Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৭

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৭

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৭
মেহজাবিন নাদিয়া

সারিমের গাড়িটা এসে একটা বিশাল লোহার গেটের সামনে থামল, অরি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলো।আনতারা মৃধার বলা ‘অনাথ’ শব্দটা এখনো ওর কানের পর্দায় এসে তীরের মতো বিঁধছে।
সারিম গাড়ি থেকে নেমে এসে ওপাশের দরজাটা খুলে দিল। অরির হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিয়ে বলল,

_”নামো, চন্দ্রিমা।”
অরি ইতস্তত করে গাড়ি থেকে নামল। সামনে তাকাতেই ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে গেল। বিশাল একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, অথচ চারপাশটা একদম সুনসান, নিঝুম। গেটের সামনে কোনো দর্শনার্থী নেই, কোনো শোরগোল নেই। পার্কের ভেতরের রঙিন রাইডগুলো সকালের রোদে চকচক করছে, যেন কোনো রূপকথার রাজ্য অলস পড়ে আছে।অরি অবাক হয়ে সারিমের দিকে তাকাল।
_”সারিম, এখানে কোনো মানুষ নেই কেন? পার্ক কি আজকে বন্ধ?”
সারিম অরির চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠিক করে দিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটিয়ে তুলল।_”বন্ধ থাকবে কেন? তোমার স্বামী থাকতে এই পার্ক বন্ধ করার সাহস কার আছে? আজ সারাদিনের জন্য এই পুরো পার্কটা শুধু তোমার জন্য বুক করা, চন্দ্রিমা।এখানে আমরা দুজন ছাড়া আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকবে না।শুধু তুমি আর আমি।”

অরি হা করে তাকিয়ে রইল। একটা আস্ত পার্ক শুধু ওর জন্য বুক করে ফেলেছে লোকটা! সারিমের এই উম্মাদনা গভীরতা দেখে অরির বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় মুচড়ে উঠল।ভেতরে ঢুকতেই অরির চোখের সামনে যেন এক নতুন পৃথিবী খুলে গেল। বিশাল চত্বর জুড়ে নানারকম রাইড-মেরি-গো-রাউন্ড থেকে শুরু করে রোলার কোস্টার। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, পার্কের ভেতরে সারি সারি খাবারের স্টল বসানো হয়েছে। আইসক্রিম, পপকর্ন, চটপটি আর ধোঁয়া ওঠা ফুচকার স্টল। প্রতিটি স্টলে বিক্রেতারা অত্যন্ত ভদ্রভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা শুধু এই বিশেষ অতিথিটির জন্যই অপেক্ষা করছিল।
ফুচকার স্টলটা দেখামাত্রই অরির মলিন মুখটা মুহূর্তে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সকালের সব কষ্ট, সব কান্না এক নিমেষে উধাও। সে সারিমের হাত ধরে বাচ্চাদের মতো টেনে ফুচকার স্টলের দিকে নিয়ে গেল।_”সারিম! ফুচকা! আমি ফুচকা খাব!”

সারিম অরির এই চঞ্চল রূপটা দেখে মনে মনে এক পরম শান্তি পেল। সে বিক্রেতার দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই প্লেট ভর্তি করে টক-ঝাল ফুচকা সাজিয়ে দেওয়া হলো। অরি এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে ফুচকা মুখে পুরে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।_”উমম… দারুণ!আপনি খাবেন না সারিম?”
সারিম পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ওর বউয়ের গালের ওঠানামা দেখছিল। সে নিচু হয়ে অরির ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একটুখানি টক নিজের আঙুল দিয়ে মুছে নিয়ে বলল,_”তুমি খাও চন্দ্রিমা। তোমার এই রাক্ষসের মতো খাওয়া দেখলেই আমার পেট ভরে যায়।”
অরি চোখ রাঙিয়ে ওর পায়ে আলতো করে লাথি মারল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার রাইডগুলোর দিকে তাকিয়ে খুশিতে তালি বাজিয়ে উঠল। মেরি-গো-রাউন্ডে চড়ে অরি বাতাসে চুল উড়িয়ে হাসছিল, সারিম নিচে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে ওর সেই হাসিমুখটা নিজের হৃদয়ে ফ্রেমবন্দি করে রাখছিল।বাড়ির দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে বের করে এনে সারিম তার চন্দ্রিমার মুখে হাসিটা ফোটাতে পেরেছে-এর চেয়ে বড় সার্থকতা সারিমের কাছে আর কিছু নেই।

বেশ কিছুক্ষণ হইহুল্লোড় আর রাইডে চড়ার পর অরি একটা কটন ক্যান্ডি হাতে নিয়ে পার্কের মেইন গেটের কাছাকাছি একটা বেঞ্চে এসে বসল, তখন আচমকা ওর নজর গেল বাইরের লোহার গেটটার দিকে।গেটের ওপাশে, রাস্তার ধারে চার-পাঁচজন পথশিশু দাঁড়িয়ে আছে।তাদের পরনে ছেঁড়া-ফাঁটা নোংরা পোশাক, চুলে ধুলোবালি। বাচ্চাগুলো চশমা পরা অরি আর ভেতরের রঙিন রাইডগুলোর দিকে চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। ওদের চোখগুলো বলছিল, কত ইচ্ছে ওদেরও এই রঙিন রাইডে চড়ে দেখতে,এই সুন্দর খাবারগুলো খেতে। কিন্তু পার্কের বিশাল ভারী গেট আর কড়া সিকিউরিটি ওদের সেই ইচ্ছেটাকে বাইরের ফুটপাতেই আটকে রেখেছে।
বাচ্চাগুলোর সেই নিষ্পাপ, আকুল চাউনি দেখামাত্রই অরির বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।সে নিজে একজন অনাথ,অরি জানে অবহেলা আর বঞ্চনার স্বাদ কেমন হয়। ও এই আনন্দের মাঝে ওই বাচ্চাগুলোকে বাইরে রেখে নিজে একা উপভোগ করতে পারছিল না।

অরি কটন ক্যান্ডিটা রেখে সোজা দাঁড়িয়ে গেল। সারিম পাশেই দাঁড়িয়ে একটা ফোন কল সারছিল, অরি ওক কিছু না বলেই দ্রুত পায়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল।সিকিউরিটি গার্ডরা বাচ্চাদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ধমক দিতেই অরি চড়া গলায় বলে উঠল,_”খবরদার! ওদের গায়ে হাত দেবেন না।”
গার্ডরা চমকে পিছিয়ে গেল। অরি গেটের লকটা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল এবং বাচ্চাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।অরির দুচোখে মমতায় ভরা।_”তোমরা ভেতরে যাবে? রাইডে চড়বে?”
বাচ্চাগুলো প্রথমে ভয়ে একে অপরের দিকে তাকাল, তারপর একযোগে মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল। ওদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট যে মেয়েটা, সে অরির পোশাকের কোণাটা ধরে ফিসফিস করে বলল,
_”আমগোরে পুলিশে যাইতে দিব না আপা? ওই হুলো বিড়ালের মতো দারোয়ানটা আমগোরে তাড়া দেয়।”অরি হেসে ফেলল। ও মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

_”কেউ কিছু বলবে না। চলো আমার সাথে।”
অরি বাচ্চাদের হাত ধরে পার্কের ভেতরে নিয়ে এল। সারিম ততক্ষণে ফোন রেখে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর ফর্সা কপালে সামান্য কুঁচকে যাওয়া ভাঁজ। এই বাচ্চাগুলোকে পার্কের ভেতরে নিয়ে আসাটা ও হয়তো সহজভাবে নিতে পারছিল না, কিন্তু অরির চোখের আনন্দ দেখে সারিম আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না।
অরি বাচ্চাদের নিয়ে সোজা আইসক্রিম আর ফুচকার স্টলে চলে গেল।_”ভাইয়া, ওদের যত ইচ্ছে আইসক্রিম আর ফুচকা দিন।”

বাচ্চাগুলো পেট পুরে আইসক্রিম খাচ্ছিল আর মনের সুখে মেরি-গো-রাউন্ডে ঘুরছিল, ওদের সেই বাঁধভাঙা চিল চিৎকার আর হাসিতে পুরো নিঝুম পার্কটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। অরিও ওদের সাথে খেলায় মেতে উঠল, ওদের হাতগুলো নিজের হাতে জড়িয়ে সে নিজেও একটা বাচ্চা হয়ে গেল।
সারিম দূরে একটা গাছের নিচে দু হাত পকেটে রেখে দাড়িয়ে আছে।ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে গভীর হাসি ফুটে উঠলো।দৃষ্টি তার অরির দিকেই নিবদ্ধ,চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে সে।যেন এক টুকরো পবিত্র মেঘকে নিজের নজরে বন্দি করে রেখার প্রয়াস।ঘড়ির কাঁটা তখন বেলা দশটা ছুঁইছুঁই। হঠাৎ করেই আকাশের নীল রঙটা বদলে গিয়ে ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেল চারপাশ। বাতাসের বেগ বাড়ল, আর মুহূর্তের মধ্যে সকালের তপ্ত রোদকে বিদায় জানিয়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো। আকাশভাঙা সেই বৃষ্টির তীব্র ছাঁট পার্কের কংক্রিটের মেঝেতে আছড়ে পড়তে লাগল।বাচ্চাগুলো বৃষ্টির শব্দ শুনেই আহ্লাদে চিত্কার করে উঠল। সারিম পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত অরির দিকে এগিয়ে গেল।সে অরির হাত ধরে টান দিয়ে বলল,_”বউ! বৃষ্টি নেমে গেছে। চলো, দ্রুত ওই শেডের নিচে। ঠাণ্ডা লেগে যাবে নয়তো।”
কিন্তু অরি আজ কোনো নিয়ম মানার মুডে নেই। সে সারিমের হাতটা শক্ত করে ধরে এক ঝটকায় ওকে বৃষ্টির মাঝখানে টেনে নিয়ে এল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো নিমেষে সারিমের শার্ট আর অরির চশমার কাঁচকে ভিজিয়ে দিল।অরি নিজের রিডিং গ্লাসটা খুলে বেঞ্চের ওপর রেখে দিল। তারপর দুই হাত মেলে, মাথাটা আকাশের দিকে উঁচিয়ে গোল হয়ে ঘুরতে লাগল।_”সারিম! দেখুন কী সুন্দর বৃষ্টি! চলুন না আজ নিয়ম ভুলে একটু ভিজি!”

বাচ্চাগুলো ততক্ষণে বৃষ্টির মধ্যে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। অরিও ওদের সাথে তাল মিলিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ভিজতে লাগল, বৃষ্টির জল ওর ভেজা চুল বেয়ে ঘাড়ে, পিঠে লেপ্টে যাচ্ছিল।অরির খিলখিল হাসি বৃষ্টির শব্দের সাথে একাকার হয়ে যাচ্ছে।সারিম বৃষ্টির মধ্যে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর ভেজা শার্টটা শরীরের টানটান মেদের সাথে লেপ্টে গেছে, চুলগুলো কপাল বেয়ে চোখের ওপর এসে পড়েছে। কিন্তু ওর চোখ দুটো কেবল একটা অবয়বের ওপরই থমকে ছিল। বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা যেন অরিকে আরও বেশি মায়াবী, আরও বেশি মোহময়ী করে তুলছিল।
সারিমের কি যেন হলো সে আনমনেই, অত্যন্ত গভীর ও মাদকতাভরা কণ্ঠে দুলাইন গেয়ে উঠল-
“আমি বৃষ্টি হয়ে তোমার
চোখে ঝরবো অঝোরা,
“তুমি দুহাত পেতে আমায়
চেয়ে করবে প্রার্থনা…”

সারিম ধীর পায়ে অরির দিকে এগিয়ে গেল। ওর চোখের চাউনি এখন ভালোবাসার সমুদ্রে পরিণত হয়েছে।সারিম অরির কোমরটা দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। অরির লাফালাফি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল,সে সারিমের ভেজা বুকের ওপর দুই হাত রেখে কাঁপতে লাগল।
সারিম অরির কপালে নিজের ভেজা থুতনিটা ঠেকিয়ে, ওর কানের কাছে মুখ এনে অত্যন্ত নিচু অনড় স্বরে ফিসফিস করে বলল,
_”তুমি আমার, চন্দ্রিমা। শুরু থেকে শেষ অব্দি, শুধু আমার। এই দুনিয়ার কোনো শক্তি তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না।”
অরি সারিমের ভেজা চোখের দিকে তাকাল।সেখানে এক আকাঁশসম ভালোবাসা।অরি নিজের ছোট হাত দুটো দিয়ে সারিমের চওড়া গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ লুকাল। বাইরের ঝমঝম বৃষ্টির পটভূমিতে, দুই হৃদয়ের ধুকপুকানি যেন এক অলিখিত কাব্যের জন্ম দিচ্ছিল।

আরিশান মৃধার সেই চিরচেনা ‘দাঁত ভেঙে হাত দিয়ে দেওয়ার’হুমকিটা শোনার পর থেকেই জেবা নিজের মুখটা বন্ধ করে রেখেছে। লোকটার রাগ ও জেদ সম্পর্কে ওর খুব ভালো করেই জানা আছে। সে মুখে যা বলে, কাজেও তা করতে এক সেকেন্ড ভাববে না, বিশেষ করে এই লোকের গম্ভীর চোখের দিকে তাকালে জেবার কলিজা শুকিয়ে যায়। জেবা আর একটা কথাও না বাড়িয়ে জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে ওড়নার খুঁত নিখুঁতভাবে ছিঁড়তে লাগল। মনে মনে আরিশান মৃধাকে একশো একটা গালি দিতেও ছাড়ল না।আরিশান জেবার সেই রাগী বিড়ালের মতো মুখ ফুলিয়ে বসে থাকা দেখে মনে মনে কিছুটা আমোদ পেল, যদিও ওনার পাথরের মতো শক্ত মুখাবয়বে তার বিন্দুমাত্র প্রকাশ ঘটল না।কিছুক্ষনের মধ্যেই,আরিশান মৃধার গাড়িটা বাড়ির বিশাল সদর ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল,গাড়ি থামতেই আরিশান মৃধা নিজে নেমে জেবার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামালেন। বাড়ি ঢোকার পর দেখা গেল ড্রয়িং রুম একদম সুনসান, ফাঁকা। সকালের সেই চড়-থাপ্পড়ের পর আনতারা মৃধা নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছেন, তিনি আর নিচে নামেননি।আরিশান মৃধা জেবাকে সোজা ওপরের রুমে নিয়ে এলেন।বিছানায় জেবাকে বসিয়ে দিয়ে ওনার সেই গম্ভীর, ভারী কণ্ঠে বললেন,
_”চুপচাপ রুমে থাকবে। নিজের ওই ছোট বাচ্চার মতো বুদ্ধি খাটিয়ে বাইরে যাওয়ার বা কোনো পাগলামি করার চেষ্টা করবে না। আমি বিকেলে ফিরব।”

জেবা কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে রইল। আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওনার বডিগার্ড ও সিকিউরিটি টিমকে কড়া নির্দেশ দিলেন যাতে জেবার সুরক্ষায় কোনো কমতি না হয়। এরপর ওনার গাড়িটি তীব্র গতিতে ছুটে চলল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের কনফারেন্স রুমের পরিবেশ আজ সকাল থেকেই বরফশীতল। বাইরে এখনো মেঘলা আকাশ, থেকে থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে, যা জানালার কাঁচে এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।রুমের ভেতরের আবহাওয়া বাইরের চেয়েও অনেক বেশি থমথমে।
বিশাল প্রজেক্টর স্ক্রিনের ওপর ভেসে আছে চৌদ্দ বছর আগের ‘অর্গান ট্রাফিকিং’ কেসের মূল সন্দেহভাজন সার্জন ডাক্তার জুইফানের ছবি। তার ঠিক পাশেই গতকাল রাতে সেন্ট্রাল জেলের সেল থেকে উদ্ধার হওয়া জুইফানের গলিত, বীভৎস লাশের ফরেন্সিক ছবিগুলো।
আয়ুশ টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে গাঢ় ধূসর রঙের একটা ব্লেজার, চুলগুলো নিখুঁতভাবে ব্যাক-ব্রাশ করা। তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি প্রজেক্টর স্ক্রিনের দিকে নিবদ্ধ।
টেবিলের উল্টোদিকে অবিরাম আর ওসি প্রদীপ বাবু অত্যন্ত সতর্ক ও তটস্থ হয়ে বসে আছেন। অবিরামের সামনে ছড়ানো এক গাদা ওল্ড আর্কাইভের ফাইল।
আয়ুশ একটা লেজার পয়েন্টার অন করে ডাক্তার জুইফানের ছবির ওপর আলো ফেলল। ঠান্ডা, মেপে মেপে বলা গলায় ও বলল,

_”ডক্টর স্যানালের ফাইনাল অটোপ্সি রিপোর্ট এইমাত্র আমার হাতে এসেছে। মৃত্যুর কারণ কোনো বিষ বা কেমিক্যাল ইনজেকশন নয়। জুইফানের শরীরে এক ধরণের হাইলি মিউটেটেড বায়োলজিক্যাল এজেন্ট বা মডিফাইড ভাইরাস পুশ করা হয়েছিল। এই ভাইরাসটা শরীরে ঢোকার ঠিক আধঁ ঘণ্টার মধ্যে ভেতরের কোষগুলোকে অ্যাসিডের মতো গলিয়ে দেয়। অর্গান ট্রাফিকিং কেসের সাথে জরিত এত বড় একজন সার্জন চৌদ্দ বছর ধরে জেলে বন্দি থাকার পর, হঠাৎ কাল রাতেই তাকে এভাবে কেন মরতে হলো? এনি গেসেস?”
অবিরাম একটা লম্বা ফাইল টেনে নিয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে বলল,_”স্যার, আমি জুইফানের জেলের ভেতরের লাস্ট কয়েক মাসের রেকর্ড চেক করেছি।ওনি কিন্তু একদম চুপচাপ থাকত। অদ্ভুত ব্যাপার হলো,তবে ঠিক এক সপ্তাহ আগে জুইফান কোর্টে একটা আপিল ফাইল করার চেষ্টা করেছিল। ওনি কেসের কিছু গোপন তথ্য এবং সেই রহস্যময় মাস্টারমাইন্ড’-এর আসল নাম ডিসক্লোজ করতে চেয়েছিল একটা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের কাছে। কিন্তু সেই টিম জেলের ভেতর পৌঁছানোর আগেই কাল রাতে ওকে সাইলেন্টলি লিকুইডেট করে দেওয়া হলো।”
আয়ুশের ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।সে লেজার পয়েন্টারটা টেবিলের ওপর রেখে সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে বসল।_”তার মানে, দাবার বোর্ডের পেছনের মূল খেলোয়াড় এখনো বাইরে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবং জুইফান মুখ খুললে সেই মাস্টারমাইন্ডের মুখোশ খুলে যেত, তাই তাকে চিরতরে শান্ত করে দেওয়া হলো। কিন্তু প্রদীপ বাবু…”

আয়ুশ হঠাৎ ওসি প্রদীপের দিকে চোখ সরু করে তাকাল।_”জেলের ভেতর চব্বিশ ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরা সচল, হাই-সিকিউরিটি জোন। বাইরের কেউ তো আর সিরিঞ্জ হাতে ভেতরে ঢুকে জুইফানকে ভাইরাস পুশ করে আসেনি। ইনসাইডার কে? কাল রাতে চার নম্বর সেলের ডিউটিতে কে কে ছিল?”
প্রদীপ বাবু রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন,
_”স্যার, হেড কনস্টেবল রফিক আর সেন্ট্রাল জেলের একজন ফার্মাসিস্ট কাল রাতে ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা হলো স্যার, আজ সকাল থেকে ওই ফার্মাসিস্ট এবং হেড কনস্টেবল দুজনেই নিখোঁজ! ওদের কোয়ার্টারেও কোনো সন্ধান মেলেনি। ফোনও সুইচড অফ।”
আয়ুশ এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। ওর ধারালো চিবুকটা শক্ত হয়ে উঠল। অপরাধী শুধু নিখুঁত চালই চালছে না,সে প্রতিটা পদক্ষেপ আয়ুশের টিম পৌঁছানোর আগেই মুছে দিচ্ছে। চৌদ্দ বছর আগে যেভাবে দিলরাজ সাহা সহ বাকি তিনজন অফিসার ফাইল খোলার তিন-চার দিনের মধ্যে লাশ হয়ে গিয়েছিল, অপরাধী ঠিক সেই একই প্যাটার্ন ফলো করছে।
ঠিক তখনই কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সিআইডির টেকনিক্যাল উইংয়ের প্রধান নিশীথ। ওর হাতে একটা পেনড্রাইভ।_”স্যার, আপনি জুইফানের সেলের বাইরের করিডোরের সিসিটিভি ফুটেজটা ল্যাবরেটরিতে রিকভার করতে বলেছিলেন। ক্রাইম সিন থেকে যে ডিজিটাল এভিডেন্স ডিলিট করে দেওয়া হয়েছিল, তার একটা পাঁচ সেকেন্ডের ব্যাকআপ ক্লিপ আমরা ডার্ক ওয়েবের সার্ভার থেকে ট্রেস করে রিকভার করতে পেরেছি।”
আয়ুশ ঝটপট উঠে দাঁড়াল।

_”প্লে করো, নিশীথ।”
নিশীথ ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা প্লাগ-ইন করতেই প্রজেক্টর স্ক্রিনে একটা ঝাপসা, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ভিডিও ক্লিপ চালু হলো। সময়-কাল রাত ঠিক বারোটা বেজে বাইশ মিনিট। জেলের চার নম্বর সেলের লোহার শিকের ওপাশে জুইফান তখনো বেঁচে ছিল।
ঠিক তখনই করিডোরের আবছা আলোয় একটা অবয়বকে সেলের সামনে এসে দাঁড়াতে দেখা গেল। অবয়বটার পরনে জেলের ডাক্তারের অ্যাপ্রন, মাথায় সার্জিক্যাল ক্যাপ আর মুখে মাস্ক। অবয়বটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে স্লাইড লক খুলে সেলের ভেতরে ঢুকল। জুইফান ওকে দেখামাত্রই ভয়ে পেছনের দেয়ালের দিকে পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু ওই রহস্যময় ব্যক্তিটি এক ঝটকায় জুইফানের ঘাড় চেপে ধরে ওনার গলায় একটা হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ ফুটিয়ে দিল।
ভিডিওটা অত্যন্ত ঝাপসা হওয়ায় লোকটার মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু আয়ুশের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না একটা বিশেষ জিনিস। সেই রহস্যময় ঘাতক যখন জুইফানের ঘাড় ধরে সিরিঞ্জটা পুশ করছিল, তখন তার বাম হাতের কব্জির ওপর একটা বিশেষ ট্যাটু স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল-একটা তলোয়ারের চারপাশে জড়িয়ে থাকা বিষাক্ত সাপের ট্যাটু। ঘাতকের হাতের গড়ন, হাঁটার ভঙ্গি কোনো পুরুষের নয়, ওটা ছিল একজন নারীর শরীর!
_”স্টপ! রিউইন্ড অ্যান্ড জুম অন দ্য রিস্ট!”আয়ুশ বজ্রকণ্ঠে নির্দেশ দিল।
নিশীথ ভিডিওটা পজ করে সেই বাম হাতের কব্জির ট্যাটুটা জুম করল। স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠল সেই তলোয়ার আর সাপের নিখুঁত ডিজাইন। ট্যাটুটা দেখার পর আয়ুশ একটু মনে করতে লাগল,সে মনে হয় আগে এই ট্যাটুর মালিক কে দেখেছিলো। তবে ওর এখন কিছুই মনে আসছে না।

পার্কের বাঁধভাঙা বৃষ্টির বেগ একটু কমতেই সারিম অরিকে প্রায় জোর করেই কোলে তুলে নিয়ে গাড়ির ভেতরের উষ্ণতায় নিয়ে এল। ভেজা কাপড়ে এসি চালালে বউটার ঠান্ডা লেগে যাবে, তাই এসি বন্ধ করে ও মেইন রোডে গাড়ি তুলে দিল। অরি জানালার কাঁচের গায়ে জমে থাকা পানির ফোঁটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিল, ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল এক চিলতে তৃপ্তির হাসি।
মিনিট বিশেক পর গাড়িটা একটা সুউচ্চ বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল। আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে গাড়িটা পার্ক করে সারিম অরির হাত ধরে লিফটের দিকে পা বাড়াল, অরি কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে চারপাশটা দেখতে লাগল। লিফট থেকে নেমে একটা কাঠের দরজার সামনে আসতেই অরি সারিমের দিকে তাকিয়ে নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করল।

_”এটা কার বাসা, সারিম? আমরা এখানে কেন এসেছি?”
সারিম পকেট থেকে চাবি বের করে লকটা খুলতে খুলতে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল,
_”এটা আমার ফ্ল্যাট,”
_”আপনি আবার ফ্ল্যাট কবে কিনলেন।
_”রাজশাহী থাকাকালীন প্রায় সময় আমাকে কাজের ক্ষেত্রে এখানে থাকতে হতো,তখন নিয়েছিলাম।
_”ওহ,
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই অরির চোখ দুটো বিস্ময়ে জোড়া লেগে গেল। ফ্ল্যাটটা ভেতর থেকে বিশাল! ডুপ্লেক্স স্টাইলের লিভিং রুম, ওপরের দিকে চলে গেছে রাজকীয় কাঠের সিঁড়ি। আধুনিক আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো থাকলেও পুরো ঘরে এক ধরণের ছিমছাম, শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে।
অরি চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখে সারিমের সামনে এসে দাঁড়াল। ওর শার্ট থেকে তখনো টুপটুপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে।

_”একা একটা মানুষের থাকার জন্য এত বড় ফ্ল্যাট কিনেছেন কেন আপনি?”
সারিম ওর ভেজা শার্টের ওপরের দুটো বোতাম আলগা করতে করতে অরির খুব কাছাকাছি এগিয়ে এল। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা,মাদকতাভরা বাঁকা হাসি।
_”তাতে কী হয়েছে? একা আছি বলে কি আজীবন একাই থাকব? ফ্ল্যাটটা এখন বড় মনে হলেও কোনো সমস্যা নেই… দরকার পড়লে আমাদের ডজন খানেক ছানাপোনা এনে পুরো ঘর ভরিয়ে দেব। তখন দেখবে এই জায়গাটাও ছোট মনে হচ্ছে।”
সারিমের এই অকপট অসভ্যতামি শুনে অরির ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তে লজ্জায় লাল টমেটো হয়ে উঠল। ও এক পা পিছিয়ে গিয়ে দুই হাত দিয়ে নিজের ভেজা শার্ট চেপে ধরল।
_”অসভ্য লোক একটা! মুখ থেকে সবসময় খালি এসব ফালতু কথাই বের হয়, তাই না?”
সারিম আর কথা বাড়াল না। সে আলতো করে হেসে পাশ থেকে একটা নরম, শুকনো তোয়ালে তুলে নিল। অত্যন্ত যত্ন করে সারিম অরির মাথাটা আলতো হাতে মুছে দিতে লাগল। ওর আঙুলের ছোঁয়া যখন অরির ভেজা কানের লতিতে লাগছিল, অরি আড়ষ্ট হয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল। মাথা মোছা শেষে সারিম নিজের ওয়ার্ডরোব থেকে ওর নিজের একটা লুজ-ফিট শার্ট আর একটা ট্রাউজার বের করে অরির হাতে দিল।অরি সারিমের সেই বিশাল সাইজের শার্ট আর ট্রাউজার হাতের ওপর মেলে ধরে চোখ বড় বড় করল।

_”নেও এগুলো পরে আসো”
_”এগুলো আমার গায়ে ফিট হওয়া তো দূরের কথা,পরলে তো কোমর থেকে খুলেই পড়ে যাবে!”
সারিম ওর কপালে একটা হালকা টোকা দিয়ে বলল,
_”আপাতত এগুলো দিয়েই কাজ চালিয়ে নাও। ভেজা কাপড়ে থাকলে ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। যাও, ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।”
অরি মুখ ফুলিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এদিকে সারিম অন্য একটা গেস্ট রুমের ওয়াশরুমে গিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে একটা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরে বেরোলো। সারিম ভালো করেই জানে, অরির গোসল করতে অনেক সময় লাগে।এই সুযোগে সারিম সরাসরি কিচেনে চলে গেল। সকাল থেকে ওর বউটা একটা দানাও মুখে তুলতে পারেনি। ক্ষুধায় নিশ্চয়ই ওর পেট চুঁইচুঁই করছে। সারিম ওভেনের ক্যাবিনেট ঘেঁটে পাউরুটি, চিজ আর স্লাইসড চিকেন বের করল। মিনিট পনেরোর মধ্যে ও দুটো চিজি স্যান্ডউইচ আর দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি বানিয়ে ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রাখল। ঠিক তখনই রুমের দরজা খোলার মৃদু শব্দ হলো।

সারিম ঘুরে তাকাতেই থমকে যাওয়ার উপক্রম হলো। ওয়াশরুম থেকে অরি বেরিয়ে এসেছে। সারিমের সেই বিশাল শার্টটা ওর হাঁটু অব্দি নেমে এসেছে, ট্রাউজারের কোমরটা ও কোনোমতে একটা দড়ি দিয়ে টেনেটুনে বেঁধে রেখেছে। হাতার কাপড়গুলো কব্জি ছাড়িয়ে ঝুলে থাকায় বেচারি বারবার ওগুলো গুটানোর চেষ্টা করছে। ওকে দেখতে হুবহু কোনো আজব, কিউট ভিনগ্রহের প্রাণীর মতো লাগছিল!
সারিম একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।লক্ষ করল, দিন দিন ওর বউটা যেন আরও বেশি রূপসী হয়ে উঠছে। ভেজা চুল থেকে ঝরে পড়া পানির ফোঁটাগুলো ওর ফর্সা গলায় এক অদ্ভুত চমক তৈরি করেছে। সারিম বিরবির করে বলতে লাগল,

_“এভাবে যদি বউয়ের রূপ দিন দিন বাড়তে থাকে, তবে তো একে বাহিরে বের হওয়া নিষিদ্ধ করে,প্যাকেটে পুরে ঘরে রেখে দিতে হবে।”
অরি টেনেটুনে জামাটা ঠিক করে টেবিলের কাছে আসতেই সারিম নিজের ঘোর কাটিয়ে অত্যন্ত ভদ্রলোকের মতো একটা চেয়ার টেনে এগিয়ে দিল।
_”বসুন, আমার রাজকন্যা।”
অরি ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে স্যান্ডউইচের দিকে তাকাল। খিদেয় ওর পেট আসলেই জ্বলছিল।
_”আপনি বানিয়েছন?”
_”হুম। খেয়ে দেখ,” সারিম কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বলল।
অরি এক কামড় দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল। ক্ষুধার্ত পেটে এই চিজ আর চিকেনের মেলবন্ধন যেন অমৃতের মতো লাগল।ঠিক তখনি টেবিলের ওপর রাখা সারিমের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। ওপাশ থেকে ওর পিএস-এর কল।
সারিম ফোনটা রিসিভ করে কানে দিল। ওপাশ থেকে পিএস কী বলছিল তা বোঝা যাচ্ছিল না, তবে সারিম অত্যন্ত পেশাদার এবং গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল

_”ঠিক দুপুর বারোটায় রেজাল্ট সার্ভারে লাইভ হবে। আমি নিজেই লিংকটা অ্যাক্টিভেট করার পারমিশন দিয়েছি। সব প্রিপারেশন রেডি রাখো।”
সারিমের মুখ থেকে ‘বারোটায় রেজাল্ট পাবলিশ’ শব্দটা শোনা মাত্রই অরির হাতের স্যান্ডউইচটা প্লেটে পড়ে গেল। ওর চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল।এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে চকিতে দাঁড়িয়ে পড়ল অরি!হঠাৎ ওর মস্তিষ্কের সুপ্ত নিউরনগুলো সজাগ হয়ে উঠেছে। আজকে যে ওর এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার কথা ছিল! তা প্রায় পুরো ভুলেই বসে ছিল সে!
অরিকে ওভাবে আচমকা ভূত দেখার মতো দাঁড়িয়ে যেতে দেখে সারিম কফির মগটা নামিয়ে রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
_”কী হলো বউ? কোনো সমস্যা? স্যান্ডউইচ ভালো লাগেনি?”
অরি সারিমের দিকে তাকিয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠল,
_” আজ তো আমার এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে!”
সারিম বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না।সে অত্যন্ত স্বাভাবিক, ভাবলেশহীন গলায় কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল,

_”তো?”
_”তো মানে কী? একটু আমার রেজাল্টটা আগে চেক করে দিন না! আপনি তো শিক্ষামন্ত্রী, আপনার কাছে তো আগেই ডেটাবেস চলে আসে। প্লিজ, একটু দেখুন আমার রেজাল্ট কি?!”
_”রেজাল্ট বারোটায় অফিশিয়ালি পাবলিশ হলে সবাই একসাথে দেখতে পারবে। তার আগে সার্ভার লক থাকে। আর এত প্যারা নিচ্ছ কেন? তুমি এমনিতেই এ+ পাবে। আমার বিদ্যাসাগর বউ বলে কথা!”
অরি দেখল সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। লোকটা ক্ষমতার চেয়ারে বসেও বউয়ের জন্য একটুও স্পেশাল সুবিধা দিচ্ছে না! অরির বুকের এখন ভয়ে, উত্তেজনায় ড্রাম বাজছে।সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গুটি গুটি পায়ে টেবিলটা ঘুরে সারিমের চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল।
সারিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, অরি এক ঝটকায় সারিমের কোলের ওপর উঠে বসল! ওর সেই বিশাল লুজ শার্টের ঘের নিয়ে ও সারিমের শক্ত, চওড়া উরুর ওপর নিজের জায়গা করে নিল। দুই হাত দিয়ে সারিমের ভেজা চুল আর চওড়া গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল-

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৬

_”এমন কেন করছেন, সারিম? আমি আপনার বিবাহিত বউ-ই তো হই, বাইরের কেউ তো আর নই! একটু আগেভাগে রেজাল্টটা দেখলে কী এমন ক্ষতি হবে আপনার? একটু দেখুন না, প্লিজ!”
সারিম আচমকা কোলের ওপর নিজের চন্দ্রিমার এই উষ্ণ ও নরম ছোঁয়া পেয়ে এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।ভেতরের পুরুষালি চাহিদাটা মুহূর্তের মধ্যে চাড়া দিয়ে উঠল।এক হাত দিয়ে অরির কোমরটা শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ওর মুখের খুব কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল
“বউয়ের অধিকার ফলাচ্ছ, চন্দ্রিমা? রেজাল্ট দেখতে হলে তো একটা ঘুষ দিতে হবে।আমি কিন্তু ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করবো না।”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here