Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩০

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩০

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩০
মেহজাবিন নাদিয়া

শব্দটা উচ্চারণ করে সারিম নিজের তর্জনীটা অরির কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। অরির বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম একসঙ্গে বাজছে। এই লোকটার মতিগতি বোঝা সত্যিই দায়! এইমাত্র যে লোকটা শাড়ি পরা রূপ দেখে একটা শুকনো ‘ভালো’ বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, সে-ই এখন এই সাধারণ, এলোমেলো রূপে ওকে দেখে এভাবে ঘায়েল হচ্ছে?
সারিমের চোখের ধারালো এবং গভীর চাউনি অরিকে এক চুলও নড়তে দিল না। অরি দুই হাত দিয়ে নিজের শার্টের নিচের অংশটা শক্ত করে চেপে ধরল। ও কোনোমতে ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল, কিন্তু সারিমের উপস্থিতি ওকে ক্রমশ অবশ করে দিচ্ছিল।সারিম আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করতে চাইল না। ভেতরের সমস্ত ধৈর্য যেন এই বৃষ্টিভেজা রাতে বাঁধ ভেঙে গেছে। অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সারিম আচমকা নিচু হয়ে এক ঝটকায় অরিকে দুই বাহুর বন্ধনে বন্দি করে কোলবালিশের মতো শূন্যে তুলে নিল।
হুট করে এভাবে কোলডাঙ্গা হওয়ায় অরি চমকে উঠে একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠল-

_”সারিম! কী করছেন? ছাড়ুন আমাকে! নামান বলছি!”
সারিম অরির কোনো বারণ শুনল না, যেন ও এখন এক মায়াবী ঘোরের মধ্যে তলিয়ে গেছে। ওর পেশিবহুল দুই হাত অরিকে শক্ত করে বুকের সঙ্গে লেপ্টে ধরে রাখল।সারিম অরির ছটফটানিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সোজা বেডরুমের দিকে হেঁটে গেল। পায়ের ধাক্কায় বেডরুমের দরজাটা আধো-বন্ধ করে ও সোজা গিয়ে দাঁড়াল বিছানাটার পাশে। অত্যন্ত আলতো করে সারিম অরিকে নরম বিছানার ওপর শুইয়ে দিল।
অরি বিছানায় পিঠ ঠেকতেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আগেই সারিম ওর দুই পাশে নিজের হাত রেখে বিছানায় ঝুঁকে পড়ল। সারিমের এই আকস্মিক রূপ দেখে অরির চোখের রিডিং গ্লাসটা সামান্য বাঁকা হয়ে গেল। ও নিজের হাত দিয়ে সারিমের বুকটা ঠেলে দূরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে বলল,

_”সারিম, প্লিজ… একদম কাছে আসবেন না। আমার ভালো লাগছে না কিন্তু!”
সারিম এতক্ষনে আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না।চোখ দুটো যেন এক অদ্ভুত নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। ও এক হাত দিয়ে অরির দুটো হাত এক জায়গায় এনে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরল এবং অন্য হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে অরির শার্টের ওপরের বোতামটা খুলতে গেল। ওর আঙুলের স্পর্শে অরি শিউরে উঠল।সারিম অরির কানের কাছে নিজের তপ্ত শ্বাস ফেলে অত্যন্ত কাতর এবং গম্ভীর গলায় বলল-
_”আজকে আর আটকাবে না বউ! আই হ্যাভ নো কন্ট্রোল ওভার মাইসেলফ! পেছনের যত ভুল করে এসেছি, তার জন্য আমি সত্যিই সরি চন্দ্রিমা। সামনে তোমাকে খুব করে আগলে রাখবো। কোনো কষ্ট পেতে দেব না।এখন স্বামীকে একটু আদর করতে দাও, জান…”
কথাটা শেষ করেই সারিম পরম আবেশে চোখ দুটো বুজে অরির ওষ্ঠাধর নিজের ঠোঁটের চেপে ধরার জন্য যেই না আরও ঝুঁকে পড়ল,

সারিমের ঠোঁট অরির ঠোঁট স্পর্শ করার ঠিক এক মিলিমিটার আগেই, অরি আচমকা দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করে বাচ্চাদের মতো মুখ হাঁ করে বিকট শব্দে কেঁদে উঠল।
অরির এই আকস্মিক গগনবিদারী কান্নার শব্দে সারিমের ভেতরের সমস্ত নেশা আর উত্তেজনা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে কর্পূরের মতো উড়ে গেল! যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর এক বালতি বরফশীতল পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। সারিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, চোখ বড় বড় করে অরির দিকে তাকিয়ে রইল। অরি যেভাবে গলা ছেড়ে, হাত-পা ছুড়ে বাচ্চাদের মতো কান্না জুড়ে দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে ওকে আদর নয়, বরং কেউ ধরে মারধর করছে!
সারিমের মুডটা একদম তিতকুটে হয়ে গেল।সে প্রচণ্ড বিরক্তি আর অস্বস্তিতে নিজের দুই কান হাত দিয়ে চেপে ধরে ঝটকা মেরে অরির ওপর থেকে সরে বিছানার অন্যপাশে গিয়ে বসল।

_”হোয়াট দ্য…! এটা কী শুরু করলে চন্দ্রিমা?” সারিম বিরক্ত গলায় বলে উঠল।
সারিম গা থেকে সরতেই অরি বিছানার মাঝখানে হাঁটু গেড়ে ধপ করে বসে পড়ল। চোখের রিডিং গ্লাসটা ততক্ষণে নাক থেকে খসে বিছানায় পড়ে গেছে। চোখের জল, নাকের জল এক করে ও অনবরত কেদেই চলেছে, কোনো থামাথামির লক্ষণই নেই। ওর কান্না দেখে মনে হচ্ছে যেন বিশাল বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে গেছে।সারিম কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল। অরির এই একটানা কান্না ওর সহ্য হচ্ছিল না। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তি ঝেড়ে, আবার অরির দিকে একটু এগিয়ে গেল।অরির কাঁধে একটা হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞাসা করল।
_”বউ কাঁদছ কেন এভাবে? আমি তো জোর করিনি। ছুঁইওনি তোমাকে। তাহলে এত কান্নার কী আছে? কী হয়েছে তোমার, বলবে তো নাকি?”
অরি কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়ে, হিক্কা তুলতে তুলতে শার্টের হাতা দিয়ে চোখ-মুখ মুছল। তারপর সারিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিষ্পাপ আর ভয়ার্ত গলায় বলল-
_”আ… আমি আপনাকে কখনো শারীরিক সুখ দিতে পারব না, সারিম! আপনি প্লিজ মাইন্ড করবেন না… আমাকে ছেড়ে দিন!”

সারিম এবার পুরো আকাশ থেকে পড়ল। ও ভ্রু কুঁচকে, চোখ সরু করে অরির দিকে তাকিয়ে রইল। এই মেয়ে হুট করে এসব কী আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বসল!
_”কেন? কী সমস্যা তোমার?”
অরি নাক টেনে, কান্নাভেজা গলায় ডুকরে উঠে বলল।
_”আমি ঐসব করব না সারিম। ঐসব করতে গিয়ে ইন্টারনেটে কতো নিউজে দেখেছি আমি… প্রচুর রক্তপাত হয়, অনেক কষ্ট হয়, তারপর অনেকে মরে যায়! আমি এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না সারিম! আমার খুব ভয় করে..!”

অরির মুখে এমন অদ্ভুত, আজগুবি যুক্তি শুনে সারিম কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল না হাসবে নাকি কাঁদবে! এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, অরির মতো পড়াশোনা করা একটা মেয়ে,ইন্টারনেটের উল্টোপাল্টা নিউজ দেখে কীসব ভয়ানক ধারণা মাথায় নিয়ে বসে আছে!সারিম নিজের কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল।রাগ, বিরক্তি আর হাতাশা এসে ভর করল ওর ওপর।দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরির দিকে তাকাল। অরি তখনও গুটিসুটি মেরে বিছানার এক কোণে বসে আছে, ওর গাল বেয়ে পানির দাগ লেপ্টে আছে,বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে সারিমকে দেখছে-যেন সারিম কোনো মানুষ নয়, আস্ত একটা রাক্ষস!
সারিম বিছানায় আরটু এগিয়ে এসে অরির মুখোমুখি বসল। ওর একটা হাত আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গলার স্বর যতটা সম্ভব নরম আর আশ্বস্ত করার মতো করে বলল,
_“তুমি ইন্টারনেটের সব আবর্জনা নিউজ পড়েছো। ঐগুলো ভুয়ো।এর কোনো সত্যতা নেই,আমি বলছি কাছে আসো আমার।কিছু হবে না।”

অরি নাক টেনে, হিক্কা তুলতে তুলতে বলল,
_“আমি মিথ্যা বলছি না!ঐগুলো ভুয়ো না।আপনি সার্চ করে দেখুন! ওখানে স্পষ্ট লেখা ছিল… অনেক ব্যথা লাগে, তারপর ব্লিডিং হয়… মানুষ সহ্য করতে না পেরে শকড হয়ে মারাও যেতে পারে! আমি মরতে চাই না সারিম, প্লিজ কাছে আসতে বলবেন না।”
সারিম এবার আর না পেরে হেসেই ফেলল।অরির কপালে জমে থাকা ঘাম আর চোখের জমে থাকা পানি নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিয়ে বলল,
_“ধুর বোকা মেয়ে! ওসব ফেক নিউজ, স্রেফ ভিউ পাওয়ার জন্য বানিয়ে লেখে। তুমি তো পড়াশোনা জানা একটা মেয়ে, ইন্টারনেটের সব কথা বিশ্বাস করতে আছে? এই যে আমি তোমাকে এতো আগলে রাখি, আমি কি কোনোদিন চাইব আমার চন্দ্রিমার এক ফোঁটা রক্ত ঝরুক? বা ও কোনো কষ্ট পাক?”
অরি সারিমের চোখের দিকে তাকাল। সারিমের গলার স্বর আর চোখের মায়া ওকে একটু শান্ত করল, কিন্তু ভেতরের ভয়টা পুরোপুরি কাটল না। ও ফিসফিস করে বলল,
_“কিন্তু সবাই তো বলে… প্রথমবার নাকি অনেক কষ্ট হয়? আপনি আমাকে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছেন না তো?”

_“একদম না, আমার জান,” সারিম অরির হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে একটা মৃদু চুমু খেল।
_“কষ্ট কেন হবে? যদি দুজন মানুষের মধ্যে বিশ্বাস থাকে, তবে ওটা কষ্টের হয় না। ওটা একটা সুন্দর অনুভূতি। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ। আমি তো আছি, তাই না?তুমি শুধু নিজেকে আমার কাছে একবার সপেঁ দিয়েই দেখ! বাকিটা আমি সামলে নিবো,”
অরি কিছুক্ষণ চুপ করে সারিমের বুকের দিকে তাকিয়ে রইল। সারিমের তপ্ত শ্বাস ওর মুখে এসে লাগছে।
_“ তাহলে আপনি আমাকে কথা দিন।”
_“কী কথা, বলো?” সারিম অরির মুখের দিকে ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করল, ওর চোখ দুটো আবার সেই চেনা নেশায় বুঁদ হতে শুরু করেছে।
_“কথা দিন, আপনি আমাকে একটুও ব্যথা দেবেন না। আর… আমি যদি বলি ‘ছেড়ে দিন’, বা আমার যদি খুব কষ্ট হয়, আপনি তখনই আমাকে ছেড়ে দেবেন। একদম জোর করবেন না। বলুন, রাজি?” অরি অত্যন্ত ভয়ার্ত আর নিষ্পাপ চোখে সারিমের দিকে তাকিয়ে শর্তটা দিল।

সারিম অরির এই সরলতা দেখে মনে মনে হাসল।অরির গালটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, _“রাজি। একশো বার রাজি। তুমি যেভাবে বলবে, সেভাবেই হবে। তোমার স্বামী তোমার ওপর কোনো জোর করবে না, প্রমিস।”
অরি আস্তে করে মাথা নাড়ল। ওর সম্মতি পেতেই সারিমের ভেতরের এতক্ষণের চেপে রাখা তৃষ্ণা যেন দ্বিগুণ হয়ে জেগে উঠল। ও আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে অরিকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। এবার আর অরি বাধা দিল না, তবে ওর শরীরটা তখনও সামান্য কাঁপছিল।সারিম ধীরেসুস্থে অরির রিডিং গ্লাসটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর আবার ফিরে এসে অরির ওপর ঝুঁকে পড়ল। ওর ধারালো চাউনি অরির সমস্ত সত্ত্বাকে অবশ করে দিচ্ছিল। সারিম পরম আবেশে অরির কপালে, দুই চোখে আর গালে নিজের ঠোঁটের স্পর্শ দিল। অরি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে সারিমের শার্টের কলারটা খামচে ধরল।
সারিমের হাত দুটো এবার অরির কোমরের দুপাশে শক্ত করে চেপে বসল। ও অত্যন্ত অধীর হয়ে অরির শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে ফেলল। উন্মুক্ত শীতল ত্বকে সারিমের তপ্ত হাতের স্পর্শ লাগতেই অরি শিউরে উঠল, ওর বুকটা দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। সারিম অরির কানের লতিতে কামড় বসিয়ে ফিসফিস করে বলল, _“তুমি শুধু আমার চন্দ্রমুখী… আর ভয় নেই তো?”

অরি কোনো উত্তর দিতে পারল না, ওর মুখ দিয়ে শুধু একটা অস্ফুট শব্দ বের হলো। সারিম আর দেরি করল না, ও অরির কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে বন্দি করে নিল। এক গভীর, মাদকতাময় চুম্বনে মেতে উঠল সে। অরির সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছিল, সারিমের ভালোবাসার গভীরতা ওকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছিল।বাহিরের বৃষ্টির ছাঁট আর ঝমঝম শব্দ যেন ওদের এই মিলনকে আরও মোহময় করে তুলছিল।
একসময় দুজনের মধ্যে তীব্র আবেশ চরমে পৌঁছাল, সারিম নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ওর ভেতরের প্রেমিক পুরুষটি তখন চন্দ্রিমাকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিতে ব্যাকুল। ভালোবাসার এই চরম মুহূর্তে, সারিম আরও গভীরে প্রবেশ করতে চাইল, আচমকাই অরির শরীরে একটা তীব্র ব্যথার মোচড় দিয়ে উঠল।
অরি একদম প্রস্তুত ছিল না। আচমকা এই অচেনা আর তীব্র ব্যথায় ও শিউরে উঠে সারিমের পিঠের চামড়া নিজের নখ দিয়ে খামচে ধরল। ওর চোখ ফেটে আবার পানি বেরিয়ে এল।

_”সারিম… প্লিজ… ব্যথা লাগছে! ছাড়ুন আমাকে!” অরি ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। ও সারিমের বুকটা দুই হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।তবে সারিম বিন্দু পরিমান নড়লো না অরির থেকে উল্টো তাকে আরো গভীর ভাবে কাছে পেতে চাইলো।একসময় অরি সহ্য না করতে পেরে অনুরোধ করে বলল।
_“সারিম, আপনি কথা দিয়েছিলেন! ছাড়ুন… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! প্লিজ!”
এদিকে সারিম তখন এক মায়াবী ঘোরের চরম শিখরে পৌঁছে গেছে। ওর কানে তখন অরির এই কান্নার আওয়াজ কিংবা অনুরোধের কোনো কথাই পৌঁছাচ্ছিল না। ওর মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ অবশ, চোখের দৃষ্টিতে কেবল তীব্র কামনার আগুন।সারিম অরির দুই হাত এক ঝটকায় মাথার ওপর চেপে ধরল, যাতে ও আর ছটফট করতে না পারে।

_“সারিম… শুনছেন না কেন? উঁহু… ছাড়ুন আমাকে… আমি আর পারছি না…” অরি অনবরত কেঁদে চলল, ওর গলার আওয়াজ বুজে আসছিল।
সারিম অরির কোনো বারণ, কোনো কান্নাকে পাত্তাই দিল না। ও আরও তীব্র গভীর আবেগে অরিকে নিজের বাহুবন্ধনে পিষে ফেলতে লাগল। ব্যথার মাঝেও এক তীব্র ভালোবাসার জোয়ারে সারিম অরিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। অরির চোখের পানি সারিমের কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু সারিম তখন নিজের চন্দ্রিমাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের করে নিতে, তাকে ভালোবাসার চরম শিখরে পৌঁছে দিতে সম্পূর্ণ ব্যস্ত। এই বৃষ্টিভেজা রাতে, সমস্ত নিয়ম আর শর্ত ভেঙে সারিম অরিকে নিজের বুকের ভেতর একাকার করে নিল।
আরিশান মৃধা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হলেন, ওনার পরনে একটা কালো রঙের ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর ধূসর রঙের টি-শার্ট। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে চোখ গেল বিছানার দিকে।বিছানার ঠিক মাঝখানে জেবা উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ওর দুই পা ওপরের দিকে তুলে ও বাতাসের মধ্যে দোলাচ্ছে আর আপন মনেই গুনগুন করে গান গাইছে। আরিশান মৃধাকে বের হতে দেখেই জেবা ঝটপট উঠে সোজা হয়ে বসল। ওনার এই ঘরোয়া রূপ দেখে জেবা মনে মনে আবার ফিদা হয়ে গেল। স্যুট-কোট পরা আরিশান মৃধাকে যতটা গম্ভীর আর দূর আকাশের তারা মনে হয়, এই সাধারণ টি-শার্টে ওনাকে ততটাই আকর্ষণীয় আর আপন মনে হচ্ছে।

আরিশান মৃধা তোয়ালেটা একপাশে রেখে জেবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
_”কী দেখছ এভাবে?”
জেবা খাটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে দুই গালে হাত দিয়ে বলল,
_”দেখছি আমার গম্ভীর জামাইকে সাধারণ পোশাকে কতটা কিউট লাগে! তা আপনার এই বিশাল সাম্রাজ্যে আমার মতো একটা গরিবী রূপবতীকে জায়গা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
আরিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাটের অন্যপাশে গিয়ে বসলেন। জেবার এই অনর্গল কথা বলার স্বভাব ওনার চেনা। ওনি ল্যাপটপ টেনে নিয়ে ওটার স্ক্রিনে চোখ রেখে বললেন,
_”বেশি কথা না বলে চুপচাপ ঘুমানোর চেষ্টা করো।”
জেবা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। ও খাট ঘেঁষে আরিশান মৃধার একদম কাছাকাছি চলে এলো। আরিশান মৃধার ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে নিজের মুখটা নিয়ে গিয়ে চোখ টিপে বলল,
_”আহা! প্রথম দিন এক রুমে একসাথে থাকছি, আর আপনি ল্যাপটপ নিয়ে বসেছেন?কাজ কি আমার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়? হুহ!”

আরিশান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে জেবার মুখের দিকে তাকালেন। এত কাছে জেবার চঞ্চল চোখ দুটো আর ওর ঠোঁটের কোণের দুষ্টুমিভরা হাসি দেখে আরিশান মৃধার ভেতরের সেই চিরচেনা শক্ত দেয়ালটা যেন একটু একটু করে ধসে পড়ছে। ওনি ল্যাপটপটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিলেন। তারপর আচমকাই জেবার হাতটা ধরে নিজের দিকে একটু টেনে নিলেন।
হুট করে ওনার এমন অ্যাকশনে জেবা এবার নিজেই ভড়কে গেল। আরিশান মৃধা জেবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু ভারী গলায় বললেন,
_” তুমি কিন্তু প্রতিনিয়ত আগুনের সাথে খেলছ। এই আগুনের তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা কি তোমার আছে?”
জেবা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল ওনার চোখের গভীরতা দেখে। কিন্তু ও তো জেবা! দমে না গিয়ে আরিশান মৃধার টি-শার্টের কলারটা নিজের দুই আঙুলে পেঁচিয়ে ধরে একটু কাছে টেনে নিল। ওনার ওপরে নিজের অধিকার খাটিয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,

_”আগুনের ভয় দেখাবেন না হানি! ছোটবেলা থেকেই আমি ফায়ার ব্রিগেডের ফ্যান। আর তাছাড়া, আপনার এই আগুনের পাওয়ার কতটুকু, তা তো আমার ভালোই জানা আছে। ইদানীং বাজারে নাকি ভালো ভালো ভেষজ ওষুধ পাওয়া যায়, ‘হারবাল’ চিকিৎসা বলে ওটাকে। কোনো সমস্যা থাকলে বলেই ফেলুন, লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে কথা, দেশের এত প্রেসার নিতে গিয়ে নিজের ভেতরের মেশিন যদি আবার হ্যাং মেরে বসে থাকে, তখন তো লসটা আমারই!”

জেবার মুখে খোঁচা মারা কথা শুনে আরিশান মৃধার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কপালের রগটা রাগে দপদপ করে উঠল।আনতারা মৃধাও বোধয় জীবনেও ওনার সঙ্গে এমন রসিকতা করার সাহস দেখাইনি।আর এই পিচ্ছি মেয়েটা সরাসরি ওনার পুরুষত্ব নিয়ে খোঁচা মারছে! তাও আবার হারবালের খোঁটা দিয়ে!
নিজের ভেতরের উপচে পড়া রাগটাকে চরম শক্তিতে দমনের চেষ্টা করলেন আরিশান মৃধা।মাথাটা ভোঁভোঁ করছে ওনার।আগে ওই ছ্যাঁবলা ছেলেটা দিনরাত জ্বালাত, আর এখন এই নতুন আপদ এসে জুটেছে!কিন্তু ওনাকে শান্ত থাকতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, জেবা এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। এই মুহূর্তে রেগে গিয়ে ওনার কোনো ক্ষ্যাপাটে আচরণ করা একদমই অনুচিত হবে।
ওনি জেবার হাতটা ঝটকা মেরে নিজের কলার থেকে সরিয়ে দিয়ে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন। গলার স্বর যতটা সম্ভব বরফশীতল আর গম্ভীর করে বললেন,

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৯

_”জেবা! নিজের লিমিট ক্রস কোরো না। তুমি অসুস্থ, তাই চুপ করে আছি। এর মানে এই নয় যে,যা মুখে আসবে, তাই বলে পার পেয়ে যাবে।সময় আসলে দেখা যাবে তোমার সহ্য ক্ষমতা কতটুকু।”
_”তো দেখান এখনি, সময় আর আসা লাগবেনা। আমি আপনার জন্য সবসময় প্রস্তুত হানি।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here