Home Born to be villains Born to be villains part 29

Born to be villains part 29

Born to be villains part 29
মিথুবুড়ি

ইবরাত বাচ্চাদের মতো মেঝেতে দু’পা ছড়িয়ে, দু’হাতে ন্যাসোর পা আঁকড়ে ধরে আছে। তার চোখ দু’টো পাকা আমের মতো লাল হয়ে আছে। বিপরীতে ন্যাসোর থুতনির রেখা ক্রোধে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রোধকে দমিয়ে রাখতে গিয়ে সে এত জোরে দাঁতে দাঁত চেপে রেখেছে যে, দাঁতের ঘর্ষণে কটমট শব্দ ভেসে আসছে। ইস্পাত-দৃঢ় শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করেও পা ছাড়াতে পারছে না যন্ত্রমানব। ইবরাত জোঁকের মতো তা পা কামড়ে ধরে ঝুলে আছে। ন্যাসোর দুর্দান্ত দেহসৌষ্ঠবের তুলনায় ইবরাত এতোটাই ক্ষীণ ও পলকা যে, ন্যাসো পা তুলে কদম বাড়াতে গেলে ইবরাতও তার পায়ের সাথে উঠে আসে।
ইবরাত বাচ্চাদের মতো ভ্যাঁ, ভ্যাঁ করে কাঁদে,”প্লিজ এমনটা করবেন না। আমি একা থাকতে ভয় পাই। আমার হার্ট একটু ছোটো।”
ইবরাতের এ কথায় ন্যাসোর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। সে দাঁত খিঁচিয়ে ফুঁসে উঠল,”কি-হ! হার্ট ছোটো? হার্ট ছোটো মেয়ে এমন সাংঘাতিক একটা কাজ করতে পারে?হোয়াট অ্যান ইন্ট্রিকেট স্কিম! ওহ গড, দ্যাট ওয়াজ ইনসেইন!”

ইবরাত শিশুর মতো আলাভোলা মুখ বানিয়ে বলল,”তখন আমার আবেগ কাজ করেছিল, বিবেক কাজ করেনি। কি করব বলুন? ছোট্টো একটা হৃদয়, তাও পুরোটাই আবেগে টইটম্বুর।”
মেয়েটার ন্যাকা বাক্যালাপে ন্যাসোর ধৈর্যের শেষ অবশিষ্টটুকুও ক্ষয়ে যেতে লাগল। রেশমী কেশমুষ্টি খামচে ছিঁড়ে ফেলার অভিপ্রায়ে তার দু’হাত বিদ্যুৎবেগে ছুটে উঠেও আত্মসংযমের শেষ শৃঙ্খলে মাঝপথেই থেমে গেল। আঙুলগুলো ধীরে ধীরে পাষাণকঠিন মুষ্টিতে রূপ নিল। দাঁতের ঘর্ষণে কটমট শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। অন্তঃস্থলে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার ন্যায় উথলে ওঠা বিস্ফোরক ক্রোধকে সে পুনরায় সংযম গহীনে ঠেলে দিল। ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ছেড়ে শান্ত গলায়,
“ওকে, ওকে…. ওকে ফাইন ৷ এখন তো বিবেক কাজ করছে। তুমি না ভালো মেয়ে। এবার ভদ্রবাচ্চার মতো ডিভোর্স দিয়ে দাও৷”
ইবরাত ঘাড় তুলে চোখ গোল গোল করে লোকটার দিকে তাকাল। সরল দৃষ্টিতে চেয়ে মাথা নাড়ল,”উঁহু।”
“উঁহু মানে?”
“এটা বিবেক, আবেগ—দুটোরই বাইরে।”

ন্যাসো যথাসম্ভব নিজেকে শান্ত রেখে কৌশলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সে এবার আরও শান্ত, আরও আদ্র গলায় বলল,”তুমি আমার কথা শুনবে না? তুমি না আমাকে ভালোবাসো?”
ইবরাতের চটপটে জবাব,”হা, বাসি তো। কিন্তু আব্বু বার বার করে বলে দিয়েছে, আপনার মিষ্টি কথার ফাঁদে যেন পা না দিই। পুরুষ মানুষ মতলব ছাড়া মিষ্টি কথা বলে না।”
ন্যাসোর সংযম ভাঙল, ক্রোধ আকাশ ছুঁলো। পুরুষালী বরফ শীতল কণ্ঠস্বর ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো বিকট ধমক,”এই মেয়ে, তোমার আব্বু এটা বলেনি, জোর করে বিয়ে করা গেলেও সংসার করা যায় না? পা ছাড়ো বলছি। এই রুমে হয় তুমি থাকবে, নয় আমি।”

ইবরাত আরও শক্ত করে দু’হাতে জাপ্টে ধরল ন্যাসোর পা। উপরে উপরে কাঁদো কাঁদো ভাব দেখালেও, মনে মনে সে একশোটা গালি দিচ্ছে ন্যাসোকে৷ এতো শক্ত কারও পা হয় নাকি? পা তো নয়, যেন ইস্পাত। তাছাড়া লোকটাকে তালগাছের মতো এতো লম্বা হতে বলেছে কে? ঘাড় তুলে তাকাতে হয় সবসময়। সেই তখন থেকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকিয়ে থাকার কারণে তার ঘাড়ে ব্যাথা ধরে গেছে৷ ইবরাত আবারও বেহায়া দৃষ্টি তুলে তাকাল। প্রথমেই ইবরাতের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ন্যাসোর অনাবৃত, ঢেউখেলানো বক্ষদেশে। পেশির ছয়টি সুস্পষ্ট ভাঁজ যেন শিলায় উৎকীর্ণ কোনো দুর্বোধ্য শিল্পকর্ম। এতদিন পোশাকের অন্তরালে নির্বাসিত সেই পৌরুষদীপ্ত স্থাপত্য আজ সমস্ত আড়াল ভেঙে পূর্ণ মহিমায় উন্মোচিত। পাথর কেটে গড়া সেই দেহরেখাগুলোর ওপর চোখ পড়তেই অজান্তেই শুকনো ঢোক গিলল ইবরাত। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি সরে এলো প্রশস্ত কাঁধের দিকে। পেশির আঁকাবাঁকা রেখায় খোদাই করা প্রতিটি বাঁক রমণীর বুকে ঝড় তোলার জন্য ছিল যথেষ্ট। সুঠাম বাহু আর স্ফীত মাংসপেশিগুলোতেও নারী মহলের দূর্বল হৃদয়গুলো ঘায়েল করার পৌরুষের অভিঘাত স্পষ্ট। এই দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে ইবরাতের ঠোঁট অজান্তেই শুষ্ক হয়ে উঠল, বুকের ভেতর অকারণ আলোড়ন ছড়িয়ে পড়ল।

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই ন্যাসো দমিয়ে রাখা ক্রোধে গজগজ করতে করতে রুমে ঢুকে সোজা শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। বরফশীতল জলধারা হয়তো তার শিরায়-উপশিরায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া ক্রোধকে নিভিয়ে দিতে পারবে এই ভেবে। অনেকক্ষণ পর বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সে। তখন পরনে ছিল কেবল ঢিলেঢালা ওয়াইড-লেগ প্লিটেড ট্রাউজার্স। উপরের অংশ ছিল সম্পূর্ণ অনাবৃত। ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া জলকণা ঢেউখেলানো বক্ষদেশ বেয়ে নিচে গড়িয়ে যাচ্ছিল। শিলাখণ্ড খোদাই করা দেহরেখাগুলো ভেজা আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। ইবরাত তখন পানি খাচ্ছিল। দৃশ্যটা দেখামাত্র তার চোয়াল আলগা হয়ে এলো, মুখ থেকে পানি গড়িশে পড়ল নিচে। বিস্ময়ে চোখদুটো স্থির হয়ে যায় ন্যাসোর ওপর। উঁহু, তার পৌরুষদীপ্ত দেহসৌষ্ঠবে! ইবরাতের বেহায়া দৃষ্টি ন্যাসোর ভেতরে আবারও ক্রোধের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়। চোয়াল শক্ত করে কোনো কথা না বলে সে রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আর তার পরই ইবরাত দৌড়ে এসে তার পা দু’হাতে আঁকড়ে ধরে, আর মুহূর্ত থেকে এখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে।

ইবরাতের কম্পিত দৃষ্টি এবার গিয়ে স্থির হলো ন্যাসোর মুখে। লোকটার চেহারায় ইতালিয়ান আভিজাত্যের একটা স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। রুক্ষ চোয়াল, ধারালো চিবুক, খাড়া নাক, অবিন্যস্ত খাড়া চুল, বাদামি চোখের মণি আর গলদেশের অ্যাডামস অ্যাপেলের ওপর লম্বালম্বিভাবে আঁকা ইতালিয়ান ভাষার ট্যাটুটা; ঢোক গিলার সাথে সাথে ট্যাটুটা যখন কেঁপে ওঠে, তখন ইবরাতের মনে হয় ওটা কোনো ট্যাটু নয়, তার বুকে আঘাত করা ধারালো তলোয়ার! এরপর ইবরাতের চোখ গেল ন্যাসোর গায়ের রঙের দিকে। পরক্ষণেই সে তাকাল নিজের দিকে। এই লোকটার তুলনায় তার গায়ের রং বেশ চাপা। একটু নয়, অনেকটাই চাপা। উচ্চতা আর গায়ের রঙের এই পার্থক্যের কারণে তাদের দুজনকে পাশাপাশি দেখলে কেউ কখনোই পারফেক্ট কাপল বলবে না। লোকটার গায়ের রং বড্ড বেশি উজ্জ্বল।
আজ ন্যাসোর এই ধবধবে গায়ের রঙটার প্রতি খুব হিংসা হলো ইবরাতের। মনে মনে ভাবল, ছেলেদের গায়ের রঙ মেয়েদের মতো এতো ধবধবে ফর্সা হতে কে বলেছিল?
তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে। তার গায়ের রং চাপা তো কী হয়েছে? সে-ও তো কারো চেয়ে কম নয়! তার চেহারায় মায়া আছে। ছোটবেলায় তার দাদি প্রায়ই বলতেন, তার মুখের এই অবোধ মায়া যেকোনো বাহ্যিক সৌন্দর্যকে হার মানাতে বাধ্য।
ইবরাত ঢোক গিলল, মিনমিন করে বলল,”আমরা একটা চুক্তিতে আসি, কেমন? আপনাকেও বের হতে হবে না, আমাকেও বের না। তারচে বরং আমার একসাথে থাকি।”

“শাট দ্য ফাক আপ, স্টুপিট।”
ন্যাসোর আকাশচুম্বী হুংকারে থরথর করে কেঁপে উঠল। ন্যাসো আবারও পা টানল। বিপরীতে আরও শক্ত হলো ইবরাতের হাতের বাঁধন। আহাজারি জুড়ে দিল ইবরাত। আহাজারির ভেতর দিয়েই বলল,”প্লিজ আমার সাথে বাংলায় কথা বলুন। আমি ইংলিশ কম পারি।”
ন্যাসো গর্জন-তোলা বাঘের ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে ইবরাতের দিকে তাকাল। পা ঝেড়ে ওকে ছাড়াতে ছাড়াতে দাঁতে দাঁত পিষল,
“ইংলিশ কম পারো, কিন্তু ছেলেদের ফাঁদে ঠিকই ফেলতে পারো, তাই না?”
ইবরাত ন্যাসোর পা এমনভাবে জাপ্টে ধরল, যেন এটাই তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে ন্যাসোর চোখে চোখ রাখল সে। নির্লজ্জের মতো আবার বলল,”আর কাকে? শুধু আপনাকেই তো।”

ন্যাসো আর না পেরে নিজের চুম খামচেই ধরল,”আমাকেই কেন, ড্যামিট?”
ইবরাতের কান্নাভেজা কণ্ঠে চটপটে প্রত্যুত্তর,”কারণ, আপনি জোস।”
ন্যাসোর ইচ্ছে করল মেয়েটাকে কাঁচা চিবিয়ে খেতে। তবে মানুষকে খাওয়া সম্ভব নয়। তাহলে সে নরখাদক হয়ে যায়। মানুষকে খাওয়া যায় অন্য উপায়ে। তবে তা এখন সম্ভব নয়। আর না কখনো এই মেয়ের সঙ্গে তা সম্ভব হবে। ন্যাসো ফোঁস ফোঁস করে কতগুলো নিঃশ্বাস ছাড়ল। বোঝানোর মতো করে বলল,
“লিসেন লিটল গার্ল… প্রেম, ভালোবাসা, সংসার—এসব কখনোই জোর করে হয় না। একটা সংসার টিকে থাকতে টান লাগে, মায়া লাগে, বোঝাপড়া লাগে। ফর গড’স সেক, বোঝার চেষ্টা কর। তোমার প্রতি আমার কোনো টান নেই, কোনো অনুভূতি নেই। তুমি যেটাকে প্রেম ভাবছ, সেটা শুধুই একপাক্ষিক। কাউকে জোর করে সম্পর্কে টেনে আনা যায়, কিন্তু জোর করে তার সঙ্গে সংসার করা যায় না।”
ইবরাতের বাচ্চাদের মতো শব্দ করে কান্না জুড়ে দিল। তার কান্নার শব্দে সবার আগে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে এলো লুকাস। ইবরাতকে এভাবে ন্যাসোর পায়ের কাছে পড়ে থাকতে সে প্রথমে চমকে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ন্যাসোর অর্ধনগ্ন শরীর এবং ইবরাতের চোখের জল দেখে মিইয়ে যাওয়া লাজুক হাসিতে দু’হাতে মুখ চেপে ধরল সে। অর্ধ নগ্ন শরীর আর চোখের জল— দু’টোকে মাইনাসে, মাইনাসে প্লাস করে দুষ্ট হেসে ন্যাসোর উদ্দেশ্যে বলল,

“আহহ ন্যাসো! এসব কিছু করছ? বিয়ে করেছ, এখনও ঘন্টা পার হয়নি। এরমধ্যেই জোরজবরদস্তি শুরু করে দিয়েছ? এতো অস্থির হলে চলে? ছোট্টো একটা মেয়ে! তোমার মতো দৈত্যকে কি ওর পক্ষে সামলানো সম্ভব? একটু তো সময় দিতে পারতে, ব্রো।”
ন্যাসো দাঁতে দাঁত পিষে লুকাসকে চোখ রাঙাল,”লোকা, তুমি আমাদের মধ্যে একদমই আসবে না।”
হঠাৎ করে ইবরাত গিরগিটির চেয়েও দ্রুত রং বদলে বলে উঠল,”লুল্লু প্রাণী, প্লিজ আমাকে বাঁচাও। দেখো না, আমি বলছি আমার সময়ের প্রয়োজন, তাও মানতে চাইছে না।”
লুল্লু প্রাণী বলায় লুকাস ইবরাতের দিকে চোখ গরম করে তাকাল। তবে সে প্রতিক্রিয়া দেখানোর র পেল না। তার আগেই ন্যাসো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সে এবার সত্যি সত্যিই পা তুলে ইবরাতকে আছাড় মেরে ফেলতে যাবে, এমন সময় ইবরাতের কান্নার শব্দে উপর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো এলিজাবেথ। এলিজাবেথের পিছনে রিচার্ড। তবে এখানকার দৃশ্যপটে একঝলক চোখ বুলিয়ে, রিচার্ড চিবুকে চাপা বিরক্তি নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
এলিজাবেথকে দেখে ইবরাত ন্যাসোর পা ছেড়ে দেয়। এই সুযোগে ন্যাসো তৎক্ষনাৎ সেখান থেকে সরে গেল। কারণ তার গায়ে পোশাক ছিল না। লুকাসও প্রস্থান করল। এলিজাবেথ এগিয়ে গিয়ে ইবরাতকে সোজা করল ৷ দু’হাত কাঁধ তার কাঁধে রাখল।

“ইবরাত, তুই এসব কি করছিস? ভালোবাসা মানেই এই না নিজের আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দেওয়া। আত্মসম্মানের চেয়ে বড় কিছুই হয় না। কেন জোর করে নিজেকে ছোটো করছি? উই আর কুইন্স, অ্যান্ড উই ডিজার্ভ টু বি ট্রিটেড লাইক কুইন্স—নট ইনসাল্টেড।”
ইবরাত চোখের পানি মুখে ব্যথিত চোখে এলিজাবেথের দিকে তাকাল। অবুঝের মতো ঠোঁটে উল্টে বলল,
“কি করব বল? অনুভূতিকে তো আর খাঁচায় বন্দী রাখা যায় না। তুইও তো আগে এমন পাগলামিই করতি তোর না দেখা স্বামীর জন্য!”
পূর্বের প্রণয়ময় মুহূর্তগুলোর কথা মনে হতেই এলিজাবেথের চোখেমুখের রং বদলে গেল। মুখশ্রী উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে দোলা দিল একচিলতে আলোড়ন।
আলতো হেসে এলিজাবেথ বলল,
“একজন নির্দিষ্ট মানুষের জন্য বোধহয় বোকা, বেহায়া, নির্লজ্জ হওয়াও জায়েজ।”
ইবরাত হেসে ফেলল। কথাটা তার যু্ক্তির সঙ্গে খাপেখাপ খেয়েছে। সে প্রসঙ্গ পাল্টে দিল। এলিজাবেথের হাত ধরে তাকে রুমের ভেতর নিয়ে যেতে যেতে বলল,

“যাকগে, এসব কথা বাদ দে। কতদিন আমরা আড্ডা দিই না। তুই জানিস, সেদিন তোর বিদায়ের পর আন্টি উন্মাদের মতো কান্না করেছিল। আমরা কেউ আন্টিকে সামলাতে পারছিলাম না। আন্টি সত্যিই অনুতপ্ত রে।”
এলিজাবেথ হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। সপ্রশ্নে ইবরাতের দিকে তাকাল,”অনুতপ্ত মানে? কেন উনি কি করেছে?”
ইবরাত চোখ ছোটো ছোটো করে এলিজাবেথের দিকে তাকাল,”কি করেছে মানে? তুই কি সব ভু….” সে থেমে গেল। শুকনো ঢোক গিলল। একটু থেমে আবার বলল,”তোর ইমনের কথা মনে আছে?”
এলিজাবেথ মাথা নাড়ল,”হ্যাঁ, আমার ভাই।”
“আর মিসেস নীহারিকা, ইমাম ওয়াসিম?”
এলিজাবেথ দুই সেকেন্ড সময় নিয়ে বলল,”ইমান ওয়াসিম তো আমার বাবার নাম৷”
ইবরাতের কণ্ঠ ধীরে ধীরে সন্দিগ্ধ হচ্ছে,”মিসেস নীহারিকা?”
এলিজাবেথ থমকে যায়। মস্তিষ্কে চাপ দেয়। তবে উত্তর দিতে পারে না। ধীরে ধীরে তার মুখের রং বদলাতে শুরু করেছে। ইবরাতের মুখের রংও ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হতে থাকে। এলিজাবেথকে দ্বিধায় পড়ে যেতে দেখে ইবরাত দ্রুত আরেকটি প্রশ্ন করল,

“ইমামা, তোর গৌরবের ছোটো ভাইয়ের কথা মনে আছে? লাস্ট ইয়ার আমরা ওর বার্থডে পার্টিতে কতোই না এনজয় করেছিলাম।”
এলিজাবেথ এবার দ্রুতই উত্তর দিতে পারল,”হ্যাঁ, মনে আছে তো। নিউ ইয়ার ছিল সেদিন।”
ইবরাত হঠাৎ এলিজাবেথকে বুকে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে, অনেক শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এলিজাবেথও কিছু না ভেবে ইবরাতকে জড়িয়ে ধরল। এলিজাবেথের অজান্তেই ইবরাতের চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। গৌরবের কোনো ভাই নেই। সেদিন গৌরবের বোনের জন্মদিন ছিল!

পুলের এককোণে দাঁড়িয়ে রিচার্ড সিগারেট ফুঁকছিল।
তার সুগভীর ললাটে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে রিচার্ডের পেছনে এসে দাঁড়াল ন্যাসো।
ন্যাসো কিছু বলার আগেই রিচার্ডের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল, “আমি বলেছিলাম আমার সাথে যোগাযোগ না করতে। সময় হলে আমি নিজেই তোমাদের সাথে যোগাযোগ করতাম।”
রিচার্ডের এই অতিপ্রাকৃতিক সিক্সথ সেন্স নিয়ে ন্যাসো এখন আর অবাক হয় না। যার আইকিউ একশো আশির ওপর, স্রেফ পেছনের মানুষের শ্বাসের শব্দ শুনে তার উপস্থিতি টের পেয়ে যাওয়াটা তার জন্য ডালভাত। ন্যাসো নতজানু হয়ে রিচার্ডের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। অদ্ভুতভাবে তার ক্ষিপ্ত কণ্ঠস্বর মুহূর্তে খাদে নেমে নিখাদ পেশাদারিত্বে রূপ নিল,
“দুঃখিত, বস। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তবে নিশ্চিন্ত থাকুন, আমাদের লোকেশন কেউ জানে না। আমরা অত্যন্ত সতর্ক ছিলাম।”
রিচার্ড নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। ন্যাসোর চতুর বুদ্ধিমত্তা আর নিখুঁত গোপনীয়তার ওপর তার ভরসা আছে। শেষ হয়ে আসা সিগারেটের ফিল্টারটা পুলে ফেলে দিয়ে সে নতুন আরেকটি সিগারেট ধরাল। মৃদু স্বরে শুধাল,
“ফাদার কেমন আছেন?”

ন্যাসো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিচার্ডের দিকে তাকাল। লোকটার মরুভূমির মতো রুক্ষ ও ভাবলেশহীন মুখাবয়বে কোনো অনুভূতির ছাপ না মিললেও, কণ্ঠের গভীরে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগটুকু ন্যাসোর চোখ এড়াল না। কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! যার ওপর অভিমান করে আস্ত একটা সাম্রাজ্য ছেড়ে এসেছে, আজো তাকে নিয়েই মন পুড়ছে তার!
ন্যাসো মনে মনে হাসল। তারপর নিরেট, ঠাণ্ডা স্বরে বলতে শুরু করল, “আপনি ইতালি ছাড়ার পর ফাদার পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। আপনি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন—এটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। যার ফলে একটা মিনি হার্ট অ্যাটাকও হয়। চার দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। এরপর থেকেই আপনাকে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে নিজের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফাদার এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন যে পেপার, নিউজ, ম্যাগাজিন—সব জায়গায় আপনার নিখোঁজ সংবাদ দিয়েছেন। প্রথম প্রথম ক্রোধ আর জেদ থেকে এসব করলেও, ধীরে ধীরে আপনার শূন্যতা ওনাকে ভেতর থেকে চুরমার করে দিয়েছে। আপনাকে ছাড়া ফাদার বড্ড দুর্বল, বড্ড ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, বস।”

রিচার্ডের পাথুরে অভিব্যক্তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন দেখা গেল না। এর মাঝেই তার হাতের সিগারেটটিও শেষ হয়ে এসেছে। পরবর্তী সিগারেটটি ধরানোর আগে সে স্রেফ চোখের ইশারায় ন্যাসোকে চলে যেতে বলল। ন্যাসো নিঃশব্দে প্রস্থান করল। রিচার্ডের সমুদ্র-নীল চোখের দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল পুলের স্বচ্ছ স্থির পানিতে। পলকেই স্মৃতির স্রোত তাকে টেনে নিয়ে গেল পূর্বে,
ফাদার জানতেন না এলিজাবেথ কে, কিংবা কোথায় তার বাস। কিন্তু রিচার্ডের চোখে এলিজাবেথের প্রতি আসক্তি ওনার নজর এড়ায়নি। যে রিচার্ডকে তিনি নিজের হাতে ইস্পাত-দৃঢ় মানব হিসেবে গড়ে তুলেছেন, সেই রিচার্ড আজ অন্য কারও প্রতি দুর্বল হবে? ফাদারের চেয়ে অন্য কাউকে বেশি প্রাধান্য দেবে? এটা তার অহংকারে লেগেছিল। আর সেই ইগোর লড়াই থেকেই তার ভেতর ক্ষোভের আগুন জ্বলতে শুরু করে। শুরু হয় রিচার্ড আর ফাদারের নীরব ও শব্দহীন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। সেই ঠাণ্ডা যুদ্ধ ততদিনই স্থায়ী হয়েছিল, যতদিন না রিচার্ড বুঝতে পারল, ফাদার এবার তার সাথে পেরে না উঠে সরাসরি এলিজাবেথের ক্ষতি করার ছক কষছেন। নিজের উদ্দেশ্য হাসিলে ফাদার কতটা আত্মঘাতী আর নিষ্ঠুর হতে পারেন, তা রিচার্ডের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তাই সে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেনি। রুশ রমণীর অনিন্দ্য সুন্দর রূপে মুগ্ধ হয়ে, নিজের সাজানো সাম্রাজ্য ত্যাগ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আর তারপর থেকেই রিচার্ড এই পৃথিবীর বুকে এক নিখোঁজ, ফেরারীর নাম।
রিচার্ড সিগারেটের জ্বলন্ত লাল অংশের দিকে তাকাল। তার মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা। সেদিন ফাদারের চোখেও ঠিক এমনই আগুন জ্বলছিল। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে ফাদার চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, “ওই মেয়ে তো আর এখন তোমার জীবনে নেই! তাহলে কেন এসব করছ? এখনও সময় আছে রিচার্ড, ফিরে এসো!”
তখন রিচার্ডের ইস্পাত-কঠিন উত্তর ছিল,”ওই মেয়েই আমার জীবন।”

সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বিলাসবহুল শপিং মল বানহোফস্ট্রাসের সামনে এসে থামল তিনটি কালো মার্সিডিস। প্রথম গাড়ির ফ্রন্ট ডোর খুলে ড্রাইবিং সিট থেকে নেমে এলো রিচার্ড। নেমেই সে লম্বা কদমে এগিয়ে গিয়ে অতি সংবেদনশীলভাবে দ্রুত অপজিট ডোর খুলে দিল। ভেতর থেকে আলতো হেসে নেমে এলো এলিজাবেথ। হাত রাখল রিচার্ডের ড্রাগনের ট্যাটু খচিত বাঁ-হাতের আঙুলের ভাঁজে। তারপর দু’জন শপিং মলের ভিআইপি এন্ট্রান্সের অভিপ্রায়ে পা বাড়ায়। এরপর শব্দ করে খুলে গেল তৃতীয় গাড়ির ডোর। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো লুকাস। নেমেই সে কুচকুচে কালো থ্রি-পিস স্যুটটা পেটের দিক দিয়ে একটু টেনে নিল। উদ্দেশ্য একটাই, তার ফোলা ভুঁড়িটা যেন একটু নিচু দেখায়। লুকাস হেঁটে সামনে আসতেই দ্বিতীয় গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো ন্যাসো। সে নামচেই রোদের তীব্রতায় ঝলমলিয়ে উঠল তার বাদামী চোখের মনি। অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে চোখের রোদ চশমা ঠিক করতে করতে তারা সামনে এগিয়ে গেল।

মুরব্বিরা বলে থাকেন—ভোজনরসিক পুরুষ মানুষের সঙ্গে কখনো বাজারে, আর সৌখিনতাপ্রিয় নারীর সঙ্গে কখনো শপিং মলে যাওয়া উচিত নয়। কেন উচিত নয়, তার কারণ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বিজনেস টাইকুন রিচার্ড কায়নাত দুই ঘণ্টা ধরে সে ট্রায়াল রুমের সামনের একটি সোফায় বরফশীতল মুখে বসে আছে। তার চিরায়ত গুরুগম্ভীর মুখে আজ ক্লান্তির ছাপ বেশ স্পষ্ট ভাবেই ফুটে উঠেছে। মিনিট পাঁচেক পরপরই এলিজাবেথ নতুন নতুন পোশাক পরে বেরিয়ে আসছে। কখনো স্নিগ্ধ সাদা গাউনে, কখনো কালো বডিকনে, কখনো বা ঝলমলে ইভনিং ড্রেসে। আর তারপর কখনো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, কখনো দুহাত ছড়িয়ে নিজেকে দেখাচ্ছে, আবার কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিচার্ডের মতামত জানতে চাইছে। আর রিচার্ড? বুকের ভেতরের উসখুস আর বিরক্তিকে কোনোমতে চাপা দিয়ে প্রতিবারই ঠোঁটে হাসি টেনে জানাচ্ছে,
“ইয়্যু লুক অ্যাবসলিউটলি স্টানিং, হানি।”

কিন্তু এলিজাবেথের যেন কিছুতেই মন ভরছে না। একটার পর একটা… এভাবে পঁচিশটি পোশাক ট্রায়াল দেওয়ার পর তার মাত্র পছন্দ হচ্ছে মাত্র দুটি। এভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। রিচার্ডের মনে হলো, ব্যবসায়িক জীবনে হাজারো সংকট সামলালেও ধৈর্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটা সম্ভবত আজই দিচ্ছে সে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা পর অবশেষে এলিজাবেথের কেনাকাটা শেষ হলো। কিন্তু আসল বিপত্তি বাধল বিল পরিশোধের সময়। শপিংয়ের উচ্ছ্বাসে কখন যে সে এত কিছু কিনে ফেলেছে, তা নিজেও টের পায়নি। ক্যাশিয়ারের হাতে বিলটা দেখে শূন্যের পর শূন্য গুনতেই তার চোখ প্রায় কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো।
“এ-এত!”
বিব্রত মুখে সে কিছু ড্রেস আর কিছু জুয়েলারি আলাদা করে রেখে দিতে উদ্যত হতেই রিচার্ড ক্ষিপ্ত মুখে এক ঝাটকায় তার হাত থামিয়ে দেয়। অতঃপর অবিশ্বাস্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্ল্যাক কার্ড পিওএস মেশিনে ঢুকিয়ে, সামান্য ঝুঁকে গেল এলিজাবেথের কানের কাছে,
“আপনার দায়িত্ব শুধু টাকা উড়ানো, মাথা ঘামানো নয়। হিসেব কষে চলা আমার একদমই পছন্দ নয়। আমার পরিশ্রম আপনার বিলাসিতার জন্যই।”

দীর্ঘক্ষণ ধরে ইবরাতকে দেখতে না পেয়ে ন্যাসো এবার একটু অবাকই হলো বটে। মেয়েটা সারাক্ষণ তার পিছুপিছু লেজ ধরে ঘুরতে থাকে। এখন এতগুলো ঘন্টা পার হয়ে গেল, অথচ একবারের জন্য তার ছায়াও দেখা গেল না? বিষয়টা কেন যেন সে হজম করতে পারল না। গাড়ি থেকে নামার পূর্বে সে ইবরাতকে তার কার্ড ধরিয়ে দিয়ে এসেছে। সে এই বিচ্ছু মেয়ের সাথে মার্কেট ঘুরে ঘুরে কখনোই শপিং করবে না। সেজন্যই আগেভাগে ওকে কার্ড ধরিয়ে দিয়ে লুকাসের সঙ্গে চলে এসেছিল সে৷
কিছু একটা ভেবে ন্যাসো আবার পার্কিংলটে গেল। গাড়ির কাছে যেতেই বিস্ময়ে তার পা দু’টো জমে গেল। ইবরাত গাড়ির ভেতরে বসে আছে! তখন ঠিক যেভাবে, সেখানে বসে ছিল, এখনও ঠিক একই জায়গায় কলের পুতুলের মতো নিশ্চল বসে আছে। পার্থক্য শুধু গালে। চুপসে থাকা গাল দু’টো ফুলে আছে, যেন গালের ভেতর বেলুন দেওয়া। ন্যাসো লক্ষ করল, মেয়েটার চোখ দু’টো অসম্ভব লাল! পাকা কাশ্মীরি আপেলের মতো লাল! তবে কি এতোক্ষণ ধরে ইবরাত কান্না করেছে? কিন্তু কেন?
ন্যাসো আকষ্মিক বিষ্ময়কর ভাব কাটিয়ে মুখে প্রস্তরখচিত কঠোরতা নিয়ে খোলা উইন্ডোর কাছে এগিয়ে গিয়ে ধমকে উঠল,

“এই মেয়ে, তুমি এখনও গাড়িতে কি করছ?”
চটপটে এবং ছটফটে ইবরাতের কাছ থেকে আজ সাড়া আসে না। বুলেটের গুলি মিস হলেও যার কথারঢং কখনো মিস হয় না, সেই মেয়েটা আজ এত চুপ? ন্যাসো ভেতরে ভেতরে কিঞ্চিৎ অবাক হলো। আবার ধমকাল,
“কি হলো? কথা বলছ না কে?”
হঠাৎ ইবরাত ফ্যাৎফ্যাৎ করে কেঁদে দিল। শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল, নাকের জল এক করে বলল,” আপনি আমার জন্য ডোর খুলে দেননি কেন?”
ন্যাসোর কপালে ভাঁজ পড়ল, বাদামী রঙা চোখ দুটো সরু হয়ে এলো,”হোয়াট? তারমানে এতোক্ষণ তুমি গাড়িতেই ছিলে?”
ইবরাত খুব জোরে নাক টেনে অকস্মাৎ চেঁচিয়ে উঠল,”হ্যাঁ, হ্যাঁ…..হ্যাঁ ছিলাম৷ আপনি আমার জন্য ডোর ওপেন করেননি কেন? হোয়াই? আমি কালো বল?”
“হোয়াট দ্য হ্যাক,” ন্যাসো চমকায়, থমকায়, আশ্চর্য হয়,”এখানে সাদা-কালোর প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? আর ইয়্যু ইনসেইন?”
ইবরাত প্রজ্বলিত ক্রোধ কাঁপতে কাঁপতে অগ্নিমূর্তি রূপে ন্যাসোর দিকে তাকাল, তেজস্বিনীর ন্যায় জ্বলে উঠল,”একদম ইংরেজি মারাবেন না। মুখে একেবারে ঝাঁটা ঘষে দেব। জানেন না কুইনদের কীভাবে ট্রিট করতে হয়? না জানলে আপনার বসের কাছ থেকে শিখে আসবেন।” আক্রোশে মেয়েটার ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে।
এহেন প্রচলিত বাংলা এবং অদ্ভুত কথাবার্তায় ন্যাসোর মুখ বিকৃত হয়ে আসে। সে অবাক হয়ে জানতে চাই,”কুইন! কে কুইন?”

ইবরাত সর্গভে বলে,”আমি কুইন ৷ আপনার ওয়াইফ—ইবরাত বেহরোজ।”
ন্যাসো তাচ্ছিল্য করে হেসে উঠল,”ডু ইয়্যু ইভেন নো দ্য ট্রু মিনিং অব আ কুইন? আ কুইন নেভার ফোর্সেস এনিওয়ান। শি নেভার ট্র্যাপস এনিওয়ান। শি ইজ চোজেন, নট বেগড ফর।”
কথাগুলো ন্যাসো উইন্ডো মিররের উপর ঝুঁকে বলছিল। হঠাৎ ইবরাত ন্যাসোর কলার খামচে ধরল। চোখে চোখ রেখে বলল,”আমি এতশত বুঝি না। বুঝতেও চাই না। শুধু জানি, আপনি আমার। আমার ভালোবাসা। আর পুরোটাই আমার। আর একটাও জানি, একদিন আপনিও আমাকে ভালোবাসবেন। আমাকে কাছে টানবেন, আদর করে বুকে আগলে রাখবেন। ফুল দিবেন।”
ন্যাসো ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল,”হ্যাঁ, ফুল দিব তো। তোমার কবরে।”
লোকটার চোস্ত জবাবে এবার ইবরাত সত্যি সত্যিই আঘাত পেল। অদৃশ্য যন্ত্রণা মুষড়ে পড়ল রমণীর নাজুক হৃদয়ে।অন্তঃসারশূন্য হয়ে ইবরাত কিছুক্ষণ বুদ্ধিভ্রংশের মতো স্থির চোখে ন্যাসোর নিরাসক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তাও আসবেন আমার করবে, দু’হাত ভরে ফুল নিয়ে৷”

ন্যাসো কিছু বলতে যাবে, সেই মুহূর্তেই পেছন দিক থেকে ভেসে এল একসঙ্গে কয়েক জোড়া পদধ্বনি। সে ঘুরে তাকাতেই দেখল রিচার্ড আর এলিজাবেথ মলের ভেতর বেরিয়ে আসছে। তাদের পেছনে সারিবদ্ধভাবে হাঁটছে কয়েকজন গার্ড। প্রত্যেকের হাতই শপিং ব্যাগে ভর্তি। এলিজাবেথের আউটফিটে ছিল অনাড়ম্বর। কালো ট্রেঞ্চ কোটের অন্তরালে তার ধনুকের মতো বাঁকানো মসৃণ দেহরেখায় নিখুঁতভাবে জড়িয়ে ছিল একটি ব্ল্যাক ফিটেড টার্টলনেক টপ। নিচে ডার্ক ব্লু হাই-ওয়েস্ট ওয়াইড-লেগ জিন্স, সঙ্গে স্লিম ব্ল্যাক জেনুইন লেদার বেল্ট। চোখে ছিল কুচকুচে কালো সানগ্লাস, আর লালচে কার্ল করা চুলগুলো আলগোছে পিঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

আজ রিচার্ডও নিজের স্বভাবসুলভ অভিজাত ক্লাসিক লুকেই ধরা দিয়েছে। ব্ল্যাক টেইলর্ড ট্রাউজারের সঙ্গে পরেছে ব্ল্যাক রিবড নিট পোলো শার্ট। কোমরে ব্ল্যাক জেনুইন লেদার বেল্ট আর বলিষ্ঠ কবজিতে স্টেইনলেস স্টিল ব্রেসলেট ওয়াচ। ব্ল্যাক রেক্ট্যাঙ্গুলার অপটিক্যাল ফ্রেমটি শার্টের কলারে ঝুলছে। তবে তার পরিপাটি, স্মার্ট উপস্থিতির চেয়েও বেশি নজর কাড়ল অন্য একটি দৃশ্য। এক হাতে সে অনায়াস ভঙ্গিতে ধরে রেখেছে এলিজাবেথের হিল জোড়া, আর অন্য হাতে কয়েকটি শপিং ব্যাগ।
হঠাৎ দূর থেকে রিচার্ডের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ন্যাসোর ওপর। সে লম্বা কদমে এগিয়ে এসে ন্যাসোর সামনে দাঁড়াল। একবার তাকাল ইবরাতের ভেজা চোখের দিকে, তারপর ধীরে চোখ তুলে দৃষ্টি স্থির করল ন্যাসোর মুখে। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বরফশীতল কণ্ঠে বলল,

Born to be villains part 28

“এ জেন্টলম্যান নোজ হাউ টু ট্রিট আ ওম্যান। আই নো ইয়্যু নো দ্যাট, নেসো।”
এরপর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না রিচার্ড। ন্যাসো নির্বাক চোখে তাকিয়ে দেখল রিচার্ড কত দ্রুত এগিয়ে গেল ডোর খুলে দেওয়ার জন্য। তারপর এলিজাবেথ যখন ভেতর গিয়ে বসল, তখন সে সমস্ত পুরুষতান্ত্রিক অহং এক চুটকিকে উড়িয়ে দিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল পার্কিংলটে এবং সন্তপর্ণে হিল জোড়া পরিয়ে দিল এলিজাবেথের পায়ে।
ন্যাসো কিছুক্ষণ সেখানে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকল। শুকনো ঢোক গিলল। অতঃপর হাত বাড়াল ডোর খোলার জন্য!

Born to be villains part 30

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here