রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭ (২)
সুহাসিনি ফাতেহা
“পরপারে ফের দেখা না হওয়া অবধি আমার কাছ থেকে তোমার কোনো মুক্তি নেই বউ। — ছাড়াছাড়ি নট এলাউ! ফারাজ খানের যেহেতু হয়ে গেছো— তার থেকে ছাড়া পাওয়ার দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই তোমার।”
নত করে রাখা মুখখানা তুলে তড়াক চোখে তাকায় তিতলি। মুহূর্তেই চোখ নামিয়ে নিলো। ওই ধা*রাল নেত্রদ্বয় অব্ধি পৌঁছাতে তার দৃষ্টিযুগল বিফল হলো। সরু নাকের পাটাটা সামান্য ফুলিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে বসে,
“আমি…আমি ছাড়বো না আপনাকে। আপনি ছেড়ে দিলেও আপনার কাছেই থেকে যাবো একদম।”
তিতলির কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসল রূঢ় মানব! পাহাড়সম বলিষ্ঠ পুরুষ তৎক্ষণাৎ বেয়াদব বউকে নিজের সাথে পুরোপুরি মিশিয়ে নিলো। দেহের সাথে দেহের সংঘর্ষ হতেই,গভীর দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার মুখখানার পানে। অতঃপর বাঁকা কন্ঠে শুধালো,
“তো? ছাড়তে কে বলছে তোমায়? তোমার সামনেই তো আছি — ধরে রাখো! সাথে আমিও যা করার গোসল করার আগেই করে নিই!”
ফারাজের ঠোঁটের কোঁণে বাঁকা হাসি যেন প্রজাপতির ন্যায় খেলা করছে। একহাতে শার্টের বোতামে হাত দিয়ে মুখ এগিয়ে আনলো কাছাকাছি।
তিতলি মরতে থাকা প্রানীর মতো হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো। দুহাতে ফারাজের বুক ঠেলে সরাতে চাইল। কিন্তু ব্যর্থ হলো। কোমরের দুপাশে শক্ত ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেলো৷ গলায় দাঁড়ির খোঁচা খেল। তিতলি নড়েচড়ে উঠলো। এমন স্পর্শে তার বুকের উঠানামার গতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে। ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে। চোখদুটো খিঁচে রেখেছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র হলো। সত্যি ম*রে যাচ্ছে নাতো?
ফারাজ আচমকা ছেড়ে দিলো। মুখখানা কেমন বদলে গেলো মুহূর্তেই। পরনের শার্ট সোফায় ছু*ড়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলে গেলো,
“পরেরবার নিজ থেকে হুটহাট আপনাকে ছাড়বো না কথাটা বলে কাছে আসতে চাইলে, এখনকার ধরাটা আরো নির্মম ভাবে ধরবো। মাইন্ড ইট!”
বোকার ন্যায় হতবিহ্বল ভাব ধরল তিতলি। নেত্রপল্লব কয়েকবার ঝাপটে তাকাল। সে কি বুঝালো আর ভাল্লুক কি বুঝে নিচ্ছে? তার কথা তাকেই ফিরিয়ে দিলো। তিতলি না ভেবে সোফায় পড়ে থাকা ফারাজের শার্টটা হাতে নিয়ে নাকের কাছে এনে লম্বা এক নিশ্বাস নিলো। চেনাজানা কড়া পারফিউম সহ পুরুষালি শরীরের সুবাস নিমেষেই অবশ করে দিলো তার চারপাশ। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। খারাপ লোক! আমাকে একটু বুঝেন না।”
এর ভেতরে আরো তিনদিন পেরিয়ে গেছে। কলেজে ফারাজের অত্যন্ত জরুরী কাজ থাকায় তিতলিকে বাবার বাড়ি যেতে দেয়নি। সাথে করেই কলেজে নিয়ে গেছে দুদিন। তার এত কাজ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবে, আর বেয়াদব বউ বাপের বাড়ি গিয়ে পায়ের উপর পা তুলে ঘুমাবে এটা সে মানতে পারবে না। তবে আজ শ্বশুরের সাথে কথা বলে জানিয়েছে কালকে বিকালে দিয়ে আসবে। শ্বশুর অনেক জোর করেছে সাথে যেন সেও যায়। ফারাজ ভদ্রতায় ঠিক আছে যাবো বলেছে। তবে সে যাবে নাকি যাবেনা এটা সোজা তার মনের উপর ডিপেন্ড করে।
সন্ধ্যা সাতটা।
শেখ বাড়িতে একটা ছোটখাটো ঝামেলা বেধেছে। তৌসিফ শেখ তুষারকে একটা মেয়ের সাথে দেখেছেন। এটা আলেয়া শেখ সহ ফরিদা বানু সবার কানে চলে গেছে। তুষার বাবার পাশে বসে আছে। সামনের দু সোফায় আলেয়া শেখ ও ফরিদা বানু।
তুষার অনেক ভেবেচিন্তে কোনোরুপ ভনিতা ছাড়াই বাবা মায়ের উদ্দেশ্য বলল,
“আমাকে যার সাথে দেখেছো ও ঝিলিক আব্বু! অয়নের ফুপাতো বোন।”
তৌসিফ শেখ রেগে আছেন নাকি গম্ভীর আছেন তা এ মুহূর্তে বুঝা দায়। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তো এখন কি করতে বলছিস?”
তুষার বাবার গম্ভীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। অতঃপর সোজা বলল,
“আমি ওকে….”
ফরিদা বানু নাতির মুখের দিকে চেয়ে বললেন,
“কি নাতি? হেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস? তিনদিন ধরে দেইখতাছি তুই ফোন নিয়া কার সাথে কথা কইয়া মনে মনে হাসোস? মাইয়াডার নাম পিলিক নাকি ঝিলিক কইলি?”
তৌসিফ শেখ মাকে বললেন,
“আম্মা যা বলার আমরা বাপ ছেলে বলতেছি। তারপর তোমাদের মতামত দিও।”
আলেয়া শেখ বললেন,
“আমি বরং উঠে চলে যায়। আপনারা বাপ ছেলে কথা বলেন।”
তৌসিফ শেখ স্ত্রীকে বললেন,
“এটা আমার তোমার সবার জানা উচিত! তোমার ছেলে পাড়া পাড়া বাইকে করে যে মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মা হয়ে এটা তোমার জানার প্রয়োজন আছে।”
তুষারের বাবার সাথে প্রায় বন্ধুসূলভ সম্পর্ক। তার কোনো ইচ্ছেতে চাওয়াতে না বলেনি কখনো। সে যেটায় এটা ঠিক বলেছে তার বাবাও মত দিয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তার বাবা রাগ দেখাবে রাজি হবে না সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। তাও দুহাতে আঙুল পেঁচিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বলল,
“আব্বু আম্মু আমি ঝিলিককে বিয়ে করতে চাই! এ নিয়ে তোমাদের সকলের মতামত চাই! তোমরা শুধু হ্যাঁ বলে দাও বাকিটা আমি সামলে নিবো।”
আলেয়া শেখ চেঁচিয়ে বললেন,
“বিয়ে করবি মানে?”
তৌসিফ শেখ এমন কথায় আন্দাজ করছিলেন। তাই চুপচাপ বসে আছেন। হাতের চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বললেন,
“পরিচয় কি? বাপের নাম কি? মায়ের নাম কি? ভাই বোন কয়জন? সব ঠিকানা দে? তারপর ভেবে দেখবো। বিয়ে শুধু বললেই হয়ে যায় না।”
ফরিদা বানু ছেলেকে বললেন,
“নাতি বিয়া করতে চাইতাছে দিয়া দাও বাপ! তিতলির লাহন দেইখা ওগ্গা মাইয়া লই আয়! মাইয়া তো বিয়া দিয়া দিছস! এবার নাতিডারে
বিয়া করায় দাদা, নানা হইয়া যা। তুদের সক্কাল বিয়া করাইছি বইল্লা এহন নাতিন, নাতির গো বিয়া দেইখতাছি।
তুষার খুক খুক করে কেশে উঠল।
ফরিদা বানু আবার দুঃখ করে বললেন,
“নানিত টারে কয়দিন দেহি না। নাতজামাইকে খালি সামনে দেহি সোজা কইয়া দিমু নাতিনরে আর পাইবা না। এহন থেকে আমগো বাড়িত থাইকবো। তুমি ভাইগ্গা যাও মাস্টারি করো চেয়ারে বয় বয়!”
তৌসিফ শেখ মাকে বললেন,
“আম্মা তিতলি কালকে আসবে। তখন যা ইচ্ছে বলিয়ো।”
“আর না নাতাজামাই আইবো নি! নো আইলে রশি দি বাইন্দা নিয়া আয়!”
এর মাঝেই তৌসিফ শেখের ফোন বেজে উঠায় তিনি পকেট থেকে ফোন বের করে দেখেন তিতলি ভিডিও কল দিয়েছে। তিনি সব ভুলে গিয়ে হাসিমুখে ফোন রিসিভ করলেন,
ওপাশ থেকে তিতলি বাবাকে দেখে হাসিমুখে বলল,
“আসাসলামু আলাইকুম আব্বু!”
তৌসিফ শেখ: “ওয়ালাইকুম আসসালাম! কেমন আছো আম্মু?”
তিতলি: “ভালো আব্বু! তুমি ভালো আছো?”
তৌসিফ শেখ : “আলহামদুলিল্লাহ্! জামাই কোথায় আম্মু?”
তিতলি: “জানিনা।”
ফোনের সাউন্ড স্পিকার বাড়ানো থাকায় ফরিদা বানু সহ সবাই শুনলো। ফরিদা বানু বললেন,
“দেহি আমারে দে।”– তৌসিফ শেখ মাকে ফোন দিলেন। আলেয়া শেখের সাথে বিকালেও কথা হয়ছে। তুষার ও দুপুরে বোনের সাথে কলেজে দেখা করে এসেছে।
ফরিদা বানু নাতিনকে বললেন, “জানোস না মানে কি? নাতজামাই কই যায়? কি করে? সব খবরাখবর লইয়া রাখবি। রাইতের বেলা বেশিক্ষণ বাইরে থাইকতে দিস না।”
এভাবে সবার সাথে আরো কথা হলো।
ঘড়ির কাঁটা বারোটায়। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট ধরে বই খাতা নিয়ে বসে আছে তিতলি। সামনে ফারাজ তিতলিকে নিজের মতোই এটাসেটা বুঝাচ্ছে। একদম মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু তিতলির মন সেদিকে নেই। এইমুহূর্তে সে ভাল্লুককে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছেনা। কি গম্ভীর মুখে তাকে পড়াচ্ছে এই গম্ভীর মুখ দেখেই তার প্রেম প্রেম পায়। ইচ্ছে করে মুখে কয়টা চুমু বসিয়ে দৌড় দিতে। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে তার সামনে বসে আছে। সুঠাম দেহের লোমশ বুকের অধিকারী। বুকের উপরের অংশ আরো কতকি এসব অংশ দেখে নিজে নিজে লজ্জা পাচ্ছে সে। চুমু দিবে দিবে ভেবেছে
তার মাঝেই ফারাজ তিতলিকে বলল,
“চোখ বইয়ের দিকে চাই! আমার দিকে নয় হুমম!”
তিতলি মুখ ভেঙচি কেটে বইয়ের দিকে নজর দিলো। খারাপ লোক। একটু তো দেখেছে। কেমন ধমক দিলো। মুখ নাক ফুলিয়ে বলল,
“তাকাচ্ছি না আপনার দিকে। বই আমার স্বামী!”
ফারাজের ভ্রুজোড়া কুঁচকে যায় কৌতুকে। স্কেল হাতে নিলো তৎক্ষণাৎ। কপট রাগ দেখিয়ে হিসহিসিয়ে শুধাল,
“মাইর খেতে ইচ্ছে করে?”
“না আপনাকে চু..চুমু….” অর্ধেক বলে থামল সপ্তদশী! ফের বলল,
“এই না না পড়ছি! মারবেন না প্লিজ! এটা দিয়ে মারলে খুব ব্যাথা পাবো।”
ফারাজ তিতলির দিকে ফিরলো আচমকা। ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
“কি যেন বলে যাচ্ছিলে? আমাকে চুমু সম্পূর্ণ কথাটা শুনতে চাই?”
তিতলি কেঁপে উঠে বলল,
“কিছুনা কিছুনা বইকে চুমু! আপনাকে না।”
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭
ফারাজ খান এখন পড়ানোর মুডে আছে। তাই বেয়াদব বউকে পড়া জিজ্ঞেস করলো,
নিউটনের প্রথম থেকে তৃতীয় সূত্র পর্যন্ত বলো,
তিতলি কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে উত্তর দিলো,
“নিউটনের প্রথম সূত্র হলাম আমি! দ্বিতীয় সুত্র হলেন আপনি! তৃতীয় সূত্র আমাদের টুনাটুনিরা। চতুর্থ সূত্র আমরা সবাই!” দেখুন হয়েছে কিনা?
