ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৮
মুশফিকা রহমান মৈথি
কাঞ্চন রীতিমত ছটফট করছে। কঠিন গলায় বললো,
“নামাও আমাকে!”
স্নিগ্ধ তার ছটফটানিতে গা করলো না। শুধু আদেশের সুরে কাজিনমহলের উদ্দেশ্যে বললো,
“আজকের সভা এখানেই মুলতবি। যে যার রুমে যা।”
তারপর কাঞ্চনকে কোলে রাখা অবস্থাতেই সে হনহন করে হাটতে লাগলো নিজের ঘরের দিকে। কাঞ্চন কিল ঘুষি যা পারছে তাকে দিচ্ছে। স্নিগ্ধ তাতে নির্বিকার। একটা সময় তার ঘাড়ে কামড় বসালো কাঞ্চন। পা থামলো। কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়াই ওই কামড় সহ্য করলো স্নিগ্ধ। কাঞ্চন যখন হাঁপিয়ে উঠে ঘাড়টা ছাড়লো দেখা গেলো তাতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। দাগ বসে গেছে তার দাঁতের। খানিক ভীত হলো সে। স্নিগ্ধর দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো সে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। কাঞ্চনের চোখে মুখে অস্থিরতা। স্নিগ্ধ তাকে আরেকটু উপরে তুলে নিজের মুখের সম্মুখে এনে খুব শান্ত গলায় বললো,
“আমার জানা ছিলো না, মিসেস পটনভীকে যে আমার মামীরা খেতে দেয় না। ডোন্ট ওয়ারি, তোর হালাল হাসবেন্ডের ইনকাম ভালো। খাবারের অভাব হবে না।”
একটু আগে যে এক ইঞ্চি মায়া তৈরি হয়েছিলো সেটা কর্পূরের মতো উবে গেল৷ চোখ সরিয়ে নিলো কাঞ্চন। তার ফোলা গাল দেখে হাসি পেলো স্নিগ্ধের। ঠোঁটটা একটা বাঁকিয়ে হাটতে লাগলো সে।
নিজের ঘরের বিছানায় বসালো সে কাঞ্চনকে। তারপর হাটু গেড়ে বসলো ঠিক তার সামনে। লেহেঙ্গার ঘাগড়াটা একটু তুলতেই কাঞ্চন চোখ বড় বড় করে বললো,
“কি করছো তুমি!”
“বলছি না মিসেস পটনভীর খেদমত!”
বলেই উচু হাই হিলটা আলতো হাতে খুলে ফেললো। পায়ের ছোট আঙ্গুলে ফোসকা পড়ে গেছে। হিল পড়ার অভ্যাস নেই কাঞ্চনের। ফলে গোঁড়ালি এবং পায়ের আঙ্গুলের অবস্থা একেবারে যাচ্ছে তাই। গোঁড়ালিতে চামড়া ছিলে গেছে। স্নিগ্ধ খুব আলতো করে পা টা পরিষ্কার করে দিলো। কাঞ্চন তীক্ষ্ণ চোখে তাকে দেখছে। নেহায়েত আদিখ্যেতা লাগলো। যে মানুষটি তার প্রতি একবিন্দু মায়া দেখায় নি সেই মানুষটির এমন আহ্লাদ তার গায়ে গরম তেলের ছিঁটের মতো লাগছে। পা সরাতেও পারছে না। কারণ স্নিগ্ধ শক্ত হাতে সেটা ধরে রেখেছে। কাঞ্চন চোখ সরিয়ে নিলো।
পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ টেপ লাগিয়ে দিলো স্নিগ্ধ। তারপর উঠে দাঁড়ালো সে। একটা চেয়ার টেনে বসলো ঠিক কাঞ্চনের মুখোমুখি। এখন তার মুখের নরম ভাব গায়েব হয়ে গেলো। কাঠিন্য এলো চোয়ালে। খুব শান্ত স্বরে বললো,
“বিয়েটা যেভাবেই হোক, বিয়েটা হয়ে গেছে। তাই এখন থেকে আমরা হাসবেন্ড ওয়াইফ। এটাই রিয়ালিটি। রিয়ালিটি মেনে নে।”
কাঞ্চন তীক্ষ্ণ স্বরে বললো,
“তো আমি কি এখন নাচবো?”
“না আমার লক্ষ্মী বউ হবি।”
“আমি তো তোমার যোগ্য ছিলাম না, এখন হুট করে আমার যোগ্যতা বেড়ে গেছে?”
“তুই এখনো আমার যোগ্য নস। বাট আমি তোকে আমার যোগ্য বানাতে চাই।”
কাঞ্চনের চোয়াল শক্ত হলো। স্নিগ্ধ উঠে যেয়ে টেবিল থেকে একটা নোটপ্যাড নিয়ে বসলো। উপরে লিখলো,
“Do and Don’t”
তারপর কাগজে খচখচ করে লিখতে লিখতে বললো,
“তোর হাতে এখন আমার সাথে জীবন কাটানো ছাড়া কোনো অপশন নেই। আমি যেহেতু একটাই বিয়ে করবো এবং সেই বিয়েটা কবর পর্যন্ত টানবো। তাই তোকে ছাড়া জীবন কাটাতে চাই না। আমার মনে হয় আমাদের মিউচুয়ালি একটা পয়েন্টে হওয়া উচিত। একটা বিয়েকে সুখী দাম্পত্য জীবনের নাম দেওয়া এতটা কঠিন নয়। এখানে আমরা সেই লিস্ট করবো যেটা আমাদের উভয় পছন্দ বা অপছন্দ। প্রথম তোকে সুযোগ দিচ্ছি। বল তোর কি অপছন্দ?”
“তোমাকে।”
স্নিগ্ধ জিহ্বা দিয়ে গালের ভেতরে টোকা দিলো তারপর আনমনেই হাসলো। চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললো,
“তোর লিস্টটা বাতিল। আমি আমার লিস্ট করছি। প্রথমত তোর ড্রেসাপ। এখন থেকে তুই বাহিরে এই জিন্স, টিশার্ট পরবি না। আমার ভালো লাগে না। আমি চাই না আমার বউ উড়ন্ত বান্দরীর মতো চলুক। আমি খুব কম্ফোর্টেবল সালওয়ার কামিজ কিনে দিব। তুই সেগুলো পরবি!”
“এখন তোমার জন্য আমার নিজেকে বদলাতে হবে?”
“বদলাতে নয় গুছাতে হবে। তুমি ছন্নছাড়া পটনভীটি আর নও। তুমি আমার স্ত্রী। তাই তোমাকে আমার সমপর্যায়েই যেতে হবে।”
“পারবো না। যদি আমি এতোটাই তুচ্ছ তাহলে আমাকে বিয়ে করলে কেন?”
স্নিগ্ধর দৃষ্টি কিছুটা নরম হলো। খানিকটা এগিয়ে এসে কাঞ্চনের চোখে চোখ রেখে বললো,
“আই হ্যাড নো চয়েজ!”
“তুমি আমাকে প্রীতি আপু বানাতে চাও?”
“তুই কাঞ্চন, তুই প্রীতি নস। আমি তোকে কাঞ্চন হিসেবেই বিয়ে করেছি। প্রীতি হিসেবে না। পোশাক শুধু বেশভূষায় পরিবর্তন আনে মানুষের মধ্যে না। তোর সাথে এখন আমার নাম জড়িত। তাই তোকে এখন থেকে পরিপাটি হয়েই চলতে হবে। আমার ঘরে আমার সামনে যদি তুই কিছু নাও পরে ঘুরিস আমার সমস্যা নেই। কিন্তু বাহিরে তোকে সরফরাজ পটনভীর ওয়াইফ হিসেবেই চলতে হবে। আমারও ইউনিফর্ম ভালো লাগে না। তাই বলে বাহিরে আমি ন্যাংটা চলি না। আমার মনে হয় আমি বুঝাতে পেরেছি!”
কাঞ্চন কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো। স্নিগ্ধ আবার আগের মতো বসলো। হাটুর উপর পা তুলে কাগজে খচখচ করে লিখছে। কাঞ্চনের ইচ্ছে করছে স্নিগ্ধের মাথাটা দু ভাগ করে দিতে। স্নিগ্ধ আবার বললো,
“এখন থেকে আমার কাছে মিথ্যে বলা যাবে না। যদিও আমি তোর মিথ্যে ধরে ফেলি কিন্তু আমার কাছে মিথ্যে বলা যাবে না। I hate lies”
“বললে কি করবে?”
কথাটা বলার সময় কাঞ্চনের গলা কাঁপলো। তার চোখ লাল হয়ে রয়েছে। স্নিগ্ধ সেই চোখের দিকে তাকালো। মৃদু স্বরে বললো,
“তোকে শুধরে নিবো।”
“যেমনটা আগে করেছো?”
কাঞ্চন কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে বিদ্রুপের ছাপ। স্নিগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর বললো,
“এখন থেকে তোর লোকেশন অন থাকবে। আমার সাথে শেয়ার করা থাকবে!”
“কেন? আমাকে স্টক করবে?”
“আমি আমার ওয়াইফের প্রতিটা মোমেন্টের খবর জানতে চাই। সেটাকে স্টক করা হলে তাই!”
কাঞ্চনের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। সে চোখের পলকে উঠে দাঁড়ালো। একপ্রকার ছুটে এসে নোটপ্যাডের সবগুলো পৃষ্টা ছিড়ে কুটি কুটি করে ফেললো। তারপর গজগজ করে বললো,
“মাই লাইফ, মাই রুলস। আমি তোমার রুলসকে গুনি না।”
স্নিগ্ধ তখনও শান্ত। কাঞ্চন তার মুখের উপর সেই ছেঁড়া কাগজগুলো ছুড়ে মেরে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কম্বলটা গলা অবধি টেনে নিলো। স্নিগ্ধও সাথে সাথে সেই কম্বল টেনে সরিয়ে বললো,
“চেঞ্জ করে ঘুমা। তোর অস্বস্তি হবে!”
“আমার অস্বস্তির জন্য তুমি যথেষ্ট। আমার জীবন তানাতানা করে ফেলার জন্য তুমি যথেষ্ট!”
স্নিগ্ধ কপালের চামড়া টেনে ধরলো। বিরক্তি নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কাঞ্চন বিছানা খামচে, চোখ বুজেই ছিলো। অমনি খেয়াল করলো সে বিছানায় নেই। শূণ্যে ভাসছে। স্নিগ্ধ তাকে আবার কোলে তুলে নিয়েছে। হাত পা ছুড়লো কাঞ্চন। কিন্তু স্নিগ্ধ থামলো না। নামালো ঠিক ওয়াশরুমে। ঝর্ণার নলটা ছেড়ে দিতেই কাঞ্চন ভিজে একাকার হয়ে গেলো। আকস্মিক ঘটনায় হতবিহ্বল কাঞ্চন। মুখে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সে,
“what the hell!”
“এখন নিশ্চয়ই ভিঁজে কাপড়ে ঘুমাবি না।”
“I hate you”
“Hate me HARDER, পুরো জীবন পড়ে আছে।”
বলেই একবার আপাদমস্তক তাকালো কাঞ্চনের দিকে। ঠান্ডা পানিতে ভিজে একাকার সে। লেহেঙ্গার ব্লাউজটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। চোখ লাল হয়ে আছে। শরীর থরথর করে কাঁপছে। স্নিগ্ধ সাথে সাথে নলটা বন্ধ করে দিলো। স্ট্যান্ডে একটা সাদা টাওয়েল ছিলো। সেটা দিয়ে দ্রুত মাথা মুছে দিতে লাগলো। তারপর শান্ত, হিম ধরানো গলায় বললো,
“ঠিক দুমিনিটে এই কাপড় ছেড়ে বের হ। ঠিক দু মিনিট।”
“নাহলে কি করবে?”
“যা করবো সেটা তোর ভালো লাগবে না।”
“তুমি আমাকে নিজের পাপেট বানাতে চাও তাই না?”
“না, আমার পুতুলের মতো বউ বানাতে চাই।”
বলেই বেরিয়ে গেলো। কাঞ্চনের চোখ জ্বলছে। চোখটা ভিজে আসছে। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাঁদা মানে তো হেরে যাওয়া। সে সরফরাজ পটনভীর জন্য কাঁদতে চায় না। কখনোই না।
রিদমের ঘুম আসছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেছে কিন্তু কাজে দেয় নি। বারবার কেমন উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। এসিটাও কাজ করছে না। সার্ভিসিং করানো প্রয়োজন। তাই নিজের টাম্বলারটা হাতে নিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বের হলো ঘর থেকে। করিডোরে আসতেই তার চোখ কুঁচকে গেলো,
“এই রাতের বেলা এখানে কি করিস?”
পৃথুলা একটুও চমকালো না। সে করিডোরের শেষ মাথায় ঝুলন্ত বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। চুলগুলো খোলা। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। তাই শীতল বাতাস বইছে। সেই বাতাসে চুলগুলো উড়ছে। পরণে একটা গেঞ্জি আর ঢোলা প্লাজো। রিদম এসে দাঁড়ালো ঠিক পৃথুলার পাশে। পৃথুলা তার অস্তিত্ব বুঝতে পেরে হেসে বললো,
“পেত্নীর চুল গুনি, গুনবি?”
রিদম হেসে উত্তর দিলো,
“তুই নিজেই পেত্নী!”
“আর তুই ভোদাই”
“এজন্যই তোকে ভালোবাসি”
কথাটা বলে নিজেই চুপ করে গেলো রিদম। পৃথুলা একটু থমকালো। কিন্তু না শোনার ভান করলো। রিদম সাথে সাথেই নিজেকে শুধরে বললো,
“একদিনের জন্য বাসতাম, এখন বাসি না। স্লিপ অফ টাং হয়েছে!”
“হলেই ভালো।”
রিদম কপাল কুঁচকালো। একটা অসহনীয় ক্রোধ তার চোখে মুখে ফুটে উঠলো। কেমন অধৈর্য্য গলায় বললো,
“কেন? আমি তোকে ভালোবাসতে পারি না?”
“তুই আমাকে সামলাতে পারবি না।”
“কারণ তুই শাকচুন্নী। তোকে প্রেমিকা বানানো আমার জীবনের কাল।”
“আমি তোকে মাথার দিব্যি তো দেই নি।”
“কিন্তু আশা তো দেখিয়েছিলি।”
“আমি তোর কাছে সবসময় ক্লিয়ার ছিলাম আমি কি চাই! তুই একা একাই জলঘোলা করেছিলি।
পৃথুলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এবার তাকালো সে রিদমের দিকে। তার ঠোঁটের কোনায় রক্ত জমাট বাঁধা। রিদমের চোখজোড়া বড় হয়ে গেলো। অস্থির গলায় বললো,
“ফুপু!”
“না পড়ে গেছিলাম”
বলেই পৃথুলা ভেতরের দিকে পা বাড়াতেই রিদম তার হাত টেনে ধরলো। পৃথুলার ঠোঁটে আলতো করে ছুঁয়ে বললো,
“নয়া দাদাজানের সাথে কথা বল, প্লিজ! আর কত!”
“মা চায় না। সে চায় না, আমাদের অবস্থা কাঞ্চনের মতো হোক। সে তার স্বামীকে খুব ভালোবাসে।”
নিষ্প্রাণ গলায় বললো পৃথুলা। রিদমের কপালে ভাঁজ পড়লো। সূক্ষ্ণ বিষাদ ফুটে উঠলো। পৃথুলা তার হাত ছাড়িয়ে বললো,
“তুইও ব্যতিক্রম নস। এক মন তোরা একজনকে কেন দিতে পারিস না, বলতো।”
রিদম একটা শুকনো ঢোক গিললো। পৃথুলা দাঁড়ালো না। খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে সে নিজের ঘরে গেলো। রিদমের একবার ইচ্ছে হলো তাকে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো মিথ্যে আশা দেওয়ার কোনো মানে নেই। সে এবং পৃথুলা দুটো আলাদা সত্তা। তাদের এক সুতোয় বাঁধা অসম্ভব।
সারা রাত একটা ফোঁটা ঘুম হয় নি কাঞ্চনের। একই বিছানায় সিমেন্টের বস্তার সাথে ঘুমানো অসম্ভব। যদিও সে একটা বিশাল কোলবালিশের বর্ডার দিয়েছে। একেবারে বাংলাদেশ ভারতের বর্ডার। তাও এক ফোঁটা ঘুমায় নি। আযান কানে আসতেই সে উঠে পড়লো। স্নিগ্ধ তখন গভীর ঘুমে। মাথা কি যেন একটা খেলে গেলো। রাতে ঠান্ডা পানির শোধটা নেওয়া বাকি!
ফলে দ্রুত উঠে গেলো সে। বৃষ্টি হচ্ছে বাহিরে। একটু পর পর বজ্রপাতের শব্দ দেওয়ালগুলোকেও কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ফলে নলের পানি একেবারে ঠান্ডা। মগ খুঁজলো প্রথমে, কিন্তু সিমেন্টের বস্তার বাথরুমে কোনো মগ নেই। ফলে বালতিতেই পানি ভরলো। তারপর সেই আধ বালতি পানি টেনে আনলো বিছানার কাছে। “বিসমিল্লাহ” বলেই সেই আধবালতি ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলো স্নিগ্ধর গায়ে। গভীর ঘুম তার সাথে সাথেই ছুটে গেলো। ঠান্ডা পানির স্পর্শ পেতেই স্নিগ্ধ তড়াক করে উঠে গেলো। কঠিন চোখে পাশে তাকাতেই দেখলো তার স্ত্রী একটা খালি বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আঙ্গুলটা উঁচিয়ে বললো,
“আযান দিচ্ছে। মনে হলো শ্রদ্ধেয় সরফরাজ সাহেবকে একটু ডাকা উচিত!”
সরফরাজ ডান হাতে ভেজা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিলো। কিছুসময় ঠান্ডা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কাঞ্চনের দিকে। সত্যি সত্যি আযান না দিলে ওকে কাঁচা খেয়ে ফেলতো।
স্নিগ্ধ কাবার্ডের একটা অংশ সম্পূর্ণ কাঞ্চনকে দিয়ে দিয়েছে। নিজের অংশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা। কাঞ্চনের অংশে সব সুতির সালোয়ার কামিজ। কাঞ্চনের সব ঢোলা গেঞ্জ, প্যান্ট, স্কার্টগুলো একটা ট্রলিতে ভরে কাজের মেয়েদের দিয়ে বলেছে “এগুলোকে মোছার ন্যাকড়া হিসেবে চালাও।”
কাজিন মহল কাঞ্চনের এমন পরিবর্তনে হতাশ। অবশ্য প্রতিপক্ষ স্নিগ্ধ সেটা ভুললে চলবে না। ফলে কোনো জামাকাপড় না থাকায় কাঞ্চনের এখন বাধ্য হয়ে সালোয়ার কামিজ পরতে হচ্ছে। পৃথুলা ঠেস মেরে বললো,
“স্নিগ্ধ ভাই তোকে ইয়ো ইয়ো থেকে টিভি সিরিয়ালের গোপি বাহু বানিয়ে দিয়েছে”
কাঞ্চন দাঁত দাঁত পিষে সেটা সহ্য করলো। সেলোয়ার-কামিজ পরে অবশ্য বিরক্ত লাগছে না।একদম কারুকাজ ছাড়া, নরম সুতি কাপড়। গেঞ্জির থেকে পড়ে আরাম বেশি। তাই খুব একটা রাগ করতে পারছে না। তবে তার লোকেশন শেয়ার করা স্নিগ্ধের মোবাইলে। কোথায় যাচ্ছে, সব খবর স্নিগ্ধের কাছে। মোটকথা জীবনটা কারাদণ্ড থেকে কিছু কম না। ফলে একদণ্ড মুক্তির জায়গা হলো ভার্সিটি। রিদম, কাঞ্চন, অঞ্জনা, পৃথুলা, তাকবীর এবং সানিয়া একই ভার্সিটিতে পড়ে। শুধু ডিপার্টমেন্ট আলাদা। তাই ভার্সিটি যাওয়া আসাটাও এক সাথে। যদিও সানিয়াকে এরা দলে টানে না। ওর থেকে বরাবরি আলাদা থাকে।
ওপেন ক্রেডিট হবার কারণে আজ কাঞ্চনের ক্লাস নেই। তবুও সে চললো তাদের সাথে ভার্সিটি। অঞ্জনা শুধালো,
“তুই ভার্সিটি যেয়ে কি করবি?”
“কি আবার? আমার সদ্য বিবাহিত বরের পকেট ফাঁকা করতে হবে না?”
“মানে?”
বলেই ব্যাগ থেকে স্নিগ্ধের মানিব্যাগটা বের করলো। সকাল সকাল স্নিগ্ধ উঠার আগেই মানিব্যাগটা চুরি করেছে। সবার চোখ কপালে। স্নিগ্ধর মানিব্যাগ কি না চুরি করেছে? কি সাহস। রিদম বিস্মিত গলায় বললো,
“সিংহের মুখ থেকে দাঁত বের করলি কি করে?”
“ওগুলো পরে বলবো। আজ চল একটা মুভি দেখে আসি!”
“সেটা করাই যায়, কিন্তু টাকা?”
“তোমাদের দুলাভাই দিবে!”
কাঞ্চনের কথা শুনতেই অঞ্জনা ছাড়া সবাই রাজি হলো। শুধু অঞ্জনাই ভীত স্বরে বললো,
“তোর জামাই জানলে আমাদের রিমান্ডে নিবে!”
“জানবে কি করে?”
“তোর লোকেশন!”
“বলবো নেট ছিলো না। চল তো!”
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৭
বলেই নিজের নেট বন্ধ করে সবাই একটা সিনেমা হলে গেলো। “বনলতা এক্সপ্রেস” দেখবে তারা। সিনেমা শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ছয়টা বাজলো। এর মধ্যেই ফোন বাজা শুরু করলো কাঞ্চনের। স্ক্রিনে “সিমেন্টের বস্তা” নামটা উজ্জ্বলভাবে ভাসছে। কাঞ্চন ফোনটা ধরার সাথে সাথে অপর পাশ থেকে একটা স্বর ভেসে এলো,
“কোথায় তুই?”
“ভার্সিটিতে কেন?”
“আজকাল ভার্সিটি সিনেপ্লেক্সে শিফট করেছে বুঝি, কাঞ্চনজঙ্ঘা?”
