ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৯
মুশফিকা রহমান মৈথি
স্নিগ্ধের কপালে প্রগাঢ় বলিরেখা। শুভ্র মুখটা ব্যথায় নীল হয়ে আছে। কাঞ্চন দু তিন বার ডাকলো তাকে। কিন্তু সাড়া পেলো না। অচেতন স্নিগ্ধ। তার হুশ নেই। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। তার গায়ে হাত দিতেই কাঞ্চন আঁতকে উঠলো। মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেলো ভয়ে, দুশ্চিন্তায়, উৎকুণ্ঠায়। হাসপাতালে সে ছাড়া আর কেউ নেই। স্নিগ্ধের কিছু হয়ে গেলে সে একা কি করে সব সামলাবে। রাত অবধি তো ভালোই ছিলো। জ্বালাচ্ছিলো তাকে। বিরক্ত করছিলো সিমেন্টের বস্তাটা। হঠাৎ কি হলো!
মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। অজানা ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো তার। সময় নষ্ট না করেই নার্স স্টেশনের দিকে ছুটলো তাদের ডাকার জন্য।
রাত ততটাও গভীর হয় নি। দেড়টা বাজে। নার্সেরা তখন চা খাচ্ছিলো আর আড্ডা দিচ্ছিলো। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো কাঞ্চন। তার শুভ্র মুখখানা আরোও বেশি ফ্যাকাশে লাগছিলো। জড়ানো স্বরে বললো,
“আপু একটু আমাদের কেবিনে আসুন। আমার হাসবেন্ডের গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে!”
কথাটা বলে নিজেও চমকালো। । “হাসবেন্ড” এই শব্দটিই কেন বের হলো মুখ থেকে। দায়িত্বরত নার্স নড়েচড়ে উঠলেন। অর্ধেক খাওয়া চা ডেস্কে রেখেই থার্মোমিটার, প্রেসার মেশিন, অক্সিমিটার নিয়ে বললেন,
“চলুন”
স্নিগ্ধের জ্বর পারদ স্থানাঙ্কে একশ দুই। তার শরীর ঘাম দিচ্ছে। ডিউটি রত ডাক্তার অন্য ফ্লোরে ছিলেন। একটা কাজে নিচে গিয়েছিলেন। তাকে ফোন করাতে তিনি ছুটে এলেন। স্নিগ্ধের সেলাইয়ে কোনো সমস্যা পরিলক্ষিত হলো না। তার শরীর ক্ষণে ক্ষণে ঘামছে। ডিউটি ডাক্তার নার্সকে দ্রুত ফার্মেসিতে ফোন করতে বললেন। যে ডাক্তার স্নিগ্ধর অপারেশন করেছে তাকে ফোন দিলে তিনি প্যারাসিটামল দিতে বললেন। নাপা ৫০০ ইনজেকশন দেওয়া হলো স্নিগ্ধকে। ডিউটি ডাক্তার কাঞ্চনকে বললেন,
“এটা অনেক কারণেই হতে পারে। খুব স্বাভাবিক বিষয় এটা। যতটা কত সময় থাকে এবং এর মধ্যে শরীরে কেমন রিয়েকশন হয় সেটাই দেখার বিষয়। কালকে সকালে কিছু টেস্ট করা হবে। আমি লিখে যাচ্ছি। আপাতত রাতে প্যারাসিটামল চলুক। এন্টিবায়োটিক রিয়েকশন হতে পারে, ইনফেকশন হতে পারে আবার ইনফ্ল্যামেটরি রেসপন্স হতে পারে আবার ডিহাইড্রেশন হতে পারে। আমরা টেস্ট না করে বুঝতে পারবো না৷ রাতটা একটু দেখবেন। জ্বর বাড়লে অবশ্যই নার্সকে জানাবেন। আমার কেবিন ৬০৭। আপনি আমাকেও নক করলে পাবেন।”
কাঞ্চন মাথা দোলালো। একবার তাকালো স্নিগ্ধের দিকে। লোকটি জ্বরের ঘোরে আছে। এই লোকটির ধৈর্যশক্তি অতুলনীয়। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কষ্টে তড়পাচ্ছে। তাও একটু শব্দ বের হচ্ছে না।
ডাক্তার চলে গেলে চেয়ারটা নিয়ে বেডের পাশে বসলো কাঞ্চন। শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো সে স্নিগ্ধের দিকে। এক অদ্ভূত অনুভূতির সংমিশ্রণ হৃদয়ে ছেঁয়ে গেছে। স্নিগ্ধকে সে ঘৃণা করে, অথচ তার যন্ত্রণায় নীল হয়ে আসা মুখটা তাকে আনন্দ দিচ্ছে না। আবার কোনো কারণে তার কষ্ট হচ্ছে এটা ভাবার প্রয়োজন নেই। কষ্ট প্রিয় মানুষের প্রতি হয়। স্নিগ্ধ তার অপ্রিয়র তালিকার প্রথম ব্যক্তি। তবে অস্বীকার করার জো নেই, একটা ফাঁকা ভাব হৃদয়কে খামচি মেরে আছে। কেন যেন ভয় হচ্ছে। ভয়টা নিতান্তই অহেতুক। মনে মনে নিজেকে বুঝালো,
“এটা যাস্ট সহানুভূতি। একটা অসুস্থ মানুষের প্রতি সবাই সহানুভূতি দেখায়। নাথিং মোর, নাথিং লেস। মাথা থেকে চিন্তা গুলো ঝেড়ে ফেল কাঞ্চন। যত চিন্তা করবি ততই দূর্বল হয়ে যাবি। এই ধূর্ত মানুষটি তোকে একটা ফাঁদে ফেলেছে। এই ফাঁদ কেটে যেভাবে হোক তোর বের হতে হবে। এই লোকটাকে তোকে হারাতে হবে। ওইটাই তোর প্রতিশোধ হবে।”
নাপার ঔষধটা রডে ঝুলছে। ক্যানোলার মাধ্যমে সেটা শরীরে যাচ্ছে। রাতটা বোধ হয় নির্ঘুম কাটবে কাঞ্চনের। ক্লান্ত লাগছে খুব। চোখ ভার হয়ে আসছে ঘুমে। মনে হচ্ছে একযুগের ঘুম এসে জড়ো হয়েছে চোখে। তবুও সে ঘুমালো না। শান্ত চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্নিগ্ধের দিকে। জ্বরের কারণেই কি না, তবে তার মুখটা মলিন লাগছে। ভ্রু এখনো কুঞ্চিত। ঘুমিয়ে আছে নাকি ঘোরে বোঝা গেলো না। সে সারা দিচ্ছে না। কাঞ্চন বুঝতে পারলো, এই লোকটা তাকে শান্তি দিবে না। কাঞ্চন ঘুমালো না সারা রাত। একটু পর পর স্নিগ্ধের গা মুছে দিচ্ছিলো সে। ঘন্টা দুয়েক পড়ে স্নিগ্ধের মুখখানা একটু একটু করে স্বাভাবিক হয়ে এলো। তার জ্বর কমে আস্তে লাগলো। নার্স জ্বর মেপে বললেন,
“আর জ্বর না আসলে সমস্যা নেই।”
কাঞ্চনের শরীর এবার ছেড়ে দিলো। একটা চিন্তা যেন মাথা থেকে নেমে গেলো। দলাপাকানো ভয়গুলো গলে যেতে লাগলো। কান্ত মাথাটা রাখলো স্নিগ্ধের হাতের উপর। চোখ বুজে এলো। কখন যে ঘুমিয়ে এলো টের পেলো না।
শেষ রাতে বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়ায় একটা শান্তির রেশ। সূর্যটাও বেশ আয়েশ করেই আজ উঠেছে। তাপ নেই আলো তে। মিষ্টি একটা রোদ। জানালার ফাঁক থেকে সেই রোদ প্রবেশ করছে কেবিনে। আলোকিত হলো কেবিন। আলোর মধ্যে ঘুমানোর অভ্যাস নেই স্নিগ্ধের। তার ঘরের আলো স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে। পর্দার কোনা দিয়ে আলো ঢুকলেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আজও তাই হলো। ঘর আলোয় ধা ধা করছে। দুটো রড লাইট জ্বলছে। রড লাইটের আলো, বাহিরের মিষ্টি রোদ সব মিলিয়ে অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল কেবিন। ফলে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো স্নিগ্ধের।
চোখ মেলে তাকালো সে সাদা সিলিংয়ের দিকে। শরীরটা কেমন দূর্বল লাগছে। গা ঘেমে চটচট করছে। রাতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। হয়তো জ্বর এসেছে। জ্বরে ঘোরে তার হুশ ছিলো না। সামান্য জ্বরে কাবু হবার স্বভাব নেই তার। তবুও গতকাল হয়েছিলো। এখন জ্বরবোধটা নেই। কিন্তু গলায় কাছে তেঁতো ভাব রয়েছে। শরীরে বিন্দুমাত্র বল নেই। এতোটা দূর্বল স্নিগ্ধ নয়। যে তার ফিটনেসের উপর প্রচন্ড সচেতন। পর্যাপ্ত খাওয়া, জিম এসব কিছুর ব্যাপারে সে প্রচন্ড সিরিয়াস। শুধু ঘুমের ক্ষেত্রে চাকরি তার শত্রু। তবুও সে এমনভাবেই নিজের শরীরকে গড়িয়ে নিয়েছে সে এক দু ঘন্টা ঘুমেও দিব্যি দশ বারোজন মানুষকে কমব্যাটে হারিয়ে দিতে পারবে। অথচ এখন তার শরীর মনে হচ্ছে একেবারে নিশ্চল। কাঞ্চন উদ্ধার মিশনকে কেন্দ্র করে তার ব্রেইনের উপর কি মারাত্মক চাপ পড়েছিলো? সে কি খুব বেশি ইনভল্ভ হয়ে পরেছিলো? নিজের শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ফেলেছে সে? সামন্য একটা মিশন, অথচ মনে হচ্ছে তার ভেতরের কলকব্জাগুলো নড়ে গেছে। অথচ এর থেকেও রিস্কি মিশন সে করেছে। সাংঘাতিক খুনিকে ধরেছে। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে বহুবার দেখেছে সে। অথচ এতোটা ক্লান্ত সে হয় নি। এখানে কাঞ্চনের বদলে অন্যকেউ অপহৃত হলেও কি সে এতোটাই চিন্তিত, উৎকুন্ঠিত হত?
চোখ বুজলো স্নিগ্ধ। অনেকদফা ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেললো। উঠতে যাবে, হঠাৎ হাতের উপর ভার অনুভূত হলো। পাশে ফিরতেই ঠোঁটের কোন বাঁকলো সামান্য। কাঞ্চন তার হাতের উপর ভুট হয়ে ঘুমাচ্ছে। সূর্যের কমলা আলো এসে পড়ছে মেয়েটার মুখে। ভুট হয়ে থাকায় শুধু একপাশ দেখা যাচ্ছে। স্নিগ্ধ স্থির চোখে চেয়ে রইলো কয়েকটা সময়। মস্তিষ্কে একটা কথাই আওড়ালো,
“তোর মনে ঠাঁই না পাই, মস্তিষ্ক জুড়ে রই;
ভালোবাসা নাই বা হই, ঘৃণাই সই।”
হাতে রক্ত জমাট বেঁধে আসছে। ফলে কেমন অবশ হয়ে আসছে। তবুও হাত সরালো না সে। ঠিক ওভাবেই রইলো যতসময় না তার স্ত্রীর ঘুম ভাঙ্গে।
কাজিনমহলের আজ উঠতে একটু দেরি হয়েছে। সবাই গতরাতে খেলা দেখেছে। ভেবেছিলো ব্রাজিল হারবে। হারে নি। পৃথুলা তো রিদমের জন্য তিনটা টিস্যুর বক্স কিনে রেখেছিলো। কিন্তু আফসোস কাজে আসে নি। রিদম ব্রাজিল জিতে যাওয়ায় কিছুক্ষণ নাগিন ডান্স করেছে। তাশদীদও সেই সাথে নেচেছে। সেও ব্রাজিল ভক্ত। যদিও সে পল্টিবাজ। ব্রাজিল হারলেই সে হয়ে যেত ফ্রান্স। আর্জেন্টিনাকে জিততে দেওয়া যাবে না। দুজন মিলে নেচেছে,
“Main teri dushman
Dushman tu mera
Main naagan tu saperaa
Main naagan tu saperaa”
বলেই মাথায় সাপের ভঙ্গি করে পৃথুলা, ইকরাম, তাকবীর এবং অঞ্জনাকে ছোঁবল মারতে গিয়েছে। তাশদীদ তো অঞ্জনাকে ক্ষেপাতে বলেই দিয়েছে,
“বিল্লিরে আর কত পেনাল্টিতে জিতবি, একটু খেলেও জিত।“
এসব ফাজলামিতে রাত তিনটা বেজেছ। এখন সবগুলো ঝিমুচ্ছে। কোনো মতে হাই তুলতে তুলতে পরোটা চিবুচ্ছে। খাওয়ার মধ্যেই পৃথুলার ডাক পড়লো। তার মা মনোয়ারা পটনভী ডাকছেন। খবরটা জানালেন, কাঞ্চনের মেজ চাচী নিহারিকা পটনভী। পৃথুলার খাওয়া থেমে গেলো। মায়ের ডাকের কথাটা শুনতেই কেমন কেঁপে উঠলো সে। বিষয়টা অঞ্জনা ঠিক খেয়াল করলো। রিদম বসেছিলো পৃথুলার ঠিক বিপরীতে। নিহারিকা চাচী যখন জানালেন,
“পৃথুলা তোর মা ডাকে।“
পৃথুলা নড়েচড়ে উঠলো। মনোয়ারা পটনভী পৃথুলার মা। অথচ মহিলার সাথে তার মেয়ের ভালো সম্পর্ক না। পৃথুলা তাকে সর্বোচ্চ এড়িয়ে চলতে চায়। অঞ্জনা তার হাত চেপে বললো,
“আমি যাবো সাথে?”
“না প্রয়োজন নেই।“
বলেই উঠে দাঁড়ালো পৃথুলা। রিদম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। পটনভী মঞ্জিলের ভেতরের গল্পগুলো খুব ভিন্ন। রসুনের পাছা মনে হলেও পরিবারটি ভেতর থেকে খুব ফাঁকা।
মনোয়ারা বেগমের ঘর অন্ধকার। সবগুলো পর্দা টেনে রাখার জন্য কোনো আলো প্রবেশ করছে না। মনোয়ারা বেগম শুয়েছিলেন। পৃথুলা দরজায় কড়া নাড়লেই তিনি উঠে বসলেন। তবে একেবারে উঠে বসতে পারলেন না। হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইলেন। তার গলা ভেঙ্গে গেছে। গাল ফুলে আছে। চোখগুলো লাল টকটকে। চোখে আলো সইছে না। পৃথুলার কণ্ঠ শুনতেই তিনি কড়া স্বরে বললেন,
“আসো।“
“মা, ডেকেছিলে।“
ঘরে প্রবেশ করে পৃথুলা প্রথম যা লক্ষ্য করলো কার্পেটের উপর চকচক করছে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো। মনোয়ারা বেগম হেলান দিয়ে বসা। চোখ মেলে চাইলেন মেয়ের দিকে। প্রচন্ড বিতৃষ্ণাভরা চাহনী। পৃথুলাকে তিনি অপছন্দ করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস এই মেয়েটার জন্য আজকে তার অবস্থা এতোটা করুন। ইলিয়াস পটনভী অর্থাৎ তার স্বামী সবসময় ছেলে চাইতেন। অথচ তার হয়েছে একটা মেয়ে। তাও বেয়াদব।
পৃথুলা মায়ের দিকে করুণ চোখে চাইলো। মায়ের প্রতি এখন আর রাগ হয় না তার। বরং করুণা হয়। একটা নারী এতোটা বলদ আর আত্মসম্মানহীন কি করে হতে পারে তার মাথায় আসে না। মাকে না দেখলে হয়তো কখনো মাথায় আনতেও পারতো না। একজন কুলাঙ্গার পুরুষকে কি আশায় সে ভালোবাসছে? এটা কি আদোপি ভালোবাসা? খুব তাড়া দেখিয়ে শুধালো,
“কি বলার বল।“
“কেনো, তোমার কোন রাজ্যের কাজ আছে শুনি?”
“আমার একটা জীবন আছে, যেটাকে আমি প্রতিদিন বাঁচার চেষ্টা করি।“
মনোয়ারা পটনভী প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে তাকালো পৃথুলার দিকে। পৃথুলা খুব একটা গা করলো না। খুব স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“তুমি ক্লান্ত মা। আমি কি চলে যাব?”
“তোমার বাবা তোমার বিয়ে ঠিক করেছেন।“
“কি?”
“পারভেজের সাথে তোমার বিয়ের কথা হচ্ছে। এখনো জুলফিকার চাচাকে জানানো হয় নি। সব ঠিকঠাক হলে জানানো হবে।“
“এই বিয়েতে বাবার কি লাভ হচ্ছে শুনি?”
মনোয়ারা বেগম চোখ গরম করে চাইলেন মেয়ের দিকে। পৃথুলা একরাশ ক্ষোভ নিয়ে বললেন,
“সে যদি ভেবে থাকে পারভেজের কাছে বিক্রি করে সে লাভবান হবে তবে ভুল। আমার এখনো ভার্সিটি শেষ হয় নি। লাস্ট সেমিস্টার চলছে। এরপর আমি চাকরি করবো। এখন এই বিয়ে শাদীতে আমাকে ভরাবে না।“
বলেই অপেক্ষা করলো না সে। মনোয়ারা পটনভী খুব রেগে গেলেন। বিশ্রী বিশ্রী গালি দিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে বলে দিলেন,
“তুই আমার মুখ দেখবি না বেহায়া মেয়ে মানুষ।“
পৃথুলার দমবন্ধ লাগে মায়ের ঘরে গেলে। এতো অসহ্য কি কখনো লেগেছে তার? না লাগে নি। পৃথুলার বাবা ইলিয়াস পটনভী জুলফিকারের দূরসম্পর্কের বোনের ছেলে। ইলিয়াসের বাবা ছিলেন পটনভী পরিবারের খুব হাতে গোনা পরিবার বহির্ভূত জামাতা। পেশায় ছিলেন শিক্ষক। ইলিয়াস এবং তার তিন ভাইবোনকে খুব ছাপোষা জীবনের মধ্যেই মানুষ করেছেন। বাবার মৃত্যুর পর ইলিয়াসের ঠাঁই হয় পটনভী মঞ্জিলে। ফলে মনোয়ারা পটনভীকে একরকম প্রেমের জালে ফেলেই বিয়েই করেন। জুলফিকার পটনভীর বড়ভাই ইরশাদ পটনভীর বিয়েতে মত ছিলো না। ইলিয়াসকে তার খুব একটা ভালো লাগতো না। কিন্তু মেয়ের পছন্দের বিরুদ্ধেও তিনি যান নি।
সেই সময় পটনভী এন্টারপ্রাইজের মধ্যে সবচেয়ে বড় শেয়ার জুলফিকার পটনভীর বাবার ছিলেন। সেই থেকে তারা তিন ভাই এবং পাঁচ বোন শরীক হন। ইরশাদ পটনভী যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পটনভীদের সব ব্যবসার দায়ভার তার ছিলো। ইলিয়াস পটনভী ভেবেছিলেন তিনি মনোয়ারা পটনভীকে বিয়ে করার ফলে ব্যবসায় খুব ভালো একটা স্থান পাবেন। কিন্তু তার আশায় গুড়েবালি। জুলফিকার পটনভী হাতে বাগডোর যাবার পর থেকে তিনি-ই ব্যবসার সকল দায়ভার সামলাচ্ছেন। তিনি যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু করলে ইলিয়াসের ভাগ্যে ছোট খাটো ব্যবসা সামলানোর দায়িত্বই পড়তে লাগলো। ফরহাদ পটনভীর যখন তিন মেয়ে হলো, ইলিয়াস পটনভী ছেলে কামনা করতে লাগলেন। ছেলে হলে ব্যবসায় তার অগ্রধিকার থাকবে। যেমনটা এখন রিদম, তাকবীর, তাশদীদ পাচ্ছে। তাশদীদ এবং রিদমকে একপ্রকার জোর করে ব্যবসায় বাগডোর ধরানো হচ্ছে। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাদের বিয়ে করে অন্যের ঘরে শোভা হতে হয়।
পৃথুলা হবার পর থেকে ইলিয়াস পটনভীর স্ত্রীর প্রতি রাগ। তার ধারণা তার স্ত্রী একজন অকর্মণ্য নারী। তাই স্ত্রীর প্রতি বিন্দুমাত্র ভালবাসা নেই তার। এখন যখন মেয়েই হয়েছে তাহলে কেন না তাকে কাজে লাগানো হোক। পারভেজ, জুলফিকার পটনভীর মেজো বোনের ঘরের নাতী। তারা থাকে ইন্ডিয়াতে। ইন্ডিয়াতে তাদের বিশাল কারোবার। সেই ঘরে বিয়ে হলে মেয়ে শুধু সুখ করবে বিষয়টা এমন নয়। ইলিয়াসও জামাইয়ের থেকে অর্থের সাহায্য পাবে।
পৃথুলার অসহ্য লাগে। এই যন্ত্রণা থেকে সে পালাতে চায়। খুব দূরে। তৃতীয় তলার পশ্চিমের ঝোলানো বারান্দার রেলিং ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো পৃথুলা। দূর থেকে একজোড়া চোখ তাকে দেখছে নিপুণভাবে। কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস তার নেই। পৃথুলার হাত ধরার যোগ্যতা তার নেই।
স্নিগ্ধের এখন জ্বর নেই গায়ে। কিন্তু রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। খেতে ইচ্ছে করছে না। এখন কিছু না খেলে তার ভারী এন্টিবায়োটিক ঔষধগুলো দেওয়া যাবে না। সার্জারী ডাক্তার এসে দেখে গেছের। জ্বরের কারণ স্বরুপ তিনি ডিহাইড্রেশনকে দায়ী করলেন। বেশি করে পানীয় খাওয়ানোর নির্দেশ দিলেন। ফলে সকালের নাস্তা কর্ণ স্যুপ। কাঞ্চন নিজে কিনে এনেছে। কাঞ্চন স্নিগ্ধের থেকে একটু দূরে দূরে থাকছে। ঘুম ভাঙতেই দেখলো সিমেন্টের বস্তার তার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসছে। তার মাথা সিমেন্টের বস্তার হাতের উপর। তড়াক করে উঠতেই অসভ্য লোকটা শুধালো,
“ঘুম ভালো হয়েছে নিজের পার্সোনাল বালিশে?”
কাঞ্চনের নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলো। আর ঘুমানোর জিনিস পায় নি সে? অসভ্য লোকটা সেই ছুঁতোতে শুধু তাকে উত্যক্ত করছে। কিছু বলছে না শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকছে আর ঠোঁট বাঁকিয়ে আসছে। অসহ্য।
স্যুপের বাটিটা স্নিগ্ধের সামনে রাখলো কাঞ্চন। কোনো কথা বললো না। স্নিগ্ধ একবার তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“খাবো না। সরা।“
“খাবে না কেন?”
“ইচ্ছে করছে না।“
নিরুত্তাপ কণ্ঠ। বলেই হেলান দিয়ে চোখ বুঁজলো। কাঞ্চনের ইচ্ছে হলো বাটিটা দিয়ে এই লোকের মাথাটা ভেঙ্গে দেওয়া যেত! ডেস্কের উপর রেখে যাওয়া ঔষধ গুলোর পাতা ফ্যানের বাতাসে মৃদু কাঁপছে। গতরাতে সে জ্বরে ভুগেছে এখন ঢং করছে। এতো নটকা পুরুষ সে দ্বিতীয়টা দেখে নি। বিরক্ত হয়ে বললো,
“ঢং করছো কেন?”
“আমার ইচ্ছে।“
আবারোও নির্লিপ্ততা। ঠেকা যেন কাঞ্চনের। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে সে রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো। অসুস্থদের মারতে নেই। নয়তো আজকে সত্যি এই লোকের মাথা দুভাগ করে ফেলতো সে। বাটিটা হাতে নিলো। দাঁতে দাঁত পিষে এক চামচ স্যুপ এগিয়ে বললো,
“হা কর।“
বালিশে মাথাটা হেলান দিয়ে ছিলো স্নিগ্ধ। চোখ মেললো সে। ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে ভারী কণ্ঠে বললো,
“ডিল অন হতেই আমার পাঁজরের হাড্ডি একেবারে কামের বউ হয়ে গেছে। পতিসেবা করছে৷ আহা! আমার চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে!”
দিলো তো খোঁচা। কাঞ্চন শান্ত চোখে তার দিকে কিছুসময় চেয়ে শীতল স্বরে বললো,
“তোমার জায়গায় অগাবগা থাকলেও আমি এমনটাই করতাম। এটাকে মানবতা বলে।”
“আমার মানবিক বউ, হাউ সুইট! এবার আমার কপালে একটা চুমু খেয়ে আরেকটু মানবতা দেখানো হোক। কোথায় যেন পড়েছিলাম, হালাল বউয়ের চুমু থেকে বড় ঔষধি আর নেই। একেবারে একশত নাপার জোর!”
কথাটা শেষ হবার আগেই গরম স্যুপ মুখ পুড়ে দিলো সে স্নিগ্ধর। স্নিগ্ধ সাথে সাথে ঠোঁট চেপে ধরলো। জিহবা, ঠোঁট হালকা পুড়ে গেছে গরম স্যুপের ভাপে। অথচ একটিবারও সে তার প্রকাশ করলো না। সিমেন্টের বস্তা কি সামান্য যন্ত্রণা প্রকাশ করে? কাঞ্চন কঠিন স্বরে বললো,
“এতো বাঁচাল হলে কবে থেকে? আগে তো কথাই বের হত না মুখ থেকে। আরেকটা কথা বলেছো তো পেটের সাথে সাথে মুখটাও সেলাই করে দিতে বলবো।“
জিভ দিয়ে ঠোঁটের পোড়া অংশটা ভিজিয়ে নিয়ে হালকা হাসলো স্নিগ্ধ। ঠোঁটের উপর হালকা করে আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে কাঞ্চনের চোখে চোখ রেখে বললো,
“Feisty, just what I like”
“অসহ্য!”
সরফরাজ পটনভীর ঠোঁট পুড়ানোর শাস্তি যে কাঞ্চন এতো অদ্ভূত ভাবে পাবে তার জানা ছিলো না। বিকালে স্নিগ্ধকে ধরে ধরে কিছু সময় হাটাহাটি করানোর পর যখন কেবিনে নিয়ে এলো তখন সে নিজের বেডে না বসে বসলো সোফাতে। গা এলিয়ে কাঞ্চনকে বললো,
“একটু পানি দে।“
কাঞ্চন মগটা এগিয়ে দিতেই লোকটা হাতে দেওয়ার আগে ছেড়ে দিলো। ফলে এক মগ পানি পড়লো ঠিক সোফার উপর। কাঞ্চন তাকাতেই সে বললো,
“উপস, স্লিপড।“
এর মধ্যে ক্ষণিকের জন্য পটনভী বংশের লোক এসেছিলো রোগী দর্শনে। আধাঘন্টার জন্য ঘরটা একটা মাছের বাজার হয়ে গিয়েছিলো। সেই ভেজা সোফায় সানিয়ার হাত থেকে গরম চা পড়লো। একেই এক মগ পানি উপর থেকে এক কাপ চিনি মিশ্রিত চা। সোফা পরিষ্কার করার পরও সেই সোফা শুকালো না। নিজের শোবার কোনো ব্যবস্থা হলো না। কারণ কোনো মাদুর বার কম্বল নেই কাঞ্চনের কাছে। ফলে স্নিগ্ধ তাকে বললো,
“আমার খাটে অনেক জায়গা চাইলে শুতে পারিস।“
“কোনো প্রয়োজন নেই।“
যদিও কাঞ্চন খুব আত্মসম্মান দেখাতে চাইলো। জেদ দেখিয়ে চেয়ারে বসেই রাত কাঁটানোর সিদ্ধান্ত নিলো। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ টিকলো না। খুব ক্লান্ত লাগছে। রোগী সেবা করা, অসুস্থ হওয়া থেকেও ক্লান্তিময়। শরীর ভেঙ্গে আসছে। ফলে নিজের আত্মসম্মানকে একরাতের জন্য “টাইম প্লিজ” বলে সে স্নিগ্ধের খাটের এক কোনায় নিজের চিকন শরীরটা গলালো। স্নিগ্ধ চোখ ডেকে হাসলো। কাঞ্চন কঠিন গলায় বললো,
“হাসবে না।“
“এজ ইউ কমান্ড”
বেডটা খুব প্রশস্ত নয়। কিন্তু কাঞ্চনের মতো চিকন শরীরটা ঠিক এঁটে গেলো। তার চুলগুলো মাথার উপরে খোঁপা করলো। স্নিগ্ধের দিকে পিঠ করে শুলো সে। একটু পর স্নিগ্ধের গাঢ় স্বর কানে এলো,
“ওয়াইফি”
সাড়া দিলো না কাঞ্চন। নড়লো না এক বিন্দু। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেললো যেন মনে হয় সে ঘুমাচ্ছে। স্নিগ্ধ আবার ডাকলো,
“হাড্ডি!”
“…”
“কাঞ্চনজঙ্ঘা!”
“….”
“মিসেস পটনভী!”
“….”
“ফেকুচন্দ্র!”
“….”
“শ্বেতকাঞ্চন!”
একটা সময় বিরক্তির বাঁধ ভাঙ্গলো। কাঞ্চন ঝাঁঝিয়ে উঠে বললো,
“আমি ঘুমাচ্ছি। যন্ত্রণা কর না।”
“তুই কথা বলছিস।”
“আমি ঘুমের মধ্যে কথা বলি, সমস্যা আছে তোমার?”
“তাহলে ঘুমের মধ্যে আমার কথা শোন!”
“পারবো না। আমার কান বন্ধ!”
স্নিগ্ধ কিছু সময় চুপ করে রইলো। তারপর একটা সাংঘাতিক কাজ করলো। একটান দিয়ে কাঞ্চনের উঁচু করে বাঁধা খোঁপাটা খুলে ফেললো। ফলে লম্বা চুল চাঁদরের মতো বিছিয়ে গেলো পিঠময়। কাঞ্চন এবার উঠে তার দিকে চাইলো কঠিন চোখে। ক্রোধিত স্বরে বললো,
“সমস্যা কি তোমার?”
“সমস্যা তোর ঘাড়। চোখে পড়ছে।“
“আমার ঘাড় কি তোমাকে কামড়াচ্ছে?”
স্নিগ্ধ ভারী গলায় খুব আস্তে বললো,
“আমার কামড়াতে ইচ্ছে করছে। It’s….tempting”
ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ১৮
কাঞ্চন স্তব্ধ হয়ে গেলো। বুকের ভেতর একটা তান্ডব শুরু হলো। অথচ লোকটির খুব স্বাভাবিক। এতো সাংঘাতিক কথা এতো শান্ত গলায় কেউ কি করে বলতে পারে। কাঞ্চনের মনে হলো হৃৎপিন্ডটা হাতে চলে আসবে। কান গরম হয়ে গেলো। নিজেকে সামলালো সে। বিরক্ত স্বরে বললো,
“তুমি কি রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার? গুলি খেয়ে মাথার কলকব্জা নড়ে গেছে?”
স্নিগ্ধ এবার একটু উঠলো। মুখখানা এগিয়ে কাঞ্চনের মুখ বরাবর রেখে খুব ধীরে বললো,
“আমার হালাল ওয়াইফ আমার কাছে থাকলে আমার সব কব্জা নড়ে যায়। It’s hard to control.”
