গম্ভীর মুখে চরম বিরক্তি নিয়ে ওনি ধীর পায়ে ঐ রুম থেকে বেরিয়ে নিজের বেডরুমের দিকে হাঁটা দিলেন।
করিডোর পার হয়ে আরিশান মৃধা নিজের রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। রুমটা সম্পূর্ণ শান্ত আর থমথমে। ওনি সোজা খাটের কাছে এগিয়ে গিয়ে জেবাকে আলতো করে কিং সাইজ বেডের নরম গদির ওপর বসিয়ে দিলেন। নিজের গলা থেকে জেবার হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং কোটের বোতাম খুলতে খুলতে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বললেন,
_”এখানে চুপচাপ বসে থাকো।”
জেবা এতক্ষণে নিজের চোখ মেলে চারপাশটা দেখল। ও নিজেকে এই রুমে আবিষ্কার করে হচকচিয়ে গেল। চোখ দুটো বড় বড় করে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করল,
_”আ… আপনি আমাকে আপনার রুমে কেন এনেছেন?”
আরিশান মৃধা ওনার কোটটা খুলে পাশের একটা স্ট্যান্ডে ঝোলাতে ঝোলাতে অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
_”এটা এখন থেকে তোমারও রুম। আজ থেকে এখানেই থাকবে তুমি।”
কথাটা বলেই আরিশান মৃধা আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে কাবাড থেকে নিজের একটা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর টি-শার্ট বের করে নিলেন। তারপর জেবার দিকে আর এক পলকও না তাকিয়ে সটান ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলেন। পরমুহূর্তেই ওয়াশরুমের দরজাটা আটকে যাওয়ার শব্দ হলো।
জেবা খাটের ওপর স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না! এই বুইড়া বেডা ওকে নিজের রুমে থাকার অনুমতি দিয়ে দিল? তাও পাকাপাকিভাবে?
জেবার ভেতরের ছটফটে মনটা এবার খুশিতে নেচে উঠল। ও বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও আবার ধপ করে খাটের নরম গদিতে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ল। হাত বাড়িয়ে বিছানার রেশমি চাদর আর নরম তুলতুলে গদিটা ছুঁয়ে দেখল। অদ্ভুত এক সুবাস ছড়িয়ে আছে পুরো বিছানাময়-ঠিক আরিশান মৃধার শরীরের সেই চেনা চেরি পারফিউমের গন্ধ। জেবা খুশিতে খাটের এপাশ থেকে ওপাশ গড়াগড়ি খেতে লাগল। ওর বিশ্বাসই হচ্ছে না যে এখন থেকে, সুন্দর রুমটা ওরও!
গড়াগড়ি খাওয়া শেষ করে জেবা বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে রুমের চারপাশটা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। রুমটা সত্যিই অনেক বড়, জেবার আগের রুমটার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
একপাশে একটা দামি মখমলের সোফা সেট পাতা, যার সামনে একটা কাঁচের টি টেবিল।দেয়াল ঘেঁষে বিশাল কাঠের কাবাড।তার ঠিক পাশেই একটা বড় ড্রেসিং টেবিল, যেখানে আরিশান মৃধার কিছু নামি-দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি আর পারফিউমের বোতল সাজানো।ঘরের এক কোণে রয়েছে একটা বিশাল বইয়ের তাক। জেবা কৌতূহল নিয়ে ওটার দিকে তাকাল। সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো নানা ফিকশনাল বই, থ্রিলার উপন্যাস আর কিছু ভারী ওজনের মোটিভেশনাল বই।
পুরো রুমটার গাম্ভীর্য দেখে জেবা মনে মনে ভাবল,
_”বাহ! জামাইয়ের চয়েস আছে বলতে হবে। এখন শুধু এই গম্ভীর রুমে আমার একটু আধটু কালারফুল ছোঁয়া লাগাতে হবে। দুদিন পর যখন এখানে আমাদের বাচ্চা হামাগুড়ি দেবে, তখন এই গম্ভীর রূপ এমনিতেই গায়েব হয়ে যাবে!”
ভাবনাটা আসতেই জেবা ওড়না দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে একাই লজ্জায় লাল হয়ে হেসে উঠল। ওয়াশরুম থেকে তখনো পানির ঝিরঝির শব্দ আসছে, আর জেবা খাটের মাঝখানে বসে নিজের নতুন সাম্রাজ্য বিজয়ের আনন্দে বিভোর হয়ে রইল।
বাইরের একটানা ঝিরঝির বৃষ্টির শব্দে চারপাশটায় এক মায়াবী নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। অরি জানালার গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে ছিল। ভেবেছিল বৃষ্টি কমলে হয়তো তারা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। কিন্তু সারিমের তেমন কোনো তাড়া আছে বলে মনে হলো না। অরি আর থাকতে না পেরে আস্তে করে বলল,
_”আমরা কি বাড়ি ফিরব না, সারিম?”
সারিম সোফায় হেলান দিয়ে বসে বসে তখন ফোন ক্রোল করছিল।ও ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই এক শব্দে উত্তর দিল,
_”না।”
_”কেন?” অরি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
_”যেতে ইচ্ছে করছে না,”
সারিমের এমন অনড় জবাবে অরি এবার আর কিছু বলল না। অরিকে চুপ করে থাকতে দেখে সারিম সোফা থেকে উঠে ওর কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ও আচমকা অরিকে প্রস্তাব দিলো,
_”বাইরে চমৎকার আবহাওয়া চন্দ্রিমা। চলো, রাতে কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসি?”
সারিমের মুখে রাতের বেলা ঘুরতে যাওয়ার অফার শুনে অরি মনে মনে ভীষণ খুশি হয়ে গেল। কিন্তু এই খুশির মাঝেই হুট করে ওর মনটা দমে গেল। অরি নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করে বলল,
_”কিন্তু আমার তো এখানে পরার মতো কোনো ড্রেস নেই! এই পোশাকে কীভাবে যাব?”
সারিম অরির চেহারার মলিন ভাবটা মুহূর্তেই ধরে ফেলল। ও মুচকি হেসে পকেট থেকে ফোনটা বের করে বলল,
_”এতটুকু বিষয়ের জন্য মন খারাপ করার কোনো দরকার নেই বউ। তুমি একটু ওয়েট করো।”
কথাটা বলেই সারিম দ্রুত কাউকে একটা কল লাগাল। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই ও গম্ভীর কিন্তু মার্জিত গলায় বলল,
_”আপনার কাছে মেয়েদের লেটেস্ট যে কালেকশনগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে একটু আমার ফ্ল্যাটে আসুন এখনই।”
সারিম ফোনটা রাখতেই অরি কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
_”কাকে ফোন দিলেন?”
সারিম ফোনটা পকেটে পুরে বলল,
_”পাশের ফ্ল্যাটেই একজন ভদ্রমহিলা থাকেন, ওনার কাপড়ের বিজনেস আছে।”
অরি চোখ বড় বড় করে বলল,
_”ওহ! তা এতগুলো আনতে বললেন কেন? পরার মতো জাস্ট একটা হলেই তো চলে!”
সারিম অরির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু হাসল।
বলার ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজার কলিং বেল বেজে উঠল। অরি তড়িঘড়ি করে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে, মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলা একগাদা ড্রেসের প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলার হাতে এত এত ড্রেসের কালেকশন দেখে অরি পুরো অবাক! ও ভদ্রতা বজায় রেখে মহিলাকে ভেতরে আসতে বলল।
মহিলাটি ভেতরে এলে অরি ওনাকে সোফায় বসতে বলে নিজেও পাশে বসল। মহিলাটির নাম সুক্তা। সুক্তা সোফায় প্যাকেটগুলো খুলে অরিকে একে একে ড্রেস দেখাতে শুরু করলেন। সারিম অবশ্য অন্যপাশের সোফায় বসে ফোনে কী যেন করায় মগ্ন, ওদিকে ওর কোনো মনই নেই।সুক্তার আনা প্রতিটা ড্রেসই বেশ রুচিসম্মত আর সুন্দর ছিল, যা অরির বেশ পছন্দ হলো। তবে ও তো এতগুলো নেবে না। তাছাড়া অরি সবসময় শার্ট, জিন্স কিংবা প্লাজো পরতেই অভ্যস্ত। কিন্তু আজ কেন জানি এই বৃষ্টিভেজা রাতে সারিমের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার জন্য ওর একটা শাড়ি পরতে ভীষণ মন চাইল। অথচ বাস্তব জীবনে অরি শাড়ি পরা একদম অপছন্দ করে!অরি অনেক বেছে বেছে সুক্তার কাছ থেকে একটা অত্যন্ত সুন্দর জামদানি শাড়ি পছন্দ করে নিল।
সুক্তা ওকে আরও কিছু ড্রেস দেখাতে লাগলো।
_”এগুলো নিতে পারো, তোমার গায়ে খুব মানাবে এটা।একটা থ্রিপিস দেখিয়ে অরিকে বলল। তবে অরি থ্রি-পিস পরে না তাই হেসে মানা করে বলল,
_”না, আন্টি। লাগবে না আর, একটা হলেই হবে।”
সুক্তা আর কিছুই বললেন না। সে তার বাকি ড্রেসগুলো গুছিয়ে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই সারিম হুট করে ফোন থেকে চোখ তুলে ওনাকে আটকালো। গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
_”ড্রেস সবগুলো এখানেই রেখে যান। বিল আমি অনলাইন পে করে দিচ্ছি।”
ব্যবসায়ী সুক্তা তো এতে মহা খুশি! তিনি সমস্ত প্যাকেট সোফায় রেখে দিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। মহিলা চলে যেতেই অরি হাঁ করে সারিমের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
_”এত ড্রেস কে পরবে?”
সারিম সোফায় পা তুলে আরাম করে বসে বলল,
_”তুমি পরবে।”
_”আপনি পাগল হয়েছেন? এত ড্রেস দিয়ে আমি কী করব? বাড়িতে অলরেডি আমার কাবাড ভরতি ড্রেস আছে!”
সারিম বাঁকা হেসে বলল, _”এখানে থাকবে, সমস্যা কী?”
অরি চোখ সরু করে বলল, _”এখানে থাকবে মানে? আমরা এখানে আসবো আর নাকি ?”
সারিম এবার সোফা থেকে উঠে অরির একদম কাছে চলে এলো। ওর কোমরে দুহাত গলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_”যখনই রোমান্সের মুড আসবে, তখনই দুজনে এখানে চলে আসব। আমাদের ডিস্টার্ব করার মতো আর কেউ থাকবে না। ড্রেস গুলো কাজে আসবে তখন তোমার।”
সারিমের মুখে এমন নির্লজ্জ কথা শুনে অরি পুরো লাল হয়ে গেল। এই লোকের মুখ দিয়ে যখন যা আসে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলে দেয়! ও সারিমের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
_”অসভ্য পুরুষ!”
সারিম চোখ জোড়া কপালে তুলে বলল,
_”অসভ্য হলাম আমি? আবার কী করলাম? এভাবে বারবার আমার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিতে থাকলে কিন্তু সত্যি সত্যি অসভ্যের মতো কিছু একটা করে ফেলব বলে দিলাম!”
অরি আর কোনো কথা বলল না। ও মুখে এক চিলতে লজ্জামাখা মুচকি হাসি ফুটিয়ে সারিমকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে রুমের দিকে চলে গেল সাজগোজ করতে।প্রায় আধঘণ্টা পর। অরি আজ খুব যত্ন নিয়ে সারিমের জন্য শাড়িটা পরেছে। ওর বাদামি সিল্কি চুলগুলো আজ ক্লিপ দিয়ে না আটকে পিঠের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। চোখের চিরচেনা রিডিং গ্লাসটা টেবিলের ওপর খুলে রাখলো। চোখের পাতায় সামান্য গ্লিটার আর ঠোঁটে হালকা লিপগ্লোজ লাগিয়েছে-ব্যাস, এতটুকুতেই অরিকে একদম ভুবনমোহিনী সুন্দরী দেখাচ্ছিল। অরি আয়নায় নিজেকে দেখে মনে মনে ভেবেই নিয়েছে, সারিম আজ ওর এই রূপ দেখে প্রশংসা না করে পারেই যাবে না!
ও অত্যন্ত খুশি মনে, ধীর পায়ে সারিমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সারিম তখনো সোফায় বসে একমনে ফোনের স্ক্রিনে কী যেন করছিল। অরি ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য গলা ঝেড়ে হালকা একটা কাশি দিল।কাশির শব্দ শুনে সারিম ফোন থেকে চোখ তুলে অরির দিকে তাকাল। কিন্তু… ওর চোখে কোনো বিস্ময় বা মুগ্ধতার রেশ দেখা গেল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক, প্রতিক্রিয়াহীন চোখে অরিকে এক পলক দেখল।
সারিমের এমন শীতল চাউনি দেখে অরির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।ওর ভীষণ খারাপ লাগল।নিজের কৌতুহল সামলাতে না পেরে নিজ থেকেই সারিমকে জিজ্ঞাসা করে বসল,
_”আমাকে কেমন লাগছে?”
সারিম এবার অরির দিকে পুরোপুরি না তাকিয়ে, পুনরায় ফোনে চোখ রেখেই এক লাইনে উত্তর দিল,
_”ভালো।”
ব্যাস আর কিছু না,সারিমের এহেন উদাসীন আর অবহেলামূলক আচরণে অরির বুকের ভেতরটা তিরের মতো বিঁধল। ভীষণ কষ্ট পেল ও,চোখের কোণে জমে উঠল একরাশ অভিমান। যে মেয়ে কোনোদিন শাড়ি পরা পছন্দ করে না,সে আজ এই লোকটার জন্য সেজেছে।অথচ লোকটার একটু প্রশংসাও জুটল না কপালে! শুধু একটা শুকনো ‘ভালো’?
রাগে, অভিমানে অরির চোখে জল চলে এলো। ও আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। গটগট করে রুমে ফিরে গেল। সোফায় রাখা সুক্তা সেই ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ঢিলেঢালা ওভারসাইজড শার্ট আর প্লাজো টেনে বের করল। রাগের চোটে গায়ের শাড়িটা টেনেহিঁচড়ে গা থেকে খুলে ছুড়ে ফেলল বিছানায়। এই বেয়াদপ লোকটার জন্য সাজাটাই ওর বৃথা!
অরি আবার সেই নিজের চেনা পুরনো ফ্রেমে ফিরে গেল। ঢিলেঢালা ওভারসাইজড শার্ট, প্লাজো গায়ে চড়ালো। টেবিল থেকে রিডিং গ্লাসটা নিয়ে চোখে পরল।পিঠের ওপর ছড়ানো চুলগুলোকে টেনেটুনে একটা অবিন্যস্ত খোঁপা করে ব্যান্ড দিয়ে আটকে নিল। ওর এতক্ষণের সুন্দর ঘোর আর ঘোরার মুড-দুটোই সারিম এক নিমেষে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।এসব ভেবে অরি এবার শক্ত পায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে গেল। ও আজ কোথাও যাবে না, সারিমকে পরিষ্কার মুখে এটা জানিয়ে দিয়ে ও ঘুমিয়ে পড়বে-এই হলো ওর শেষ সিদ্ধান্ত।
অরি ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই। অরিকে চরমভাবে চমকে দিল সারিম। অরিকে আসতে দেখেই সারিম ওর ফোনটা পাশে রেখে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।ধীর পায়ে অরির দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। সারিমের চোখের ধারালো দৃষ্টি এবার সরাসরি স্থির হলো অরির ওপর। ও অরিকে আপাদমস্তক একবার খুঁটিয়ে দেখল।
অরি কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই সারিম ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। নিজের একটা শক্ত হাত বাড়িয়ে ও অরির নরম চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে ওপরে তুলল। তারপর অরির কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে নিয়ে গভীর, মাদকতাভরা ফিসফিসে কণ্ঠে বলল,
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৮
_”তোমাকে সীমাহীন সুন্দর লাগছে, বউ! প্লিজ, এভাবে আমার সামনে এসে মনের ভেতর আর নতুন করে দোলা লাগিও না।তোমার এলেমেলো রূপ দেখলে, নিজেকে সামলাতে বড্ড হিমশিম খেতে হয় আমায় চন্দ্রিমা। আই ওয়ান্ট লেট মি সি ইউ জান!”
_”সা…সারিম।”
_হুস”
