Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 22 (2)

Tell me who I am 2 part 22 (2)

Tell me who I am 2 part 22 (2)
আয়সা ইসলাম মনি

হলের আবছা অন্ধকারে সিলিংয়ে ঝুলন্ত বিশালাকার ডিস্কো বল থেকে বিচ্ছুরিত নীল, বেগুনি আর চেরি-রেড আলোর রশ্মিগুলো আছড়ে পড়ছিল সমবেত তরুণ-তরুণীদের ওপর।
মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে, বৃহৎ রোল্যান্ড জুপিটার-এইট সিন্থেসাইজারের সামনে আসাদ যখন মাইক্রোফোনটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরল, তখন তাকে জার্মানির ‘মডার্ন টকিং’ ব্যান্ডের থমাস অ্যান্ডার্সের চেয়ে কোনো অংশে কম লাগছিল না। চকচকে চেরি-রেড রঙের সাটিন শার্টের ওপরের বোতামগুলো উন্মুক্ত, যার ফাঁক গলে বুকের চওড়া মেটালিক চেইনটি নিয়ন আলোয় ঝিলিক মারছে। তার ওপর চড়ানো নিখুঁত ফিটেড কালো লেদার জ্যাকেটটির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। ঘামের বিন্দুতে ভেজা অবিন্যস্ত চুলের কয়েকটি গোছা তার কপালে লেপ্টে আছে।
সে যখন তার ভারী, মাদকতাময় কণ্ঠে সুর তুলল,

“Oh, I cannot explain, every time it’s the same
Oh, I feel that it’s real, take my heart
I’ve been lonely too long, oh, I can’t be so strong
Take the chance for romance, take my heart…”
অমনি মঞ্চের পাদদেশে সমবেত শত শত তরুণী দুই হাত তুলে ‘আশু! আশু!’ বলে চিৎকারে ফেটে পড়ল, আর সিল্কের বেলবটম পরা তরুণেরা ‘এসি! এসি!’ ধ্বনিতে হলরুম কাঁপিয়ে তুলল। আসাদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আব্দুর রহমান। তার দীর্ঘ আঙুলগুলো যখনই ফেন্ডার স্ট্র্যাটোকাস্টার ইলেকট্রিক গিটারের তারে স্পর্শ করছে, সেই চমৎকার সুরের মূর্ছনা আসাদের কণ্ঠকে আরও দ্বিগুণ মোহময় করে তুলছে।
ঠিক এই উন্মাদনার মাঝেই, মিলনায়তনের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে একটি রাজকীয় গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এল কৌশিকা। তার পেছনে বডিগার্ড টাইপের দুজন দীর্ঘকায় সুঠাম ব্যক্তি আসতেই সে হাত উঁচিয়ে তাদের ভেতরে আসতে বারণ করে দিল।
তাদের একজন কিছুটা নিচু হয়ে বিনীত গলায় বলল, “বাট ম্যাম, স্যার হ্যাজ স্ট্রিক্টলি ফরবিডেন ইউ টু গো অ্যালোন।”

কৌশিকা নিজের লেদার হাতব্যাগটি কাঁধে ঠিক করতে করতে পাশ্চাত্য হাসি ফুটিয়ে বলল, “আই ক্যান প্রিটি ওয়েল টেক কেয়ার অব মাইসেলফ। ড্যাড নিজে আমাকে ক্যারাটে শিখিয়েছেন, সে কি তোমরা ভুলে গেছ?”
তার এই ক্ষুরধার যুক্তির সামনে গার্ডরা মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কৌশিকার পরনে আজ ছিল ব্লিচ করা নীল রঙের হাই-ওয়েস্টেড ডেনিম জিন্স, কোমরে চওড়া বাকলওয়ালা চামড়ার বেল্ট। তার সঙ্গে গায়ে জড়ানো কালো রঙের ফিটেড শর্ট-স্লিভ টপ, যার ওপর পিছনদিক থেকে দুই কাঁধে আলগাভাবে চাপানো এভিয়েটর স্টাইলের কালো লেদার জ্যাকেট। গলার চারপাশে লুপ করে বাঁধা উজ্জ্বল লাল রঙের একটি ছোট্ট সুতি ব্যান্ডানা। ডান হাতে দোলা খাচ্ছে একটি সরু মেটালিক ব্রেসলেট। পায়ে চকচকে কালো ব্লক-হিল অ্যাঙ্কেল বুট। তার ঘন, হালকা বাদামি চুলগুলো ব্যাককোম্ব করে ভলিউম দেওয়া। সে এক হাত ডেনিমের পকেটে পুরে, বুটের খট খট শব্দ তুলে মিলনায়তনের ভিড়ের দিকে পা বাড়াল।
হাজারো মানুষের সেই কোলাহল আর আলো-আঁধারির মাঝেও আসাদের বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া মুহূর্তের মধ্যে কৌশিকাকে চিনে নিল। তার ঠোঁটের কোণে আপনাতেই কপট হাসি ফুটে উঠল। সে সরাসরি কৌশিকার চোখের দিকে নিজের নেশালো দৃষ্টি স্থির রেখে পরের অন্তরা ধরল,

“I need you so
There’s no time I’ll ever go…
Cheri, cheri lady
Goin’ through a motion
Love is where you find it
Listen to your heart…”
কিন্তু কৌশিকা যেন ওপরের স্টেজের দিকে তাকাচ্ছেই না, এমন একটা উদাসীন ভাব বজায় রাখল। সে সোজা হেঁটে হলের এক কোণে থাকা নিয়ন আলোয় ঘেরা বার কাউন্টারের দিকে চলে গেল। সেখানে কাঠের কাউন্টারে আয়েশি ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা ফলের জুস নিয়ে চুমুক দিল। গানের সেই পপ বিটের সাথে তাল মিলিয়ে বারের ওখানেই দাঁড়িয়ে সে হালকা মাথা দোলাতে লাগল।
ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে এক সুদর্শন কিন্তু চপল যুবক এগিয়ে এল। তার ঠোঁটে ধূর্ত হাসি খেলা করছে। সে কৌশিকার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে গ্লাস উঁচিয়ে বলল, “হ্যালো লেডি!”
কৌশিকা তার দিকে এক পলকও না তাকিয়ে নিজের জুসের গ্লাসের স্ট্র-টাতে পুরো মনোযোগ দিল।
এই চরম উপেক্ষা হাসান নামের সেই ছেলেটির পুরুষালি ইগোতে গিয়ে তীব্রভাবে আঘাত করল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বারের কাউন্টারে আরও কিছুটা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল, “হেলথ মিনিস্টারের মেয়ে বলে একটু বেশিই প্রাইড দেখাচ্ছ না? আমার বাবাও কিন্তু এই শহরের কম প্রভাবশালী কেউ নন, দ্যাট ইউ শুড নো।”

কৌশিকা তার ঠোঁট দুটো এমনভাবে বাঁকাল, যেন সে খুব সস্তা আর নর্দমার কোনো আওয়াজ শুনেছে যা কান দেওয়ারও যোগ্য নয়। তার এই নীরব অবজ্ঞা হাসানের ভেতরের হিংস্রতাকে উসকে দিল। তার মুখের রেখাগুলো কঠোর হয়ে উঠল। সে চতুরতার সাথে এদিক-ওদিক তাকিয়ে, পেছন থেকে কৌশিকার পিঠে নিজের নোংরা হাতটা ছোঁয়াতে গেল। কিন্তু তার আগেই কৌশিকা কাউন্টার ছেড়ে এক কদম সামনে চলে এল।
হাসান এবার এক ঝটকায় কৌশিকার নরম কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরল, “বেশি অ্যাটিচিউড দেখাচ্ছিস? তোর মতো সুন্দরীকে যদি একবারের জন্যও আমার বিছানায় না আনতে পারি, তবে তো আমার এই পুরুষ জীবনটাই বরবাদ!”
এই বলে সে কুৎসিত হাসি হেসে কৌশিকাকে নিজের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই, কৌশিকা তার ধারালো জুতোটা দিয়ে হাসানের জুতো পরা পায়ের পাতার ওপর পুরো শরীরের ভর দিয়ে সজোরে চাপ দিল। হিলের তীক্ষ্ণ ফলাটা হাসানের পায়ের চামড়া ভেদ করে ভেতরে বসে গেল।
কৌশিকা হাসানের চোখের দিকে হিমশীতল দৃষ্টি হেনে, দাঁতে দাঁত চেপে থেমে থেমে জোর দিয়ে বলল, “নোংরা… নর্দমার… সাথে… কথা বলে… আমার মূল্যবান বাক্যের… অযথা খরচ… আমি কখনোই… পছন্দ… করি… না!”

সে পা টা এক ঝটকায় সরিয়ে নিতেই হাসানের জুতো গলে রক্তিম আভা বেরিয়ে এল। তীব্র যন্ত্রণায় হাসান দাঁতে দাঁত চেপে বারের একটা কাঠের স্টুলের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। কৌশিকা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তার জ্যাকেটটা ঠিক করে সামনের দিকে এগোতে চাইল।
কিন্তু হাসান যন্ত্রণাকাতর পা নিয়েই হুট করে আবার উঠে দাঁড়িয়ে কৌশিকার পথ আগলে দাঁড়াল। তার হাত দুটো তখন হিংস্র থাবার মতো কৌশিকার দিকে এগিয়ে আসছিল। কৌশিকা নিজের ব্যাগটা একপাশে সরিয়ে ক্যারাটের ডিফেন্স পজিশন নেওয়ার জন্য শরীরটা সামান্য বাঁকাল। কিন্তু হাসান তার গায়ে হাত ছোঁয়ানোর ঠিক এক মিলি সেকেন্ড আগেই, অন্ধকারের বুক চিরে এক প্রবল জোরালো ঘুসি তার মুখে আঘাত হানলো।
আঘাত লাগার সাথে সাথে সে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরে বারের শক্ত মেঝের ওপর ছিটকে পড়ল। সে যন্ত্রণায় গোঙাতে লাগল, তার মুখটা একপাশে সম্পূর্ণ বেঁকে গেছে, ওষ্ঠাধর চিরে ফিনকি দিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে এল।
আসাদ জ্যাকেটটির বাম হাতাটা কনুইয়ের ওপর আরেকটু টেনে নিল। এরপর এক হাত দিয়ে কপালের অবাধ্য চুলগুলো আলতো টানে ব্যাকব্রাশ করতে করতে শীতল গলায় বলল, “এক আঘাতেই তোর মুখের ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে গেছে, হাসান। আরেকটা মারলে এই মুখ আর ঘাড়ের সাথে লেগে থাকবে না, ধড় থেকে আলগা হয়ে ফুটবলের মতো করিডোরে গড়িয়ে যাবে।”

মেঝেতে পড়ে থাকা র*ক্তাক্ত হাসান তীব্র আক্রোশে কাঁপলেও, আসাদের ওই ইস্পাতকঠিন চোয়াল আর হিংস্র চোখজোড়া দেখে তার ভেতরের সমস্ত পুরুষত্ব এক নিমেষে জল হয়ে গেল। সে ভাঙা চোয়ালটা একহাতে চেপে ধরে ভয়ার্ত চোখে ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল। আসাদ তখন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তার ঘাড়টা একবার ডানে আর একবার বামে কাত করে সশব্দে মটকা ভাঙল।
ঠিক তখনই তার পেছন থেকে গভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ফাইট কিন্তু আমিও জানি।”
আসাদ ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক কৌশিকাকে দেখে নিল। তারপর চোখের সানগ্লাসটা শার্টের কলারে ঝুলিয়ে সে সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়িয়ে, ডান ভ্রূটা কিঞ্চিৎ উঁচিয়ে বলল, “তাহলে এতক্ষণ নিজের সেই আত্মরক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করলেন না কেন, ম্যাম?”

কৌশিকা এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “তোমাকে একটু সুযোগ দিচ্ছিলাম আর কি।”
“নাইস ট্রাই!” আসাদ ওষ্ঠাধর উলটে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করল।
কৌশিকা এবার কিছুটা নরম গলায় বলল, “বাই দ্য ওয়ে… থ্যাংকস।”
আসাদ মুহূর্তের মধ্যে নিজের ডান হাতটি বুকের ওপর রেখে, রাজকুমারদের মতো সামান্য ঝুঁকে কুর্নিশ করার ভঙ্গিতে বলল, “মাই প্লেজার, সুইটহার্ট।”
কৌশিকা আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে নিজের কাঁধ থেকে জ্যাকেটটি টেনে গায়ে জড়িয়ে নিল। তারপর অ্যাঙ্কেল বুটের শব্দ তুলে সে হলের মূল ফটকের দিকে এগিয়ে যেতেই, পেছন থেকে আব্দুর রহমান এসে আসাদের চওড়া কাঁধে একটা হাত রাখল।
“কি রে, ওখানে তোকে সবাই ডাকছে, এখানে কি করছিস?”
আসাদ গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেমির দিকে না তাকিয়ে, কৌশিকার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়েই মনে মনে বলল, “মনে হচ্ছে খুব জলদিই তোর সতিন আসতে চলেছে, রেমি।”

পরবর্তী কয়েক মাসে কার্জন হলের করিডোর কিংবা ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডায় আসাদের সাথে কৌশিকার যখনই দেখা হতো, তখন এক রকম ত্যাড়া ত্যাড়া কথা আর মৃদু ঝগড়া ছাড়া তাদের কোনো কথোপকথন পূর্ণতা পেত না। তবে আসাদ সুযোগ পেলেই কৌশিকার সাথে কিছুটা মডার্ন কায়দায় ফ্লার্ট করার চেষ্টা করত; কিন্তু কৌশিকা যে ঘরানার মেয়ে, তাতে তাকে এত সহজে টলানো অসম্ভব ছিল।
এমনই একটা মেঘলা দুপুরে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আসাদের এক চতুর ফ্লার্টিংয়ের জবাবে কৌশিকা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে তার ডানহাতে ধরা কাফকার একটা বই বুকের সাথে চেপে ধরে বলেছিল, “ইউ নো হোয়াট? তোমার এই ওল্ড-ফ্যাশনড ট্রিকসগুলো বড্ড পুরোনো। তোমার চেয়ে অনেক বেটার ফ্লার্টিং আমি জানি।”

আসাদ সুজুকি টিআর-১১৮ বাইকের চাবিটা আঙুলে বনবন করে ঘুরিয়ে লাইব্রেরির কাঠের দরজায় পিঠ ঠেকাল। জিভ দিয়ে গালের ভেতরটা ঠেলে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্য-মেশানো এক চোরা হাসি টেনে বলেছিল, “এত কনফিডেন্স? তাহলে দেখি, আমাকেও একটু ইমপ্রেস করে দেখাও না, মিস বিদেশিনি!”
তখন কৌশিকা এক কদম এগিয়ে এসে আসাদের প্রশস্ত বুকে নিজের তর্জনী দিয়ে একটা হালকা ধাক্কা মেরেছিল। সে তার জাদুকরী নীল চোখের দৃষ্টি আসাদের চোখের ওপর স্থির করে বলেছিল, “আমার অ্যাটেনশন পেতে হলে তোমাকে আরও উপরের লেভেলে যেতে হবে, মিস্টার আসাদ চৌধুরি!”
এই বলে সে নিজের রেশমি চুলের গোছায় একটা মৃদু ঝটকা দিয়ে চলে গিয়েছিল। চুলের সেই অবাধ্য রেশমি গোছা বাতাসে উড়ে এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেল আসাদের চোখ। আকস্মিক ছোঁয়ায় চোখের পাতা দুটো বুজে ফেলল সে। পরক্ষণেই আবার চোখ খুলে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না হয়ে তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসেছিল। তরুণীর এই প্রচ্ছন্ন অহংকার আর রূপের দম্ভ সে মনে মনে বেশ উপভোগ করছিল।
তবে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তৈরি হয়েছিল রেমির সাথে। এই কয়েক মাসে আব্দুর রহমানের সাথে কৌশিকার নির্মল ও বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্ব বেশ জমে উঠেছিল। রেমি মানুষটাই এমন, তার ভেতরে এক ধরনের শান্ত, প্রগাঢ় এবং স্নিগ্ধ মিশুক পুরুষালি আভা আছে, যা যে-কোনো চঞ্চল মানুষের মনকে নিমেষে শান্ত করে দেয়। রেমির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল, সে কোনো অচেনা তরুণীর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলত না।
আসাদের রগচটা, গম্ভীর আর ওয়েস্টার্ন ভাইবের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ ছিল সে। তবে আব্দুর রহমানও শারীরিক গড়নে বেশ দীর্ঘাঙ্গী, চওড়া কাঁধের অধিকারী এবং তার কথার অমায়িক ধরন যে কাউকেই মুগ্ধ করত। রেমি মূলত বরিশালের লোক, তাই কথায় কথায় সে তার রূপসি বাংলার নদী, ধান আর খাবারের বেশ সুনাম করত।

একদিন লাইব্রেরির পেছনের নির্জন বারান্দায় বসে বরিশালের রুপালি ইলিশের গল্প শুনে কৌশিকা চিবুকে হাত দিয়ে বলেছিল, “তোমার বরিশালের গল্প শুনতে শুনতে আমার সত্যিই লোভ লেগে গেছে, রেমি। আমাকে কোনোদিন নিয়ে যাবে সেখানে? আমি কিন্তু ইলিশ ভাপা খেতে চাই!”
আব্দুর রহমান তখন তার ডায়েরিটা বন্ধ করে, এক গাল অমায়িক হাসি ফুটিয়ে নিজের চিরচেনা বরিশালের আঞ্চলিক টানে বলে উঠল, “তোমারে মোগো বাড়তে লইয়া যাইয়া খাঁটি কউররা ত্যালে রান্দা ইসা মাছের হুররা খাওয়ামু, ফুলকলী! হের মধ্যে আতপ চাউলের গরম রুডি পিডা ভিজাইয়া মোহে ভরবা আর মনের সুখে কবা—ও মনু, ইয়া কী খাওয়াইলা তুমি!” (তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাঁটি সরিষার তেলে রান্না করা চিংড়ি মাছের ঝোল খাওয়াব, ফুলকলী! তার মধ্যে আতপ চালের গরম রুটি পিঠা ভিজিয়ে মুখে পুরবে আর মনের সুখে বলবে—ওহে বন্ধু, এটা কী খাওয়ালে তুমি!)
কৌশিকা রেমির মুখের সেই মিষ্টি, শুদ্ধ বরিশালের বুলি আর ‘মনু’ সম্বোধন শুনে নিজের সমস্ত শহুরে গাম্ভীর্য ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল।

“কৌশিকা, প্রজাপতির পাখায় আরেকটু নীল রং দিলে আমার মনে হয় ওটা আরেকটু জীবন্ত হয়ে ফুটবে। বাকি বিন্যাসটা কিন্তু একদম নিখুঁত।”
আব্দুর রহমানের পরিশীলিত কণ্ঠস্বর শুনে ইজেলের পেছন থেকে মুখ ফেরাল কৌশিকা। এই গত কয়েক সপ্তাহে রেমির সাথে তার বেশ কয়েকবার সাহিত্য ও শিল্প নিয়ে আলাপ হয়েছে। এই অদ্বিতীয় প্রতিভাময়ী ছাত্রীর ক্যানভাসের কাজ এতটাই নিখুঁত যে, একবার দেখলে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যায়। কৌশিকার দুই হাতে তখন নানা রঙের আলপনা; পরনে কটন শার্টের ওপর জড়ানো এক ধূসর রঙের সুতি অ্যাপ্রোন। ঘন ওয়েভি চুলগুলো আজ মাথার ওপর শক্ত করে পনিটেইল করে বাঁধা, যেখান থেকে দু-একটি অবাধ্য গোছা তার ফরসা ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে।
আব্দুর রহমান এতক্ষণ হলের এক কোণের কাঠের চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে তার উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি সংশোধন করছিল। কৌশিকাই তার লেখার কিছু গুরুচণ্ডালী দোষ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, বাক্যগুলোকে আরও আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে। সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার এই লেখা দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশের ব্যবস্থা করে দেবে।

কৌশিকা হাতের তুলিটা সামান্য উঁচিয়ে একটু আক্ষেপের সুরে বলল, “তুমিও নোটিশ করেছ? আমারও ঠিক তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু দেখো না, আল্ট্রামেরিন ব্লু শেডটা একদম শেষ হয়ে গেছে! অথচ আগামীকালই এখানে বড়ো এক্সিবিশন। খোদ ভিসি স্যার নিজে বলেছেন আমার এই পেইন্টিংটা মেইন উইংয়ে থাকবে। কিন্তু আমি যদি এখন নিউ মার্কেট গিয়ে রং কিনে এনে বাকিটা আর্ট করতে যাই, ততক্ষণে চারুকলার এই হলরুম বন্ধ হয়ে যাবে।”
“এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, আমিই নিউ মার্কেট থেকে ওটা এনে দিচ্ছি,” আব্দুর রহমান মৃদু হেসে আশ্বস্ত করল, “তুমি ততক্ষণে ক্যানভাসের বাকি কাজটুকু শেষ করো।”
“দ্যাটস সো সুইট অব ইউ, রেমি! থ্যাংক ইউ সো মাচ। আর হ্যাঁ, ফেরার সময় গেটে আমার ড্রাইভারকে বলে আমার ক্যাশমেট বক্স থেকে ক্যামেরাটা একটু আনিয়ে দিও, প্লিজ! এটার একটা প্রপার ছবি না তুললে পুরো খাটুনিটাই ইনকমপ্লিট থেকে যাবে।”

“আচ্ছা আচ্ছা,” আব্দুর রহমান মাথা ঝুঁকিয়ে হলরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
রেমি চলে যেতেই কৌশিকা আবারও গভীর মনোযোগে ক্যানভাসের সূক্ষ্ম রেখায় মন দিল। পুরো হলরুমে তখন সে ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মানবসন্তান নেই। ঠিক তখনই পেছনের বড়ো জানালার ওপাশে একটা ছায়া দৃশ্যমান হলো। সেখানে দাঁড়িয়ে আসাদ একটা চুইংগাম চিবাচ্ছিল। হঠাৎ ভেতরের নির্জনতায় কৌশিকাকে একা তুলি হাতে দেখে তার মনের কোণে দুষ্টুমিভরা চিন্তা হানা দিল।
কৌশিকা তখনো ক্যানভাসে মগ্ন, ঠিক তখনই আচমকা পেছন থেকে তার ডান কাঁধের ওপর আসাদ তার চিবুকটা রাখল। তার পরনে আজ এক কালো ক্যাজুয়াল শার্ট, যার ওপরের বোতামখোলা অংশ থেকে তার গায়ের সুগন্ধির সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। সে কৌশিকার তুলি ধরা ডান হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় আলতো করে চেপে ধরল।
আসাদ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচু স্বরে বলল, “এত চমৎকার আর্ট করতে জানো, বিদেশিনি? অথচ ওই সুন্দর মুখে সারাক্ষণ এত বিষ কেন জমে থাকে, বলো তো?”

হঠাৎ এই অতর্কিত ও অতি-নিকট সান্নিধ্যে কৌশিকার বুকের ভেতরটা যেন কিছুটা কেঁপে উঠল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস মুহূর্তের মধ্যে ঘন হয়ে এল, আর ফরসা গাল ও কানের লতিতে লালিমা ছড়িয়ে পড়ল। আসাদ খুব কাছ থেকে তার এই সূক্ষ্ম শারীরিক পরিবর্তনটুকু লক্ষ্য করল। কৌশিকার ওষ্ঠাধর থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে আসাদ এবার তার বাম হাতটি কৌশিকার সরু কোমরের ওপর স্থাপন করল। নিজের শরীরটা আরেকটু সামনে এগিয়ে নিয়ে, কৌশিকার পিঠের সাথে নিজের প্রশস্ত বুক মিশিয়ে দিয়ে সে তার কানের ঠিক লতির কাছে উত্তপ্ত ফিসফিসানি তুলল, “আমাকে একটু শেখাবে?”

আসাদের গরম ও অবাধ্য নিশ্বাস কৌশিকার স্পর্শকাতর ত্বকে আছড়ে পড়তেই তার তুলি ধরা হাতের সূক্ষ্ম রেখাগুলো এবার ক্যানভাসের বুকে একদম এলোমেলো হয়ে যেতে শুরু করল। সে ততক্ষণে নিজের চোখ দুটো বুজে ফেলেছে, তাই নিজের হাতের ভুলটা সে টের পাওয়ার মতো স্থিতধী অবস্থায় ছিল না।
সে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে বিড়বিড় করল, “কী… কীহ?”
আসাদ নিজের ফরসা গালের সাথে কৌশিকার মসৃণ গালটা আলতো করে ঘষে দিয়ে ফিসফিস করল, “অবশ্যই রোম্যান্স শেখানোর কথা বলছি না, সুইটহার্ট; ওটা তোমার চেয়ে আমি ঢের ভালো জানি। এখন না হয় ক্যানভাসে এই রং মেশানোর কৌশলটাই আমাকে একটু শিখিয়ে দাও।”
“ইউ আর… তুমি কিন্তু একদম ঠিক করছ না, আসাদ! জাস্ট গেট ব্যাক।”
তার এই প্রতিবাদের সুর শুনে আসাদ অপ্রত্যাশিত মোচড়ে কৌশিকাকে সম্পূর্ণ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর এক ঝটকায় তাকে পেছনের ভারী কাঠের পেইন্টিং বোর্ডের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে চেপে ধরল।
কৌশিকা এবার হতভম্ব ও স্তব্ধ চোখে আসাদের ঠিক চোখের দিকে তাকাতে বাধ্য হলো। আসাদ চৌধুরিকে এত কাছ থেকে সে আগে কখনো এভাবে পর্যবেক্ষণ করেনি। ছেলেটি সত্যিই বড়ো বেশি সুদর্শন ও পুরুষালি। তার ধারালো তীক্ষ্ণ চোয়াল, গ্রিক মূর্তির মতো খাড়া নাক, কালচে বাদামি ওষ্ঠাধর আর ঘাড় ছুঁই ছুঁই করা অবাধ্য চুলের গোছা। বিশেষ করে এখন তার এই নেশালো, গভীর চাহনিটা কৌশিকাকে ভেতরে ভেতরে একদম ঘায়েল করে দিচ্ছিল।

আসাদ আরও এক ইঞ্চি এগিয়ে এল, তাদের দুজনের দূরত্ব তখন প্রায় শূন্য। সে পাশের টেবিল থেকে রঙের একটা ছোট কৌটো থেকে তর্জনীতে সামান্য লাল রং তুলে নিল। তারপর আলতো ছোঁয়ায় সেই রং কৌশিকার গোলাপি ফরসা, উত্তপ্ত গালে লেপে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, “আমার সৌভাগ্য নাকি চরম দুর্ভাগ্য, তা আমি জানি না নীলপদ্মা; তবে এটা বুঝতে পারছি যে, এবার আমাকেও সোজা পিজি হাসপাতালের কোনো এক কেবিনে ভর্তি হতে হবে। এত ভয়ংকর সুদর্শনা আর মায়াবী রমণী আমি আমার এই মরণশীল জীবনে কোনোদিন দেখিনি।”
কৌশিকা অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করল, “আমাকেও বলতে?”
আসাদ তার আঙুলের রেখাটি কৌশিকার গাল বেয়ে আস্তে আস্তে আলতো টানে তার অধরের কোণের দিকে নামিয়ে আনতে লাগল।

সে তার কণ্ঠস্বর আরও এক ধাপ নিচু করে, সম্মোহনী সুরে বলল, “আজ অবধি তোমাকে যে যে ছেলে এক নজর দেখেছে, তারা প্রত্যেকেই অন্তত এক দিনের জন্য হলেও পিজি হসপিটালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছে। তবে ওদের আসলে কোনো দোষ নেই, বিদেশিনি। এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর সৌন্দর্য যে একবার প্রত্যক্ষ করবে, তার মাথা ঘুরে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। তাই ইদানীং ভাবছি, তোমাকে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ার চোখ থেকে আড়াল করে লুকিয়ে রাখব, একদম আমার এই বুকের গভীরতম কোনো প্রকোষ্ঠে।”
আসাদ একটু থামল। কৌশিকার কানের কাছে নিজের ওষ্ঠাধর আরও এক ইঞ্চি নামিয়ে এনে সে যোগ করল, ​”আসলে সৌন্দর্য উপভোগ করার জিনিস নয়, নীলপদ্মা… সৌন্দর্য হলো এক ধরনের মরণব্যাধি। আর আমি চাই না আমার আগে অন্য কেউ এই ব্যাধিতে মা’রা যাক।”
কথাগুলো শেষ করতে করতে আসাদ তার ওষ্ঠাধর আরও কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গেল তরুণীর রক্তিমাভ গালের দিকে। অবাধ্য আকর্ষণে কৌশিকাও নিজের লাজুক চোখ দুটো আলতো করে বুজে ফেলল।
“তোমার এই কাঙ্ক্ষিত আল্ট্রামেরিন ব্লু রংটা এনে দিতে আমাকে যেন পুরো সাত সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়েছে, ফুলকলী! এবার নাও তো…”

ঠিক তখনই সদর দরজার কাছ থেকে আব্দুর রহমানের অতি পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
রেমির আওয়াজ কানে আসতেই এক ঝটকায় সংবিৎ ফিরে পেল আসাদ। সে ক্ষিপ্রতার সাথে কৌশিকার শরীর থেকে দূরে সরে গেল। আকস্মিক এই কণ্ঠে কৌশিকাও নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে দ্রুত একপাশে ছিটকে সরে এল। আর তখনই তার অ্যাপ্রনের কোণ লেগে পেছনের ভারী ইজেলটি টাল খেয়ে নড়ে উঠল।
আসাদও নিজেকে সামলাতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খেল পাশের কাঠের টেবিলটার সাথে। তার শরীরের ধাক্কায় টেবিলে সাজানো গাঢ় তেলরঙের বড়ো বড়ো কৌটোগুলো উলটে সোজা নিচে পড়ে গেল। আর ঠিক তার আগ মুহূর্তেই ক্যানভাসটি ইজেল থেকে খসে মেঝেতে আছড়ে পড়ল।
উন্মুক্ত রঙের কৌটোগুলো থেকে কালচে লাল আর হলদে রঙের পুরো তরলটা স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে সদ্য পড়া ক্যানভাসটির ওপর।

রঙের কৌটো আর ক্যানভাস পতনের এই আকস্মিক শব্দে কৌশিকার ঘোর পুরোপুরি কেটে গেল। সে মেঝেতে তাকাতেই তার পুরো শরীর স্তব্ধ হয়ে গেল। তার দীর্ঘ এক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে আঁকা সেই সাধের ছবিটা এখন কুৎসিত রঙের তালগোল পাকানো কাদার মতো পড়ে আছে। কৌশিকা বিবর্ণ মুখে, হতভম্ব হয়ে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল এবং কাঁপাকাঁপা হাতে সেই নষ্ট ক্যানভাসটি তুলে ধরল।
কৌশিকার বুকটা তখন তীব্র কষ্টে দ্রুত ওঠানামা করছে। তার চোখ দুটো ততক্ষণে নোনা জলে ভিজে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে। আসাদ অপরাধবোধ নিয়ে নিচে ঝুঁকে কৌশিকার কাঁধে হাত দিতে দিতে ভারাক্রান্ত স্বরে বলল, “আই অ্যাম সো সরি, কৌশি… তুমি ঠিক আছ তো—”
তার বাক্যটি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই,

কৌশিকার হাতের সজোরে এক থাপ্পড় এসে পড়ল আসাদের গালে। তীব্র আঘাতে আসাদের মুখটা একপাশে সামান্য ঘুরে গেল। আব্দুর রহমান দরজার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না; আসাদ চৌধুরীর গালে কেউ চড় মারতে পারে, এটা তাদের দুজনের কল্পনারও অতীত ছিল।
কৌশিকা মেঝের ক্যানভাসটি তুলে আসাদের বুকের ওপর ছুঁড়ে মারল। সে সোজা দাঁড়িয়ে, রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে বলল, “জাস্ট শাট আপ! তোমার এই সস্তা ফাজলামির জন্যই আমার এত বছরের ড্রিমটা এক সেকেন্ডে নষ্ট হয়ে গেল! নিজে তো লাইফে ক্রিয়েটিভ কিছু করতে পারো না, অন্তত অন্য কারোর কঠোর পরিশ্রমের কদর দিতে তো শেখো! আই উইল নেভার ফরগিভ ইউ, মিস্টার আসাদ চৌধুরি!”
এই বলে চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা তপ্ত জল হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুছে, কৌশিকা হন্তদন্ত হয়ে গ্যালারি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
আসাদ তখনো মেঝেতে হাঁটু গেড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল; তার হাতের ওপর পড়ে আছে সেই নষ্ট ক্যানভাস। সে নিজেও মনে মনে কখনোই এমনটা চায়নি। আসলে কৌশিকা রূপের এমন এক মায়াবী মোহ তৈরি করেছিল যে, আসাদের মতো রগচটা ছেলেও তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল।

আব্দুর রহমান ক্ষুণ্ন ও গম্ভীর গলায় বলল, “এটা তুই কী করলি, ভাই? তুই কি জানিস, কৌশিকা একদম ছোটোবেলা থেকে মনে মনে কী স্বপ্ন পুষে রেখেছিল? ও চেয়েছিল ওর এই আর্ট ওয়ার্কটা যেন ইউনিভার্সিটির মেইন এক্সিবিশনে স্থান পায়। আর তুই কি না ওর এতগুলো দিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম… আমি আর কোনো অজুহাত শুনতে চাই না আসাদ, তুই এখনই ওর পেছনে যাবি আর নিজের ভুলের জন্য ওর কাছে ক্ষমা চাইবি। নাহলে তুই মনে মনে ওর ব্যাপারে যা চাচ্ছিস, তা এই জীবনে কোনোদিন সম্ভব হবে না।”
‘ক্ষমা’ শব্দটা কানে আসতেই আসাদের ভেতরের সেই অহংকারী সিংহটা যেন আবারও জেগে উঠল। সে এক ঝটকায় মেঝে থেকে সোজা উঠে দাঁড়াল। তার চোয়ালের রেখাগুলো কঠোর হয়ে উঠল। সে পকেট থেকে তার রুপালি জিপো লাইটারটা বের করল। একটা ৫৫৫ ব্র্যান্ডের সিগারেট ঠোঁটের কোণে চেপে ধরে আগুন জ্বালাল।
ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসের বুকে উড়িয়ে দিয়ে অহংকারের সুরে বলল, “যা করেছি, করেছি। ভুলবশত হয়ে গেছে। তবে ওসব ক্ষমা-টমা আমি চাইতে পারব না, রেমি। তুই খুব ভালো করেই জানিস, আসাদ চৌধুরি কোনোদিন কোনো পরিস্থিতিতেই কারো সামনে মাথা নোয়ায় না।”
এই বলেই সে বুটের খটখট শব্দ তুলে রেমির সামনে দিয়ে চারুকলার করিডোর বেয়ে গটগট করে প্রস্থান করল।

“তুমি কি ইম্পোটেন্ট নাকি? নাহলে আমার মতো একটা মেয়েকে ভালোবাসতে তোমার ঠিক কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে? আর কতকাল এভাবে আমাকে অপেক্ষায় ঝুলিয়ে রাখবে, আশু?”
আসাদের ডেনিম জ্যাকেটের কলারটা দুই হাতে শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে, তাকে দেয়ালে ঠেসে ধরে রাগে ফুঁসে উঠল রিতা। তার অন্য হাতে ধরা একটা তাজা লাল গোলাপ, যা দিয়ে মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগেই সে আসাদকে নিজের হৃদয়ের সমস্ত আকুতি জানিয়ে প্রেম নিবেদন করেছিল। কিন্তু আসাদ তার চিরাচেনা উদাসীনতায় কোনো উত্তর না দিয়ে যখনই তাকে উপেক্ষা করে চলে যেতে চাইল, তখনই রিতার এই আকস্মিক ও আক্রমণাত্মক পথরোধ।
আসাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলেও তার মুখের অভিব্যক্তি বরফের মতো শীতল রইল। সে রিতার চোখের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, “আমি পুরুষ হিসেবে কতটা সক্ষম কিংবা অক্ষম, তার কোনো জাস্টিফিকেশন তোমাকে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না। আর প্লিজ, নিজের লিমিট ক্রস করো না, আমি কোনো মেয়ের গায়ে হাত তুলতে পছন্দ করি না।”
“তোলো! গায়ে হাত তোলো তো দেখি!” রিতা জেদের চরম সীমায় পৌঁছে আসাদের খাড়া নাকের দিকে আরও এক কদম ঘেঁষে এল, “দেখিই না তোমার ওই শক্ত, রুক্ষ হাতের ছোঁয়ায় আমার শরীরে কেমন নতুন ভাইব্রেশনের জন্ম হয়!”

“ছিঃ! নোংরা মেয়ে!” আসাদ চরম বিরক্তিতে নিজের মুখটা একপাশে সরিয়ে নিল, “তোমাকে শেষবারের মতো ওয়ার্ন করছি, আমার থেকে দূরে সরো।”
“একদম আমাকে নোংরা বলবে না!” রিতা চওড়া বেলবটম প্যান্টের নিচে পরা হিল জুতো জোড়ায় ভর দিয়ে আরও চড়া গলায় বলে উঠল, “আমি এই ক্যাম্পাসের বাকি সাধারণ উইক মেয়েদের মতো নই যে তুমি একটা ইশারা করলেই দূরে সরে যাব। তোমার ওপর, তোমার এই রূপের ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে।”
আসাদ এক ঝটকায় রিতার শক্ত মুঠো থেকে নিজের কলারটা ছাড়িয়ে নিল, এবং তার হাতটা সজোরে সরিয়ে দিয়ে চোখ দুটো ছোট ছোট করে কটমট করে তাকাল। সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসে গলায় বলল, “কীসের অধিকার, হ্যাঁ? কে তুমি? কোন সাহসে তুমি আসাদ চৌধুরীর কলার ধরার স্পর্ধা দেখাও?”
রিতা নিজের লাল হয়ে যাওয়া ফরসা হাতটা অন্য হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে ওষ্ঠাধরে এক চিলতে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে বলল, “আমি তোমার ভবিষ্যৎ বউ, বুঝেছ? আচ্ছা, তোমাদের দুই বন্ধুর আসল সমস্যাটা কী, বলবে? নিজেদের কি বড্ড বেশি হ্যান্ডসাম আর আনটাচেবল ভাবো, তাই এত দেমাগ বেড়েছে? সেদিন ঐশী গিয়ে রেমিকে প্রপোজ করল, আর সে এক লাইনে উত্তর দিয়ে দিল, সে নাকি ‘অ্যাসে’ক্সু’য়াল’! সিরিয়াসলি? ক্যাম্পাসের আধুনিক মেয়েরা তো এখন লজ্জায় ওর ধুলোও মাড়ায় না। আচ্ছা, তুমিও কি তোমার ওই চশমা পরা প্রিয় বন্ধুর মতোই অ্যাসে’ক্সু’য়াল নাকি? নাকি ভেতরের আসল সত্যটা অন্য কিছু? তোমরা দুজন নিজেরা নিজেদেরই পছন্দ করো না তো?”

এতক্ষণ রিতার সমস্ত প্রলাপ ও কটূক্তি নীরবে হজম করলেও, আব্দুর রহমানকে টেনে আনা শেষ বাক্যটি শোনা মাত্রই আসাদের কানের লতি দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল, মাথার ভেতরের সমস্ত রগ দপদপ করতে লাগল। সে নিজে রেমির সাথে একান্তে হাজারো মশকরা বা ইয়ার্কি করতে পারে, কিন্তু বাইরের কোনো তৃতীয় ব্যক্তির এই পবিত্র বন্ধুত্ব নিয়ে মন্তব্য করার কোনো অধিকার নেই।
আসাদ যেমন এই ক্যাম্পাসের মেয়েদের কাছে এক গম্ভীর, উগ্র অথচ অতিরিক্ত সুদর্শন পুরুষ, আব্দুর রহমান তেমনই রহস্যময়, আকর্ষণীয় ও পরম শান্ত এক যুবরাজ। তাদের দুই বন্ধুর এই অনন্য ব্যক্তিত্বের মোহে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু করে কলা ভবনের প্রায় প্রতিটি তরুণীই মনে মনে গলে পড়ত। তবে আশির দশকের রক্ষণশীল সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোনো মেয়ে নিজে সাধ সেধে কোনো ছেলেকে বিয়ের বা প্রেমের প্রস্তাব দেবে, এটা মোটেও ট্রেন্ডি বিষয় ছিল না। বড্ড বেশি সাহসী না হলে কেউ এই পথ মাড়াত না।
আর এই ধরনের ফটকাবাজ ও উগ্র মেয়েদের হাত থেকে নিজেদের চরিত্র ও সময় বাঁচাতে দুই বন্ধু মিলে আগেভাগেই এক গোপন মনস্তাত্ত্বিক পরিকল্পনা ফেঁদে রেখেছিল। যদি কোনো সাধারণ ও সুরুচিসম্পন্ন মেয়েকে ভালো লেগে যায় তবে তো উত্তম, আর যদি কোনো মেয়ে সস্তা ইগো নিয়ে পথ আটকাতে আসে, তবে সোজা বলে দেওয়া হবে—তারা ‘অ্যাসে’ক্সু’য়াল’! আসাদ তার গম্ভীর রূপের কারণে এই কৌশলের তেমন প্রয়োগ করার সুযোগ না পেলেও, রেমি কিন্তু এর পুরো ফায়দা তুলত। কারণ তার মনে সেই একটাই ধ্রুব সত্য প্রোথিত, সে নিজেকে কেবল তার অনাগত, পবিত্র হালাল নারীর জন্যই সম্পূর্ণ অক্ষত ও পবিত্র রেখে দিয়েছে; কোনো বেগানা নারীর ছোঁয়ায় সে নিজেকে কলুষিত করবে না।

আসাদ নিজের ভেতরের রাগটা কোনোমতে চেপে ধরে তীব্র ক্ষোভে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু রিতা পেছন থেকে দৌড়ে এসে আবারও তার ডান হাতটা খপ করে চেপে ধরল।
এবার আসাদের ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে বিদ্যুদ্বেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে রিতার গালে সজোরে এক চড় কষিয়ে দিল।
রিতার মুখটা একপাশে হেলে পড়ল, তার ঠোঁটের কোণটা সামান্য চিরে র’ক্তিম আভা বেরিয়ে এল। আসাদ এক ঝটকায় রিতার হাত থেকে সেই লাল গোলাপটি কেড়ে নিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুর গলায় বলল, “হাতের ছোঁয়া চেয়েছিলে না? আশা করি তোমার সেই ডার্টি উইশ এবার খুব ভালোভাবে পূরণ হয়েছে!”
এই বলেই আসাদ হনহন করে করিডোর বেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই সামনের বকুলতলার ছায়াপথ ধরে হেঁটে আসছিল কৌশিকা, আর তার ঠিক পাশেই প্রফুল্ল মুখে হেসে হেসে কথা বলতে বলতে আসছিল আব্দুর রহমান।
আসাদ নিজের ভেতরের অপরাধবোধ, জেদ আর ক্ষোভকে এক করে চোয়াল শক্ত করল। সে আর এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে, সরাসরি কৌশিকার সামনে গিয়ে ধুলোমাখা মাটিতে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার হাতের সেই লাল গোলাপটি সে কৌশিকার দিকে বাড়িয়ে দিল।

এই অভাবনীয় ও নাটকীয় দৃশ্যে আব্দুর রহমান আর কৌশিকা দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিশেষ করে রেমি নিজের কপালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল! আসাদ কৌশিকার সেই গভীর নীল চোখের দিকে নিজের নেশালো দৃষ্টি স্থির রেখে, বুকের ভেতরের সমস্ত আবেগ ঢোক গিলে বলল, “আমি জানি তোমার এই নীল সমুদ্রে একবার ডুবে যাওয়া মানেই আত্মাহুতি। তবু আমি বাঁচার পথ খুঁজিনি; স্বেচ্ছায় তোমার সেই অতল গভীরতায় ডুবে যেতে চেয়েছি। এই উন্মাদনা আর লুকিয়ে রাখতে পারছি না, রাখতেও চাই না। আই অ্যাম ক্রেজিলি ইন লাভ উইথ ইউ, বিদেশিনি! সারাজীবনের জন্য নিজেকে আমার কাছে বন্দি করবে? আমার জীবনের শেষ ঠিকানা হবে? উইল ইউ ম্যারি মি, নীলপদ্মা?”
কৌশিকা দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটু গেড়ে বসা আসাদের মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। রেমির কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। চারুকলার সেই ক্যানভাস নষ্ট হওয়ার ঘটনার পর কৌশিকা রাগে, অভিমানে আর তীব্র দুঃখে টানা পনেরো দিন ইউনিভার্সিটির চত্বরেই পা রাখেনি। আজ যখন অনেক সাধ্য-সাধনার পর সে ক্যাম্পাসে পা রেখেছে, রেমি নিজের অক্লান্ত চেষ্টায়, বহু কষ্টে তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এখানে এনেছে, যেন আসাদ নিজের দাম্ভিকতা ভুলে তার কাছে একটা প্রোপার অ্যাপোলজি চায়।
আর রেমি কৌশিকার ভাঙা মন জোড়া লাগাতে আসাদের পক্ষে ওকালতিও করেছে। আসাদ দেখতে কিছুটা রাগী, উগ্র আর জেদি হলেও মন থেকে সে কতটা খাঁটি, সে কখনো কোনো বেগানা মেয়ের সাথে নোংরামি করেনি, নারীদের সম্মান রক্ষা করতে সে কতটা অগ্রগামী—বন্ধুর নামে এমন সব সত্য গুণ গেয়ে সে কৌশিকার মন নরম করার চেষ্টা করেছিল। কারণ আব্দুর রহমানও মনে-প্রাণে চাইত তার এই যাযাবর বন্ধুর জীবনে এক টুকরো সত্যিকারের ভালোবাসার বসন্ত আসুক। কিন্তু সে কখনোই চায়নি আসাদ এমন একটা বিশৃঙ্খল ও উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই প্রকাশ্য দিবালোকে, এত মানুষের সামনে এভাবে আকস্মিক প্রস্তাবটি দিক।
ঠিক তখনই কৌশিকার ওষ্ঠাধরে মনোহর হাসি ফুটে উঠল। সে এক কদম এগিয়ে এসে আসাদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে নিজের হাতটা বাড়াল। আসাদের বুকের ভেতর তখন প্রাপ্তির আনন্দ দোলা দিয়ে উঠল, এটা ছিল তার কাছেও সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

কৌশিকা আসাদের হাত থেকে গোলাপটি গ্রহণ করল ঠিকই, কিন্তু সে আসাদের দিকে না তাকিয়ে, হুট করে বাম দিকে ঘুরে সোজা দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুর রহমানের দিকে সেই রক্তিম গোলাপটি বাড়িয়ে দিল।
আসাদ হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থাতেই পাথরের মূর্তির মতো জমে গেল।
কৌশিকা আব্দুর রহমানের চশমা পরা শান্ত চোখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, স্পষ্ট ও মায়াবী কণ্ঠে বলে উঠল, “রেমি, তোমাকে অনেকদিন ধরেই এই কথাটা বলার তীব্র ইচ্ছে ছিল। আসলে প্রথম দিন কার্জন হলের সামনে দেখার পর থেকেই, তোমার সাথে আমি সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা আত্মিক টান অনুভব করেছি, যা আমাকে অকারণেই তোমার দিকে টেনে নিয়ে যায়। সেই টানটা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। আই থিংক… আই অ্যাম ইন লাভ উইথ ইউ!”
ঘাসের ওপর পদ্মাসন হয়ে বসে থাকা কারান পরম মগ্নতায় পড়ে যাচ্ছিল ১৯৮৫ সালের সেই পুরোনো আখ্যান, যেখানে আসাদ চৌধুরীর দর্প চূর্ণ করে কৌশিকা নিজের প্রসারিত হাতটি বাড়িয়ে দিচ্ছে আব্দুর রহমানের দিকে। ঠিক এই চরম মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্তে, নিস্তব্ধ চত্বরের গা ছমছমে নীরবতা ভেঙে কারানের পকেটে থাকা আইফোনটি ভাইব্রেট করে উঠল।
যান্ত্রিক সেই কম্পনে কারানের ধ্যান ভঙ্গ হলো। সে পুরোনো চিঠির ভাঁজ থেকে চোখ সরিয়ে পকেট থেকে ডিভাইসটি বের করল। স্ক্রিনের নীলাভ আলোয় তার পাথরের মতো নিস্পৃহ মুখাবয়ব মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল দেখাল। ডিসপ্লেতে নাম ভেসে উঠেছে ফাহমিদার। এখানে শেষ রাত হলেও, ফাহমিদা এই মুহূর্তে দেশের বাইরে, সেখানে এখন ভরদুপুর। কারান কলটা রিসিভ করে কানে ধরল, কিন্তু তার ঠোঁট দুটো বন্ধ রইল।
ওপাশ থেকে ফাহমিদার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “স্যার, কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি। একদম নরমালভাবেই কথা বলেছে।”

কারান এবারও কোনো উত্তর দিল না। তার এই পাথুরে নীরবতার গভীরতা পরিমাপ করতে পেরেই ফাহমিদা কিছুটা ইতস্তত করে আবার বলল, “স্যার, ক্যান আই আস্ক সামথিং?”
“হু!” কারানের সংক্ষিপ্ত, নিরুত্তাপ জবাব।
“হাউ লং উইল দিস গো অন? মানে, তারা তো কোনো না কোনোদিন রিয়েলিটিটা জেনেই যাবে।”
কারান দূর আকাশের কালচে অন্ধকারের দিকে তাকাল, যেখানে ভোরের প্রথম আভা ফুটতে শুরু করেছে। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “যাবে। কিন্তু অন্তত এখন জানানোর সময় নয়। তুমি এক কাজ করো, ফারহানের ফোন থেকে তরুর যে ভয়েস নোটগুলো ফরোয়ার্ড করেছিলাম, সেগুলো আরও নিখুঁতভাবে স্টাডি করো। প্র্যাকটিস ইট এগেইন অ্যান্ড এগেইন। কোনোভাবেই যেন কোনো লুপহোল না থাকে। বিশেষ করে আমার বউ…”
কথাটা বলতে গিয়ে কারানের সুগঠিত চোয়াল সামান্য শক্ত হলো, “শি ইজ এক্সট্রিমলি স্মার্ট। বাকিদের হয়ত ম্যানিপুলেট করা যাবে, কিন্তু ওর যদি একবার খটকা লাগে, ও সহজে ছেড়ে দেবে না। শি উইল প্রোপারলি ডিগ ইনটু দিস।”
ওপাশ থেকে ফাহমিদা মৃদু হেসে বলল, “ম্যাম তো দেখছি একদম আপনার ফিমেইল ভার্শন, স্যার।”
কারানের মুখে কোনো অভিব্যক্তি ফুটল না। সে মনে মনে আওড়াল, “হুম, আমারই ফিমেইল ভার্শন। তাই তো এত লুকোচুরি।”
তবে মুখে সে চরম রুক্ষতা ধরে রেখে বলল, “ফোকাস অন ইয়োর ওয়ার্ক।” কথা শেষ হতেই কলটা ডিসকানেক্ট করে দিল।

বাইরে তখন অন্ধকার পুরোপুরি ফিকে হয়ে চারপাশের গাছপালা আর ল্যান্ডস্কেপের অবয়বগুলো স্পষ্ট হচ্ছে। কারান আবার পরের পৃষ্ঠার চিঠি পড়তে যাবে, ঠিক তখনই স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। এবার ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠা নামটা দেখে কারানের চোখের মণি কিছুটা সংকুচিত হলো। মিরা! মিরা কল দিচ্ছে মানে সে নিশ্চয়ই ঘরের ভেতর তাকে খুঁজছে।
কারান সতর্কতার সাথে স্কচটেপ দিয়ে জোড়া লাগানো চিঠিগুলো ভাঁজ করল। আম্বিয়ার দিয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন কাঠের বাক্সটার ভেতর সেগুলো রেখে ডালাটা লক করে দিল। এরপর দ্রুত পায়ে পেছনের প্রাচীন পুকুর ঘাটের দিকে চলে গেল।
ঘাটের সান বাঁধানো সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সামনের স্থির জলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নিথর হয়ে রইল সে। কুয়াশাচ্ছন্ন সেই জলের দিকে তাকাতেই হুট করে তার অবচেতন মনে শৈশবের একটা সুপ্ত স্মৃতি উঁকি দিল।
সেদিনও এই পুকুর পাড় থেকেই কারানের ফরসা, নরম ছোট হাতটা শক্ত মুঠোয় ধরে টানতে টানতে ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়েছিলেন দাদি আম্বিয়া জমাদ্দার। বৈঠকখানায় সোফায় বসা কৌশিকার সামনে কারানকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আম্বিয়া ক্ষোভের সুরে বলেছিলেন, “দেহো কৌশি, দেহো তোমার এই নবাবপুত্তুরের অবস্থাহান। পুকুর পাড় দিয়া টাইনা-হিঁচড়াইয়া নিয়া আইছি, নইলে আইজকা সারাটাদিন এই পোলা পানির তলে ডুবাইতো।”

“কী বলছেন, মা? কারান পুকুরে গোসল করেছে?” কৌশিকা বেশ উৎসুক ও বিস্মিত হয়ে প্রশ্নটা করেছিলেন।
“করছে মানে? আমার মানিকচাঁদের শরীরটার দিকে তাকাইয়া দেহো খালি। আমি ঠিক সময়ে না গ্যালে আরও কয় ঘণ্টা ডুবাইত কে জানে! গোরা গাখানা উদলা পানিতে ভিজাইয়া লাল কইরা ফেলছে। ওই পাইছে গেরামের কিছু ফাজিল পোলাপান। ওরা নাকি সবাই নামছে, আর তোমার ছেলের হাত ধইরা টান দিয়া ওরেও নামাইছে। আর আমার নাতি পানি পাইয়া এমন ভিজা ভিজছে যে ওর চোখমুখ বোঝার উপায় নাই এহন।”
এই বলতে বলতে তিনি নিজের সুতি শাড়ির আঁচল দিয়ে কারানের ভেজা মাথাটা পরম মমতায় মুছে দিতে থাকলেন। হাঁটু পর্যন্ত ভেজা, হালকা আকাশি রঙের অর্ধহাতা শার্টটা তার ছোট্ট শরীরে সেঁটে গিয়েছিল। গাঢ় নীল হাফপ্যান্ট থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছিল, আর কাদামাখা খালি পায়ের আঙুলগুলো বারবার মেঝের সঙ্গে ঘষে নিচ্ছিল সে। সাত বছর বয়সি কারান তখন অপরাধবোধে চোখ দুটো নিচের মেঝের দিকে নামিয়ে রেখেছিল। সে ভাবছিল, এতক্ষণ দাদি বকেছে, এবার নিশ্চয়ই মা চড়া গলায় শাসন করবে।
এদিকে কৌশিকা সোফা থেকে নেমে এগিয়ে এসে কারানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন। ছেলের দুই কাঁধে নিজের হাত রেখে কোমল গলায় বললেন, “তুমি পুকুরে গোসল করেছ? সত্যি, বেইবি?”

“হ্যাঁ, মম।”
“ওরা ফোর্স করেছিল, নাকি তুমি নিজের ইচ্ছেতে নেমেছ?”
“ওরা ফার্স্ট ট্রাইয়ে নামতে বাধ্য করলেও, বাকি সময় গোসল আমি নিজের ইচ্ছেতেই করেছি।”
“কিন্তু তুমি তো সাধারণত কারও সাথে মিক্সড আপ হও না, কথাই বলো না; তাহলে ওই গ্রামের ছেলেদের সাথে তোমার ফ্রেন্ডশিপ হলো কীভাবে?”
“ফ্রেন্ডশিপ হয়নি। ওরা নিজে থেকেই এসে আমার সাথে কথা বলেছিল। আমি শুধু চুপচাপ শুনেছি, এতেই নাকি ওদের আমাকে ভালো লেগে গেছে।”
“দ্যাটস গুড,” কৌশিকা ছেলের চিবুকটা আলতো নেড়ে বললেন, “কিন্তু এত ঘণ্টা ধরে পানির নিচে ডোবার কারণটা জানতে পারি?”

কারান তার মায়ের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আমার এখানের সবকিছুই খুব পিসফুল লাগে, মম। এই ন্যাচার, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ওয়াটার, আর মানুষগুলো, যেটা আমি শহরের ওই কনক্রিটের লাইফে কোথাও পাই না। আর সবথেকে বেশি ভালো লাগে দিদার এই খাঁটি বকা। আমি ফিউচারে এমন আরও দুষ্টুমি করতে চাই, যেন দিদা আমাকে আরও বেশি করে বকে।”
পেছন থেকে আম্বিয়া এগিয়ে এসে কারানের কপালে একটা গাঢ় চুমু দিয়ে আবেগি গলায় বললেন, “বুলির জাদুতে মন গলাইতে আমার মানিকচাঁদ কিন্তু সবার উপ্রেই আছে, দেখছ কৌশি?”
কৌশিকা এক চিলতে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে বললেন, “তাই তো দেখছি, মা।”
এরপর তিনি কারানকে টেনে এনে নিজের হাঁটুর ওপর বসালেন, তার ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার এই ভেবে খুব ভালো লাগছে যে তুমি কোনো মিথ্যার আশ্রয় নাওনি, একদম সত্যি কথাটা বলেছ। তুমি একদম আমার মতো হয়েছ, বেইবি। আমারও এই রিল্যাক্সিং ন্যাচার ভীষণ পছন্দ।”
“আর আমি দেখতেও একদম তোমার মতো হয়েছি। তোমার মতো ব্লু আইজ, তোমার মতোই হেয়ার।”
“কারণ তুমি যে আমারই একটা অংশ, আমার এই পুরো জীবনের সবচেয়ে প্রিয়ও তুমিই।”
কারান মায়ের গলার দুই পাশে তার ছোট্ট দুটো হাত জড়িয়ে ধরল। তার মায়াবী নীল চোখ দুটোতে এই বয়সেই কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক আর তীব্র অধিকারবোধ রয়েছে। সে কৌশিকার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে একদম নিচু, শান্ত গলায় বলল, “অ্যান্ড ইউ আর মাই অবশেসন, মম!”

​ছোট্ট বাচ্চাটার মুখে ওই বয়সেই ‘অবশেসন’ শব্দটা শুনে কৌশিকা ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ ও অবাক হলেন। কিন্তু পরক্ষণেই পরম মায়ায় তাকে নিজের বুকের নিবিড় গহিন প্রকোষ্ঠে টেনে নিয়েছিলেন।
অতীতের সেই সোনালি স্মৃতি মনে পড়তেই কারান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা শুষ্ক ঢোক গিলল। তার চোখের মণি দুটো মুহূর্তে আবার নেকড়ের মতো হিংস্র ও শীতল হয়ে উঠল। আজ রাতেই সে নিজের হাতে কতগুলো নৃশংস হ*ত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার কালো হুডি আর প্যান্টে এখনো ছোপ ছোপ তাজা র*ক্তের দাগ শুকিয়ে চটচট করছে।
সে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে, পরনের হুডিসহই নিজের র*ক্তমাখা শরীরটা ধুয়ে ফেলতে এক লাফে পুকুরের কনকনে ঠান্ডা জলের বুকে আছড়ে পড়ল। কিছুক্ষণ জলের অতল গহিনে নিজেকে ডুবিয়ে রেখে, শরীরের সমস্ত ক্লান্তি আর র*ক্তের গন্ধ ধুয়ে সে ওপরে উঠে এল। তার ভেজা, লেপ্টে থাকা পোশাক থেকে টপটপ করে মাটির ওপর জল ঝরে পড়ছে। সে ওভাবেই, ভেজা বুটের শব্দ তুলে ধীর পায়ে মূল ঘরের লিভিং রুমের দিকে পা বাড়াল।

লিভিং রুমে পা রাখতেই কারানের চোখ আটকে গেল। ভোরের ম্লান আলো তখন জানালার কাচ গলে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। সামনেই জানালার দিকে পেছন ফিরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে মিরা। তার কাঁধ দুটো অবাধ্য কান্নায় সামান্য কাঁপছে।
কারান নিজের ভেতরের নির্মমতা আর সদ্য ঘটে যাওয়া মানসিক ঝড়টাকে এক মুহূর্তের মধ্যে আড়াল করে নিল। সে নিজের কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক, শান্ত করে ডাকল, “মিরা।”

Tell me who I am 2 part 22

কারানের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে আসতেই মিরা বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়াল। তার ফ্যাকাশে, বিবর্ণ মুখশ্রী আর চোখের কোণ বেয়ে নামা অশ্রুর ধারা ভোরের ওই ম্লান আলোয় হীরের টুকরোর মতো চকচক করে উঠল। কারানের দিকে দু-পা এগিয়ে এসে সে ছলছল চোখে তার দিকে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো যন্ত্রণায় কাঁপছিল। অবরুদ্ধ গলায় কান্নার তোড়ে শব্দগুলো যেন ঠিকমতো বের হতে পারছিল না। সে কারানের ভেজা জ্যাকেটের হাতাটা খপ করে ধরে আর্তনাদ করে উঠল, “দা-দাদি… দাদিজান আর নেই, কারান!”

Tell me who I am 2 part 23

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here