Home লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৩

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৩

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৩
নুসাইবা আরা নুরি

মেহেরাজ গাড়ির দরজা খুলে ফুলের বুকে টা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়।ওপাশ থেকে ফাহিম ও নামে।মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে একবার তাকায়।চোখ জোড়া বাদে আর কিছুই দেখার উপাই নেই তাহার আর।মেহেরাজ মনে মনে বেশ খুশি হয় শ্রেয়সী কে এই অবস্থায় দেখে।ফাহিম মেহেরাজের পাশে এসে দাঁড়ায়।শ্রেয়সীর দিকে একবার তাকিয়ে ইরুর দিকে আড় চোখে তাকাতেই ইরু নিজেকে গুটিয়ে নেয় ভয়ে।
মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-আসলে একটু জ্যাম ছিলো রাস্তায় তাই লেট।আপনার কোনো সমস্যা হয়নি তো অপেক্ষা করতে??
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী বিনীত হাসি দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলে,

-জ্বী না।
এদিকে মেহেরাজের কথা শুনে ফাহিম মনে মনে বিড়বিড় করে বলে,
-শালা মিথ্যা বাদি।জ্যাম ছিলো না তাও মিথ্যা বলিস।গাড়ি চালাতে পারিস না ধীরে চালাস আবার বলিস জ্যাম ছিলো।তোর বিয়ে হবে না শালা।
নিজের কথায় মনে মনে নিজেই বোকা বনে যায় ফাহিম।মেহেরাজের তো বিয়ে শেষ। এই অভিশাপ তো লাগবে না।যদি ঘুরে ফিরে তার উপর লাগে তখন কি হবে।ফাহিম মনে মনে তওবা করে নেই।জিবনেও আর এসব বদ্দোয়া দেবে না কাওকে।
মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে ফুলের বুকে টা এগিয়ে দেয়।তারপর বলে,
-আসুন গাড়িতে উঠুন রাস্তায় যেতে যেতে কথা হবে।
মেহেরাজের হাত থেকে ফুলের বুকে টা নিয়ে শ্রেয়সী একবার ফুলের ঘ্রান শুকে।তারপর মেহেরাজের পিছনে দাড় করানো গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে,
-আজ বাইক নিয়ে আসেন নাই।বাইক এ আপনাকে বেশি ভালো লাগে!
শ্রেয়সী ভুল করে মনের কথাটা প্রকাশ করে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায়।ফাহিম শ্রেয়সীর কথায় হেসে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেহেরাজের চোখ পাকানোতে দমে যায়।মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,

-আপ্নার বাইক পছন্দ??
শ্রেয়সী মাথা নাড়ায়।লজ্জায় আর তাকাতে পারছে না।মেহেরাজ মনে মনে হাসে।তারপর বিড়বিড় করে বলে,
-একদিন পুরো শহর আপনাকে বাইক এ করে নিয়ে ঘুরবো মাই লিটল মারমিড।
মেহেরাজ শ্রেয়সী কে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসে।ফাহিম ইরু ও উঠে।যদিও ইরু এসব জান্তো না।আজ যখন শ্রেয়সী কোচিং এর জন্য ডাকতে গেছে তখন ইরু ভাত খাচ্ছে।তাড়াতাড়ি খেয়ে রোকেয়া খাতুনের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।শ্রেয়সী যখন জিজ্ঞাসা করলো নানী বাড়ি থেকে কখন আসলি তখন ইরু প্রথমে চমকালেও পরে মিথ্যা বলছে যে সকালে এসেছে।শ্রেয়সী সেদিনের ব্যবহারের জন্য ইরুর কাছে মাফ চেয়েছে।আর ইরু তো আগেই মাফ করে দিয়েছে শ্রেয়সী কে।বন্ধুদের মাঝে কি রাগ অভিমান ধরে রাখা যায় আদেও।রাস্তায় হেটে আসতে আসতে শ্রেয়সী ইরুকে সব খুলে বলেছে তাই এতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিলো ওরা।
মেহেরাজ গাড়ি ড্রাইভ করছে আপন মনে। ফাহিম পাশে সিটে বসে বার বার লুকিং গ্লাসে তাকাচ্ছে।পিছনে ভীত মুখ নিয়ে বসে থাকা ইরুর দিকে।ইরু কেমন ভয় পেয়ে আছে।তবে শ্রেয়সী বা ইরু কারোর মুখেই কোনো কথা নেই।প্রায় বিশ মিনিট পর মেহেরাজ একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি পার্ক করে।ফাহিম একবার তাকিয়ে দেখে নেয় যায়গাটা।তারপর সবাই নেমে যায়।নিচের তলায় কাজি অফিস দোতলায় মার্কেট আর তৃতীয় তলায় রেস্টুরেন্ট।নাম গ্রীন ভ্যালী ক্যাফে।সবুজে মোড়া।খোলা আকাশের নিচে ছোট টেবিল বিছানো তার উপর ছাতা দেওয়া অন্য রকম একটা পরিবেশ।ফেইরি লাইট জলছে চারিপাশে সাউন্ড বক্সে সফট মিউজিক বাজছে।

মেহেরাজ আগে সিড়ি বেয়ে উঠতে থাকে পিছনে শ্রেয়সী আর ইরু উঠে আসে হাত ধরে।ফাহিম একটা কাজে কিছুক্ষনের জন্য কোথায় গেছে তাই সে আসছে না।মেহেরাজ একটা টেবিল দেখে শ্রেয়সী আর ইরুকে বস্তে বলে।আর অন্যটায় গিয়ে নিজে বসে।ওয়েটার ডেকে শ্রেয়সীর খাবার অর্ডার দিয়ে মেহেরাজ সাদের রেলিং এর ধারে যায়।বাতাসে পাঞ্জাবি মেহেরাজের গায়ে সিটে যাচ্ছে তা দেখে লজ্জা পেয়ে শ্রেয়সী চোখ ফিরিয়ে নেয়।তারপর ইরুর সাথে কথা বলতে শুরু করে।
মেহেরাজ ফাহিম কে টেক্সট করে তাড়াতাড়ি আসতে বলে।ফাহিম সিন করে আর রিপ্লাই দেই না তার মানে সে আসছে।কিছুক্ষনের মাঝেই ফাহিম একটা হলুদ রঙের ফাইল নিয়ে চলে এলো।এটা সংসোধন করতে দিয়েছিলো মেহেরাজ ফাহিমের কাছে।তারপর ফাহিমের দিকে ইশারা করতেই ফাহিম ইরুর দিকে তাকায়।ইরু ফাহিমের দিকেই তাকিয়ে ছিলো এতক্ষন।ফাহিমের ধারালো দৃষ্টি দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
ফাহিম এবার গলা ঝেড়ে ইরুর উদ্দেশ্যে বলে,

-ইরাবতী তুমি যদি একটু এপাশে আসতো তাহলে ওদের একটু প্রাইভেসি দিতে পারতাম।
ফাহিমের কথায় ইরু একবার শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে উঠে কিছুটা দূরে একটা টেবিলে গিয়ে বসে।আজ ইরু মুখটা ভিষন মলিন।লজ্জা লেগেছে সাথে অপমানিত বোধ করছে এখানে এসে।ফাহিম।ইরুর মুখ মলিন করে যাওয়া দেখে নিজেও মেহেরাজের হাতে ফাইল টা দিয়ে ইরুর সামনা সামনি চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ে।
ফাহিম কে হটাৎ নিজের সামনে বসতে দেখে চমকে যায় ইরু।ইরুকে চমকাতে দেখে ফাহিম বলে,
-ইদানিং গোবরে পদ্ম ফুল হয়ে গেছো ইরাবতী কোথায় ছিলে কাল সারাদিন??
ফাহিমের কথায় ইরুর পুরোনো ক্ষত মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।চোখে পানি এসে ভিড় করে।ফাহিম দেখে উত্তেজিত হয়ে বলে,

-এই কি হয়েছে তোমার কাদছো কেন আমি কি বললাম??এই??
ফাহিমের কথায় ইরু চোখের পানি মুছে নেয়।তারপর বলে,
-কিছুনা।বাড়িতে ছিলাম না নানু বাড়িতে গেছিলাম।আর কোথায় ছিলাম না ছিলাম সেটা আপনাকে কেন বলবো??
-তোমার সাহস বেড়ে গেছে আমাকে বলছো আমাকে কেন বলবা তাইনা।
ফাহিমের কন্ঠে কেপে উঠে ইরু।ফাহিম ইরুর মুখের দিকে একবার ভালো করে পরখ করে।তারপর বুজে যায় প্রতিদিনের মতো আজ তাকে দেখে ইরুর কান্না পায়নি অন্য কারনে কাদছে।কারন তার সাথে কথা বলতে গেলে ইরু কথা তুতলিয়ে বলে।একজন এডভোকেট হওয়ার দরুন ফাহিম এসব বিষয় গুলো নিপুন ভাবে খেয়াল করেছে।সে কি ইরুর কাছে জিজ্ঞাসা করবে কি হয়েছে।যদি না বলে।আচ্ছা ওকি বলবে।নিজের ভাবনা সরিয়ে ফাহিম সরাসরি জিজ্ঞাসা করে বসে,

-তোমার গালে রক্ত জমাট বাধা।নিচের ঠোঁট ফুলে গেছে চোখের নিচে কালি।যা এখান থেকে দুইদিন আগেও ছিলনা।আজ কেন??কি হয়েছে তোমার সাথে??
ফাহিমের কথায় ইরুর এবার সত্যি কেদে ফেলতে ইচ্ছা হয়।শ্রেয়সী বুজতে পারেনি কারন তার মাস্ক পরা ছিলো।তাও কন্ঠ শুনে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছে কি হয়েছে ইরু তো ঠান্ডা লেগেছে বলে কাটিয়ে দিছে তবে এই লোক।এই লোক তো তাকে পুরো স্কান করে নিয়েছে।কি বলবে। ইরুকে চুপ থাকতে দেখে ফাহিম এবার রেগে যায়।ফাহিম বুজে যায় কিছু না কিছু একটা হয়েছে ইরুর সাথে। তাই ধমকে বলে,
-সিরিয়াসলি যদি না বলো তাহলে আমি পুলিশ এ ফোন দিবো।তারপর ব্যাপার টা তারা দেখবে।এখন তোমার ব্যাপার কি হয়েছে সত্যিটা বলবে কিনা।
কথাটা বলে ফাহিম পকেট থেকে ফোন বের করে ইরুকে ভয় দেখানোর জন্য। কাজ ও হয়।ইরু এবার চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ফুফিয়ে উঠে।ফাহিম আলতো করে টেবিলের নিচ দিয়ে ইরুর হাতের উপর হাত রেখে শান্তনা দেয়।তারপর বলে,

-কেদো না সত্যিটা বলো আমাকে কিচ্ছু হবে না ভয় পাওয়ার দরকার নেই।
ফাহিমের কথায় কিছুটা ভরসা পেয়ে সেদিন বিকাল থেকে পরের সব ঘটনা ফাহিম কে উগরে দেয় ইরু।ইরুর ভিষন ভয় করছে যদি তার মাকে সব বলে দেয় তাহলে আবার মারবে তবে ইরু আর নিজের ভেতর চেপে রাখতে পারছে না ও এসব।নিজের ছোট বেলা থেকে সব বলতে শুরু করে দেয় ফাহিম নির্বাক স্রোতা হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুনতে থাকে ইরুর সব কথা।
শ্রেয়সী লজ্জায় তাকাতে পারছে না মেহেরাজের দিকে তা দেখে মেহেরাজ একটু হাসে।তারপর শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-আপ্নার সাথে তো আমার ফোনে অনেক কথা হলো তো আপনার লজ্জাটা কি এখোনো ভাঙেনি মিস।
মেহেরাজের কথায় শ্রেয়সী কিছু বলেনা।মেহেরাজ একটু চুপ থেকে গলা ঝাড়া দিয়ে সোজাসোজি বসে তারপর শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-আপ্নি আপনার বাবা আর ভাইকে খুব বিশ্বাস করেন তাইনা??
মেহেরাজের এমন প্রশ্নে শ্রেয়সীর লজ্জা উবে যায়।এটা কেমন প্রশ্ন।প্রতিটা মেয়েই তো তার বাবা ভাইকে বিশ্বাস করে এটা তো স্বাভাবিক।শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ আবার বলে,

-বলেন??
-জ্বী??
-আর আমাকে??
মেহেরাজের এই কথায় শ্রেয়সী চুপ হয়ে যায়।কি উত্তর দিবে সে।হ্যা লোক্টা ভালো কিন্তু।শ্রেয়সী উত্তর পায়না।তা দেখে মেহেরাজ হাসে।শ্রেয়সী মুগ্ধ হয়ে তাকায় সেই হাসির দিকে।লোক্টা হাসলে বাম গালে টোল পড়ে যার দরুন হাসিটা আরো মনমুগ্ধকর লাগে।মেহেরাজ শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-আপ্নি যতটুকু আপনার বাবা ভাইকে বিশ্বাস করেন ঠিক ততটাই চাইলে আমাকেও করতে পারেন।আশা করি আপনি জিতবেন।আর আজ একটা প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্যই আপনাকে এখানে নিয়ে এসেছি।কথাটা আপনি বিশ্বাস করবেন কি করবেন না আপনার ব্যাপার৷তবে আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।আমি জানি আপনার বাবা ভাইয়ের নামে কথাটা বলার পর আপনি হয়তো রেগে যাবেন।তাও বলা উচিত বলে মনে হয় আমার।

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২২

মেহেরাজের কথায় অবাক হয় শ্রেয়সী। তার বাবা ভাইকে নিয়ে এই লোক কি এমন বলবে যে কথায় শ্রেয়সী রেগে যাবে।খারাপ কিছু নাতো।তাও আবার বিশ্বাস করতে বলছে।শ্রেয়সী ভাবনার মাঝে মেহেরাজ শ্রেয়সীর ভাবান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here