Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪৭

এই অবেলায় পর্ব ৪৭

এই অবেলায় পর্ব ৪৭
সুমনা সাথী

তালুকদার বাড়ির আজ এক ভিন্ন রূপ। সকাল থেকেই চারদিকে হইহই রইরই রব। উৎসবের চঞ্চলতা যেন পুরো বাড়িটাকে গ্রাস করেছে। আজ বাড়ির দুই ছোট সদস্য, ইহান আর ইভানের সুন্নতে খাৎনা। আয়োজনও করা হয়েছে বেশ বড়সড় ভাবে। আমন্ত্রিত অতিথিদের আনাগোনায় চারপাশ মুখরিত। দুপুরের খাওয়ার প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। এই উৎসবমুখর পরিবেশের ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছিল কলরব। চোখে-মুখে চরম বিরক্তি নিয়ে সে টুকটাক কাজে হাত লাগাচ্ছিল। গত রাতে ক্লাবে থাকায় এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি তার। আর সকাল সকালই এই শোরগোলের মধ্যে পড়তে হওয়ায় মেজাজটা খিটখিটে হয়ে আছে। দেখতে দেখতে সকাল গড়িয়ে দুপুর ছুঁইছুঁই। বাড়ির উঠোনের একপাশে অতিথিদের বসার চেয়ার-টেবিলগুলো গুছিয়ে রাখা হয়েছে। এমন সময় রঙিন কাগজে মোড়ানো একটি গিফট বক্স হাতে নিয়ে গেট দিয়ে ভেতরের দিকে এগোচ্ছিল কলরব। কোনো এক অতিথি আসার সময় এটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ভেতরে কাঁচ কিংবা অন্য কোনো ভঙ্গুর জিনিস আছে বোধহয়। বেশ ভারী ঠেকছিল হাতটায়। ঠিক তখনই ঘটল অঘটন। আচমকা একটা বাচ্চা ছেলে হন্যে হয়ে দৌড়ে এসে সজোরে ধাক্কা দিল কলরবকে। অতর্কিত এই ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল সে। সামলানোর শত চেষ্টা করেও পারল না। হাতের বাক্সটি ছিটকে গিয়ে পড়ল বেশ কিছুটা দূরে। কিন্তু বিপত্তির এখানেই শেষ নয়। নিজেকে সোজা করার আগেই কোথা থেকে যেন এক তরুণী হুট করে তার সামনে চলে এলো। কলরবের টালমাটাল শরীরের সাথে ধাক্কা লেগে মেয়েটি ছিটকে আছড়ে পড়ল মাটিতে। কলরব তাকে ধরার বা তোলার কোনো চেষ্টাই করল না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন মাটিতে পড়ে থাকা ওই রঙিন বাক্সটার দিকে। ওটার ভেতরের জিনিসগুলো যে এতক্ষণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এদিকে মাটিতে পড়ে গিয়ে মেয়েটি প্রথমে অপ্রস্তুত হয়ে আশপাশে তাকাল। এরপরই তার চোখ গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কলরবের দিকে। অপমানে আর রাগে মুহূর্তেই তার ফর্সা মুখাবয়ব লাল হয়ে উঠল। ঝড়ের বেগে মাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে তেড়ে এলো কলরবের দিকে। কলরবকে কোনো কৈফিয়ত বা কথা বলার সুযোগ না দিয়েই তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল,
“অসভ্য, ইডিয়ট কোথাকার! চোখে কি সর্ষে ফুল দেখছো? দেখেশুনে চলতে পারো না? নাকি মেয়ে মানুষ দেখলেই এমন অসভ্যতামি করার স্বভাব জেগে ওঠে? তোমাদের মতো ছেলেদের আসলে….!”
কথাগুলো বলতে বলতেই ক্ষোভে কলরবের গালে চড় মারার উদ্দেশ্যে হাত তুলল মেয়েটি। কিন্তু চড়টা আর কলরবের গালে পৌঁছাল না। তার আগেই বিদ্যুতবেগে মেয়েটির হাতটা চেপে ধরল কলরব। এমনিতেই সারা রাতের অনিদ্রা আর সকালের ঝুটঝামেলায় তার মেজাজ চড়ে ছিল সপ্তমে। তার ওপর এই আকস্মিক আক্রমণ। প্রথমে ভেবেছিল ভদ্রতাবশত একটা ‘স্যরি’ বলে ঝামেলা চুকিয়ে দেবে কিন্তু মেয়েটির এমন উদ্ধত আচরণে সেই ইচ্ছেটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। কলরব নিজের রাগ সংবরণ করে দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,

“রিলাক্স! গায়ে দেখছি ভীষণ জোর আপনার।”
মেয়েটি নিজের হাতটা কলরবের শক্ত মুঠো থেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে করতে তেঁতে উঠল,
“হাত ছাড়ো আমার। বলছি হাত ছাড়ো! নয়তো ফল কিন্তু খুব খারাপ হবে। আমি কে, সেই সম্পর্কে তোমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে এই বাড়িতে আজই তোমার শেষ দিন হবে!”
কথাটা শুনে কলরবের মনে হলো সে হয়তো ভুল শুনেছে। মেয়েটি বলছে কী এসব? পরিস্থিতিটা আচমকা এতই হাস্যকর ঠেকল যে, কলরবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে মৃদু হেসে বলল,
“আইচ্ছা? তাই নাকি? আমি তো ভয়ে জমে গেছি! তা মহোদয়া, আপনি কে বলুন তো শুনি? এই বাড়ির মালকিন নাকি? নাকি তার থেকে বড় কিছু।”
মেয়েটি রাগে ফুঁসছিল। তার পরনে সাধারণ একটা কুর্তি। গলায় ওড়না জড়ানো। বাহ্যিক অবয়বে বেশ একটা মার্জিত ও ভদ্র ভাব থাকলেও, তার মুখের ভাষা আর আচরণ যে উগ্র, তা কলরব ততক্ষণে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে। তবে মাথা খাটিয়েও মেয়েটিকে সে চিনতে পারল না। কলরব ঝটকা দিয়ে তার হাতটা ছেড়ে দিল। মুক্ত হতেই মেয়েটি এক হাত দিয়ে অন্য হাতের কবজিটা ডলতে ডলতে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল,

“হাউ ডেয়ার ইউ! তোমার এত বড় সাহস কী করে হয় আমার হাত ধরার? তোমার মতো অসভ্যদের এই বাড়িতে কাজে কে রেখেছে? একটু দাঁড়াও, আমার সাথে এই বেয়াদবির ফল হাতেনাতে পাবে। তোমাকে যদি এখনই এই বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বের না করিয়েছি, তবে আমার নামও আনায়া না!”
আনায়ার কথা শুনে কলরবের সত্যিই পেট ফেটে হাসি পাওয়ার উপক্রম হলো। এই মেয়ে কি তাকে বাড়ির কাজের লোক ভাবছে? পরক্ষণেই নিজের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, বিধ্বস্ত চেহারা আর এমন জামাকাপড় পরনে। এখন বাড়ির অন্যান্য ডেকোরেশন বা ক্যাটারিংয়ের স্টাফদের মতোই দেখাচ্ছে তাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে কলরব শান্ত গলায় বলল,
“দেখুন ম্যাডাম, প্রথমত আমি আপনার সাথে কোনো অসভ্যতামি করিনি। যা হয়েছে তা সম্পূর্ণ একটা দুর্ঘটনা।ইটস অ্যান এক্সিডেন্ট! অযথা জল ঘোলা করে বিষয়টাকে আপনি বড় করছেন। আর আমাকে কাজ থেকে বের করবেন আপনি?”

আনায়া তপ্ত গলায় বলল, “তোমাদের মতো ছেলেদের কায়দা-কানুন আমার খুব ভালো করেই জানা আছে। রাস্তায় বা জনসমক্ষে কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তোমাদের প্রথম কাজ হয় কোনো না কোনো অজুহাতে গায়ে পড়া। তারপর ধরা খেলে সেটাকে খুব সুন্দর করে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ বলে চালিয়ে দেওয়া!”
“এক মিনিট, এক মিনিট! এই যে বারবার ‘তোমাদের মতো ছেলে’ ‘তোমাদের মতো ছেলে’ বলে চিৎকার করছেন। কী বোঝাতে চাইছেন আপনি? এ যাবৎ কয়টা ছেলেকে এভাবে চিনেছেন শুনি? আর আপনি কোন সুন্দরী মেয়ের কথা বলছেন? আশপাশে তো তেমন কাউকে আমি দেখতে পাচ্ছি না!”
আনায়ার রাগ যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল। অপমানে আর ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে কলরবের মুখের সামনে নিজের তর্জনী উঁচিয়ে তীব্র গলায় বলল,
“তোমাকে দেখে নেব আমি! তোমাকে ভুগতেই হবে।”
কলরব বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং চট করে আবারও আনায়ার উঁচানো আঙুলটা খপ করে ধরে নিচে নামিয়ে দিল। তারপর এক গাল হেসে বলল,

“সে তো আপনার কাণ্ডকারখানা দেখেই বুঝতে পারছি। প্রথম দেখাতেই আমার প্রতি আপনি ইন্টারেস্ট ফিল করছেন। কিন্তু কী বলুন তো ম্যাডাম? লাভ নেই। আপনার মতো মেয়ের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। একে তো আপনাকে আমি জীবনে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। তার ওপর এমন উগ্র আচরণের কেউ অন্তত আমাদের চেনা-জানার মধ্যে হতে পারে না। আমার তো দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি কোনো পাগলাগারদ থেকে পালিয়ে সোজা এখানে ঢুকে পড়েছেন। আপনার বাড়ির লোকজনের বলিহারি যাই। রোগ পুরোপুরি সুস্থ না করেই এভাবে বাইরে ছেড়ে দিল কেমন করে?”
একটু থেমে, নিজের কণ্ঠস্বর আরেকটু গম্ভীর ও ধারালো করে কলরব যোগ করল,
“আর হ্যাঁ, পরের বার এভাবে আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলার দুঃসাহস দেখাবেন না। এই আঙুল উঁচানো দেখলে আমার মেজাজটা গরম হয়ে যায়।”
কথাগুলো শেষ করেই কলরব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দীর্ঘ কদমে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পেছন থেকে আনায়ার চিৎকার ভেসে এল,
“তোমার এই ব্যবহারের মূল্য তোমাকে দিতে হবে।”
কলরব পেছনে না তাকিয়েই মৃদু হাসল। সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে ড্রয়িং রুমে গিয়ে ভাঙা বাক্সটা একপাশে রাখল। তারপর উঁচু গলায় ডাকল,

“আম্মু!”
কিছুক্ষণের মধ্যেই অলেখা ড্রয়িং রুমে এসে হাজির হলেন। কলরব বাক্সটার দিকে ইশারা করে বলল,
“আম্মু, এটা মতিন আঙ্কেল আসার সময় নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আসার পথে হাত থেকে একবার পড়ে গেছে। ভেতরে মনে হয় কাঁচের কিছু ছিল।”
অলেখা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে বললেন, “তুই কি একটা কাজও জীবনে ঠিকঠাক করতে পারিস না কলরব? জানি না কবে যে তোর একটু বুদ্ধি-শুদ্ধি হবে, কবে বড় হবি! আর তুই এখনো এই চেহারায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন? চারদিকে অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। যা, জলদি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ভালো একটা জামাকাপড় পরে আয়।”

কলরব মুখটা গোমড়া করে বলল, “আমি আর আসব না এখানে। আমায় কেউ ডাকতেও আসবে না।”
অলেখা চোখ রাঙিয়ে উঠলেন, “কলরব! একদম বাড়াবাড়ি করবি না বলে দিচ্ছি। তোর আব্বু এমনিতেই তোর ওপর রেগে আগুন হয়ে আছে। আর নতুন করে ঝামেলা বাড়াস না। চুপচাপ নিজের ঘরে যা। রেডি হয়ে আয়।”
মায়ের আদেশের পর আর কথা বাড়ানোর সাহস হলো না কলরবের। সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথা নেড়ে সায় দিল। তখনই ঝড়ের বেগে, হন্তদন্ত হয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল আনায়া। ড্রয়িং রুমের একপাশের সোফায় তখন উপস্থিত আছেন আনায়ার বাবা-মা। সেই সাথে আরশাদ তালুকদার, মাজহা আফতাব তালুকদার সবাই সেখানে বসা ছিলেন। আনায়াকে ওভাবে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে ভেতরে ঢুকতে দেখে মাজহা বেশ অবাক হলেন। তিনি কিছুটা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে মা? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
আনায়া এতক্ষণের চড়া সুর নিমেষেই বদলে ফেলল। নিজের গলার স্বর যতটা সম্ভব নরম ও ভাঙা ভাঙা করে, চোখে একরাশ কাল্পনিক অশ্রু এনে ধরা গলায় বলল,
“আমি মাত্রই উঠোনে একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম আন্টি। তখন একটা ছেলে হুট করে এসে আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। শুধু তাই নয়, আমার সাথে অত্যন্ত বাজে ব্যবহার করেছে। কী সব নোংরা কথা বলেছে! আই অ্যাম সো স্যরি আন্টি, কিন্তু এই অপমানের পর আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না।”

আনায়ার মুখে এমন নালিশ শুনে উপস্থিত সবার চোখমুখে উদ্যেগ ধরা দিলো। আর ওদিকে এক কোণে দাঁড়িয়ে কলরব যেন আকাশ থেকে পড়ল। মেয়েটি যে এত বড় মিথ্যা কথা এত সহজে বানিয়ে বলতে পারে তা তার ধারণার বাইরে ছিল। কিছুটা কৌতূহল আর বিস্ময় নিয়ে কলরব আরেকটু সামনে এগিয়ে আসতেই আনায়া বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকাল। মনে মনে সে বেশ খুশিই হলো। শিকার নিজেই খাঁচায় এসে ধরা দিয়েছে। এবার তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া আরও সহজ হবে ভেবে আনায়ার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। কলরব মাজহার দিকে তাকাল। অত্যন্ত শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,
“চাচিআম্মা, এনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না। তোমার কোনো আত্মীয় নাকি?”
মাজহা হাসিমুখে বললেন, “হ্যাঁ রে কলরব। উনি নাফিসা। আমার অনেক পুরোনো আর খুব কাছের বান্ধবী।”
অতঃপর পাশে বসা বান্ধবীকে উদ্দেশ্য করে মাজহা কলরবের পরিচয় করিয়ে দিলেন,
“নাফিসা, ও হলো কলরব। ভাইজানের ছোট ছেলে। আর কলরব, ও হচ্ছে আনায়া। তোর নাফিসা আন্টির মেয়ে। আমরা বড়রা সবাই মিলে ঠিক করেছি, আমাদের কায়েফের সাথেই আনায়ার বিয়ে দেব।”

বিরাট এক আয়নার সম্মুখে বসে আছে রমণী। তার সামনের টেবিলে সারিতে সারিতে সাজানো রঙ-বেরঙের আধুনিক প্রসাধনী। দুজন দক্ষ মেকআপ আর্টিস্ট অত্যন্ত নিখুঁত ছোঁয়ায় তার মুখাবয়বে কারুকাজ করে চলেছে। বিধাতার তৈরি সৌন্দর্যকে আরও দ্বিগুণ করার এক আপ্রাণ প্রচেষ্টা।
এমন সময় ঘরের বন্ধ দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। আয়না থেকে চোখ না সরিয়েই নিযানা অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বলল,
“এসো।”
অনুমতি পেয়ে ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এলেন আনতাসা। নিযানার ঠিক সামনে একটা কাগজের খাম রেখে আমতা আমতা করে বললেন,
“তোমার যাওয়াটা কি আসলেই খুব জরুরি?”
নিযানা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়েই দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল,
“অবশ্যই। না যাওয়ার কী আছে?”

আনতাসা ভালো করে খেয়াল করলেন কুচকুচে কালো শাড়িতে আবৃত মেয়েটিকে। নিযানার আপাদমস্তক দেখে তিনি যেন একপলকে থমকে গেলেন। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল তার। এটা কি আসলেই নিযানা? কী অপূর্ব, কী অলৌকিক সুন্দর লাগছে তাকে আজ! এতটা মায়াবী রূপ যেন আজ অবধি তিনি কারও দেখেননি। অথচ ইশ! এই মেয়েটার জীবনেই কিনা আজ একটা স্থায়ী দাগ লাগতে চলেছে। তাও আবার তাঁর নিজের কারণে! নিজের ভাইয়ের অনুরোধ রাখতে গিয়ে, নিজের মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। তীব্র এক আফসোসে আনতাসের বুকটা ভেঙে আসতে চাইল। চোখের কোণ দুটো অশ্রুতে ছলছল করে উঠল। তিনি ভেজা চোখেই এক চিলতে ম্লান হেসে বললেন,
“মাশাআল্লাহ! কী যে সুন্দর লাগছে তোমাকে, বেবি!”
নিযানা শুধু মৃদু একটু হাসল। মুখে কিছু বলল না। সুন্দর তো তাকে লাগতেই হবে। গত কয়েকটা দিন সে অনেক ভেবেছে। নিভৃতে অঝোরে কেঁদেছে। কিন্তু আর না। ঢের হয়েছে! কলরব তাকে ভালোবাসেনি তার মানে এই নয় যে নিযানার রূপ কিংবা গুণে কোনো কমতি আছে। বরং নিযানাকে হারানোটা কলরবের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। কলরবকে বুঝতে হবে সে কী হারিয়েছে। নিযানা ওকে অনুতপ্ত হতে দেখতে চায়। ওকে আফসোসের আগুনে পুড়তে দেখতে চায়।
ইতিমধ্যে মেকআপের শেষ পর্বটুকুও সম্পন্ন হলো। মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে যে দুজন মেয়ে এসেছিল। তাদের একজন নিযানার চশমাটা টেবিল থেকে তুলে তার দিকে এগিয়ে দিতে গেল। নিযানা আলতো করে হাত তুলে তাকে বাধা দিয়ে বলল,

“ওটার আর দরকার নেই। থাক। আপনারা এবার আসতে পারেন।”
টেবিলে রাখা সেই কাগজের ফাইলটি আলতো হাতে তুলে নিল নিযানা। ধীরস্থিরভাবে খামটি খুলে ভেতরের পাতাগুলো বের করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছু শব্দ। ডিভোর্স পেপার। কাগজের বুকে লেখা প্রতিটি অক্ষর যেন এক বুক নির্মম বাস্তবতা নিয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। নিযানা স্তব্ধ হয়ে একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বুকের ভেতর একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠলেও সে নিজেকে সামলে নিল। চোখের কোণে জমা হওয়া টলমল অশ্রুকণাটুকু চোখের পলকেই লুকিয়ে ফেলল গোপনে। যাতে কেউ তার দুর্বলতা ধরতে না পারে। অত্যন্ত শান্ত, ভাবলেশহীন গলায় সে প্রশ্ন করল,
“ও চলে এসেছে?”
আনতাসা নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। হাত দিয়ে দ্রুত চোখের কোণ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ, নিচে এসে বসে আছে। তুমি তৈরি হয়ে নাও, এসো।”
কথাটা বলে আনতাসা দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন। পেছন পানে চেয়ে ধরা গলায় আমতা আমতা করে বললেন,

“আই অ্যাম সো স্যরি, সোনা!”
মায়ের ভেতরের এই তীব্র অপরাধবোধ আর ছটফটানি নিযানা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিল। আনতাসার পানে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“বারবার এভাবে কেন স্যরি বলছ, মাম্মা? পুরনো কথা বাদ দাও না। তবে তুমি যদি আজ সাথে যেতে। খুব ভালো হতো। মামুও ভীষণ খুশি হতেন।”
আনতাসা একটু ম্লান হেসে বললেন, “তোমাকে বলেছিলাম না সোনা, আজ আমার একটা জরুরি মিটিং আছে। তোমরা যাও। কোনো রকম সমস্যা হলে মাম্মাকে সাথে সাথে কল দিও, ঠিক আছে?”
নিযানা আর কোনো কথা বাড়াল না। কেবল নীরবে মাথা নেড়ে সায় দিল।

সুন্নতে খাৎনার পুরোটা সময় জুড়েই ইহান যা চঞ্চলতা দেখিয়েছে তা এককথায় অবিশ্বাস্য। কিন্তু শেষ মুহুর্তে ভয়ে আর আতঙ্কে সে ডাক্তারকে পর্যন্ত নাজেহাল করে ছেড়েছে। একদিকে যেমন ছটফটানি। অন্যদিকে তেমনি কান্নার রোল। কেঁদে কেঁদে নিজের অবস্থা একেবারে কাহিল করে ফেলেছিল সে। শেষমেশ ওকে সামলাতে গিয়ে বাড়ির বড়দের সবার যেন দম বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। সেই ঝড়ের পর বর্তমানে ঘরের বিছানায় শান্ত হয়ে শুয়ে আছে দুই ভাই। তাদের ঘিরে পাশে বসে আছে কলরব, কায়েফ, আনায়া, কুহু আর দিয়া। কলরবের মেজাজটা সকাল থেকেই খিটখিটে ছিল। আর যখন থেকে সে জানতে পেরেছে এই উগ্র স্বভাবের মেয়েটার সাথেই কায়েফের বিয়ে ঠিক হয়েছে তখন থেকে তার ভেতরের অসন্তোষ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। কায়েফ অবশ্য বরাবরের মতোই শান্ত ও স্বাভাবিক। এদিকে আনায়া কায়েফের পাশাপাশি বসে থাকলেও এখনো পর্যন্ত কারও সাথে একটা কথাও বলেনি। যখন থেকে সে জানতে পেরেছে যে কলরব এই বাড়িরই ছেলে এবং কায়েফের ভাই, তখন থেকেই এক চরম বিব্রতবোধ তাকে গ্রাস করেছে। সে মনে মনে নিজেকেই অনবরত বকে চলেছে। ইহান বিছানায় একটু নড়েচড়ে উঠে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ইভান, এখন তো আর আমাদের স্কুলে যেতে হবে না, তাই না?”
ইভান বিরক্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। যেন সে কত বড় এক পরিপক্ব মানুষ এমন ভঙ্গিতে বলল,
“নাহ্! মাম্মা বলেছে কিছুদিন আমাদের ছুটি। বেশ কিছুদিন পর আমরা স্কুলে যেতে পারব।”
স্কুলে যেতে হবে না। এই বয়সে এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী-ই বা হতে পারে! খুশিতে ইহানের যন্ত্রণাকাতর মলিন চোখ-মুখ এক নিমেষেই ঝলমল করে উঠল। সে মহা উৎসাহে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল,
“আচ্ছা চাচ্চু, মুসলমানি কি জীবনে একবারই হয়?”
পাশে বসা কলরব সংক্ষেপে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, একবারই।”
উত্তরটা শুনে ইহানের ঝলমলে মুখটা মুহূর্তেই আবার মেঘলা হয়ে গেল। কলরব তার মুখের ভাব পরিবর্তন খেয়াল করে হেসে ফেলে বলল,
“একবারের ধকল সামলাতেই তো তুমি পুরো বাড়ির সবার অবস্থা বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিস! আমার মানসম্মানটাই আর রাখলি না। আমার সুযোগ্য শিষ্য হয়ে এত ভীতু হলে চলে বলতো?”
কুহু পাশ থেকে মুখ ভেঙিয়ে ফোড়ন কাটল, “এসেছেন আমার মস্ত বড় গুরু! নিজের বেলায় কী করেছিলে শুনি? তুমিও তো ওর মতোই ঘর মাথায় তুলেছিলে!”
কলরব এক মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেল। কায়েফ বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল। তাদের সাথে যোগ দিল বিছানায় শুয়ে থাকা ইহান ও ইভান। কলরব নিজেকে সামলে নিয়ে উল্টো কিছু একটা বলার মুখ খুলতেই, হুট করে দরজার কাছ থেকে একটা অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আসবো?”
কণ্ঠটা কানে পৌঁছানো মাত্রই কলরবের বুকের ভেতরটা যেন এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল। তীরের মতো এসে বিঁধল শব্দটা। সে চট করে মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে নিযানা! কলরব এক পলকের জন্য চোখ সরাতে পারল না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল। কুচকুচে কালো শাড়িতে আজ নিযানাকে ঠিক কতটা অলৌকিক সুন্দর লাগছে, তা প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা তার জানা নেই। কিন্তু সেই মুগ্ধতা স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। মুহূর্তেই কলরবের ভ্রু জোড়া কুঁচকে কুঁচকে কঠিন হয়ে উঠল। নিযানার ঠিক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অন্য একটি ছেলে। হ্যাঁ, ছেলেটাকে কলরব খুব ভালো করেই চেনে। নিযানার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছেলে, অভিনব। ও হুট করে আজ নিযানার সাথে এখানে কী করছে? তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে কলরব সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছে নিযানাকে সশরীরে এই বাড়িতে দেখে। অমন পরিস্থিতির পর নিযানা যে নিজের থেকে এখানে আসবে, তা সে দূরতম কল্পনাতেও ভাবেনি। কুহু নিযানাকে দেখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উৎসাহের সাথে বলল,
“আরে নিযানা, আয় না! ভেতরে আয়। তুই যে আসবি, আমি তো একদম ভাবতেই পারিনি!”
এক পাশে বসে থাকা আনায়া কিছুটা অবাক চোখে তাকাল দরজার দিকে। সে বুঝলো না কে এই মেয়েটি? নিযানা ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত মার্জিত ও মৃদু এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,

“খুব বেশি লেট করে ফেললাম নাকি?”
কুহু হাসিমুখে উত্তর দিল, “আরে না না, একদম না! আমরা এখনো কেউ খেতে বসিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তুই এসেছিস। এটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। খেয়ে ফেললেও আমি তোর সাথে আবার খেতাম।”
নিযানা ঘরের সবার সাথে কথা বললেও আড়চোখে ঠিকই কলরবের তীক্ষ্ণ ও স্তব্ধ চাহনিটা লক্ষ্য করল। কিন্তু অত্যন্ত সাবধানে সে সেই চাউনিকে উপেক্ষা করে গেল। একবারের জন্যও কলরবের দিকে সোজাসুজি ফিরে তাকাল না। ইহান আর ইভানের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাদের জন্য আনা উপহারের প্যাকেটটা টেবিলের ওপর রাখল। এরপর দিয়ার সাথে হালকা কুশল বিনিময় করলো। তারপর আদর করতে লাগল। কলরব এক কোণে দাঁড়িয়ে নিযানার প্রতিটা মুভমেন্ট, প্রতিটা অবহেলা খুব সূক্ষ্মভাবে দেখল এবং বুঝল। নিযানা যে তাকে এতটা অবলীলায় এড়িয়ে যেতে পারে, তা তার অহংকারে আঘাত করল। নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকাতে সে মনে মনে নিজেকেই একবার শাসাল। তারপর হুট করেই ঘর থেকে বের হয়ে গেল। করিডোর দিয়ে লম্বা কদমে কিছুটা দূর যেতেই পেছন থেকে অভিনবের কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল,
“কলরব, একটু শোনো!”
কলরব থমকে দাঁড়াল। নিজের ভেতরের ঝড়টাকে কোনোমতে চাপা দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক ও শক্ত করে পেছনের দিকে ঘুরে তাকাল। নিযানাকে সাথে নিয়েই ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলো অভিনব। কাছে এসেই অভিনব বেশ ভদ্রতার সাথে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“হ্যালো, নাইস টু মিট ইউ। অনেক দিন পর দেখা হলো তোমার সাথে। কেমন আছ বলো? আমরা তোমার বাড়িতে এলাম অথচ সামান্য একটু ওয়েলকাম টুকুও করলে না!”
কলরব অভিনবের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত মিলিয়ে যান্ত্রিক গলায় বলল,
“আসলে আমার একটা জরুরি কাজ আছে।”
অভিনব বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল। নিযানা হাতে ধরা সেই কাগজের ফাইলটা কলরবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত নিস্পৃহ ও শান্ত গলায় বলল,

“তোমার মূল্যবান সময়টুকু নষ্ট করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
নিযানার সামনাসামনি হতেই কলরব অলক্ষ্যেই একটা শুকনো ঢোক গিলল। মনে মনে এক তীব্র চঞ্চলতা অনুভব করল সে। বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক ওলটপালটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিজের মধ্যকার এই চঞ্চলতা লুকাতে সে এক মুহূর্তের জন্য চোখ জোড়া বন্ধ করে আবার খুলল। মেয়েটার আজ হয়েছেটা কী? এত মায়াবী করে, এত নিপুণতায় নিজেকে সাজানোর কী প্রয়োজন ছিল? কুচকুচে কালো শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে তার রূপ যেন আজ এক অলৌকিক জ্যোতির মতো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যা কলরবের চেনা জগতটাকে এক নিমেষে ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর তার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাতটা এলো নিযানার মুখের দিকে তাকাতেই। তার সেই আজন্ম চশমার আবরণটি আজ অনুপস্থিত। অবারিত, দীর্ঘ পল্লবঘেরা সেই চোখ জোড়ায় আজ কোনো দ্বিধা নেই। কোনো লুকোছাপা বা সংকোচের লেশমাত্র নেই। এক অদ্ভুত নিস্পৃহ অথচ ধারালো স্থির দৃষ্টিতে সে সরাসরি কলরবের চোখের দিকে চেয়ে আছে। নিযানার চোখের ওই অতল গভীরতা আর অবহেলামিশ্রিত শান্ত চাউনি কলরবের বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে দুমড়েমুচড়ে দিল। একটা অজানা হাহাকার আর চাপা আক্রোশ দানা বেঁধে উঠল তার পাঁজরে। নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু, সংযত আর নির্বিকার রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,
“কী এটা?”
“ডিভোর্স পেপার।”
নিযানার মুখ থেকে উচ্চারিত এই দুটি শব্দ যেন পুরো করিডোরের বাতাসকে এক নিমেষে ভারী করে তুলল। কলরব ভেতরে ভেতরে তীব্রভাবে চমকে উঠলেও, বাইরের অবয়বে তার বিন্দুমাত্র প্রকাশ ঘটতে দিল না। মুখের প্রতিটি পেশি শক্ত রেখে সে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল,
“ওহ।”
“সই করে দিও।”
“আচ্ছা।”

কলরবের এই চূড়ান্ত নির্লিপ্ততা আর অনীহা দেখে নিযানার বুকের ভেতরটা অভিমানে আর অপমানে ফেটে যেতে চাইল। এই বরফশীতল ব্যবহার সে আর সহ্য করতে পারছিল না। এই মুহুর্তে তার হাউমাউ করে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করল। কেন যে অবাধ্য মনটা শেষ মুহূর্তেও একবার অলীক আশায় বুক বেঁধেছিল! মনের কোনো এক গহীনে সে চাতকের মতো চেয়েছিল। কলরব যেন কাগজটা হাত বাড়িয়ে না নেয়। ওটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাকে আটকে রাখুক। পরক্ষণেই নিজের এই দুর্বলতার জন্য নিজেকে মনে মনে চরম ধিক্কার দিল নিযানা। কেন এখনো এই পাষাণটার জন্য মনে আশা জাগে তার? নিজেকে তো সে খুব ভালো করেই বুঝিয়েছিল। তবে কেন এই মানুষটার সামনে এলেই জীবনের সব জটিল হিসাব নিমেষে গোলমাল হয়ে যায়? নিযানার সেই অবাধ্য আশা আর মনটাকে আরেকবার নির্মমভাবে গুঁড়িয়ে দিয়ে কলরব নির্বিকার মুখে ফাইলটা হাতে তুলে নিল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল,
“এত তাড়াহুড়োর কী ছিল?”

নিযানা নিজেকে সামলে নিল। ভেতরের রক্তক্ষরণ আড়াল করতে সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভিনবের একটা বাহু আলতো করে জড়িয়ে ধরল। কলরবের চোখের দিকে সটান চেয়ে তপ্ত গলায় বলল,
“দরকার তো ছিলই। যত তাড়াতাড়ি আমাদের এই নামমাত্র সম্পর্কের আইনি বিচ্ছেদ হবে, তত তাড়াতাড়িই আমি অভিনবকে বিয়ে করতে পারব।”
কথাটা শোনামাত্রই কলরবের বুকের ভিতর কিছু একটা যেন প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিযানা আর অভিনবকে এতটা কাছাকাছি, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কলরবের শিরা-উপশিরায় বয়ে চলা সমস্ত রক্তকণিকা যেন তীব্র ক্ষোভে ও ঈর্ষায় টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে নিশ্চয়ই ভুল শুনেছে। তার চোখের সামনে যা ঘটছে তা কোনো বাস্তব নয়। এক দুঃসহ দুঃস্বপ্ন! অভিনব শান্ত গলায় বলল,
“আমরা ভেবেছিলাম ডিভোর্স পেপারটা তুমিই হয়তো পাঠাবে। কিন্তু তোমার দিক থেকে দেরি হতে দেখে শেষমেশ আমাদেরই এটা নিয়ে আসতে হলো।”

কলরব জলন্ত দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকাল নিযানার পানে। সেই দৃষ্টিতে কি ছিলো কে জানে। নিযানার সর্বাঙ্গ এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল। কলরব তার ঠোঁট জোড়া সামান্য প্রসারিত করে কঠিন গলায় বলল,
“আমার সাথে চল। তোর সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।”
নিযানা বলল, “যা বলার এখানেই বলতে পারো।”
“তোর বেশ কিছু জিনিস এখনো আমার ঘরে রয়ে গেছে। ওগুলো আমি আজই তোর হাতে বুঝিয়ে দিতে চাই। ইরিটেড করে ওগুলো আমাকে। চোখের সামনে সহ্য হয় না।”
নিযানার অসুবিধা হবে ভেবে অভিনব তড়িঘড়ি করে বলল,
“ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি তোমার সাথে ঘরে। ওগুলো আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি নিয়ে নিচ্ছি।”
“তুমি কে?”

কলরবের প্রশ্নের মুখে অভিনব মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেল। এই প্রশ্নের জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিব্রতবোধ লুকিয়ে সে মুখে এক চিলতে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু কলরবের অবস্থা তখন পুরো ভিন্ন। তার দুই চোখ রাগে লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। ফর্সা মুখাবয়ব ক্রোধে থমথম করছে। কপালে ও গলায় রাগের রগগুলো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। নিযানা কলরবের এই রূপ খুব ভালো করেই চেনে। কয়েকবার তার এই রূপ দেখার অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। কলরবের ভেতরের এই অস্থিরতা আর ঈর্ষার আগুন দেখে নিযানার বুকের গভীরে এতক্ষণে যেন এক অদ্ভুত আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। সে অবলীলায় মাথা নেড়ে অভিনবকে আড়াল করার ভঙ্গিতে বলল,
“ও ভবিষ্যতে তোমার কোনো বোনের বর হতে চলেছে।”
কলরব এক মুহূর্তও সময় না নিয়ে জবাব দিল, “স্বপ্নে? আমার কোনো বোনই এতটা সস্তা নয় যে যার-তার গলায় ঝুলিয়ে দেব!”

অভিনব প্রথম থেকেই কলরবের উপর বিরক্ত। এতক্ষণ কেবল নিযানার মুখের দিকে চেয়ে সে নিজেকে সংযত রেখেছিলো। কিন্তু এবার তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে যথেষ্ট রেগে গেলেও নিজের কণ্ঠস্বর শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
“কলরব, বিষয়টা ইনসাল্টিং হয়ে গেল না?”
কলরব নিরেট গলায় বলল, “আমি তো তোমাকে ইনসাল্ট করতেই চেয়েছি। তোমার সেই যোগ্যতা আছে বলেই হয়েছ।”
নিযানার দিকে চোখ রেখে যোগ করল, “আর আমি কথা বলছি ওর সাথে, তুমি মাঝখানে আসছ কেন?”
নিযানা শক্ত গলায় বাধা দিল, “কলরব, বিহেভ ইয়োরসেলফ! তুমি কিন্তু নিজের সীমা ছাড়িয়ে বাড়াবাড়ি করছ।”
কলরব তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বলল, “করলে করছি।আমার সাথে ঘরে চল। কয়েক মিনিটের তো ব্যাপার মাত্র। জাস্ট একটা জিনিস জানার আছে আমার। এমন নাটক করছিস যেন এই জীবনে তুই কোনোদিন ওই ঘরে পা রাখিসনি! আর সেখানে গেলেই আমি তোমাকে খেয়ে ফেলব? যাইহোক, তুই নিজে থেকে গেলে ভালো। নয়তো আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

নিযানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল, “ওকে ফাইন! চলো।”
“আমিও সাথে যাব।” অভিনব বলল।
কলরব আড়চোখে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন? তুমি কি ওর বডিগার্ড?”
“আমি তখন থেকে তোমার সাথে যথেষ্ট ভদ্রভাবে কথা বলার চেষ্টা করছি কলরব। আর তুমি ক্রমাগত এমন অদ্ভুত, অভদ্র আচরণ করে যাচ্ছ। সমস্যাটা কী তোমার আসলে?”
অভিনব বেশ চড়া গলায় প্রশ্ন করল। কলরব হুট করেই নিজের গলার স্বর একদম নামিয়ে এনে শান্ত গলায় বলল,
“দেখো ভাই, সকাল থেকে আমার পেটে এক দানা দানাপানি পড়েনি। প্রচুর খিদে পেয়েছে। আর খিদে পেলে আমার মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে থাকে। তেমন কোনো বড় সমস্যা না। তা ছাড়া, এটা সম্পূর্ণ স্বামী-স্ত্রীর পার্সোনাল ব্যাপার। কোনো কাপল ফটোশুট নয় যে তুমি সেখানে গিয়ে ক্যামেরা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাহলে অযথা এসব ফালতু কথা বলে আমার মেজাজটা আরও খারাপ করছ কেন? এমনিতে তো কোনো বিয়ের কার্ড না দিয়ে। এভাবে ডিভোর্সের কাগজ এনে বিয়ের দাওয়াত দেওয়ার মতো এক জঘন্য, ছোটলোকের মতো কাজ করেছ তোমরা!”

অভিনব কিছু একটা বলতে চাইল। নিযানা হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। নরম গলায় বলল,
“আই অ্যাম সো স্যরি অভি।আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি এখানে এসে তোমাকে এমন একটা জঘন্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। তুমি প্লিজ আপাতত কিছুক্ষণ ওয়েট করো।আমি একটু পরেই আসছি।”
কলরব আর দাঁড়াল না। নিজের হাতের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে লম্বা কদমে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। করিডোরের শেষ প্রান্তেই তার ঘর। তাই পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগল না। নিযানা তার পিছু পিছু আসলো। ঘরে ঢুকেই ঝাঁঝালো ও তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
“তুমি কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছ কলরব? এটা কোনো সভ্য মানুষের ব্যবহার হতে পারে? তুমি অভির সাথে এমন জঘন্য ব্যবহার কীভাবে করতে পারলে? আই জাস্ট ওয়ান্ট টু নো!”
কলরব ধীরপায়ে পেছন ঘুরে তাকাল। অদ্ভুত শান্ত ও উদাসীন গলায় বলল,

“ওর সাথে তো আর আমি কোনো সুমধুর আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতে যাচ্ছি না! তাহলে অযথা ওকে জামাই আদর করতে যাব কেন, শুনি? আমার দ্বারা ওসব সস্তা ন্যাকামি অন্তত সম্ভব না।”
নিযানা ক্ষোভে ফেটে পড়ে আরও কিছু একটা বলতে মুখ খুলেছিল মাত্র, কিন্তু তার আগেই ঝড়ের গতিতে ঘটনাটি ঘটে গেল। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই কলরব তার এক হাত ধরে এক তীব্র ও অনমনীয় টানে ঘরের একেবারে ভেতরে টেনে নিল তাকে। নিযানা আকস্মিক এই টানে নিজের শরীরের ভারসাম্য সামলাতে পারল না। ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল বিছানার নরম তোষকের ওপর। ধাক্কাটা সামলে নিয়ে, চুলগুলো একহাতে সরিয়ে মাথা তুলতেই নিযানার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে দেখল কলরব দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিচ্ছে। খটাস করে লক পড়ে যাওয়ার শব্দটা যেন নিযানার বুকের ভেতর গিয়ে আছড়ে পড়ল। এক অজানা আশঙ্কায় ও বিস্ময়ে ভেতরটা জমে পাথর হয়ে গেল তার। বিছানায় আধবসা অবস্থাতেই আমতা আমতা করে বলল,

এই অবেলায় পর্ব ৪৬

“কলরব! কী করছো তুমি? দরজা কেন বন্ধ করছ হ্যাঁ? দরজা খোলো!”
কলরব মৃদু হাসলো। তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “তুই একটু আগে আমাকে যে সারপ্রাইজটা দিলি না? তার জন্য তোকে একটু বিশেষভাবে পুরস্কৃত করাটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তোকে অ্যাওয়ার্ড দেব৷”

এই অবেলায় পর্ব ৪৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here