Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৯

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৯

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৯
আশফিয়া হিয়া

ভোর বেলায় পাখির কোলাহল মোরোগের ডাক শুনে আরু পিটপিট করে চাইল। পর্দা দিয়ে ঘরে অল্প আলো প্রবেশ করছে। সে বিছানা থেকে উঠে বসল। বাইরে যাবার জন্য রুহানিকে ডাকল কিন্ত সে উঠল না অনেক রাত পর্যন্ত ফারিশের সাথে কথা বলেছে তাই তার ঘুম সহজে ভাঙ্গবে না। আরু নিচে তাকিয়ে দেখল নুহা রুহার শোয়ার জায়গাটা ফাঁকা তার মানে ওরা উঠে পড়েছে। আরুর বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরু একা একাই পুরো বাড়িটা টইটই করে ঘুরল কিছুক্ষণ। গ্রামে সবার ভোর বেলায় ওঠার অভ্যাস। সবাই উঠে নিচে চলে গেছে নিচ থেকে কথার শব্দ আসছে পুরো বাড়িটা ফাঁকায় আছে আপাতত তাই আরুর ঘুরতে সুবিধা হলো।

আরু এবার নিচে চলে এল। মা – চাচী মামীরা সবাই রান্নাঘরের কাজে হাত লাগিয়েছে। আরুকে দেখে জিজ্ঞাসা করল কিছু খাবে কি না আরু মাথা নেড়ে না বোঝাল। আরু হাঁটটে হাঁটটে পুকুর পাড়ের দিকে এসে দেখল রোহান ও তার মামারা মিলে লোক দিয়ে পুকুরে জাল ফেলেছে বাড়িতে অতিথিরা এসেছে পুকুরের বড় মাছটা খাওয়াতে হবে না। আরু মাছ ধরা দেখতে লাগল রোহান তার পাশে দাঁড়িয়ে এই সম্পর্কে বলতে লাগল আরুরও মনোযোগ দিয়ে শুনছে তার এসব শুনতে ভালো লাগে। দূরে দাঁড়ানো রুদ্ধ কঠিন দৃষ্টিতে কেবল তাদের দেখে গেল। তবুও এগিয়ে গেল না। এটা তো স্বাভাবিক কাজিন হিসেবে তারা কথা বলতেই পারে তবে এই সাধারণ জিনিসটাই সে মেনে নিতে পারছে না। সে আর সেখানে দাঁড়াল না বাড়ির দিকে চলে গেল।

ঘড়ির কাটায় দুপুর বারোটায়। আজ পিহুর হলুদের অনুষ্ঠান করা হবে। হলুদের স্টেজটা বাড়ির উঠানে করা হয়েছে। তাদের বাড়ির নিয়ম অনু্যায়ী ছেলে পক্ষ থেকে তও্ব নিয়ে এলে মেয়েকে শাড়ি পড়িয়ে হলুদ লাগানো হবে। এরপর মেয়েকে ছেলে বাড়ি থেকে আনা দুধ দিয়ে গোসল করানো হয়। নিয়ম অনু্যায়ী বর পক্ষ থেকে বিয়ের তও্ব নিয়ে চলে এল সবাই। তাদের মধ্যে চারজন মেয়ে পাঁচজন ছেলে।
রুদ্ধ ওপরেই যাচ্ছিল আরুকে সিড়িঁ দিয়ে নামতে দেখে তাকে টেনে নিয়ে ওপরে চলে গেল।
– ” আরেএ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আমি নিচে যাবো তো।”
রুদ্ধ তার হাত ছেড়ে বলল,

– ” নিচে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
আরু ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” কেনো?”
– ” নিচে অনেক ছেলে আছে এখন যেতে হবে না ওরা চলে গেলে যাবি।”
– ” কিন্তু নিচে তো সবাই আছে আহি নিধি আপু ওরাও তো আছে।”
রুদ্ধ হঠাৎ অন্যরকম গলায় বলল,
– ” ওরা আর তুই এক?”
আরুর মাথায় হঠাৎ দুষ্টুমি ভর করল সে বলল,
– একিই তো ওরাও আপনার বোন আমিও আপনার বোন।”
রুদ্ধ তার দিকে এক পা এগিয়ে এল,
– ” তাই?”
– ” হুম।”

রুদ্ধ আশে- পাশে দৃষ্টি রেখে আরুকে টেনে নিজের বুকের কাছে নিয়ে এল। পিঠে এক হাত দিয়ে নিজের সাথে আগলে নিল। আরু চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেলল। তার কপালের সাথে লেপ্টে যাওয়া বেবি হেয়ারগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিল।
– ” আমি তোর ভাই হই?”
আরু চোখ বন্ধ রেখেই দুদিকে মাথা নাড়ল। রুদ্ধ তাকে নিজের দিকে আরেকটু টেনে নিয়ে বলল,
– ” মুখে বল?”
– ” না..না
সিঁড়ি থেকে পায়ের শব্দ আসছে কেউ হয়তো ওপরে আসছে শব্দ পেতেই রুদ্ধ আরুকে ছেড়ে দিল। আরু অন্যদিকে ঘুরে গেল। রুদ্ধ ভাই ইদানিং এমন এমন কান্ড করছে সে নিজেকে সামলে উঠতে পারে না। সিঁড়ি দিয়ে রুহাকে ওপরে উঠতে দেখা গেল।
– ” আরু আপু নিচে চলো সবাই তোমাকে খুঁজছে।”
আরু কিছু বলবে তার আগেই রুদ্ধ বলল,
– ” তুমি যাও ও কিছুক্ষণ পরে যাবে।”
তার রাশভারী স্বরের পক্ষে সে আর কিছু বলতে পারল না তবে আরুকে ইশারা করল নিচে যেতে। আরুও ইশারায় বোঝাল সে একটু পরে আসছে।

আরুর নিচে নামতে নামতে ঘন্টা পেরিয়েছে যতক্ষণ না বর পক্ষের লোকেরা গিয়েছে ততক্ষণ রুদ্ধ না নিজে গিয়েছে আর না তাকে যেতে দিয়েছে। কেউ ডাকতে এলেও তার মুখের ওপর না করে দিয়েছে। আরু এখন যেতে পারবে না পরে যাবে। আহিও বেশিক্ষণ নিচে থাকতে পারেনি ইয়াজ তাকে টেনে ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছে। রুহানি আগে থেকেই নিচে যায়নি ছেলেদের দেখে। ফারিশের এসব পছন্দ নয় সে জানতে পারলে তার খবর করে ছাড়বে তাই নিচেই যায়নি। তারা চলে যেতেই তিন বোন এসে পিহুকে হলুদ লাগাল। এরপ্র তাকে বরপক্ষ থেকে আনা কলসি ভরা দুধ দিয়ে গোসল করানো হলো। গোসল শেষ হতেই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল বিকেলে বড় করে হলুদের অনুষ্ঠান করা হবে।

হলুদের মেয়েদের জন্য মেজেন্টা রংয়ের শাড়ি আনানো হয়েছে। মিতা বেগম দুই মেয়েকেই সুন্দর করে শাড়িটা পড়িয়ে দিয়েছ। আহি আজ প্রথমবার শাড়ি পড়েছে। শাড়ি সে একদমই সামলাতে পারছে না। রুম থেকে করিডর পর্যন্ত যেতেই তার কুঁচিগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সে এবার বিরক্ত খুব। নিচের দিকে তাকিয়ে কুঁচি ঠিক করছিল আর হাঁটছিল। হঠাৎ ইয়াজের সাথে ধাক্কা খেল। ইয়াজ তার দিকে কয়েক সেকেন্ড থম মেরে তাকিয়ে রইল এরপর বলল,

– ” কিরে এমন পেতনি সেজে কার মাথা খেতে যাচ্ছিস।”
– ” তোমার মাথা খেতে যাচ্ছি হয়েছে? সরো এবার।”
ইয়াজ তার পথ আগলে দাঁড়াল,
– ” ঠিক মতো শাড়িটাও সামলাতে শিখিসনি কিন্তু মানুষের মাথা খেতে শিখে গিয়েছিস।”
আহি কিছু বলবে তার আগেই ইয়াজের করা কাজ তার মুখের শব্দ কেড়ে নিয়েছে। ইয়াজ তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে এলোমেলো শাড়ির কুঁচি গুলো খুব সুন্দর করে ঠিক করে দিল। কুঁচি ঠিক করে উঠে দাঁড়াতেই আহিকে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইয়াজ তার মাথায় টোকা দিল।
– ” কি ব্যাপার বলো তো তুমি কুঁচি ঠিক করা কি করে শিখলে?”
– ” রিলস দেখে শিখেছি।”
– “রিলস দেখে এসব শেখা যায়?”
– ” আমি কি তোর মতো গাঁধা? এসব আমি একবার দেখলেই পারি বুঝেছিস?”
আহি তাকে ভেংচি কাটল। এরপর বলল,
– ” একটু নিচু হও তো।”
– ” কেনো?”
– ” হও না একটা কথা বলবো। ”
ইয়াজ নিচু হতেই আহি তার পরিপাটি চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করে শাড়ি উঁচু করে দৌড় লাগাল। ইয়াজ আজ আর কিছু বলল না তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে এলোমেলো চুলে হার বুলাল।

আরু আচঁলটা ছেড়ে রেখেই শাড়ি পরেছে।শাড়ির সাথে সাদা রঙের ব্লাউজ পড়েছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে মুখে মশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন মাখল এরপর সামান্য ফ্রেস পাউডার দিল চোখে মোটা করে আইলেনার দিল। তার চোখ দুটো ডাগর ডাগর মোটা করে আইলেনার দিলে তার চোখ দুটো বেশ সুন্দর লাগে। দু গালে ও নাকে হালকা করে ব্লাসন লাগাল। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে লিপস্টিক দিল। চুল গুলো খোলা রেখেছে। কানে এক জোড়া দুল পড়ল। এক হাত ভর্তি করে কাঁচের চুড়ি পড়ল। পায়ে রুদ্ধর দেয়া নূপুর জোড়া তো রয়েছেই। তাকে দেখে মিতা বেগম মুগ্ধ হলেন কপালে চুমু খেলে বলল,
– ” মাশাল্লাহ আমার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে।”
আরু লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসল।

রুম থেকে বেরিয়েই সে রুদ্ধর রুমে উঁকিঝুকি দিতে লাগল যার জন্য সাজল তাকে দেখাতে হবে না? হঠাৎ করে একটা হাত তাকে রুমের ভেতর টেনে নিয়ে গেল। আরু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আচমকা এভাবে টান দেয়ায় সে ভয় পেয়ে গিয়েছে। রুদ্ধর শরীর থেকে পারফিউমের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। সে আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এই ঘ্রাণটা তার ভীষণ পছন্দের। রুদ্ধ তখন তার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত। আরু চোখ খুলল। রুদ্ধর চোখ দুটোটে তার জন্য স্পষ্ট মুগ্ধতা খেলা করছে। সে এক ধ্যানে আরুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আরু বেশিক্ষণ সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ নামিয়ে রাখল। আড়চোখে রুদ্ধর দিকে তাকাল। মানুষটা কি আসলেই এতটা সুন্দর নাকি তার দৃষ্টিতেই মানুষটাকে এত সুন্দর লাগে? এই যে সাদা রঙের পাঞ্জাবি – পায়জামা পড়েছে তার ওপর স্কাই – ব্লু রঙের কটি পড়েছে চুলগুলো সুন্দর করে সেট করেছে তাতেই তাকে এতটা সুদর্শন দেখাচ্ছে। আরুর চোখ চেয়েও ফেলাতে পারছে না। রুদ্ধ তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ওপরের রাখা প্যাকেট থেকে বেলি ফুলের মালা বের করল। খুশিতা আরুর চোখ চিকচিক করে উঠল। সে এটা একদমই আশা করে নি। রুদ্ধ খুব যত্ন নিয়ে তার খালি হাত জোড়ায় মালাটা পেচিয়ে পরিয়ে দিল।

– ” এটা কখন আনলেন?”
– ” এনেছি কোনো এক সময়।”
– ” চুলে খোপা বাধঁবো?”
– ” না তোকে খোলা চুলেই মারাত্নক লাগে।”
আরু লজ্জা পেল। এরপর খুব নিচু গলায় আবদারের স্বরে বলল,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৮ (২)

– ” চলুন না একটা ছবি তুলি?”
রুদ্ধ কিছু বলল না পকেট থেকে মোবাইল বের করে আরুর কাঁধ জড়িয়ে ধরল। আরু রুদ্ধ দিকে তাকিয়ে রয়েছে আর রুদ্ধ আরুর দিকে এভাবেই তাদের সুন্দর একটা মুহুর্ত ক্যামেরার বন্দি হলো।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here