Home রোমান্টিক ভাইয়া রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৩

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৩

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৩
মহাসিন

পরের দিন সকাল। ঘড়িতে ১০টা।
বাড়িটা এখনো চুপচাপ। শাপলা তৈরি হয়ে পায়ের আওয়াজ না করে খুব সাবধানে ড্রয়িংরুমে চলে এলো। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কেউ আছে কিনা দেখল। তারপর নিঃশব্দে সদর দরজার ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে গেল।তার পেছন পেছন ছায়ার মতো বের হলো কবিতা।
গেটের সামনে এসেই শাপলা থমকে দাঁড়াল। পলাশ দাঁড়িয়ে আছে। ওকে আগে সরাতে হবে।
একটু দূর থেকে গলা উঁচু করে ডাকল,

“ওই পলাশ ভাইয়া, এদিকে একটু আসেন তো।”
পলাশ ধীরে ধীরে কাছে এলো।
“হ্যাঁ বলেন।”
শাপলা ওর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিল।
“একটু বাজারে যেতে পারবেন?”
“হ্যাঁ পারব। কি লাগবে?”
“এই টাকা দিয়ে বড় একটা তেলাপিয়া মাছ নিয়ে আসবেন।”
পলাশ মাথা নেড়ে চলে গেল।দূর থেকে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে কবিতা সব দেখল।পলাশ চলে যেতেই শাপলা আর দেরি করল না। দ্রুত গেটের কাছে এসে একটা সিএনজিতে উঠে বসল। সিএনজিটা চলতে শুরু করল।কবিতাও আর সময় নষ্ট করল না। সেও পাশের একটা সিএনজি ডেকে উঠে পড়ল। চোখ শাপলার গাড়ির দিকে।
সিএনজির ভেতর বসে কবিতা বিড়বিড় করে বলল,
“এবার দেখি তুই কোথায় যাস। তোর সব রহস্য আমি জানবই। অনেক হিসাব এখনো বাকি আছে।”
অন্যদিকে শাপলার সিএনজি।
সে ড্রাইভারকে বলল,

“মামা, একটু তাড়াতাড়ি যান। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তারপর ফোন বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করল।
ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলা ভেসে এলো,
“আর বলিস না, একদম অস্থির হয়ে আছে।”
শাপলা উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“খাবারের সাথে ওটা দিয়েছিলি তো?”
“নারে, মনে ছিলো না।”
শাপলা বিরক্ত হয়ে বলল,
“ধ্যাত! এমন করলে কিভাবে হবে? আচ্ছা পরের বার অবশ্যই মনে করে দিবি।”
“আচ্ছা ঠিক আছে।”
“আমি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছি।”
কথাটা বলেই শাপলা ফোন কেটে দিল।
সিএনজি ছুটে চলেছে। পেছনে কবিতার সিএনজিও।
দুইটা গাড়ি, দুইটা মানুষ। একজনের গন্তব্য জানা, আরেকজনের চোখে শুধু এই অজানাকে জানার জেদ।সকালের রোদ আস্তে আস্তে কড়া হচ্ছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর। পলাশ বাজার থেকে ফিরে এলো। হাতে বড় একটা তেলাপিয়া মাছ।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাপল।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল কলি।
“কিছু বলবেন ভাইয়া?”
পলাশ মাছটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“শাপলা আপু টাকা দিয়ে বলেছিল মাছটা এনে দিতে। এই নিন।”
কথাটা বলেই সে আবার গেটের দিকে চলে গেল।
কলি হাতে মাছটা নিয়ে থমকে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে গেল। কলি বিড়বিড় করল,
“শাপলা মাছ দিয়ে কি করবে? ফ্রিজে তো এমনিতেই অনেক মাছ আছে।”
সে গলা উঁচু করে ডাকতে লাগল,
“ভাবী! ভাবী! একবার এদিকে আসেন তো।”
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো নীলাঞ্জনা। কলির দিকে তাকিয়ে শুধালো,

“কি হয়েছে কলি?”
কলি মাছটা দেখিয়ে পলাশের বলা সব কথা এক এক করে নীলাঞ্জনা কে বলল।
কথা গুলো শুনে নীলাঞ্জনাও বেশ অবাক হলো।
“শাপলা আবার মাছ দিয়ে কি করবে? আচ্ছা যাও, মাছটা ফ্রিজে রেখে শাপলাকে ডেকে নিয়ে আসো।”
কলি মাথা নেড়ে রান্নাঘরে গেল। মাছটা ফ্রিজে যত্ন করে রেখে তারপর পা টিপে টিপে শাপলার ঘরের দিকে গেল।
দরজায় হালকা টোকা দিয়ে শাপলা কে ডাকতে লাগলো,
“শাপলা?”
কোনো উত্তর নেই। দরজাটা ভেজানো ছিল। কলি আস্তে করে ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘর ফাঁকা। বিছানা গোছানো।
“শাপলা… এই শাপলা… কোথায় গেলি?”
কলি ওয়াশরুমের দরজা খুলে দেখল, সেখানেও নেই।
মনটা কেমন খচখচ করছে। সে দ্রুত ড্রয়িংরুমে চলে এলো।
নীলাঞ্জনা সোফায় বসে আছে। কলিকে দেখে জিজ্ঞেস করল,

“পেলে?”
কলি মাথা নাড়ল।
“না ভাবী। ঘরে কোথাও নেই।”
নীলাঞ্জনা কপালে ভাঁজ ফেলল।
“আজ আবার কোথায় গেল মেয়েটা? একদম বেশি বাড়াবাড়ি করছে। কবিতাকেও তো দেখছি না।”
কলি বলল, “উপর থেকে নেমে এলাম। তারও কোনো সাড়া নেই।”
নীলাঞ্জনা উঠে দাঁড়াল।
“দুজন একসাথে বের হলো নাকি?”
“একটা কল দিয়ে দেখেন ভাবী।”
নীলাঞ্জনা প্রথমে কবিতার নাম্বারে ডায়াল করল। রিং হয়েই কেটে গেল। কেউ ধরল না।
তারপর শাপলার নাম্বার। ওটাও একই অবস্থা। রিং হয়ে হয়ে অফ হয়ে যাচ্ছে।
ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে নীলাঞ্জনা বিরক্ত মুখে বলল,
“একজনেরও ফোন ধরার নাম নেই।”

সিএনজিটা শহরের কোলাহল ছেড়ে একটা নির্জন রাস্তায় এসে থামল। চারপাশে ধুলো উড়ছে, দূরে দূরে কয়েকটা বড় বড় গাছ।
শাপলা ভাড়া মিটিয়ে নেমে গেল। চোখে মুখে তাড়া।
তার থেকে কিছুটা দূরে আরেকটা সিএনজি থামল। ভেতর থেকে নেমে এলো কবিতা।শাড়ির আঁচলটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল। চোখ দুটো সজাগ।
শাপলা মেন রাস্তা ছেড়ে বাঁ দিকে একটা কাঁচা রাস্তা ধরল। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ করছে। দুপাশে উঁচু উঁচু গাছ। রোদের আলো পাতার ফাঁক গলে মাটিতে ছায়ার নকশা আঁকছে।
কবিতাও দূরত্ব বজায় রেখে ওর পিছু নিল। বুকের ভেতর দ্রিম দ্রিম করছে।
হঠাৎ শাপলা থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। মনে হলো কেউ অনুসরণ করছে।
কিন্তু রাস্তা ফাঁকা। শুধু বাতাসে পাতার শব্দ।
সেই ফাঁকেই কবিতা দ্রুত একটা বড় গাছের আড়ালে সরে গেল। বুকের ভেতর হাঁপাচ্ছে। বিড়বিড় করে বলল,
“এবার তোর মুখোশ খুলব শাপলা। দেখি তুই আসলে কি চাস। আমি কবিতা, আমাকে বোকা ভাবলে ভুল করবি।”
শাপলা আর সন্দেহ না করে আবার হাঁটতে শুরু করল। কবিতাও ছায়ার মতো পেছনে।
অনেকটা পথ হাঁটার পর সামনে একটা পুরনো বাড়ি চোখে পড়ল। ইটের রং জ্বলে গেছে, গেটে মরিচা। চারপাশে জঙ্গলের মতো।

শাপলা চারপাশে একবার দেখে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।
কবিতাও নিঃশব্দে পিছু নিল। পা টিপে টিপে।
বাড়ির ভেতরটা ঠান্ডা। করিডোরে আলো কম। শাপলা সোজা গিয়ে একটা ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভিজিয়ে দিল।
কবিতা দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। কান পাতল দরজার কাছে।
ভেতর থেকে কথা ভেসে আসছে।
ঘরের মাঝে একটা চেয়ারে বসে আছে দীপা। সামনে আরেকটা চেয়ারে বাঁ_ ধা অবস্থায় সিরাজ। চোখে মুখে রাগ আর অস্থিরতা।
শাপলা ভেতরে ঢুকেই বলল,
“আমি চলে এসেছি। ওর কি অবস্থা?”
দীপা একবার সিরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“নিজেই দেখে নে।”
শাপলা ধীর পায়ে সিরাজের সামনে এসে দাঁড়াল। ঠোঁটে হালকা হাসি।
“কি সিরাজ? এসবের জন্য তো তুই দায়ী। শুধু শুধু আমার সাথে ঝামেলা করতে এলি। নিজেই নিজের বি_ প _দ ডেকে আনলি।”
সিরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আমি তোকে ছা_ ড় ব না শাপলা। সময় এখন আমার হাতে নেই। কিন্তু একদিন আসবে। সেদিন…”
শাপলা হেসে উঠল। এই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই।
“সেই দিনের আশায় হা করে বসে থাক।এই শাপলা আসলে কি করতে পারে তাই দেখবি এবার।”
দীপা উঠে এসে শাপলার পাশে দাঁড়াল। বিরক্ত গলায় বলল,
“লোকটাকে আমার একদম সহ্য হয় না। এর একটা ব্য_ ব_ স্থা করতেই হবে।”
শাপলা শান্ত গলায় বলল,
“আর কয়েকটা দিন। যেভাবে হোক সামলে রাখ। তারপর এই সিরাজের পর্ব শে_ ষ হবে।”
দরজার ওপাশে কবিতার বুক কেঁপে উঠল। মনে মনে বলল,
“শাপলা সিরাজকে এখানে আ_ ট_ কে রেখেছে? কেন? ওর উদ্দেশ্যটা কি? আমি ওকে এতদিন বোকা ভেবেছি। কিন্তু ও তো আমার চেয়েও অনেক ধূর্ত।”
কবিতা আর দাঁড়াল না। আস্তে করে চলে গেল।
ভেতরে দীপা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,

“সিয়াম যদি সব জেনে যায় তখন কি হবে ভেবেছিস?”
শাপলা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সিয়াম জানলে আমার কিছু যায় আসে না। আমি যখন খেলা শুরু করেছি, শেষও আমাকেই করতে হবে।”
“আর কতদিন?” দীপার গলায় ক্লান্তি।
“জানি না।” শাপলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “এই খেলার আসল গুটি তো সিয়াম নিজেই। ও যদি একবার বুঝে যায় আমি সবাইকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করছি, তাহলে সব শেষ। তাই খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে।”
একটু থেমে আবার বলতে লাগলো,
“আমি এখন আসি। তুই সিরাজকে দেখে রাখিস। আর হ্যাঁ, ভুল করেও আবার প্রেমে পড়িস না। তাহলে কিন্তু মুশকিল।”
দীপা চোখ কপালে তুলল।

“ধ্যাত! এই লোকটার প্রেমে আমি পড়ব? পাগল নাকি?”
শাপলা দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,
“ঐশী এসে সব দিয়ে যাবে। আমি চললাম।”
কথা শেষ করে ও বেরিয়ে গেল। দীপা পেছন থেকে দরজাটা আটকে দিল।
ঘরটা আবার নীরব। দীপা ধীরে ধীরে সিরাজের কাছে এলো।
“কেন এত জেদ করছেন? শাপলাকে সব বলে দিলেই তো ঝামেলা শেষ।”
সিরাজ মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“কখনো না।”

“তাহলে এভাবেই থাকুন।আমিও দেখব আপনি কিভাবে এখান থেকে যান। শাপলার উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আপনার কোথাও যাওয়া হবে না।”
সিরাজ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“শাপলা কেন সিয়ামকে বিয়ে করছে জানো? সিয়াম যদি এসব জানতে পারে তখন কি হবে?”
দীপা শক্ত গলায় বলল,
“কিছু হবে না। সিয়াম শাপলাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে।”
সিরাজ হাসতে হাসতে বলল,

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬২

“ভালোবাসা?একজন মানুষ যখন জানতে পারবে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটাই দিনের পর দিন মিথ্যা বলছে, তখন সেই ভালোবাসার ভিতটাই ভেঙে পড়ে। আমি শুধু সেই কাহিনী দেখার অপেক্ষায় আছি।”
“চুপ করুন!” দীপা ধমকে উঠল। “আজেবাজে কথা বন্ধ করুন।”
বলেই সে জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। বাইরে গাছের পাতা নড়ছে। দীপার কপালে চিন্তার ভাঁজ।
মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
“খেলা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলে চলবে না। এখনো অনেক কিছু বাকি। সবকিছু এভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে না।”

রোমান্টিক ভাইয়া পর্ব ৬৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here