ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৯
মুশফিকা রহমান মৈথি
স্নিগ্ধের কথাটা শুনতেই বুকটা ধরাস করে উঠলো কাঞ্চনের৷ সাথে সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলো সে। তার মুখটা পাংশু বর্ণের হয়ে গেছে। ফোনের ওপাশ থেকে স্নিগ্ধ ধীরে স্বরে বললো,
“মুন্ডি খুলে যাবে তো এভাবে ঘোরালে। চোখটা খুলে সোজা তাকালেই আমাকে দেখতে পাবে মিসেস ফেকুচন্দ্র পটনভী!”
কাঞ্চন এবার একেবারে সোজা তাকালো। কালো ইউনিফর্ম পরিহিত পুরুষটি কানে ব্লুথুথ হেডফোন লাগিয়ে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা এখানে চলে এসেছে? কাঞ্চনের মুখটা একেবারে সাদা পৃষ্ঠার মতো হয়ে গেলো। কাঞ্চনের সাথে সাথে কাজিন মহলের মুখ গুলো চুপসো আমসত্ত্বের মতো হয়ে গেছে৷ ঘনঘন শুকনো ঢোক গিলছে। রিদম আর তাকবীরের অবস্থা সবচেয়ে বাজে। তারা পারলে উল্টো দৌড় দেয়। রিদম ফিসফিসিয়ে বললো,
“এই তুই ফিজিক্সের ছাত্র না? তুই একটু বল আমাদের থেকে যে দূরত্বে স্নিগ্ধ ভাই আছে সেটা পার করে আমাদের টুটি যেন ধরতে না পারে সেজন্য আমাকে কত স্পিডে দৌড় দিতে হবে!”
তাকবীর শুকনো ঢোক গিলে বললো,
“ভাই আমি স্নিগ্ধ ভাইকে দেখলে নিজের নাম ভুলে যাই, ফিজিক্সের সূত্র কিভাবে মনে থাকবে? তবে বায়োলজির বিষয়ে আমি নিশ্চিত!”
“কি কস, পাগলায়ে গেছোস?”
“স্নিগ্ধ ভাই আমাদের টুটি ধরে তার টাকায় সিনেমা দেখার শখ মিটিয়ে দিবে। সেটা হবে আমাদের বায়োলজি সেশন।”
“যাহ! স্নিগ্ধ ভাই এতো চিপ না। সামান্য কয়টা টাকা!”
“ভুলে যাস না। এটা চুরির টাকা।”
অঞ্জনা মাঝখান থেকে বলে উঠলো,
“আমরা কি জেলে যাচ্ছি?”
“জেলে আমরা কেন যাবো! কাঞ্চন যাবে। চুরি ও করেছে!”
সাথে সাথেই উত্তর দিলো পৃথুলা। অঞ্জনা হতাশ গলায় শুধালো,
“আচ্ছা, বরের টাকা চুরি করাও কি চুরি? না মানে এখানে যো মেরা হ্যা, ভো তেরা টাইপের কনসেপ্ট হয়ে যায় না। আম্মুকে দেখেছি আব্বুর মানিব্যাগ থেকে টাকা নিতে!”
“এটা স্নিগ্ধ ভাই। স্নিগ্ধ ভাইয়ের নিয়ম আর সারা পৃথিবীর নিয়ম কি এক? কাঞ্চন বেটা, তু তো গায়া!”
কাঞ্চন চোখ গরম করে বললো,
“আমি গেলে তোরাও যাবি। সিনেমা দেখার আর পপকর্ণ গেলার সময় তো খুব “কাঞ্চন তুই বেস্ট” বলে চিয়ার করছিলি। এখন হাওয়া বেরিয়ে গেলো। যদি ওই সিমেন্টের বস্তা আমাকে রিমান্ডে নেয় তোরাও আমার সাথে যাবি!”
“তুই চিন্তা করিস না। যদি উলটো দৌড় দিয়ে ধরা পরি, তাহলে আমরা তোর সাথে আছি।”
এর মধ্যেই স্নিগ্ধ এসে দাঁড়ালো তাদের সামনে। পকেটে হাত পুরে কিছুক্ষণ চোখ বুলালো অপরাধীদের উপর। তারপর তার চোখ গেল চরম অবাধ্য মেয়েটার উপর। গাল ফুলে আছে তার। যদিও সে গাল ফুলায় না। কিন্তু মুখটা লটকে রাখলে গালটা আপনাআপনি ফুলে যায়। স্নিগ্ধ অনেকটা সময় তার দিকে তাকিয়ে রইলো। স্থির সেই চাহনী। তারপর হিম ধরা স্বরে বললো,
“এটা তোদের ভার্সিটি বুঝি!”
“আমাদের ক্লাস ছিলো না আজকে!”
কাঞ্চন কিছুটা সাহস নিয়ে উত্তর দিলো। স্নিগ্ধ পকেট থেকে বুকে হাত বেঁধে তীক্ষ্ণ গলায় বললো,
“আমি যতটুকু জানি আজ তোদের সবার ক্লাস ছিলো!”
পৃথুলা ফিসফিসিয়ে বললো,
“সানিয়া কুত্তি!”
“ওরে আমি খাইছি!”
রিদম উত্তর দিলো সাথে সাথে। কাঞ্চন ভয় পেলো না। শুধু একটা ঢোক গিলে বললো,
“বাঙ্ক করেছি। কি সমস্যা? এখন কি আমাদের সবাইকে কান ধরে উঠবস করাবে তুমি!”
স্নিগ্ধ কিছুসময় তাকিয়ে রইলো। কাঞ্চন আরেকটু সাহস করে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি এখানে কি করছো? তোমার ডিউটি নেই!”
“একটা চোর আমার মানিব্যাগ চুরি করেছে। ভেবেছে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু সে হয়তো জানে না, আমার মানিব্যাগেও জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো। সেই চোরটাকেই ধরতে এসেছি। হাতে পেলে আই উইল শ্যুট হার!”
স্নিগ্ধের কথায় সবাই আতঙ্কে জমে গেলো। তাকবীর স্বর খাঁদে নিয়ে বললো,
“রিদম, এবার মনে হচ্ছে আমাদের উসাইন বোল্ট হবার পালা।”
রিদম মাথা নাড়ালো। স্নিগ্ধ সূক্ষ্ণ চোখে তাদের দেখে নিলো। তারপর ঝুঁকে কাঞ্চনের মুখের সামনে মুখ এনে বললো,
“কি মিসেস পটনভী! আপনাকে এমন খাবি খাওয়া কাতলা মাছের মতো দেখাচ্ছে কেন?”
কাঞ্চন একটা শুকনো ঢোক গিলে বললো,
“একটা মানি ব্যাগ ই তো, এখানে শ্যুট করার কি আছে! এমন একটা ভাব যেন মনিমুক্তো আছে!”
“তার থেকেও দামী কিছু আছে!”
কাঞ্চন একটু অবাক হলো। সে স্নিগ্ধের মানিব্যাগে তেমন কিছুই দেখে নি। দুটো ব্যাংকের ডেবিট কার্ড, সাড়ে তিন হাজারের মতো ক্যাশ টাকা আর কিছু ভিজিটিং কার্ড। এ ছাড়া কিছু পেয়েছে? দেখলো না তো! কার্ড তো ব্যাংকে ফোন করেই বন্ধ করা যায়। আর টাকাটা যদিও বেশি। কিন্তু পুরোটাও তো খরচ করে নি কাঞ্চন। অল্প কিছু টাকা খরচ করেছে। সাড়ে তিন হাজার টাকার জন্য সরফরাজ পটনভীর ডিউটি ছেড়ে কখনোই এখানে আসার কথা না। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলো কি? কাঞ্চনের গলাটা শুকিয়ে গেলো। কেসের কিছু ছিলো? স্নিগ্ধ কাজের প্রতি কতটা নিবেদিত প্রাণ সেটা পটনভী মঞ্জিলের প্রতিটা প্রাণ জানে।
স্নিগ্ধ নিজের মোবাইলটা কাঞ্চনের মুখের সামনে ধরলো। সেখানে লোকেশন দেখা যাচ্ছে। কাঞ্চন কাঁপা স্বরে শুধালো,
“কি?”
“লোকেশন বলছে আমার মানি ব্যাগটা এখানেই আছে!”
“চোর এসেছে হয়তো সিনেমা দেখতে!”
“চোরের মনে তো পুলকের অভাব নেই। অফিসার সরফরাজ পটনভীর মানিব্যাগ চুরি করে প্রথমে তোদের ভার্সিটিতে গেলো, এরপর সিনেপ্লেক্সে এলো সিনেমা দেখতে। এরপরের স্টেশনটা কোথায় হত ম্যাড শেফ নাকি পিজ্জাহাট? চোরটা তো ভারি চিন্দিমার্কা।”
কাঞ্চন এবং কাজিনমহলের মুখে রা নেই। সানিয়াকে পেলে হয়তো ওরা উত্তম মধ্যম দিত। নিশ্চয়ই ওই স্নিগ্ধ ভাইয়াকে জানিয়েছে। কিন্তু এখন চাচা আপন প্রাণ বাঁচা টাইপের সিচ্যুয়েশন। স্নিগ্ধ বুকে হাত রেখে বললো,
“আমাকে বললেই আমি নিজ হাতে আমার মানিব্যাগ আপনার হাতে ধরিয়ে দিতাম। শুধু শুধু আমাকে এতো খাটানো হলো। এবার মানিব্যাগটা দিবেন প্লিজ!”
কাঞ্চন বুঝলো সে ধরা পড়ে গেছে। অহেতুক শ্রম খরচ করে লাভ নেই। এর থেকে ভালোয় ভালোয় এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের। তাই ব্যাগ থেকে মানিব্যাগটা বের করে স্নিগ্ধের হাতে দিলো। স্নিগ্ধ সবকিছু খুঁতিয়ে দেখলো। তবে টাকার পকেটটা একবারও দেখলো না। বরং ছোট ছোট পকেট গুলো দেখলো। তার কপালের তীক্ষ্ণ ভাঁজগুলো মিলিয়ে গেলো। তারপর মানিব্যাগের একদম প্রথম বোতামওয়ালা পকেট থেকে ছোট্ট জিপিএস ট্র্যাকারটা বের করে কাঞ্চনের ব্যাগে পুরে দিলো। এবার তার গলাটা একটু কঠিন হলো,
“এই ট্র্যাকার যেন না হারায়। লাস্ট ওয়ার্নিং, মাথায় ছেপে নে!”
কাঞ্চনের শরীরে ঘাম ছুটছে। ঠোঁটের নিচে ঘমেছে বিন্দু বিন্ধু ঘাম। কেন যেন ভয় করছিলো খুব। স্নিগ্ধ পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললো,
“কোথায় খাবি তোরা?”
“তুমি খাওয়াবে?”
“না মিসেস পটনভী খাওয়াচ্ছে।”
বলেই কাঞ্চনের হাতটা নিজের হাতের ফাঁকে নিলো। তার হাত ঘেমে ভিজে গেছে। অঞ্জনা কিঞ্চিত কৌতুহলী স্বরে শুধালো,
“তুমিও যাচ্ছো?”
“কেন? কোনো সমস্যা?”
“তোমার ডিউটি?”
“মিসেস ফেকুচন্দ্র পটনভী খাওয়াবে আর আমি থাকবো না তা কি হয়?”
সবার ভয়টা একটু হালকা হলেও কাঞ্চন নিরাসক্ত। তার হাত এখনো ঘামছে। স্নিগ্ধ হঠাৎ কানের কাছে মুখ এনে বললো,
“যেহেতু মিসেস পটনভী আমার মানিব্যাগের চোর, তাই শ্যুটিং সেশনটা আপাতত পেন্ডিংয়ে রাখলাম।”
পটনভী মঞ্জিলে দুটো বিষয় নিয়ে হট্টগোল। প্রথম বিষয়টি হলো প্রীতির বিয়ে। প্রীতি নিজে পালিয়ে বিয়ে করায় সকলের চোখে বিষয়টা দৃষ্টিকটু। উপর থেকে ছেলেটা পটনভী নয়। আফনান দেখতে খুব সুদর্শন নয়। পটনভী বংশের পাঠানের মতো এক একটা ছেলের সামনে সে খুব একটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। শ্যাম বর্ণ, কাঁধে ছোট, লম্বা প্রীতির সমান-ই। বোকা বোকা চেহারা। নিহারীকা চাচীর ভাষ্যে, “ল্যাদাভ্যাদা ছেলে”। তার মতে প্রীতির সাথে তাকে মানায় না। অথচ প্রীতিকে মাত্রাতিরিক্ত আনন্দিত লাগছে। স্নিগ্ধের সাথে বিয়ে হবার সময় সে যেমন পাথরের মূর্তির মতো হয়ে ছিলো এখন সে এমন নয়। সে সব বিষয়ে খুব আগ্রহী। শাড়ি, ডেকোরেশন–সবকিছু। যে কারণে তার মা খুব আনন্দিত। তবে ফরহাদ সাহেব মোটেই প্রসন্ন নন। তিনি চেয়েছিলেন স্নিগ্ধ তার জামাই হবে। র্যাব জামাই মাঝে মাঝে খুব কাজে আসতো। স্নিগ্ধ নিশ্চয়ই শ্বশুরের সাথে বিরোধিতা করতো না। কিন্তু সেটা হলো কোথায়?
দ্বিতীয় ঝামেলার কারণ আশুলিয়ার একটি জমি। বর্তমানে একটা বিশাল জমি বিক্রয় হবে। জমিটা ক্রয় করেছিলেন জুলফিকার পটনভী। কিন্তু জমিটা ক্রয় করা হয় “পটনভী এন্টারপ্রাইজ” এর নামে। সুতরাং পটনভী এন্টারপ্রাইজের সাথে জড়িত সকল পটনভীর সেখানে ভাগ রয়েছে। অথচ টাকাটা শুধু রফিকুল্লাহ পটনভীর করা ভুলের মাশুল হিসেবে ব্যবহৃত হবে আর কিছু টাকা যাবে কাঞ্চনের নামে। বিয়েতে ওকে কিছুই দেওয়া হয় নি। কোটি টাকার সম্পত্তি অথচ এই দুজন ছাড়া কেউ পাবে না ভাগে। জুলফিকার পটনভী নিজের অকর্মণ্য ছেলের দেনা শোধ করতে এবং একটা অনাথ মেয়েকে উপঢৌকন দিতে সবাইকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
অথচ জুলফিকার পটনভীর উপরে কেউ কোনো কথাও বলতে পারছে না। কারণ বিশাল ব্যবসার বাগডোর এখনো তার হাতেই। তার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। এতে পৃথুলার বাবা ইলিয়াস পটনভী এবং ফরহাদ পটনভী সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত। ফরহাদ পটনভীর তিনটে নতুন লরি কেনার ইচ্ছে ছিলো। সেকারণে তিনি-ই একটা কাস্টোমার ধরে এনেছিলেন। অথচ এখন শুনছেন তারা কেউ কিছুই পাচ্ছে না।
সন্ধ্যা না হতেই তারা দুজন পেছনের বাগানে মদের বোতল খুলে বসেছেন। ড্রিংক করার স্বভাব কম বেশি সব পটনভীর ভেতর ই আছে। কিন্তু ফরহাদ এবং ইলিয়াস পটনভী একটু বেশি মদ্যপান করেন। প্রায় প্রতিদিন তাদের অভ্যাস এটা। শুধু মদ্যপানে তারা সীমাবদ্ধ থাকেন তা কিন্তু না।
পৃথুলার বাবা ইলিয়াস পটনভীর অন্যান্য বাজে স্বভাবও আছে। নিষিদ্ধ পল্লীতে প্রতিদিন তার যাওয়া আসা। দরজার ওপাশের খবরটা পটনভী মঞ্জিলের কেউ জানে না। জুলফিকার পটনভীর কানে সেকারণে যায় না। মনোয়ারা পটনভী ফরহাদ পটনভীর আপন বোন। অথচ তিনিও তার ব্যাপারে উদাসীন। পটনভীরা হয়তো একত্রে থাকে কিন্তু তাদের নিজের মানুষের প্রতি দরদ নেই। তাদের চোখ শুধু টাকার উপর।
অবশ্য আরেকটা কারণে ইলিয়াস পটনভী পার পেয়ে যাচ্ছেন। সেই কারণটি হলো তিনি ফরহাদ পটনভীর ডান হাত। ফরহাদ পটনভী সব কাজের সাক্ষী তিনি। তাই বোনের সাথে অন্যায়টাকে দেখার থেকে ফরহাদ পটনভীর সাথে নিজের গা বাঁচানোটাই প্রধান।
এখন সন্ধ্যা সাতটা, একটু পর প্রীতির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আসবে। আফনানের পরিবার খুব সম্ভ্রান্ত। বাবা-মা দুজন ই নামকরা ডাক্তার। তবুও ফরহাদ পটনভীর তাদের অপছন্দ। কারণ তাদের ছেলের সাথে মেয়ে সুখী হলেও তার কোনো কার্যসিদ্ধি হবে না। জুলফিকার পটনভী ফরহাদ এবং ইলিয়াস পটনভীকে খুঁজতে রফিকুল্লাহ পটনভীকে পাঠালেন। অনেক খুঁজে বাগানের শেষ মাথায় তিনি এই দুজনকে মদ গিলতে দেখলেন। অমনি কর্কশ গলায় বলে উঠলেন,
“আক্কেল কি বেঁচে দিসোস? একটুপর মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আসবে আর এনারা এখানে মদ খাচ্ছে! ছিঃ। বলি বোধবুদ্ধি হবে না তোদের!”
“তোর তো অনেক বোধবুদ্ধি, কি করছিস সেটা দিয়ে? এখন আমাদের টাকা মেরে খাচ্ছিস!”
কথাটা ভীষণ গায়ে লাগলো রফিকুল্লাহ পটনভীর। তিনি ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠলেন,
“ফরহাদ মুখ সামলে কথা বল!”
“নয়তো কি করবি? তুমি করবা হলো বা***।”
ফরহাদ পটনভী আরোও নোংরা কিছু ভাষা প্রয়োগ করলেন। যা রফিকুল্লাহ পটনভীর একেবারেই সহ্য হলো না। তিনি কষিয়ে এক থাপ্পড় বসালেন ফরহাদ পটনভীর গালে। থাপ্পড়টা মারার সময় রফিকুল্লাহ পটনভীর মাথায় ছিলো না অপর পক্ষের মানুষটি মদের নেশায় বুদ ফরহাদ পটনভী। তিনি লাল চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছু সময় রফিকুল্লাহ পটনভীর দিকে। তারপর এমন একটা কাজ করলেন যা পটনভী মঞ্জিলে এ যাবৎকালে হয় নি।
বাসায় ফিরে কাজিনমহল জানতে পারলো কাঞ্চনের বড়চাচাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফরহাদ পটনভী তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। স্নিগ্ধের মা আয়েশা পটনভী এবং কাঞ্চনের বড় চাচীর মুখ থমথমে। এদিকে প্রীতি এবং তার মা নাজমা পটনভী লজ্জায় মাথা নত করে আছে। পটনভী মঞ্জিলে থমথমে একটা পরিবেশ। জুলফিকার পটনভী ক্রুদ্ধ হয়ে আছেন। ফরহাদ পটনভীর তখনো হুশ নেই। তিনি ঘুমাচ্ছেন। কাজিন মহলকে যার যার ঘরে যেতে বলা হয়েছে। স্নিগ্ধ একা শুধু সেখানে ছিলো। পৃথুলা উপরে উঠতে উঠতে বললো,
“যেদিন এই মঞ্জিল থেকে বের হতে পারবো দুই রাকাআত নফল নামায পড়বো। এখানে মানুষ থাকতে পারে না।”
স্নিগ্ধ মায়ের থেকে পুরো ব্যাপারটা শোনার পরও নির্লিপ্ত রইলো। যেন সে আগ থেকেই সবটা জানতো। নানার উদ্দেশ্যে বললো,
“নানাজান, আমার মনে হয় ফরহাদ মামাকে এবার একটা কঠিন শাস্তি আপনার দেওয়া উচিত। আপনার বৃদ্ধ বয়সের সুযোগ সবাই নিচ্ছে বিষয়টা ভবিষ্যতে আপনাকেই বাজে ভাবে আঘাত করবে। প্রীতির শ্বশুরবাড়ির লোকেদের কাছে বিষয়টা গেলে খুব খারাপ শোনাবে। তাই বিষয়টা আইনের দাড়িপাল্লায় আনতে চাচ্ছি না। তারা তো আর “দ্যা পটনভী’স” না। এখন যা সিদ্ধান্ত নেবার আপনি ভেবেচিন্তে নিয়েন।”
রাতের দূর্ঘটনা সকালে একেবারেই উবে গেলো। সবাই যেন ভুলেই গেলো কিছু একটা হয়েছে। যে যার কাজে ব্যস্ত। প্রীতির শ্বশুরবাড়ি লোকেদের গতকাল নিষেধ করা হয়েছিলো। তারা আজ আসবে। ফরহাদ পটনভীকে “পটনভী মটরস” এর দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সে এখন সেখানে কাজ করছে বটে কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যবসার দায়িত্ব তার হাতে নেই। সিদ্ধান্ত সে নিতে পারবে না। সেই দায়িত্বটা এখন রিদমের বাবা আব্দুল্লাহ পটনভীকে দেওয়া হয়েছে। ফরহাদ এতে হম্বিতম্বি করলেও তাকে বাধ্য হয়ে বিষয়টা মেনে নিতে হয়েছে। কারণ জুলফিকার পটনভী তাকে দুটো বিকল্প দিয়েছেন। জেলে যাওয়ার থেকে ব্যবসা থেকে সরে যাওয়া লাভজনক। তবে একটা চাপা ক্ষোভ তার মনে ঠিকই জমছে।
ভার্সিটিতে ক্লাস নেই। কাঞ্চনের আজ সারাদিনটা ফাঁকা ফাঁকাই গেলো। সবাই প্রীতি আপুর শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বরণে ব্যস্ত। তার এসবে যেতে ভালো লাগছে না। সে মোটেই প্রীতির জন্য হ্যাপি নয়। তাই তার আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে না। স্নিগ্ধও গতকাল রাতে বেরিয়ে গেছে। কোনো একটা ভিআইপি কেসের জন্য তাকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে। ফলে শান্তি আর শান্তি। এখন যা ইচ্ছে তাই করা যাবে! আচ্ছা সে কি করবে? কি এমন করলে স্নিগ্ধ রাগে পাগল হয়ে যাবে এবং সে ছুটে যেয়ে ফুপুর কাছে বলতে পারবে,
“আমি তোমার ছেলের সাথে সংসার করতে চাই না।”
অবশ্য এই বাড়িতে সে কিছু না করলেও দোষী হয়। সেখানে যদি সে উল্টোপাল্টা কোনো কাজ করে তাহলে তো তাকে ছেড়ে কথা কেউ বলবে না। স্নিগ্ধ হলো দ্যা পারফেক্ট পটনভী। সুতরাং তাকে কিছুই বলবে না কেউ। সব কাঞ্চনের চুল ছিড়বে। তাহলে কি করা যায়? মাথায় কোনো বুদ্ধি আসছে না। ফলে ফেসবুকের ফিড স্ক্রল করতে শুরু করলো। এরমধ্যে একটা পোস্ট এলো “স্প্যারো গ্রুপে”।
” আমার স্বামী বিগত তিনমাস ধরে আমাকে তার ড্রয়ার ধরতে দিতো না। নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো যেন আমি ড্রয়ার না ধরি। আজ সাহস করে ড্রয়ারটা খুলে যা দেখলাম আমার মাথা ঘুরে গেলো। ড্রয়ারে বেশ কিছু সাদা গুড়োর পুটলি এবং গাঁজা পেয়েছি। এখন আমার কি করা উচিত?”
স্নিগ্ধ ভাইয়ের কাবার্ডে কি এমন কিছু পাওয়া যাবে? পাওয়া গেলেও সেটাকে কেসের জিনিস বলে সে চালিয়ে দিবে। আচ্ছা তার কাবার্ডে কি এমন আছে যে কারণে তা ধরা যাবে না? ভাবতে ভাবতেই মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি এলো কাঞ্চনের। স্নিগ্ধর না থাকার সু্যোগে সে কাবার্ডটা খুললো। কাবার্ডের চাবিটা বিছানার ড্রয়ারেই ছিলো। তাই খুব বেগ পেতে হয় নি।
তবে কাবার্ড খুলে খুব কিছু পাওয়া গেলো না। কিছু ফর্মাল, ইনফরমাল শার্ট, প্যান্ট, জিন্স, টিশার্ট, বেল্ট, টাই। অন্য জিনিসের মধ্যে দু ধরনের রিভলভার, আর কেসের ফাইল। ড্রয়ার খুঁজে আরোও বিরক্ত ধরে গেলো। এই লোক এতো ছোটখাট কাগজ পুড়ে রেখেছে ড্রয়ারে। আর এতো ফাইল। ফাইলের মধ্যে কাঞ্চন হারিয়ে যেতে পারবে। যখন একেবারে হতাশ হয়ে সব গুছিয়ে ফেলতে যাবে তখন ড্রয়ারের ফাইলের নিচে একটি খয়েরি মলাটের ডায়েরি দেখতে পেলো সে। প্রথমে ডায়েরিটা স্নিগ্ধের ডায়েরি ভেবে খুশি হলেও যখন ডায়েরিটা বের করলো তখন মুখে আষাঢ়ের কালো মেঘ নেমে এলো। তখন ই মেঘমন্দ্র স্বরে কানে এলো,
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৮
“আমি বলেছিলাম না আমার কাবার্ডে হাত দিবি না।”
পেছনে ফিরে তাকালো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। তার কপালে তীব্র ভাঁজ। চোখে মুখে কেমন উদ্ভ্রান্ত ভাব। কাঞ্চন খুব শান্ত গলায় বললো,
“কিন্তু এইটা তো তোমার জিনিস না স্নিগ্ধ ভাই”
