বজ্রমেঘ পর্ব ৪১
ফাবিয়াহ্ মমো
গালের মাংস অনেকখানি কেটেছে। বেসিনে থুথুর সঙ্গে রক্ত বেরোচ্ছে। ঠাণ্ডা পানি মুখে নিয়ে আয়নায় তাকাতেই শাওলিনের বুকটা ধক্ করে উঠল। ডানগালের ওপর পাঁচ আঙুলের টকটকে লাল দাগ। মুখের পানিটা বেসিনে ফেলে শাওলিন বাথরুম থেকে বের হলো। অমনি দেখল তাশফিয়া জুলজুল চোখে তাকিয়ে আছে। বিস্ময়ে বলে ফেলল,
– আপু, তোমার গাল…
শাওলিন গালে হাত ছুঁয়ে বলল,
– এটা কিছু না।
তাশফিয়া চোখ সরাতে পারল না,
– কে মেরেছে, আপু? এতো লাল হয়ে গেছে!
শাওলিন ইতস্তত চোখে তাকাল। তাশফিয়া যদি ভুল করে অন্যখানে বলে ফেলে তাহলেই হবে ঘোর বিপদ। নিচের ঠোঁট আলতো কামড়ে বলল,
– তাশফিয়া, একটা অনুরোধ করব? রাখবে?
তাশফিয়া অন্যরকম চোখে তাকাল। মনে মনে স্থির করে ফেলেছে কলটা কাকে করবে। কণ্ঠে বিষম রাগ নিয়ে বলল,
– এর পেছনে রেবা আপু দায়ী না? আপুই তোমাকে মেরেছে না? আমি ভাইয়াকে বলব তো, দাঁড়াও।
শাওলিন অবাক হলো,
– তুমি কীভাবে বলছ এটা?
– কারণ আমি জানি।
– দেখো তাশফিয়া, যেভাবেই জেনে থাকো এখন চুপ থাকতে হবে। আমি বাড়ি থেকে বের হব, তার আগ অবধি কিচ্ছু বলবে না।
তাশফিয়া ঢোক গিলল। দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল,
– আপু, তুমি জানো না এই বাড়িতে তোমাকে নিয়ে কী পরিমাণ নোংরামি হয়। মা সেদিনের পর অন্য মানুষ হয়ে গেছে। সবকিছুর জন্য তোমাকেই দায়ী করছে!
শাওলিন কোনো উত্তর দিল না। বুঝতে পারল না এই বাড়ির লোকগুলো এমন নির্মম স্বার্থে ঘেরা প্রবঞ্চক কেন। তাহমিদের মৃত্যু বা আত্মহননের পেছনে ও দায়ী? দেয়াল ঘড়িটায় সময় দেখে নিয়ে বলল,
– সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আমি বেরোব। যে যা বলার বলুক, মুখে তালা দিয়ে থাকবে। আমার ব্যাপারে কোনো কথার পাল্টা উত্তর দিবে না। কী বলেছি শুনেছ? আসি।
শাওলিন তাশফিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হাসি দিল। কাপড়ের ছোটো ব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ছিল এমন সময় তাশফিয়া বলল,
– আপু, তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি।
শাওলিন পথ থমকে দাঁড়াল। চোখে অদম্য কৌতুহল নিয়ে বলল,
– কী কথা?
তাশফিয়া একমুহুর্ত ইতস্তত করল। তারপর দৌড়ে গিয়ে দরজাটা ছিটকিনি বদ্ধ করল। ফিরে এসে নিম্ন অধরে জিভ বুলিয়ে বলল,
– আমি খুব ছোটো থাকতে একটা ঘটনা শুনেছিলাম। মা বলতো, শোয়েব ভাইয়ার জন্য…
শোয়েব কথা বলছে না। চোখের তারা দুটো অস্থিরতায় থমথম করছে। লাঞ্চের পর লাগাতার ফোন করতে দেখা গেল। কিন্তু অপরপাশে একবারও কল রিসিভ হলো না। দুপুর তিনটা পাঁচে শোয়েব নোটিশ জমা দিল। সাড়ে চার বছরে এই প্রথম ছুটির আবেদন করল। রাফান আর পার্থ বুঝতে পারছিল, মানুষটার ভেতর ভয়ংকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এমন স্তব্ধ ক্রোধ তারা আগে কখনো দেখেনি। শোয়েবের কালচে সবুজ জীপটাকে গর্জন করে বেরোতে দেখে বনকর্মী ডেভিড চাকমা চমকে যায়। রাফানের দিকে কপাল কুঁচকে বলল,
– শোয়েব স্যার নাকি ছুটি নিয়েছেন! উনি কোথায় যাচ্ছেন?
রাফান কোনো কথা বলল না। মোশাররফকে কল দেবার জন্য দূরে গেল সে। পার্থ শান্ত গলায় বলল,
– উনি চলে আসবেন, ডেভিড স্যার। আপনি ব্যস্ত হবেন না। চলুন, রিপোর্টগুলো দেখি।
রাফান মোশাররফকে খবর দিয়ে ‘ব্যাক আপ’ প্রস্তুত করল। নিজের কালো গাড়িতে দশ মিনিটের ভেতর রওনা দিল রাফান। পার্থ কানের ইয়ারপিসে শুনল,
– আমি গেলাম! এদিকে মেজর সুনীল, গুলজার স্যার রইল।
পার্থ মাথা নাড়াল। অমনেই গাড়িটা ধূলো উড়িয়ে মসৃণ সড়কে বেপরোয়া গতি তুলল। শোয়েবের কালচে সবুজ জীপ যেন পাহাড়ি সড়ক চিরে এগোচ্ছে। চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে ফেলেছে সুনীল দত্ত। দূর থেকে কালো বিন্দুসম লক্ষবস্তুটা কেমন ছাড়খার গতিতে ছুটছে। একজন সৈনিক চোখ থেকে দূরবীন নামিয়ে বলল,
– শোয়েব স্যারের গাড়ি ওটা! স্পিড সুবিধার না, স্যার!
সুনীল দত্ত ঠিক সেসময়ই একটা কল পেল। ওয়ারলেস যন্ত্রটা মুখের কাছে এনে বলল,
– চেকপোস্ট থেকে সুনীল দত্ত বলছি।
জীপ থেকে উত্তর দিল শোয়েব,
– রুট ক্লিয়ারেন্স দিন, সুনীলদা।
সুনীল গতির অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ ব্যারিকেড সরাতে বলল। জীপটা যেন সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে চেকপোস্ট ক্রস করল। মুখে বাতাসের ঝাপটা খেল সুনীল। এক ঝলকের জন্য দেখল, শোয়েব শুধুমাত্র বাঁহাতে স্টিয়ারিং ধরে ডানহাতে ওয়ারলেস নিয়ে কথা বলছে। হাঁ করে গমনপথের দিকে তাকিয়ে থাকল সুনীল। শোয়েব রুদ্র ভঙ্গিতে কোথায় যাচ্ছে?
তাশফিয়া সবে মাত্র বলতে যাবে, অমনেই ঠক ঠক করে দরজায় আঘাত পড়ল। চমকে উঠল দুজনই। ঘরে গাঢ় আঁধার। শাওলিন দরজার দিকে বলল,
– কে বাইরে?
– খোলো।
রেবেকার গলা শুনে তাশফিয়া হিম হয়ে গেল। শাওলিনের কবজি খামচে নিচুগলায় বলল,
– আপু, সাবধান। রেবা আপুর সামনে কোনো প্রশ্ন করো না।
কথাটা বলে তাশফিয়া রুমের বাতি জ্বেলে দরজা খুলে দিল। ছিটকিনি নামাতেই রেবেকা দৃপ্তপায়ে ঘরে ঢুকল। সরাসরি শাওলিনের দিকে নজর বিদ্ধ করে বলল,
– চলো, বাসায় ফিরবে। তোমার এখানে থাকার দরকার নেই।
শাওলিন ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অবাক হলো। কিন্তু বাইরে প্রকাশ না করে বলল,
– আমি হলে ফিরব।
– আমি রাতের ট্রেনে সিলেট ফিরব, শাওলিন। যে বাড়িতে তোমার গায়ে হাত তুলেছি, সেখানে আর আমি একমুহুর্তও থাকব না। চলো।
– আপনি কলাবাগানে ফিরবেন?
– হ্যাঁ। সঙ্গে তুমিও।
শাওলিন আড়চোখে তাশফিয়ার মুখ দেখল। চোখে প্রশ্ন মেশানো কৌতুহল। চোখ ফিরিয়ে রেবেকার দিকে বলল,
– আমি তৈরিই আছি। আপনি চলুন।
– না। তুমি নিচে নামো। গাড়িতে গিয়ে বসো। একসেকেণ্ডও এখানে থাকা যাবে না।
তাশফিয়া কপালের চামড়া কুঁচকে ফেলল। হুট করে তাকাল শাওলিনের দিকে। শাওলিনও তখন তাশফিয়ার দিকে তাকিয়েছে। রেবেকা যেন একরাশ রহস্য ছড়িয়ে এখান থেকে যাবার কথা বলছে। তাশফিয়া মনে মনে ভাবছে, রেবা আপু ভয় পেয়েছে? আপুর চোখে কেমন যেন ভয়ের ছায়া দেখলাম। সে হঠাৎ শোকের বাড়ি কেন ছাড়বে? মা আপুকে কিছু বলেছে? না। আমার মনে হচ্ছে এখানে অন্যকিছু জড়িত! শাওলিন কাঁধে টোটব্যাগ নিয়ে ডানহাতে কাপড়ের ব্যাগ নিল। তাশফিয়াকে অন্যমনষ্ক দেখে কিছু বলল না। রেবেকার পিছু পিছু অগ্রসর হলে শাওলিন প্রশ্ন করল মনে মনে, হঠাৎ কী এমন হলো মণি এক কাপড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন? কেন বাসায় ফেরার জন্য অস্থির হয়ে গেলেন?
শ্রেষ্ঠা সন্ধ্যার দিকে গোসল করেছে। চুল থেকে টুপ টুপ করে পানি ঝরছে। তোয়ালে দিয়ে চুল ঝাড়ছে আর ঘরময় ঘুরে ঘুরে মায়ের বকুনির কাণ্ড বাড়াচ্ছে। ছোটোবোন নিপা দরজায় এসে বলল,
– আপি, আম্মু তোমাকে চা নিয়ে যেতে বলেছে। তাড়াতাড়ি শাড়ি পড়ো।
নিপার দুহাতে ট্রে ভর্তি খাবার। কথাটা জানিয়ে ড্রয়িংরুমের পর্দা ঠেলে ঢুকল সে। শ্রেষ্ঠাকে দেখতে ছেলেপক্ষ এসেছে। বাবার কলিগের ছেলে। শ্রেষ্ঠা বাবাকে যেমন ভালোবাসে, তেমনি বাবাকেই বাঘের মতো ভয় পায়। বাবা রাহাতের ব্যাপারে জেনেছে। প্রথম দেখাতেই রাহাতকে ‘চলবে না’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। শ্রেষ্ঠা ওসব শাড়ি না পরে একটা সুতির সাদা জামা পরল। লাল বাটিকের ওড়না, ঢিলে লাল পাজামা পরে চুলগুলো মাঝে সিঁথি কেটে সাধারণ চেহারায় বেরুল। যে চেহারার নিখুঁত কারিগর শুধু স্রষ্টা। চার খালাদের চারজনই শ্রেষ্ঠার অবস্থা দেখে ক্রুদ্ধ হন। চোখে নেই কাজল, ঠোঁটে নেই লিপস্টিক। শ্রেষ্ঠা একটা সোফায় বসে বলল,
– আসসালামুয়ালাইকুম।
পাত্র মেয়ের উপস্থিতি দেখে নত মাথা উঁচু করল না। মেঝের দিকে চোখ রেখে মাকে ইঙ্গিত করল। মা গুরুত্ব না দিয়ে মুখে বললেন,
– ওয়াআলাইকুমসসালাম।
শ্রেষ্ঠা তখুনি কপাল কোঁচকায়। মনে মনে যেটা ভাবছে, সেটা যদি সত্যি হয় তাহলে এখানেই আল্লাহ হাফেজ। বাবা অন্যঘরে কলিজ বন্ধু সাথে ধূমপান যোগে আড্ডা দিচ্ছে। পাত্রের সঙ্গে সব মহিলা সদস্য। শরীরে গয়নার চাকচিক্য নিয়ে একজন বলল,
– মা, আমি হচ্ছি ছেলের ফুপু। আপন ফুপু হই। সম্পর্কে তোমারও ফুপু।
মহিলা শ্রেষ্ঠার গা ঘেঁষে বসেছে। বিব্রত স্পর্শে গায়ে, ঘাড়ে হাত বুলিয়ে মাথার চুল টেনে দেখছে। যেন নকল না আসল বুঝে নিল। শ্রেষ্ঠা বুঝতে পারছিল ওর সঙ্গে কী ঘটছে। কিন্তু লজ্জার বিষয় এতোগুলো মহিলার ভেতর নিজেকে অপাঙক্তেয় মনে হলো। অন্যজন উঠে বসে শ্রেষ্ঠার বাঁদিকে বসলো। চতুর ভাবে শ্রেষ্ঠার হাত, নখ, আঙুল সব খুঁটে খুঁটে দেখছিল। আপন খালাদের দিকে তাকাল শ্রেষ্ঠা। তারা গরু বাছতে দিয়ে খোশমেজাজে গল্প করছে। ফুপু মহিলাটা হাসতে হাসতে বলল,
– একটু দাঁড়াও তো, মা। ঘরের ওদিক থেকে এ পর্যন্ত ডানপা দিয়ে হেঁটে আসো।
শ্রেষ্ঠা যারপরনাই অবাক হয়ে সোফা ছাড়ল। মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। শ্রেষ্ঠার খালাদের একজন পাত্রপক্ষকে তেলমর্দন করে বলল,
– নুপূর, যাও একটু হেঁটে আসো। তোমার এই ফুপু তোমাকে দেখতে চাচ্ছেন।
শ্রেষ্ঠা এবার কাহিনি বুঝল। এরা পাত্রী দেখার ছদ্মবেশে দাসী বাছাই করছে। নখ, চুল, হাঁটা সব দেখবে। শ্রেষ্ঠাও কম যায় না। ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোমরে মডেলিংয়ের মতো হাত রেখে বলল,
– ক্যাটওয়াক দেখবেন নাকি হর্সওয়াক? জিজি হাদিদের হাঁটা চলবে? নাকি ইয়াসমিন ভিয়ানালদামের মতো শেকল নাচাতে নাচাতে দেখাব?
ঘরের ভেতর যেন শব্দহীন বোমা ফাটল। কেউ কথা বলতে পারল না। শ্রেষ্ঠার সেজো খালা কঠিন গলায় বলতে যাবেন, তার আগেই শ্রেষ্ঠা সুযোগে কোপ দিয়ে বলল,
– আমার শরীর ব্রাজিলিয়ান ফিগার না। পশ্চাৎ দেখিয়ে বশ করতে চাইলে আমার সেজো খালার মেজো মেয়েটা আছে। সুইটেব্যাল। পছন্দ হবে গ্যারান্টি দিচ্ছি।
কথাটা বলতেই সেজো খালা হিসিয়ে বললেন,
– বেয়াদব কোথাকার! বুবু, এই বুবু! এদিকে আসো!
শ্রেষ্ঠা পাত্তা না দিয়ে খাবারের ট্রে থেকে একটা নিমকি তুলে নিল। ঠিক এমন সময় হাতের ফোনটা বাজতে লাগল। স্ক্রিনে নামটা দেখে কামড় দিতে পারল না ও। তড়িঘড়ি করে নিমকি ফেলে ফোনটা রিসিভ করে বাইরে চলে গেল। থতমত কণ্ঠে বলল,
– হ্যালো,
বহুদিন পর আবারও মানুষটার ভারী কণ্ঠ শুনল,
– তুমি হলে আছ, শ্রেষ্ঠা?
– না, স্যার। আমি তো বাসায়। কিন্তু কেন?
– শাওলিন ফোন ধরছে না। ফোনটা বন্ধ কেন?
– ফোন বন্ধ? জানা তো ফোন বন্ধ রাখার লোক না।
– সেটা জানি। এখন কীভাবে রিচ করতে পারব সেটা বলো।
শ্রেষ্ঠা দুই ভ্রুঁ এক করল। চিন্তিত সুরে বলল,
– আমি দেখছি ব্যাপারটা। আপনি নিশ্চিন্ত হোন ও ঠিক আছে।
– না, ঠিক নেই। দুপুর দেড়টায় কল দিয়েছে। কলে পুরোটা সময় কেঁদেছে। কী হয়েছে আমি জানি না।
শ্রেষ্ঠা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। বুক অজান্তেই ধক করে উঠেছে। প্রচণ্ড উদ্বেগ নিয়ে বলল,
– কেঁদেছে? জানা ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদার মানুষই না!
– কারণ খোঁজ করো। আর ফোনটা চালু কীভাবে করানো যায় সে ব্যবস্থাও করো।
– আমি দেখছি, স্যার। আপনাকে পরে কল করছি।
– আরো একটা কথা।
– জ্বি বলুন।
– সম্পর্কের ডায়নামিক বদলেছে না? স্যার ডাকো কেন? শাওলিন তোমার ছোটো হলে আমাকে কী ডাকা উচিত?
শ্রেষ্ঠা নিচের ঠোঁট উলটো করে দাঁতের সাথে চেপে ধরল। উপরসারির দাঁত দিয়ে কামড়ে বলল,
– নাম ধরে ডাকতে পারব না। আপনি আমার অনেক বড়ো। আমি ভাইয়া ডাকব।
– ঠিক আছে। কাজ করো।
শ্রেষ্ঠা নিপার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। নিপা শ্রেষ্ঠার এলোমেলো ঘর গুছিয়ে দিচ্ছিল। বড়োবোনের হন্তদন্ত ভাব দেখে বলল,
– আপি, এখন কোথায় যাচ্ছ? বাসায় মেহমান।
শ্রেষ্ঠা দাঁত চিবিয়ে বলল,
– আমার বা** মেহমান! ছেলেটাকে দেখেছিস? সালামের উত্তর দিতেও মায়ের অনুমতি নেয়া লাগছে! বাবা কেন সম্বন্ধ আনে!
– এটা তো খালামণির জোরাজুরি।
– জানার কী যেন হয়েছে। ও নাকি কলের ভেতর কাঁদছিল। ওর ভাবী মারলো টারলো নাকি বুঝতে পারছি না।
নিপা চমকে চাইল। বোনের দিকে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,
– আমি সোহা আপুদের কল করব?
– নিপা, এখন না। হলে খবর নিয়ে আসি। স্কুটিটা নিয়ে গেলাম। মাকে বলিস।
শ্রেষ্ঠা জামাকাপড় বদলে ঢোলা জিন্সের প্যান্ট, হাঁটুস্পর্শী কালো কূর্তি পরল। চুলগুলো দুহাতে ঝড়ের বেগে খোপা পাকাল। চুল ছুটে এসে গালে, কপালে দোল খাচ্ছে। একটা চেস্টব্যাগ বুকে কোনাকুনি নিয়ে বেরুল শ্রেষ্ঠা। সিঁড়িতে স্নিকারের ধপধপ আওয়াজ জানান দিল শ্রেষ্ঠা বেরিয়ে যাচ্ছে।
শাওলিন কাঁচের জানালা ভেদ করে বাইরে দেখছিল। রাতের শহর সৌন্দর্য নিয়ে ফুটেছে। উজ্জ্বল আলোতে জ্বলজ্বল করছে পথ ঘাট, ভবন, দালান। রেবেকা পাশে নিশ্চুপ। হাতের আঙুল ফোটানোর শব্দ পেয়ে শাওলিন ডানদিকে তাকাল। রেবেকা আড় দৃষ্টি লক্ষ করে শাওলিনের দিকে ফিরল। শাওলিন অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল,
– আপনি ভয় পাচ্ছেন আমি উনাকে সব বলে দেব।
রেবেকা স্থির থাকল। চোখের তারা দুটো নড়ল, কিন্তু পলকহীন চাহনি। শাওলিন জিভ দিয়ে গালের কাঁটাস্থান বুলাল। জ্বলে উঠল! চোখ কোঁচকাতে গিয়ে শান্ত করল নিজেকে। রেবেকা কয়েক মুহুর্ত নীরব থেকে বলল,
– আমি সেরকম খারাপ নই শাওলিন, যতটা শোয়েব তোমাকে বুঝিয়েছে। ও একটা বাটপার, মিথ্যুক। তুমি একদিন ঠিকই বুঝবে কেন আমি বিয়েতে বাধ্য হয়ে মত দিয়েছি।
শাওলিন মনে মনে বলল, আমাকে কেউ কিছু বলেনি। আপনার মতো সবাই চুপ আছে। রেবেকা গভীরভাবে দম ফেলে বলল,
– তোমার গায়ে একটা ফুলের টোকাও পরতে দিইনি। সেই আমি ওভাবে চড়টা দিয়েছি! এই হাতটার ওপর ঘেন্না হচ্ছে। হাতটা কী কেটে ফেলব?
শাওলিন চোখ ছোটো করল। প্রশ্ন মাখানো স্বরে বলল,
– হাত কেটে ফেললে কী হবে? সমস্যা যখন আপনার মনে।
রেবেকা কথা বলতে পারল না। বড়ো বড়ো চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির হয়ে গেল। যেন বোঝার চেষ্টা করছে হাওয়া কোনদিকে। একটু চুপ থেকে মলিন সুরে বলল,
– তুমি রেগে থাকলে রাগো শাওলিন। কিন্তু নিষ্ঠুরের মত কথা বলো না। তোমাকে আমি স্নেহ করি, ভালোবাসি। আমার অনুভূতিটা মিথ্যা না।
জানালার বাইরে তাকাল শাওলিন। কোন রূপটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে মায়ায় ঢাকা শাওলিন বুঝতে পারছে না। গাড়িটা ওদের এলাকায় প্রবেশ করল। কাঙ্ক্ষিত ভবনের সামনে নামতেই লিফটে নবম তলায় পৌঁছুল। ফাঁকা করিডোর। সুনশান চারিদিক। ঘড়িতে নটার মতো বাজে। রেবেকা ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল। শাওলিন ব্যাগ থেকে চাবি নিয়ে কি-হোলে চাবি ঘুরাল। জোহরা বাসায় নেই। গ্রামেরবাড়ি গিয়েছেন। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে চিরচেনা ঘ্রাণ ধাক্কা দিল। জোরে দম টানল শাওলিন। বাতাসে কী যেন বোঝার চেষ্টা করছে। রেবেকা পেছন থেকে জুতা খুলে ভেতরে ঢুকছে, এমন সময় দরজা সংলগ্ন ছোটো আলমারির দিকে চোখ থমকাল। রেবেকা ছোটো কাঠের আলমারি খুলতেই শাওলিন তখন টোটব্যাগ রেখে ফ্ল্যাটের চারপাশ দেখছিল। হঠাৎ রেবেকা আঁতকে উঠে চেঁচাল,
– শাওলিন! শাওলিন, জলদি এসো! ভেতরে যেয়ো না!
শাওলিন পিলে চমকে তাকাল। রেবেকা এভাবে চিৎকার করছে কেন? কী হয়েছে? শাওলিন একরাশ দুশ্চিন্তা গেঁথে দ্রুত ফিরে গেল। রেবেকা দরজার কাছে হতভম্ব চেহারায় বলল,
– এগুলো কী?
রেবেকার যেন ভয়, উদ্বেগ, আশঙ্কা। হাতের ফোন থরথর করে কাঁপছে। শাওলিন মেঝের দিকে তাকাতেই কে যেন বাতাসে উত্তর পাঠাল,
– আমার জুতা, রেবা।
ঘরের ভেতর নিঃশব্দে বজ্রপাত পড়ল। শাওলিন সমস্ত গা কাঁপিয়ে শিউরে উঠেছে। এ যে বহু পরিচিত স্বর! হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহর তোলা আলোড়ন! পায়ের তলায় যেন মাটি নেই। শব্দটা যেখান থেকে এল সেদিকেই শাওলিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে। রেবেকাও দেখতে পেল ড্রয়িংরুমে শব্দ ছাড়া টিভি চলছে। টিভির পর্দায় ইউরোপীয় লীগের ফুটবল ম্যাচ। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নেমেছে দুদল। সোফায় কেউ বসে আছে। এখান থেকে কেবল মাথাটা দেখা যাচ্ছে। শাওলিন ওই মাথাটা চেনে! ওই কালো-বাদামি ঝরঝরে চুলগুলোতে ওর আঙুল ডুবেছে! শাওলিন স্তব্ধ চোখে সুইচ টিপে দিল। সারা ঘর আলোকিত হয়ে ড্রয়িংরুমেও কিছু আলো প্রবেশ করল। রেবেকা বিমূঢ়। কাঠপুতুলের মতো স্থবির দাঁড়িয়ে আছে। টিভিটা বন্ধ করে সোফা ছেড়ে উঠল দীর্ঘদেহি ছায়াটা। নিকষ আঁধার থেকে উজ্জ্বল আলোয় এসে দাঁড়ালে রেবেকা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। শাওলিন ছলছল চোখে নিচের ঠোঁটে দাঁত বসালো। এতো জোরে, যেন সমস্ত ব্যথা যন্ত্রণা সেরে গেছে। কিন্তু দীর্ঘদেহি মানুষটা ওর দিকে তাকাল না। সে তাকাল রেবেকার দিকে। আগুন ঝলসানো চোখে স্থির হয়ে গেছে। রেবেকা শব্দ করে পেছাল। শাওলিন ভড়কে পিছু তাকাল। রেবেকা অদ্ভুত গলায় বলল,
– তোমার আসার কথা না! তুমি…
কথাটুকু কেড়ে বিদ্রুপ করল শোয়েব,
– টিকিট কেটে পালাবে ভেবেছ?
এবার শুধু রেবেকা নয়, শাওলিনও চমকে তাকাল। ঘণ্টাখানেক পর মণি সিলেটের উদ্দেশ্যে বের হবে, এ কথা কীভাবে জানতে পারল? শাওলিন কিছু বলবে, তার আগেই শোয়েব হাত উঁচু করল। চোখ দুটো রেবেকার ওপর স্থির করে বলল,
– প্রশ্ন ছাড়া সব জানাও।
শাওলিন বীতশ্রদ্ধ ভাবে ঢোক গিলল। রেবেকার দিকে চোখ তুলে শোয়েবের দিকে ফিরে বলল,
– ওসময় আবেগপ্রবণ…
শোয়েব হুংকার দিয়ে উঠল,
– তোমাকে বলিনি। আমি তোমাকে বলেছি।
শোয়েবের দৃষ্টি ধীরে ধীরে শাওলিনের মুখ থেকে সরে গিয়ে রেবেকার ওপর স্থির হলো। সেই দৃষ্টিতে ছিল ভয়ংকর কিছু। ঠান্ডা, ধারালো, নির্মম।রেবেকা এক পা পিছিয়ে গিয়ে দরজাটা ঠেলে বন্ধ করল। লক লাগাল না। যেন কিছুই হয়নি, এমন নির্লিপ্ত স্বরে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
– তোমার সঙ্গে কিছু হয়নি। তাই অযথা ঝগড়া করতে চাই না।
শোয়েব এক কদম এগিয়ে ডানহাতে শাওলিনের গাল ধরল। শাওলিন বুঝতে পারছিল এখনই কিছু না বোঝালে একটা অনর্থ হবে। সাহস সঞ্চয় করে বলল,
– উনি চলে যাচ্ছেন, দয়াকরে যেতে দিন। ইচ্ছে করে কিছু করেননি। শোকের বাড়িতে মাথা শান্ত রাখা যায় না।
গাল ছেড়ে দিল শোয়েব। একটা টু শব্দও করল না। শাওলিন এই ভঙ্গি দেখে আতঙ্কে জমে গেল। চোখের পলক ফেলেছে, এমন মুহুর্তে শাওলিন দেখল শোয়েব রেবেকার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। বিস্মিত চোখে দৌড়ে গেল শাওলিন। রেবেকা থেমে নেই। মুখের শেষ বাক্যবাণ ছুঁড়ে বলল,
– জঙ্গলী কোথাকার! গাড়ি ছুটিয়ে শহরে এসেছ ঝগড়া করতে! মারামারি করতে!
শোয়েব বন্য পশুর মতো হিসহিস করছে। দমিয়ে রাখতে পারছে না শাওলিন। দুহাতে জাপটে ধরেছে শোয়েবকে। শক্ত বুকের ভেতর মাথা চেপে বলে চলেছে,
– শান্ত হোন! আপনি শান্ত হোন! এটা ফ্ল্যাটবাড়ি, এরকম করবেন না। চিৎকার চেঁচামেচি সব বাইরে শোনা যাবে।
শোয়েব কিছু শুনল না। এক ঝটকায় শাওলিনের হাত সরিয়ে দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– সরে দাঁড়াও।
শাওলিন দুদিকে হাত মেলে দিল। মাথা নাড়িয়ে বলল,
– না।
– বলেছি সরে দাঁড়াও!
– আপনি এরকম করলে আমি কলই দেব না। বিপদের সময়েও না!
মেজাজ আরো খারাপ হলো। গর্জে উঠল শোয়েব,
– আমার রাগ বাড়ানোর চেষ্টা করো না, শাওলিন।
শাওলিন তখন পাশে ফিরে রেবেকাকে বলল,
– ভেতরে যান। রুম থেকে বেরোবেন না। ড্রাইভার চাচাকে বলুন গাড়ি বের করতে!
রেবেকা সুযোগ পেয়ে দৌড়ে রুমে ঢুকল। ধাম করে দরজা লাগাল। ভেতর থেকে উচ্চকণ্ঠে ভেসে এল,
– জানোয়ারের মতো আচরণ করছে! আমার বাসায় এসে আমাকে হুমকি! কতো বড়ো সাহস!
শাওলিন আশ্চর্য হয়ে গেল। উনি কী বুঝতে পারছে না শাওলিন উনাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে? আগুন ঘি ঢালার মতো কথা বলছে কেন? ওই পলকা কাঠের দরজা যে এক মুহুর্তে উড়ে যাবে, এটা উনি বোঝেন না? শাওলিন সামনে ফিরে চমকে উঠল। শোয়েব হাতে ফুলদানি তুলে নিচ্ছে। রেবেকা যে আর কিছুক্ষণের ভেতরেই বেরোবে, এটা বুঝেই যেন মারণাস্ত্রটা হাতে ধরল। শাওলিন ছুটে গিয়ে কবজিটা দুহাতে আঁটকালো।
– ছাড়ুন! ছাড়ুন এটা। আপনি মারামারি করতে এসেছেন? আল্লাহ… আমি যদি জানতাম, ভুলেও কলটা দিতাম না।
শাওলিন ধস্তাধস্তি করে ফুলদানিটা মেঝেতে ফেলল। কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দে সারা ফ্ল্যাট ভীতিকর শব্দ ছড়িয়ে দিল। শাওলিন হাঁপিয়ে উঠেছে। বুকটা অসম্ভব ওঠানামা করছে। কিন্তু হাতের বাঁধন আলগা করল না। শোয়েব এখনও রাগে কাঁপছে। শরীরের প্রতিটি পেশি শক্ত হয়ে আছে। শাওলিন ক্লান্ত হয়ে মাথাটা তার শক্ত বুকে ঠেকিয়ে দিল। শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল,
– বুঝেছি, প্রতিশোধ নিতে জানেন। কিন্তু এখন শান্ত হোন।
শাওলিন সেই সকালে কিছু খেয়েছিল। ইনকোর্স পরীক্ষা দিয়ে একমুহুর্তও স্বস্তি পায়নি। ঝড়ের পর ঝড়। শাওলিন যেন ন্যুব্জ স্বরে বলল,
– আমিও ক্লান্ত। আপনিও ক্লান্ত। উনাকে যেতে দিন।
মাথা তুলে শোয়েবের মুঠোটা দুহাতে ঢেকে নিল শাওলিন। হিংস্র পশুকে শান্ত বানাচ্ছে, এমন মৃদু গলায় বলল,
– আসুন।
শাওলিন সাবধানে কাঁচের টুকরো দেখে দেখে এগোতে লাগল। পেছন ফিরেও দেখল শোয়েব ঠিকভাবে পা ফেলল নাকি। শাওলিনের রুম ফ্ল্যাটের দক্ষিণমুখী। দরজায় ঘিয়ে রঙের চোখ জুড়ানো পর্দা, লম্বায় মেঝে ছুঁই ছুঁই করছে। ঝাপটা দিয়ে সরিয়ে ভেতরে মানুষটাকে নিয়ে এল। আঁধার ছাওয়া ঘর। শাওলিন বাতি না জ্বলে আগে দরজা আঁটকানো নিরাপদ মনে করল। বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে শব্দযোগে শ্বাস ছাড়ল শাওলিন। ঘুটঘুটে আঁধারে দীর্ঘদেহি ছায়াটাকে দেখতে দেখতে বলল,
– শরীর ভরা রাগ নিয়ে খু&ন করতে এসেছেন? না থামালে কী করতেন?
বজ্রমেঘ পর্ব ৪০
উঁচু কাঁধ দুটো ঘুরে দাঁড়াল ওর দিকে। শাওলিন বুঝল, অন্ধকারে ওর দিকেই চেয়ে আছে। কেমন যেন শিরশির করল গা-টা! পরনে থাকা ধূসর স্যূটটা খুলে একপাশে রেখে সে এগোল। পেছনে দরজা, সামনে সে। শাওলিন চোখ সওয়া আঁধারে দেখতে পেল, তার একান্ত ছায়ামূর্তিটা তাকে বন্দি করে ফেলেছে। কোমরের ডানপাশ থেকে একটা হাত ধীরে ধীরে বাঁপাশে এনে জড়িয়ে ধরল। একটু পর শাওলিন টের পেল, পায়ের নিচে সত্যিই ভূমি নেই। ওকে দুহাতে বন্দি করে বুকে জাপটে ধরেছে। এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে, যেন জীবনের শেষ অবলম্বন আঁকড়ে নিজেকে ডুবন্ত সাগর থেকে বাঁচাতে চাইছে। ভীষণ নিচু এক সুরে মানুষটা বলল,
– যেখানে ব্যথা, সেখানে যেমন হাত পড়ে। যেখানে তোমার অস্তিত্ব, সেখানে বারবার আমার আগমন হবে।
