Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৭

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৭
মুশফিকা রহমান মৈথি

কাজিনমহল তখন খাওয়াদাওয়া করে নি। বিরিয়ানির গন্ধটা জিভে জল আনলেও তারা নড়তে পারছে না। এতো চমৎকার সিনেমা রেখে কি নড়া যায়? রাতের বেলা “নেই কাজ তো পটনভী ভাঁজ” গ্রুপে খ্যাঁ খ্যাঁ করার সুযোগ তো মিস করা যাবে না।
কাঞ্চন প্রীতির কথায় আকাশ থেকে পড়লো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। প্রীতি আপুকে সে খুব ভালোবাসতো। একেবারে এঁটেল মাটির মানুষ হিসেবে সে প্রখ্যাত। কিন্তু মহিলা যে এমন উচ্চতর লেভেলের ধান্দাবাজ তাতো জানা ছিলো না। এঁটেল না এই মহিলা একটা বেলে মাটির কাঁকড়া। মিথ্যে বলায় সে কাঞ্চনকে একেবারে টেক্কা দিচ্ছে। কি সাংঘাতিক! বিষয়টা একটু আঁতেও লাগছে। কিছু বৈশিষ্ট্য মানুষের স্বকীয় হয়। এই চাপা মারার বৈশিষ্ট্যটা পারিজাত পটনভী কাঞ্চনের স্বকীয়। সুতরাং প্রীতিকে সেটা কেড়ে নেওয়ার সুযোগ সে দিবে না।

প্রীতির গলা কাঁপছে। তার নাকের নিচে ঘাম জমছে। মিথ্যে বলা খুব কঠিন। তবুও তাকে বলতে হচ্ছে। মিথ্যে কথাগুলো অনর্গল বলে সে চুপ করে গেলো। আফনানের হাত খেমছে ধরে আছে সে। আফনান বেঁচারা কিছু বুঝতে পারছে না। ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রয়েছে। একটু পর পর আশেপাশে চাইছে। গাজীপুরের রিসোর্টে আজকে বুফে ছিলো। বুফেটা খাওয়া হলো না। এখন চিনের জনগোষ্ঠীর মতো বিশাল এক পরিবারের সামনে ভুতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যাদের একটা মুখও সে চিনে না। কি অদ্ভূত!
প্রীতির বাবা ফরহাদ পটনভী জুলফিকার পটনভীর উদ্দেশ্যে বললেন,
“চাচা আপনি বিচার করেন। এই মেয়ে ভরা সমাজে আমাদের নাক কাঁটাইছে! উপযুক্ত শাস্তি না দিলে বাকিগুলোও আকাশে উড়তে শুরু করবে।”
“কিন্তু বাবা, আমি তো প্রথমেই বলেছি আমি অন্য একজনকে পছন্দ করি। আপনি আমার কথা গ্রাহ্য করেন নি। তাহলে এখানে আমার দোষটা কোথায় বলতে পারেন?”
প্রীতির গলা কাঁপছে। ফরহাদ সাহেব ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন,

“এই চুপ! আর একটা কথা বললে তোমাকে থাপড়াবো আমি! তোমার ভাগ্য ভালো যে এখনো তুমি শ্বাস নিতে পারছো। সে অপরাধ তুমি করেছো তোমাকে জ্যন্ত মারা উচিত!”
প্রীতি কেঁপে উঠলো। সাথে তার স্বামী আফনানও। তার মুখ রীতিমত বর্ণহীন সাদা কাগজের মত হয়ে গেছে। ফরহাদ পটনভী উগ্র মেজাজী ব্যক্তি। এই লোক সীমা বুঝে না। কাজিনমহলের অপছন্দের তালিকায় এই ব্যক্তিও আছে। তাদের ভাষায় ফরহাদ চাচা “চামার”। ফরহাদ চাচার চামার স্বভাবটা অবশ্য তার সাঙ্গপাঙ্গের কারণেই। ফরহাদ চাচার ট্রান্সপোর্ট বিজনেজ। সতেরোটা লড়ি গাড়ি তার। ড্রাইভার, হেল্পারদের সাথেই তার উঠাবসা। ফলে ভাষায় বা আচরণে সেই বিষয়গুলো ছেপে গেছে। অনেকের ধারণা তিনি গুণ্ডা পালেন। প্রীতি এবং তার ছোট দু বোন পরি এবং প্রীশাকে জিজ্ঞেস করলে তারা অস্বীকার করে। রিদম পৃথুলার কানে কানে বললো,

” দেখেছিস, বলেছিলাম না ফরহাদ চাচা মাফিয়া গ্যাঙ্গে আছে!”
“শাটআপ রিদম। সিনেমা জমে গেছে। ইঞ্জয় করতে দে। প্লিজ”
“নে নে নে নে নে!”
পৃথুলার কথায় মুখ বাঁকিয়ে ভেঙ্গালো রিদম। ফলে ঠাস করে পায়ে পাড়া দিলো পৃথুলা। রিদম “উ উ উ” করে উঠলো৷ তারপর পা সরাতেই বললো,
“তুই একটা শাকচুন্নী!”
“ইয়েট ইউ লাভড মি!”
“ওইটা আমার জীবনের কাল ছিলো!”
এসবের মধ্যে জুলফিকার পটনভী গম্ভীর রাশভারী স্বরে গর্জে উঠে ফরহাদ পটনভীকে থামালেন,
“ফরহাদ, শান্ত হও। তুমি তোমার নিজের ঘরে নেই৷ ভুলে যেও না।”
চাচার ধমকে নিজেকে সংযত করলেন ফরহাদ। ফরহাদ সাহেবের স্ত্রী নাজমা মুখ কালো করে এক কোনায় দাঁড়িয়ে রইলেন। এবার জুলফিকার সাহেব প্রীতির দিকে চাইলেন। গম্ভীর স্বরে বললেন,
“একটু আগে তুমি কিছু বলছিলে। সেটা বিস্তারিত বল!”

প্রীতি একটা শুকনো ঢোক গিললো। একটু চোখ তুলে চাইলো স্নিগ্ধের দিকে। শান্ত, হিম চোখে সে তাকিয়ে আছে। তার মতো নিস্পন্দ মানুষ বোধ হয় এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা নেই। এক হাটুর উপর একটা পা তুলে ডান হাতটা সোফার হেলান দেওয়ার জায়গায় ঝুলিয়ে বাম হাত সেই তুলে রাখা পায়ের উপর রেখে সে খুব শান্তভাবে সিনেমা দেখছে। প্রীতির এই লোকটা কেন যেন ভয় করে। সে চোখ সরিয়ে একটা শ্বাস ফেললো। মাথায় কথাগুলো গুছিয়ে বললো,
“আমি আফনানকে পছন্দ করি আজ পাঁচ বছর। আমরা একই মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট। এক সাথে ইন্টার্নি করছি। এক সাথেই এখন জব করি। তাই আমাদের ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে গাঢ় হয়েছে। আপনি যখন আমাদের বিয়ে ঠিক করেন আমি বাবাকে জানাই। বাবা আমাকে থাপ্পড়ও মারেন। তখন আমার জীবনে এক রাশ আলো নিয়ে আসে কাঞ্চন। কাঞ্চন আমাকে জানায় সে স্নিগ্ধ ভাইয়াকে ভালোবাসে। আমার তখন মনে হয়েছে এখানে অনেকগুলো জীবন জড়িত। আমি কখনোই স্নিগ্ধ ভাইয়ের সাথে সুখী হতে পারবো না। আর কাঞ্চনও কখনো আপনাদের জানাতে পারবে না ভয়ে। ফলে কাঞ্চন আমাকে বুদ্ধি দেয় পালিয়ে যাওয়ার। ওই আমাকে সাহায্য করেছিলো পার্লারের নাম করে পালানোর। এজন্য আমাকে পার্লারে ওই নিয়ে যায়!”
কথা সত্য পার্লারে এই মহিলাকে সেই নিয়ে গিয়েছিলো। কাঞ্চন স্থির চোখে প্রীতিকে দেখছে। মহিলার চাপার দম আছে। সত্যের সাথে একটু মিথ্যে মিলয়ে কি চমৎকার গল্প ফাঁদলো। বড়চাচা চেঁচিয়ে উঠলেন,

“আসল নষ্টের গোড়া তাহলে কাঞ্চন। দেখেছো বাবা বেশি লায় দিলে কি হয়?”
“তুমি থামো রফিকুল্লাহ!”
ফরহাদ সাহেব চটে গিয়ে বললেন,
“রফিকুল্লাহ ভাই ঠিক বলছেন চাচা। সালমানের মেয়েটাই সব নষ্টের মূল। ওই আমার ভালো মেয়েটাকে দিয়ে এমন বিশ্রী কাজ করিয়েছে!”
কাঞ্চন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। জুলফিকার পটনভী কাঞ্চনকে গমগমে স্বরে শুধালেন,
“প্রীতি যা বলছে তা কি সত্য!”
“হ্যা!”
কাজিন মহলের চোখ বিস্ফারিত হলো। পটনভী গুষ্টির মধ্যেও একটু হেলদোল হলো। কানাঘুঁষাটা বাড়লো। সব বেশি পরিবর্তন ঘটলো স্নিগ্ধের মধ্যে। নিস্পন্দ মানুষটা তার বসার ধরণ বদলালো। একটা সামনে এগিয়ে এসে দুহাটুর পর দু হাত জড়ো করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলো কাঞ্চনের দিকে। ফরহাদ তেড়ে আসতে গেলে সিরাজুল পটনভী তাকে আঁটকে দিলো। কাঞ্চনের ছোট শরীরটা কাঁপছে। তার চোখ ভেজা। কেমন দলা পাঁকানো স্বরে বললো,

“আমি প্রীতি আপুকে পালাতে সাহায্য করেছি। আমার হাতে কোনো উপায় ছিলো না দাদাজান। প্রীতি আপু নয়তো সুইসাইড করতো!”
পটনভী পরিবারে পিনপতন নীরবতা। সবার মধ্যেই একটা আতঙ্কিত ভাব। প্রীতির মতো শান্ত ভদ্র মেয়ে কিনা সুইসাইড করতো? এতো বড় কদম সে কেন নিবে? সুইসাইড কোনো মুখের কথা না। একটা বিশ্রী কদম। একচাচী বলেই উঠলেন,
“আজকালের ছেলেমেয়ে গুলো এতো বেপরোয়া?”
ফরহাদ পটনভী ভুত দেখার মতো চমকে উঠলেন। প্রীতির মা নাজমা পটনভী মুখে আঁচল চেপে ধরলেন। যেন তিনিও আঁচ করেছিলেন। এর মধ্যে রিদম ফিসফিসিয়ে বললো,
“পপকর্ণ এনে দে ভাই। নাটক জমে গেছে। এতো নেটফ্লিক্স, হইচট ফেইল রে! টুইস্ট পে টুইস্ট!”
“চুপ কর। দেখতে দে!”

কাঞ্চনের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। তার মেকাপ গলে যাচ্ছে। কাজল চোখের নিচে জমা হয়েছে। সে মুখে হাত চেপে বলল,
“আমি প্রীতি আপুকে পালাতে সাহায্য করেছি। কিন্তু একটা ভুল আছে, আমি স্নিগ্ধ ভাইয়াকে পছন্দ করি এটা মিথ্যে ছিলো। আমি বাধ্য হয়েছি প্রীতি আপুকে মিথ্যে বলতে। কিন্তু আমার করার কিছু ছিলো না। আমি জানতাম এটা না বললে প্রীতি আপু কখনোই সাহস করবে না। সে আফনান ভাইয়াকে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু বাধ্য হয়ে স্নিগ্ধ ভাইয়াকে বিয়েতে সে রাজি হয়েছে। আমি কি করবো বলুন, আমি যখন প্রীতি আপুর বালিশের নিচে ঘুমের ঔষুধের কৌটা দেখেছিলাম আমার ভয়ে গা শিউরে গিয়েছিলো। আমি জানতাম ফরহাদ কাকা কখনো প্রীতি আপুর কথা শুনবেন না। তাই আমি বাধ্য হয়ে মিথ্যে বলেছি দাদাজান। এখন আপনি যা শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে নিব। আমার ছোট্ট মাথায় কোনো বুদ্ধি আসে নি। তবে আমি এটা আমার স্বার্থের জন্য করি নি। স্নিগ্ধ ভাইকে আমি অপছন্দ করি সেটা উনিও জানেন।”
বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। প্রীতি কিছু বলতে গেলেই সে তার হাত চেপে ধরলো। তীক্ষ্ণ চোখে একবার তাকালো, যার অর্থ,

“মিথ্যে বলার কাজ আমার, আমাকেই সেটা করতে দাও!”
প্রীতি আর কথা খুঁজে পেলো না। এই মেয়ে এমন ভাবে কাঁদছে প্রীতি তার কান্না আসল ভেবে বসেছিলো। জুলফিকার পটনভীর কপালে ভাঁজ পড়লো। তাকে কিছুটা বিচলিতও লাগলো। স্নিগ্ধর ঠোঁট বেঁকে গেলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বললো,
“নানাজান, আমি কিছু বলি?”
জুলফিকার পটনভী অনেকটা অসহায়ের মতো চাইলের স্নিগ্ধের দিকে। স্নিগ্ধ খুব শান্ত স্বরে বললো,
“এখানে সবচেয়ে বড় ভিক্টিম আমি। তাই এই দুজনকে শাস্তি দেবার রাইটও আমার-ই। সো আমি যা চাইবো, আপনি সেটাই সিদ্ধান্ত নিবেন।”
স্নিগ্ধের কথায় সায় দিলেন জুলফিকার পটনভী। যদিও সে মেয়ের ঘরের নাতী। তবুও জুলফিকার পটনভীর গর্ব সে। কারণ তার ছেলে-মেয়ে বা নাতী নাতকুর দের মধ্যে সে নিজের ছাপ দেখে না। একমাত্র এই ছেলেটার মধ্যেই নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। তাই তিনি বললেন,

“কি চাও তুমি?”
“আমি চাই প্রীতি আর আফনানের বিয়েটা সুন্দর ভাবে হোক। এটা নিয়ে জলঘোলা না হোক। আফনান একজন ডাক্তার। ভালো হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত। সুতরাং এই বিয়েতে অমতের কোনো কারণ নেই। যেহেতু আমার বিয়ে হয়েই গেছে, সুতরাং ওদেরকে এখন হ্যারাস করার মানে নেই। তবে একটা বিষয় আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে নানাজান।”
“কি?”
“কাঞ্চন আমার কাছে কখনো ডিভোর্স চাইতে পারবে না। আমি ভাঙ্গাগড়ার সম্পর্কে বিশ্বাসী নই। আমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করি বা না করি আমাদের বিয়েটা একপ্রকার জোর করেই হয়েছে। এখানে আমাদের হাত নেই। আমি যেহেতু বিয়েটা মন থেকে মেনে নিয়েছি। সেও যেন সেটাই নেয়। তার যদি কোনো পছন্দ থেকেও থাকে সে যেন সেটা মাথা থেকে মুছে ফেলে। সে এখন আমার ওয়াইফ সেটা যেন সে মাথায় ছেপে ফেলে।”
স্নিগ্ধ শান্ত স্বরে বললেও কাঞ্চনের মাথায় বাজ পড়লো। স্নিগ্ধর কথা শেষ হতেই জুলফিকার পটনভী কাঞ্চনকে শুধালেন,
“তুমি কি বুঝতে পেরেছো সরফরাজ কি বলেছে?”
কাঞ্চন চুপ করে রইলো। গুগলিটা আসলে স্নিগ্ধই মারলো শেষমেশ। তবে কাঞ্চনও দমে যাবার মানুষ নয়! চোখের পানি মুছে সেও শান্ত স্বরে বললো,

“মানে আমাকেও মায়ের মতো শাস্তি ভোগ করতে হবে, তাই তো দাদাজান?”
জুলফিকার পটনভী এবার খানিকটা বিচলিত হলেন যেন। অতীতের একটা ভুল বারবার তাকে বাজেচাবে মুষড়ে ফেলে। স্নিগ্ধ তখন ভারী স্বরে বলল,
“আমি সালমান মামা নই। সুতরাং এটাকে শাস্তি না ভেবে একটা সম্পর্কের সূচনা ভাবাটাই উচিত। যাক গে, আমি আমার বক্তব্য রেখেছি এখন নানাজান আপনার সিদ্ধান্ত!”
জুলফিকার পটনভী কাঞ্চনের উদ্দেশ্যে ধীরে স্বরে বললেন,
“তুমি যা করেছো সেটা আপাতদৃষ্টিতে ভালো হলেও এখানে একটা পরিবার জড়িত ছিলো। নিজে নিজে মাতবরি না করে আমার কাছে আসা উচিত ছিলো। মাঝে থেকে সরফরাজকে সেই মাশুল দিতে হয়েছে। তাই আমি চাই সব ভুলে একটা নতুন সূচনা হোক। প্রীতি এবং আফনানের বিয়েটা আমরা ধুমধাম করে আগামী মাসেই দিব। এখন আপাতত এই বিয়েটাকে কাবিন হিসেবেই ধরছি। আফনান তুমি তোমার বাবা-মাকে নিয়ে আসবে কাল। আর কাঞ্চন তুমি, এখন থেকে নিজের বৈবাহিক জীবনে মনোযোগ দাও। আমি চাইবো তুমি চেষ্টা করো। তারপর যদি অপারগ হও, তোমার দাদাজান আছেন। আমি তোমার উপর কিছু চাপিয়ে দিব না। আমি সরফরাজকেও বলবো আমার নাতনীর সাথে মিলে মিশে থাকার। সে যেন এই দাম্পত্য জীবনকে কারাগার না ভাবে, সেই দায়িত্ব তোমার।”

ফরহাদ পটনভী চাচার সিদ্ধান্তে সহমত পোষণ না করলেও বলার কিছু ছিলো না। তাকে খুব অপ্রসন্ন দেখালো। প্রীতি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। আফনান বোকা স্বরে বললো,
“এখন আমি কই যাব?”
“আপাতত এখানেই থাকো। সকালে বাড়ি যেও!”
বলেই স্বামীকে আশ্বস্ত করলো প্রীতি। কাঞ্চন আর কথা বাড়ালো না। লেহেঙ্গা তুলে হনহন করে হাটতে লাগলো। এই বাড়িতে তার মতামতের মূল্য নেই তা তো অজানা নয়। সে এই বাড়িতে একটা পরগাছার সমতূল্য। সুতরাং মন খারাপ করার মানেই নেই। তবে প্রীতি আপুর উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে৷ মহিলাকে ফাঁকা পেলে চেপে ধরে পেট থেকে কথা বের করতে হবে৷ কেনো সে তাকে ফাঁসালো? এরমধ্যে কাজিনেরা ঘিরে ধরলো কাঞ্চনকে। তাবাসসুম মেজো খালার মেয়ে। সে প্রায় হাত খামচে ধরে বললো,
“প্রীতি আপু সুইসাইড করতে গিয়েছিল? সত্যি?”
কাঞ্চন একটা ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

“না!”
রিদম চোখ বড় বড় করে বললো,
“তাইলে ওখানে যে বললি! আর তুই যে কাঁদলি?”
কাঞ্চন খুব শান্ত ভঙ্গিতে হাটতে হাটতে বললো,
“মিথ্যে শুধু আমি একা বলি না। পটনভী পরিবারের সবাই চাপামাসি। তাই চাপামাসিদের সামনে একটু নায়িকা না হলে হয় না!”
অঞ্জনা এবং পৃথুলা একঘরে থাকে। পাশাপাশি দুটো খাট। তারা একেবারে সমবয়সী। মাত্র এক মাসের ফারাক। তাই তাদের আপন বোনের মতোই দেখায়। কাঞ্চন না নিজের ঘরে গেলো, না স্নিগ্ধের ঘরে সে সরাসরি গেলো পৃথুলার ঘরে। সেখানেই কাজিনমহল জড়ো হলো। মোট নয় জন আপাতত। রিদম, ইকরাম, শাহাদাত, অঞ্জনা, তাবাসসুম, পৃথুলা, তাকবীর, সোহম এবং কাঞ্চন। আর বাকিরা যার যার রুমে। মোট চৌদ্দ জন কাজিন তারা সমবয়সী বা পিঠাপিঠি। সানিয়া যদিও এদের সমবয়সী কিন্তু ওর কুটনামির জন্য কেউ তাকে দলে টানে না। কাঞ্জনের দিকে সবার চোখ। মেয়েটার কান্না দেখে একটু আগে অঞ্জনা প্রায় নাক টানছিলো। ফলে সে হতাশ হলো জেনে যে সেটা অভিনয়। সবার বিস্ময় কমাতে কাঞ্চন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“শোন, আমি মিথ্যে বলেছিলাম। প্রীতি আপুর যে প্রেমিক আছে সেটা আমার জানা ছিলো না। প্রীতি আপুকে আমি পার্লারেই রেখে আসি। মাঝে আমার এক বান্ধবীর ফোন আসাতে আমি ওকে বলেছিলাম ড্রাইভার ওকে নিয়ে যাবে। সো আমি সত্যি জানতাম না ও পালাবে। আর পটনভী মঞ্জিল একটা মাছের বাজার আমি কেমনে জানবো ও পার্লার থেকে আসে নাই?”

“তাইলে ও যে বললো?”
“ও আমাকে ফাঁসিয়েছে। দেখ আমি পালিয়েছি বলার থেকে কেউ আমাকে সাহায্য করেছে সেটা বলা ইজি! দায় কমে। আর যদি বলা হয় ওই মানুষটা তার হবু বরকে ভালোবাসে তাহলে নিজের ঘাড়ে কোনো দোষ থাকলো না। বেসিক্যালি প্রীতি আপুও তাই করেছে। কিন্তু আমি কেন এটাই মাথায় আসছে না।”
কাঞ্চনের কণ্ঠে সন্দেহ। সে অংকটা মিলাতে পারছে না। ঠিক তখন ই পৃথুলা বলে উঠলো,
“পটনভী’স নিউ জেনারেশনের সবারই কম বেশি জানা বিষয়টা!”
“কি?”
“এই যে তোমার এক কালের কেরাশ ছিলো স্নিগ্ধ ভাই!”
কাজিন মহল মোটেই অবাক হলো না। রিদম শুধু একটু মুখ বাঁকালো। কাঞ্চন ক্ষেপে বললো,
“ফাজলামি করিস না।”
“তুই অস্বীকার করতে পারবি? তুই স্নিগ্ধ ভাইয়ের আশেপাশে মৌমাছির মতো ঘুরতি ছোটকালে! সবাই দেখেছি। লোকটাই শুধু তোকে এড়িয়ে যেত। ছোটবেলায় ঘর ঘর খেলায় সবসময় স্নিগ্ধ ভাইকে ডাকতি। ওর বউ হতে চাইতি।
বলেই তাবাসসুম হাসিতে ফেঁটে পড়লো। কাঞ্চনের মুখে কালো মেঘ জমলো। সোহম বিজ্ঞের মতো বলে উঠলো,

“বাচ্চাকালের ভুল তোকে ডোবালো কাঞ্চন! তবে প্রীতি আপু ঝানুমহিলা”
প্রীতি আসলেই ঝানুমহিলা। কাঞ্চনের ইচ্ছে হচ্ছে ঢঙ্গী আনুপমা সাজা ওই মহিলার মাথাটা ফাঁটিয়ে দিতে। কিভাবে একটা বেড়াজালে তাকে আঁটকে ফেলল। এখন সারাটাজীবন ওই সিমেন্টের বস্তার সাথেই কাটাতে হবে। ব্যাপার না, কাঞ্চন হেরে যাওয়ার পাত্রী নয়। বাবা-মার ছায়া ছাড়া এই পটনভী মঞ্জিলে সে বড় হয়েছে। নিজের লড়াই সে নিজেই করতে জানে। সিমেন্টের বস্তা নিজে ওকে ছাড়বে। বাপ বাপ করে ছাড়বে।

করিডোরে ফোনে কথা বলছিলো স্নিগ্ধ। একটা কেসের বিষয়ে বিশদ আলোচনা করছিলো নিজের টিমের মানুষদের সাথে। ঠিক তখন ই তার পেছনে এসে দাঁড়ালো প্রীতি। তার চোখে মুখে একটা অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে। স্নিগ্ধ তাকে দেখেই ভারী স্বরে বললো,
“রাখছি!”
ফোনটা কেটেই তাকালো প্রীতির দিকে। প্রীতি কাচুমাচু স্বরে বললো,
“সরি স্নিগ্ধ ভাইয়া আর থ্যাংক ইউ!”
স্নিগ্ধ ধাঁরালো চোখে কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“নেক্সট টাইম থেকে আমার ওয়াইফের নামে মিথ্যা কথা বলার আগে একটু ভেবে নিস!”
প্রীতির মুখটা কেমন ফ্যাকাশে সাদা হয়ে গেলো। খানিকটা বিচলিত হয়ে বললো,
“কিন্তু!”
“প্রীতি”

প্রীতি কথাটা শেষ করতে পারলো না স্নিগ্ধের ভারী স্বরের প্রকোপে। চুপ করে যেতে হলো। স্নিগ্ধ খুব শান্ত ভঙ্গিতে বললো,
“তুমি আফনানকে ভালোবাসতে, আফনানের সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে। পরিবার মেনে নিয়েছে এখানেই তোমার খুশি হওয়া উচিত। যা হয়েছে সেটা ওখানেই যেন থাকে। আমার এবং কাঞ্চনের সাথে তোমার পথ আলাদা। সুতরাং তুমিও পুরোনো কাসুন্দি টানাটা বন্ধ কর। আমার মনে হয় তুমি বুদ্ধিমান মেয়ে।”
বলে ঘাড় টানা দিলো। পকেটে মোবাইলটা ঢুকিয়ে বললো,
“অল দ্যা বেস্ট ফর ইউর লাইফ।”
তারপর বড় বড় পা ফেলে হাটা শুরু করলো স্নিগ্ধ। প্রীতির কপালে তীব্র ভাঁজ। কেন যেন খুব অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। সে কি কাঞ্চনের জীবনটা একটা অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দিলো। তার চিঠি দেওয়া বা পরিবারের সবার সামনে মিথ্যে বলাটা কি ঠিক হলো! এছাড়া তো উপায়ও ছিলো না।

কাঞ্চনের চোখ প্রায় ঘুমে জড়িয়ে এসেছে। ভারী মেকাপ, লেহেঙ্গা বিরক্ত করছে। পৃথুলাকে বললো,
“আজকে তোদের সাথেই থাকবো আমি।”
কিন্তু কথাটা বাস্তবায়িত হলো না। কারণ সরফরাজ পটনভী এসে দরজায় কড়া নাড়লেন। অঞ্জনা দরজা খুলতেই ভারী স্বরে বললো,
“ফেকুচন্দ্র কোথায়?”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৬

অঞ্জনা পথ ছেড়ে দিলো। স্নিগ্ধ সুন্দর ঘরে ঢুকলো। কোন ভনীতা ছাড়াই স্নিগ্ধ আটজোড়া চোখের সামনে কোলে তুলে নিলো কাঞ্চনকে। কাঞ্চন ভয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলো। এমন কাজে সে হতবিহ্বল। খাবি খাওয়া গলায় বললো,
“হচ্ছে কি?”
“মিসেস ফেকুচন্দ্র পটনভীর খেদমত!”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here