Home দুইজনাতেই দুইজনাতেই পর্ব ৩৪

দুইজনাতেই পর্ব ৩৪

দুইজনাতেই পর্ব ৩৪
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

সাক্ষ্য বেচারা না পেরেই গলা ঝাড়ল। শুকনো ঢোক গিলল পরমুহূর্তেই। অতঃপর অদিতি আন্টির কথার জবাবস্বরূপ বলে উঠল,
“ না আন্টি, উনি ঘুমালে থাক। আমি চলে যাচ্ছি। ”
দ্বিতীর মা হাসলেন। বাঁধা দিয়ে বলে উঠলেন,
“ না, না। তোমার ভার্সিটির জন্যই আনা হয়নি তোমাদের। এখন যখন এসেছোই উপরে এসো। নয়তো কষ্ট পাবো আমি। ”

সাক্ষ্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। এই মুখ নিয়ে এখন সে উপরে যাবে? অদিতি আন্টির সামনে দাঁড়াবে? ছিহ ছিহ! সাক্ষ্য বোধহয় পুরোপুরিই চাইছিল এই অবস্থাটা কাটিয়ে যেতে। তাই তো মিথ্যে অযুহাত দিল। কিন্তু লাভ হলো না শেষমেষ। দ্বিতীর আম্মুর বারবার বলাতেই তাকেও বাইকটা বিল্ডিংয়ের ভেতরে রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হলো। অতঃপর ভদ্র সভ্য সাক্ষ্য বারবার নিজেকে বুঝ দিচ্ছিল যে এটা স্বাভাবিক, কিচ্ছু হবে না। এসব বুঝ দিয়েই সে উপরে উঠল। কলিং বেল বাঁজিয়ে দাঁড়াতেই দ্বিতীর আম্মু এসে দরজা খুলল। হেসে বলল,
“এই বাসায় আসতে কিসের সংকোচ সাক্ষ্য? তোমার বাসায় আমার মেয়ে থাকতে পারলে তুমি পারবে না এই বাসায় আসতে? ”
সাক্ষ্য গলা ঝাড়ল আবারও। কি করে বুঝাবে সমস্যা এটা নয়। সমস্যা হলো তখনকার কথা গুলো বলে দেওয়া। শুনতে পেয়েছিল কি অদিতি আন্টি? নাকি পাননি? সাক্ষ্য বুঝে না। তবে উত্তর করল,

” আসলে বাসায় কাউকে বলে আসা হয়নি আন্টি। তাই। ”
“ আমি বলে দিব সাজিকে। এখন ভেতরে এসো। ”
সাক্ষ্য ভেতরে এল জুতোজোড়া খুলে। দু পা বাড়াতেই দ্বিতীর আম্মু ফের প্রশ্ন করল,
“ খেয়েছো সাক্ষ্য? ”
সাক্ষ্য মাথা নাড়াল। যে খেয়ে এসেছে। দ্বিতীর আম্মু এবারে মৃদু হাসল। বলল,
“ ঐ আধ সেদ্ধ হওয়া বিরিয়ানি? ”
সাক্ষ্য চাইল। দ্বিতী কি বলেছে তা বুঝে উঠল না। তবে উত্তর করল,
“ ঠিক ছিল।”
দ্বিতীর আম্মু চাইল। হেসে ফের পরমুহূর্তেই বলল,
“ দ্বিতীটা এখনো অনেক কাজকর্ম করতে পারে না সাক্ষ্য। রান্নাবান্নাও সব পারে না। সবসময় আদরে আদরে রেখেছিলাম তো। রান্নাটা ও কখনো করেই নি তেমন। শখ হলে গিয়ে করেছে। তাও আমি সাথে সাথে থাকতাম হাত পুড়ে যাবে বলে।”

সাক্ষ্যর হুট করেই মনে হলো সে অদিতি আন্টিকে দেওয়া কথা রাখতে পারেনি। তার মেয়েকে আদরে রাখতে পারেনি। ভাবছে হয়তো, একদিনের মধ্যেই মেয়েটা হাত পুড়িয়ে বসেছে। কথা শুনেছে। কষ্ট করে রান্না ও করেছে। এসব শুনেই বোধহয় অদিতি আন্টি ভরসা হারাচ্ছেন? সাক্ষ্য চাপা শ্বাস ফেলল। উত্তর করল,
“উনার কাজকর্ম পারতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই আন্টি। ”
দ্বিতীর আম্মু হাসল। বিনিময়ে উত্তর করল,
” আসলে আমি ওকে সব কাজ শিখিয়ে পড়িয়েই তোমাদের বাড়ি পাঠাতাম সাক্ষ্য। আমি তো জানি, সংসারে সব কাজ জানতে হয়৷ কিন্তু মাঝপথে তোমরাই হঠাৎ আনুষ্ঠানিক বিয়ের তোড়জোড় শুরু করলে। আমি আর মেয়েটাকে কাজকর্ম শিখাতেই পারিনি। তুমি বরং এক কাজ করো, দ্বিতীকে এই বাড়িতেই রেখে যেও কয়েকটাদিন। আমি কয়েকদিনে যা পারি অবশ্যই শেখাব ওকে। পার্ফেক্ট হিসেবেই পাঠাব। ”
সাক্ষ্য তাকাল। জবাবে বলল,

“ ঐ যে বললাম, আপনার মেয়ের কাজ পারার বাধ্যবাধকতা নেই আন্টি৷ কাজ শেখার প্রয়োজনই পড়বে না। ”
“ পড়বে সাক্ষ্য। কাজ না পারলে কেউ না কেই ঠিকই আঙ্গুল তুলবে। আমি চাই, আমার মেয়ের দিকে কেউ আঙ্গিল তুলতে না পারুক। ”
সাক্ষ্য ছোট ছোট চোখে চাইল। কি মুসিবত! এত কষ্ট করে বউ ঘরে তুলেছে সে। আর এখন কাজ করার জন্য বউকে বাপের বাড়িতে রাখবে? উত্তর হিসেবে গম্ভীর স্বরে সে বলল,
“ যা হয়েছে তার বাইরে দ্বিতীয়বার আর কেউ আঙ্গুল তোলার সাহস পাবে না আন্টি। কথা দিচ্ছি। কথার খেলাপ হলে তখন দরকার হয় আপনার কথা মেনে নিব। ”
সাক্ষ্য এরপর আর একটাও কথা বলেনি। পা বাড়িয়ে দ্বিতীর ঘরটায় গেল। গুঁটিশুঁটি হয়ে শুঁয়ে থাকা দ্বিতীকে দেখে মনে হচ্ছিল বাচ্চা একটা মেয়ে। যার গায়ের উপর বেশ স্বযত্নেই কাঁথা এগিয়ে দেওয়া আছে। সাক্ষ্য দরজা লাগিয়ে এগোল। মৃদু হেসে দ্বিতীকে দেখতে লাগল। অতঃপর কপালে দৃঢ় চুম্বন এঁকে ফিসফাস করে বলল,
“ সাক্ষ্য সরি মিসেস এহসান। যেটুকু কষ্ট আপনি পেয়েছেন সেটুকু কষ্ট সাক্ষ্যের ও হোক। যেটুকু কথা আপনাকে শুনতে হয়েছে তা সাক্ষ্যকেও শুনতে হোক। সরি হুহ? আর কখনো আপনাকে কথা শুনতে দিব না। প্রমিজ। ”
দ্বিতী তখন ঘুমের ঘোরে। শুনল না কিছুই।

কথার শাড়ি পরা দুয়েকটা ছবি সাম্যর ফ্রেন্ডসার্কেলটায় ঘুরঘুর করছিল। গোলগাল মুখের মেয়েটাকে শাড়িতে অতোটাও বাজে দেখাচ্ছে না যতোটা সাম্য বলেছে। সাম্য ফোঁস করে শ্বাস ফেলল।ফ্রেন্ডগ্রুপে নিহালের দেওয়া একটু আগের ছবিগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেই অন্য এক ফ্রেন্ড এর ম্যাসেজ এল,
“ দোস্ত, ও মোটা হলেও মুখটা কিন্তু সুন্দর বল? আমার আবার এমন গোলুমুলু মেয়েই বেশি ভালো লাগে। কোনভাবে ওকে তোদের ভাবি করলে কেমন হবে বল তো? জড়িয়ে ধরেই শান্তির ঘুম দেওয়া যাবে। ”
ব্যস! এই ছোট্ট ম্যাসেজটা দেখে সাম্য দাঁতে দাঁত চাপল। তাদের বাড়ির মেয়েকে নিয়ে কেউ জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর অব্দি প্ল্যান করে ফেলতেছে ভেবে রাগও লাগল তার। এর পরের কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দেখে গেল ফ্রেন্ড সার্কেলে কথাকে নিয়ে আলোচনা। সাম্য আর চুপ থাকতে পারল না বোধহয়। সোজা কল দিল নিহালকে। দাঁতে দাঁত চেপে দু তিনটে গালি উগড়ে দিয়েই সে শুধাল,

“ কথার সাথে তোর ছবি গ্রুপে দিয়ে কি প্রমাণ করেছিস নিহাল? তোকে অনুমতি দিয়েছে কে গ্রুপে ছবি দেওয়ার? কে দিয়েছিল? ”
কথাগুলো সাম্য স্বাভাবিক ভাবে বলে নি। অনেকটা চেঁচিয়েই বলল সে। এতোটা রাগ নিয়ে বলেছিল যে সাম্যর কপালের মাঝ বরাবর রগটা ফুলে উঠল। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠল আচমকাই। চোখজোড়াও কেমন লাল টকটকে দেখাল যেন। বোধহয় বাড়ির মেয়েকে নিয়ে একঝাঁক ছেলে আলোচনা করছে বলেই সইতে পারল না৷ সাম্য ফের চেঁচিয়ে বলল,
“ তোর কি কথাকে দুই টাকার মেয়ে মনে হয় নিহাল? কি মনে হয় তোর? ও যা তা মেয়ে? ওকে নিয়ে আলোচনা করা যায়? শোন নিহাল, কান খুলে শুনে রাখ। ওকে আমি যা ইচ্ছে তাই বলব। যা ইচ্ছে তাই করব। কিন্তু তাই বলে অন্য কেউ কিছু বললে আমি মেনে নিব না। একটুও না৷ ও আমার আব্বুর মেয়ে হয়। ”
নিহাল বোধহয় বন্ধর এমন রাগ রাগ ভাব দেখে ছবিগুলো মুহূর্তেই ডিলেট করল। শুধাল,
“ তুই তো ওকে পাত্তাই দিস না। নিজেই তো চব্বিশ ঘন্টা আমাদের সামনে ওকে নিয়ে ট্রল করিস। তো এখন খুব লাগছে তোর? ”

“ ওটা আমি জানোয়ার। ওর ঘরের মানুষ আমি। ছোট থেকে বড় হয়েছি একসাথে। আমি বলব, একশো একবার বলব। কিন্তু তুই কে? তুই কে বলার? নেক্সটবার সামনে আসলে তোর কপালে খারাপ কিছু লেখা আছে নিহাল। বন্ধু হ, আর যেই হ আমি তোকে ছাড়ব না। ”
“ কি করবি তুই? ”
“ তোর বোনের সাথে প্রেম করব। ছবি তুলব। একঝাঁক ছেলের সাথে সেসব ছবি নিয়ে আলাপও করব। রসালো আলাপ। আই থিংক তোর ভালো লাগবে? ”
“ তুই কবে থেকে কথাকে বোনের মতো স্নেহ করিস? দুই চোখে তো দেখতেই পারিস না। ”
“ দুই চোখে দেখতে পারি নাকি এক চোখে দেখতে পারব তা আমার বিষয়। তোর কি? তোকে ভাবতে বলেছি আমি? তুই এবার থেকে কথার সাথে কথাও বলবি না নিহাল। এক অক্ষর কথাও বলবি না। মাইন্ড ইট! ওকে নিয়ে নোংরা আলোচনার আসর সাঁজালে আমি তোকে ছাড়ব না। ”

সাম্য কথাগুলো বলেই ফোনটা ছুড়ে ফেলল। শরীর ঘেমে গেছে তার। রাগে কাঁপছে এখনো সে। নিহাল! নিহাল নামক ভদ্র সভ্য দেখতে ছেলেটা কিনা কথাকে নিয়ে আলোচনা আসর সাজাচ্ছে? সাহস কত ওর! সাম্য রাগে কাঁপতে কাঁপতেই ছাদে গেল। পকেটে সিগারেট নেই। নয়তো এতক্ষনে সে একটা সিগারেট ফুঁকত। নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াত। নেহাৎ বাড়ির মানুষদের থেকে লুকিয়ে নিকোটিনের নেশায় আসক্ত হয়েছে বলেই বাড়িতে সিগারেট আনতে পারে না।
সাম্য যখন ছাদে গেল তখন ছাদের বামপাশের দোলনাটায় সাদা স্কার্ট পরিহিত একটা মেয়ে। মৃদু আলোতে হাতে বই নিয়ে বসে আছে উল্টো হয়ে। চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া। বাম হাতে রাখা কফির মগটায় একটু পর পরই চুমুক দিয়ে নিচে নামাচ্ছে। পায়ের নুপূরের রিনিঝিনি শব্দ ভাসছে এই রাতদুপুরেও।সাম্য জানে, এটা কথা। পড়তে পড়তে মাথায় জ্যাম বেঁধে গেলে সে এখানেই আসে। বই হাতে দোলনায় বসে কফি নিয়ে। আজও তাই হলো। সাম্য এগোল। দোলনার একপাশটায় নিজে বসেই বলে উঠল,

“ আরো ওদিক সর কাঁথা। তুই যে মোটা আমার জায়গা হচ্ছে না। ”
কথা শুনল। নিরব চেয়ে থেকে হুট করে ওপাশে সরল। মাঝখানে ব্যবধার রেখে বলে উঠল,
“ আমি কাল থেকে সন্ধ্যায় জিমে যাব। মোটা থেকে হুট করেই চিকন হয়ে যাব সাম্য। তখন তুই এমন মোটা মোটা কাকে করবি? ”
“ আবার তুই বলছিস? ”
“ তুমি তুমি আমার মুখ দিয়ে অতো আসছে না। তাছাড়া সাম্যভাই শব্দটাও আর আসছে না। তুইটাই থাক বরং। বেশিদিন তো আর ডাকব না। সয়ে নে।”
“ তোর ঐ বুড়ো দাদাজান এসে বুঝি তোকে নিয়ে যাচ্ছে? নিয়ে গেলে তো ভালোই। আপদ বিদায় হবে। ”
কথা হাসল। মোটা মতো বইটা একপাশে রেখে দিয়ে বলে উঠল,
“ বোধহয় সত্যিই তোর চোখের আপদ বিদায় হবে। আমার আব্বু আসছে। নিয়েও যাবে হয়তো আমায়৷ তখন আর তোদের খাবও না, তোদের পরবও না। তোর চোখে বিদ্ঘুটে মোটা এই কথাটাই থাকবে না৷ ”
সাম্য চাইল। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ আমি কি তোকে এখন ইমোশনাল হয়ে থেকে যেতে বলব? ওভাবে চেয়ে আছিস কেন? বরং তোর উপর আমার রাগ হচ্ছে। একটু আগেও রাগে কাঁপছিলাম আমি। আরেকটু রাগলেই বোধহয় তোকে আমি ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলেও দিতাম৷ ”

“কেন? ”
সাম্য চোখ খিচে৷ এবার তার আবারও রাগ লাগছে। আবারও শরীর কাঁপছে।দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ নিহাল কে হয় তোর? তোর আপন মানুষ নিহাল? ”
কথা চোখ ছোট ছোট করে ফেলল। জবাবে বলল,
“ না তো। এক মিনিট, তুই কি উনার প্রোপোজালের কথা শুনে রেগে গেছিস নাকি? আম্মুকে গিয়ে জানাবি এখন তাই না? বলবি যে কথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে? ”
সাম্য শীতল চোখে চাইল এবারে। প্রোপোজাল? কথাকে প্রোপোজালও দিয়েছে নিহাল? তারপরই বুঝি দুইজনে হেসে হেসে ছবি তুলেছিল? সাম্যর চোখ লালাভ হয়ে উঠল। আচমকাই দোলনা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সে শুধাল,

দুইজনাতেই পর্ব ৩৩

“ মাথায় ঘিলু নেই তোর? নাকি শুধু খেয়ে দেয়ে হাতে পায়ে একটা হাতি হয়ে যাচ্ছিস? নিহালের ভোলাবালা ভাব দেখে রাজি হয়ে গিয়েছিস কি করে নেচে নেচে? আমি তো আজ আব্বুকেও বলব। শুধু আম্মুকে নয়, সবাইকেই বলব। বলব যে তোকে নিহালের সাথে উগান্ডায় পাঠিয়ে দিতে। ”

দুইজনাতেই পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here