লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২২
নুসাইবা আরা নুরি
নিজের করা বোকা প্রশ্নে নিজেই লজ্জা পায় শ্রেয়সী।লজ্জায় কথা আটকে আসে। এই লোকটা তাকে খালি লজ্জায় ফালাচ্ছে আচ্ছা খারাপ তো লোকটা।নিজের ভাবনায় নিজেই হাসে শ্রেয়সী।শ্রেয়সীকে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ বলে,
-তো কি করেন এখন??
-পড়ছি।
শ্রেয়সীর মৃদু কন্ঠ।মেহেরাজের সাথে কথা বলতে গেলেই কথার স্বর জেনো কোথায় হারিয়ে যায়।শ্রেয়সীর কথা মেয়েরাজ শ্রেয়সীকে লজ্জা দেওয়ার জন্য বলে,
-তো আমার বিড়ালের বাচ্চার মতো বউটা কি খাটের থেকে পড়ছে নাকি টেবিল থেকে??
কথাটা বলে মুচকি হাসে মেহেরাজ।গম্ভীরমুখের পিছনের চঞ্চল হাস্যজ্জল মেহেরাজ কে কেও দেখেনি।দেখবে কি করে মেহেরাজ কখোনো প্রকাশ ই করেনি।মেহেরাজের বউ সম্মোধন করায় ফোনের ওপাশে থাকা শ্রেয়সী জেনো জমে যায়।গায়ের পশম গুলো সব দাঁড়িয়ে যায়।সবাই বললেও কিছু হয় না কিন্তু এই লোক বলাতে এমন হচ্ছে কেন।শ্রেয়সী নিজেকে সাম্লাতে চাইলো তবে পারলো না।শান্ত ক্ষীন আওয়াজে বলল,
-বই পড়ছিলাম।
-ওহ আচ্ছা।বউ খাইছো??
শ্রেয়সীর এবার হৃদপিন্ডের গতি হারালো।এই লোক সকাল সকাল এমন করছে কেন।আর তারই বা এমন হচ্ছে কেন।শ্রেয়সী কে চুপ থাকতে দেখে মেহেরাজ বুজে ফেললো শ্রেয়সীর লজ্জা পাওয়ার কথা।তাই শ্রেয়সীকে বলল,
-থাক আর লজ্জা পেতে হবে না।আমার বাড়িতে আসার পর তখন লজ্জা পাইয়েন আমি আরো লজ্জা দিবোনি। এখন বলেন খাইছেন সকালে??
শ্রেয়সী জোরে একটা নিশ্বাস নিয়ে বলল,
-জ্বী,আপনি??
-বাবাহ বউ আমার খাওয়ার খোজ নিচ্ছে আমি ধন্য হয়ে গেলাম।
শ্রেয়সীর এবার মাটি ফাক করে নিচে চলে যেতে ইচ্ছা হলো লজ্জায়।তখনই খাদিজা খাতুন শ্রেয়সীকে ডাক দিলো।শ্রেয়সী আসছি বলে মেহেরাজ কে বলল,
-আম্মু ডাকছে এখন রাখি পরে কথা হবে আপনার সাথে।
-আচ্ছা শুনো??
-জ্বী??
-কোচিং যাবে যখন তখন দেখা করিও কথা আছে তোমার সাথে।মনে থাকে যেনো।আল্লাহ হাফেজ বউ।
শ্রেয়সীর লজ্জা লাগলো।তাও লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
-আচ্ছা।আল্লাহ হাফেজ।
মেহেরাজ কল কেটে দিতেই শ্রেয়সী মোবাইল টা বুকের বাম পাশে চেপে ধরলো।তার হার্টবিট দ্রত চলছে।হায় আল্লাহ শ্রেয়সীর সব কেমন ফাকা ফাকা লাগছে।তার ভিতরে খাদিজা খাতুন আবার ডাক দিলেন।শ্রেয়সী মোবাইল টা রেখে জোরে জোরে কয়েকটা নিঃশ্বাস নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো নিজেকে সাভাবিক হয়ে।
বিছানার পাশে বসে সিয়াম চা খাচ্ছে আর তোহা পাশে বসে আছে।মাত্রই ঘুম থেকে উঠলো সিয়াম তোহার ডাকে।আলতাফ শেখ ডেকে দিতে বলায় ডেকে দিয়েছে।তোহা সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলে,
-আপনার কিছু পরষ্কার করা লাগবে থাকলে দিয়েন??
তোহার কথায় সিয়াম চায়ের কাপ রেখে বলে,
-শার্ট আছে দুইটা আর প্যান্ট আছে ওগুলো আর কিছু নাই।
-আচ্ছা।
-আব্বু কোথায় এখন??
-ডাইনিং এ বসে চা খাচ্ছে আপনাকে ডাকছিলো তাই ডেকে দিলাম।
তোহা কথাটা বলে সিয়ামের খুলে রাখা শার্টটা হাতে তুলে নিলো।তারপর উঠে দাড়াতে যেতেই তোহার চোখ গেলো শার্টের হাতার কাছে কিছুটা পুড়ে গেছে কেমন ছোপ ছোপ।তোহার ভ্রু জোড়া কুচকে যায়।সাথে সাথে সিয়াবের বাম হাতের দিকে তাকায়।শ্যামলা বর্নের সিয়ামের হাতে তেমন বোঝা যাচ্ছে না।তাই তোহা সিয়াম কে বলে,
-আপ্নার শার্ট পুড়লো কিভাবে??
তোহার প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় সিয়াম তারপর বলে,
-কই দেখি??
তোহা শার্ট টা সিয়ামের দিকে এগিয়ে ধরতেই সিয়াম শার্টের পোড়া অংশে তাকায়।মুহুর্তেই সিয়ামের মনে পড়ে যায় কাল সন্ধাই যখন রাশিদার বাড়িটে আগুন লাগাচ্ছিলো খড় দিয়ে তখন কিছু খড়ের জলন্ত ছায় এসে তার হাতে পড়েছিলো। তখন সেসবে পাত্তা দেইনি সিয়াম।কিন্তু এখন তো দেখছে সেখানে পুড়ে গেছে।সিয়াম কে ভাবতে দেখে তোহা বলে,
-কি হলো কি ভাবছেন আপনি।কিভাবে পুড়ে গেলো??
তোহার কথায় চমকে উঠে সিয়াম।সিয়ামের চমকানোতে তোহার চতুর মনে সন্দেহের দানা বেধে যায়।সাথে সাথে বলে,
-আপনি তো সিগারেট ও খান না তাহলে এমন ভাবে পুড়লো কিভাবে।আপনার হাতে লাগে নি তো??
তোহা সিয়ামের হাতের সেই পুড়া যায়গায় হাত দিতেই সিয়াম হাত সরিয়ে নেয়।তারপর বলে,
-কাল রিকশায় বসে ছিলাম তখন রিকশা ওয়ালা মামার বিড়ির আগুন উড়ে এসে লেগেছিলো।যেহেতু বাতাস হচ্ছিলো তাই ওনার দোষ ছিলো না আমিও পাত্তা দেই নি।তুমি বরং শার্ট টা বাদ দেও।আমি গিয়ে দেখি আব্বু কি বলছে।
সিয়াম আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলো বাইরে।সিয়াম ইচ্ছা করেই গেছে কারন তোহা এখন নানান প্রশ্ন করবে আর সে উত্তর দিতে না পারলে তোহা যদি অন্য কিছু সন্দেহ করে।বিশেষ করে সে কোন কাজে গিয়েছিলো কোথায় থেকেছে এসব।কিন্তু এখন চলে গেলে তোহা আর এসব প্রশ্ন নিয়ে ঘাটবে না।অনেক সরল সোজা মেয়েটা।তাইতো সিয়াম তোহাকে প্রচন্ড ভালোবাসে।
সিয়ামের চলে যাওয়ার দিকে তোহা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।সিয়াম চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হতেই তোহার মুখে রহস্যে ঘেরা হাসি ফুটে উঠে।তোহা তাড়াতাড়ি গিয়ে ভিতর থেকে দরজা লক করে দেয় ভিতর থেকে।তারপর নিজের মোবাইল থেকে ফেসবুক লগিন করে তুহিনের আইডিতে টেক্সট করে,
-ভাই।তোর সন্দেহ ঠিক সিয়াম শেখ দোকানের কোনো কাজে বাইরে যায়নি সে অন্য কোনো কাজে গিয়েছিলো।ও সিগারেট খাই না আজ ওর শার্টের হাতা পোড়া পেয়েছি।ও যে এক্সকিউজ দিলো তাতে শার্ট এর পোড়া দেখে ওর অবাক হওয়ার কথা না।তুই একটু খোজ লাগা তো।আশে পাশের এমন কোনো ঘটনা যেইটা আগুনের সাথে সংযুক্ত।
তোহা ম্যাসেজ সেন্ট করার কিছুক্ষন পরেই সিন হয়।তোহা সস্তির একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আইডি লগ আউট করে ডিলেট করে দেয়। ফোনটা যায়গা মতো রেখে দরজা খুলে দেয়।তার পর ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
-আমার সন্দেহ সত্যি হলে আর আপনি যদি এই কাজের সাথে জড়িত থাকেন সিয়াম শেখ।তবে আপনার নিকৃষ্টতম মৃত্যু পুরো চট্রগ্রাম শহর দেখবে কথা দিলাম।
দুপুরে আজ ফাহিম দের বাড়িতে মেহেরাজের দাওয়াত ছিলো। যদিও মেহেরাজ প্রথমে রাজি হয়নি কিন্তু পরে সাহিদা খাতুন আর ফাহিমের জোরাজোরি তে রাজি হয়েছে।তাই মেহেরাজ আজ দুপুরে ফাহিমদের বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া করেছে।
খাওয়া দাওয়া শেষ এ ফাহিম আর মেহেরাজ বেরিয়ে পরে বাড়ি থেকে।আজ আর বাইক নেইনি।কারন শ্রেয়সীরাও আসবে।ফাহিম যদিও নিতে চেয়েছিলো তাও মেহেরাজ নেইনি।নিজের গাড়িটাই নিয়েছে।
মেহেরাজ গাড়ি চালাচ্ছে আর ফাহিম পাশের সিটে বসে বসে বক বক করেই যাচ্ছে।মেহেরাজ একবার চুপ করতে বল্লেও ফাহিমের সেদিকে ভাবান্তর হলোনা।নিজের মতো বক বক করে যাচ্ছে আর মেহেরাজ কিছুক্ষন পর পর হু হু করছে।বেশ কিছুক্ষন পর মেহেরাজ গাড়ি নিয়ে এসে থামলো একটা ফুলের দোকানের সামনে।ফাহিম মেহেরাজ কে গাড়ি থামাতে দেখে বলল,
-কি হলো গাড়ি থামালি কেন??
ফাহিমের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে মেহেরাজ গাড়ি থেকে নেমে যায়।বেশ কিছুক্ষন পর ফিরে আসে।হাতে একটা ফ্লাওয়ার বুকে আর খোলা দুটো লাল টকটকে গোলাপ।আর দুটো বেলি ফুলের মালা।মেহেরাজ একটা গোলাপ আর একটা মালা ফাহিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বাকি গুলো পিছনের সিটে সাবধানে রাখলো।তারপর ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
-নে এবার নিজের সেটিংস টাও ঠিক করে নিস।আর কতবার ফোনে কল দিয়ে না পেয়ে ঘুর ঘুর করবি।এবার ঘরে তোলার ব্যাবস্থা কর।
-মানে???
মেহেরাজের কথা ফাহিমের বোধগম্য না হলে মেহেরাজ বলে,
-তুই শ্রেয়সী ফ্রেন্ড কে কতবার কল করেছিস আমি জানি চায়ের দোকানের সামনে গিয়েও অপেক্ষা করে পেলি না।হতাশ হলি।তাই বলছি কি এবার প্রপোজ টা করে বিয়ে করে ঘরে তুলে নিয়ে যা।
মেহেরাজের কথায় ফাহিম কিছুটা লজ্জা পেয়ে বলে,
-দোস্ত তুই এতো কিছু বুজলি কিভাবে??
-এমনিতেই।
মেহেরাজ গাড়ি স্ট্রার্ট দেই।মেহেরাজের পরনে স্কাই ব্লু রঙের একটা দামি পাঞ্জাবি সাদা পাজামা।হাতে রোলেক্স এর ঘড়ি।পায়ে সু।চুল গুলো সেট করা সুন্দর করে।দেখতে বেশ ড্যাশিং লাগছে ওকে।মেহেরাজ সামনে চোখ রেখে গাড়ি চালাতে চালাতে বলে,
-শুনেছি মেয়েরা বেলি আর গোলাপ পছন্দ করে। তুই যেহেতু আমার এতো বড় উপকার করলি তাই আমিও চাই আজকে এই ফুল দিয়ে তুই ওকে তোর ভালোবাসার কথা জানিয়ে দিবি।বাকি টুকু আমি দেখে নিবো।
-কিভাবে??
মেহেরাজ এবার চোখ সরু করে বলল,
-কিভাবে সেটা জানা জরুরি নাকি মেয়েটাকে তুই নিজের করে পাওয়া জরুরি??
-নিজের করে পাওয়া।
-তাহলে চুপ থাক।যা বলেছি তাই কর।আজকে যেনো সব হয়ে যায়।
মেহেরাজ আর কথা বাড়ালো না।ফাহিম ভাবনায় ডুবে গেলো এবার।এতোদিন নাহয় ইরু কে ভয় দেখিয়ে কথা বলতো।কিন্তু তার ভালোবাসায় কি ইরু রাজি হবে।তাকে কি ভালোবাসবে মেয়েটা।ফাহিমের বুক দিক দিক করছে।ইতিমধ্যে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে বিশ মিনিট লেট হয়ে গেছে।আজকেও যদি কালকের মতো ইরু না আসে।তখন কি হবে এই প্লানিং এর।
লেফটেন্যান্ট মেহেরাজ মির্জা পর্ব ২১
এর মাঝেই মেহেরাজ গাড়ি ঘুরিয়ে গলির রাস্তায় ঢুকাতেই দেখতে পায় চায়ের দোকানের পাশে দুজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।মেহেরাজের ঠোঁটে হাসি খেলে যায়।গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে কিছুক্ষনের মাঝেই চায়ের দোকানের সামনে এসে গাড়ি থামায় মেহেরাজ।জানালার কাচ নামিয়ে তাকায় তার অর্ধাঙ্গিনীর পানে।
