Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১০

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১০

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১০
মুশফিকা রহমান মৈথি

ডায়েরিটা হাতে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চন। উত্তরের প্রতীক্ষা করছে। উত্তরটা সে চটজলদি পাবে না সে জানে। সরফরাজ পটনভী স্নিগ্ধ কারোর সাথে জবাবদিহিতার জন্য বাধ্য নয়। যখন হাল ছেড়ে দিয়েছিলো কাঞ্চন ঠিক তখন স্নিগ্ধ গাঢ় এবং গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলো
“কিন্তু জিনিসটা আমার জন্যই তৈরি, তাই নয় কি!”
এখনো লোকটার মধ্যে দর্পের আভাস পেলো কাঞ্চন। অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো। কিন্তু অস্বীকার করতে পারলো না। বরং ক্ষুব্ধ স্বরে শুধালো,
“আমি তো সেটা ফেলে দিয়েছিলাম। তোমার কাছে পৌছানোর কথা তো না।”
“যে জিনিস যার জন্য বরাদ্দ সেটা তার কাছে পৌছাবেই”
কাঞ্চনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। দৃষ্টি স্থির। অনেকটা সময় স্নিগ্ধের দিকে তাকিয়ে থেকে সে একটা সাংঘাতিক কাজ করলো। কাঞ্চনের ব্যাগে সবসময় সেফটির জন্য একটা ব্যাগ থাকে। সেই ব্যাগে সবসময় এন্টিকাটার, লাইটার, পেপারস্প্রে আরোও অনেক কিছু থাকে। সেই লাইটার বের করলো কাঞ্চন। স্নিগ্ধের কপালে ভাঁজ পড়লো। কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলো,

“কি করছিস?”
“যেটা আগেই করা উচিত ছিলো!”
বলেই ডায়েরিটার কাগজে আগুণ ধরিয়ে সেটাকে মেঝেতে ফেলে দিলো। স্নিগ্ধ দেখলো। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। দাউ দাউ করে একটু একটু করে জ্বলছে ডায়েরিটা। পাঁচ বছর আগে এই ডায়েরির মালিক ছিলো কাঞ্চন। এখন সেটা আগুণের লেলিহান শিখায় জ্বলছে। কাঞ্চন শীতল স্বরে বললো,
“আজ থেকে অতীতের সেই সূক্ষ্ণ দড়িটাও আমি ছিড়ে ফেললাম। বোকা কাঞ্চন যে তোমাকে ভালোবাসতো সে পাঁচবছর আগেই, তাকে আমি মেরে ফেলেছি। এখন যা জ্বলছে সেটা তার ধ্বংসাবশেষ। আশাকরি এখন থেকে কোনো ভুল ধারণা মাথায় রাখবে না।”

ডায়েরিটা জ্বলছে। সেই সাথে জ্বলছে একটা কিশোরীর কিছু অব্যক্ত অনুভূতি। যেই অনুভূতিগুলো কাউকে বলা যায় না। এই ডায়েরিটা ছিলো কাঞ্চনের সঙ্গী। কিছু আনন্দ, কিছু স্মৃতি, কিছু অভিমান আর কিছু কথা যা কাউকে বলা যায় না। কাজিনমহলে সারাক্ষণ ফাজলামি করে জমিয়ে রাখা মেয়েটিরও কিছু দুঃখ ছিলো। যা সন্তর্পণে এই ডায়েরিতে লুকিয়ে রেখেছিলো সে। তার ভালো লাগার পুরুষটির জন্য এই ডায়েরি লেখা। কাঞ্চন বেশি সময় সেই জ্বলন্ত ডায়েরির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না। দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে তৎপর হলো। যাবার সময় স্নিগ্ধের কাঁধে ধাক্কা খেলো। কিন্তু স্নিগ্ধ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোয়াল শক্ত। দৃষ্টি ওই জ্বলতে থাকা ডায়েরিতে আবদ্ধ।
কাঞ্চন মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে গেলো। বাগানের ভেতর একটা ঘাটলা বাঁধা পুকুর আছে। পরিত্যক্ত পুকুর। পুকুরের পানিতে শ্যাওলা জমেছে। সবুজ হয়ে গেছে পানিটা। তার উপর ঝুকে আছে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। কাঞ্চনের পছন্দের জায়গা এটা। এই জায়গাটা কিছুদিন পর মেজো চাচা ভরাট করে দিবেন। ডায়েরির সাথে সাথে এই জায়গার স্মৃতিগুলোও মুছে যাবে।

পারিজাত পটনভী কাঞ্চন, পটনভী মঞ্জিলের একটা প্যারাসাইট। এই ভাষ্যটা তার নয়। ভাষ্যটা সেই পুরুষের যাকে কেন্দ্র করে একটা সময় একদলা আবেগ জমেছিলো কাঞ্চনের বুকে। কাঞ্চনের বাবা সালমান পটনভী এবং কাঞ্চনের মা মেহরিনের বিয়েটা হয়েছিলো জুলফিকার পটনভীর ইচ্ছেতে। মেহরিন পটনভী জুলফিকার পটনভীর চাচাতো বোনের মেয়ে। বোন মারার যাবার সময় তিনি কথা দিয়েছিলেন সালমানের সাথে মেহরিনের বিয়ে দিবেন। কারণ মেহরিনের কোনো ভাইবোন ছিলো না। তার বাবা অনেক ছোটবেলায় মারা গেছে। সুতরাং তার কোনো অভিভাবক নেই। কেউ একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের দায়ভার নিতে চাইছিলো না। ফলে স্বেচ্ছায় মেহরিনের দায়িত্বটা জুলফিকার পটনভীর কাঁধে নেন।

সালমান জুলফিকার পটনভীর ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ছোট হবার দরুণ সে অত্যন্ত আদুরে, জেদি, ক্ষেপাটে প্রকৃতির মানুষ সে। একপ্রকার স্বাধীনচেতা পুরুষ হিসেবেই সে বড় হয়। তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাকে এক গ্লাস পানি অবধি ঢালানো যেত না। জুলফিকার পটনভীর যখন তার মেহরিনের বিবাহে প্রস্তাব দেন, সে সরাসরি নাকোচ করে। তার মেহরিনকে পছন্দ নয়, সে তাকে বিয়ে করবে না। বিয়ের মতো এতো কঠিন সিদ্ধান্ত সে আবেগের বশে নিতে চায় না। ফলে বাবা এবং ছেলের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এতে করে জুলফিকার পটনভীর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে সালামানের সেই জেদ খুব বেশি সময় টেকসই রইলো না। একটা সময় মায়ের অসুস্থতা বাড়তে থাকলে তার জেদের হাটু ভাঙ্গে, ফলে বাধ্য হয়ে তাকে বিয়েটা করতে হয়। বিয়ের পর সে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। মেহরিন নরম প্রকৃতির মেয়ে। তাকে যা বলা হত সে করতো। সবচেয়ে বেশি যা সালমানকে প্রভাবিত করলো তা হলো মেহরিন তাকে খুব বেশি ভালোবাসতো। ফলে তাকে ভালো না বাসলেও তাকে অবজ্ঞা করতে পারলো না সালমান। সবাই ভেবেছিলো সালমান মেহরিনকে মেনে নিয়েছে। জুলফিকার পটনভীও মনে মনে প্রসন্ন হলেন। নিশ্চিন্ত হলেন মেহরিনের জন্য। কিন্তু তার চিন্তায় এক দিন ফাঁটল পড়লো।
সালমান পটনভী কাউকে কিছু না বলে শুধু মেহরিনের উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে চলে গেলেন। চিঠিতে লেখা,

“আমাকে ক্ষমা করো। তুমি ভালো মেয়ে, তোমার জীবনটা আরোও সুন্দর হতে পারবে। আমার মতো অপদার্থের জন্য অপেক্ষা করো না। আমি ফিরবো না।”
মেহরিন পাথরের মতো তাকিয়ে ছিলো ওই চিঠির দিকে। তার চোখ থেকে এক বিন্দু অশ্রুও গড়ায় নি। সেই মুহূর্তে সে অন্তঃসত্ত্বা ছিলো। সালমানকে বলার সুযোগটাও সে দেয় নি। জীবনের ওই মুহূর্তে সে একেবারে একা। জুলফিকার পটনভী অনুশোচনায় ভুগলেন বহুদিন। নিজের ছেলেকে ত্যাজ্য করলেন। সালমান বেঁচে আছেন কি না পটনভী মঞ্জিলের কেউ জানে না। জুলফিকার পটনভীর স্ত্রী ছেলের এমন প্রতারণায় মনোক্ষুণ্ণ হলেন। অনুশোচনা, গ্লানিতে তিনি আরোও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মেহরিন কাউকে দোষ দিলো না। কোনো হা হুতাশ করলো না। ভাগ্য ভেবে সবটা গিলে নিলো। পটনভী মঞ্জিলের একটা ঘরে নিজেকে বন্দি করে ফেললো। মেয়েটিকে মৃত্যুর আগ অবধি কখনো হাসতে দেখেন নি জুলফিকার পটনভী।

নয়মাস পর কাঞ্চন জন্মালো। মায়ের মতো ভাগ্য নিয়ে। এই বিশাল পটনভী মঞ্জিলের সবচেয়ে অবজ্ঞার পাত্রী সে। চাচীরা যদিও সেটা কখনো প্রকাশ করে নি। তবে কাঞ্চন বুঝতে পারতো। চাচারা তাকে খুব হেয় চোখে দেখতো। স্বাভাবিক, তার বাবা ত্যাজ্য। অথচ সে তাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। জুলফিকার পটনভী অনুশোচনার কারণে কাঞ্চনের নামে তার কিছু শেয়ার এবং একটা জমি লিখে দিয়েছিলেন। ছেলে এবং ভাতিজাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন তার মৃত্যুর পরও কাঞ্চন যেন কোনো সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত না হয়। এতে শরীকেরা খুব হুক্কাহুয়া করেছিলো। যেখানে সালমান পটনভীকে সব জায়গা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে তবে তার মেয়ে কেন সম্পত্তির ভাগীদার হবে। খেয়েপড়ে থাকছে সেটাই অনেক। জুলফিকার পটনভী অনড় রইলেন। তার কথার বিপরীতে কোনো বিরোধিতা টিকলো না।
মেহরিন মারা গেলো যখন কাঞ্চনের বয়স মাত্র ছয় বছর। মায়ের মৃত্যুর স্মৃতিটাও তার মস্তিষ্কে আবছা। মা শুধু মৃত্যুর সময় একটা কথাই বলেছিলেন,

“তুই নিজের জন্য বাঁচবি!”
মায়ের মৃত্যুর পর তাচ্ছিল্য, করুনা, অনুশোচনাগুলো বাড়ে। তবে বড়ফুপু আয়েশা ব্যতিক্রম। এই নারীর কখনো তাকে করুনা করে নি। কখনো তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন নি। আক্ষেপ করে বলেন নি, “আহারে!”
মাতৃস্নেহের এক নরম চাঁদরে কাঞ্চনকে তিনি রেখেছিলেন। তার আদরেই কাঞ্চন চঞ্চলা ফড়িং এর মতো পটনভী মঞ্জিলে উড়ে বেড়ানোর লাইসেন্স পেয়েছে। কেউ কিছু বললে ফুপুর আঁচলে মুখ গুজতে পেরেছে। ফুপুর আহ্লাদ করে বলেছে,
“পটনভী মঞ্জিল একটা পাগলাগারদ। পাগলের কথায় কি কিছু যায় আসে?”

হয়তো এই মমতার প্রভাবেই উড়ণচন্ডী রুপে বড় হয় কাঞ্চন। সেই উড়ণচন্ডী মেয়ের মনে ধরা দিলো তার নাক উঁচু, দেমাগী, একরোখা পুরষ। কাঞ্চন আজও সেই কারণ খুঁজে পায় না। সে এতোটা কেন মজেছিলো সেই দাম্ভিক, রগচটা পুরুষের প্রেমে। অবশ্য সেই মনে ধরার একটি কারণ হিসেবে তার চেহারা, বচনভঙ্গিকে বিবেচনা করাই যায়। এতে কাঞ্চনের অস্বীকার করার জো নেই যে স্নিগ্ধ একজন সুদর্শন পুরুষ। তার চালচলন, বচনভঙ্গিতে পিছলে যাওয়া খুব একটা অন্যায় নয়। কাঞ্চনের মতে সে দেখতে একেবারে পাকিস্তানি নায়ক ফাওয়াদ খানের মতো। তখন নতুন নতুন তার সিনেমা, সিরিজি দেখতে শুরু করেছিলো। হয়তো সেকারণেই স্নিগ্ধকে তার মনে ধরেছিলো। নয়তো এতো আত্মকেন্দ্রিক, অন্যের প্রতি উদাসীন এই পুরুষটাকে ভালোলাগার কোনো কারণ সে দেখে না। আঠারোতে পা রাখা কিশোরীর মন তখন অদ্ভূত স্বপ্নচারণে ব্যস্ত।

কাজিন মহল থেকে স্নিগ্ধ নিজেকে আলাদা করে রাখতো। এতে কাঞ্চনের সুবিধাই হত। তার মনের খবর সেই লোকের কানে যেত না। নয়তো শুধু কান ধরে উঠবস করাতে লোকটা সীমাবদ্ধ হত না। কাঞ্চন যদি এখন সেই আঠারো বছরের কাঞ্চনকে সামনে পেতো তাহলে ঠাঁটিয়ে দুটো থাপ্পড় দিত। সে কি অন্ধ ছিলো। লোকটার বিরক্তি, তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা তার চোখে পড়তো না। অবশ্য গায়ে লাগতো না কারণ স্নিগ্ধ কাউকেই বিশেষ কোনো লায় দিত না। তার ধাঁরালো চোখের শিকার কাজিনমহলের সবাই। সেকারণেই কাঞ্চনের মনে হত সে শুধু তাকেই অপছন্দ করে এমন বিষয়টা না। সে এই পটনভী মঞ্জিলের সবাইকে অপছন্দ করে।
একদিনের ঘটনা খুব প্রবলভাবে মনে আছে কাঞ্চনের। কাঞ্চন গাছে চড়তে ভালোবাসতো। বড়ফুপুর মতে সে ছিলো বান্দরী। জৈষ্ঠ্য মাস। আম পেঁকে ঝুলছে। কাঞ্চনের লোভ হলো সেই আম খাওয়ার। সে তরতর করে গাছে উঠলো। একে একে আম পেড়ে তার স্কার্টে জমালো। থামতে যাবার সময় বাঁধলো গোল। পা পিছলে মগডাল থেকে ধপাস করে পড়ে গেলো। ভয়ে, আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেললো সে। ভেবেছিলো আজ বুঝি সে শেষ। নিচে পড়ার মিনিট দুয়েক পর পিটপিট করে চোখ মেললো। আশপাশে তাকিয়ে দেখলো না সে মরে নি। হাত পাও অক্ষত। খুশির চোটে বলে উঠলো,

“থ্যাংক ইউ আল্লাহ! থ্যাংক ইউ!”
তার নিচে যে একটা মানুষ আছে সেটা অনুভব করলো একটু পর যখন মানুষটা খেঁকিয়ে বললো,
“উড়ার প্রাকটিস হয়ে গেলে গা থেকে সর!”
একপ্রকার চমকালো কাঞ্চন। দ্রুত সরতেই দেখলো স্নিগ্ধ ঘাসের উপর শুয়ে আছে। তার ঘাড়ে টান লেগেছে। হাত পা টেনে উঠলো খুব কষ্ট করে। কাঞ্চন অবাক স্বরে শুধালো,
“তুমি এখানে কি করছিলে?”
“তোকে ক্যাচ ধরার জন্য বসে ছিলাম। ইডিয়ট!”
“আসলে!”
স্নিগ্ধ তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকালো। চরম বিরক্তি প্রকাশ পেলেও সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে শুধালো,
“বেঁচে আছিস?”
“হ্যা!”
কাঞ্চনের পা মচকেছিলো। তবে বিষয়টা বুঝেছিলো যখন সে উঠতে গেলো। স্নিগ্ধ কিছুসময় তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো,

“আমি বসছি, তুই আমার কাঁধে ভর দিয়ে পিঠে চড়!”
“পিগিব্যাক!”
“হুম”
“যাহ লজ্জা!”
“মর তাহলে!”
“না না”
স্নিগ্ধ সেদিন খুব দয়া দেখিয়েছিলো। আসলে কাঁধে করে কাঞ্চনকে ঘরে নিয়ে গিয়েছিলো। তার কাঁধে যথেষ্ট ব্যাথা ছিলো। কিন্তু সেটা তখন সে কাউকে বলে নি। এমন আরোও ছোট ছোট ঘটনা রয়েছে। যা কাঞ্চন ডায়েরি বদ্ধ করে রেখেছে। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো কাঞ্চনের আবেগটাকে গাঢ় করেছে। অলীক ভাবনা মস্তিষ্কে জন্মালো, স্নিগ্ধ ভাই অতটা খচ্চর নয়।
কাজিনমহলে একটা কথা খুব প্রচলিত ছিলো, জুলফিকা পটনভীর পরে মঞ্জিলের প্রধান সরফরাজ পটনভী হবে। দাদাজান এভাবেই স্নিগ্ধভাইকে তৈরি করছেন। কিন্তু সবার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে স্নিগ্ধ ভাই বাংলাদেশ পুলিশে জয়েন করেন। সেখান থেকে দুবছর পর তাকে র‍্যাবিড একশন ব্যাটেলিয়নে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখনো সে সেখানের অফিসার৷ ম্যাডেলের পর ম্যাডেল তার নামে। কালো পোশাকে তাকে সবথেকে বেশি ভালো লাগতো কাঞ্চনের। লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখতো। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে গেলে স্নিগ্ধ তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতো।

কান ধরে উঠ বস করানোর পরও এই পাষণ্ড লোকের প্রতি মোহ কমে নি কাঞ্চনের। হয়তো বয়সটাই এমন ছিলো। তাইতো পটনভী মঞ্জিলের তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টি আর স্নিগ্ধের তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য লাগতো।
স্নিগ্ধকে নিয়ে বড়ফুপু খুব ভয়ে থাকতেন। তার ভয়, তার ছেলের কাজ নিয়ে। এতো ভয়ংকর ক্রিমিনালদের সাথে লড়তে যেয়ে যদি কখনো তার ছেলে আহত হয়! যদি কোনো বিপদ হয়! স্নিগ্ধকে সে বহুবার বলেছে চাকরিটা ছেড়ে দিতে। স্নিগ্ধ ছাড়ে নি। স্নিগ্ধ তার পেশাকে খুব ভালোবাসে। সে ছাড়তে পারবে না। এজন্য তাকে দু/তিন বার গুলিও খেতে হয়েছে।

প্রথম যেবার হাতে গুলি খেলো বড়ফুপু কেঁদে পটনভী মঞ্জিল ভাসালেন। তার স্বামী অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় তিনি খুব ভয় পান। ছেলেকে হারালে তার কিছুই থাকবে না। স্নিগ্ধকে কসমও দিলেন। কাজ হলো না। একরাতে তিনি একটা বাজে স্বপ্ন দেখলেন। সেই স্বপ্নটা ছিলো স্নিগ্ধ কেন্দ্রিক। স্নিগ্ধ একটা ড্রাগ র‍্যাকেটের কেসে কাজ করছিলো সেই সময়। বড়ফুপু স্বপ্নে দেখলেন তার ছেলে গুলি খেয়েছে। ধরফরিয়ে উঠলেন। স্নিগ্ধ দুদিন বাড়ি ফিরছে না। তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন ছেলেকে দেখার জন্য। ফোন করলেন কিন্তু তার ফোন বন্ধ। বড়ফুপুর অস্থিরতা বাড়ার ফলে খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম করলেন। ফলে প্রেসার ফল করলো তার। কাঞ্চন বুঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি জেদ করতে লাগলেন। একটা সময় কাঞ্চনের হাত ধরে বললেন,
“তুই ওর অফিসে ফোন কর। দরকার হলে মিথ্যে বল। বল যে আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেছি। আমার অবস্থা খুব খারাপ। ডায়াবেটিস, প্রেসার সব কমে গেছে!”
“মিথ্যে বলে ধরা পড়লে?”
“আমি আছি তো!”

ফুপুর বায়না ফেলা গেলো না। এই মা-বর্গীয় শ্রেণীর জেদ ফেলা যায় না। তাদের ওই অসহায় চোখজোড়া খুব অনুশোচনায় ভোগায়। তাই কাঞ্চন বাধ্য হলো ফুপুর কথা শুনতে। স্নিগ্ধের অফিসে ফোন করে জানালো,
“বড়ফুপু মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন। খুব অসুস্থ, একেবারেই জ্ঞান নেই। প্রেসার ফল করেছে। আমরা তাকে হাসপাতালে নিব। স্নিগ্ধ ভাইকে বলবেন দ্রুত বাড়ি আসতে!”
কাঞ্চনের মতে সে মিথ্যে বলে নি। বড়ফুপুর অস্থিরতায় তার শারীরিক অবস্থা সত্যি খারাপ ছিলো। শুধু হাসপাতালটুকু বাড়িয়ে বলা। স্নিগ্ধ মাভক্ত ছেলে। সে দুঘন্টার মধ্যে বাড়ি চলে এলো। বড়ফুপু ছেলেকে পেয়ে হাফ ছাড়লেন। তবে বাড়ি ফিরতেই মিথ্যেটা ধরা পড়ে গেলো। পটনভী পরিবারের ডাক্তার মেহেদী চাচা জানালেন,

“আপার একটু বিপি ড্রপ হয়েছিলো। ডিম খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো কিছু একটা বিষয়ে তিনি একটু ডিসটার্বড ছিলেন। তবে হাসপাতালে নিবার মত কিছুই হয় নি!”
কাঞ্চন এক কোনায় দাঁড়িয়েছিলো। স্নিগ্ধের সেদিন একটা ভিন্নরুপ সে দেখলো। দেমাগী, আত্মকেন্দ্রিক, নাক, উঁচু স্বভাবের বহির্ভূত তার হিংস্র একটা রুপও আছে সেটা সেদিন সবাই দেখলো। কপালের রগ ফুলে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি কেমন ভয়ংকর হয়ে গেছে। মনে হলো এটা তার বাড়ি নয়। কোনো ইন্টারোগেশন রুম। চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। নরম কণ্ঠটা উবে গিয়ে হিম ধরা কণ্ঠে উঠলো সে,
“তোমাদের ফাজলামি মনে হয় মা? আমি আমার কাজ ফেলে এখানে এসেছি, তোমার কোনো ধারণা আছে আমাকে এর খেসারত কি দিতে হবে? আমি শুধু তোমার কথা ভেবে এসেছি। আমার চাকরি চলে যেতে পারে!”
“গেলে যাক তুই সুস্থ থাক। কি ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছি কোনো ধারণা আছে তোর?”
এবার ক্রোধ গলায় ঠিকরে পড়লো,
“তোমার স্বপ্নের জন্য আমার চাকরি ছেড়ে দিতে হবে?”
স্নিগ্ধ কখনো মায়ের সাথে চিৎকার করে না। অথচ সেদিন যেন দায়ড়া ভুলে গিয়েছিলো সে। এর মধ্যে সানিয়া বলে উঠলো,

“মিথ্যেটা তো কাঞ্চন বলেছে। মাকে বকে কি লাভ! ওই ফোন করেছিলো অফিসে!”
সানিয়ার কথা শোনার সাথে সাথেই কাঞ্চনের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চাইলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন ভয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। স্নিগ্ধের আর বুঝতে বাকি রইলো না সর্ষের ভুত কে! স্নিগ্ধ সেদিন যেভাবে তার দিকে তাকিয়েছিলো আজ অবধি ভুলবে না কাঞ্চন। ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, ক্রোধ, বিরক্তি– কি ছিলো না সেই চাহনীতে। কাঞ্চনের মনে হলো কোনো মানুষের দিকে এতোটা বিশ্রীভাবে তাকানো সময় নয়। স্নিগ্ধ ক্ষিপ্র স্বরে ভৎর্সনা করে বলেছিলো,
“যাকে তাকে বেশি লায় দিয়ে মাথায় তুললে তারা তো নিজের জায়গা ভুলবেই। মাথায় উঠে নাচাটা অস্বাভাবিক না।”
কথাটা কানে বাজলো কাঞ্চনের। এতোটা হেয়ভাবে তার চাচারাও তার সাথে ব্যবহার করে নি৷ জুলফিকার পটনভী সেদিন স্নিগ্ধকে থামিয়েছিলো। তার বাহু চেপে বলেছিলেন
“তুমি নিজের মধ্যে নেই, ঘরে যাও। রাগ কমাও!”

কাজিনমহল সেদিনের পর থেকে যমের মতো ভয় পায় স্নিগ্ধকে। পরে জানা গিয়েছিলো স্নিগ্ধ ছয়মাসের জন্য সাসপেন্ড হয়েছে। কারণ তার ফেলে আসা মিশনে সে না থাকায় তাদের একজন কলিগ আহত হয়। মিশনটাও ফেইল হয়। কাঞ্চনের খুব অনুশোচনা হলো। ফুপুর কথায় রাজি না হওয়াটা উচিত ছিলো। ভুল যখন করেছে ক্ষমা চাইতে কি ক্ষতি! তাই বুকে অদম্য সাহস নিয়ে সে স্নিগ্ধর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো।
স্নিগ্ধের ঘরে কাজিনমহল কেউ যেতো না। কাঞ্চন সেই প্রথমবার ই স্নিগ্ধের ঘরে গিয়েছিলো। কিন্তু শুধু দরজা অবধি। দরজা তখন ভেজানো ছিলো। কাঞ্চন দরজায় টোকা দেবার সময় স্নিগ্ধ এবং রাতুল ভাইয়ের গলা কানে এলো। রাতুল ভাই রিদমের বড় ভাই। সে এখন পটনভী মঞ্জিলে থাকেন না। অস্ট্রেলিয়ায় স্যাটেল্ড। তিনি কাজিনমহলের সবচেয়ে বড়। স্নিগ্ধ তাকে সম্মান করতো, তাদের সম্পর্ক বেশ ভালো। তিনি স্নিগ্ধের হতাশা দেখে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন,

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৯

“এমন হয় স্নিগ্ধ। এতো আপসেট হবার মত কিছু হয় নি। আপস এন্ড ডাউন্সেই জীবন। ফুপু আর কাঞ্চন একটা মিসটেক করে ফেলেছে। বয়স কম, বুঝে নি। যা হবার হয়ে গেছে।”
“ওই প্যারাসাইটের কথা আমি ভাবিও না, শি ইজ নান টু মি

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here