Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪৫

এই অবেলায় পর্ব ৪৫

এই অবেলায় পর্ব ৪৫
সুমনা সাথী

একটা কাঠের চেয়ারে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে ছেলেটা। জায়গাটা ক্লাব ঘর। ঘরের এক কোণায় একটা ক্যারাম বোর্ড পড়ে আছে আর চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটা চেয়ার, বেঞ্চ আর টেবিল। ছেলেটার বাঁ হাতের দুই আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট। মাঝে মাঝেই বড্ড তাচ্ছিল্যের সাথে ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে সে তাতে। ওর মুখ আর নাসিকারন্ধ্র গলে বের হওয়া ধোঁয়ার ধূসর ফোয়ারায় পুরো ঘরটা জমে উঠেছে। কলরবের মেজাজটা চটে ছিল। দরজায় এসে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। একেবারে বাঘের মতো তেড়ে গিয়ে, কোনো প্রকার পূর্ব সংকেত ছাড়াই একটা সপাটে লাথি বসাল আযানের বসা চেয়ারটায়। মুহূর্তের মধ্যে চেয়ারসহ উল্টে গিয়ে মেঝেতে ছিটকে পড়ল আযান। ওর হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা ছিটকে গিয়ে পড়ল দূরের এক কোণে। ঠিক পাশে বেঞ্চে বসা রফিক নামের ছেলেটা আতঙ্কে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। হুট করে কলরবকে এভাবে চোখের সামনে দেখে নিজের চোখ দুটো যেন কোটর থেকে ফেটে বের হওয়ার উপক্রম হলো। এই ঘরে এই মুহূর্তে ওরা মোটে দুজনই উপস্থিত। এখানে যে এখন বড়সড় একটা ঝামেলা হতে চলেছে তা রফিক খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। কী করবে বা কীভাবে নিজেকে বাঁচাবে তা ভেবেই বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল ওর। মাটিতে পড়া আযান সামলে উঠে দাঁড়ানোর আগেই কলরব ঝুঁকে পড়ল ওর ওপর। নিজের ভেতরের সবটুকু পুঞ্জীভূত রাগ মেটাতে উন্মাদের মতো উপরিউপরি কিল-ঘুষি বসাতে লাগল আযানের মুখ আর শরীরে। রফিক ওভাবে আযানকে মারতে দেখে ভয়ে আর ক্ষোভে চেঁচিয়ে উঠল,
“কলরব! এসব কী করছিস তুই, হ্যাঁ? খুব খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু বলে দিচ্ছি! ছাড় ওকে!”
আযানকে বাঁচানোর জন্য এক পা এগোতেই। পেছন থেকে অভিক এসে ওর দুই হাত চেপে ধরল। মুখে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলল,

“আস্তে রফিক ভাই। খুব তাড়া দেখছি তোমার! তুই মাঝখানে কেন ফালতু নাক গলাচ্ছিস বল তো? এখন তো দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ বা ভাষা আন্দোলন হচ্ছে না যে তোকে অকারণে শহীদ হয়ে দেশের ইতিহাসে নাম লেখাতে হবে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখ!”
রফিক তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল, “খুব খারাপ হচ্ছে অভিক! আমাদের আজ একা পেয়ে তোরা ক্ষমতা দেখাচ্ছিস তাই না? তোদের সব কয়টাকে আমি দেখে নেব!”
শান্ত গম্ভীর মুখ নিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ। যা দেখার বিয়ের আগেই দেখে নিস। কারণ বিয়ের পর আমি আর কোনো পরপুরুষের সামনে যাব না বলে ঠিক করেছি। এটা একটা গুনাহের কাজ।”
কলরব চারপাশের কোনো কথায় কান না দিয়ে ইচ্ছামতো নিজের হাতের সুখ করে রাগ ঝাড়তে ব্যস্ত। এমন অতর্কিত ও আংশিক আক্রমণে আযান নিজের হাত দুটো দিয়েও ঠিকমতো নিজেকে বাঁচাতে পারছিল না। ওর ঠোঁটের কোণ গলে ততক্ষণে র’ক্তের লালচে রেখা নেমে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ পর, হাঁপাতে হাঁপাতে একটুর জন্য থামল কলরব। আযানের বুকের ওপর নিজের একটা হাঁটু শক্ত করে চেপে রেখে, দুহাতে আযানের শার্টের কলারটা এমনভাবে মুচড়ে ধরল যেন দম আটকে আসে। আযানের মুখটা মেঝে থেকে সামান্য উঁচুতে তুলে, চোখের দিকে চেয়ে বড্ড চড়া গলায় বলল,
“হোয়াটসঅ্যাপ ব্রো! বহুত দিন পর দেখা হলো তাই না? তা কেমন আছিস বল? মানুষের পেছনে জাউরামি করে দিনকাল নিশ্চয়ই তোর ভালো যাচ্ছে। কী বলিস?”

কিল আর ঘুষির আঘাতে আযানের মুখটা ইতিমধ্যেই জখম হয়ে গেছে। কেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণ গলে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। তবুও ওর চোখ দুটো যেন এক হিংস্র আক্রোশে জ্বলছে। রাগে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ওর অক্ষিগোলক। তেজী গলায় বলল,
“তোর সাহস হলো কী করে, কলরব?”
“এই প্রশ্নটা তো আমি তোকে জিজ্ঞেস করতে এসেছি! তোর সাহস হলো কী করে?”
কলরব তার কলারের বাঁধন আরও শক্ত করে ঝাঁকুনি দিল। আযান রক্তাক্ত ঠোঁট দুটো মেলে এই অবস্থাতেও খিলখিল করে হেসে উঠল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“উফফ! বউয়ের প্রতি দেখি প্রেম উথলে উঠছে তোর! তা, ইরার কী হলো? ইশ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম! সে তো তোকে লাথি মেরে ছেড়ে চলে গেছে, তাই না?”
কলরব রাগল না বরং ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, ছেড়ে তো দিয়েছে। তবে আফসোস। তোকে কিন্তু সে তখনো পাত্তা দেয়নি আর এখনো ধরেনি। তুই শালা আগেও লুজার ছিলি এখনো লুজারই রয়ে গেলি। সো স্যাড ব্রো! এতদিন পর তোর এই ফালতু মুখটা আবার দেখতে হবে। আমি ভাবিনি।”

আযান চোখ ছোট করে দাঁত বের করে বলল, “আমিও ভাবিনি কিন্তু তোর বউটা ভাই! কী জোস দেখতে! যখনই রফিক বলল ওটা তোর বউ, আমি কসম খেয়ে বলছি। নিজেকে আর আটকাতেই পারলাম না। যাই বলিস, তোর কপালটা মাইরি চড়া! আগেরটা যদি সোনা হয়, তবে এবারেরটা পুরাই ডায়মন্ড রে ভাই…!”
কথাটা অব্যক্ত রইলো। আযানের মুখমণ্ডল লক্ষ্য করে পরপর আবারও কয়েকটা সপাটে ঘুষি পড়ল। রাগে তখন ফুঁসছে কলরব। ওর নাসিকারন্ধ্র কাঁপছে তীব্র ক্ষোভে। উন্মাদের মতো এদিক-ওদিক তাকাল কয়েকবার। হঠাৎই নজরে এল ঘরের কোণায় ধুলোবালি মেখে পড়ে থাকা একটা কাঠের ক্রিকেট স্টাম্প। আযানের বুকের ওপর থেকে বসা ছেড়ে সে দ্রুত পায়ে গিয়ে এক ঝটকায় তুলে আনলো সেটা। আযান ভাবতেও পারেনি পরিস্থিতি এত দূর গড়াবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্টাম্পের শক্ত কাঠের বাড়ির ওপরে বাড়ি পড়তে লাগল ওর শরীরে। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল আযান। কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রফিক ভয়ে চিৎকার করে উঠল,

“কলরব! স্টপ৷ খুব খারাপ হবে কিন্তু!”
শান্ত এতক্ষণ পুরো ঘটনাটা শান্তভাবে দেখলেও আচমকায় কপাল কুঁচকে গেল। সে আদতে কিছুই জানতো না। কলরব ডেকেছে সে চলে এসেছে। অবাক হয়ে বলল,
“এ নিযানাকে ডিস্টার্ব করেছে? নিযানা…!”
“ভাবি বল!”
চিৎকার করে গর্জে উঠল কলরব। প্রচন্ড রাগে পুরো শরীর কাঁপছে তার। চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে। পুরোপুরি হতজ্ঞানশূন্য। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। শান্ত গম্ভীর মুখটা ধরে রেখেই কলরবের সাথে তাল মিলিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“ওই হ্যাঁ, ভাবি! এ্যাঁ? কী বললি তুই?”
অভিক সহ্য করতে না পেরে পাশ থেকে শান্তর পায়ে সপাটে একটা লাথি মারল। শান্ত “উফ” করে ওঁর দিকে তাকাতেই অভিক চোখ বড় বড় করে ইশারায় বোঝাল। কলরবের মাথা এখন পুরোপুরি গরম। এভাবে মারলে আযান আজ সত্যি সত্যি লাশ হয়ে যাবে। সে শান্তকে আটকাতে বলল। শান্ত পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দেরি করল না। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কলরবকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে স্টাম্পটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। উদ্বিগ্ন গলায় বলল,

“কলরব, কী করছিস তুই? মাথা ঠাণ্ডা কর! এভাবে মারিস না ওকে। কলরব, ছাড় বলছি… শান্ত হ!”
কলরব থামল কিছুক্ষণ পর। আযানের অবস্থা তখন পুরোপুরি বেহাল। কলরব ভারী শ্বাস ফেলতে ফেলতে আযানের খুব কাছে মুখটা নামিয়ে ঝুঁকে বসল।
“এখন বল। কী যেন বলছিলিস ডায়মন্ডের গল্প? শুনি একটু?”
আযান ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে কাঁপা গলায় বলল,
“আমাদের একা পেয়ে এখানে জোর দেখাচ্ছিস? ক্ষমতা থাকলে একা একা সবার সামনে মোকাবেলা করতিস। কাপুরুষ কোথাকার! আর তোর কী মনে হয়? তোকে আমি ভয় পাই? তুই একটা আস্ত বেইমান কলরব! একটা মেয়ের জন্য সেদিন আমাদের এতদিনের বন্ধুত্বের কথা তুই একবারও ভাবিসনি। আর আজকে আরও একটা সামান্য মেয়ের জন্য আমাকে এভাবে মারছিস?”
“সামান্য মেয়ে?”

কলরবের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে গেল আযানের ওপর,
“যখন ও স্রেফ আমার ফুফাতো বোন ছিল তখনও ওর দিকে কাউকে আমি চোখ তুলে তাকাতে দিইনি। আর এখন তো ও আমার বিবাহিতা বউ! তুই সবটা জেনেও ওর সাথে এমন কুরুচিপূর্ণ ব্যবহার করার সাহস পেলি কী করে? আর বন্ধুত্বের কথা বলছিস? ওটা তুই অনেক আগেই নিজের স্বার্থের জন্য ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলিস। আমাদের অতীতে আমার ভুল কতটা ছিল আর তোর নোংরামি কতটা ছিল তা সবাই জানে। তোর ওই কালকের ফালতু নোংরামির জন্য মেয়েটার পুরো একটা দিন বাজে কেটেছে। কান্না করতে করতে চোখমুখ ফুলিয়ে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে। তোকে এই সামান্য একটু অশান্তি আর উপহার না দিয়ে আমি কীভাবে থাকি বল? অত্যন্ত দুঃখিত ভাই। তবে আশা করি, আজকের পর আর ওমন চুলকানি তোর হবে না। সোনা বাচ্চার মতো থাকবি!”
আযান একপাশে থু ফেলল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“আজকের পর যদি কোথাও দেখা হয় তবে বিষয়টা এর চেয়েও মারাত্মক খারাপ হবে কলরব। পারলে নিজের ঘরের বউকে ঘরে তালা মেরে রাখিস।”
“ওর দিকে এরপর যদি কোনোদিন ভুল করেও চোখ তুলে তাকাস তবে এই কলরব নিজের হাতে তোর ওই চোখ দুটো কোটর থেকে উপড়ে ফেলবে। আজ তোকে স্রেফ একটা ট্রেইলার দিয়ে গেলাম। পরের বার পুরো থ্রিলার মুভি দেখাবো। ক্লিয়ার? আর পারলে তোর ওই সব কয়টা কুকুর-বিড়াল চামচাদের নিয়ে আমার ক্লাবে আসিস। পারলপ ছিঁড়িস কিছু।”
অভিক বলল, “হ্যাঁ, আসিস। আমি তোদের জন্য স্পেশাল আকিজ বিড়ির ব্যবস্থা করে রাখবো। শালা গরীবের দল! লাকি খাচ্ছে।”
আযান মাটিতে শুয়ে জোরে জোরে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“সব মনে থাকবে আমার। হিসাবের খাতা আমিও খুলবো।”

মূলত কলরবের নামে কমপ্লেনটা করেছে আযানের বাবা। একমাত্র ছেলেকে এভাবে নির্মমভাবে মারধর করার অপরাধে সে আইনের আশ্রয় নিয়েছে। আরশাদ তালুকদার কড়া গলায় কলরবকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলেন। সে আযানের মতো একটা ছেলের গায়ে এভাবে কেন হাত তুলেছে? কিন্তু কলরব নিজের জেদ বজায় রেখে আসল কারণটা, অর্থাৎ নিযানার অপমানের কথাটা মুখ ফুটে কাউকেই বলেনি। ব্যাস। তাতেই আরশাদ তালুকদারের মেজাজটা চরম চটে গেল। নিজের ছেলের এমন বেপরোয়া ও উশৃঙ্খল আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ওসিকে সাফ জানিয়ে দিলেন। তার এই ছেলেকে যেন সোজা জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এমন কুলাঙ্গার ছেলে জেলের ভাত খেলেও উনার কিচ্ছু যায় আসে না। কলরবও বাবার এই অবহেলা দেখে একরাশ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে পুলিশের গাড়িতে গিয়ে খুশি খুশি বসে পড়েছিল।বর্তমানে থানার এক অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে সাধারণ লকআপের মধ্যে বেঞ্চে বসে দেওয়ালের দিকে চেয়ে আছে ও। ঠিক তখনই দেখলো দিব্য এসে দাঁড়িয়েছে। কলরব মুখ তুলে ভাইয়ের দিকে কয়েকবার চাইল। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিলো। দিব্য একা আসেনি। সাথে করে নিয়ে এসেছে নামী উকিলকে। দিব্য থানার ওসির সাথে অত্যন্ত রাশভারী গলায় কথা বলে টেবিলের সামনের একটা চেয়ারে গিয়ে বসল। কাউকে একটা জরুরি ফোন করালো। সাধারণ কথাবার্তা বলতে লাগলো। লকআপের ভেতর থেকে কলরব বেশ কিছুক্ষণ ওদিকের সবকিছু খেয়াল করার পর আর সহ্য করতে না পেরে নিজের দুই হাত লোহার শিকের ফাঁক গলে বের করে গলা উঁচিয়ে ডাকল,

“ভাইয়া! আগে আমাকে এইখান থেকে বের করতে বলো না প্লিজ। আমার মাজাটা পুরো ব্যথা হয়ে গেছে!”
দিব্য বিরক্ত চোখে লকআপের ভেতরে থাকা ভাইয়ের দিকে তাকাল। সামান্যতম ভয়ডর, অনুশোচনা কি এই ছেলের মধ্যে বিন্দুমাত্র নেই? ধমক দিয়ে বলল,
“জাস্ট শাট আপ, কলরব! তোকে এইখান থেকে বের করতে কে এসেছে শুনি? ওখানে চুপচাপ বসে থাক।”
কলরব মোটেও দমল না। সে লোহার শিক দুটো দুই হাতে ধরে বড্ড নির্বিকার মুখে বলল,
“তাহলে কি তুমি উকিল নিয়ে স্রেফ ওসির হাতের কফি খেতে পুলিশ স্টেশনে এসেছ?”
দিব্য ওর এই ত্যাঁদড়ামির জবাবে কিছু বলার আগেই থানার অফিসার ইনচার্জ হালকা করে হেসে উঠলেন। বললেন,

“শান্ত হও দিব্য। তোমার ভাইকে ধমকে কোনো লাভ নেই। এই বয়সের ছেলেপুলে সাধারণত একটু এমনই বেপরোয়া হয়। যাই হোক, একটা ভেতরের কথা বলি। তোমার বাবা যদি নিজে থেকেও চেষ্টা করতেন তবুও আজ ওকে বাড়ি থেকে ছাড়াতে পারতেন না। ওপর মহল থেকে আমাদের ওপর কড়া অর্ডার ছিল আযানের বাপের কমপ্লেনের ভিত্তিতে ওকে থানায় আনতেই হবে। তাই আমরাও বাধ্য হয়েছি।”
দিব্য ওসির কথার পিঠে মৃদু মাথা নাড়ল। তখনই থানার সদর দরজার পর্দা ঠেলে কাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটা হাজির হলো। আযানের বাবা প্রতাপ শেখ। থানার ভেতরে দিব্য তালুকদারকে সশরীরে বসে থাকতে দেখে তিনি কিছুটা থমকালেও স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে গম্ভীর গলায় বললেন,
“আরে, দিব্য যে! তা থানায় কেন? ছোট ভাইকে ছাড়াতে এসেছ বুঝি?”
দিব্য নিজের বসা চেয়ারটা ছেড়ে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। রাশভারী চওড়া অবয়ব আর চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি প্রতাপ শেখের দিকে স্থির করে ধারালো গলায় বলল,
“উঁহু প্রতাপ কাকু। আপনি ভুল ভাবছেন। আমি এখানে আপনার ছেলের নামে একটা কেস ফাইল করতে এসেছি।”

মুহূর্তের মধ্যে প্রতাপ শেখের মুখের সমস্ত দাপট এক লহমায় উবে গেল। অহংকারী চোয়ালটা ঝুলে পড়ল। উত্তেজিত হয়ে চড়া গলায় বলে উঠল,
“কী! ফাজলামি পেয়েছ তোমরা তালুকদার বাড়ির ছেলেরা? প্রকাশ্য দিবালোকে অন্যায় করল তোমার ভাই। আমার একমাত্র ছেলেকে পিটিয়ে হাসপাতালের বেডে পাঠাল সে। আর তুমি এখন উল্টো আমার ছেলের নামেই কেস করবে?”
দিব্য তাচ্ছিল্যের সাথে মাথা নাড়ল, “অবশ্যই করব। তাও যে সে ছোট বাচ্চাদের মতো হাতাহাতি, মারামারি কিংবা খামচাখামচির সস্তা কেস না। আপনার ছেলের নামে আমি সম্মানহানি এবং ইভটিজিং-এর জামিন অযোগ্য কেস দেব। নিজের ছেলের কুরুচিপূর্ণ কুকর্ম সম্পর্কে বিন্দুমাত্র না জেনেই, অন্যের ছেলেকে ক্ষমতার দাপটে জেলে ভরতে এসেছেন? বিষয়টা ফানি আর লজ্জাজনক, তাই না?”
“কে বলেছে তোমাকে এসব আজেবাজে কথা, হ্যাঁ? আমার ছেলে কাকে ইভটিজিং করতে যাবে?”
“আমার ছোট ভাইয়ের বিবাহিতা স্ত্রী, নিযানাকে। পুরো ক্লাসের সামনে অসম্মান করেছে ও।”
প্রতাপ শেখের গলা কাঁপতে লাগল, “এটা হতেই পারে না! তোমরা… তোমরা স্রেফ এই কেস থেকে বাঁচাতে মিথ্যা ফাঁদে ফাঁসাতে চাইছ, আমার ছেলেকে!”

দিব্য একটু হাসি হাসল। পরনের সুটটা টেনে ঠিক করতে করতে বলল,
“দেখুন প্রতাপ কাকু, আপনাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আইনের ধারা বোঝানোর মতো ফালতু সময় আপাতত আমার নেই। আপনি বরং এখন নিজের ছেলের ক্যারিয়ার বাঁচানোর জন্য যা করার করার চেষ্টা করুন। একটা সামান্য হাতাহাতির বিষয় নিয়ে আপনি আপনার ক্ষমতার গরমে আমার ভাইকে থানার লকআপ অব্দি টেনে নিয়ে এনেছেন। খুব শখ আপনার! আমি যদি এবার আপনাকে আর আপনার ওই সোনার ছেলেকে কোর্টের বারান্দা অব্দি টেনে নিয়ে গিয়ে জুতো ক্ষয় না করাতে পারি। তবে তালুকদার বাড়ির বড় ছেলের ক্ষমতা আর পরিচয় আজ থেকে তুচ্ছ হয়ে যাবে। আপনার এই নোংরা চালটা চালার আগেই আমাকে আর আমাদের ক্ষমতাটা একটু ভালো করে পরখ করে নেওয়া উচিত ছিল। উকিল আংকেল চলুন।”
দিব্য কথাগুলো শেষ করে প্রতাপ শেখের আর কোনো প্রত্যুত্তরের জন্য অপেক্ষা করল না। টান পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। একজন কনস্টেবল লকআপের তালা খুলে একটু আগেই কলরবকে ছেড়ে দিয়েছিল। সে-ও নিজের শার্টের হাতাটা ঠিক করতে করতে ত্রস্ত পায়ে দিব্যর পেছন পেছন থানা থেকে বেরিয়ে এলো।।থানার সদর তোরণ পার হতেই কলরব পেছন থেকে ডাকল,

“ভাইয়া শোনো! একটু দাঁড়াও না।ভাইয়া!”
দিব্য নিজের গাড়ির সামনে দাঁড়াল। কলরব ওর পাশে এসে একগাল হেঁসে বলল,
“আচ্ছা ভাইয়া, একটা জিনিস বুঝলাম না। তুমি তো একটু আগে ওসির রুমে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে বললে যে তুমি আমাকে ছাড়াতে আসোনি! তাহলে ওই কনস্টেবল ব্যাটা হুট করে লকআপের দরজা খুলে আমাকে এভাবে বের করে দিল কেন, হ্যাঁ?”
দিব্য গাড়ির লকটা আনলক করে এক দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। ওর চোখে-মুখে তখনো এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। ভারী গলায় বলল,
“কারণ একজন আমার কাছে এসে আকুল হয়ে তোর জন্য রিকুয়েস্ট করছিল। তাকে আমি কথা দিয়ে এসেছিলাম যে তোকে সুস্থ-সবল অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব। স্রেফ ওর সেই বিশ্বাস আর ওর দেওয়া কথাটুকু রাখার জন্যই আজ আমি এই কাজটা করেছি।”
কলরবের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো কিছুটা আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
“নিযানা? ও… ও তোমাকে এসব কথা বলেছে? কিন্তু ও কীভাবে জানল যে আমি আযানকে মারতে গিয়েছি? আমি তো এই মারামারির ব্যাপারে কাউকেই একটা শব্দও বলিনি!”

তালুকদার বাড়ির মস্ত বড় ড্রয়িং রুমটায় এই মুহূর্তে এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। সেখানে বাড়ির ছোট-বড় মোটামুটি সবাই উপস্থিত। সোফায় বসে আছেন নিযানার বাবা নওয়াজ চৌধুরী। ওর চোখমুখ লাল, রাগে-ক্ষোভে তিনি রীতিমতো ফুঁসছেন। আনতাসা তার পাশে বসে ওনাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতির মাঝেই প্রধান দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল দিব্য আর কলরব। ওদের দেখামাত্রই সোফাটায় একটু সোজা হয়ে বসে অলেখা স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন,
“ওই তো, ওরা চলে এসেছে। আমি তো আগেই বললাম, নওয়াজ ভাই, দিব্য যখন গেছে। ও ঠিক কলরবকে সাথে করেই নিয়ে আসবে।”
কলরব ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই চারপাশের থমথমে পরিবেশটা এক নজরে পরখ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। সবার মুখ যেন আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো হয়ে আছে। তবে আচমকা শ্বশুর নওয়াজ চৌধুরী আর আনতাস উপস্থিত দেখে সে মনে মনে বেশ বিব্রত বোধ করল। তারা কেন এই বাড়িতে হুট করে ছুটে এসেছেন তা পুরোপুরি অজানা। নওয়াজ চৌধুরী কলরবের দিকে তীক্ষ্ণ, ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

“যা শুনলাম তা কি সত্যি? তুমি ওই প্রতাপের ছেলেটাকে মেরেছ, তাই না?”
কলরব সরাসরি কোনো জবাব দিল না। সে একবার নওয়াজ চৌধুরীর পাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিযানার পানে চাইল। নিযানা তখন একরাশ অসহায়ত্ব চোখ নিয়ে ওর দিকেই চেয়ে আছে। কলরব একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে নিজের মাথাটা মৃদু নাড়াল। অর্থাৎ, সে মেরেছে। নওয়াজ চৌধুরী সোফা ছেড়ে ঝট করে দাঁড়িয়ে উঠলেন। হাতের আঙুলটা নিযানার দিকে তাক করে ক্ষিপ্ত গলায় বললেন,
“দেখেছ নিযানা? এই এমন একটা দায়িত্বজ্ঞানহীন, উশৃঙ্খল ছেলের জন্য তুমি আমার স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করে এই বাড়িতে ছুটে এসেছ? যে মাঝরাতে উন্মাদের মতো বেপরোয়া গতিতে বাইক চালিয়ে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে পড়ে থাকে। কথায় কথায় রাস্তায় মারামারি করে থানা-পুলিশের লকআপে যায়! নিজের ঘরে একটা বউ রেখে যে…!”
বাবার মুখ প্রচ্ছন্ন কোনো ইঙ্গিত বের হওয়ার উপক্রম হতেই নিযানা আতঙ্কে শিউরে উঠল। মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে আকুল হয়ে উঠল,
“আব্বু! প্লিজ।”

কলরব বিস্ফোরক নয়নে শ্বশুরের দিকে তাকাল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে ও অপমানে স্থির হয়ে গেল। নওয়াজ চৌধুরী নিযানার আকুলতায় কান না দিয়ে পুনরায় সবার সামনে চড়া গলায় বলতে লাগলেন,
“শুধুমাত্র আনতাসার ইচ্ছের কথা ভেবে আমি এই বিয়েটা মেনে নিয়েছিলাম। ওর ওই অন্ধ জেদের কারণেই এই ছন্নছাড়া ছেলেটাকে জামাই হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমি বিয়ের আগেই ওর স্বভাব সম্পর্কে ভালো করে জানতাম। মনে মনে ভেবেছিলাম, বিয়ের পর মাথায় একটা সংসারের দায়িত্ব পড়লে হয়তো ছেলেটা একটু শুধরে যাবে। কিন্তু না! বিয়ের পর থেকে ও একের পর এক ভুল করেই গেছে। ও বদলে যাওয়া তো দূর, ওঁর এই নোংরা কীর্তিকলাপের জন্য এখন লোকসমাজে লজ্জায় আমার নিজের মাথা কাটা যাচ্ছে। এমন একটা উশৃঙ্খল, বেপরোয়া ছেলের সাথে আমার মেয়ে সারাজীবন একটা ঘরে থাকবে? ওর ভবিষ্যৎ কী?”

আনতাসা পরিস্থিতি আরও বেগতিক হওয়ার আগেই মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ওনাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই কলরব শান্ত, নিস্পৃহ গলায় বলে উঠল,
“নিয়ে যান আপনার আদরের মেয়েকে।”
মুহূর্তের মধ্যে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সকলের স্তম্ভিত দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো কলরবের পানে। ছেলেটার পুরো চোখমুখ তখন এক অদ্ভুত, অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করেছে। নিযানার বুকের ভেতরটা এক ধাক্কায় যেন খালি হয়ে গেল। মনে হলো সে বোধহয় ভুল কিছু শুনেছে। কান দুটো ঝাঁঝাঁ করতে লাগল। আনতাসা কলরবের দিকে দু-পা এগিয়ে এসে ধমকের সুরে বললেন,
“কলরব! এসব কী আজেবাজে কথা বলছিস তুই, হ্যাঁ? মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে তোর? থানা থেকে এসেছিস, ওদিকে নিজের মাথাটা ঠিক নেই। যা, সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। নিযানা, তুই ওরে ঘরে নিয়ে যা তো!”

কলরব এক চুলও নড়ল না। সে নিজের জায়গায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল,
“আমি একদম ঠিক বলছি। এবং যা বলছি, ভেবেচিন্তেই বলছি। আমার মতো একটা উশৃঙ্খল আর ছন্নছাড়া ছেলের সাথে সারাজীবন একটা ছাদের নিচে সংসার করা আপনার এই রাজকন্যে মেয়ের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব না। তাই বলছি, ওকে আর এই নরকে কষ্ট না দিয়ে আজই নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান।”
নওয়াজ চৌধুরী কলরবের এই বুক ফুলিয়ে কথা বলা আর ঔদ্ধত্য দেখে রাগে কাঁপতে লাগলেন। একটু হেসে বললেন,
“তোমার কী মনে হয় কলরব? তুমি এভাবে চড়া গলায় ধমক দিয়ে কথা বললে আমি ভয় পেয়ে যাব? আর পাঁচটা সাধারণ, অসহায় মেয়ের বাপের মতো তোমার সামনে হাত জোড় করে কান্না করব, আর বলব বাবা, আমার মেয়েটাকে তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না। জীবনটা সর্বনাশ হয়ে যাবে? ওসব ভুলেও ভেবো না! আমার মেয়ের কপাল এতটা খারাপ না। তোমার মতো এই উশৃঙ্খল যুবকের চেয়ে হাজার গুণ ভালো আর যোগ্য ছেলে ও জীবনে ডিজার্ভ করে, মনে রেখো!”
কথাটা শোনামাত্রই কলরবের দুই হাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে উঠলো। শরীরের প্রতিটি রগ পলকে টানটান হয়ে উঠল। শিরা-উপশিরায় যেন এক তীব্র বিষাক্ত জ্বলন ধরে গেল নিমেষেই। নিজের লাল হয়ে যাওয়া দুই চোখ সোজা তুলে নওয়াজ চৌধুরীর চোখের দিকে তীব্র আক্রোশে চাইল। দাঁতে দাঁত পিষে ধারালো গলায় বলল,
“তো? আপনার এই মূল্যবান কথাটি কি এই বিয়ের আগে বা বিয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাবা উচিত ছিল না? বিয়ের দিন কবুল বলার আগে এই জ্ঞানটা কোথায় ছিল আপনার? আমি… আমি বা আমার পরিবার কি আপনার মেয়েকে বাড়িতে বউ করে আনার জন্য মরে যাচ্ছিলাম? ইনফ্যাক্ট, আজ এই মুহূর্তেও আমি কোথায় আপনাদের হাতে-পায়ে ধরে সাধাসাধি করছি ওকে আমার ঘরে রাখার জন্য? কে মরতে যাচ্ছে ওর সাথে এই ফালতু সংসার করার জন্য, শুনি?”

আরশাদ তালুকদার আর স্থির থাকতে পারলেন না। সোফার হাতলে চাপ দিয়ে ধমকে উঠলেন,
“কলরব! অনেক হয়েছে। মুখ বন্ধ কর নিজের। বড়দের সামনে এভাবে কথা কে বলে?”
“কী চুপ করবো আমি, আব্বু? কেনই বা করবো? আমি ভুল কী বলেছি এখানে? সবাই মিলে জোর করে, ধরে-বেঁধে নিজেদের ইচ্ছামতো আমাদের ঘাড়ের ওপর এই বিয়েটা চাপিয়ে দিলে। আমি… আমি নিজে কোথায় উনার মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, হ্যাঁ? আমাকে তো রীতিমতো বাধ্য করা হয়েছিল এই সম্পর্কে জড়াতে! শুধু বিয়েটা দিয়ে তোমরা সবাই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে হাফ ছেড়ে বাঁচলে। কিন্তু দিনশেষে সংসারটা করতে হচ্ছে আমাদের। চার দেয়ালের মাঝে একসাথে আমরা আছি৷ আমরা ভালো করেই জানি আমরা কেমন আছি আর কতটা মানিয়ে চলছি! আর এখন মাঝপথে এসে সবার হঠাৎ মনে হচ্ছে যে সবাই মস্ত বড় ভুল করেছে? নওয়াজ চৌধুরীর যদি এতই ইগোতে লাগে, যদি কলরব এতই খারাপ আর অসভ্য একটা ছেলে হয়। তবে নিয়ে যাক না উনি উনার সোনার মেয়েকে! টাকার জোরে নিজের ইচ্ছেমতো কোনো এক রাজপুত্রের সাথে আবার বিয়ে দিক, জাহান্নামে পাঠাক। তাতে আমার কী আসে যায়? আমি কি বারণ করছি?”

নওয়াজ চৌধুরী কলরবের এই রূঢ় কথায় অপমানিত বোধ করলেন। সমস্ত শরীর রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল তার। চড়া গলায় বললেন,
“তুমি কিন্তু বেয়াদবি করছ কলরব!বিহেভ ইয়োরসেল্ফ। আমি সত্যিই আজ আমার মেয়েকে এই মুহূর্তে এখান থেকে নিয়ে যাব। তোমার মতো একটা অসভ্য, ছোটলোক ছেলের সাথে আমার মেয়েকে আর একটা সেকেন্ডও রাখার কোনো মানে হয় না।”
কলরব বলল, “হ্যাঁ, প্লিজ নিয়ে যান! আমি তো সেটাই বলছি। এখনই নিয়ে যান ওকে। আর হ্যাঁ, সময়মতো একটা ডিভোর্স পেপার রেডি করে আমার নামে পাঠিয়ে দেবেন। আমি এক বাক্যে ওটাতে সই করে দেব।”
মুহূর্তের মধ্যে ড্রয়িং রুমের বাতাসে যেন একটা বজ্রাঘাত নেমে এলো। উপস্থিত প্রত্যেকে আক্ষরিক অর্থেই বোকা বনে গেল। সবার মুখের ভাষা স্তব্ধ হয়ে গেল। স্বয়ং নিযানা নিজের জায়গায় এক জীবন্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর চারপাশের পুরো পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল। দু-চোখ ফেটে এক রাশ জল নেমে এসে ওঁর দৃষ্টি সম্পূর্ণ ঝাপসা করে দিল। কলরব এসব কী বলছে? কেনই বা বলছে? কে ওর অবুঝ মনটাকে এভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে সে? নওয়াজ চৌধুরীর ভেতরের রাগটা এবার যেন তিন গুণ বেড়ে গেল। পুরুষালি ইগো আর আভিজাত্যে জোরালো এক আঘাত লেগেছে। ওদিকে আরশাদ তালুকদার পুরোপুরি বোবা বনে সোফায় বসে রইলেন। উনার নিজের মাথায় তখন সত্যি সত্যিই এক মস্ত বড় অপরাধবোধ ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি কি আসলেই নিজের ইচ্ছে রাখতে গিয়ে এই দুটো বাচ্চার জীবনে মস্ত বড় কোনো ভুল করে ফেলেছেন? নওয়াজ চৌধুরী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সোফা থেকে পুরোপুরি উঠে দাঁড়ালেন। তেজি গলায় বললেন,

“আজকের এই অপমানের পর তো আমার মেয়েকে এই বাড়িতে, এই উশৃঙ্খল ছেলের সংসারে রাখার আর কোনো প্রশ্নই আসে না! অনেক সহ্য করেছি আমি। নিযানা, তুমি শুনে নিয়েছো? তোমার থাকা না থাকায় ওর কিছু যায় আসেনা। চলো! এখনই চলো আমার সাথে। আর এক মুহূর্তও আমরা এই বাড়িতে থাকবো না।”
পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে আরশাদ তালুকদার আকুল হয়ে বললেন,
“নওয়াজ ভাই, আপনি কি মাথা খারাপ করলেন নাকি? বাচ্চাদের এই সামান্য রাগের মাথার কথায় কেউ এভাবে রিয়াক্ট করে নাকি? আর কলরব, তোর মাথা কি সত্যি সত্যি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে? এসব তুই কী আজেবাজে কথা বলছিস? চড়িয়ে সোজা করে দেব আমি!”
“আমি যা বলেছি, ভালো করে বুঝেশুনেই বলেছি আব্বু। উনি নিয়ে যাক উনার মেয়েকে। আমার এতে বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না!”

কথাটা শেষ করেই কলরব আর এক সেকেন্ডও ড্রয়িং রুমে দাঁড়াল না। টান পায়ে, গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। নিযানা ওর সেই প্রস্থান ঝাপসা চোখে অপলক চেয়ে চেয়ে দেখল। ওঁর বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক অভিমানে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। নওয়াজ চৌধুরী আর কালবিলম্ব না করে নিযানার একটা হাত শক্ত করে ধরে টান দিলেন,
“চলো নিযানা। ও আর কোনোদিন তোমার কদর বুঝবে না। চলো আমার সাথে।”
নিযানা বাবার ওই শক্ত টানের বিপরীতে নিজের পা দুটোকে মেঝেতে শক্ত করে চেপে রাখল। চোখ গলে তখন অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। কাঁপা, নিচু গলায় বলল,
“এক মিনিট আব্বু… আমাকে একটু সময় দাও।”

বাবার হাতের বাঁধন আলগা হতেই নিযানা এক প্রকার উন্মাদের মতো ছুটে চলে গেল ড্রয়িং রুম থেকে। সিঁড়ি বেয়ে ছুটে চলল ঝড়ের গতিতে। কলরবের ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকতেই সে দেখল। কলরব ব্যালকনির রেলিং ধরে শূন্য দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিযানা আর এক মুহূর্তও ভাবল না। ভেতরের সমস্ত সংকোচ আর পৃথিবীর সব লোকলজ্জা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। আকুলতায় ছুটে গিয়ে কলরবের পিঠের ওপর আছড়ে পড়ল। ওঁর দু-হাত দিয়ে কলরবের চওড়া কোমরটা পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। হুট করে এই কোমল স্পর্শে কলরব নিজের অজান্তেই একটু কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা এক মুহুর্তে ধক করে উঠল যেন। আঙুলের ফাঁকে থাকা আধপোড়া জ্বলন্ত সিগারেটটা ওঁর হাত ফসকে নিচে ব্যালকনির মেঝেতে পড়ে গেল। পরমুহূর্তেই পিঠে নিযানার তপ্ত চোখের জলের স্পর্শ আর ফোঁপানোর শব্দ কানে আসতেই কলরবের ভেতরের শক্ত মনটা ও কেঁপে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। পুরো অবয়বে এক কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে শীতল গলায় বলল,
“নিজের দরকারি জিনিসপত্রগুলো নিতে এসেছিস? চটপট গুছিয়ে নিয়ে চলে যা। শুধু শুধু এখানে এসে এত ড্রামা আর নাটকের কোনো দরকার নেই।”

“কলরব…!”
ভীষণ আহত শোনাল নিযানার ভাঙা গলা। ওই একটা ডাক তিরের মতো গিয়ে বিঁধল কলরবের বুকের ঠিক মাঝখানটায়। ভীষণ ইচ্ছে করল ঘুরে মেয়েটাকে বুকে টেনে নিতে কিন্তু কিছু একটা ওকে আটকে দিল। নিজেকে নিযানার শক্ত বাঁধন থেকে জোর করে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“ছাড় আমাকে।”
নিযানা ওঁর কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আকুল গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি… তুমি একবারের জন্যও আমাকে আটকাবে না?”
কলরব ওর হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। নিযানাকে পুরোপুরি হতবাক করে দিয়ে চোখের দিকে চেয়ে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আমার এখানে আটকানোর কী আছে, হ্যাঁ?”
“তোমার… তোমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না?”
“কষ্ট হওয়ার কী আছে? আমি তো এটাই চাইছিলাম।”

নিযানা ক্ষণিকের জন্য যেন একটা জীবন্ত পাথরের মতো স্থবির হয়ে রইল। বিশ্বাস হচ্ছে না কলরব সত্যি বলছে। পরমুহূর্তেই আবারও ছিটকে গিয়ে পড়ল কলরবের চওড়া বুকের ওপর। ওঁর শার্টের কলারটা খামচে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠে বলল,
“কিন্তু আমি… আমি তো এটা চাই না, কলরব! প্লিজ! আমি তোমার থেকে দূরে যেতে চাই না। আমাকে এভাবে যেতে দিও না। আমাকে… আমাকে প্লিজ একবার আটকাও! আমি যেভাবে হোক থেকে যাব।”
কলরব মুখটা সামান্য উঁচিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“সম্ভব না নিযানা। কেন আটকাবো তোকে? কী কারণ?”
“কারণ আমি! আমি তোমার সাথে থাকতে চাই!”

এই অবেলায় পর্ব ৪৪

নিযানা অনবরত কাঁদছে। ওর কান্নার তোপে মুখ থেকে ঠিকমতো কথাও বের হতে পারছে না৷ নিজের দুই হাত দিয়ে চোখের জলটুকু কোনোমতে মুছে নিয়ে কাতর চোখে কলরবের পানে চেয়ে বলল,
“তুমি আমাকে ভালোবাসো না, তাই তো? আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমাকে কোনোদিন আমাকে ভালোবাসতে হবে না। আমি কখনো তোমার কাছে ভালোবাসার দাবি নিয়ে যাব না। তাও। তাও প্লিজ আমাকে তোমার সাথে থাকতে দাও। আমরা না হয় এভাবেই সারাজীবন থেকে যাব! কী এমন ক্ষতি হবে তাতে বলো? আমি কসম খেয়ে বলছি। আমি কখনো তোমাকে ভালোবাসতে জোর করব না। তোমার সাথে কোনোদিন কোনো বিষয়ে ঝগড়াও করব না। তুমি যা বলবে, আমি মুখ বুজে সব মেনে নেব। তাও! তাও আমাকে তোমার সাথে থাকতে দাও, কলরব। প্লিজ! আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাই না। আমি… আমি সত্যিই মরে যাব!”

এই অবেলায় পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here