আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৩
নাবিলা ইষ্ক
অতীত চলমান –
একজোড়া বাদামি মণির ধারালো দৃষ্টি তার ওপরেই নিবদ্ধ বুঝেও গুলনাহারের তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। ভীষণ সুক্ষ্ণভাবে মেদহীন পেট ঢাকতে আঁচল টেনে নিয়ে কাঁধে জড়িয়ে শক্ত করে ধরে সেইফটিপিন লাগালেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে পাওয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঠিক করতে থাকলেন শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অস্তিত্ব জুড়ে বসা শাড়িটা। পেটের দিকে শাড়ির ভাঁজটা ধাপে ধাপে সাজাতে সাজাতে অবশেষে আয়নার মাধ্যমে দেখলেন নিজের পেছনেই, বিছানার ওপরে বসে থাকা শরীরটার দিকে।
ওসমান ওখানে বসে থেকে ভীষণ ধৈর্যের সাথে শাড়ি পরার পুরো প্রক্রিয়াটা দেখলেন। তা আজ নতুন নয়। প্রায়ই দেখেন, এইজন্যই আর তেমন বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখান না গুলনাহার। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। নিজস্ব এই অভদ্রলোকের সব নির্লজ্জতা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন তার সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে মিশে গিয়েছে। লজ্জা পেতে পেতে এখন লজ্জার বয়স বেড়ে হিমালয় ছোঁয়ায় তেমন ধারালো প্রতিক্রিয়া আসে না। দৃষ্টি পুনরায় নিজের ওপরে রেখে বললেন গুলনাহার –
‘বাড়ি ভরতি অতিথি রেখে আপনি এখানে বসে আছেন যে!’
ওসমানের কণ্ঠ তুলনামূলক আজ গুরুগম্ভীর। ঠান্ডা লেগেছে। কণ্ঠ বসে গিয়েছে। নড়চড় নেই তার। দৃষ্টিরও না। শুধু বলেন –
‘তোমায় নিয়ে বেরোব।’
গুলনাহার বিরক্ত হলেন। নাক ফুলিয়ে শাড়ির কুঁচি গুলো ঠিক করতে করতে বলেন –
‘আপনার জন্য কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকতে পারছি না।’
ওসমান উঠলেন। গুলনাহারের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন বড়ো কয়েকটি কদমে। গুলনাহার ছোটোখাটো গড়নের। ওসমানের লম্বাচওড়া দেহের সম্মুখে বরাবরই ইঁদুর প্রজাতির প্রাণী সে। ওসমান একটা হাঁটু গেড়ে বসতে বসতে আওড়ালেন –
‘কুঁচি ঠিক করে দিচ্ছি। আর কী সাহায্য লাগবে?’
গুলনাহার জবাব দিতে পারলেন না। শুধু দেখলেন ওসমানের হাত দুটো কতটা যত্নের সাথে কুঁচির একেকটি ভাঁজ ঠিক করতে ব্যস্ত। লক্ষকোটি বার এমন দৃশ্য দেখেও গুলনাহারের মন ভরে না। তৃষ্ণা মেটে না। মিটতে চায় না। ওসমান শাড়ির কুঁচি ঠিক করে প্রশ্ন করলেন –
‘ঠিকাছে? টেনে দেব নিচের দিকে?’
গুলনাহার ঘুরে পেছনের দিকে দেখিয়ে দিলেন –
‘ধীরে কিন্তু!’
হালকা টেনে দেয়ায় শাড়িটা মসৃন ভাবে ফ্লোর স্পর্শ করঝরঝরে লাগছে। ওসমান উঠে দাঁড়ালেন ফের। ড্রেসিং টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখা নেকলেসের বাক্স থেকে নেকলেসটা নিয়ে গুলনাহারের গলায় পরিয়ে দিচ্ছিলেন ভীষণ মনোযোগের সাথে। তার পুরোটা মনোযোগ তখন গুলনাহারের গলায়। আয়নায় প্রতিবিম্ব হওয়া ওসমানের মনোযোগী মুখটা দেখে গুলনাহার মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকলেন। এই মুগ্ধতা বুঝি শতজনমেও শেষ হওয়ার নয়। নেকলেস পরানো শেষ করতে না করতেই আচমকা ঘুরলেন গুলনাহার। ওসমান বুঝে ওঠার আগেই তার চাপদাড়ি ওয়ালা ধারালো চোয়ালে চুমু পড়ল দুটো। ওসমান চোখ বুজে উপভোগ করলেন নরম হাতের তালুর আদরও। গুলনাহার শক্ত গালটা বুলিয়ে তাড়া দিলেন এবার –
‘হয়েছে আমার। দুলটা পরব, আর চুড়িগুলো। আপনি যান, আমি আসছি।’
ওসমান গেলেন না। উল্টো আস্তে করে বললেন –
‘আমি ধরলে শাড়ির ভাঁজটা নষ্ট হয়ে যাবে। কাছে আসো।’
গুলনাহার ঠোঁট টিপে হেসে এগিয়ে গিয়ে স্বেচ্ছায় জড়িয়ে ধরলেন। পুনরায় পুরুষালি চোয়ালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললেন –
‘এই শাড়ির ভাঁজ আজ নষ্ট হলে আমি আপনি সহ আপনার এই প্রোগ্রাম গুল্লি মে রে ওড়াব।’
ওসমান পড়লেন দ্বিধায়। মোলায়েম ভঙ্গিতে হাত জোড়া কোনোভাবে শাড়ি ভেদ করে গুলনাহারের কোমরে রেখে নিজের সাথে জড়িয়ে তাকালেন সুন্দর মুখখানায়। মুখটা সুন্দর করে সাজিয়েছে। সজ্জিত মুখ আর ঠোঁটে চেয়ে অবশেষে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালেন। শক্ত নয়, ভীষণ নরম ভাবে যেন লিপস্টিক না নড়ে। বললেন –
‘পরিয়ে দিতাম আমি।’
দরজায় কড়াঘাতের শব্দ শোনা গেল। গুলনাহার সরে এলেন। ব্যস্ত হাতে কানে দুল পরতে পরতে বললেন –
‘দেখুন কে!’
ওসমান সরলেন না। ওখান থেকেই জলদস্যুর মতো গলা তুললেন –
‘বল!’
সাইফের কণ্ঠ ভেসে এল, ‘বস, সময় হচ্ছে…’
‘আসছিই…’
গুলনাহার খোঁপাটা আরেকটিবার পর্যবেক্ষণ করে নিলেন। সাবানা নিজে খোঁপাটা করে দিয়ে গিয়েছিল। এবারে চুড়িজোড়া পরতে পরতে দেখলেন আঁচল ওসমানের হাতে। আঁচলে অকারণে মুখ মোছার বদভ্যাস আছে লোকটার। ছেলেটাও কুড়িয়েছে বাবার অভ্যাস গুলো। গুলনাহার জিজ্ঞেস করলেন –
‘বাবু কোথায়? তৈরি হয়েছে? স্যুট গুছিয়ে রেখে এসেছিলাম। সাড়াশব্দ শুনলাম না ছেলেটার।’
ওসমান পরেছেন কালো থ্রি-পিস স্যুট। সাদা শার্টের সাথে কালো টাই, ওপরে কালো রঙের ভেস্ট, ভেস্টের ওপরে কালো রঙের কোট, কালো ঢিলাঢালা প্যান্টের সাথে। জুতোজোড়াও কালো। সিলভার রঙের হাত ঘড়িটা চকচক করছে। অনামিকা আঙুলে ভীষণ সাধাসিধে একটা আংটি আছে। আংটির বয়স হয়েছে। তাদের বিয়ের আংটি এটা। গুলনাহারের আঙুলের আংটিটা ডায়মন্ডের। জ্বলজ্বল করে তুলনামূলক।
‘আমি দেখছি…’
ওসমান বেরিয়ে এলেন রুম থেকে। সাইফ দাঁড়িয়ে আছে দূরত্ব বজায় রেখে। পরনে শুভ্র রঙের স্যুট। জিজ্ঞেস করলেন –
‘আদিল কোথায়? রুমে? রেডি হয়েছে?’
‘বাবা বলেছে, আপনাদের আগে নামতে। একটু পরে নামবে।’
ওসমান কথা বাড়ালেন না, বাড়ালেন কদম। ছেলের কান ধরে টেনে আনবেন এই উদ্দ্যেশ্যে। সাইফ বাঁধ সাধল। ওসমানের গম্ভীরমুখে চেয়ে অবশেষে হার মানল। বলল –
‘সারপ্রাইজ দিবে মনে হয়।’
ওসমান বুঝলেন। দুপাশে মাথা দুলিয়ে বললেন –
‘জানে না তার মা কেমন? বাবু বাবু করে তো মাথা খাবে। সারপ্রাইজ লাগবে না। বলো আসতে। একসাথে নামব। তার সহচরী দুটো কোথায়?’
সহচরী দুটো আদিলের সঙ্গী শান্ত আর এলেন ব্যতীত অন্যকেউ না। সাইফ একটু আগেই দেখে এল দুটোকে। শান্ত আর এলেন লুকোচুরি করে কিসব যেন করছে স্টেজের ওখানে। সেসব খোলাসা করে অবশ্য বলল না বসকে। ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে মুখে কুলূপ এঁটে আছে। অঘটন ছেলে সম্ভবত কিছু একটা ঘটাচ্ছ বুঝলেন ওসমান। এবারে স্ত্রীকে জোরপূর্বক নিয়েই নামতে হবে। উপায় নেই। ইতোমধ্যে সাতটা বাজল বলে!
দামী গাড়িগুলো একেক করে প্রবেশ করছে ম্যানশনের বিশাল সদরদরজা দিয়ে। কড়াকড়ি ভাবে গার্ড বসানো হয়েছে। কয়েক ধাপে যাচাই করে তবেই প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে গাড়িগুলোকে। ভেদাভেদ নেই মন্ত্রীদের মধ্যেও। ইতোমধ্যে দুটো গাড়ি ফিরতি পথে চলে যাচ্ছে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে।
ভেতরে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। ম্যানশন থেকে প্রবেশের পথ পর্যন্ত লাল কারপেট বেছানো হয়েছে। সন্ধ্যার আয়োজন, তবে অতিমাত্রার লাইটিং এর কারণে মনে হচ্ছে বিকেলের সময়। অথচ খোলা আসমানে তখন জ্বলজ্বলে এক পরিপূর্ণ চাঁদ। ঝলমলে প্রাঙ্গনে কালো পোশাকে আবৃত ওয়েটার গুলো ঘুরছে অতিথিদের মাঝেমাঝে। রূপালি ট্রেতে ক্রিস্টালের গ্লাস সাজিয়ে অতিথিদের হাতে হাতে ওয়াইন তুলে দিচ্ছে। নানান রঙের পদার্থ ওতে।
আজ এই অনুষ্ঠানে অতিথিদের তালিকায় আছেন দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রী, শিল্পপতি ও খ্যাতিমান ব্যক্তিরা সহ উপস্থিত রয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এমন সব মুখ, যাদের পরিচয় প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা হয় না বললেই চলছে।
এমন সময়তেই প্রাঙ্গনের আলো কমে যায়। নিভুনিভু সবটা। বরঞ্চ সকল উজ্জ্বলতা আচমকা নিবদ্ধ হয় ম্যানশনের সিঁড়িতে। সিঁড়ি বেয়ে নামছেন ওসমান মির্জা এবং তার স্ত্রী গুলনাহার। কালো স্যুটে আবৃত ওসমানের পাশে ভীষণ মার্জিত গুলনাহারের পরনে আকাশী রঙের জামদানি শাড়ি। দুজনের কদম সুরের মতন মিলছে। গুলনাহার নামছিলেন ধীরেসুস্থে, স্বামীর হাত ধরে। হাততালির জোয়ারে ভাসছে আশপাশটা। সিঁড়িগুলো বেয়ে তারা নামতেই পরপরই পুনরায় আলোকিত হয়ে ওঠে সবটা। মুহূর্তে অতিথিদের আন্তরিকতা চেপে ধরে তাদের। অভ্যর্থনার শব্দগুচ্ছ ভেসে বেড়ায়। ওসমান মির্জা স্ত্রীর হাতটা মুঠোয় নিয়ে সামনে এগিয়ে চেনাপরিচিত মুখগুলোর সাথে আলাপ জুড়ছেন। পাশাপাশি গুলনাহার স্বাভাবিক মুখে শুধু –
‘আসসালামু আলাইকুম।’
জানাচ্ছেন, এতটুকুই। আর কোনো শব্দ নয়, কারও মুখের দিকে তাকানো নয়। ভদ্রতাসূচক হাসিও নয়। সে যে ওসমান মির্জার ওজগতের মানুষ পছন্দ করেন না তা পরিষ্কার দিনের আলোর মতন। কমবেশ সবারই জানা তা। গুলনাহার স্বামীর ব্যস্ত পিঠে চেয়ে মুখ বাড়িয়ে আস্তে করে শুধালেন –
‘বাবুকে দেখছি না।’
ওসমান কথা বলছিলেন মন্ত্রী রেজওয়ান মাহমুদের সঙ্গে। পাশে তার ব্যবসায়িক পার্টনার করীমও আছেন। করীমের পাশে তার মেয়ে নয়নতারা, যার বয়সটা আদিলের কাছাকাছি। গুলনাহারের পাশাপাশি যার সাথে কথা হচ্ছে সেই একমাত্র ছেলের সম্পর্কেই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। ওসমান মির্জার একমাত্র ওয়ারিস বলে কথা! মূল কেন্দ্রবিন্দু যে সেও। ওসমান হাতের ইশারায় ডাকলেন আসাদকে। আসাদ পাশাপাশি ছিলো। এলো সাথে সাথে। মাথাটা এগুতেই প্রশ্ন করলেন ওসমান –
‘আমার বান্দরটা কোথায়? খবর নেই কেনো?’
আসাদ পড়ল ঝামেলায়। ছোটো বাবা তো একটা শব্দও বলতে নিষেধ করে দিয়েছে। বলবেটা কী? আশেপাশে নেই সাইফও। ওটা গিয়েছে ওদিকটা দেখতে। ওসমান অবশ্য আসাদের মুখের অবস্থা দেখেই কিছুটা বুঝলেন। চোখ রাঙিয়ে আদেশ ছুড়লেন –
‘পাঁচ মিনিটের মধ্যে…’
ওসমান কথা শেষ করতে পারলেন না। বাতি চলে গেল। গুলনাহারকে নিজের সাথে প্যাঁচিয়ে ধমকে উঠবেন সাথে সাথে বাতি জ্বলল উত্তরদিকের স্টেজের ওপরে। যেখানে ধীরে পিয়ানো বাজছিল। স্টেজের ওপরে একটা শরীর দেখা যাচ্ছে এখন। চওড়া পিঠ সবার দিকে। নিজের ছেলেকে চিনতে ওসমানের এক সেকেন্ডের প্রয়োজনও পড়ল না। বেজে উঠল সাউন্ডবক্সে —
‘ লেডিস অ্যান্ড জেন্টালম্যান… আহ, ফরগেট ইট… ‘
আদিলের পরনে নেভিব্লু রঙের কোট-প্যান্ট সাদা শার্টের সাথে। এলোমেলো চুল ফর্সা কপালে এসে ঠেকেছে। চঞ্চল চোখমুখে দুষ্টুমির ছলাকলা খেলছে। পেছনে আজকের নাচগানের জন্য আনা ডান্সারস। ড্যান্সারসদের সামনে শান্ত আর এলেনকে দেখা যাচ্ছে। ওদের সামনে আদিল। সাউন্ডবক্সে বেজে ওঠা গানের সুরে সুর মিলিয়ে মুখ নাড়িয়ে নেচে উঠল তখুনি –
‘সে শাভা-ভা..সে শাভা-শাভা…’
চমকে উঠেছে গুলনাহার। ওসমান মির্জাও হতবিহ্বল। সাইফ, আসাদ হাততালি দিয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে আদিল স্টেজ থেকে নেমে এসেছে নিচে ডান্সারস নিয়ে। মুহূর্তে বাতি সবখানে ফের জ্বলে উঠল। ওসমান মির্জা আর গুলনাহারের আশপাশ থেকে সবাই সরে গিয়েছে। হাসছে তারা। নাচতে নাচতে গানের লিরিকস আদিল গেয়ে উঠেছে গুলনাহারকে ধরে –
‘রূপ হ্যায় তেরা ছোনা, ছোনি তেরি পায়েল…
হোয়ে, রূপ হ্যায় তেরা ছোনা ছোনা, ছোনি তেরি পায়েল,
ছান ছানা ছান অ্যায়সে ছানকে, কার দে সবকো ঘায়াল…
কেহ রাহা আঁখোঁ কা কাজাল, ইশ্ক মে জিনা মারনা…’
গুলনাহার আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসছে ছেলের কাণ্ডে। লজ্জায় বারবার ওসমানের পিঠের পেছনে লুকোতে চাচ্ছে। আদিল অবশ্য কাউকেই ছাড় দেয়নি। নিজের বাবাকেও না। তাকেও ঘিরে নাচতে নাচতে কাঁধে ধাক্কা মে রে প্রায় নাড়িয়েই তুলল –
‘ ইয়ে,
সে শাভা শাভা মাহিয়া…
সে শাভা শাভা মাহিয়া,
সে শাভা শাভা মাহিয়া….
সে শাভা শাভা…’
আদিল হাতের ইশারা করতে এবারে আসাদ, সাইফও তালে তাল মেলাল। তাদের অবশ্য কোনো ডান্স স্টেপ জানা নেই। উল্টাপাল্টা ভঙ্গিতেই হাত পা নাড়ানোর প্রচেষ্টা। ওসমান মির্জার গম্ভীর কণ্ঠের হাসির আওয়াজ ভেসে বেড়াল। তাকে এমন পাব্লিক্যালি প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিতে হাসতে দেখা ভীষণ বিরল। আদিল চিৎকার করে উঠল –
‘পাপা,
সে শাভা-শাভা….’
আশ্চর্যজনক ভাবে, সবাইকে চমকে উঠিয়ে ওসমান মির্জা ছেলের আনন্দে শামিল হলেন। কদম মেলানো চেষ্টা করলেন। মুহূর্তে হৈচৈ বেড়ে গেলো। চেনাপরিচিত অনেকেই হাসাহাসির পাশাপাশি নাচলেনও। গুলনাহার হাসছেন। সেই হাসি মাথার ওপরে থাকা আসমানে জ্বলজ্বল করা চাঁদের চেয়েও সুন্দর। তাকে ঘিরেই স্বামী আর পুত্রের সব আয়োজন এবারে। আদিল আস্তে করে জানাল –
‘হ্যাপি অ্যানিভার্সিরি।’
–
‘দিস ইজ মাই সান, আদিল.. আদিল মির্জা।’
আদিল এমনিতে বাউন্ডুলে স্বভাবের। তার আচরণে একরকমের ছাড়া ভাব থাকলেও এবেলায় ভীষণ স্বাভাবিক, সাবলীল। অপরপক্ষের চোখে চেয়ে ভদ্রতাসূচক হেসে বলল –
‘হ্যালোও…আংকেল!’
মন্ত্রী রেজওয়ান মাহমুদ দেখলেন প্রাণবন্ত যুবককে। উজ্জ্বল, স্বাধীন.. দীপ্তি ছড়াচ্ছে একরকম। প্রত্যেকটি বাবার স্বপ্নের ছেলে। মুগ্ধ কণ্ঠেই বললেন –
‘হ্যালো, মাই বয়!’
রেজওয়ান তাকালেন ওসমানের দিকে। বললেন –
‘ওকে নিয়ে এসো বাসায়।’
ওসমান শুধু হাসলেন। উত্তর করলেন না। করীম পাশেই ছিলেন। তার দুটো ছেলেমেয়েই এসেছে। ছেলেটা আদিলের চেয়ে দুবছরের বড়ো। মেয়েটা আদিলের বয়সী, নয়নতারা। দুটোকেই আদিল চেনে। বাড়িতে মাঝেমধ্যে আসাযাওয়া হয় ওদের। না তেমন পছন্দ আর নাইবা অপছন্দ। করীম বললেন –
‘যাও, আদিলের সাথে আশপাশটা ঘুরে দেখো।’
আদিল ওদের সাথে নিয়ে হাঁটছে। কথাবার্তা বলছে না। নয়নতারাই আলাপ তুলল –
‘এবার এসএসসি দেবে তো তুমি, আদিল?’
আদিল ফিরে তাকাল না। জবাবে বলল, ‘হু…’
‘দেরি করে ভর্তি হওয়াতে এই অবস্থা। নাহয় কলেজে থাকতে না এখন?’
আদিল হাসল শুধু। মা ভক্ত সে ছোটোবেলায় নাকি মায়ের আঁচল ছেড়ে কোথাও যেতে চাইতো না। কান্নাকাটি জুড়তো। গুলনাহার ছেলের কান্না সহ্যই করতে পারতেন না। তাইতো হোম টিউশনি দেয়া হয়েছে। অবশেষে যখন নার্সারিতে ভর্তি করানো হলো ছেলে আর নার্সারিতে থাকার বয়সে ছিলোই না। তারপরও ছেলেকে জিরো থেকেই পড়িয়েছেন গুলনাহার। আদিলের আইকিউ ভালো। পড়াশোনায় সে চমৎকার। পাশাপাশি ভালো গিটার সে বাজাতে পারে। কণ্ঠও দারুণ। নয়নতারা বলে –
‘একটা গান গাইবে গিটার বাজিয়ে?’
আদিল এবারে বিরক্ত হচ্ছে। ওসমান নিজের ছেলেকে ভালোভাবে চেনেন। তাইতো এসময়ে ডাকলেন। এরই বুঝি অপেক্ষাউয় ছিলো আদিল। তাকে আর পায় কে! কেটে পড়েছে ওখান থেকে। গুলনাহার সোফায় বসেছেন। সোফাটা বসানো হয়েছে একসাইড করে। অনুষ্ঠান শেষের পথে। খাওয়াদাওয়া হচ্ছে এখন। আদিল বসেছে মায়ের গা ঘেঁষে। আঁচলে চোখমুখ মুছে ক্লান্ত গলায় বলল –
‘মাথাটা ব্যথা করছে মা!’
গুলনাহার মুহূর্তে চিন্তিত হলেন। আদিলের এলোমেলো চুল গুছিয়ে কপাল ডলতে ডলতে আওড়ালেন –
‘এতো দৌড়ঝাঁপ করলে মাথা ব্যথা হবে না? একদন্ড যদি শান্তিতে থাকো তুমি!’
আদিল গাল ফোলালো, ‘দৌড়ঝাঁপ? সিরিয়াসলি মা? তোমার জন্য সারপ্রাইজ ছিলো!’
গুলনাহার মুহুর্তে নিজেকে শুধরে নিলেন, ‘ওই পারফরম্যান্স আমি ভীষণ উপভোগ করেছি আব্বু। ধন্যবাদ।’
আদিল গালটা বাড়িয়ে দিলো। কী চাইছে বুঝতে অসুবিধে হলো না! এতো বড়ো ছেলে, এখনো চুমু খুঁজে বেড়ায়! শাসালেন গুলনাহার। তবে দিনশেষে ছেলে তার কাছে এখনো বাবুটাই। ঠোঁট ছুঁয়ে দিলেন গালে। মাথা বুলিয়ে বললেন –
‘আজ আর রাত জাগা নয়, শুনলে? সোজা ঘুমোবে তুমি।’
আদিল বাধ্য ভাবে মাথা দোলাল। তখুনি আলাপ শেষ করে এলেন ওসমান। বসেছেন স্ত্রীর পাশে। বাবা – ছেলের মধ্যে গুলনাহার। তৎক্ষণাৎ সাইফ ফটোগ্রাফারকে ডেকে আনল। বলল –
‘তুলুন কিছু ফটো।’
মুহূর্তে মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসেছে আদিল। ঝলমলে হাসি তার ঠোঁটে, অস্তিত্বে অন্যরকম আনন্দ। ওসমানও তাকালেন ক্যামেরার দিকে। গুলনাহারও মিষ্টি করে হাসছেন ক্যামেরার দিক চেয়ে। তখুনি ক্লিক। এরপরে আরও কিছু ছবি তোলা হলো, সবগুলোতেই হাসাহাসির ব্যাপার। সুখী সুখী এক রাতের ব্যাপার।
সাবানার পেছনেই নূরজাহান। মেয়েটা কেমন মিইয়ে আছে। মায়ের আঁচল ধরে রেখেছে। কিছু একটা চাপা গলায় হয়তোবা বলছে। সাবানা সঙ্গে সঙ্গে ধমকালেন। তা শুনতে পেলো আদিল। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকাল –
‘কী হয়েছে চাচি? কেনো ধমকাচ্ছো নূরজাহানকে?’
গুলনাহারের ভীষণ কাছের লোক দুটো হচ্ছে সাবানা আর জুলেখা। জুলেখা জীবনে বিয়ে না করলেও সাবানা করেছে। তার স্বামী মা রা গিয়েছে। পরবর্তীতে মির্জা বাড়িতেই একমাত্র সন্তান নিয়ে থাকা। নূরজাহানই তার একমাত্র মেয়ে। আদিলের থেকে তিন বছরের বড়ো। আদিল তুইতোকারি করলেও নূরজাহান আপনি করেই শ্রদ্ধা জানায়। সাবানা হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন –
‘কিছু না বাবা…’
কথা শেষ করতে পারেননি। আদিল দেখতে পেলো নূরজাহানের চোখজোড়া। মুহূর্তে গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটার সামনে। জিজ্ঞেস করতেই নূরজাহান গলগল করে বলে দিলো কাঁদতে কাঁদতে। একটা ছেলে ওকে বাজেভাবে ছুঁয়েছে, বাজে প্রস্তাব দিয়েছে। আদিলের মাথাটা সঙ্গে সঙ্গে গরম হয়ে গেল। ক্রোধে লাল হয়ে উঠল চোখজোড়া। এতোবড়ো স্পর্ধা কার? তার বাড়িতে দাঁড়িয়ে তার বাড়ির মেয়ের দিকে হাত? মুহূর্তেই মেয়েটার হাত ধরে টানতে টানতে এগুনো শুরু করে। জিজ্ঞেস করে যায় –
‘কে ওই জানো য়ার! দেখা আমাকে… কে?’
নূরজাহান আঙুল তুলে দেখাল। সামনেই করীমের ছেলে, যে আদিলের চেয়ে বড়ো। নামটা ঠিকঠাক মনে নেই আদিলের। সে কোনো শব্দ খরচ করল না। ডাকল না। সোজা এগিয়ে গিয়ে আচমকা ছেলেটাকে কাঁধে তুলে আছাড় মার ল প্রাঙ্গণে সাজিয়ে রাখা কাঁচের টেবিলের ওপরে। কাঁচ ভেঙে ছেলেটা পড়ল ছাঁটা ঘাসের ওপরে উবুড় হয়ে। কপাল কেটেছে। র ক্ত বেরুচ্ছে বেশ। আদিল থামল না। পুনরায় গিয়ে ঘুষি দিতে শুরু করল। ততক্ষণে লোকজন জমা হয়ে গিয়েছে। চলে এসেছেন ওসমান মির্জা সহ করীমও। ভদ্রলোক নিজের ছেলেকে এভাবে মার খেতে দেখে পাগল হয়ে যান। আদিলের কলার ধরে টেনে সরাতে সরাতে চিৎকার করে ওঠেন –
‘এই ছেলে, এইইই! হাউ ডেয়ার ইউউ! আমার ছেলেকে এমনভাবে মারার সাহস কোথায় পা…’
বলতে বলতে করীম তেড়ে যাচ্ছিলেন আদিলের দিকে, পারেননি। ওসমান ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে দেয়ালের ন্যায়। বজ্রকণ্ঠে হুংকার ছাড়েন –
‘তোমার সাহস তো কম না, করীম! তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার ছেলেকে ধমকানোর সাহস করো! এই ওসমান মির্জার ছেলে ও। আওয়াজ নিচে রাখো। আওয়াজ নিচে সবসময়! গলা কে টে ফেলব একদম।’
করীম শান্ত হলেন ওতে। তবে রাগ দমে না। র ক্তাক্ত ছেলেকে দেখিয়ে তিনি হিসহিসিয়ে ওঠেন –
‘এভাবে আমার ছেলেকে কেনো মার ল? এর জবাবদিহিতা দাও ওসমান।’
‘কেনো দেব না? আমার ছেলে এভাবেই মার বে না। রিজন আছে, ভয়ংকর রিজন।’
ওসমান তাকালেন ছেলের দিকে। আদিল তখনো সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছে র ক্তাক্ত ছেলেটার দিকে চেয়ে। যেন আরও মার বে। ওসমান শুধালেন –
‘কী হয়েছে? আমাকে না জানিয়ে এসবে জড়ালে কেনো?’
‘পাপা, এই জানো য়ার নূরজাহানকে ব্যাড টাচ করেছে। খারাপ প্রস্তাব দিয়েছে।’
করীম চমকে ওঠেন প্রথমে। ছেলের খারাপ স্বভাব সম্পর্কে তিনি অবগত। তাই অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসে না। পরপরই দেখেন পেছনের মেয়েটাকে। কাজের লোকের মেয়ে, চিনেছেন। তাই আর ওত মাথা ঘামালেন না। বললেন –
‘একটা কাজের লোকের মেয়ের জন্য এমন ব্যবহার? আর ওমন একটা মেয়েকে আমার ছেলে এসব বলবে ভাবলেই বা কীভাবে? ওই মেয়ে মিথ্যা বলছে না তার গেরান্টি কী?’
ওসমান শব্দ করে হাসেন। বলেন, ‘কাজের মেয়ে হলেও এই বাড়ির মেয়ে। আমার মেয়ে। করীম, সিসিটিভি দেখাব সবাইকে?’
মুহূর্তে তটস্থ হলেন ভদ্রলোক। ছেকে কাইকুই করে উঠতে চাচ্ছে। ওসমান স্পষ্ট করে বললেন –
‘এক্ষুনি তোর এই কুলাঙ্গার ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে যা। নাহলে আমি গার্ডস দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বের করাব।’
করীমের চোখজোড়া অপমানে লাল হয়ে এল। একপলক শক্ত চোখে চেয়ে নিজের ছেলেমেয়ে, গার্ডস নিয়ে করীম বেরিয়ে গেলেন। ওসমান নিজের ছেলের কাঁধ চাপড়ে তাকালেন নূরজাহানের দিকে। তখুনি এসে দাঁড়িয়েছেন গুলনাহার। ওসমান স্ত্রীকে বললেন –
‘যাও, মেয়েটাকে নিয়ে ভেতরে যাও।’
গুলনাহার তখনো সবটা জানে না। খুলে বলল জুলেখা। ততক্ষণে সাবানা আর নূরজাহানকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে গুলনাহার।
গুলনাহার ভীষণ মায়ামায়া ভঙ্গিতে ছেলের দিকে চেয়ে আবদার করলেন, ‘শোনা না বাবু! একটু শুনি। আমার পছন্দের গান ওটা।’
আদিল ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে। হাতে পছন্দের গিটার। এটায় তার নাম লেখা। ওসমান রাশিয়া থেকে এনে দিয়েছে। প্রায়শই সে মায়ের জন্য গান গায়। যেহেতু গতকাল তাদের বিবাহবার্ষিকী গিয়েছে অবশ্য আজ সে গান শোনাবে। তা হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। গুলনাহার সেকেলে মানুষ। পছন্দের গানও সেকেলে। একটা বাংলা, দুঃখী গান তার পছন্দের। আদিল যখনই ওই গান গায় তার হাসি পায়। ওই গানের লিরিকস গুলো মোটেও তার সাথে মানায় না, যায় না। তাই ওই গান সে ফিলিংস নিয়ে গাইতে পারে না। তাও গুলনাহার ছেলের মুখেই শুনতে চান। আজও ব্যতিক্রম নয়। আদিল বাধ্য বড্ড, গিটার বাজানো শুরু করল। অবশেষে সুর তুলে গাইল কয়েকটি লাইন। কণ্ঠে উচ্ছ্বাস, চোখে উজ্জ্বলতা যা গানের সাথে মোটেও মানাল না –
‘না জানি কোন অপরাধে..
দিলা এমন জীবন,
আমারে পুড়াইতে তোমার…
এতো আয়োজন,
আমারে ডুবাইতে তোমার…
এতো আয়োজন …’
গুলনাহার চোখ বুজে শুনলেন ছেলের কণ্ঠ। আদিল গান শেষ করে শব্দ করে হেসে উঠল। গিটার রেখে মাথাটা ফেলল মায়ের কোলে। গুলনাহার সবসময়ই শাড়ি পরেন। প্রিন্টেড সিল্কের শাড়ি। আপাতত তাই পরনে। মায়ের ঘ্রান নাকে নিয়ে আদিল চোখ বুজল। জিজ্ঞেস করল –
‘পাপা কোথায়? ফিরেনি এখনো!’
‘এইতো আর কিছুদিন। কাজকর্ম ছেড়ে তো দিচ্ছেন ধীরেসুস্থে। ভাবছি সে ফ্রি হলে ভ্যাকেশনে যাব।’
আদিল চটপট বলল, ‘সুইজারল্যান্ড যাব।’
আপত্তি নেই গুলনাহারের। ঘড়ির কাঁটা দেখলেন, রাত হয়েছে। ওসমান ফিরবে বলে। ছেলের মাথা সোফায় রেখে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। সাবানা, জুলেখা সাহায্য করছে ডাইনিং সাজাতে। সাইফ, আসাদের কণ্ঠ শুনে উঠে বসল আদিল। ওসমান প্রবেশ করেছে। আদিল চ্যাঁচাল –
‘আসাদ চাচ্চু, আজকে আমি কী পেয়েছি জানো?’
আসাদ বরাবরই চমৎকার শ্রোতা আদিলের। জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিলো উচ্ছ্বাসের সাথে, ‘কী পেয়েছেন বাবা?’
‘একটা হোয়াইট হেয়ার।’
টিশার্টের পকেট থেকে আদিল একটা সাদা চুল বের করে সবার সামনে ধরল। যেন যাদুঘরে রাখা কোনো খনি। ওসমানের চেহারায় মেঘ জমল। ইদানিং তার চুলের ভাঁজে দু একটা সাদা চুল দেখা যাচ্ছে। যা ওসমান তুলে ফেলতেন। আসাদ ঠোঁটে ঠোঁট টিপে ধরল। সাইফের অবস্থা তেমন একটা ভালো না। মুখ লাল হয়ে গিয়েছে হাসি আটকাতে গিয়ে। ওসমান গর্জে উঠলেন –
‘ননসেন্স! আদিল!’
আদিল ওই চুল সবার সম্মুখে ধরে রেখে ঘোষণা দিয়ে উঠল, ‘এখনো মাম্মামকে দেখানো হয়নি। তার তো জানা উচিত তার স্বামী বুড়ো হচ্ছে!’
মুহূর্তে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন ওসমান। তাড়া দিলেন, ছেলেকে ধরে আচ্ছারকম কান মলবেন। সে সুযোগ আদিল দেয়নি। সে পালাতে ব্যস্ত। পুরো ড্রয়িংরুমে চক্কর কেটে রান্নাঘরে ঢুকেছে। ব্যস্ত হয়ে পেছন পেছন প্রবেশ করেছে ওসমানও। গুলনাহার মুরগির মাংসটা গরম করতে বসিয়েছেন। সাবানা, জুলেখা আলগোছে এককোণে দাঁড়িয়ে হাসছে। আদিল লুকিয়েছে মায়ের পেছনে। ওসমান ছেলেকে ধরতে চাইলেন। বাঁধ সাধলেন গুলনাহার। তিনি বিরক্ত, আবার হাসছেনও –
‘করছেন কী? বাচ্চার সাথে বাচ্চামি!’
বলতে বলতে কোমরের আঁচল ছাড়িয়ে সাবানাকে বললেন –
‘মুরগিটা পরিবেশন কর। আমি আসছি।’
গুলনাহার চোখ রাঙালেন ফের স্বামীর দিকে, ‘আসুন, কাজ থেকে ফিরে বিশ্রাম নেই, ফ্রেশ হওয়া নেই…ছোটাছুটি হচ্ছে!’
গুলনাহার বেরিয়ে গিয়েছেন রান্নাঘর ছেড়ে। আদিলও বেরিয়ে গিয়েছে দৌড়ে। ওসমান ধমকাতেও পারলেন না ছেলেকে। রুমে এসে দেখলেন গুলনাহার ট্রাউজার, টিশার্ট বের করে দিয়েছে। পৃথিবীর সব ক্লান্তি মুহূর্তে জমল ওসমানের শরীরে। গায়ের পোশাক খুলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিছানায়। ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন –
‘কাঁধ, মাথাটা ব্যথা করছে। মালিশ করে দাও।’
গুলনাহার গিয়ে বসলেন মাথার কাছে। দুহাতে টিপলেন কাঁধ, তারপর কপালে। বালিশ থেকে ওসমানের মাথা চলে গেলো স্ত্রীর কোলে। পরম যত্নে কপাল, কাঁধ মালিশ করে চুলের ভাঁজে ভাঁজে আঙুল ঘোরাচ্ছে্ন গুলনাহার। একপর্যায়ে অনুভব করলেন ঘুমিয়ে পড়েছে ওসমান। গুলনাহার আর তাকে জাগালেন না। নড়ল না যদি ঘুমটা ছুটে যায় মানুষটার। একইরকমভাবে বসে আঙুল চালা্লেন চুলের ভাঁজে। একসময়ে তার নিজেরও চোখ লেগে যায়।
এমন সাতসকালে ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে পুরো ম্যানশন মাথায় তুলেছে আদিল। তার আশেপাশে শান্ত, এলেন আছে। দুজানাই আদিলের ছোটো। এখনো চেহারায় বাচ্চা বাচ্চা ভাব। ওদের এখনো বডিগার্ডের ট্রেনিং চলছে। সাইফ, আসাদ দায়িত্বে আছে ওদের। চব্বিশ ঘণ্টার বারো ঘন্টাই শান্তর ট্রেনিংয়ে চলে যায়। আদিলের বিশ্বস্ত বডিগার্ড ওসমান নিজে বাছাই করে এনেছেন। ছোটো থেকে হাতের কাছে রেখে শিখিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছেন ছেলের জন্য। ছেলের নিরাপত্তা আগে তার কাছে। একান্ত গার্ড বিশ্বস্ত হওয়া যে কতটা প্রয়োজনীয় তা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়! আদিল অবশ্য এসবে তেমন মাথা ঘামায় না। তার নাকি গার্ডের প্রোয়োজন নেই। একাই একশো! ওসমান বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখলেন ছেলের ব্যস্ত শরীর। উড়ে উড়ে ব্যাডমিন্টন খেলছে। গার্ড, বাড়ির কাজের লোক দিয়ে প্রাঙ্গণ ভরে আছে। সবাই খেলা দেখছে ভীষণ আগ্রহের সাথে। আদিল চ্যাঁচামেচি করছে –
‘শান্ত, ইউ ইডিয়ট। জোরে মার!’
শান্ত কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, ‘য..যদি মুখে লাগে আপনার?’
‘বিচ্ছুর ঘরে বিচ্ছু, তুই মা র। দেখি কতো শক্তি তোর!’
ওসমান শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে এগিয়ে গিয়ে শান্তর হাত থেকে র্যাকেট নেন। শাটলকক ছুঁড়ে র্যাকেট দিয়ে মেরে ওপর পাশে মারেন। আদিল সতর্ক হয়েছে বেশ। আগের উড়োউড়ো ভাবটা নেই। মনোযোগের সাথে খেলছে এখন। ছেলের ওমন সতর্ক হাবভাব ভালোই উপভোগ করছেন ওসমান। হাসছে সাইফ, আসাদও। মিনিট দশেক টাকা শাটলকক হাওয়াতেই আছে। দুজানার পালা আক্রমণ চলছে। একপর্যায়ে হার স্বেচ্ছায় হার মানলেন ওসমান। বোঝালেন তিনি এই্পর্যায়ে আর মা রতে পারেননি। আদিল হৈচৈ ফেলে লাফিয়ে উঠল। তার অট্টহাসির আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছে ম্যানশন জুড়ে। ছেলের হাস্যোজ্বল এই চেহারার জন্য এমন সহস্র পরাজয় খুশি মনে ওসমান মেনে নেবেন।
‘কী? নিউজপেপারের ফ্রন্টে বড়ো করে হেডলাইন ছাপাতে বলব নাকি? এক যুবকের নিকট ব্যাডমিন্টনে হেরে গেলেন ওসমান মির্জা!’
সাইফ হাসছে। বলল, ‘আপনি বললে আদেশ করি বাবা?’
আদিল ব্যাডমিন্টন ফেলে ছুটে গিয়ে ওসমানের পিঠে লাফিয়ে চড়েছে। গলা ধরে হাসতে হাসতে বলল –
‘উহুঁ, তোমরা জানলেই হবে।’
ওসমান ছেলের হঠাৎ আক্রমণে সামান্য টলেছেন অবশ্য। চোখমুখ গম্ভীর রাখতে চেয়ে ধমকে ওঠেন, ‘নামো! কটা বাজে? স্কুল যাও।’
আদিল নামল না। জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছো মাম্মাকে নিয়ে?’
‘তোমার নানার বাড়ি। তারা বেঁচে নেই, তবে বাড়িটা তো আছে। কদিন ধরে ওখানে যাওয়ার বায়না ধরে আছে।’
‘আমিও যাব পাপা।’
‘আজ না। অন্য একদিন।’
আদিল লাফিয়ে নামল বাবার পিঠ থেকে। গুলনাহার তখুনি বেরুলেন। প্রিন্টেড শাড়িটা নরম আলোয় জ্বলজ্বল করছে। ড্রাইভওয়েতে তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সাইফ, আসাদ গার্ড নিচ্ছে কিছু। এখুনি বেরুবে তারা। গুলনাহারের সাথে সাবানা যাবেন। জুলেখা থেকে গিয়েছে আদিলের জন্য। গুলনাহার ছেলের ঘর্মাক্ত মুখটা আঁচলে মুছে বললেন –
‘ফিরে আসব দ্রুতো। স্কুল থেকে ফিরে খেয়ে নিও। তোমার চাচি থাকবে।’
আদিল হেসে মাথা দোলাল। বলল, ‘তাড়াতাড়ি এসো। শপিংয়ে যাব। সুইজারল্যান্ড যাওয়ার জন্য কতকিছু কেনা বাকি।’
ওসমান বললেন, ‘স্কুল থেকে ফিরে দেখবে চলে এসেছি। এবার যাও, রেডি হয়ে স্কুলে যাও।’
ওসমান তাকালেন তার বিশ্বস্ত গার্ডের দিকে। আনোয়ার দাঁড়িয়ে ছিলেন পেছনে। তার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘থাকো, ছেলেকে দেখে রাখিস।’
আদিল অসহায় ভাবে মাথা দুলিয়ে তাড়া দিলো তাদের –
‘তোমরা এমন ভাব করছো যেন কয়েক বছরের জন্য যাচ্ছো!’
গুলনাহার ছেলের গাল টানলেন, ‘মায়ের মন বুঝবে না। আর নাইবা বাবার! সন্তানের ছায়া আশেপাশে না থাকলে চিন্তা হয়।’
আদিল হঠাৎ নুইয়ে মায়ের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো, ‘বুঝেছি। সাবধানে থাকব।’
হাসলেন গুলনাহার। কদম বাড়ালেন গাড়ির দিকে। ওসমান গাড়ির ব্যাকসিটের দরজা মেলে ধরেছেন। গুলনাহার উঠে বসল। ওসমান গাড়িতে উঠে বসার আগে ফিরে তাকালেন হঠাৎ। আদিল তখনো দুয়ারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হাসছিল। ওসমান গলা তুলে বললেন –
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫২
‘আব্বাজান, এদিক ওদিকে যাওয়া নয় আজ। স্কুল থেকে সোজা বাড়িতে। মনে থাকবে?’
আদিল হাত তুলে সালাম ঠুকল, ‘ইয়েস বস! মনে থাকবে।’
হেসে ফেললেন ওসমান। সবাইকে আরেকবার সতর্ক করে অবশেষে উঠে বসলেন। গাড়ি তিনটে ধীরেসুস্থে বেরিয়ে গেলো ম্যানশন থেকে। আদিল লাফিয়ে, কয়েক কদমে সিঁড়ি বেয়ে ঢুকল ভেতরে। কোনোরকমে স্কুলের সাদা শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট, টাই পরে কাঁধে ব্যাগ চড়িয়ে, পাউরুটি মুখে নিয়েই বেরিয়ে এসেছে। পেছনে জুলেখা অনুনয় করে গেলেন আরেকটু খাওয়ার জন্য। কথা শুনল না আদিল। গাড়িতে উঠে বসল। তার সাথে শান্ত, এলেন আর আনোয়ার যাচ্ছে।
