Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৪
মেহজাবিন নাদিয়া

বুকের ওপর আছড়ে পড়া আনতারা মৃধার কাঁদো কাঁদো আকুতি আরিশান মৃধাকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। কিন্তু ওনার হাত দুটো অবশ হয়ে শূন্যেই ঝুলে রইল, আনতারা মৃধাকে ফিরিয়ে জড়িয়ে ধরার কোনো তাগিদ ওনার ভেতর জাগল না। আরিশান মৃধা চোখ দুটো তখনো অবাধ্য হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যান্ত পাথর হয়ে যাওয়া জেবাকে। জেবার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ আর চোখের কোণে চিকচিক করা জল ওনার বুকের ভেতর এক তীব্র অপরাধবোধের জন্ম দিল।
আরিশান মৃধা আলতো কিন্তু দৃঢ় হাতে নিজের বুক থেকে আনতারা মৃধাকে সরিয়ে দিলেন। ওনার ভালোবাসা ‘তারা’ আজ ওনার সামনে রক্তমাংসের শরীরে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ওনার হৃদস্পন্দন থমকে গেছে। যেখানে খুশিতে আত্মহারা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আরিশান মৃধার পুরো মন জুড়ে এক কালচে বিষণ্ণতা ভর করেছে।নিজের অনুভূতিটাই ওনার কাছে এক মস্ত বড় ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চৌদ্দ বছর আগে মৃত ঘোষণা হওয়া একটা মানুষ কীভাবে আজ এভাবে ফিরে আসতে পারে? এটা ওনার কাছে অলৌকিক কোনো ঘটনা নয়, বরং এক অবিশ্বাস্য ঘোর বলে মনে হতে লাগল।

ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশ
কিছুক্ষণের জন্য এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যে রূপ নিল।
সোফায় মুখোমুখি হয়ে সে আছেন আনতারা মৃধা।ঠিক তার সামনের একক সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন আরিশান মৃধা।
পাশের সোফায় সারিম আর অরি পাশাপাশি বসে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এক কোণে জেবা দাড়িয়ে।সে সোফায় বসার সাহস পাচ্ছে না। ড্রয়িংরুমের এক কোণায় দেয়াল ঘেঁষে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। যেন এই মৃধা পরিবারের কোনো দৃশ্যেই তার আজ কোনো অধিকার নেই।
আরিশান মৃধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চশমাটা ঠিক করলেন। ওনার রাশভারী চোখ দুটো আনতারার ওপর নিবদ্ধ করে অত্যন্ত শান্ত অথচ ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন,
_“এই চৌদ্দটা বছর তুমি কোথায় ছিলে, আনতারা? যদি বেঁচে-ই ছিলে, তবে এতগুলো দিন নিজেকে এভাবে লুকিয়ে রেখেছিলে কেন?”

আনতারা মৃধা ওনার চোখের জল মুছে অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন,
_“আমার কিছুই জানা নেই আরিশান। সেদিন সেই জ্বলন্ত ঘর থেকে কে বা কারা আমাকে বাঁচিয়েছিল, আমি জানি না।আজ সকালে আমার জ্ঞান ফেরে, আমি নিজেকে একটা অচেনা হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করি। চারিদিকের ওই অপরিচিত পরিবেশ আর অচেনা মানুষদের দেখে আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে, নিজের মানসিক ভারসাম্য সামলাতে না পেরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসি। এরপর দীর্ঘ সময় আমার স্মৃতিও ঠিকঠাক কাজ করেনি…শুধু আমাদের বাড়ির ঠিকানাটা স্পষ্ট মনে ছিলো তখন।”
আনতারা মৃধার এই করুণ কষ্টের কথা শুনে জেবার মনের ভেতর একটা তীব্র কষ্টের মোচড় দিয়ে উঠল। একজন নারীর এমন অসহায়ত্বের গল্প শুনে তার বড্ড দুঃখ হলো। কিন্তু তার নিজের ভাগ্যের পরিহাসের কথা ভেবে বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।
আরিশান মৃধা আনতারার কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণের জন্য ভাষা হারিয়ে ফেললেন। ওনি কী বলবেন বা ওনার প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত, তা বুঝতে পারলেন না। তবে ওনার অবচেতন মন বারবার ছুটে যাচ্ছিল জেবার দিকে। ওনি আড়চোখে একবার জেবার দিকে তাকালেন।
জেবা তখন দুই হাত দিয়ে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে চেপে ধরে মাথা নিচু করে আছে। নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে, যেন কোনোমতেই ভেতরের উপচে আসা কান্নাটা বাইরে প্রকাশ না পায়। মেয়েটা যে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, আরিশান মৃধা তা এক পলকেই বুঝে ফেললেন। ওনার বুকের ভেতরটা আবার অস্থির হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই এই আবেগঘন পরিবেশটাকে এক ঝটকায় হালকা করতে পাশ থেকে সারিম হঠাৎ আনতারা মৃধার উদ্দেশ্য বলে উঠল,

_“তা তোমার ওই ভেগে যাওয়া লাভার বয়, মানে সেই মহান প্রেমিক পুরুষ তোমাকে হঠাৎ পুড়িয়ে মারতে চাইল কেন? আমরা তো শুনতাম তোমরা একে অপরকে অনেক পেয়ার কারতি হো ! হঠাৎ করে ওনার মুড সুইং করল কেন?যদি বলতে একটু আমরাও শুনি।”
সারিমের মুখে এমন সরাসরি খোঁচানো প্রশ্ন শুনে আনতারা মৃধা চরম লজ্জা আর অপরাধবোধে কুঁকড়ে গেলেন। নিজের ছেলের সামনে নিজের অতীতের এমন কালো অধ্যায় বলতে ওনার বুক কাঁপছিল, তবুও তিনি সত্যটা আর গোপন করতে পারলেন না। মাথা নিচু করে ম্লান কণ্ঠে বললেন,

_“সে আমাকে নয়… সে ভালোবেসেছিল আমার বাহ্যিক রূপ আর আমার বাবা আমার জন্য রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে। যখন সে আমার কাছ থেকে সবকিছু হাতিয়ে নেওয়া শেষ হলো, তখন সে তার আসল রূপ বের করতে শুরু করল। দিনের পর দিন টাকার জন্য আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করত। ওনার শেষ নজরটা ছিল আমার আর আরিশানের বিয়ের শেষ স্মৃতি আংটিটার ওপর। আমি আরিশানের শেষ চিহ্নটা হাতছাড়া করতে চাইনি, তাই ওনাকে দিইনি। আর সেই ক্ষোভ থেকেই লোকটা আমাকে ওই বন্ধ ঘরে আটকে রেখে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে চলে আসে… এরপর আমার আর কিছুই মনে নেই।”
আনতারা মৃধার কথাগুলো কেন যেন সারিম আর আরিশান মৃধা কারোরি বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। তারা দুজন খুব ভালো করেই আনতারা মৃধাকে চিনে। সামান্য একটা আংটির জন্য কেউ কাউকে আগুনে পুরিয়ে ফেলা অবিশ্বাস্য,যে কেউ এটা শুনলে বিশ্বাস করবে না।তবুও সারিম কিছুই আর জিজ্ঞাসা করলো না এসব ব্যাপার নিয়ে।সে অত্যন্ত আফসোসের হওয়ার ভান করে নিজের মুখটা কুঁচকে বলে উঠল,
_“ইসসস! সো সেড… বন্ধু মোরে ভালোবাসলো না!সে বেইমানি নিকলা।”

সিরিয়াস মুহূর্তে সারিমের এমন অদ্ভুত মন্তব্য শুনে আরিশান মৃধা হুট করে ‘ফিক’ করে হেসে দিলেন!
যদিও আরিশান মৃধার মতো একজন রাশভারী মানুষের মুখ থেকে এই অসময়ের হাসিটা বড্ড বেমানান আর অদ্ভুত ঠেকল। কিন্তু ওনাকে হাসতে দেখে পাশে বসে থাকা অরিও হেসে দিলো।
সোফায় বসে থাকার মাঝেই অরির হাতের ফোনটা হঠাৎ অনবরত কেঁপে উঠল। স্ক্রিনজুড়ে একের পর এক নোটিফিকেশনের বন্যা। কৌতূহল সামলাতে না পেরে অরি ফোনটা ওপেন করতেই দেখল, একটা অপরিচিত মেয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে পর পর অনেকগুলো মেসেজ এসেছে। অরি ভ্রু কুঁচকে আইডির নামটার দিকে তাকাল—‘আহিলা সোনাম’।

নামটা দেখেই অরির মনে একটু কৌতূহল জাগলো মেসেজটা একবার পড়ে দেখার।ড্রয়িংরুমের এই থমথমে আর অদ্ভুত পরিবেশের মধ্যে বসে মেসেজগুলো পড়ার চেয়ে একা বসে দেখাটাই ওর কাছে শ্রেয় মনে হলো। তা ছাড়া, সে বেশ বুঝতে পারছে এখানে এখন আর তার কোনো কাজ নেই। ওনাদের পারিবারিক ঝামেলা ওনারাই মেটাক। অরি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে ধীর পায়ে হাঁটা দিল।
অরিকে ওখান থেকে চলে যেতে দেখে জেবাও আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াতে চাইল না। এই ঘরের বাতাস যেন তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলছে। সেও অত্যন্ত দ্রুত পায়ে অরির পিছু পিছু সেখান থেকে প্রস্থান করল। আরিশান মৃধা পুরোটা সময় কেবল একদৃষ্টে জেবার চলে যাওয়া পথের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। ওনার চোখের ভিতরের গভীর বিষাদ ও অস্থিরতা কেউ খেয়াল না করলেও, সারিমের চোখ এড়াতে পারল না।
সারিম নিজেও এবার এখানে থাকা আর প্রয়োজন বোধ করল না। তার বাবার ঝামেলা বাবাই সামলাক। সত্যি বলতে, এত বছর পর নিজের জন্মদাত্রী মাকে চোখের সামনে জ্যান্ত দেখেও সারিমের ভেতর কোনো রকম অনুভূতির সঞ্চার হচ্ছে না। ওর কাছে আনতারা মৃধা বেঁচে থাকাও যা, না থাকাও তা-ই। ছোটবেলা থেকে মায়ের অবহেলা আর উদাসীনতা পেতে পেতে সে বড় হয়েছে, তাতে মায়ের প্রতি সমস্ত টান অনেক আগেই কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। এত বছর পর মা বেঁচে আছে জেনেও ওর মনে কোনো ভাবাবেগ নেই। সারিম সোফা থেকে উঠে সোজা ওপরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।কালকের বাতিল হওয়া মিটিংটা আজ হতে চলেছে,
সবাই একে একে চলে যেতেই বিশাল ড্রয়িংরুমটা একদম খাঁ খাঁ আর থমথমে হয়ে গেল। দীর্ঘক্ষণের এক রুদ্ধশ্বাস নীরবতা গ্রাস করল চারপাশকে। অবশেষে আরিশান মৃধাই প্রথম মুখ খুললেন। তিনি আনতারা মৃধার দিকে চেয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ও নিরাসক্ত গলায় বললেন,

_“এখন তোমার বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন, আনতারা। অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে। বাকি সব কথা পরে শুনলেও চলবে। আমার একটা অত্যন্ত জরুরি কাজে এক্ষুনি বাইরে যেতে হবে।”
আনতারা মৃধা কিছুক্ষণ চুপ করে আরিশানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনার ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান অভিমানের রেখা ফুটে উঠল। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন,
_“আমার ফিরে আসাতে তুমি বোধহয় খুশি হওনি আরিশান? অবশ্য খুশি না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি তোমার সঙ্গে সারা জীবন শুধু অন্যায়-ই করে এসেছি, আর তুমি সবসময় মহৎ সেজে আমায় ক্ষমা করে গেছ। তাই ভাবছিলাম, এবারও বোধহয় শেষবারের মতো আমায় ক্ষমা করে দিয়ে নিজের বুকে টেনে নিবে। কিন্তু তোমার এই উদাসীনতা আমায় বড্ড কষ্ট দিচ্ছে।”

আরিশান মৃধা কিছু বলতে পারলেন না। ওনার কণ্ঠনালী যেন কেউ চেপে ধরেছে। তিনি নিজেকে নিয়ে এক মস্ত বড় গোলকধাঁধায় আটকে আছেন। নিজের ভেতরের এই অদ্ভুত পরিবর্তন ওনি নিজেই ব্যাখ্যা করতে পারছেন না।
আরিশান মৃধাকে চুপ থাকতে দেখে আনতারা মৃধা এবার সোফার কুশনে হেলান দিয়ে কিছুটা বাঁকা চোখে তাকালেন। ওনার কণ্ঠে এবার হালকা উপহাসের সুর ফুটে উঠল,
_“নিজের থেকে হাঁটুর বয়সী একটা মেয়েকে বিয়ে করেছ দেখছি! তা বেশ সুখেই তো ছিলে আমাকে ছাড়া। আমি তো ভেবেছিলাম, কই… তুমি বুঝি আজও শুধু আমাকেই ভালোবাসো আরিশান! আমার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বুঝি আজও একা কেঁদে মরো!”
আনতারা মৃধার এই তীক্ষ্ণ কথার জবাবে আরিশান মৃধার মুখচ্ছবি আরও কঠোর হয়ে উঠল। ওনি নিজের ভেতরের তোলপাড় লুকিয়ে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় শুধু বললেন,

_“এমন কিছুই না।”
আনতারা মৃধা ওনার এই সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে ঠোঁট টিপে একটু হাসলেন। ওনার সেই হাসির আড়ালে কী লুকিয়ে ছিল, তা বোঝা দায়। পরক্ষণেই তিনি নিজেই তাড়া দিয়ে বললেন,
_“তোমার বোধহয় কোথাও যাওয়ার কথা ছিল? তবে যাচ্ছ না কেন? যাও, নিজের কাজ শেষ করো।”
আরিশান মৃধা আর একটা মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। নিজের চশমাটা ঠিক করে,গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ওনার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আনতারা মৃধার মুখের সেই ম্লান ও দুর্বল ভাবটা এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। সেখানে জায়গা করে নিল এক চতুর ও কুটিল বাঁকা হাসি। তিনি সোফায় বসে একা একাই বিড়বিড় করে উঠলেন,
_“এত সহজে এবার তোমাকে আমি ছাড়ছি না মাই লাভলি হাসব্যান্ড!ওই মেয়ের একটা স্থায়ী ব্যবস্থা আমি খুব জলদিই করে ছাড়বো!”

জেবা অত্যন্ত দ্রুত পায়ে অরির পিছন পিছন আসলেও,শেষ মুহূর্তে সে আর অরির রুমে গেল না। এই মুহূর্তে নিজের ভেতরের এই তীব্র ঝড়টা কারো সামনে প্রকাশ করার মতো মানসিক অবস্থা তার নেই। সে অরির রুমটা পার হয়ে সোজা করিডোরের শেষ মাথায় থাকা একটা গেস্ট রুমে ঢুকে পড়ল।
রুমে ঢুকেই জেবা দরজাটা আটকে দিল। লক করার শব্দটা যেন তার নিজের ভাগ্যের ওপর একটা চিরস্থায়ী সিলমোহর বসিয়ে দিল। দরজাটার পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে জেবা আস্তে আস্তে স্লাইড করে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।ঠিক তখনই, এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে থাকা কান্নাগুলো বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো উগড়ে এল। এতক্ষণ সবার সামনে যে শক্ত খোলসটা সে ধরে রেখেছিল, তা এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
জেবা দুই হাতে নিজের মুখটা চেপে ধরল, যাতে তার কান্নার আওয়াজ বাইরে না যায়। কিন্তু বুকের ভেতরটা তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছিল। আরিশান মৃধাকে এত চড়াই-উতরাই পার করে নিজের জীবনে পেয়েও আজ তাকে আবার ছেড়ে দিতে হবে—এই সত্যটা যেন তার কলিজা ছিঁড়ে ফেলছিল। জেবার ভালোবাসা কখনো পূর্ণতা পেল না। মনের এক কোণে তীব্র অভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। লোকটা নিশ্চয়ই এখন খুব খুশি! এত বছর পর তার ভালোবাসার মানুষটা, তার জীবনের প্রথম নারী ফিরে এসেছে। আরিশান মৃধা তো তাকেই চেয়েছিল চিরকাল।

_”আমি কীভাবে থাকব ওই লোকটাকে ছাড়া?”
জেবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নিজের মনেই আছাড় খেতে লাগল। পরক্ষণেই সে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে নিজে শাসন করতে শুরু করল,
_”না জেবা! তুই এমনটা করিস না। তোকে এখন নিজের সমস্ত অধিকার ছেড়ে দিতে হবে। নিজের মনকে শান্ত কর। লোকটা তোকে কোনোদিন ভালোবাসেনি। তুই সবসময় লোকটার পেছনে আঠার মতো চিপকে ছিলি, সে তো কেবল দয়া আর দায়িত্বের খাতিরে তোকে সয়ে গেছে। তখন তার স্ত্রী পাশে ছিল না বলে তুই জায়গা পেয়েছিলি, কিন্তু এখন তো আসল মানুষটা চলে এসেছে। তোকে এখন এই দুজনের মাঝখান থেকে সরে আসতেই হবে।”
জেবার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এল। সে হাঁটু গেড়ে বসে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল এবং একসময় কান্নার বেগ সামলাতে না পেরে শীতল মেঝেটার ওপরই শুয়ে পড়ল। চোখের জলে মেঝের একটা অংশ ভিজে সিক্ত হয়ে গেছে।

মেঝেতে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই জেবা নিজের ডান হাতটা চোখের সামনে তুলে ধরল। কবজিতে জ্বলজ্বল করছে আরিশান মৃধার কিনে দেওয়া সেই সোনার চুড়িগুলো। চুড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে জেবার চোখের জল আরও দ্বিগুণ বেগে নামল। সে আবার ডুকরে কেঁদে উঠল।চুরি গুলো আরিশান মৃধা ওকে নিজ হাতে পরিয়ে দিছিলো। তাই আর ওগুলো খুলেনি জেবা, প্রিয় মানুষটার দেওয়া জিনিস গুলো ওর কাছে অমৃত মনে হয়েছিল।
জেবা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শূন্য চোখে হাসল। এখন তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম তকমাটা নিজের নামের পাশে জুড়তে হবে-‘ডিভোর্সি’ তকমা। সমাজ তাকে নিয়ে হাজারটা কটু কথা বলবে, আঙুল তুলবে। কিন্তু জেবা এই কলঙ্কটাও মাথা পেতে নেবে, শুধু তার ভালোবাসার মানুষটার জন্য। লোকটা নিজের পুরনো ভালোবাসা, নিজের আপন মানুষকে নিয়ে সুখে থাকুক—জেবা তো এটাই চেয়েছিল। আরিশান মৃধার সুখের চেয়ে বড় তো তার নিজের আত্মসম্মান বা সমাজের তকমা হতে পারে না।

সারিম তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের হাতাটা ঠিক করছিল।একটু তাড়াহুড়ো করেই রেডি হচ্ছিল সে। ঠিক এমন সময় অরি হুট করে ওর রুমে এসে ধপ করে খাটের ওপর বসে পড়ল।অরিকে আজ হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া, নিজে থেকে এই রুমে আসতে দেখে সারিম মনে মনে একটু অবাক হলো। তবে অবাক হওয়ার চেয়ে ওর মনের ভেতর এক চিলতে খুশিই খেলে গেল। ভাবল, যাক—যাওয়ার আগে বউকে একটু কাছে পাওয়া যাবে! কিন্তু সারিমের সেই ভাবনায় একবস্তা ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়ে অরি আচমকা খাট থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো রাগে একদম রক্ত-লাল হয়ে আছে। টানটান হয়ে সারিমের একদম সামনে এসে দাঁড়াল অরি। হাইটে সারিমের চেয়ে কিছুটা ছোট হওয়ায় ওর দিকে সোজা তাকাতে অরির একটু অসুবিধা হচ্ছিল, তাও সে নিজের রাগী চাউনিটা ধরে রাখল।
সারিম অরির এই রাগটুকুও বেশ উপভোগ করল। সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, এক হাত দিয়ে অরিকে বগলে ধরে আলতো করে ওপরে তুলে নিজের কোলের সমানে নিয়ে এল। অরি সাধারণত এমন করলে ছটফট করে, কিন্তু আজ সে কিচ্ছু বলল না; উল্টো শক্ত করে সারিমের গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলতে থাকল।ওর চোখের দিকে তাকিয়ে সারিমের মনে বেশ সুবিধার ঠেকল না। শান্ত সাগরের নিচে যেন এক বিশাল সুনামি লুকিয়ে আছে।
সারিম অরির গালটা আলতো ছুঁয়ে জিজ্ঞাসা করল,

_”কী হয়েছে, চন্দ্রিমা? এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
অরি কিছুক্ষণ একদৃষ্টে সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ শক্ত গলায় বলে উঠল,
_”আপনি একটা অসভ্য, ক্যারেক্টারলেস সারিম!”
সারিম কথাটা শুনেও মোটেও সিরিয়াস নিল না। ওল ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
_”জানি বউ, শুধু তোমার চোখেই আমি এমন।”
অরি ওর এই হালকা মেজাজ দেখে আরও চটে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
_”আই জাস্ট হেট ইউ! আমি আপনাকে ঘৃণা করি, সারিম।”
সারিম হাসিমুখেই জবাব দিল,
_” সেটাও জানি।”
_”আমি আপনার জীবনের দ্বিতীয় নারী, তাই না সারিম?”
অরির এই আকস্মিক প্রশ্নে সারিম কিছুটা দমে গেলেও, চাইল অরিকে আরেকটু রাগাতে। অরিকে রাগতে দেখে ওর বড্ড ভালো লাগছিল। তাই মুখে একটা আফসোসের ভাব এনে সারিম বলল,
_”ওহ নো! সত্যিটা তাহলে তুমি জেনেই গেলে?”
অরির কণ্ঠস্বর এবার কেঁপে উঠল,

_”তাহলে এটা সত্যিই ছিল?”
সারিম দুষ্টুমিটা চালিয়ে গিয়ে বলল,
_”হুম বউ, সত্যিই ছিল। মেয়েটা খুব ভালোবাসত আমায়, এখনো বাসে। আমার অপেক্ষায় সে আজো বিয়ে করেনি।ভাবছি তুমি যেহেতু আমায় মেনে নিচ্ছো না তাহলে তাকে একটা চান্স দেওয়াই যায়,কি বলো!”
সারিম অরিকে একটু জেলাস ফিল করানোর জন্যই কথাটা বলেছিল। তবে অরি এবার আর একটা কথাও বলল না। চোখের পলকে সে সারিমের কোল থেকে সটান নিচে নেমে দাঁড়াল। আর ঠিক পরমুহূর্তেই, সারিমকে চরম মাত্রায় স্তব্ধ আর অবাক করে দিয়ে সে তার ডান হাতটা তুলে পরপর, একনাগাড়ে সারিমের গালে ছয়টা কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দিল!
চড়ের আওয়াজগুলো প্রতিধ্বনিত হলো রুমে। সারিম ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে নিজের গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বেচারা একদম তাজ্জব বনে গেছে! ওর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে—ওর এই শান্ত বউটা। এভাবে অশান্ত হয়ে ওকে কেন এভাবে মারল, তার কোনো হিসাব সে মেলাতে পারল না সারিম।
এদিকে অরি আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। অত্যন্ত দ্রুত পায়ে সারিমের রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে হনহন করে চলে গেল। আর সারিম আয়নার সামনে ওভাবেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল,গালে তখনো অরির আঙুলের পাঁচটা লাল দাগ জ্বলজ্বল করছে।

সারিম ভাবলো অরির পিছু নিয়ে তার রুমে যাবে,বউটা হঠাৎ এহেন আচরনে সারিমের চিন্তা লাগলো।সে যেতেই নিবে এমন টাইমে ওর ফোনটা শশব্দে বেজে উঠে। সারিম ফোনের দিকে তাকাতেই দেখে শিক্ষাবোর্ড থেকে কল এসেছে।ফোনটা গুরুত্বপূর্ণ তাই সারিম পিক করলো।ওপাশ থেকে তাড়া আসলো সারিমকে এখন যেতে হবে। কিছুক্ষনের মধ্যেই মিটিং শুরু হতে চলছে।আজকের মিটিংয়ে সারিমের থাকাটা মাস্ট ইমপোর্টেন্ট। অগত্যা সারিম অরির কাছে আর গেল না। বেড সাইড টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো কাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

রাত তখন ঠিক আটটা। চারপাশের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে সঙ্গী করে আরিশান মৃধার গাড়িটা পার্ক করে সদর দরজা গলিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল, কোটের বোতামটা আলগা করতে করতে তিনি ড্রয়িং রুমের দিকে এগোতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। ওনার সুতীক্ষ্ণ চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য সংকুচিত হয়ে উঠল।
ড্রয়িং রুমের আলো-আঁধারি ছায়ার মাঝে সোফায় বসে আছেন সোলেমান শেখ। তার মুখে এক হাসির রেখা। তিনি বেশ আয়েশ করে, অত্যন্ত হাসিখুশি ভঙ্গিতে আনতারা মৃধার সঙ্গে গল্পে মেতে আছেন। যেন বহু বছরের চেনা কোনো পরম আত্মীয়ের সঙ্গে দীর্ঘ বিরতির পর মোলাকাত হয়েছে। আর তাদের ঠিক পাশেই, সোফার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে চুপচাপ বসে আছে জেবা। মেয়েটার দিকে তাকালে বুকটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। তার চঞ্চল, চপল মুখটা আজ বড্ড মলিন, যেন এক নিমিষেই কেউ ওর ভেতরের সমস্ত বসন্তকে কেড়ে নিয়ে এক ধূসর শরৎ এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
আরিশান মৃধার জুতোর খটখট শব্দে ড্রয়িং রুমের গল্পে ক্ষণিকের ছেদ পড়ল। ওনাকে প্রবেশ করতে দেখেই আনতারা মৃধা মুখে এক কৃত্রিম চওড়া হাসি ফুটিয়ে সাগ্রহে ডেকে উঠলেন,

_”আরিশান!এসো, দেখো কে এসেছে।”
সোলেমান শেখও ধীরভঙ্গিতে পিছু ফিরে তাকালেন। আরিশান মৃধাকে দেখে তার ঠোঁটের কোণের হাসির পরিধি আরও কিছুটা বিস্তৃত হলো। তিনি অত্যন্ত আন্তরিক গলায় বললেন,
_“এসো আরিশান, তোমার কথাই হচ্ছিল।”
আরিশান মৃধা কোনো কথার উত্তর দিলেন না। ওনার সমস্ত অবয়ব জুড়ে এক গম্ভীর, হিমশীতল নীরবতা। ওনার তীক্ষ্ণ, অনুসন্ধানী দৃষ্টি চারপাশের সবাইকে উপেক্ষা করে সোজা গিয়ে থিতু হলো জেবার ওপর। তিনি কোনো ভূমিকা না করে সোজা হেঁটে গিয়ে জেবার একদম সামনের সোফাটায়, ওর মুখোমুখি হয়ে বসলেন।কিন্তু জেবা একবারের জন্যও ওনার দিকে ফিরে তাকাল না। সে নিজের কোলের ওপর রাখা আঙুলগুলোর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন আরিশান মৃধা নামের কোনো মানুষের অস্তিত্বই এই ঘরে নেই।
পরিবেশের এই গুমোট ভাবটা কাটাতে সোলেমান শেখ নিজেই আবার কথা বলে উঠলেন। তিনি আনতারার দিকে একবার তাকিয়ে আরিশানের উদ্দেশ্যে বললেন,

_“আনতারাই আমাকে ডেকে আনল। সত্যি আরিশান, তুমি বড্ড ভাগ্যবান! মানুষ তার জীবনে ভালোবাসা খুব কমই ফিরে পায়। তুমি খুব লাকি যে তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে তুমি আবার পুনরায় ফিরে পেয়েছ।”
সোলেমান শেখের মন্তব্যের জবাবে আরিশান মৃধা একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে রইল। তবে আনতারা মৃধা সোলেমান শেখের কথায় বেশ তৃপ্তির হাসি হাসলেন, যেন এই প্রশংসাটা তারই প্রাপ্য ছিল।
আরিশান মৃধা পকেট থেকে ওনার ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিনের দিকে গম্ভীর মনোযোগ কিছু একটা করছিলেন, যেন তার সামনে বসে থাকা মানুষগুলোকে পাত্তা দেওয়ার মতো বিন্দুমাত্র সময় বা মানসিকতা ওনার হাতে নেই। ওনার এই উদাসীনতা ও অবজ্ঞা ঘরের ভেতরের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলল।
সোলেমান শেখ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরিশান মৃধা আর আনতারা মৃধা দুজনের উদ্দেশ্যেই বলতে শুরু করলেন,

_“আসলে কী জানো? সন্তানদের ভুলের জন্য আজকাল বাবা-মাকে সমাজের কাছে ভীষণ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এই যে এত বড় একটা কেলেঙ্কারি ঘটে গেল, এখানে দোষটা কিন্তু সারিম আর জেবা দুজনেরই। দুজনে সমান তালের অন্যায় করেছে, এখানে দোষটা আমার বা তোমার কারো নয় আরিশান, দোষটা এই ছেলে মেয়েদের। তবে আর নয়, আমি একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।”
এটুকু বলে সোলেমান শেখ খানিকক্ষণের জন্য থামলেন। আরিশান মৃধা এতক্ষণে ফোন থেকে চোখ সরালেন। ওনার গম্ভীর চোখের মণি জোড়া সোলেমান শেখের ওপর স্থির হলো, যেন তিনি পরবর্তী বাক্যটি শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
সোলেমান শেখ গলাটা সামান্য ঝেড়ে নিয়ে বললেন,

_“জেবা ভুল করেছে, তা সে নিজের মুখে স্বীকার করেছে। আমি আসলে আজ জেবাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমার মেয়ে যে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে, এইটুকুই আমার জন্য অনেক। আমি অলরেডি উকিলের সাথে আলাপ করে এসেছি, ডিভোর্সের আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন হতে মাস তিনেক সময় লাগবে। এই তিনমাস জেবা আমার সাথেই থাকবে। এরপর আমি ওকে স্টাডিজের জন্য আমেরিকা পাঠিয়ে দেব। ওখানেই ও নিজের জীবনটা নতুন করে গুছিয়ে নেবে।”
সোলেমান শেখের কথা শেষ হতেই আনতারা মৃধা যেন হাতে স্বর্গ পেলেন। তিনি সোফায় একটু নড়েচড়ে বসে খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,
_“এটা তুমি খুব ভালো এবং বাস্তবসম্মত একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছ সোলেমান। জেবার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আমার তরফ থেকে সবসময় শুভকামনা রইল। মেয়েটার একটা হিল্লে হওয়া দরকার।”
জেবা এতক্ষণ পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে ছিল। কিন্তু এবার তাকে মুখ খুলতেই হলো। বুকের ভেতর হাজারটা ভাঙচুরের শব্দ, কলিজা ছিঁড়ে যাওয়া কষ্টগুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ধামাচাপা দিয়ে, সে একটা কৃত্রিম হাসি মুখে ফুটিয়ে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে বলল,

_“সরি আঙ্কেল… আমার জন্য আপনাকে আর আপনার পরিবারকে অনেক কিছু ফেস করতে হয়েছে। আমি সেদিন ওমন পাগলামি না করলে, আজকে হয়তো এত বড় সমস্যা তৈরি হতো না। আসলে আমি এখন বুঝতে পেরেছি, আপনার আর আমার একদম যায় না। আপনি তো আমার বাবার মতো শ্রদ্ধেয়… আমিই হয়তো বয়সের তাড়নায় আর আবেগে ভেসে একটা মস্ত বড় পাগলামি করে বসেছিলাম। তার জন্য দয়া করে আমায় ক্ষমা করবেন।”
জেবার মুখ থেকে ‘বাবার মতো’ এবং ‘আবেগের পাগলামি’ শব্দগুলো যখন বের হচ্ছিল, তখন আরিশান মৃধার চোখ দুটো যেন সামান্য কেঁপে উঠল। তিনি একদৃষ্টে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওনার পাথুরে মুখের আড়ালে কী তীব্র তোলপাড়, কী গভীর ভাবাবেগ লুকিয়ে ছিল, তা আদেও বোঝা গেল না। ওনার চোখ দুটো যেন এক অতলান্ত মহাসমুদ্র, যার গভীরতা মাপা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে।
সোলেমান শেখ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জেবাকে বললেন,

_“জেবা মা, তোর যদি প্রয়োজনীয় কিছু থাকে, তবে ওপরে গিয়ে চট করে গুছিয়ে নিয়ে আস। আমাদের বের হতে হবে।”
জেবা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে সোফা ছেড়ে উঠে ধীর পায়ে ওপরে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে চলে গেল। আরিশান মৃধা তখনো নির্বিকার, নিস্পৃহ। ওনার মুখে কোনো বিকার দেখা গেল না। ড্রয়িং রুমে তখন আনতারা মৃধা আর সোলেমান শেখ নিজেদের মধ্যে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেছিলেন। আরিশান মৃধা ওনাদের দিকে তাকিয়ে বলে উঠেন,
_“আমার একটা জরুরি ফোন কল করতে হবে”এই এক্সকিউজ দিয়ে ড্রয়িং রুম থেকে উঠে বাইরের লনের দিকে চলে গেলেন আরিশান মৃধা।
ওপরে এসে জেবা সরাসরি নিজের রুমে না গিয়ে অরির রুমে ঢুকল। অরি তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। জেবা রুমে ঢুকেই কোনো কথা না বলে নিজের গলা, হাত আর কান থেকে আরিশান মৃধার দেওয়া গয়নাগুলো একটা একটা করে খুলতে লাগল।এবং অত্যন্ত যত্ন সহকারে অরির ড্রেসিং টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল।
অরি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জেবার এই নিঃশব্দ বিদায়ের প্রস্তুতি দেখছিল। ওর বুকে একটা চেনা কষ্ট মোচড় দিয়ে উঠলেও কিন্তু মুখ ফুটে কিচ্ছু বলল না। জেবা সব গয়না রাখা শেষ করে অরির দিকে একবার তাকাল। ওর মলিন ফ্যাকাশে মুখে একটা বিদায়ের করুণ আভা ফুটে উঠল। সে খুব মৃদু গলায় বলল,

_“আমি আসি রে অরি। তুই ভালো থাকিস।”
অরি নিজের ভেতরের আবেগটুকু চেপে রেখে শুধু বলল,
_“ঠিক আছে, সাবধানে যাস।”
জেবা একটা স্নান, বিবর্ণ হাসি হেসে অরির রুম থেকে বেরিয়ে এল। করিডোর দিয়ে ও যখন সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই বাড়ির একজন মেড অত্যন্ত দ্রুত পায়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল। মেডটি জেবার দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ম্যাম, সারিম স্যার আপনাকে এক্ষুনি ছাদে ডেকেছেন। উনি বললেন আপনার সাথে ওনার জরুরি কথা আছে।”
মেডের মুখে কথাটা শুনে জেবা বেশ অবাক হলো।এতোক্ষন যাবত নিচে ছিলো সে,কই সারিমকে এখনো তো বাড়ি ফিরতে দেখেনি।তবে পরক্ষণেই জেবা ভাবল, হয়তো সে অরির রুমে আসার ঠিক পরপরই সারিম বাড়ি ফিরেছে আর জেবা খেয়াল করেনি। সারিম ভাই কেন ওকে ছাদে ডাকবে—এই কৌতূহল আর সামান্য দ্বিধা নিয়ে জেবা সিঁড়ি বেয়ে ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

রাতের ছাদটা একদম অন্ধকার। নিঝুম কালো আকাশটা মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে। জেবা ছাদে পা রাখতেই চারপাশের এই নিস্তব্ধতা দেখে কিছুটা দমে গেল। পুরো ছাদে কোনো আলোর চিহ্ন নেই, চারপাশটা খা খা করছে। জেবা অন্ধকারের মধ্যে চোখ পিটপিট করে তাকালেও কাউকে দেখতে পেল না। সারিমকে কোথাও না দেখে ওর মনের ভেতর একটা অজানা চিন্তার রেখা ফুটে উঠল।
জেবা অন্ধকারের দিকে চেয়ে কিছুটা জোরে সারিমের নাম ধরে ডাকল,
“সারিম ভাইয়া ? কোথায় আপনি?”
কিন্তু চারপাশ থেকে শুধু বাতাসের সাঁ সাঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো উত্তর এল না। জেবা ছাদের এমাথা থেকে ওমাথা হেঁটেও যখন সারিমকে পেল না, ভাবল, হয়তো সারিম চিলেকোঠার ঘরটায় বসে আছে।জেবা ধীর পায়ে চিলেকোঠার দিকে এগিয়ে গেল।
চিলেকোঠার দরজাটা সামান্য খোলাই ছিল। জেবা ভেতরে ঢুকে সারিমকে খুঁজতে গিয়ে যেই পা রাখল, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক ঝটকায় কেউ একজন দরজাটা টেনে ধরে সজোরে আটকে দিল!একটা ভারী তালা লাগানোর শব্দ হলো বাইরে থেকে।

হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় জেবা পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, হাত বাড়িয়েও নিজের হাত দেখা যাচ্ছে না। ভীতি আর আশঙ্কায় জেবার গলার কাছে চিৎকার আটকে গেল। সে পাগলের মতো দরজার দিকে ছুটে গিয়ে দুই হাতে দরজায় আঘাত করতে লাগল।
“কে? কে বাইরে? দরজা খুলুন! সারিম ভাইয়া, আপনি কি বাইরে? প্লিজ দরজাটা খুলুন! আমার খুব ভয় করছে… কেউ আছেন? দরজাটা খুলুন!”

জেবা অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে দরজার হাতলটা ধরে ঝাঁকাতে লাগল, চিৎকার করে দরজা খোলার জন্য অনুনয় করতে লাগল। কিন্তু চিলেকোঠার দেয়াল ভেদ করে বাইরে থেকে কোনো সাড়া শব্দ এল না।
আরিশান মৃধা লনের দিক থেকে ফিরে এসে ড্রয়িং রুমে নিজের পূর্বের জায়গাটিতে আবার এসে বসলেন। ওনার অবয়বে সেই চেনা গাম্ভীর্য আর উদাসীনতা। সোফায় হেলান দিয়ে তিনি পকেট থেকে ফোনটা বের করে আবার স্ক্রল করতে শুরু করলেন। ওনার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব, যেন এই ঘরের ভেতরে বা বাইরে কী ঘটে যাচ্ছে, তা নিয়ে ওনার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।
এদিকে সোলেমান শেখ সোফায় বসে বারবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ জেবার নিচে নামার কোনো লক্ষণ নেই। সাধারণ একটা ব্যাগ গোছাতে একটা মেয়ের এতক্ষণ সময় লাগার কথা নয়। জেবাকে এখনো নিচে নামতে না দেখে ওনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তিনি কিছুটা অস্থির হয়ে সোফায় নড়েচড়ে বসলেন।

সোলেমান শেখকে এভাবে বারবার ঘড়ি দেখতে আর চিন্তিত হতে দেখে আনতারা মৃধার চতুর চোখ দুটো চকচক করে উঠল। তিনি মুখে কৃত্রিম সহানুভূতি ফুটিয়ে নরম গলায় বললেন,
_“কী ব্যাপার সোলেমান? তুমি বড্ড চিন্তিত হয়ে পড়ছ দেখছি।”
সোলেমান শেখ চিন্তা নিয়ে বললেন,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৩

_”জেবা এখনো ফিরছেনা কেন? সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”
_”আসলে মেয়েমানুষের গোছগাছ তো, একটু সময় লাগা স্বাভাবিক। আচ্ছা, তুমি ব্যস্ত হয়ো না, আমি নিজেই দেখছি জেবা এখনো কেন নিচে আসছে না।”
কথাটা বলেই আনতারা মৃধা সোফা ছেড়ে উঠলেন এবং অত্যন্ত ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলার দিকে উঠে গেলেন।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here