Home তাকদীর তাকদীর পর্ব ১২

তাকদীর পর্ব ১২

তাকদীর পর্ব ১২
নিরুর কল্পনারাজ্য

জুনায়েদ আমিরাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। আর আয়রা তাদের পানে চেয়ে। ততক্ষণে আমিরা নিগূঢ় তন্দ্রায় আচ্ছন্ন এক শিশু। আমিরা নিদ্রাচ্ছন্ন বুঝতে পেরে আয়রা এবারে জুনায়েদের উদ্দেশ্যে ধীরলয়ে বলে ওঠে,
— এবার আমাকে দিন, আমি শুইয়ে দিচ্ছি আমিরাকে।
জুনায়েদের পা’দুটো থমকে গেলো। সে আয়রার পানে চেয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে ওপর-নিচ মাথা নাড়লো। অতঃপর আমিরাকে পাঁজা কোল করে ধীরে-সুস্থে হাতের মাঝে ধরলো। যাতে তার ঘুম ভেঙে না যায়। আমিরাকে বাহুর মাঝে নেওয়ার পর আপনাআপনিই কিছুপল তার নীল চোখদুটো স্থির রইলো বাচ্চাটার ওপর। কী ভীষণ আদুরে! ঘুমালে চোখের ভারি পল্লবদ্বয় গোলাপের ন্যায় গুটিয়ে থাকে। আর কোমল গোলাপী ঠোঁট দুটো শিশুসুলভ উল্টে থাকে। জুনায়েদ তার পানে চেয়ে মৃদু হাসে। যা অগোচর হয়না আয়রার। জুনায়েদের আচরণে সে হতবাক হচ্ছে ক্রমশ। জুনায়েদ আলতোভাবে আমিরার বাম হাতটা ঠোঁটের কাছে ধরে অধর ছোঁয়ায় ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলোয়। তাতে আমিরা নড়ে-চড়ে ওঠে স্বল্প। জুনায়েদ ঘাবড়ায়। উঠে যাবে না-তো আবার? সে-যে মদ্যপ হয়ে রয়েছে বেমালুম ভুলেই গেলো তার মস্তিষ্ক। এই ছোট্ট সত্ত্বাটাকে কোল হতে নামানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই। তবে সে-তো বাহির থেকে এসেছে তার ওপর নোংরা হয়ে রয়েছে। অনেকখানি নিষিদ্ধ দ্রব্য পান করেছে যা তার গায়ে-গোত্রে মিশে রয়েছে। জুনায়েদ আমিরার পানে চেয়ে শুধালো নরম কন্ঠে,

— যদি উঠে যায়?
আয়রার বরাবরের ন্যায় স্থির এবং শীতল কণ্ঠ,
— আমি সামলে নিতে জানি।
জুনায়েদ নিজের শান্ত দৃষ্টি নিবিষ্ট করে আয়রার নরম কায়ার ওপর। বিনাবাক্য ব্যয়ে তাকে হস্তান্তর করে আয়রার নিকট। আয়রা এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নেয় নিজের মেয়েকে। জড়িয়ে নেয় ছোট; কোমল তনুখানা নিজের বক্ষে। জুনায়েদ স্থির চিত্তে চেয়ে রয়। তবে তার মন অকস্মাৎ উত্তাল হয়ে উঠলো। অদ্ভুত এক প্রশ্ন ঝড়ের ন্যায় আঁচড়ে পড়লো তার মনগহীনে। দ্বিধান্বিত কায় তার প্রশ্ন তুললো এক,
— আচ্ছা, আমার ছোঁয়ায় কী ও অপবিত্র হয়ে গিয়েছে?
আকস্মিক এমন প্রশ্নে জুনায়েদের পানে চায় আয়রা। অপবিত্র হওয়ার প্রশ্ন কেন হঠাৎ? সে পাল্টা প্রশ্নে শুধায়,
— অপবিত্র কেনো হবে?
জুনায়েদের বরাবরের ন্যায় স্পষ্ট স্বরের উত্তর,

— ইউ নৌ, আ’ম ড্রাংক রাইট নাও! আর এই অবস্থাতে আমার মতো একজন মদ্যপ ওর মতো একটা পবিত্র সত্ত্বাকে ছুঁয়েছে….আই মিন, তুমি বুঝতে পারছো তো আমি কী বলতে চাইছি?
আয়রা হাসে স্মিত, উত্তরে বলে,
— হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। আপনার উদ্দেশ্য নিশ্চয় বাজে ছিলোনা। তাই, আমিরার অপবিত্র হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া, বাচ্চারা পবিত্র।
জুনায়েদ শান্ত হয়। ভ্রু কুঁচকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ ধরে। আয়রা থামায় তাকে ফের আরও একবার। বলে,
— শুনুন!
আবারও এক-ই শব্দ। জুনায়েদ ঘাড় ঘুরিয়ে ভ্রু উঁচায়। বোঝায় যে-‘আবার কী হলো?’
আয়রা আমিরাকে কোলে নিয়েই শুধায়,
— আমিরা তখন কাঁদছিলো কেনো?
জুনায়েদের মস্তিষ্ক ধপ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জ্বলে ওঠে অগ্নিশিখায় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা অগ্নিকুণ্ডের ন্যায়। বিকেলের সকল স্মৃতি এক এক করে চোখের পর্দায় ভাসমান হতে থাকে। চোখ-মুখ শক্ত হয়ে ওঠে। পুরুষটির অতিরিক্ত রাগ। এই রাগ সংবরণ হবার নয়। সে এ’পর্যায়ে উত্তর না দেওয়ার তাগিদে সামনে পা বাড়ায়। তবে আবারও তাকে পিছু ডাকে আয়রা,

— পড়ে গিয়েছিলো কী কোথাও?
জুনায়েদ এবার ঘুরে দাঁড়ায়। শান্ত কন্ঠে বিস্ফোরণ ঘটায়,
— ওর বাবার জন্য!
আয়রা ভাবুক একইসাথে দ্বিধান্বিত হয়ে শুধায়,
— বাবার জন্য কেনো কাঁদবে হঠাৎ করে?
— কারণ আমিরার বাবা আমিরার সামনেই উপস্থিত ছিলো।
ছোট্ট একটি লাইন। অথচ তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সে উচ্চারণ করলো পরপরই,
— ফারিশ? অর্থাৎ আমিরার বাবা? তার সাথে দেখা হয়েছিলো আপনার?
বিরক্ত হয় জুনায়েদ। বিরক্তির সুর কেটে বলে,
— এতো কুয়েশ্চন একসাথে করছো কেনো?
— আপনি কী নিশ্চিত যে সে ফারিশ নামক ব্যক্তিই ছিলো? কীভাবে সম্ভব? ফারিশ এখানে কী করবে!
— স্টপ! স্টপ, টেকিং আদার মেন’স নেইম অন ইয়্যুর টাঙ।
— জ্বী?
আয়রার বোকা প্রশ্ন। কেননা জুনায়েদের আচরণ অদ্ভুত ঠেকছে আয়রার নিকট। জুনায়েদ ফের বলে,

— ওই বাস্টার্ডটার নাম আমার সামনে না নিতে বলেছি।
— আপনাদের মাঝে কী কিছু হয়েছিলো? আপনি কী জানিয়ে দিয়েছেন যে আপনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে?
আয়রা সন্দিগ্ধ হয়ে শুধালো। পাল্টা প্রশ্নে জুনায়েদের জবাব,
— কেনো? জানালে কোনো সমস্যা তোমার?
— তেমন ব্যাপার নয়। তবে সে বিশ্বাস করবেনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
— আচ্ছা? এতোটা বোঝাপড়া দুজনের?
আয়রার আদলজুড়ে এবার বিষাদের ছায়া নামলো। বোঝাপড়া! কেবল এক কৌতুক তা। তাকে তার স্বামী–যে কিনা তাকে ওয়াদা করেছিলো আজীবন পাশে থাকার; সে-ই কিনা একজন বাইজির কারণে তাকে স্থানচ্যুত করেছে। এমনকি একবার নিজের সন্তানটার কথা অব্দি ভাবলোনা। ভাবলোনা তাদের সুখী পরিবারটার কথা। কী ছিলোনা তাদের? তবু এমন এক পন্থা সে অবলম্বন করলো যে পন্থা আয়রার জন্য ঘাত হয়ে আসবে। আয়রা নিজের কল্পজগতে নিমজ্জিত ছিলো, এমতাবস্থায় জুনায়েদ তার সামনে তুড়ি বাজায়। রুক্ষ স্বরে শুধায়,

— এই হিজাবীনি!
আয়রা নিজের কল্পনা রেখে বাস্তবে ফিরে। আনমনে শুধায়,
— হু?
— এক্সের ভাবনায় ডুবেছো?
আয়রার মুখটা শুকিয়ে ওঠে। তিক্ত অতীত ভেসে ওঠে চোখের সামনে। ‘এক্স’ শব্দটির দরুণ আয়রার খারাপ লাগা কাজ করে অল্প মনে। শত হোক, একসাথে জীবনের পাঁচটা বছর কাটিয়েছে। তবে এমন নয় যে সে আফসোস করছে। জুনায়েদের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়রা। এই পুরুষ এতোটা ঘাড়ত্যাড়াভাবে কথা বলে কেনো! আয়রা আমিরাকে ধীরে ধীরে শুইয়ে দিয়ে আসে। আমিরার ছোট দেহের ওপর কাথাটা টেনে দিয়ে এসে দাঁড়ায় জুনায়েদের সম্মুখে। জুনায়েদের হঠাৎ একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। সেই দৃশ্যকে কেন্দ্র করেই সে তার মনে জেগে ওঠা প্রশ্নের উত্তর জানতে আয়রাকে শুধায়,

— আচ্ছা, তখন কী তুমি তোমার খোদার কাছে আমার নামে নালিশ জানাচ্ছিলে?
আয়রার ভ্রু দুটো কুঁচকে যায়৷ সে অজ্ঞের ন্যায় বলে,
— আমি? আমি কেনো খোদাতায়ালার কাছে নালিশ জমা করবো?
— তাহলে তখন যে কাঁদছিলে…..
— আমি আপনার হেদায়াতের জন্য দোয়া চাইছিলাম।
জুনায়েদ শুরুতে বুঝতে পারেনা। দ্বিধান্বিত স্বরে বলে,
— এক সেকেন্ড!
অতঃপর পকেট হতে বিলাসবহুল; দামী ফোনখানা হাতে নিয়ে গুগল নামক এপস এ ‘হেদায়েত’ নামক শব্দের অর্থ খুঁজে বের করে। ‘সঠিক পথের দিশা’!’ অর্থাৎ আয়রা তার জন্য ভালো কিছুর-ই প্রার্থনা করছিলো? অবাক হয় সে। হতবিহ্বল কন্ঠে সে শুধায়,
— আমার জন্য? তাহলে কাঁদছিলে কেনো?
আয়রা বলে,
— আমার দ্বারা একটি ভুল হয়ে গিয়েছিলে এবং সেটার জন্য-ই আল্লাহতায়ালার নিকট আমি তওবা করছিলাম।
— আচ্ছা!
পুরুষটির স্বাভাবিক স্বর। অতঃপর বলে,

— ওকে দ্যান, গুড নাইট!
— আপনি কী বাহিরের রুমে শুবেন?
— ইয়েস, এজ ইউজুয়াল!
— আপনি চাইলে আপনার নিজের কক্ষেও থাকতে পারেন।
জুনায়েদ চমকায়। শুধায়,
— হু? কী বললে তুমি?
— বললাম, আপনি চাইলে এই কক্ষেই অবস্থান করতে পারেন।
— শিউর তুমি? আনকম্ফোর্ট্যাবল ফিল হবেনা?
আয়রার শান্ত স্বর,
— না, নিজের স্বামীর সামনে কেনো অস্বস্তি বোধ করবো?

জুনায়েদের ‘স্বামী’ শব্দটা বড্ড সুমধুর শোনালো। সে বাকহারা হয়ে পড়লো। ঘনঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে আরম্ভ করলো। কিছু না বলে কেবল ওপর-নিচ মাথা নাড়লো। অতঃপর কাবার্ডের নিকট গিয়ে একটা সাদা রঙা টি-শার্ট আর সাথে ট্রাওজার বের করে আনলো। টাওয়াল হাতে নিয়ে অশান্তি পদাচরণে ওয়াশরুমের উদ্দেশ্যে চলে গেলো।
আয়রা শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। সে বলে তো দিয়েছে তার অস্বস্তি হবেনা। তবে আদৌতেই কী স্বস্তিতে থাকতে পারবে? জুনায়েদের আচরণের সাথে সৈয়দ রুহানির কথাবার্তার তুমুল বিরোধ রয়েছে। এখনো অব্দি জুনায়েেদর কোনো আচরণ তাকে আঘাত করেনি। তবু মনে ভেতর খচখচ করছে কোথাও না কোথাও। অস্বাভাবিক নয়। বিয়ের এতোদিন পর তাদের প্রথম কথোপকথন ছিলো সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক! এসব ভাবতে ভাবতেই আয়রা গিয়ে শুয়ে পড়লো আমিরার পাশে। কম্ফোর্টার গায়ে জড়িয়ে নিলো। বাহিরে বোধহয় অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে। হিজাবটা খুলে রাখলো পাশের টেবিলে। আবহাওয়া ভীষণ ঠান্ডা। এই শীতল আবহাওয়ায় রমণীর চোখ কবে যে বুজে এলো সে নিজেও তা ঠাহর করতে অক্ষম হলো। অতঃপর, মা-মেয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

অপরদিকে এক বেপরোয়া পুরুষ—যার পরিস্থিতি এমুহূর্তে বাহিরের ঝড়ের ন্যায় অশান্ত। পুরুষটির পরণে কেবলই কোমর অব্দি এক টাওয়াল। টানটান শরীরের পেশিবহুল পেটানো বক্ষস্থলের নিচের অংশের খাঁজসমূহ দৃশ্যমান। অথচ, পুরুষটি ক্ষণে ক্ষণে মিটমিটিয়ে হেসেই যাচ্ছে। কিছুতেই নিজের হাসির এই উৎস অথবা এই হাসি সে থামাতেই পারছেনা। সে তো হাসেনা। তাহলে হঠাৎ করেই এতো হাসি কোথা থেকে আসছে? তার কেবল-ই আয়রার সেই কথাগুলো মনে পড়ছে। ‘স্বামী!’ আয়রা তাকে স্বামী মানে? তার হেদায়েতের জন্যও দোয়া চেয়েছে? বিষয়গুলো তার ওপর অন্যরকম প্রভাব ফেলছে। তার এই মুহূর্তে বুঝে এলো—শহরের এতো এতো মেয়েদের অবহেলার কারণ বুঝি এই রমণী! চুলে শ্যাম্পু করতে করতে এসব ভাবছিলো সে। আয়রার ভাবনায় এতোই ডুবে ছিলো যে সেই শ্যাম্পুর পিচ্ছিল মেঝেতে হঠাৎ করেই ধপাস করে পিছলা খেয়ে বসলো সে। পড়ে গেলো হঠাৎ-ই। কোনো কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই সে হতবাক হয়ে গেলো। কপালের দিকটায় বড্ড আঘাতও লাগলো। মুহূর্তেই মস্তিষ্ক অশান্ত হয়ে উঠলো। এতোটা বিরক্তি অনুভূত হলো যে সে নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইংরেজিতে এক গালি দিয়ে বসলো,

— শিট! দিজ ফাকিং ফ্লোর।
নিজেই ফের ভাবলো,
— এসব কী ভাবছি আমি। আমি তো ওকে মানিই না। আমার কী হচ্ছে এসব।
অতঃপর তিক্ত মেজাজে সে উঠে দাঁড়ালো ফের। আয়নার পানে দৃষ্টি পড়তেই বিরক্তির পারদ আরও বাড়লো তার। কপালের কাছটা সঙ্গে সঙ্গেই ফুলে উঠেছে। পুরুষটি বিড়বিড় করলো ফের,
— শিট!
অতঃপর কিছুপল পরেই সে বেরিয়ে সম্পূর্ণ শুদ্ধ হয়ে। চুলগুলো তখনও ভেজা। টাওয়াল দ্বারা তার কেশদ্বয় মুছতে মুছতে সে এসে দাঁড়ালো ড্রেসিং টেবিলের সামনে। অভ্যাসবশত নিজের আয়নার সম্মুখে চুল মুছতে মুছতে পুরুষটির নীল সায়রের ন্যায় চোখদুটো অকস্মাৎ নজর ঘোরালো সামান্য ডানে। বিছানায় শায়িত সেই রমণীর প্রতিবিম্ব প্রস্ফুটিত হয়েছে কাঁচের আয়নায়। জুনায়েদের হাত থমকে গেলো সেখানেই। সে ভ্যাবলার ন্যায় চেয়েই রইলো। চোখ ফেরাতে পারলো না। বরংচ সম্মোহিত’র ন্যায় টাওয়ালখানা ড্রেসিং টেবিলোর ওপর রেখেই এগিয়ে গেলো বিছানা দিকে। আয়রা বিছানার একপাশে মুখ করে শুয়ে। হিজাবখানা মাথায় নেই। প্রথমবারের মতো আজ জুনায়েদ তাকে হিজাব ছাড়া দেখছে। টানা টানা চোখদুটো দীঘলপল্লব, গুটিকতক চুল মায়াবী মুখখানার ওপর আছড়ে পড়েছে। সে এই মায়ায় জড়িয়ে গেলো নিমিষেই। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সেথায়। তার চোখদুটো যেনো আটকে রয়েছে সেই মুখখানায়। এতোটা কেনো ভালো লাগছে মেয়েটাকে কে জানে! তার সেই প্রথমদিনের কথা মনে পড়ে গেলো। সে আনমনে হেসে ফেললো। উচ্চারণ করলো,

— এই হিজাবীনি, এতোটা মায়াবী কেনো তোমার মুখখানা? কেনো তোমার এই মুখখানা দেখলেই আমার হৃদয় প্রশান্ত হয়ে ওঠে? কোনো কালোজাদু করেছো কী?
তোমার এই মায়াবী চেহারার কারণেই কী তবে আমার চোখদুটো আপনাআপনি অন্য কোনো রমণীর সম্মুখে নত হয়ে যায়? ঝুঁকে যায় আমার মাথা?
অথচ উত্তর এলোনা কোনো। আসার কথাও তো নয়। মেয়েটাতো ঘুমিয়ে। অথচ পুরুষটি পারলোনা ঘুমোতে। সেই এক নারীর মায়ায় পড়ে যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়া, বখাটে পুরুষটির গোটা এক রাত নির্ঘুম কাটলো। অথচ সে তার জীবদ্দশায় কোনো রমণীর জন্য ঘুম তো দূর একবিন্দু অনুভূতিও জমাতে পারেনি। সে গোটা রাত হাঁটুমুড়ে সেই রমণীটিকে দেখে গেলো যাকে তার জন্য পাঠানো হয়েছে। যাকে তার জন্য গড়া হয়েছে। যে তার হেদায়েতর উছিলা। আল্লাহতায়ালা অসীম দয়ালু। সে তার যেকোনো বান্দাকেই চাইলে হেদায়েত প্রদান করতে পারেন। তবে সে হেদায়েত বান্দা কীভাবে গ্রহণ করবে সেটা তার ওপর নির্ভর করে। বান্দা যদি খোদাতায়ালার হেদায়েতের অপব্যবহারে লিপ্ত হয় তবে তার নিয়তি হতে খোদা সেই হেদায়েত তুলে নিতে দু’বার ভাবেন না। তার উদাহরণ হিসেবে অন্যপ্রান্তে অবস্থানরত ফারিশের অবস্থাতেই বোঝা যায়।

ফারিশ, এই মাঝরাতে জানালার ধারে বসে। পেছনেই তার স্ত্রী তুবা ঘুমিয়ে। কিছুমুহূর্ত পূর্বেই তারা ঘনিষ্ঠ এক সময় পার করেছে। অথচ ফারিশের মন উত্তাল। তার মেয়ে, এখন অন্যকারো? তার স্ত্রী? তার এসব চিন্তায় মাথা ফেঁটে যাওয়ার উপক্রম। এক এক করে তার মনে পড়তে থাকে আয়রার সাথে কাটানো সকল হাসি-খুশি’র মুহূর্তগুলো। একসাথে অযু করা থেকে নামাজ পড়া। আমিরাকে অপেক্ষায় রেখে মসজিদে যাওয়া; আসার সময় স্ত্রী এবং মেয়ের জন্য জিলাপি নিয়ে আসা। আমিরাকে কুরআন তিলওয়াত করে শোনানো। কত সুন্দর ছিলো দিনগুলো! সে কী আফসোস করছে? কিন্তু এমন তো হওয়ায় কথা নয়। সে বোধহয় কোথাও না কোথাও কষ্ট পাচ্ছে। হ্যাঁ, তাই হবে। মায়া-ই অনুভব করছে। আর কিছুই নয়। তবু কেনো তার বুকটা এমন মরুভূমির ন্যায় খাঁ খাঁ করছে? সে বিড়বিড় করলো মনে মনে,

— হে আল্লাহ, আমার মনকে আপনি শান্ত করুন৷ এ’কেমন পরিস্থিতি! আমি কী কোনো ভুল করেছি? চারটি বিয়ে তো ইসলামে সুন্নত। তাহলে আমি তো কেবল তুবাকে সেই নরকখানা হতে বাঁচিয়েছি! তবু আমার মন এমন উত্তাল কেনো?
খোদার সেই অজ্ঞ বান্দাকে বোধহয় খোদা জানান দিলো—‘সে কী করে তার স্ত্রীর আড়ালে জঘন্য পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলো। সে তার স্ত্রী মন ঠিক কতবার ভেঙেছিলো।’ অথচ সে-তো শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চায়ছে। তা কী সম্ভব? একদমই নয়।
জাহান্নাম এবং জান্নাত। খারাপ কর্ম করা প্রতিটি মানুষের পরকালের শেষ ঠিকানা জাহান্নাম এবং ভালো কাজ করা প্রতিটি বান্দার পরকালের শেষ ঠিকানা জান্নাত। সেই জাহান্নামের সর্বনিম্ন শাস্তির স্তর হলো—
কেয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা শাস্তি হবে ‘ব্যাক্তির পায়ের তালুর নিচে আগুনের দুটি কয়লা রাখা হবে এবং মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকবে।’

অথচ খোদার পাঠানো এই মাটির গড়া মানুষগুলো সেই জাহান্নামের জঘন্য থেকে জঘন্যতম শাস্তিগুলো ভুলে অনায়াসে পাপ করে চলেছে। ঠিক তেমনি, আল্লাহর বিধানে পৃথিবীতে বসবাসরত অবস্থায় পরকীয়ায় লিপ্ত প্রতিটি জাহান্নামী যারা নিজেদের ভুল স্বীকার অর্থাৎ তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করবে তাদের জন্য শাস্তি হিসেবে হাদিস শরীফে বর্ণিত রয়েছে যে,,
— মেরাজের রাতে মহানবী (সা.) জাহান্নামে একটি গর্ত দেখেছিলেন যা মাটির চুলোর ন্যায় যা ওপরের দিকটায় ছিলো সংকীর্ণ। মাটির চুলোর মতো দেখতে সেই গর্ত যেখানে প্রতিটি জাহান্নামীকে উলঙ্গ করে অগ্নির লেলিহান শিখায় দগ্ধ করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। চুলোর সেই গর্তের নিচ হতে যখনই আগুনের তাপ ওপরের দিকে উঠে আসবে ঠিক তখনই সকলে ওপরের দিকে উঠে আসতো এবং যখনই আগুন কিছুটা কমে যেতো তখনই সবাই নিচে পড়ে যেতো এবং এভাবেই কেয়ামত অব্দি তাদের শাস্তি চলতে থাকবে। এ সম্পর্কে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) তাকে জানান যে, ‘এরা হলো সেই পুরুষ ও নারী যারা ব্যভিচার ও অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত ছিলো।’

তাকদীর পর্ব ১১

এবং এভাবেই পরকীয়া এবং অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত সকল নারী-পুরুষের শেষ পরিণতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ব্যাপারে কী বোধগম্য নয় ফারিশ নামক পুরুষটি? সে নিজ ইচ্ছাতেই নিজের সংসার এবং নিজের হেদায়তকে হারিয়েছে এবং এমন এক কাজ করেছে যাকে সে ফরজ ভাবলেও আসলে তা গুণাহ!
এবং খোদা প্রদত্ত হেদায়েত একবার হারালে কী সহজে আর তা পাওয়া যায়? এ’কারণেই বোধহয় আয়রার সাথে সাথে সে নিজের মন এবং মস্তিষ্কের শান্তি হারিয়ে বসেছে!

তাকদীর পর্ব ১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here