Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৫

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৫
মেহজাবিন নাদিয়া

অরি বেলকনির সোফায় শরীরটা এলিয়ে পড়ে আছে। পরনে একটা ওভারসাইজড শার্ট, যেটা অরির কাঁধ থেকে কিছুটা ঝুলে আছে। টেবিলের ওপর ফেলে রাখা রিডিং গ্লাসটা এখন আর কোনো উপকারে আসছে না, কারণ অরির ঝাপসা দৃষ্টি এখন বইয়ের পাতায় নয়, বরং বাইরের অন্ধকার আকাশটার দিকে নিবদ্ধ। বাদামী চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়েছে, চোখের নিচে ফোলা ফোলা ভাব জানান দিচ্ছে অনেকক্ষণ সে কেঁদেছে। মুখটা এক অদ্ভুত শক্ত আবরণে ঢাকা,যেন ভেতরে ভেঙে পড়া অস্তিত্বটাকে সে প্রাণপণে আড়াল করে রেখেছে।​সারাদিন বইখাতাগুলো অস্পৃশ্য হয়ে পড়ে আছে। অরি যেন সময়ের স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তার মস্তিষ্কের ভেতরে এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সারিমের সেই উপহাসের সুর—অরি সারিমের জীবনে আসা দ্বিতীয় নারী।

​কথাটা কেমন ভোঁতা ছুরি হয়ে অরির হৃদয়ে বারবার আঘাত করছে। সারিম তাকে এভাবে না ঠকালেও পারত। ভালোবাসা না থাক, অন্তত মিথ্যে আশা তো না দিলেও পারত! সারিমের সেই পাগলামি, সেই আধিপত্য, সেই অদ্ভুত মায়া—কবে যে অরি নিজের অজান্তেই এগুলোর মধ্যে তলিয়ে গিয়েছিল, তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু এখন সবটাই যেন একটা নিষ্ঠুর প্রহসন মনে হচ্ছে। অরি বুঝতে পারছে না,সে কি সারিমের জীবনের কোনো এক অধ্যায় ছিল, নাকি নিতান্তই কোনো ‘অপশনাল’ চরিত্র, যে পরিস্থিতির প্রয়োজনে এসেছে এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে হারিয়ে যাবে?
​অরি ধীরে ধীরে উঠে বসল। নিজের হাত দুটোকে মুঠো করে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, যেন নিজেকেই কিছু একটা বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে-
​_“আইম ওকে। সিরিয়াসলি, আইম ফাইন। ইটস জাস্ট অ্যা ফেজ। সব ঠিক হয়ে যাবে। এটা তো কিছুই না, একটা সাময়িক ঝড় মাত্র।”

​কথাগুলো বলতে গিয়ে ওর গলার স্বর কেঁপে উঠল। নিজের চোখের জলটুকু হাত দিয়ে দ্রুত মুছে ফেলল অরি। নিজের আবেগগুলোকে এভাবে প্রকাশ করা ওর কাছে এখন বড্ড বেমানান, বড্ড দুর্বলতার মনে হচ্ছে।অরি নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল।​ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় টোকা পড়ল।এই সময় আবার কে এসেছে তা দেখার জন্য অরি বেলকনির সোফা ছেড়ে উঠে দাড়াল। চোখটা ভালো ভাবে মুছে নিয়ে,টেবিলের উপর থেকে রিডিং গ্লাসটা পরে নিল। দরজা খুলতেই সামনে আনতারা মৃধাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অরি একটু অস্বস্তিবোধ করলো।তবে আনতারা মৃধা সেসবে পাত্তা না দিয়ে দ্রুত গলায় তাড়া দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন,
_”ভিতরে জেবা আছে? থাকলে ওকে বলো দ্রুত নিচে আসতে।”
_”জেবা এখানে নেই।ওতো সেই কখন রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
আনতারা মৃধা অরির কথা শুনে অবাক হলেন। বেরিয়ে গেছে মানে?জেবাকে ওনি নিচে নামতে দেখেনি। গেল কোথায় তাহলে মেয়েটা। ওনি অরির দিকে তাকিয়ে পুনরায় কনফার্ম হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করেন।
_”তুমি সিওর তো!

অরি মাথা নাড়াল। আনতারা মৃধা একটু চিন্তায় পরলেন, মেয়েটা কোথায় যাবে তা ভাবতে লাগলেন। পরক্ষনেই মনে করলেন বাড়ির অন্য রুমগুলো একবার চেক করা উচিত হয়তো কোনো রুমে জেবাকে পেয়ে যাবেন তিনি।
অন্ধকার চিলেকোঠার দমবন্ধ করা গুমোট পরিবেশে জেবা ভয়ে কুঁকড়ে আছে। ছোটবেলা থেকেই অন্ধকারের প্রতি তার এক তীব্র, প্রায় পঙ্গু করে দেওয়া আতঙ্ক ছিল। আজ সেই অনিশ্চিত অন্ধকারের বুক চিরে একাকী বন্দি থাকার যন্ত্রণা যেন তার সহ্যশক্তির শেষ সীমানাটুকুও গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল। চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন জীবন্ত হয়ে তাকে গ্রাস করতে আসছিল। জেবার মনে হচ্ছিল, বাতাস ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা হাতুরে পেটার মতো ধকধক করছে, কপালে জমে উঠেছে ঠাণ্ডা ঘামের বিন্দু।
এক সময় সেই তীব্র ভয়ের প্রভাবে জেবার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। মাথার ভেতরটা প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে শুরু করতেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। অন্ধকার যেন একটা দানবের মতো তাকে গিলে ফেলল। অস্ফুট একটা কান্নামিশ্রিত আর্তনাদ তার গলা চিরে বেরিয়ে এলো।
আর পরক্ষণেই সব কিছু নিথর হয়ে গেল। চিলেকোঠার ঠাণ্ডা, শক্ত ও ধুলোবালিমাখা মেঝেতে অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ল জেবা। তার নিস্পন্দ শরীরটা পড়ে রইল এক কোণে, চারপাশের অন্ধকারটা যেন তাকে দেগে এক পৈশাচিক জয়ে হাসতে লাগল।
আনতারা মৃধা গেস্ট রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন যেখানে জেবার থাকার কথা ছিল, সেখানে গিয়ে দেখলেন ঘর একদম ফাঁকা।আনতারা মৃধা ভ্রু কুঁচকে ডাকলেন,

_”জেবা?তুমি এখানে আছো!”
কোনো উত্তর নেই।
তিনি ওয়াশরুম, ব্যালকনি, এমনকি আশপাশের অন্যান্য গেস্ট রুমেও খুঁজলেন।অরির রুমেও নেই মেয়েটা।পুরো বাড়িতে কোথাও জেবার চিহ্নমাত্র নেই। জেবাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে আনতারা মৃধার মেজাজ চরমে পৌঁছে গেল। ওনার মনে হলো,এই মেয়েটা ইচ্ছা করেই সবাইকে নাচিয়ে মারছে।
তিনি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন।চোখে-মুখে তখন তার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত,সোলেমান শেখ ড্রয়িংরুমের সোফায় অত্যন্ত অধৈর্য ও অশান্ত হয়ে বসে ছিলেন। তিনি বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। আনতারাকে একাকী, শূন্যহাতে ফিরে আসতে দেখে তিনি কিছুটা অবাক এবং একই সাথে বিরক্ত হয়ে সোজা হয়ে বসলেন। উদ্বেগ মেশানো স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন,
_”জেবা কোথায়? ও কি এখনো রেডি হয়নি? ওর ব্যাগ গোছানো হয়নি? কতক্ষণ আর বসে থাকব এখানে? আমার আরও জরুরি কাজ আছে!”

আনতারা মৃধা রাগে কাঁপতে কাঁপতে সোফায় এসে বসলেন।ঝাঁঝালো কণ্ঠে, বিষাক্ত হাসির রেখা টেনে বললেন,
_”কোথায় আর থাকবে তোমার ঐ আদরের মেয়ে? নিশ্চয়ই এই বাড়িতে থাকার জন্য নতুন কোনো নাটক শুরু করেছে! পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলাম,কোথাও তোমার মেয়ের দেখা নেই। ওপরের ঘর ফাঁকা,অথচ ও ভালো করেই জানে আজ তুমি ওকে নিতে এসেছ। মনে হয় নতুন কোনো ফন্দি এঁটে কোথাও লুকিয়ে আছে, যাতে ওকে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া না যায়।”
আনতারা মৃধার মুখে এমন অপবাদ ও অপমানজনক কথা শুনে সোলেমান শেখের মুখের রং মুহূর্তে বদলে গেল। তিনি একজন ব্যবসায়ী, সমাজে তার একটা আলাদা প্রতিপত্তি আছে। নিজের চোখের সামনে নিজের মেয়ের এমন নির্লজ্জ আচরণ করবে, এটা তার পিতৃসুলভ আত্মসম্মানে প্রচণ্ড এবং মারাত্মক আঘাত করল। রাগে লজ্জায় ওনার কানের লতি লাল হয়ে উঠল।
তিনি সোফায় হেলান দিয়ে বসে থাকা আরিশান মৃধার দিকে তাকালেন। আরিশান মৃধা তখনো ফোন ক্রোল করতে করতে অত্যন্ত শান্ত ও নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে ছিলেন,যেন চারপাশের এই নাটকের সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই। সোলেমান শেখ গলাটা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর, অপরাধবোধে ম্লান ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন,

_”আরিশান, আমি সত্যি লজ্জিত এবং দুঃখিত। একজন বাবা হিসেবে আজ আমার মাথা হেট হয়ে গেছে। সবকিছু ভুলে, ওর করা সমস্ত অবাধ্যতা আর পাগলামি মার্জনা করে মেয়েকে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিতে এসেছিলাম আজ। ভেবেছিলাম মেয়েটা হয়তো এতদিনে কিছুটা পরিণত হয়েছে, নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এখানে এসেও যে সে আবার এমন অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।”
আরিশান মৃধা ফোন থেকে মুখ না তুলেই জবাব দিলেন।
_”ইটস ওকে!ছোট মানুষ হয়তো আবেগের বসে আবার সেই একি ভুল করে বসেছে। আমি দেখছি এই ব্যাপারটা।
আরিশান মৃধার কথায়।
সোলেমান শেখ সোফা ছেড়ে সশব্দে উঠে দাঁড়ালেন।তিনি আরিশান মৃধার নিকট এক পা এগিয়ে গিয়ে বললেন,
_”তবুও মেয়েকে ভালো শিক্ষা দিতে না পারার জন্য, তাকে একজন ভদ্র পরিবারের সন্তানদের মতো যোগ্য করে গড়ে তুলতে না পারার জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও আরিশান। একজন বাবা হিসেবে আমি আজ সত্যিই পুরোপুরি ব্যর্থ! আমি তাকে শাসন করতে পারিনি, তারই খেসারত আজ সমাজ আর তোমার সামনে আমাকে দিতে হচ্ছে।”

আরিশান মৃধা সোফায় হেলান দিয়ে শান্তভাবে বসে সোলেমান শেখের কথাগুলো শুনছিলেন।মুখের অভিব্যক্তি একদম শান্ত, বিন্দুমাত্র বিচলিত হতে দেখা গেলো না তাকে।টেবিলে রাখা কফির কাপ থেকে একটা মৃদু চুমুক দিয়ে তিনি সোলেমান শেখের দিকে তাকালেন,কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য করলেন না।ওনার এই মৌনতা যেন সোলেমান শেখকে ভিতরে ভিতরে একধরনের অপরাধবোধে জর্জিত করলেন।তিনি মেয়ের উপর রাগ নিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠেন।
_”জেবা নামক আমার কোনো মেয়ে ছিল বা আছে, তা আজ থেকে আমি আমার মন থেকে,আমার জীবন থেকে মুছে ফেললাম। সে আমার জন্য মৃত! মেয়েটা পদে পদে আমার সম্মান ধুলোয় মিশিয়েছে, আমার মাথা সমাজের সামনে নিচু করেছে।এখন আবার বাবার বয়সী একজন পুরুষের সংসারে তৃতীয় পক্ষ হয়ে থাকতে চাচ্ছে,এসব ভাবলেই তো ঘৃন্না হয় আমার!এত বড় নির্লজ্জ মেয়ে আমি জন্ম দিইনি, যার ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ বলতে কিছু নেই।”
সোলেমান শেখ আনতারা মৃধা আর আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে বললেন,
_”বাকিটা তোমরা ভালো বোঝো। এই মেয়েকে যা করার তোমরাই করবে। আই ডোন্ট কেয়ার! যদি পারো ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও, আমার কোনো আপত্তি নেই।আমি গেলাম!”
সোলেমান শেখ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ওনার আত্মসম্মানের এতটাই আহত হয়েছিল যে, তিনি মেয়ের খোঁজে একবার ওপরে যাওয়ার প্রয়োজনও মনে করলেন না। হনহন করে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওনার গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার কর্কশ শব্দটা ড্রয়িংরুম অব্দি ভেসে এলো।
সোলেমান শেখ চলে যাওয়ার পর বিশাল ঘরটা এক ভারী, থমথমে নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে আনতারা মৃধা এবার নিজের ভেতরের জমে থাকা সবটুকু বিষ উগরে দিতে শুরু করলেন। তিনি এতক্ষণ সোলেমান শেখের সামনে কিছুটা সংযত থাকার ভান করছিলেন, কিন্তু এখন আর কোনো বাধা রইল না। আরিশান মৃধার দিকে এগিয়ে এলেন তিনি,চোখ দুটো সরু হয়ে উঠল। তীক্ষ্ণ ও চড়া গলায় রেগে বললেন,

_”দেখেছ আরিশান? মেয়েটার সাহস কত বড়! একটা বাবার বয়সী লোকের সঙ্গে থাকার জন্য কী জঘন্য পাগলামিটাই না করছে! আমি তখন ছিলাম না বলে হয়তো তুমি ওকে প্রশ্রয় দিয়েছ। কিন্তু এখন আমি এসেছি। আমি এই ক্যারেক্টারলেস মেয়েকে আর এক মুহূর্তও এই বাড়িতে সহ্য করব না।”
আরিশান মৃধা তখনও স্থির, নির্বিকার। তার চোখে এক অদ্ভুত, অচেনা শীতলতা। আনতারা থামলেন না, নিজের ক্ষোভ উসকে দিয়ে চালিয়ে গেলেন,
_”তুমি এভাবে কেন চুপ করে আছ কেন আরিশান? এই নোংরা মেয়েটার সাহস হয় কী করে তোমাকে এভাবে অপমানিত করার? সমাজের লোকজন তোমার দিকে আঙুল তুলবে!তোমার সম্মানের কি কোনো দাম নেই? তোমার উচিত ওকে একটা চরম শিক্ষা দেওয়া। যতো দ্রুত সম্ভব এই মেয়েকে ডিভোর্স দাও! এই কলঙ্কিনীকে বিদায় করো বাড়ি থেকে।আমি নিশ্চিত এই মেয়ে বাড়ির ভিতরে কোথাও ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসে আছে।”
এবার আরিশান মৃধা মুখ খুললেন। অত্যন্ত গম্ভীর ও নিচু স্বরে বললেন,

_”শান্ত হও আনতারা। আমি বিষয়টি দেখছি। তোমাকে এত উতালা হতে হবে না।”
কিন্তু আনতারা মৃধা নিজের রাগের উত্তাপ সামলাতে পারছিলেন না। তিনি ফুঁসতে ফুঁসতে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
_ “উতালা হবো না মানে? তুমি কি এখনো ওর জালে আটকে আছ? আমি তোমাকে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি আরিশান,এই মেয়েকে আমি এই বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করেই ছাড়বো!”
ঠিক তখনি সোফা থেকে কোনো তাড়া ছাড়াই, অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়ালেন আরিশান মৃধা। ওনার মুখাবয়বে কেবল এক চরম উদাসীনতা ও বিরক্তি ফুটে উঠল। আনতারা মৃধাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তিনি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
আরিশান মৃধাকে চলে যেতে দেখে আনতারা মৃধা থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি চিৎকার করে পিছন থেকে ডাকলেন,
_”আরিশান! আরিশান, শুনো! আমি তোমার সাথে কথা বলছি! তুমি এভাবে আমাকে অবহেলা করে চলে যেতে পারো না!”

কিন্তু আরিশান মৃধা পিছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলেন না। ওনার শক্ত পায়ের আওয়াজ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আনতারা মৃধার কোনো ডাক, কোনো চিৎকারই ওনার কান অব্দি পৌঁছাল না। ওনার এই নীরব অবজ্ঞা আনতারা মৃধার ইগোতে চরম আঘাত করল।আগে আরিশান মৃধা শতকাজে ব্যাস্ত থাকলেও আনতারা মৃধাকে উপেক্ষা করার সাহস তিনি কখনোই দেখাতো না। আর এখন সেই আরিশান মৃধাই ওনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না। ভাবতেই ওনার ভিতরে রাগে ফেটে পড়ছেন।আরিশান মৃধার এতো পরিবর্তন তিনি মেনে নিতে পারছেন না।এসব কিছুর জন্য জেবাকে দায়ী মনে হলো ওনার,
আরিশান মৃধা চোখের আড়াল হতেই আনতারা মৃধা রাগে-ক্ষোভে একদম ক্ষেপে গেলেন।পুরো শরীর কাঁপতে লাগল তার, হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। ড্রয়িংরুমের ফাঁকা দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে ওনার মনে হলো, জেবা নামের ওই মেয়েটা যেন না থেকেও ওনাকে হিংসেয় পুড়িয়ে মারছে।সোফায় বসে পড়ে আনতারা মৃধা নিজের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,
_ “এত বড় সাহস! আমার কথা এভাবে এড়িয়ে চলে গেল? ওই সাধারণ বাচ্চা মেয়েটার জন্য আরিশান আজ আমাকে অবহেলা করছে!”

তার চোখ দুটো হিংস্রতায় চকচক করে উঠল। গলার স্বর আরও নিচু, কিন্তু বিষাক্ত হয়ে এল। নিজেকেই নিজে শোনানোর মতো করে বললেন,
_”তোমার জীবন থেকে যেভাবেই হোক ওই মেয়েকে আমার সরাতেই হবে আরিশান! তা সে যে পথেই হোক না কেন। নয়তো… নয়তো আমার এত বছরের গড়ে তোলা সব প্ল্যান এক নিমেষে শেষ হয়ে যাবে! এত সহজে আমি আমার রাজত্ব অন্য কারও হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।এই জেবাকে এই বাড়ি এই সংসার এবং তোমার জীবন থেকে চিরতরে মুছে ফেলবো আমি!”

ক্রোধের এক তীব্র জ্বলন বুকে চেপে আনতারা মৃধা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ড্রয়িংরুমের গুমোট বাতাস যেন ওনার দম আটকে দিচ্ছিল। মাথার ভেতর জেবাকে সরানোর হাজারটা কুটিল বুদ্ধি অনবরত ঘুরপাক খাচ্ছিল। নিজেকে কিছুটা শান্ত করতে এবং এই থমথমে পরিবেশ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে তিনি ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।এই মুহূর্তে এক কাপ কড়া কফি ওনার এই উত্তপ্ত মস্তিষ্ককে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারবে।
ঠিক তখনই সদর দরজা গলিয়ে ক্লান্তিভরা পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল সারিম। আজকের দিনটা ওর ওপর দিয়ে প্রচণ্ড ঝড়ের মতো বয়ে গেছে। শিক্ষা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, একের পর এক ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাটি আর মানসিক ধকল—সব মিলিয়ে সে বড্ড ক্লান্ত। শার্টের ওপরের দুটো বোতাম আলগোছে খোলা, টাইটা কিছুটা ঢিলে করে গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে সে। ক্ষণে ক্ষণে এক একটা দীর্ঘশ্বাস ওর বুক চিরে বেরিয়ে আসছিল। আজ সারাদিনের কাজের ব্যস্ততার মাঝেও ওর মনের এক কোণে অনবরত খচখচ করছিল দুপুরের সেই অদ্ভুত ঘটনাটা। অরি কেন কোনো কারণ ছাড়া ওকে ওভাবে পরপর ছ’টা চড় মারল, সেই হিসাব সে হাজার ভেবেও মেলাতে পারেনি। বুকজুড়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর তীব্র ব্যাকুলতা নিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল।
সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে সারিম ক্লান্ত শরীরে নিজের ঘরে গিয়ে একা একা বিশ্রাম নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ওর নেই। ওর মন, ওর সমস্ত সত্তা আজ তীব্রভাবে চন্দ্রিমাকে চাইছে। বউয়ের ওপর অভিমান বা রাগ কোনোটাই ওর মনে টিকতে পারল না; বরং এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা কাঁপছিল। সে সোজা পা বাড়াল তিন তলার দিকে, অরির রুমে।

ধীর পায়ে করিডোর পার হয়ে অরির রুমের সামনে এসে দাঁড়াল সারিম। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। সারিম ক্ষণকাল দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর হাত তুলে দরজায় কড়াঘাত করল।
নিস্তব্ধ করিডোরে চড়ের মতো শোনাল সেই শব্দ। ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে আবারও একটু জোরে কড়াঘাত করল।
হঠাৎ সোফায় নিথর হয়ে বসে থাকা অরি দরজার আওয়াজে চমকে উঠল। চশমার আড়াল থেকে ওর ঝাপসা চোখ দুটো দরজার দিকে নিবদ্ধ হলো। এই সময় আবার কে এসেছে তা দেখার জন্য সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। লকটা ঘুরিয়ে দরজাটা সামান্য ফাঁক করতেই অরির চোখের সামনে ভেসে উঠল সারিমের সেই চেনা অবয়ব। লোকটার চোখে-মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ, চুলগুলো উসকোখুসকো।
সারিমকে দেখামাত্রই অরির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, দুপুরের সেই বিষাক্ত স্মৃতিটা আবার ওলটপালট করে দিল ওর ভেতরটা। কোনো কথা না বলে, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, অরি অত্যন্ত কঠোরভাবে ডাইরেক্ট সারিমের মুখের ওপর ধড়াম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল! এবং সঙ্গে সঙ্গেই ভেতর থেকে লক করার শব্দ হলো।
সারিম একদম আশ্চর্য হয়ে গেল! দরজার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল সে। বউটা আজকে ওর সঙ্গে এমন বিহেভিয়ার কেন করছে, তা কোনোভাবেই ওর মাথায় ঢুকছে না।মেয়েটার দিকে তাকালে একসময় শান্ত নদী মনে হতো, সে মেয়ে আজ এতটা রুক্ষ, এতটা অশান্ত কীভাবে হয়ে গেল? সারিম দরজার বাইরে থেকে আবার ব্যাকুল হয়ে কড়াঘাত করতে লাগল। দরজায় হাত চাপড়ে সে কিছুটা চড়া অথচ অনুনয়ভরা গলায় বলল,

_“চন্দ্রিমা! চন্দ্রিমা, প্লিজ দরজাটা খোল। কী হয়েছে তোমার বউ, অন্তত বলো আমাকে? এভাবে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলে আমি কীভাবে বুঝব?”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না। অরি দরজার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা চেপে ধরল যাতে ভেতরের উপচে আসা কান্নার শব্দ বাইরে না যায়।সারিম আর কোনো উপায় না পেয়ে দরজার গায়ে কপাল ঠেকিয়ে অত্যন্ত নরম ও অপরাধী গলায় বলল,
_“যদি কিছু ভুল করে থাকি তবে রিয়েলি সরি বউ। আই এম সো সরি। দরজাটা খোলো না, জান! কী হয়েছে বলবে তো আমায়? তুমি যা শাস্তি দেবে, আমি হাসিমুখে মাথা পেতে নেব। দরকার হলে দোষ না করে হলেও তোমার সব শাস্তি আমি মেনে নেব, তাও প্লিজ এমন নিঝুম হয়ে থেকো না। সোনা, দরজাটা একবার খোলো…”
দরজার অপাশে থাকা অরি সারিমের এসব আকুতি, ভালোবাসামাখা কথা শুনে কেন যেন নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিল না। ওনার কণ্ঠের ওই ক্লান্তি আর ব্যাকুলতা অরির বুকের ভেতর এক তীব্র ভাঙচুর চালাচ্ছিল। ওর অবচেতন মন দুর্বল হৃদয় বারবার সায় দিচ্ছিল—দরজাটা খুলে দে অরি! দরজাটা খুলে লোকটার বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের সব অভিমান, সব কান্না উগরে দে।লোকটাকে নিজের করে আঁকড়ে ধর।
কিন্তু ঠিক পরমুহূর্তেই অরির ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিবেক আর আত্মসম্মানবোধ সজাগ হয়ে উঠল। এক কঠোর চাবুক মেরে ওর মনকে বোঝাল—‘না অরি, ভুলিস না তুই ওর জীবনের প্রথম নারী নোস। তুই কেবলই এক অপশনাল চরিত্র, একটা প্রয়োজন মাত্র। সারিম তোকে একটা প্রয়োজন মনে করে এখন এই মিথ্যে প্রেম দেখাচ্ছে। নিজের অতীতের শূন্যতা ঢাকতে তোকে সে খেলনা বানিয়েছে!’

নিজের ভেতরের এই তীব্র দ্বন্দ্ব, আত্মসম্মান আর ভালোবাসার লড়াইয়ের কাছে অরি শেষমেশ হেরে গেল। সে নিজের মনকে শক্ত পাথরে রূপান্তর করল। চোখের জলগুলো গড়িয়ে গাল বেয়ে নিচে পড়ে গেল, তাও সে হাত বাড়িয়ে দরজাটা আর খুলল না।
বাইরে দাঁড়িয়ে সারিম আরও বেশ কিছুক্ষণ দরজায় ধাক্কাল। অনুনয় করল, ডাকল, কিন্তু ওপাশ থেকে কেবল এক বুক ফাটানো নীরবতা ছাড়া আর কিছুই প্রতিধ্বনিত হলো না। এক সময় সারিমের সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো। বুকভরা একরাশ হতাশা, ক্লান্তি আর গভীর কষ্ট নিয়ে সে দরজার সামনে থেকে ধীর পায়ে সরে এল।
বাইরে থেকে সারিমের আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অরি বুঝতে পারল যে সারিম চলে গেছে। করিডোরটা আবার আগের মতোই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। অরি আস্তে আস্তে দরজা থেকে সরে এসে মেঝের ওপর ধপ করে বসে পড়ল। লোকটা চলে যেতেই ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে উঠল, যেন এক বিশাল শূন্যতা ওকে চারপাশ থেকে গ্রাস করে নিচ্ছে।

সারিম দুতলায় এসে নিজের রুমে না গিয়ে ডাইরেক্ট বাবার রুমে ঢুকে গেল। আরিশান মৃধা তখন ঘরের সোফায় বসে ছিলেন আর ল্যাপটপে জরুরি কিছু কাজ করছিলেন। সারিমকে রুমে ঢুকতে দেখেও ওনি না দেখার ভান করে নিজের কাজেই মগ্ন রইলেন। সারিম একরাশ ক্লান্তি নিয়ে সোফায় গিয়ে ধপ করে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল।
ঠিক এমন সময় আনতারা মৃধা আরিশান মৃধার জন্য নিজ হাতে এক মগ কফি বানিয়ে ঘরে আনলেন। দরজার দিকে তাকিয়ে আনতারা মৃধাকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে সারিমের বড্ড বিরক্ত লাগল। দুনিয়াতে মনে হয় সারিমই একমাত্র ছেলে, যার কিনা নিজের জন্মদাত্রী মাকে দেখলে এমন চরম বিরক্ত লাগে!
আনতারা মৃধা আরিশান মৃধার টেবিলের পাশে কফির মগটা নামিয়ে রেখে ধীর পায়ে সারিমের পাশের সোফায় এসে বসলেন। ছেলের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি অত্যন্ত মায়া দেখিয়ে ওর মাথাটাতে হাত বুলাতে গেলেন। সারিম ওনার হাতটা সরিয়ে দিল না, চুপচাপ বাধা না দিয়ে শুয়ে রইল।আনতারা মৃধা অত্যন্ত নরম গলায় সারিমকে জিজ্ঞাসা করলেন,

_“তোমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে সারিম? প্রচুর কাজ ছিল বুঝি আজ?”
সারিম চোখ বন্ধ রেখেই আলতো করে মাথা নাড়ল। আনতারা মৃধার এবার ছেলের জন্য সত্যিই একটু মায়া হলো। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন,
_“তুমি একটু বোসো, আমি তোমার জন্য রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত বানিয়ে আনছি।”
তবে ঘর থেকে যাওয়ার আগে তিনি একবার আরিশান মৃধার দিকে তাকালেন। আরিশান মৃধা তখন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে কফির মগে একটা চুমুক দিচ্ছিলেন। ওনাকে ওভাবে দেখে আনতারা মৃধার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা কুটিল হাসির রেখা ফুটে উঠল।মনে ওনার এখন কোন শয়তানি বুদ্ধির চাল চলছে, তা বোঝার উপায় কারো নেই।
আনতারা মৃধা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সারিম সোফায় ঝটপট উঠে বসল। বাবার দিকে তাকিয়ে উপহাসের সুরে বলল,

_“অভিনয়ে একশতে তিনশ এই মহিলা!অস্কার দেওয়া উচিত।”
আরিশান মৃধা ছেলের কথা শুনে হালকা হাসলেন। ল্যাপটপটা সামান্য নামিয়ে রেখে বললেন,
_“তুমি দিবে অস্কার?”
সারিম মুখটা কুঁচকে তাচ্ছিল্য ভরে বলল,
_“আমার এত ঠেকা পড়েনি! কুটনি বেডিকে পকেটের টাকা খরচ করে রিনা খানের অভিনয়ের জন্য অস্কার দিবো!”
আরিশান মৃধা ছেলের মুখে এমন ডায়লগ শুনে আবার একটু হাসলেন। এরপর কিছুক্ষণ রুমে এক গম্ভীর নীরবতা বিরাজ করল। আরিশান মৃধা চশমাটা ঠিক করে একটু চুপ থেকে গম্ভীর গলায় বললেন,
_“তোমার একটা হেল্প দরকার আমার, সারিম।”
সারিম আরিশান মৃধার সামনের টেবিল থেকে ওনার কফির মগটাকে নিজের দিকে টেনে নিল। তাতে একটা বড় চুমুক দিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_“কি রকম হেল্প?”
আরিশান মৃধা সোজা ছেলের চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত নিরাসক্ত অথচ স্পষ্ট গলায় বললেন,
_“তোমার মাকে আজকের রাতটা আমার থেকে দূরে রাখতে হবে।”
সারিম কফির মগ হাতে নিয়েই মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। অবাক চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবতেই চট করে পুরো বিষয়টা ওর উর্বর মাথায় ঢুকে গেল। সে ওনার দিকে এক চতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফোড়ন কেটে বলল,

_“বয়স দেখো একবার!”
আরিশান মৃধা বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে কঠোর গলায় বললেন,
_“আই ডোন্ট কেয়ার।”
সারিম কফির মগটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বাঁকা হেসে বলল,
_“জেবা তোমার থেকে অনেক ভালো ছেলে ডিজার্ভ করে। একে তো বুড়ো লোক, তার উপর আরেকটা বুড়ো বউ সহ দামড়া ছেলে আছে!”
আরিশান মৃধা ছেলের এই খোঁচায় ভেতরে ভেতরে কিছুটা চটে গেলেন। তিনি সোফায় একটু টানটান হয়ে বসে কঠোর গলায় বললেন,
_“বিয়ে দেওয়ার সময় তখন মনে ছিল না? এখন এসব বলে আমাকে জেলাস করানোর ট্রাই করছ?”
সারিম হুট করে শব্দ করে হেসে উঠল। ওনার দিকে তাকিয়ে বলল,
_“জেলেসি? তাও তোমার সঙ্গে? ইউ আর জোকিং ম্যান! বাই দ্য ওয়ে, শুনলাম তোমার বউয়ের একটা এক্স ছিল আগে? সে এখনো জেবাকে পছন্দ করে। অনেক টাচিং ফাচিং হয়েছিল ওদের মধ্যে… কী বলো তুমি? ছেলে ভালো, সেটিং করিয়ে দেবে নাকি?”

‘টাচিং ফাচিং’ শব্দটা শোনা মাত্রই আরিশান মৃধার পুরো মুখাবয়ব রাগে একদম থমথমে আর কঠোর হয়ে উঠল।তিনি ল্যাপটপটা সটান বন্ধ করে অত্যন্ত রাগী ও গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন,
_“আমার বউয়ের ব্যাপার থেকে একশত হাত দূরে থাকো সারিম! নিজের বউকে মানাও গিয়ে আগে।”
সারিম এবার নিজের বউয়ের কথা শুনে বাবার ওপর পাল্টা দোষ চাপিয়ে ক্ষোভের সুরে বলল,
_“আমার বউটাকে এমন বজ্জাত বানানোর পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান তোমার! তুমি আমার বউকে অতিরিক্ত পড়াশোনা করিয়ে নষ্ট করে দিয়েছ। দোয়া করি, তোমার বউ যেন তোমার রোমান্সে বাধা দেওয়ার জন্য হলেও পড়তে বসে! তখন বুঝবে এর স্বাদ কতটুকু!”
আরিশান মৃধা ছেলের এই মরিয়া ভাব দেখে ওনার রাগী ভাবটা সামলে নিয়ে এক চিলতে উপহাসের হাসি হাসলেন। অত্যন্ত তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,

_“নিজের ব্যর্থতাকে পড়াশোনার দায়ে চাপিয়ে দিচ্ছ? তা বলছ না কেন যে তুমি ব্যর্থ?”
সারিম এবার একটু চুপ হয়ে গেল। আরিশান মৃধার এই একটা কথাই যেন তীরের মতো ওর বুকে এসে বিঁধল। মনের ভেতর এক তীব্র খটকা লাগল—আসলেই কি এটা ওর নিজেরই ব্যর্থতা? অরিকে নিজের মনের কথা বোঝাতে না পারাটা কি ওরই অক্ষমতা?আরিশান মৃধা ছেলেকে ওভাবে হঠাৎ চুপ হয়ে চিন্তিত হতে দেখে সুযোগ বুঝে আরেকটু খোঁচা দিয়ে বলে উঠলেন,
_“তুমি রিয়েলিটি মেনে নাও সারিম। তুমি ব্যর্থ। আমাকে হারবাল দেওয়ার আগে নিজেকে একবার দিয়ে দেখো।”
সারিম এবার আর নিজের ইগো সামলাতে পারল না। সোফায় টানটান হয়ে বসে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
_“এই বাবা! এই মুখ সামলে কথা বলো বলছি! তুমি জানো আমি কে?”
আরিশান মৃধা অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলেন,
_“ঘোড়ার ডিম তুমি!”

সারিম যেন আকাশ থেকে পড়ল! নিজের বুকে হাত দিয়ে চরম অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
_“তুমি আমাকে ঘোড়ার ডিম বলতে পারলে? কোন দিক থেকে আমাকে তোমার ডিমের মতো দেখায়? এত হ্যান্ডসাম একটা ছেলেকে ডিমের সঙ্গে তুলনা? পাপ হবে তোমার, পাপ!”
আরিশান মৃধা আর কিছু বললেন না। এই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ওনার নিজের মাথাটাই এবার ধরে গেছে। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলের পাশে তাকিয়ে দেখলেন ওনার কফির মগটা একদম খালি। এতক্ষণে সারিম ওনার পুরো কফিটাই চুমুক দিয়ে শেষ করে দিয়েছে। আরিশান মৃধা ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_“আমার কফি তুমি কেন খেয়েছ?”
সারিম অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো হেসে জবাব দিল,
_“বেশ করেছি খেয়েছি!”
আরিশান মৃধা আর এক মুহূর্তও সেখানে বসা প্রয়োজন মনে করলেন না। তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনি রুম ছেড়ে বেরোতে যাবেন, ঠিক তখনই ঘরের দরজার সামনে সারিমের জন্য শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন আনতারা মৃধা। আরিশান মৃধাকে দ্রুত পায়ে বাইরে যেতে দেখে তিনি বেশ অবাক হলেন এবং পথ আটকে জিজ্ঞাসা করলেন,

_“কোথায় যাচ্ছো আরিশান?”
আরিশান মৃধা সোফায় বসে থাকা সারিমের দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
_“নিচে যাচ্ছি একটু, প্রয়োজন আছে।”
সারিম তখনি সোফা থেকে চট করে উঠে ওনাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সে আনতারা মৃধার হাত থেকে শরবতের গ্লাসটা নিজের হাতে নিল এবং ওনার হাত ধরে টেনে সোফার দিকে নিয়ে গিয়ে বসাল। অত্যন্ত আদুরে গলার ভান ধরে বলল,
_“মা, আমার মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে। একটু হাত বুলিয়ে দাও না প্লিজ।”
আনতারা মৃধা ছেলের এমন আকস্মিক আবদারে আর ‘না’ করতে পারলেন না। তিনি সোফায় বসে সারিমের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। ওদিকে আরিশান মৃধা এই সুযোগে দ্রুত পায়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেলেন।
আরিশান মৃধা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আনতারা মৃধার মনটা ভিতরে ভিতরে বড্ড ছটফট করতে লাগল। ওনার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান যেন দরজার ওপারেই চলে গেল। মনে মনে ওনার তীব্র আকুতি-যাতে আরিশান মৃধা দ্রুত কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে আসে। আজকের রাতটা যেভাবেই হোক আরিশান মৃধার থেকে ওনাকে ওনার পুরনো অধিকার আদায় করেই ছাড়তে হবে!
সারিম সোফায় মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়েই শরবতের গ্লাসটা মুখে তুলল। একচুমুক শরবত মুখে নিয়েই সে অত্যন্ত বিরক্তিকর মুখভঙ্গি করে ‘থু’ করে সোফার পাশে ফেলে দিল। বেশ চড়া গলায় বলল,

_“একী! এটা কী বানিয়েছ মা? লবণে একদম ভরে গেছে!”
আনতারা মৃধা বড্ড অবাক হলেন। ওনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন,
_“লবণ বেশি? আমি তো শরবতটা বানানোর পরেও নিজে চেক করে দেখছিলাম, তখন তো একদম ঠিকই ছিল!”
সারিম শরবতের গ্লাসটা ওনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
_“আমি মিথ্যে বলছি নাকি? তুমি নিজেই টেস্ট করে দেখো।”
আনতারা মৃধা আর কোনো দ্বিধা না করে সারিমের হাত থেকে গ্লাসটা নিলেন এবং টেস্ট করার জন্য বাকি শরবতটা এক ঢোক-দু ঢোক করে প্রায় পুরোটাই খেয়ে নিলেন। শরবতটা গলায় নামিয়ে তিনি সারিমের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
_“সবকিছু তো একদম ঠিকঠাকই আছে সারিম। লবণ তো একদম বেশি না!”
সারিম এবার ঠোঁটের কোণে একটা চতুর হাসি ফুটিয়ে বলল,
_“আমি জাস্ট মজা করেছি মা!”

এতে আনতারা মৃধার বড্ড রাগ হলো। ছেলের এমন অসময়ের ফাজলামো ওনার মোটেও পছন্দ হলো না। তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকালেন। সারিম সঙ্গে সঙ্গে নিজের কান ধরে অত্যন্ত মাসুম মুখ বানিয়ে বলল,
_“সরি মা! আর করব না।”
এই বলে সে আবার ওনার কোলে মাথা রেখে শান্ত ছেলের মতো শুয়ে পড়ল। আনতারা মৃধা ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ক্ষণে ক্ষণে আড়চোখে ঘরের দরজার দিকে তাকাচ্ছিলেন-আরিশান মৃধা এতক্ষণে ফিরে আসছে কিনা তা দেখার জন্য। ওনার পুরো মনোযোগ যে দরজার দিকে, সারিম শুয়ে শুয়েই জিনিসটা খুব ভালো করেই লক্ষ করছিল। তবে সে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপচাপ মায়ের কোলে মাথা দিয়ে মটকা মেরে শুয়ে থাকল।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর, আনতারা মৃধার মাথার ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে শুরু করল। ওনার চোখের পাতা দুটো ক্রমশ ভারী হয়ে আসতে লাগল। তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করেও নিজের চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছিলেন না। এক তীব্র, অবশ করা ঘুমের ভারে ওনার পুরো শরীর নিস্তেজ হয়ে এল। শরবতের মধ্যে মেশানো সেই কড়া ঘুমের ওষুধের তীব্র প্রভাবে শেষমেশ ওনি সোফাতেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়লেন। ওনার হাত দুটো সারিমের মাথা থেকে আলগা হয়ে পাশে পড়ে গেল।

আনতারা মৃধা সম্পূর্ণ অবচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেই সারিম ওনার কোলের ওপর থেকে নিজের মাথাটা তুলে বসল।মায়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সারিমের ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা জয়ের হাসি ফুটে উঠল।
সে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর আনতারা মৃধাকে আলতো করে নিজের কোলে তুলে নিল এবং অত্যন্ত সাবধানে মায়ের শরীরের সমস্ত ভার বহন করে পাশের খাটের ওপর শুইয়ে দিল। ওনার গায়ের ওপর চাদরটা টেনে দিয়ে সারিম এক ঝটকায় শার্টের হাতাটা ঠিক করল। আর এক মুহূর্তও সেই ঘরে না দাঁড়িয়ে, অত্যন্ত নিশব্দে রুমের লাইটটা অফ করে সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
সারিম অলস পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। আজকের রাতের পুরো সমীকরণটা সে নিজের মতো করে সাজিয়ে এসেছে। হঠাৎ মাঝপথে ওর নজর গেল সিঁড়ির নিচের দিকে।দেখতে পেল, অরি সিঁড়ি ভেঙে ওপরের দিকে উঠে আসছে। সম্ভবত তৃষ্ণা পেয়েছিল বলে নিচে জল খেতে গিয়েছিল। পরনে একটা হালকা রঙের ঢিলেঢালা শার্ট, চুলগুলো খোঁপা করা। সারিম অরিকে দেখামাত্রই ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে নিজের গতি কমিয়ে দিয়ে অরির পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করল।

অরি তখনো নিজের ভাবনায় এতটাই মগ্ন ছিল যে, সিঁড়ির ওপর সারিমের এই নিঃশব্দ উপস্থিতি সে বিন্দুমাত্র লক্ষ করেনি। সে আপন মনে ওপরের দিকে উঠছিল। সারিম ওর একদম কাছাকাছি এগিয়ে এল। অরিকে কোনো কিছু বোঝার বা রিয়্যাক্ট করার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়েই সে পিছন থেকে আচমকা দুই হাত বাড়িয়ে ওকে শক্ত করে এক্কেবারে বগলদাবা করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল!
হঠাৎ এই আকস্মিক ঝোড়ো আক্রমণে অরি চরম চমকে উঠল। সারিমকে দেখামাত্রই দুপুরের সেই জমাট বাঁধা রাগ আর অভিমান ওর ভেতরে আবার দপ করে জ্বলে উঠল। নিজেকে সারিমের লোহার মতো শক্ত হাত থেকে ছুটানোর জন্য অনবরত পা ছুড়ে ছটফট করতে লাগল। কিন্তু সারিম বউকে একদমই ছাড়ল না, বরং নিজের শরীরের সঙ্গে আরও শক্ত,নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। অরি নিজেকে মুক্ত করতে না পেরে এবার চরম ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের দুই হাত মুঠো করে সারিমের পিঠে আর মাথায় ইচ্ছেমতো কিল-ঘুষি মারতে শুরু করল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

_“ছাড়ুন আমাকে! অসভ্য লোক একটা, কী করছেন কী এসব? একদম নিচে নামিয়ে রাখুন বলছি!”
সারিম ওর পিঠে পড়া সেই নরম হাতের কিল-ঘুষিগুলোকে পাত্তাই দিল না; বরং এক গাল হেসে অরিকে নিয়ে সোজা নিজের রুমে এসে প্রবেশ করল। লাথি মেরে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে সে খটাস করে লক করে দিল। অরি ততক্ষণে রাগে কাঁপছে। সে সারিমের ওপর চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে বলল,
_“ছাড়ুন আমাকে! সমস্যা কী আপনার শুনি?আমার সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াবেন, আর আমি তা সহ্য করব?একদম না।আমাকে এক্ষুনি আমার রুমে যেতে দিন বলছি!”
সারিম কোনো কথা না বলে অরিকে নিয়ে সোজা খাটের দিকে এগিয়ে গেল। ওকে আবার আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে বিছানার ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিল। অরি ওখান থেকে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করতেই সারিম ঝটপট নিজে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অরির নরম ফর্সা পা দুটো,নিজের দুই হাতের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারিম ওর পা দুটো নিজের গালে ছোঁয়াল এবং সেখানে অত্যন্ত গভীর আবেশে উষ্ণ কয়েক চুমু এঁকে দিল।

জেবা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। চারপাশের আবছা আলো-আঁধারির মাঝে নিজের অবশ হয়ে আসা ইন্দ্রিয়গুলোকে সচল করার আপ্রাণ চেষ্টা করল সে। চোখের পাতা দুটো প্রচণ্ড ভারী ঠেকছে, যেন এক যুগ ধরে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল। মাথার ভেতরটা কেমন যেন হালকা ও ফাঁকা লাগছে। নিজেকে পুরোপুরি সচল করতেই জেবা আচমকা চমকে উঠল, বুকের ভেতরটা ধক করে ধাক্কা খেল।দেখতে পেল, সে কারো শক্ত ও নিরাপদ কোলের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে! শুধু তাই নয়, সেই লোকটা তাকে অত্যন্ত মমতায়, ঠিক ছোট বাচ্চাদের মতো দুই হাতে আগলে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে রেখে দিয়েছে।
জেবা চট করে নিজের মাথাটা সামান্য ওপরে তুলতেই তার চেনা অবয়বটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আরিশান মৃধা! নিজেকে ওনার এত কাছাকাছি, এভাবে ওনার কোলের ওপর আবিষ্কার করে জেবা মুহূর্তের মধ্যে চরম অস্বস্তিতে পড়ে গেল। লজ্জায়, সংকোচে ওর ফর্সা গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল।আরিশান মৃধার গভীর, নেশাচ্ছন্ন ও তীক্ষ্ণ চাউনি জেবার হৃদস্পন্দন এক নিমেষে শতগুণ বাড়িয়ে দিল। ওনার চোখের সেই চেনা অথচ অচেনা চাহনি দেখে জেবা কিছুটা নার্ভাস হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
পরক্ষণেই জেবার ঝাপসা মগজে দুপুরের স্মৃতিগুলো এক এক করে ভিড় জমাতে লাগল। ওর মনে পড়ল, সে তো চিলেকোঠার সেই অন্ধকার, দমবন্ধ করা ঘরে আটকা পড়ে ছিল! তবে সেখানে থেকে এই রুমে, আরিশান মৃধার কোলে সে কীভাবে আসলো? আর বাবা? বাবার কথা মনে পড়তেই জেবা তীব্র আশঙ্কায় আঁতকে শিউরে উঠল। নিজেকে আরিশান মৃধার বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে সে অত্যন্ত ব্যাকুল গলায় বলে উঠল,

_“আঙ্কেল ছাড়ুন!বাবা বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
আরিশান মৃধা জেবাকে ছাড়লেন না; বরং বাহুডোর আরও কিছুটা শক্ত করে নিলেন। তিনি অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় বললেন,
_“তোমার বাবা চলে গেছে, জেবা।”
জেবা ওনার কথা বিশ্বাস করতে পারল না। সে মাথা নেড়ে ছটফট করতে করতে বলল,
_“আপনি মিথ্যা বলছেন! বাবা আমাকে এভাবে একা ফেলে কখনোই যেতে পারেন না। আমি এক্ষুনি বাবার কাছে যাব, আমাকে ছাড়ুন!”
আরিশান মৃধা ওকে নিজের বুকের সাথে আরও নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে বললেন,
_“সত্যিই চলে গেছেন। উনি তোমাকে আমার কাছে সারাজীবনের জন্য রেখে গেছেন।”
জেবা অবাক হয়ে যায় আরিশান মৃধার কথায়।ওর বাবা ওকে এই লোকটার কাছে সারাজীবনের জন্য রেখে গেছে,এটা বিশ্বাস করতে ওর কষ্ট হচ্ছে খুব।আরিশান মৃধার এই আকস্মিক আচরণ ওর কাছে কেমন যেন অদ্ভুত আর নতুন ঠেকল। গম্ভীর প্রকৃতির এই লোকটা হুট করে ওকে এত কাছে কীভাবে টেনে নিল? অবচেতন মনে এক তীব্র ভালো লাগার সুড়সুড়ি জাগার সাথে সাথেই একরাশ লজ্জা এসে জেবাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ভর করল।
আরিশান মৃধা জেবার চিবুক ধরে মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরলেন। ওনার চোখে চোখ পড়তেই তিনি সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন,

_“আমার থেকে এভাবে পালাতে চাচ্ছিলে কেন?”
জেবা ভীষণ নার্ভাস হয়ে গেল। ওনার এত কাছাকাছি থাকায় ওর বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। সে চোখ নামিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
_“আগে আনতারা আন্টি ছিলো না… ওনি ছিলেন না বলেই তো আমি আপনার জীবনে এসেছিলাম। এখন ওনি আবার নিজের সংসারে ফিরে এসেছেন, তাই এখানে আমার থাকাটা বড্ড বেমানান লাগে।তাছাড়া আপনি তো আমাকে নয় ওনাকে ভালোবাসেন?”
আরিশান মৃধা কিছুক্ষণ গভীর নীরবতা পালন করলেন। জেবার চোখের ভেতরের লুকানো অভিমানটা যেন ওনার চেনা হয়ে গেল। তিনি জেবার ওষ্ঠাধরের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,
_“যদি বলি, ওকে চিরতরে ছেড়ে দেব শুধু তোমার জন্য?”
কথাটা শোনামাত্রই চরম বিস্ময়ে জেবার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।আরিশান মৃধার মুখ থেকে এমন কথা সে স্বপ্নেও আশা করেনি। জেবাকে আরও অবাক করে দিয়ে আরিশান মৃধা আচমকা ঝুঁকে ওর ফর্সা গালে টুপ করে একটা উষ্ণ চুমু এঁকে দিলেন।জেবা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ওর কাছে এই মুহূর্তের সবকিছুই এক সুন্দর অবাস্তব স্বপ্ন মনে হচ্ছিল।জেবা কোনোমতে ওনার বুক ঠেলে নিজেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে অস্ফুটে বলল,

_“আপনি প্লিজ এমনটা করবেন না।এটা ঠিক নয়।”
_”কোনটা ঠিক নয়?”
_”আপনি আমার জন্য জন্য আনতারা আন্টিকে ছাড়বেন না প্লিজ।”
_“যদি ছেড়ে দেই, তাহলে কী করবে?”
জেবা অত্যন্ত মায়াবী চোখে ওনার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
_“আমি চাই না আমার জন্য আপনি সারিম ভাইয়া, অরি কিংবা আনতারা আন্টি—সবার চোখে খারাপ হোন। আমি কারো সংসার ভেঙে নিজের সুখ গড়তে চাই না।”
_”কিন্তু আমার চাই”
_এ্যা… ”
জেবা চমকে উঠলো আরিশান মৃধার কথা শুনে। লোকটা আজ হঠাৎ কি হলো? এভাবে আবোল তাবোল কথা কেন বলছে। জেবা তো এখনো এসব সপ্নই ভেবে আসছে।আরিশান মৃধা জেবার মুখের দিকে তাকালেন। মেয়েটার মনের অবস্থা তিনি ভালোই বুঝতে পারলেন। তবে কোনো কথা আর বাড়ালেন না।ধীর হাতে জেবার কামিজের ওড়নাটা ওর গলা থেকে সরাতে গেলেন। ওনার হাতের স্পর্শ পেতেই জেবা আঁতকে উঠে ওনাকে দুই হাত দিয়ে শক্ত করে বাধা দিল।
জেবার এই আকস্মিক বাধা পেয়ে আরিশান মৃধা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নিলেন।জেবা ওনাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে,এটা ওনার ভালো লাগে নি। তীব্র গলায় জিজ্ঞাসা করলেন,

_“সমস্যা কী, জেবা?”
জেবা ওনার চোখের কঠোরতা দেখে ভয়ে কুঁকড়ে গেল।সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
_“এসব ঠিক না আঙ্কেল।আনতারা আন্টি শুনলে কষ্ট পাবে। আপনি এসব আমার মন রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে করছেন তা জানি আমি।”
_“এসব আমি কারো মন রক্ষার্থে করছি না।আরিশান মৃধা কখনো কারোটা ভেবে দেখে না,শুধু নিজেরটা ভাবে। একদম চুপ থাকো!বাধা দেওয়ার দুঃসাহস দেখাবে না।”
জেবা বেচারির তখন একদম কান্না করার মতো অবস্থা। সে ওনার অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠতা এবং গলায় ওনার ওষ্ঠের স্পর্শ পেয়ে ভয়ে ও আড়ষ্টতায় শিউরে উঠে কেঁদে ফেলার ভঙ্গিতে বলল,
_“আঙ্কেল… ছা..ড়ু..ন..।”
কথাটা শোনামাত্রই আরিশান মৃধা ওর ঘাড় থেকে মুখ না তুলেই অবাধ্যের মতো জেবার কোমল গলায় ঠোঁট ছোঁয়ালেন। তপ্ত সেই গভীর পরশে জেবার চোখ দুটো অবশ হয়ে বুজে এল। আরিশান মৃধা ওনার নিচু, গম্ভীর ও নেশাসক্ত গলায় ওর ভুল শুধরে দিয়ে বললেন,
_“জাস্ট কল মি হানি।নয়তো চাপার দাঁত একটাও থাকবে না বলে দিলাম।”
জেবা ভয় পেয়ে গেলো আরিশান মৃধার হুমকিতে।কাঁপাকাঁপা ওষ্ঠে সে কোনোমতে উচ্চারণ করল,

_“হা…হানি।”
_“হুম,” আরিশান মৃধার কণ্ঠে এক তীব্র অধিকারবোধের টান।
_“ছাড়ুন প্লিজ, আমার অনেক পড়া বাকি। সামনে পরীক্ষা, আমাকে পড়তে হবে।”
‘পড়া’ শব্দটা কান অব্দি পৌঁছাতেই আরিশান মৃধার এতক্ষণের রোমান্টিক মুডটায় যেন মুহূর্তেই এক বালতি ঠান্ডা জল ঢেলে দিল জেবা। ঘাড় থেকে মুখ তুলে তিনি সোজা তাকালেন জেবার ডাগর ডাগর চোখের দিকে। ওনার শান্ত চোখের কোণে এবার বিরক্তি আর রাগের মিশ্রণ স্পষ্ট হয়ে উঠল। মেয়েটা ওনার এত কাছে থেকেও ওনার চেয়ে পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—এই ব্যাপারটা যেন আরিশান মৃধার একদম পছন্দ হলোনা।
চোখ দুটো সামান্য সরু করে আরিশান মৃধা অত্যন্ত কঠিন ও ভারী গলায় বললেন,
_“পড়তে হবে না আর।”
_“কেন?”

জেবা কিছুটা ভড়কে গিয়ে ওনার রাগী চোখের দিকে চেয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করল।আরিশান মৃধা জেবার কোমরে নিজের হাত দুটোর বাঁধন আরও শক্ত করে ওকে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে টেনে নিলেন। রাগ ও তীব্র অধিকারবোধ মেশানো চড়া স্বরে বললেন,
_“আমি বলছি সেজন্য! আগে আমি,পরে তোমার পড়াশোনা।”
জেবার আরিশান মৃধার বলা কথাটা একদম পছন্দ হলোনা।সে কেন লোকটার কথামতো চলবে।পড়াশুনায় নো কম্প্রোমাইজ।এখন এই বেচারির খুব করে মনে পড়ছে যে, আবেগের বশে বিয়ে করার চক্করে পড়ে স্বামীকে যে কিছু স্পেশাল বেনিফিট দিতে হয়, তা সে নিজের মানসিক চাপে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল!
এদিকে আরিশান মৃধা জেবার এতো কাছাকাছি এসে নিজের ভেতর এক অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক পরিবর্তন ফিল করতে লাগলেন। ওনার পুরো শরীরে হঠাৎ করেই প্রচণ্ড গরম লাগতে শুরু করেছে। ঘরের এসির টেম্পারেচার একদম হাই করা, তাও ওনার কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। ওনার শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমশ ভারী ও দ্রুত হয়ে আসছে। জেবা ওনার বুকের সাথে লেগে থাকায় স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল যে, আরিশান মৃধার শরীরটা যেন আগুনের মতো প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠেছে! ওনার এই অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে জেবার নিজেরও কেমন জানি রুদ্ধশ্বাস লাগছিল, সাথে এক অজানা ভয় ওর বুকটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

হঠাৎ করেই আরিশান মৃধা ওনার ভেতরের সেই তীব্র অস্বস্তি আর উত্তেজনা আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি যেন নিজের ওপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে তিনি নিজের গা থেকে ড্রেস খুলতে শুরু করলেন। আরিশান মৃধার এমন পাগলামি দেখে জেবা চরম আতঙ্কে আঁতকে উঠল! সে ওনার থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল, কিন্তু আরিশান মৃধা ওনার এক হাত দিয়ে জেবাকে লোহার খাঁচার মতো শক্ত করে লক করে বিছানার সাথে চেপে রাখলেন। ওনার এই দানবীয় শক্তির সামনে জেবা একদম অসহায় হয়ে পড়ল।
জেবার গলাটা ভয়ে শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে গেছে। সে কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারছে যে, এই মুহূর্তে এই লোকটার আচরণ মোটেও স্বাভাবিক নয়; ওনার চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে এবং ওনার হিতাহিত জ্ঞান বলতে কিছু নেই। জেবা ওনার হাতটা সরানোর চেষ্টা করতে করতে কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল,

— “আজকে না প্লিজ… হানি শুনুন না, আমার পিরিয়ড চলছে। প্লিজ আজকে আমাকে ছেড়ে দিন।”
কিন্তু আরিশান মৃধার কানে যেন জেবার কোনো কথাই, কোনো আকুতিই ঢুকছিল না। ওনার মস্তিষ্ক যেন এক তীব্র নেশা আর উত্তেজনায় অবশ হয়ে গেছে। তিনি নিজের মতো করে ড্রেস খুলতে খুলতে জেবাকে নিজের করে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একসময় জেবার বুকের ওড়নাটা শক্ত করে ধরে এক টানে তিনি সেটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। জেবা চরম লজ্জায় ও আতঙ্কে দুই হাত দিয়ে নিজের বুকটা আড়াল করে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আরিশান মৃধা ওনার সেই দানবীয় শক্তি দিয়ে জোর করে জেবার হাত দুটো দুদিকে সরিয়ে দিলেন। তিনি জেবার ঘাড়ে, গলায় মুখ গুঁজে পাগলের মতো, বুনো উল্লাসে আদর করতে শুরু করলেন। ওনার প্রতিটা স্পর্শে যেন এক তীব্র হিংস্রতা আর ব্যাকুলতা প্রকাশ পাচ্ছিল।
জেবা আরিশান মৃধার এই চরম ও অনিয়ন্ত্রিত আচরণগুলো এবার আর মোটেও স্বাভাবিক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিতে পারল না। সে বুঝতে পারছে আরিশান মৃধার নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। সাইন্সের স্টুডেন্ট হওয়াতে এবং ওনার এই অতিরিক্ত ঘাম, লাল চোখ আর অনিয়ন্ত্রিত আচরণ দেখে জেবার মনে কিছুটা খটকা লাগল—আরিশান মৃধা হয়তো কোনোভাবে ড্রাগ এফেক্টেড হয়েছেন!

জেবা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দ্রুত আরিশান মৃধার কাছ থেকে সরে আসতে চাইল। সে ওনাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করল। তবে আরিশান মৃধা জেবাকে একটুও ছাড়লেন না; বরং এক ঝটকায় ওকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে ওপাশের বড় বিছানায় নিয়ে ধপ করে শুইয়ে দিলেন। এরপর ওনি জেবার ওপর নিজের শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিলেন। ওনার সেই ভারী শরীরের চাপে জেবা যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না। আরিশান মৃধা অত্যন্ত মরিয়া হয়ে জেবার কামিজের ভেতর হাত ঢুকিয়ে, কামিজটা ওর বুক পর্যন্ত আলগা করে ফেলে চরম উন্মাদের মতো আদর করতে লাগলেন। ওনার এই অনিয়ন্ত্রিত স্পর্শে জেবা এবার সত্যিই বড্ড ভয় পেয়ে গেল।
জেবা আরিশান মৃধাকে দুই হাত দিয়ে অনবরত ঠেলতে ঠেলতে, ওনাকে বাধা দিতে দিতে কান্না করতে লাগল। ওর চোখের জলগুলো অনবরত গাল বেয়ে গড়িয়ে বালিশে মিশে যাচ্ছিল।জেবা ওনার বুকের ওপর হাত চাপড়ে,আকুতি-মিনতি করে বলতে লাগল,
_ “হানি, প্লিজ ছেড়ে দিন আমাকে! আপনি এমন করবেন না। আমি বড্ড কষ্ট পাচ্ছি। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন…”

জেবা খুব ভালো করেই জানে যে,এই সময় লোকটাকে কেবল কথার মাধ্যমে, ওনার ভেতরের সুপ্ত বিবেককে জাগ্রত করে হুশে আনতে হবে।আরিশান মৃধা কোনো হুশ নেই এখন, ওনি ওনার নিজের আদিম খেলায় মত্ত। জেবা এবার আর ওনাকে সরানোর চেষ্টা না করে, প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতে করতে ওনার নাম ধরে ডাকতে লাগল এবং ওনাকে বারবার শান্ত হতে বলল।
আরিশান মৃধা যখন ওনার সেই তীব্র পাগলামির চরম শিখরে ছিলেন, ঠিক তখনই ওনার অবশ হয়ে আসা মস্তিষ্কের তীব্র অন্ধকারের মাঝে জেবার সেই করুণ কান্নার সুর ভেসে আসলো। কান্নার শব্দগুলো যেন ওনার অবশ মস্তিষ্কে এক তীব্র চাবুক মারল।ভেতরের পুরুষটা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। জেবা ওনাকে ওভাবে একটু শান্ত হতে দেখে,ওনার রাগ ও উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য নিজের কান্নাভেজা হাত দুটো বাড়িয়ে আরিশান মৃধার ঘামে ভেজা মাথায় ও চুলে অত্যন্ত মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল এবং আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলতে লাগল,
_“শান্ত হোন আপনি… আমি তো আপনার কাছেই আছি। শান্ত হোন প্লিজ।”

জেবার নরম হাতের স্পর্শ আর আদুরে গলায় বলা কথাগুলো যেন জাদুর মতো কাজ করল। আরিশান মৃধার ভেতরের সেই তীব্র বুনো উত্তেজনা আর ড্রাগের ড্রাইভটা আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে আসতে লাগল। শরীরটা আলগা হয়ে এল তার।আস্তে আস্তে কেমন যেন একদম শান্ত ও নিস্তেজ হয়ে গেলেন ওনি।আর কোনো পাগলামি না করে, জেবার সেই নরম ও উন্মুক্ত বুকেই নিজের ভারী মাথাটা রেখে শান্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন।দুই হাত দিয়ে জেবার কোমরটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের সাথে নিজেকে একদম লেপ্টে নিলেন। ড্রাগের কড়া প্রতিক্রিয়ার কারণে ওনার শরীরটা বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, তাই জেবার বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে মাথা রেখেই তিনি আস্তে আস্তে গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলেন। ওনার নিয়মিত ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ জেবার বুকে আছড়ে পড়তে লাগল।
জেবা ওনাকে ওভাবে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে নিজের ক্লান্ত ও কাঁপতে থাকা শরীরে এক বিশাল স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর নিজের শরীরটাও আজ এই মানসিক ও শারীরিক ঝড়ে বড্ড পরিশ্রান্ত। সে আরিশান মৃধার ঘুমন্ত, শান্ত মুখশ্রীর দিকে এক রাশ মায়া ও ভালোবাসা নিয়ে তাকাল। লোকটার প্রতি ওর মনে কোনো রাগ বা ক্ষোভ রইল না, বরং এক গভীর ভালোবাসায় ওর মনটা ভরে উঠল। জেবা ওনার কপালে অত্যন্ত যন্তে দুটো গভীর চুমু এঁকে দিল। তারপর ওনাকে নিজ বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিয়ে,চোখ দুটো বুজে আস্তে আস্তে নিজেও গভীর ঘুমো দেশে তলিয়ে গেল।

সারিম দুই হাত দিয়ে অরির পা দুটো নিজের গালের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে ওভাবেই বসে রইল।
সারিমের এমন আকস্মিক অদ্ভুত আচরণে অরি একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গেল!সারিমের এই রূপ চোখের গভীর আকুলতা ওর কাছে কেমন যেন বড্ড অদ্ভুত ঠেকল।
সারিম এবার অরির আরেকটু নিকটে এগিয়ে এল। ওর পা দুটো অত্যন্ত যত্নে নিজের কোলের ওপর রাখল। তারপর অরির হাত দুটো নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে, শান্ত, গভীর নেশাচ্ছন্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
_“কী হয়েছে তোমার চন্দ্রিমা? দুপুর থেকে এভাবে মেঘলা মুখ করে আছ, মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছো-এর আসল কারণটা কী?”
অরি নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে আড়াল করার জন্য মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল,
_“আমার আবার কী হবে? আমার কিছুই হয়নি। আপনি আগে আমার হাত ছাড়ুন!”
সারিম ওর হাতের মুঠো আরও কিছুটা শক্ত করে শান্ত গলায় বলল,
_“কিছু যদি নাই হয়ে থাকে, তবে বারবার দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এত ছটফট কেন করছ চন্দ্রিমা? আমাকে এভাবে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখছ কেন?”
অরি এবার সারিমের চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটোতে কি ছিলো জানা নেই অরির।সে একচিলতে ম্লান হেসে বলল,

_“আমরা তো সবসময় দূরেই ছিলাম সারিম। কাছে এলাম কবে আবার? আমাদের এই সম্পর্কটা তো কেবল একটা প্রয়োজন আর সামাজিকতার নামান্তর মাত্র।”
সারিম অরির কথা শুনে অস্থির হয়ে উঠল। সে অরির হাতের ওপর আলতো চাপ দিয়ে বলল,
_“তুমি চাইলেই কিন্তু আমাদের এই দূরত্বটুকু মুছে সব সম্ভব চন্দ্রিমা। আমি তো তৈরি, তুমি কেন পিছিয়ে যাচ্ছো?”
অরি সারিমের কথা শুনে নিজের ভেতরের জমে থাকা একাকীত্ব আর হীনম্মন্যতা উগরে দিয়ে বলল,
_“আমার চাওয়া না চাওয়াতে এই দুনিয়ার বা আপনার জীবনের কারো কিছু আসে যায় না। আমি কারো জীবনেই তেমন স্পেশাল কেউ নই। আমি তো কেবল একটা সাধারণ মেয়ে, যে সাময়িকভাবে শূন্যতা পূরণের জন্য এসেছে….।”
সারিম অরিকে আর বলতে দিল না ।কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে বলল,
_“বউ! তুমি কিন্তু এখন প্রচন্ড অভিমানী অভিমানী খেলা খেলছ। কে বলছে তুমি আমার জীবনে কিছু না? তুমি আমার সব চন্দ্রিমা। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্যিটা তুমি।”
অরি সারিমের এই মিষ্টি কথা শুনে এক তীব্র তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ওর চোখ দুটো টলমল করে উঠল অশ্রুতে। সে অত্যন্ত করুণ অথচ শক্ত গলায় বলল,

_“মিথ্যা! একদম নিরেট মিথ্যা কথা। অরিরা কখনো কারো জীবনের ‘সব’ হতে পারে না। তারা এই দুনিয়াতে আসে একা, নিজের ভাগ্য আর জীবনের সাথে লড়েও একা, একা একাই বড় হয় এবং সবশেষে একদিন মরেও যায় একদম একা। তাদের জন্য কোনো চিরস্থায়ী ভালোবাসা থাকে না।”
সারিম অরির মুখ থেকে জীবনের এই চরম বিষাদময় দর্শন শুনে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। মেয়েটার মনের ভেতর যে কতটা গভীর ক্ষত আর অভিমান জমে আছে, তা ওর বুঝতে আর বাকি রইল না। কিছুক্ষণ রুমে এক থমথমে নীরবতা বজায় রেখে সারিম অত্যন্ত নরম ও অপরাধী গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
_“আমি কি কোনো ভুল করেছি চন্দ্রিমা? আমার অজান্তে এমন কোনো কাজ কি হয়েছে যা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে? যদি করে থাকি, তবে প্লিজ বলো আমাকে। আমি তা এক্ষুনি সংশোধন করব। পুনরায় একই ভুল আর যেন কখনো না হয়, আমি সেই চেষ্টা করব। তাও প্লিজ এভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিও না।”
অরি সারিমের আকুল চোখের দিকে চেয়ে নিজের চোখের জলটা আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

_“ভুল আপনি করেননি সারিম, ভুলটা আমি করেছি। আপনাকে নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে, আপনার এই মিথ্যে জালে জরিয়ে ভুলটা আমারই ছিল। কিন্তু আমি আপনাকে এর চেয়ে বেশি কিছু আর বলব না।”
সারিম এবার কিছুটা তাড়া দিয়ে অধৈর্য হয়ে বলল,
_“তাড়াতাড়ি বলো বউ, কী লুকাচ্ছো আমার থেকে? বলতে হবে তোমাকে! স্বামীর উপর এভাবে ক্ষোভ মনে চেপে রাখতে নেই, পাপ হবে পাপ!”
_“হোক গে পাপ! তবুও আমি আপনাকে কিচ্ছু বলব না।”
বউয়ের অনড় জেদ দেখে সারীম ঠোঁটের কোণে একরাশ ভালোবাসা মেখে আদর করে ডেকে উঠল,
_“সোনা পাখি আমার, ফুসফুসের রানী, লিভারের ভেজাল, কলিজা আত্মা আমার… বলে দে না বাল! কী লুকাচ্ছিস আমার কাছ থেকে? তোর স্বামীর ওপর একটু দয়া কর সোনা!”
অরি সারিমের মুখে এমন অদ্ভুত সব উপাধি শুনে বিরক্তে মুখটা কুচকে নিলো, গম্ভীর গলায় বলল,
_“লাভ নেই! যতই পাম দেখান না কেন, এই অরির মুখ থেকে একটা শব্দও আপনি বের করতে পারবেন না। আমি বলব না।”

সারিম এবার বুঝল, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। সে বিছানার ওপর হাঁটু গেড়ে বসা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল এবং অরির একদম নিকটে, বিছানার ওপর দুই হাত দুদিকে রেখে ওর ওপর কিছুটা ঝুঁকে এলো। চোখ দুটোতে চরম শয়তানি আর কামুক চাহনি ফুটে উঠল। অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর কণ্ঠে সারিম বলে উঠল,
_“না বললে আজ বাসর করে ফেলব, বলে দিলাম।”
_“করেন গা বাসর! তবুও আমি বলব না।”
সারিম যেন এই উত্তরের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে নিজের চোখ দুটো সামান্য সরু করে বাঁকা হেসে বলল,
_“তুই শিওর তো বউ? ঠিক আছে, তোর আর কিচ্ছু বলা লাগবে না। কিন্তু এবার আমার সত্যিই বাসর লাগবে।”
অরি সারিমের এত ঘনিষ্ঠতা দেখে মনে মনে কিছুটা নার্ভাস হলেও মুখে তা প্রকাশ না করে বলল,
_“তা আমি কী করব আপনার বাসর লাগলে? আমার কী ঠেকা পড়েছে?”
সারিম ওর ঠোঁটের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_“তোকে লাগবে চন্দ্রিমা, আমার শুধু তোকেই লাগবে। কাছে আয় আমার। একবার আমাদের এই বাসরটা হয়ে গেলে, আমি তোর এই অভিমান করার পিছনের আসল কারণটা জীবনে কোনোদিন আর জানতে চাইব না, প্রমিস! এবার আমাকে শান্তিমতো বাসর করতে দিবি জান?”
_“মগের মুল্লুক পাইছেন? দিব না আমি বাসর করতে। বাসর-ফাসর কিচ্ছু হবে না এখানে, এটা একদম ফাইনাল!”

সারিম এবার চরম অবাক হওয়ার ভান করে কপালে হাত দিয়ে বলল,
_“এই এই বাটপার বউ! তুই কিন্তু এখন নিজের মত ঘুরিয়ে ফেলছিস। একটু আগেই তো নিজ মুখে অনুমতি দিলি যে ‘করেন গা বাসর’, আর এখন আবার মানা করছিস? মিথ্যাবাদী মহিলা কোথাকার!”
অরি সারিমের এমন চতুরতায় রেগে গিয়ে বলল,
_“কখন বললাম আমি? আমি বলেছি আপনি বাসর করেন গা, কিন্তু আমার সাথে নয়! অন্য কোনো মেয়ের সাথে গিয়ে করেন বাসর!”
সারিম নিজের বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গি করে ‘ছিহ ছিহ’ করে উঠল। অত্যন্ত বিরক্ত ভাষায় বলল,
_“ছিহ! কী বেয়াদপ মহিলা রে বাবা! বউ হয়ে স্বামীকে এমন নাজায়েজ আর পাপ কথা বলে আমার এই পরম পবিত্রতাকে তুই কুলসিত করছিস? তোর লজ্জা করে না বউ?”
অরি সারিমের মুখে ‘পবিত্রতা’ শব্দটা শোনা মাত্রই এক তীব্র তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সারিমের দিকে তাকিয়ে ফোড়ন কেটে বলল,

_“আপনি পবিত্র হলে তো জনি সিন্স একজন মস্ত বড় মাওলানা!”
সারিম এই নামটা শোনামাত্রই একদম আকাশ থেকে পড়ল! তার চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল।চরম অবাক ও বিস্ময় নিয়ে অরির দিকে ঝুঁকে এসে জিজ্ঞাসা করল,
_“এই বউ! তুমি জনি সিন্সের নাম কীভাবে জানো? ঐসব নোংরা জিনিসপত্র দেখো নাকি তুমি ইন্টারনেটে?”
অরি সারিমের এমন সন্দেহে চরম লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে উঠল। সে নিজের কানে হাত দিয়ে জিব কেটে বলল,
_“ছিহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! কী যা তা বলছেন আপনি?”
সারিম ওর এই লজ্জামাখা ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখে মুচকি হাসল। ওর আরও কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
_“জানি জানি, আর ন্যাকামি করে বলতে হবে না।তুমি দেখি ভারি দুষ্টু বউ! তা একটু কাছে এসে নিজের এই স্বামীকে ওসব দুষ্টামিগুলো প্র্যাক্টিক্যালি দেখাও না কেন?”
অরি সারিমের কথায় রেগেমেগে বিছানা ছেড়ে উঠে চলে যেতে চাইল। কিন্তু সারিম ওকে যেতে দিলো না; এক ঝটকায় অরির কোমর ধরে টেনে ওকে আবার বিছানায় নিজের নিচে শক্ত করে চেপে ধরল।সারিমের দুই হাত অরির দুপাশে লক হয়ে গেল। সারিম ওর মুখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত অনড় গলায় বলল,
_“পালানোর সব পথ আজ বন্ধ তোমার চন্দ্রিমা। বাসর না করে আজ আমি তোমাকে এই ঘর থেকে বিন্দুমাত্র ছাড়ছি না।”

অরি সারিমের নিচে আটকা পড়ে ভয়ে ছটফট করতে করতে কেঁদে উঠে বলল,
_“করব না আমি বাসর! জোর করে কখনো বাসর হয় না, ওটাকে রেপ বলে! আমি আপনার বিরুদ্ধে কাল সকালেই রেপিস্টের মামলা করব, দেখবেন!”
সারিম বউয়ের মুখ থেকে ‘রেপিস্ট’ শব্দটা শোনা মাত্রই তার পুরো মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল। সে চরম হতাশায় মাথা নেড়ে বলল,
_“জাহান্নামি! জাহান্নামি! একদম খাঁটি জাহান্নামি তুই! ছিহ চন্দ্রিমা,নিজের বৈধ স্বামীকে এমন একটা নিকৃষ্ট কথা বলতে পারলি? আমি সত্যি বড্ড হতাশ হলাম তোর এই কথাটা শুনে। তা তুই আমাকে যতই বাহানা দেখাস না কেন সোনা, কোনো লাভ নাই। বাসর আজ এখানে হবেই হবে।”
বলেই সারিম আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, অরির শার্টের ওপরের একটা বোতাম ধীর হাতে খুলে ফেলল এবং নিজের উষ্ণ হাতটা ওর শার্টের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।

সারিমের এই আকস্মিক গভীর স্পর্শে অরি চরমভাবে ভড়কে গেল। সে চোখ দুটো বড় বড় করে সারিমের হাতটা সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু সারিমের হাতের সেই তপ্ত ছোঁয়া, ওর আঙুলের আলতো নাড়াচাড়া অরির ফর্সা চামড়ায় লাগামাত্রই ওর পুরো শরীরে যেন মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র ও শক্তিশালী কারেন্টের মতো বৈদ্যুতিক তরঙ্গ আছড়ে পড়ল! পুরো অবয়ব যেন এক অচেনা শিহরনে অবশ হয়ে আসতে লাগল।
সারিম আর কোনো কথা শোনার বা বোঝার অবস্থায় ছিল না। অরির শার্টের ভেতর নিজের উষ্ণ হাত গলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সে ধীর পায়ে ঝুঁকে এসে অরির নরম গলায় নিজের মুখ গুঁজে দিল।সারিমের ঠোঁটের সেই গভীর স্পর্শ অরির গলার চামড়ায় লাগামাত্রই ওর পুরো শরীর যেন এক চরম শিহরনে কেঁপে উঠল। অরি দুই হাত দিয়ে সারিমের চওড়া কাঁধটা ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু সারিমের এই পাহাড়সম শরীরের সামনে ওর সমস্ত চেষ্টা মুহূর্তেই বৃথা হয়ে গেল। সারিম ক্রমাগত উম্মত্ত আদরের গভীর পরশের কাছে শেষমেশ অরি হাল ছেড়ে দিল। সে নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বুজে বিছানার চাদরটা মুঠো করে ধরে পড়ে রইল।
এভাবে বেশ কিছুক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন সারিম অরির ঘাড় থেকে নিজের মুখ তুলছিল না, তখন অরির ভেতরের সেই ধাক্কার রেশটা কেটে গিয়ে আবার চরম বিরক্তি আর রাগ লাগতে শুরু করল।অরি সারিমের পিঠে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বেশ চড়া গলায় বলল,
_“সারিম, এবার উঠুন! অনেক হয়েছে আর না। আমার অনেক পড়া বাকি, আমি এখন পড়তে যাব। ছাড়ুন আমাকে!”

কিন্তু সারিম তবুও কোনো উত্তর দিল না সারিম। নিজের স্থান থেকে বিন্দুমাত্র নড়ল না।সারিমের এমন নিথর ও নীরব ভাব দেখে অরি একটু চুপ হয়ে গেল। ওর মনের ভেতর কেমন যেন একটা খটকা লাগল। সে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে আবার সারিমের নাম ধরে একটু নরম সুরে ডাকল,
_“সারিম… শুনছেন? উঠুন না প্লিজ। এভাবে আর কতক্ষণ?”

হঠাৎ করেই অরি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করল, সারিম ওর গলায় মুখ গুঁজে রেখেই প্রচণ্ড জোরে জোরে ঘন ঘন শ্বাস টানছেন! সারিমের বুকটা অনবরত ওঠানামা করছে। শরীরের তাপমাত্রা যেন সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি ঠেকছে। অরির মনের ভেতর এবার এক তীব্র আশঙ্কার জন্ম নিল। সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, নিজের দুই হাত দিয়ে সারিমের মাথাটা জোর করে ওপরের দিকে তুলল।সারিমের মুখটা নিজের চোখের সামনে আনতেই অরি চরম আঁতকে উঠল!সে দেখতে পেল, সারিমের পুরো মুখাবয়ব ঘামে একদম ভিজে একাকার হয়ে গেছে, কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে।চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল টকটকে হয়ে আছে! সারিম অনবরত মুখ দিয়ে জোরে জোরে কষ্টেশিষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন, যেন তার ফুসফুসে অক্সিজেনের বড্ড ঘাটতি পড়েছে।
সারিমের এই ভয়াবহ অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে অরির মনের সমস্ত রাগ, অভিমান এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেল। ওর বুকটা সারিমের জন্য অজানা আশঙ্কায় আর তীব্র চিন্তায় ধক করে উঠল।অরি নিজের এক হাত দিয়ে সারিমকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিছানায় একপাশ হয়ে শুয়ে পড়ল। শরীরের সাথে লেপ্টে আগলে রেখে, নিজের অন্য হাত দিয়ে সারিমের মুখের ও কপালের সেই বিন্দু বিন্দু ঘামটুকু আলতো করে মুছে দিল। তারপর ওর চুলে ও মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাসা করল,
_“সারিম! আপনার কী হয়েছে বলুন? শরীরটা এমন লাগছে কেন? খুব কি বেশি কষ্ট হচ্ছে আপনার?”
সারিম অরির কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক বা শারীরিক অবস্থায় ছিলো না।ওর রক্তবর্ণ চোখ দুটোর সামনে তখন এক তীব্র মায়াজালের কুয়াশা খেলা করছিল। সারিম কোনো কথা না বলে,নেশাতুর অবশ ভঙ্গিতে নিজের হাতটা বাড়িয়ে অরির পুরো মুখে আলতো করে হাত বুলাতে লাগলো।সেই কাঁপতে থাকা হাতের স্পর্শে এক তীব্র আকুতি প্রকাশ পাচ্ছিল। অরি এক হাত বাড়িয়ে সারিমের সেই ঘামে ভেজা হাতটা শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরে ফেলল।তার চোখের দিকে চেয়ে অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে বলল,

_“আপনি এমন কেন করছেন সারিম? আপনার শরীরটা আগুনের মতো এত গরম কেন? আপনি কি অসুস্থ?”
সারিম অরিকে আর কোনো কিছু বলার বা প্রশ্ন করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দিলো না। আচমকা এক ঝটকায় অরিকে বিছানায় সটান শুইয়ে দিয়ে,হিংস্র হয়ে ওর গায়ের ওপর উঠে পড়ে। নিজের সমস্ত হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সারিম পাগলের মতো অরির নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে উম্মত্তের মতো কিস করতে লাগলো। সারিমের এই বুনো অনিয়ন্ত্রিত আচরণে অরি যেন দম আটকে মারা যাওয়ার উপক্রম হলো।
সারিম ওভাবেই অরিকে নিজের নিচে চেপে ধরে, অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে নিজের পরনের শার্টের বোতামগুলো এক টানে ছিঁড়ে ফেলে শার্টটা গা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। সারিম নগ্ন ও ঘামে ভেজা তপ্ত বুক অরির বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। এবার সারিম অত্যন্ত মরিয়া হয়ে অরির পরনের শার্টটাও খোলার জন্য হাত বাড়ালো। ওর এই চরম উম্মত্ততা, হিংস্রতা আর অস্বাভাবিক রূপ দেখে অরি এবার সত্যিই ভীষণ ভয় পেয়ে গেল! ওর মনে হলো, এই লোকটা এখন আর তার চেনা সারিম নন, ওনি যেন এক অচেনা দানব হয়ে উঠেছেন। অরি নিজের সমস্ত শক্তি এক করে ভয়ে ও আতঙ্কে একটা জোরে আকাশ ফাটানো চিৎকার দিয়ে উঠল

_ “ছাড় কুত্তাআআআআ….!”
অরির এই আকস্মিক চিৎকারের শব্দে সারিমের মস্তিকের সেই ঘোর লাগা মনোযোগে যেন মুহূর্তের মধ্যে এক বিশাল বিস্ফোরণ ঘটল! ওর হাত দুটো এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। আর ঠিক সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগাল অরি।সারিমের আলগা হয়ে যাওয়া বাঁধন থেকে এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে, বিছানা ছেড়ে তড়িৎ গতিতে উঠে ঘরের মেঝেতে এসে দাঁড়াল। ওর পুরো শরীর ভয়ে তখন থরথর করে কাঁপছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৪

সারিম বিছানার ওপর একা হয়ে গিয়ে, নেশাচ্ছন্ন হয়ে ঝাপসা চোখ দুটো মেলে আশেপাশে অরিকে খুঁজতে লাগলো।শরীরে তখন এক তীব্র পীড়া ও অস্বস্তি দিচ্ছিল, শিরা-উপশিরাগুলো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল সারিমের। বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতেই অরি ভয়ে আরও পিছিয়ে গেল। সে রুমে চারদিকে তাকিয়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা খুঁজছিল। হঠাৎ কোনো কিছু না ভেবেই, সে ডাইরেক্ট ভয় পেয়ে সারিমের ঘরের বিশাল কাঠের কার্বাডের সামনে থাকা চেয়ারটার ওপর চট করে উঠে দাঁড়াল। তারপর সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে কার্বাডের একদম ওপরের ফাঁকা জায়গাটাতে উঠে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল!সারিম বিছানা থেকে নেমে অত্যন্ত টালমাটাল পায়ে ঘরের চারপাশ ঘাঁটতে লাগলো,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here