Born to be villains part 26
মিথুবুড়ি
সকলে ভেবেছে এটা স্রেফ একটা সাধারণ অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। কিন্তু কেউ জানে না এই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ অ্যারেঞ্জ করেছে সে। বিয়ের লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। কাজি সাহেব এসে অপেক্ষা করছেন বেশ কিছুক্ষণ হলো। পাত্রপক্ষের এখনো দেখা নেই। চারদিকের থমথমে পরিস্থিতির মাঝে এলিজাবেথ স্টেজে বসে আছে শান্ত হয়ে। তার পাশে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে গৌরব, হিয়া আর ইবরাত। মিসেস নীহারিকা মনে মনে ভীষণ অস্থির হয়ে তাঁর ছেলেকে খুঁজছেন। একে তো বরের দেখা নেই, তার ওপর নিজের ছেলেটাও এই সময়ে কোথায় যে গায়েব হয়ে গেল! ইমান ওয়াসিমও উদ্বেগে অস্থিরচিত্তে অনবরত পায়চারি করছেন। আমন্ত্রিত আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ইতিমধ্যে কানাঘুঁষা আর ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে। তবে চারপাশের এই অস্থিরতা আর উৎকণ্ঠার মাঝেও এলিজাবেথ ছিল ব্যতিক্রম। সে স্থির এবং শান্ত। তার চেহারায় চিন্তার কোনো রেখাই ছিল না।
হঠাৎ প্রকৃতির নিয়মে ছন্দপতন ঘটল। এতক্ষণ আকাশটা কিছুটা মেঘলা ছিল৷ কিন্তু আচমকাই মেঘ কেটে গিয়ে ঝলমলে রোদের আলোয় চারপাশ ভেসে গেল। আর সেই রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশকে কাঁপিয়ে দিয়ে দূর থেকে একের পর এক তারাবাজি ফুটতে শুরু করল। প্রথমে একটা, তারপর দুটো….দেখতে দেখতে পুরো ওয়াসিম ভিলার আকাশ রঙিন আতশবাজির আলোয় ছেয়ে গেল। বাজির বিকট শব্দে উপস্থিত সবাই কানে হাত দিয়ে কান চেপে ধরল। তবে এবার সেই শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে ভেসে এলো একঝাঁক গাড়ির চাকার কর্কশ আওয়াজ।
গৌরব কপাল কুঁচকে কৌতুহল নিয়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেল। দৃষ্টিসীমার যতটুকু রাস্তা দেখা যায়, পুরোটা জুড়ে দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য! একটা সরু রাস্তা ধরে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে আসছে একঝাঁক কালো জিপ গাড়ি। আর সেই কুচকুচে কালো জিপগুলোর ঠিক মাঝখানে রাজকীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে একটিমাত্র ধবধবে সাদা গাড়ি। যার সামনের অংশটা একগুচ্ছ ফুলে সাজানো। প্রতিটি জিপের জানালা দিয়ে অর্ধেক শরীর বের করে আছে ব্যক্তিগত রক্ষীরা। তাদের হাতে ধরা কালার স্মোক থেকে বের হচ্ছে রঙবেরঙের ধোঁয়া। দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক কুখ্যাত মাফিয়া ডন যেন তার রানিকে নিজের করে নিতে সগৌরবে ধেয়ে আসছে! এমন শ্বাসরুদ্ধকর আর রাজকীয় এন্ট্রি দেখে গৌ
গৌরব তো অভিভূত হয়ে পড়ে। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো রসোগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে উঠল। তবে পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল চওড়া হাসির রেখা। সে দুই হাতের তর্জনী মুখে পুরে জোরসে শিষ বাজিয়ে উঠল। তারপর এলিজাবেথের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় চিৎকার করে,
“তোর বরের এন্ট্রি তো একদম আউটস্ট্যান্ডিং রে, ইমু!”
ভেতরে পা রাখল বিশালদেহী তিনজন পুরুষ। দুই পাশে থাকা ছায়ার মতো সঙ্গী দুটোর পরনের পোশাকে আংশিক সাদার ছোঁয়া থাকলেও, মাঝখানের জনের আপাদমস্তক সম্পূর্ণ কালো কাপড়ে মোড়ানো। তার এক হাতে ধরা একটি ডল, অপর হাত পকেটে। রক্ষ চিবুকে শীতল দৃঢ়তা। তিনজন একদম একতালে সামনে এগিয়ে চলল। কিন্তু স্টেজের কাছাকাছি পৌঁছাতেই দুই পাশের সঙ্গী দুজন থমকে দাঁড়াল।
মিউজিক বক্সের সুরটা হঠাৎ-ই পাল্টে গেল। চেনা সুর উধাও হয়ে গিয়ে বেজে উঠল রাশিয়ান বিখ্যাত ডল মাত্র্যোশকার থিম সং। আর যে পুতুলের নামানুসারে এই গানের নামকরণ, সেই রাশিয়ান ন্যাশনাল ডল মাত্র্যোশকা হাতে নিয়ে নিজের রুশ-রমণীর উদ্দেশ্যে স্টেজে পা রাখল রিচার্ড।
রিচার্ড স্টেজে পা রাখতেই চাঙ্গা উত্তেজনায় গৌরব আবারও স্বভাবসুলভ চঞ্চল ভঙ্গিতে শিষ বাজিয়ে উঠল। তার শিষের শব্দে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল পেছনে। রিচার্ড ধীরভঙ্গিতে চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে ফেলল। তাকে দেখামাত্র উপস্থিত অতিথিদের অনেকেই সম্মানে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর যারা দ্বিধায় ছিল তারাও তড়িৎ গতিতে দাঁড়িয়ে পড়ল যখন পাশের জনের বিস্ময়ে জড়জড়িত মুখ থেকে অজান্তেই ফসকে বের হলো,
“ভিক্টোরিয়া ক্রসপ্রাপ্ত, ফাইটার পাইলট রিচার্ড কায়নাত!”
হ্যাঁ, আন্দিজ পর্বতমালার সেই বীর হিরোকে এখন সবাই চেনে। গতকালই গণমাধ্যমে বিশদভাবে প্রকাশ পেয়েছে তার জীবনবৃত্তান্ত আর ছবি। তবে এত বড় মাপের একজন সম্মানিত মানুষকে যে একদম সামনাসামনি এত কাছ থেকে দেখতে পাবে, এটা হয়তো উপস্থিত কারও কল্পনার মধ্যেও ছিল না। চারপাশের এতো এতো উৎসুক আর বিস্ময়ভরা দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রিচার্ড সোজা এগিয়ে গেল এলিজাবেথের দিকে। এতক্ষণে এলিজাবেথের মুখের পাথুরে শান্ত অভিব্যক্তিতে ভাঙন দেখা দিল। ইমান ওয়াসিমের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া না থাকলেও, সকলের এমন আচরণ দেখে মিসেস নীহারিকা বেশ অবাক হচ্ছেন। এটাকেই বলে কঠোর পরিশ্রম আর সফলতার।
ওদিকে ইবরাত আর হিয়া হা করে তাকিয়ে আছে রিচার্ডের দিকে। বিশেষ করে রিচার্ডের দীর্ঘকায় উচ্চতা দেখে তারা তো রীতিমতো স্তম্ভিত! সাধারণত বাংলাদেশি ছেলেদের উচ্চতা এতটা হয় না। তারা এলিজাবেথের মুখে লোকটার সমুদ্র-নীল চোখের প্রশংসা শুনেছিল। ভেবেছিল হয়তো সাধারণ সুন্দর। কিন্তু আজ সামনাসামনি সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো তা যেন আরও স্নিগ্ধ, আরও বেশি মোহময়। রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ইবরাতের দৃষ্টি রিচার্ডের কাঁধ গলে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ন্যাসোর ওপর গিয়ে পড়ল। ন্যাসোর পাথরের মতো খোদাই করা কঠিন চিবুক আর গম্ভীর চেহারা দেখামাত্র ইবরাত হাত দিয়ে নিজের বুক চেপে ধরল।
রিচার্ড এসে সরাসরি এলিজাবেথের সামনে থামল। এলিজাবেথের চোখের পলক পড়ছে না। যে মানুষটাকে সামনাসামনি দেখার জন্য সে এতদিন ধরে ছটফট করছিল, এত কিছু করল—আজ সেই মানুষটাকে এত কাছে পেয়েও নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। ধীরে ধীরে তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। এলিজাবেথের জলছলোছলো চোখের দিকে তাকিয়ে রিচার্ড আলতো হাসল, বলল,
“আপনাকে নিতে চলেই এলাম, মিসেস কায়নাত।”
এলিজাবেথ অনুভব করল তার শরীর শীতার্ত চড়ুইয়ের মতো কুঁকড়ে কুঁকড়ে কাঁপছে। বাতাসের ঝাপটায় দুলতে থাকা প্রদীপের শিখার মতো দুলছে তার দোদুল্যমান হৃদয়। বুকের ভেতরের অসহনীয় চাপ আঁকড়ে ধরে এলিজাবেথ ওঠে দাঁড়াল। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কেন এসেছেন?”
রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে একচিলতে আলোড়ন। সে স্বচ্ছ হেসে, বিশুদ্ধ গলায় সবিনয়ে আওড়ালো,”দুঃখের মাঝেও যে সুখ, তাকে ছেড়ে কি দূরে থাকা যায়? হুম?”
উপস্থিতি আমজনতাকে অবাক করে দিয়ে অকস্মাৎ এলিজাবেথ ঠাসিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিল রিচার্ডের গালে। চমকে উঠল সকলে। কেউ কেউ তো মুখে হাত চেপে ধরল। অথচ রিচার্ড প্রতিক্রিয়াহীন। তাদের প্রথম অফিসিয়াল সাক্ষাতকারে এরূপ রূঢ় আচরণেও একটি শব্দটিও করল না সে। এরপর আরেকটি চড় এসে আঁচড়ে পড়ল তার বাঁ-গালে। এভাবেই পরপর আরও কয়েকটি চড় আঁচড়ে পড়ল তার চোয়ালে৷ তবুও সে পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চুপ রইল। অথচ তার পিছনের দু’জন ছায়াসঙ্গীর হাত দুটো মুঠো হয়ে এসেছে। একপর্যায়ে এলিজাবেথ নিজেই হাঁপিয়ে যায়। সে অস্থির হয়। বাচ্চাদের মতো অবুঝ হয়। পাগলামি করে। চিৎকার করে কাঁদে। তারপর হঠাৎ-ই থেমে যায়। তাচ্ছিল্য করে হেসে বিদ্রুপ করে বলে,
“আপনার ইগো হার মানলো তবে?”
এতোকিছুর পরও রিচার্ডের কণ্ঠস্বর অসম্ভব রকমের শান্ত এবং স্থির,”আমার ইগো আমার ওয়াইফের পায়ের নিচে। ইফ শি নিডস মি, আই অলওয়েজ দেয়ার ফর হার৷”
বলতে বলতে সে সকলকে বিস্ময়ের শিউরে পৌঁছে দিয়ে এলিজাবেথের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। এতোদিনের দুরত্বের জন্য যেন ক্ষমা চাইল। রিচার্ড মুখ তুলে এলিজাবেথের দিকে ভেজা মুখশ্রীতে তাকাল। বড্ড মোহনীয় ছিল তার সেই চাহনি। আর তারচেও বেশি মনোমুগ্ধকর
ছিল তার পুরুষালী কণ্ঠ,
“সবই ছিল, কমতি ছিল শুধু আপনার। সেই কমতি পূর্ণ করতে এলাম৷”
রিচার্ড উঠে দাঁড়াল। দু-হাত বাড়িয়ে বুক উজার করে দিয়ে কাছে আসার আহবান জানালো,”আমায় জড়িয়ে ধরুন, এলিজান।”
এলিজাবেথের নিঃশ্বাসে টান পড়ে। সে একপা পিছিয়ে যায়। পূর্ণতার ছায়া তার গায়ে পড়লেও, তার ভয় তাকে পিছিয়ে নেয়। এলিজাবেথ ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। সেই চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“মেমোরি চলে যাবে আমার।”
এলিজাবেথের কথা শোনামাত্র শিউরে উঠলেন ইমান ওয়াসিম এবং মিসেস নীহারিকা। গৌরব, হিয়া এবং ইবরাত চোখ বড় বড় করে তাকায় এলিজাবেথের দিকে। ইবরাত হিয়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। এজন্যই কি তাদের ইমু ইদানীং সব ভুলে যেতো? অথচ রিচার্ড নির্বিকার। সে এক কদম এগিয়ে আসে। দীর্ঘসূত্রিতার ছোঁয়ায় একহাতে আড়ষ্ট মেয়েটাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে। অপরহাত গ্রীবা পেঁচিয়ে ভরসা দিয়ে স্থান নিল মেয়েটির কাঁধে। খুবই স্বাভাবিক শুনালো রিচার্ডের কণ্ঠস্বর, যেন তাকে ছুঁতেই পারেনি কথাটা।
“সব চলে যাক। রূপ, গুন, মেমোরি সব চলে যাক। আমি আছি৷”
এলিজাবেথের থুতনি গিয়ে ঠেকে রিচার্ডের কাঁধে। সে ডুকরে ডুকরে বলে,
“চলে যান৷”
“অসম্ভব।”
“ফিরে যান প্লিজজ!”
“আপনাকে ছাড়া বাঁচা অসম্ভব।”
“এই ভালোবাসা একদিন থাকবে না। সব ভুলে যাব আমি।”
লোকটার ধৈর্য দেখে এলিজাবেথ ধৈর্যচ্যুত হয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি অসুস্থ।”
তারপরও রিচার্ড তার জায়গায় স্থির। সে বোঝানোর মতো করে বলল,”আমি আছি তো। ফিট অ্যান্ড ফাইন। আমার একার ভালোবাসা যথেষ্ট এই সম্পর্ককে শেষপর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য।”
“কেন বুঝতে চাইছেন না? আপনার এই ভালোবাসা একদিন আমি ভুলে যাব৷”
“আমি আছি জান।”
“কিন্তু আমি থাকব না। আপনি থাকবেন না আমার স্মৃতিতে।”
রিচার্ড সোজা হয়। চারপাশের তোয়াক্কা না করে দু’হাতের আঁজলায় এলিজাবেথের ভেজা গাল চেপে ধরল। তারপর শিশুদের যেভাবে বোঝায়, সেভাবে বোঝানোর চেষ্টা করল,
“তো? তো কী হয়েছে? ভুলে যাবেন আমাকে? ভুলে যাবেন আমার ভালোবাসাকে? আমাদের প্রতিটা স্মৃতিকে? সো হোয়াট? আই ডোন্ট ফাকিং কেয়ার এবাউট এ্যনি অব দিস। একবার ভুলবেন? আমি হাজারবার ভালোবাসব। উন্মাদের মতো ভালোবাসব। প্রতিবার নতুন রূপে, নতুন পরিচয়ে, নতুন কোনো অজুহাতে আপনার জীবনে ফিরে আসব। এই জান… আমার দিকে তাকান। সত্যিই ভুলে যাবেন আমাকে? ওকে ফাইন। নো প্রবলেম। আমি আবার নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলব। নতুন নামে, নতুন চেহারায়, নতুন গল্প নিয়ে আপনার সামনে দাঁড়াব। আর সেই নতুন আমিটা আবারও আপনাকেই নিজের করে নেবে। তারপর? আপনি আবার আমার হবেন। আবার আমাকে ভালোবাসবেন। আবার আমার হাত ধরে বাঁচতে শিখবেন। হ্যাঁ, এমনটাই চলতে থাকবে। যতবার আপনি আমাকে ভুলে যাবেন, ঠিক ততবারই আমি নতুন করে আপনার প্রেমে পড়ব। নতুন করে আপনাকে জয় করব। আপনাকে ছেড়ে যাওয়া আমার অভিধানে নেই।
এলিজাবেথের ঠোঁট ভেঙে আসে৷ বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার জড়ো করে মিনতি করে,”প্লিজ….
রিচার্ড এলিজাবেথের মাথাটা শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল। অনুরোধ করে বলল,”প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না, এলিজান।”
একটু থেমে, গভীর নিঃশ্বাস টেনে যোগ করল,”আমি আপনাকে ছাড়তে এবং ভুলবে পারবো না। নেভার ইভার, অ্যান্ড ইভার। একটু কি দয়া করা যায় আমাকে? হাহ? যায় না?”
মানুষ বলে চোখ নাকি কখনো কথা বলে না। অথচ লোকটার সমুদ্রনীল চোখদুটো যেন হাজারো অব্যক্ত শব্দে ভরে আছে। সেখানে আকুলতার জোয়ার উঠেছে, অসহায়তার ঢেউ বারবার তীরে আছড়ে পড়ছে। সেই দৃষ্টি যেন নিঃশব্দে একটুখানি দয়া ভিক্ষা করছে। চাইছে পাশে থাকার অঙ্গীকার।
“আজ থেকে আর হারিয়ে ফেলার কিংবা ভুলে যাওয়ার ভয় নয়। আজকে থেকে আপনি শুধু বাঁচবেন। বাঁচার মতো করে বাঁচবেন। আমি একহাতে আপনাকে সামলাবো, অপর হাতে গোটা পৃথিবী। কথা দিচ্ছি, জান।”
এলিজাবেথ ফাঁপা দৃষ্টিতে রিচার্ডের অত্যন্ত শীতল, নির্বিকার চোখদুটোতে। দুর্বোধ্য মেয়েটার কণ্ঠ ভাঙা কাঁচের মতো কাঁপল,
“কীভাবে বাঁচব আমি? এতো এতো ভয় নিয়ে যে বাঁচা যায় না।”
রিচার্ড হাত রাখল এলিজাবেথের কাঁধে, “রিল্যাক্স, রিল্যাক্স। কুল ডাউন জান। কীসের এতো ভয়?”
এলিজাবেথ ঠোঁট কামড়ে ধরে। একবার দৃষ্টিতে ঘুরিয়ে তাকাল বাবা-মায়ের দিকে, তারপর বন্ধুদের চোখে। সকলের চোখ ভেজা। এলিজাবেথ ফের দৃষ্টি ফেরায় রিচার্ডের দিকে।
“সবাইকে ভুলে যাওয়ার ভয়,
আপনাকে হারিয়ে ফেলার ভয়।”
রিচার্ড আলতো করে হাত রাখে এলিজাবেথের ভেজা গালে। কণ্ঠ একদম খাদে নামিয়ে বলল,
“আমৃত্যু সঙ্গী হওয়ার জন্যই তো আজ এলাম। বিয়ে করব তো। শুধু বিয়ে নয়। একটা সইয়ের মাধ্যমে নিজেকে সম্পূর্ণ আপনার কাছে সমর্পণ করে দিব। আর ভুলে যাওয়ার ভয়? তাহলে আজ থেকে আমি আপনার ব্যক্তিগত ডায়েরি হয়ে যাই, কেমন? যে ডায়েরির প্রতিটা পাতায় শুধু আমারই নাম লেখা থাকবে, আমাদেরই গল্প লেখা থাকবে। আপনি যদি কখনো আমাকে ভুলেও যান, সেই পাতাগুলো খুললেই আবার আমাকে মনে পড়বে। চলবে?”
তারপর রিচার্ড এলিজাবেথের হাত তীব্র অধিকারসুলভ ভঙ্গিতে আঁকড়ে ধরে কাজির দিকে যেতে যেতে বলল,
“চলুন। আজ আমাদের বিয়ে। সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদের প্রেম হয়েছে, ভালোবাসা হয়েছে, এবার একটা সংসার হোক।”
এলিজাবেথ তখন যেন নিজের হুঁশ হারিয়েছে। সে শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে লোকটার দৃঢ় চিবুকে। রিচার্ড এলিজাবেথকে নিয়ে বসতে যাবে, এমন সময় মিসেস নীহারিকা এসে তার সামনে দাঁড়ালেন। এতোক্ষণ তাদের কথোপকথনে অনেকটাই আঁচ করতে পেরেছেন তিনি। তাই আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। সরাসরি বললেন,
“ওকে আগলে রাখতে পারবে তো?”
“বুকে রাখব।” রিচার্ডের বিলম্বহীন কাঠখোট্টা জবাব।
পাশ থেকে ইমান ওয়াসিম বললেন,”আমার মেয়েটা আমার ভীষণ আদরের।”
“আমার বড্ড শখের।”
মিসেস নীহারিকা বলেন,”ও ফুলের মতো পবিত্র। কোনো পাপ নেই ওর গায়ে।”
“সে আমার সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন ফুল। আমার রংহীন বাগানের একমাত্র রঙিন প্রস্ফুটন। আমার দীর্ঘ অন্ধকার জীবনের এক টুকরো পবিত্র আলো।”
“পরে পস্তাবে না তো?”
রিচার্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ইমান ওয়াসিমের দিকে তাকাল। বরফের ন্যায় শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
“ভালোবাসতে চাই। পস্তাতে নয়। সেজন্যই তো নিতে এলাম।”
“কোথায় নিয়ে যাবে?” মিসেস নীহারিকা ছটফটিয়ে উঠলেন।
“সুখ রাজ্যে।”
অতীতের কথা মনে পড়তেই দৃষ্টি নুয়ে পড়ে তার। রিচার্ড সুযোগ ছাড়ল না। আরেকটু কটু করে বলল,
“যে সুখ আপনারা ওকে দিতে পারেননি।”
মিসেস নীহারিকার জবান আঁটকে যায়। রিচার্ড এবার সরাসরি তাচ্ছিল্য ছুড়ে, “একটি পরিবার। হ্যাঁ, একটা পরিবার দিতে চাই ওকে।”
দু’জনের মুখ বন্ধ করে দিয়ে রিচার্ড যখন আবার বসতে যাবে, তখন ইবরাত হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। ওর কণ্ঠস্বর জুড়ে তখন দুর্দমনীয় অস্থিরতা, “কোথায় নিয়ে যাবেন ওকে?”
রিচার্ড শান্ত গলায় জবাব দিল, “তার রাজার রাজ্যে।”
“কোথায় সে রাজ্য?”
রিচার্ড সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাল এলিজাবেথের দিকে। ঠোঁটের কোণে একচিলতে ক্রূর হাসির রেখা ফুটিয়ে দাম্ভিকতার সাথে আওড়ালো,
“রিচার্ড কায়নাতের রাজ্য—ইতালি।”
ইবরাতের চোখে জল জমে। বাচ্চাদের মতো করে ঠোঁট উল্টে সে আবদার করল, “আমরা কিন্তু প্রতি ভেকেশনে ওর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
প্রত্যুত্তরের ক্ষেত্রে রিচার্ড বড্ড নির্লিপ্ত। সে সংক্ষেপে বলল,
“ইফ মাই ওয়াইফ উইশেস, ডেফিনেটলি।”
“ওকে আবার কবে বাংলাদেশে নিয়ে আসবেন?” পাশ থেকে হিয়া ফোঁপাতে ফোঁপাতে জিজ্ঞেস করল।
“হোয়েনএভার শি ওয়ান্টস।”
“আমরা কিন্তু সবাই একসাথে ফরেন কান্ট্রিতে ট্যুরে যেতে চাই!” ইবরাত সুযোগ বুঝে ভেজা গলায় নিজের ইচ্ছাটা প্রকাশ করল।
রিচার্ডের জবাব, “সিলেক্ট দ্য কান্ট্রি নেম, আই উইল বুক ফ্লাইটস ফর ইয়্যু অল।”
“ইমামা যাবে না আমাদের সাথে?”
“ইফ শি ওয়ান্টস।”
ইবরাত এবার ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল রিচার্ডের দিকে। খানিকটা সংশয় নিয়ে বলল, “ও যা-ই বলে, তাই কি হবে? আমি কিন্তু বিয়ের পরের কথা বলছি।”
“অলরেডি শি ইজ মাই ওয়াইফ।”
রিচার্ডের এই শান্ত জবাবে যেন বোমা ফাটল। ইমান ওয়াসিম এবং মিসেস নীহারিকা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তারা হতবিহ্বল চোখে তাকালেন এলিজাবেথের দিকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে হিয়া দ্রুত তাড়া দিল, “আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিন।”
রিচার্ড ঘাড় ঘুরিয়ে এলিজাবেথের দিকে তাকাল। সেই মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই সে প্রত্যুত্তর করল, “শি ইজ সো প্রিশিয়াস… সো, সে যা বলে তাই হবে।”
এবার পেছন থেকে গৌরব বেশ বুক ফুলিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলে উঠল, “ওই হিরো, এসব ফিল্মি ডায়লগে কিন্তু কাজ হবে না। আমার বোন যদি একটুও কষ্ট পেয়েছে না, তাহলে কিন্তু হাড়গোড় ভেঙে কারওয়ান বাজারে ফেলে আসব….
সে কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই টের পেল, দুই পাশ থেকে বিশালাকার দুটো ছায়া তার ওপর এসে পড়েছে। ন্যাসো আর লুকাসের কঠিন ও খুনে চাহনি দেখে গৌরবের সাহসের বেলুন ফুসকে গেল। রিচার্ড সামান্য গ্রীবা বাঁকিয়ে ন্যাসো আর লুকাসের দিকে তাকাতেই তারা বাধ্য ছেলের মতো পিছিয়ে গেল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গৌরব এবার সুর একদম নরম করে ফেলল, “ওর কান্না আমাদের সহ্য হয় না।”
রিচার্ডের সংক্ষিপ্ত ও গম্ভীর উত্তর, “আমারও না।”
সে এবার ঘুরে দাঁড়াল। একে একে গৌরব, হিয়া এবং ইবরাতের দিকে তাকাল। তারপর প্রখর কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে বলল, “আমি সত্যিই আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ, আমার স্ত্রীকে আপনারা এতোটা উদ্বিগ্ন দেখে। তবে আর নয়। তার হাসবেন্ড এসে গেছে। আমি ব্যতীত অন্য কেউ তাকে নিয়ে ভাববে, তা আমার একদম সহ্য হবে না।”
হিয়া আর ইবরাত একসাথে নাক টানল। তারা কাঁপা কাঁপা গলায় আকুতি জানাল, “ও আমাদের ভুলে যাবে না তো?”
“মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। চলবে?” রিচার্ড ওদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে এক ফালি আশ্বস্ত করার মতো হাসি দেখে ওরাও চোখের জল সমেত সামান্য হেসে উঠল। সমস্বরে বলে উঠল, “দৌড়াবে!”
পরপরই দু’জন ছুটে গিয়ে এলিজাবেথকে জাপ্টে ধরল।হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। এলিজাবেথও এবার নিজের ভেতরের সব সংযম হারিয়ে ফেলল। নিজের আপন পরিবারের কাছ থেকে আজীবন শুধু তাচ্ছিল্য আর অবহেলাই পেয়ে এসেছে সে। অথচ এই মানুষগুলো তাকে বুকে টেনে নিয়েছিল, নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় আগলে রেখেছিল। আজ এদের ছেড়ে বহু দূরে চলে যেতে হবে ভাবতেই তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে-ও বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল।
“আমরা তোকে খুব ভালোবাসি রে ইমু!”
পাশ থেকে নাক টানার শব্দে রিচার্ড কপাল কুঁচকে ঘুরে তাকাল। দেখল গৌরব ছেলে মানুষ হয়েও মেয়েদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গৌরবেরও খুব ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে বন্ধুদের ওই আলিঙ্গনে যোগ দিতে, কিন্তু রিচার্ডের ওই সতর্ক, গম্ভীর দৃষ্টির কারণে সে এগোতে পারছিল না। তবে তার আবেগী মন আর বেশিক্ষণ বাধা মানল না। সব ভয়ডর একপাশে ফেলে সেও ছুটে গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরল।
চার বন্ধুর এই বাঁধভাঙা কান্নার দৃশ্য দেখে উপস্থিত বাকি সবার চোখও ভিজে যায়।
“আমাদের কখনো ভুলে যাস না, প্লিজ!”
বিদায়বেলা বরাবরই পীড়াদায়ক। তবে তার চেয়েও বহুগুণ বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল মায়ের দিক থেকে মেয়ের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। মিসেস নীহারিকা একসময় বলেছিলেন—তিনি যদি কখনো জানতে পারেন এলিজাবেথ এই রক্তের নয়, তাহলে তিনি তাকে মেনে নেবেন। আজ সব সত্য সামনে এসেছে। জানা গেছে এলিজাবেথ এই রক্তের কেউ নয়। কিন্তু সত্য প্রকাশের পর সমীকরণ উল্টে গেছে। এখন আর এলিজাবেথ তাকে মেনে নিতে পারছে না।
কনে বিদায়ের অন্তিম মুহূর্তে মিসেস নীহারিকা যখন শেষবারের মতো এলিজাবেথকে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন, এলিজাবেথ সরে গিয়েছিল। মায়ের ছায়া মাড়িয়ে সে ব্যাকুল হয়ে ভাইকে খুঁজেছিল। কিন্তু ইমন তখন ছিল না। ওদিকে রানওয়েতে রিচার্ডের প্রাইভেট জেট প্রস্তুত। অগত্যা ভাইয়ের সাথে শেষ দেখাটুকু না করেই এক বুক শূন্যতা নিয়ে এলিজাবেথকে বিদায় নিতে হলো।
আজকের মেঘলা আবহাওয়ার মতোই এই গল্পের মানুষগুলোর জীবনেও ছন্দপতন ঘটেছে। একেকজনের গন্তব্য আজ একেক দিকে। ন্যাসো আর লুকাস পাড়ি জমাচ্ছে ইতালির উদ্দেশ্যে, আর রিচার্ড এলিজাবেথকে নিয়ে উড়ে যাবে তুরস্ক। অফিসার প্রেম জঙ্গলের এক নির্জন কোণে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে। লাড়া অভিমানী চোখে জল মুছে লাগেজ গোছাচ্ছে। বিদায়ের তীব্র এলিজাবেথ কাঁদছে জেটের ভেতর বসে। সুরাকা গুরুতর আহত শরীর নিয়েও সে তার অবশিষ্ট শক্তিটুকু ঢেলে দিচ্ছে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের ওপর। তাকে যে যেকোনো মূল্যে পৌঁছাতে হবে তার লিলির কাছে। আর রিচার্ড? প্রাইভেট জেটের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছিল তার শিকারের জন্য। শিকার পাতা ফাঁদে পা দিলতেই রিচার্ডের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল শীতল হাসি। ঝড়ের গতিতে ছুটে আসা গাড়িটি যেইমাত্র রানওয়ের সীমানায় চাকা রাখল, রিচার্ড রিমোটে চেপে দিল।
Born to be villains part 25 (2)
সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে গাড়িটি বিস্ফোরিত হয়ে শূন্যে উড়ে গেল। পরক্ষণেই ছিটকে পড়ল পিচঢালা রাস্তায়। ভেতরের মানুষটির মৃত্যু পুরোপুরি নিশ্চিত করতেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল গাড়ির ধ্বংসাবশেষে। রিচার্ড বিকৃত হাসিতে মেতে উঠে জেটের ভেতরের দিকে পা বাড়াল। তখুনি পেছনের গাড়িটিও আগুনের তীব্রতায় বিকট শব্দে ব্লাস্ট হলো। আর অদ্ভুতভাবে দ্বিতীয় বিস্ফোরণের গগনবিদারী শব্দের সাথে রিচার্ডের বুকের বাঁ পাশটা মোচড় দিয়ে উঠল। অদৃশ্য একটা হাত যেন তার হৃদয়টাকে খামচে ধরেছে। ব্যথার তীব্রতায় রিচার্ড কুঁজো হয়ে যায়, হাত চলে গেল বুকের বাঁ পাশে।
