Home Born to be villains Born to be villains part 27

Born to be villains part 27

Born to be villains part 27
মিথুবুড়ি

ব্যাপারটা দারুণ না? ঘুম ভাঙার পর আপনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন স্বপ্নের দেশ তুরস্কে! তাও আবার ইস্তানবুলের মতো এক জাদুকরি শহরের বুকে—রুফটপ গালাটায়। যেখান থেকে পাখির চোখে অবলোকন করা যায় পুরো ইস্তানবুলের অপার সৌন্দর্য। আজ এলিজাবেথের সকালটাও ঠিক এভাবেই শুরু হয়েছে। চোখ মেলতেই তার সামনে ধরা দিল এক টুকরো স্বর্গ। সোনালি রোদে ঝলমল করছে চারপাশের ছাদগুলো। একটু দূরেই দিগন্ত ছুঁয়ে বয়ে চলেছে নীলাভ বসফরাস প্রণালী। আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে সাদা সীগালের দল। সীগাল দলের ডানার ফাঁক গলে শীতল হওয়ায় ভর করে দূর মিনার থেকে ভেসে আসছে ভোরের আজানের সুমধুর সুর। বসফরাসের দিক থেকে ভেসে আসা বাতাস এলোমেলো করে দিচ্ছিল এলিজাবেথের গৌধুলিরঙা কেশরাশি। তার ঘুম জোড়ানো চোখের মুগ্ধতা কাটে না। সে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে থাকে ইস্তানবুলের অপার্থির সৌন্দর্যের দিকে।

হঠাৎ করেই এলিজাবেথের দৃষ্টি নিজের দিকে ঘুরে গেল। তাকিয়ে দেখল তার পরনে এখনও বিয়ের জমকালো লেহেঙ্গা। তবে গায়ের ভারী গহনাগুলোর একটাও আর অবশিষ্ট নেই। মাথার চুলগুলোও বেশ এলোমেলো। চুলের দিকে তাকাতেই প্রাইভেট জেটের ভেতরের পাগলামির মুহূর্তগুলো এক এক করে মনে পড়তে লাগল। কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতার খুশিতে এলিজাবেথ বোধহয় সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিল! তখন তার মনের ভেতর ঠিক কী চলছিল, তা সে নিজেও জানে না। সেদিন খুশিতে একদম উন্মাদ হয়ে নেচেছিল এলিজাবেথ। বিপরীতে রিচার্ড? সে শুধু ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল তার নববধূর এই উন্মত্ত রূপ।
তখন ফোনের ফুল ভলিউমে গান বাজছিল,
❝ও আমার বিলেত রাজা
প্রেমেরই ডালা সাজা
কাছে আয়, খেলব আজ
তোর মনেরই মাঠে…
কুত কুত কুত…..❞

গানের চটুল তালে তালে ভারী লেহেঙ্গা পরেই হেলেদুলে মাতাল নাচে মেতে উঠেছিল এলিজাবেথ। সে সময় নিজের হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণই হারিয়ে ফেলেছিল এলিজাবেথ। নাচতে নাচতে হাতের চুড়িগুলো একে একে খুলে ফেলছিল।আর জলসার আসরে যেভাবে টাকা ওড়ানো হয়, ঠিক সেভাবে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে সেগুলো ছুড়ে মারছিল রিচার্ডের গায়ে। সাধারণত পুরুষেরা নারীর ওপর টাকা ওড়ায়, কিন্তু এখানে পুরো বিষয়টাই উল্টো ঘটছিল। অবশ্য উল্টো হলেও দৃশ্যটা ছিল দারুণ উপভোগ্য। কখনো কখনো তো রিচার্ডের মুখের ওপর ঝুঁকে আসে, হিল দিয়ে বুকের ওপর চেপে ধরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গান গায়!
রিচার্ড এলিজাবেথকে ভীষণ শান্ত আর লাজুক স্বভাবের মেয়ে বলেই জানত। কিন্তু সেদিন জেটের ভেতর সে এলিজাবেথের সম্পূর্ণ অন্য এক রূপ দেখেছিল। আর সেই বন্য, চঞ্চল রূপটাই তাকে নতুন করে মোহিত করেছিল। সে জেটের সবচেয়ে বিলাসবহুল আসনটায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে, ঠোঁটের কোণে একচিলতে চাপা হাসি নিয়ে উপভোগ করছিল এলিজাবেথের নাচ।

নাচতে নাচতে এলিজাবেথ হঠাৎ টেবিল থেকে একটা বিয়ারের বোতল তুলে নেয়। তারপর দাঁতের ফাঁকে কর্কটা চেপে ধরে দিল এক হেঁচকা টান। কর্কটা খুলে আসতেই ভেতর থেকে ফেনিল বিয়ার উপচে পড়তে লাগল। ফেনার একটা বড় অংশ ছিটকে গিয়ে পড়ে রিচার্ডের স্যুটের ওপর। কিন্তু তাতেও সে বিন্দুমাত্র বিরক্তি প্রকাশ করল না। উল্টো সে উঠে সন্তপর্ণে এলিজাবেথের গা থেকে ভারী গহনাগুলো একে একে খুলে দিতে লাগল। কারণ ভারী গয়নার কারণে এলিজাবেথের নাচতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল।
এই সুযোগে এলিজাবেথ বিয়ারের বোতলটা এক চুমুকে পুরো ফাঁকা করে দিল। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সামান্য বিয়ার খেয়েই ওর ওপর বেশ কড়া নেশা চড়ে বসল। তার নাচের গতি আর অঙ্গভঙ্গি এবার আরও উন্মত্ত, আরও বেপরোয়া হলো। রিচার্ড স্যুটের ভেতর থেকে এক বান্ডিল ডলার বের করল। তারপর এলিজাবেথের চারপাশে ঘুরে ঘুরে তার ওপর ডলার ওড়াতে লাগল। এলিজাবেথ তখন সব ভুলে গানের তালে তালে এলোমেলো ভঙ্গিতে নাচেই মগ্ন। একপর্যায়ে তো সে মাথার ওড়নাটা টেনে খুলে শক্ত করে বেঁধে নিল নিজের কোমরে। তারপর আবারও নাচে গানের তালে তালে,

❝গোলাপি চোখে জাদু…
আকাশী গাল আমার,,
রেডি বসে আছি, হবো রাণী তোমার…
আরে আয়না হ্যান্ডসাম, প্রেমের অ্যান্থাম…❞
তখনের কথা মনে হতেই এলিজাবেথ লজ্জায় মুখ লুকোনোর জায়গা খুঁজল। জায়গায় না পেয়ে রুফটপ থেকে ছুটে ভিলার ভেতর গেল। পুরো ভিলায় দৃষ্টি ছড়িয়েও রিচার্ডকে কোথাও খুঁজে পেল না। সাদা রঙের ভিলা টি সম্পূর্ণ ফাঁকা। এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো টেবিলের উপর। দেখতে পেল বড়ো সাইজের একটি শপিং ব্যাগ। কৌতুহল নিয়ে এলিজাবেথ সেদিকে এগিয়ে গেল। রমণীর সুশ্রী কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। আগ্রহ নিয়ে সে শপিং ব্যাগে হাত রাখল। তাকে রীতিমতো বিস্ময়ে আচ্ছন্ন করে দিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো বিশাল একটি রেড ভেলভেট গাউন। ভীষণ চমকে গিয়ে এলিজাবেথ ব্যাগের ভেতর চিরকুট খুঁজল। তবে পেল না। চিরকুট খুঁজতে গিয়ে দৃষ্টি গেল ব্যাগের পাশে। ছোটো একটি রিং বক্স রাখা। এলিজাবেথ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বক্সটি হাতে তুলে নিল। ভেতরে দু’টো চকচকে গোল্ড ব্যান্ড রিং রাখা৷ সাথে ছোট্টো একটি চিরকুট। যাতে গুটগুট করে লেখা ছিল,
“Get ready for your husband”
হ্যাসবেন্ড শব্দটা কিছুক্ষণের ঠোঁটের আগা থেকে সরতে দিল না এলিজাবেথ। আচ্ছন্ন বিস্ময়ের আবরণ থেকে বেরিয়ে এসে এবার তার পলাশরাঙা ঠোঁটে ফুটে উঠল লাজভরা হাসি৷ সে রিং পরতে গিয়েও পরল না। রেখে দিল লোকটার জন্য। একটি বিশেষ মুহুর্তের জন্য! তারপর শপিং ব্যাগ নিয়ে চলে গেল রুমে— তার হাসবেন্ডের জন্য তৈরি হতে!

সূর্যের আলো যখন ইস্তানবুলের বুকে কিরণ ছড়াতে ব্যস্ত, তখন ভিলায় ফিরে রিচার্ড। রুমে পা রাখতেই তার হৃদপিণ্ড থমকে যায়। জমাট বাধা ভারি সীসায় যেন পা আঁটকে যায়। নিঃশ্বাসে টান পড়ে। ইস্পাত-কঠিন স্নায়ুও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে আসে। রিচার্ডের দৃষ্টি পেছন থেকে এলিজাবেথের ওপর স্থির হতেই হৃদয় যেন নিঃশব্দে বলে করে উঠল,
❝My Mashooqa❞
“Beauty is pain”
রুশরমণীর অপরূপ সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আজ কথাটার সত্যতা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করল রিচার্ড। পাঁজরের হাড়ের ফাঁকে ফাঁকে যে চিনচিনে ব্যাথা উঠেছিল, তা আলগোছে উপেক্ষা করে নৈঃশব্দ্যে রিচার্ড এগিয়ে গেল। কারোর উপস্থিতি টের পেয়ে এলিজাবেথ চমকে চকিতে পিছন ফিরে তাকাল। রিচার্ডকে দেখতে পেয়ে ঠোঁট গোল করে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। হাঁফ ছেড়ে বলল,
“আপনি? আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।”

রিচার্ডের চোখের চাহনি তখন ভীষণ নরম, তেমনি আদ্র কণ্ঠ,”আমি থাকতে আপনার কীসের ভয়?”
ঘুমন্ত শিশুর ওপর যেভাবে অতি সাবধানে, নৈঃশব্দ্যে ঝুঁকতে হয়, ঠিক সে-ভাবে রিচার্ড ঝুঁকে গেল এলিজাবেথের কানের পাশটায়। তার তপ্ত নিঃশ্বাসে রমণীর কানের লতিতে যে লালচে ভাব ছড়িয়ে দিয়েছিল, সেই লালচে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁই-ছুঁই করে সে বলল,
“আমি আছি তো।”
ক্ষণিকের বিদুৎস্পর্শে নারীকায়ার প্রতিটি কোণে কোণে শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। জাফরের রঙে রাঙা হয় এলিজাবেথের মুখ। সে দৃষ্টি নত করে মুখ ফিরিয়ে নিল। আঁইটাঁই করতে করতে কোনোরকমে আওড়ায়,
“আ–আমাকে কেমন লাগছে?”
রিচার্ডের প্রত্যুত্তর ছিল তাৎক্ষণিক,”একদম আমার হৃদয় থমকে দেওয়ার মতো সুন্দর।” তারপর আবারও সেই একই পদ্ধতি অবলম্বন করে কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করল,”আমাকে পাগল করার মতো সুন্দর। এতো ভয়ংকর রূপ নিয়ে সামনে আসবেন না, মিসেস কায়নাত। ওর্য়ান করছি। পরে কিন্তু অল্প বয়সে লাল ছেড়ে সাদা রঙকে সঙ্গী করতে হবে।”

এলিজাবেথ গাউনের এক অংশ শক্ত করে খামচে ধরল। তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়। সে নিজের আড়ষ্ট ভাব কাটানোয় জন্য ঘুরে যায়। সমগ্র নারীকায়াজুড়ে যে কম্পন সৃষ্টি হয়েছে, তা লুকানোর খুচরো অজুহাত হিসেবে লিপস্টিক তুলে নিল। তারপর ঠোঁটে দিতে যাবে, ওমনি রিচার্ড তার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। বাধা দিল। যে হৃদয় কখনো টলেনি, সেই পুরুষালী দৃঢ় হৃদয়টাও এখন টলছে। রিচার্ড শুকনো ঢোক গিলে। জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভেজায়। তারপর বড্ড অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“আর না। এবার মরেই যাবো।”
এলিজাবেথ থমকে যায়। বিস্ময়ে চোখদুটো একটু বড় হয়ে ওঠে। তাদের প্রেমের এক অংশ বেঁচে ছিল মুঠোফোনের ওপারে, আর বাকি অংশ পত্রকন্যা আর পত্রপুরুষের অক্ষরে অক্ষরে। তবে এই মানুষটাকে কখনো এতটা প্রেমিক পুরুষ বলে মনে হয়নি, যতটা এই মুহূর্তে হচ্ছে। ঠিক এমন একজনকেই তো সে চেয়েছিল। যে ভালোবাসার বড় বড় দাবি করবে না। ভালোবাসি শব্দটাও হয়তো উচ্চারণ করবে না। অথচ নিজের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি দৃষ্টিতে, প্রতিটি স্পর্শে তাকে উন্মাদের মতো ভালোবেসে যাবে। লোকটা কি তবে তার মনের গহীনেও উঁকি দিতে পারে? নাকি তাদের দু’জনের হৃদস্পন্দনও বিয়ের মতো একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একই ছন্দে বাঁধা পড়েছে?

“আপনি আমাকে ম্যানুপুলেট করছেন।”
রিচার্ডের কালচে ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটে। সে ভ্রু-জোড়া কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করে,”যেখানে আপনি পুরোটাই আমার, সেখানে ম্যানুপুলেশনের কথা আসছে কেন?”
“আমি যে আপনার, সেটা বার বার মনে করিয়ে দিতে হয় কেন?”
“যাতে ভুলে না যান৷”
“যদি কখনো ভুলে যাই?”
“তখন আবার ম্যানুপুলেট করব।” চোখ টিপল রিচার্ড।
এলিজাবেথ দৃষ্টি শক্ত করে৷ কিন্তু পরক্ষনেই শিশুর মতো উচ্ছাসে ফেটে পড়ে বলল,”আমরা তুর্কি আছি?”
রিচার্ড সেই অনড় দৃষ্টি এখনো ভাঙেনি। না ভেঙেই মাথা নাড়ায়। মুহুর্তেই বসন্তের মতো প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠল এলিজাবেথ। বুনো হাওয়ার মতো ছুটে বেড়াতে ইচ্ছে হলো।
বুকভরা উচ্ছ্বাসে দুলে ওঠে বলল,

“এটা তো আমার ড্রিম ছিল।”
“আমারও।”
এলিজাবেথ থমকায়, সপ্রশ্নে রিচার্ডের
দিকে চায়,”আপনারও?”
পুরুষটির কণ্ঠ তার চিন্তাধারার মতো ভীষণ কোমল শুনালো,”আপনার ড্রিম পূরণ করা আমার স্বপ্ন৷”
এবার এলিজাবেথ সত্যিই ভীষণ লজ্জা পেল। তনুমনে পুলক ছড়িয়ে পড়ল। নাকের ডগাও রঙিন হলো। তা দেখে রিচার্ড ঠোঁট কামড়ে আলতো হাসল। মেয়েটাকে আরেকটু কোনঠাসা করতে ঝুঁকে যায় মেয়েটির ওপর।
“গালে কি দিয়েছেন? খুব চকচক করছে।”
এলিজাবেথ হাঁসফাঁস করে। ঘাড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে নেয়। কাচুমাচু ভঙ্গিতে বলে,”ব্লাশ দিয়েছি।”
“বেশ লাগছে তো। একটা চুমু খাই?”
এলিজাবেথ শুষ্ক ঢোক গিলে। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে, “নো।”
“হু ফাকিং কের্য়াস! ইয়্যু আর মাই ল’ফুল ওয়াইফ।”

অর্তকিতে দু’টো চুমু বসিয়ে দিল এলিজাবেথের রক্তিম গালে৷ এলিজাবেথের যেন মরি মরি ভাব। বুকের ভেতর বেসামাল ঝড় উঠেছে। এই লাজুক অনুভূতি আর লোকটার একগুয়ে দৃষ্টি থেকে সে পালানোর চেষ্টা করল। ছুটে পালাতে চাইলে রিচার্ড পিছন থেকে ওর হাত আঁকড়ে ধরল৷ কিছু বলতে যাবে, এমন সময় তার দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল এলিজাবেথের কাঁধে। স্লিভলেস গাউন হওয়ার দরুন সম্পূর্ণ কাঁধ উন্মুক্ত ছিল। আর সেই উন্মুক্ত কাঁধে পুরোনো একটি পোড়া দাগ। সঙ্গে সঙ্গে রিচার্ড এলিজাবেথের হাত ছেড়ে দিয়ে ওকে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। শক্ত করে চেপে ধরল এলিজাবেথের চিবুক। এলিজাবেথ চমকে উঠল। কাঁপল। এই প্রথম লোকটার স্পর্শে হিংস্রতা টের পেল সে। রিচার্ডের হাতের চাপ ক্রমশ বাড়ে। নীল মনির পাশের সাদা অংশ রক্তলাল হয়। সে দাঁতে দাঁত পিষে চিড়বিড়িয়ে ওঠে,

“এটা কি করে?”
রিচার্ডের তুঙ্গস্পর্শি হুংকারে এলিজাবেথ কেঁপে উঠল। কাঁপতে কাঁপতে তাকাল নিজের কাঁধের দিকে। পোড়া দাগটির দিকে তাকাতেই তার চোখের কোণ যন্ত্রণামাখা অশ্রুতে ভরে উঠল। তার দৃষ্টি নুইয়ে পড়ল। এলিজাবেথের
এই নীরবতা রিচার্ডকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলল। সে আবারও গগনবিদারী চিৎকারে গর্জে উঠল,
“আন্সার মি ড্যামেট।”
এলিজাবেথের কণ্ঠ ঝড়ে দুলতে থাকা প্রদীপশিখার মতো থরথর করে,”ছোট্ট বেলায় ভাইকে ফেলে দিয়েছিলাম, তাই মা ইস্ত্রি দিয়….
এলিজাবেথকে বাকি কথা সম্পূর্ণ করতে দিল না রিচার্ড। হঠাৎ সে এলিজাবেথের গাল ছেড়ে দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে এলিজাবেথ ঝোড়ো হওয়ার ছুটে গিয়ে রিচার্ডকে পেছন থেকে জাপ্টে ধরল।
“কোথায় যাচ্ছেন।”

এলিজাবেথের আঁকড়ে ধরাতেও রিচার্ড থামল না। ক্রোধ তখন তার সম্পূর্ণ সত্তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। চাপা স্বরে বলল,
“ইমান ওয়াসিমের ওয়াইফের সাথে বোঝাপড়া করতে।”
“উনি আমার মা।”
রিচার্ড ঘুরে দাঁড়িয়ে এলিজাবেথ দু’কাঁধ ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে উঠল,”আর আপনি আমার ওয়াইফ। রিচার্ড কায়নাত তার ওয়াইফের অবমাননা কখনোই মেনে নিবে না।”
এলিজাবেথ সামনে থেকে রিচার্ডকে জড়িয়ে ধরল। তাকে শান্ত করতে ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল,”প্লিজ শান্ত হোন মি.কায়নাত। সেই কালো অতীতে আমি আর ফিরতে চাইনা।”

রিচার্ড অনুভব করল এলিজাবেথের সংস্পর্শে তার পৈশাচিক সত্তাজুড়ে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা তীব্র ক্রোধ আর হিংস্রতা বৃক্ষপটের মন্থর শিথিলতায় ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। সে ঠোঁট গোল করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ল কিছুক্ষণ। আগ্নেয়গিরির উত্তাপ ছড়ানো নিঃশ্বাস লুলু হাওয়ার মতো নির্গত হলো তার কণ্ঠগহ্বর হতে। রিচার্ড হাত রাখল এলিজাবেথের মাথার পেছনে। তার কণ্ঠে অকারণ অনুশোচনার রেশ,
“স্যরি ওয়াইফি।”
“স্যরি কেন?”
“আপনার জীবনে এতো দেরি করে আসার জন্য।”
এলিজাবেথ অবোধ নয়নে রিচার্ডের দিকে তাকাল,”আরও আগে আসলে কি করতেন?”
“জানি না। তবে এই দাগ পড়তে দিতাম না।”

তুর্কির প্রথম সকালের প্রথম ব্রেকফাস্ট তারা সেরে নিল রুফটপ গালাটাতে। খাবার পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো এলিজাবেথের ছবি তোলার পর্ব। তুর্কি বরাবরই এলিজাবেথের স্বপ্নের দেশ ছিল। আর তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি ছিল রুফটপ গালাটাতে রাজকীয় রেড ভেলভেট গাউন পরে মনের মতো ফটোশুট করা। আর তার স্বপ্ন পূরণে যাতে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন না ঘটে, সেজন্য রিচার্ড আগেভাগেই পুরো রুফটপ বুক করে নিয়েছিল। সেখানে তখন এলিজাবেথ, রিচার্ড এবং একজন দক্ষ পেশাদার ফটোগ্রাফার ছাড়া আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি ছিল না। রিচার্ড বরাবরই ফটোগ্রাফিতে অনাগ্রহী এবং ভীষণ অনভ্যস্ত। এই কারণেই বাধ্য হয়ে তাকে ফটোগ্রাফার ভাড়া করতে হয়েছে। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে রিচার্ডের ভেতরের প্রেমিক পুরুষটার বুকে অদ্ভুত হিংসার দাবানল জ্বলে উঠতে শুরু করল। তার চোখের সামনে তার রূপসী রুশ রমনীর এই মোহনীয় সৌন্দর্য অন্য কোনো পুরুষ ক্যামেরার লেন্সে বন্দি করছে, ব্যাপারটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।

এলিজাবেথ তখন রুফটপের ভাসমান দোলায় বসে ছবি তোলায় মগ্ন। চারপাশে একঝাঁক সিগাল ডানা ঝাপটে উড়ছে। সকালের মিষ্টি বাতাসে ঢেউ খেলছে তার লাল গাউনের নিচের অংশ। ক্যামেরাম্যান তখন সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সাইড এঙ্গেল থেকে এলিজাবেথের অপার্থিব সৌন্দর্য ফ্রেম বন্দি করছিল। আর তখুনি রিচার্ডের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকু ভেঙে গেল। হঠাৎ করেই সে গিয়ে দাঁড়াল ক্যামেরাম্যানের সামনে। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিচার্ড ক্ষিপ্র হাতে তার থেকে ক্যামেরাটা ছিনিয়ে নিল তারপর ধাক্কা দিয়ে তাকে পেছনে ফেলে দিল। বেচারা ফটোগ্রাফার সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে একেবারে নিচে গিয়ে আছড়ে পড়ল। ওদিকে পোজ দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকা এলিজাবেথ রিচার্ডের এই আকস্মিক এবং কিশোরসুলভ হিংসাপরায়ণ কাণ্ডের টেরও পেল না। হুট করে সামনে কাউকে না দেখে সে কিছুটা অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“মি. কায়নাত, ফটোগ্রাফার কোথায়?”
রিচার্ড তখন অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ক্যামেরার লেন্সটা ঠিক করতে করতে জবাব দিল,
“লেট মি বি ইয়্যুর পার্সোনাল ফটোগ্রাফার, ওয়াইফি।”
তারপর সে ঠিক তা-ই করল, যা সে তার পুরো জীবনে কখনো করেনি।

ফটোশুটের পর্ব চুকিয়ে তারা পা বাড়াল হায়া সুফিয়ার দিকে। এলিজাবেথের হাতে তখন রিচার্ডের ফোন। কৌতূহলবশত সে রিচার্ডের সবকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ঘেঁটে দেখছিল। কিন্তু অবাক কাণ্ড! সোশ্যাল সাইট বলতে টুইটার ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া গেল না। টুইটারেও রিচার্ডের কোনো সক্রিয়তা নেই। প্রোফাইলে কেবল একটিমাত্র ছবি—যেখানে রিচার্ডের কাঁধে বসে আছে তার পোষা বাজপাখি ব্ল্যাকহর, আর তার বাঁ হাতটি আগলে ধরে রাখা ব্যাকহক এর পিঠে। যার কারণে তার হাতের সেই রহস্যময় ট্যাটুটি একদম স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। পুরো প্রোফাইলে এছাড়া আর কোনো পোস্ট নেই। অবয়বও নেই। অথচ ফলোয়ার্সের সংখ্যা লক্ষ্য লক্ষ! এলিজাবেথের মনে মনে বেশ হিংসা হলো। এত মানুষ কি স্রেফ এই হাতের ট্যাটু দেখেই তাকে ফলো করে?

ঈর্ষা আড়াল করে সে গ্যালারিতে ঢুকল। কিছুক্ষণ আগে তোলা ছবিগুলো স্ক্রল করতে করতে একটা বিশেষ ছবি পছন্দ হলো তার। ছবিটা ছিল বেশ দারুণ—শূন্যে দোদুল্যমান বিশালাকৃতির দোলনায় বসে আছে এলিজাবেথ, আর ঠিক তার পেছনে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ড। দোলনাটি রুফটপ থেকে বেশ উঁচুতে থাকলেও রিচার্ডের চোখে-মুখে ভয়ের বিন্দুমাত্র লেশ ছিল না। এক হাতে দোলনার দড়িটা শক্ত করে ধরে, ডান দিকে মুখ ফিরিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল সে। তখুনি একঝলক বাতাসে এলিজাবেথের গাউনের ঘের শূন্যে উড়ে যায়৷ আর সেই নিখুঁত মুহূর্তটিই ক্যামেরায় বন্দী হয়।
ছবিটা রিচার্ডের প্রোফাইলে আপলোড করতে যাচ্ছিল এলিজাবেথ। কিন্তু আচমকাই রিচার্ড পেছন থেকে তার কাঁধের ওপর ঝুঁকে এলো। আলতো করে হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে এলিজাবেথের কানের খুব কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ব্যক্তিগত মানুষকে, ব্যক্তিগত করে রাখতে হয়।”
কথাটা বলে সে পাশের একটি স্থানীয় দোকান থেকে তুর্কি ঘরানার চমৎকার একটি হিজাব কিনে আনল। সে যখন দোকানির সাথে কথা বলছিল, এলিজাবেথ দূর থেকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। লোকটা কত সাবলীল আর স্পষ্ট উচ্চারণে টার্কিস ভাষায় কথা বলছে! রিচার্ড হিজাব নিয়ে ফিরে এলো। তারপর খুব যত্নে হিজাবটি দিয়ে এলিজাবেথের অবাধ্য লালচে চুলগুলো পুরোপুরি আড়াল করে জড়িয়ে দিল।
এলিজাবেথ বিস্ময় লুকাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,”আপনি টার্কিস ভাষাও জানেন?”
রিচার্ডের মুখে ছিল কালো মাস্ক, আর পরনে চিরায়ত কালো স্যুট। সে এলিজাবেথের হাত শক্ত করে ধরে হায়া সুফিয়ার ভেতরে প্রবেশ করতে করতে শান্ত গলায় বলল, “বিশ্বের সতেরোটি দেশের ভাষা আমার আয়ত্তে আছে।”

“কী কী? শুনি একটু?” এলিজাবেথের কৌতূহল।
“এখন শুনে কী হবে? যখন যেখানে যেটার প্রয়োজন পড়বে, তখন তো নিজের কানেই শুনতে পাবেন। আপনি তো সবসময় আমার সাথেই থাকছেন। আপনাকে তো আর ছাড়ছি না আমি।”
এলিজাবেথ একটু থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কখনোই ছাড়বেন না?”
রিচার্ড আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘুরে তাকাল এলিজাবেথের দিকে। মাস্কের ওপর দিয়ে তার গভীর চোখজোড়া এলিজাবেথের ওপর স্থির হলো, “না? আমার সন্তান আপনার গর্ভে আসার পর আপনাকে ও.টি রুমে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে তিন হাত মাটির নিচে দাফন করা পর্যন্ত—আমি আপনার সাথেই থাকব। এর সহজ মানে দাঁড়ায়, মৃত্যু পর্যন্ত আমি আপনার ছায়া হয়ে আছি।”
“যদি আমার আগে আপনি মারা যান?”
“আপনাকে সাথে নিয়েই মরব।”
“তার মানে আপনি চান আমি আপনার আগেই মারা যাই?”
“আমি আগে মারা গেলে আপনাকে কে দেখে রাখবে, প্রিন্সেস? আমার যত ভয়, সব তো আপনাকে ঘিরেই। কার ভরসায় আপনাকে এই নশ্বর পৃথিবীতে একা ফেলে যাব? মরেও যদি শান্তি না পাই, তবে সেই মৃত্যুর কোনো দাম আছে?”

রিচার্ডের কথার তীব্রতায় এলিজাবেথ খানিকটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। ফিসফিসিয়ে বলল, “আপনার কথার মাঝে গভীরতা থাকে কেন, মি. কায়নাত?”
রিচার্ড বুকের বাঁ পাশে ইশারা করল, “এখানে, ঠিক এইখানটায় এর চেয়েও শতগুণ বেশি গভীরতা আছে—ভালোবাসার গভীরতা। টের পান?”
“পাই।”
রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্টির হাসি ফুটে উঠল। সে এবার আলতো করে এলিজাবেথের গাল দুটো হাতের মুঠোয় আগলে ধরে বলল, “প্লিজজ, কারও দিকে তাকাবেন না, মিসেস কায়নাত। আমার মাথায় খুন চেপে যায়। আচ্ছা, আপনার লাল রং পছন্দ না, তাই না?”

রিচার্ডের ঠান্ডা স্বরে এলিজাবেথ ভেতরে ভেতরে আঁতকে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের সেই ঘটনা। গালাটা রুফটপ থেকে বের হওয়ার সময় এলিজাবেথের অবাধ্য দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে পড়েছিল এক তুর্কি যুবকের ওপর। ফোনে এতকাল প্রচুর তুর্কি ড্রামা দেখেছে সে। তখন থেকেই এই দেশের প্রতি তার এক ধরনের মুগ্ধতা ছিল। তাই সামনাসামনি একজন তুর্কি মানুষকে দেখে কৌতূহলবশত সে তাদের গায়ের কোমল গায়ের রং পর্যবেক্ষণ করছিল। এমন সময় হঠাৎ এলিজাবেথ তার কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করেছিল। চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রিচার্ড তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। লোকটার ঠোঁটে তখন একচিলতে শীতল হাসি থাকলেও, হাতের মুঠোয় ছিল হিংস্রতা। সেই হিংস্রতা এলিজাবেথের কোমরের নরম মাংসে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছিল।
সেই মুহূর্তের কথা মনে পড়তেই এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলল। কাঁপা গলায় বলল, “হ-হুঁ।”

“কিন্তু আমার খুব পছন্দ।” রিচার্ডের কণ্ঠস্বর চুইয়ে নামল শীতলতা।
“কেন?”
“কারণ রক্তের রং লাল।”
এলিজাবেথের বুকটা ধক করে উঠল, “আপনি কি ইনডিরেক্টলি…”
“উঁহু, ডিরেক্টলি থ্রেট দিচ্ছি। প্লিজ, কারও দিকে তাকাবেন না। আপনাকে আমি আঘাত করতে চাই না। শুধু আদর করতে চাই। শুধুই আদর।”
“কী—হ-হ-হ!”
“আপনাকে আদর ছাড়া আর কোনো উপায়ে আঘাত করার ইচ্ছে আমার নেই।”
“আদর ছাড়া মানে? আদর করেও কি আঘাত করা যায় নাকি?” এলিজাবেথ বিভ্রান্ত।
“যায় না?” রিচার্ড ভ্রু উচাঁয়।

Born to be villains part 26

এলিজাবেথ নির্বাক। রিচার্ড আর মসজিদের ভেতর প্রবেশ করল না। হঠাৎ সে এলিজাবেথকে কোলে তুলে নিল। তারপর গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে মাদকতাময় স্বরে বলল, “কাল আপনাকে আদরের প্রকারভেদ বোঝাব। চলুন।”
“আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?”
“ক্যাপাডোসিয়া (Cappadocia)।”

Born to be villains part 28

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here