Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 41

Naar e Ishq part 41

Naar e Ishq part 41
তুরঙ্গনা

ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। রাত-ভর চলা ঝড়-ঝঞ্ঝার কোনো মেঘলা ছায়া এখন আর নেই বললেই চলে। কিন্তু বাহিরের ঝড় পুরোপুরি থেমে গেলেও, ব্ল্যাক ভেইন এসেস্টের ভেতর এক গুমোট ঝড় যেন ক্রমশই বাসা বাঁধছে।
চার বন্ধুর মুখোমুখি বসে আছে কেকে। মাথাটা সামান্য ঝুঁকানো, দুহাত হাঁটুর উপর ঠেকিয়ে আঙ্গুলগুলি একে-অপরের সাথে মেলানো। ঝাঁকড়া চুলগুলো বরাবরের ন্যায়ই এলোমেলো। সেই চুলের বাহারে কপাল হতে চোখ অব্দি ছেয়ে গেছে। অথচ সে সম্পূর্ণ দৃঢ়, নিশ্চুপ এবং নির্লিপ্ত।
অপরদিকে সম্মূখের সোফাগুলো ঘিরে বসে থাকা চার বন্ধুর চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় ও প্রশ্নের উত্তরের ব্যাকুলতা। সাদের জ্ঞান ফিরেছে খানিকক্ষণ পূর্বে, কিন্তু তবুও সে স্থির হতে পারছে না। অন্যদিকে সুহিন বোধহয় এখন কেকে ঘরে বিশ্রামরত অবস্থায়। কেকের অনুমতি ব্যতীত আপাতত তার নিচে আসা নিষেধ।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ ধরে পিনপতন নীরবতা চলার পর, হঠাৎ সাদ-ই ইতস্তত করে মুখ খুলল,
“ভাই, তুই এটা কি করলি—আমায় বলতো? শেষমেশ সুহিনের সাথে? দুনিয়ায় আর কেউ ছিল না? মেয়েটা কত ভালো, আর তুই…ছি ছি ছি।”

সাদ নাক সিটকে কথাগুলো আওড়িয়ে, কেকের জবাবের আশায় আবারও বসে রইল। এবারও কেকের মাঝে কোনো হেলদোল না দেখে, সাদ খানিকটা ক্ষেপে গিয়ে বলল,
“কিরে শালা, কথা বলিস না কেন? সুহিন না তোর বোন হয়? নিজের না হোক, কিন্তু বোনই তো হয়। বোনের সাথে মানুষ এসব করে? তোকে আমি ভালো ভাবছিলাম, কিন্তু তুই যা খেলা দেখাইলি বেটা!”
সাদের কথা শুনে কেকে’র চোয়াল এবার কিঞ্চিৎ শক্ত হলো। তবে সে মাথা তুলল না। বরং একই নির্লিপ্ততা নিয়ে তীক্ষ্ণ গম্ভীর্যের সাথে গমগমে স্বরে বলল,
“সুহিন আমার বোন নয়—ও আমার বউ! বিয়ে করা বউ।”

বলেই সে আচমকা নিজের মাথাটা খানিক তুলে, শীতল দৃষ্টিতে সাদের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই সাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবার উপক্রম হলো। বাকি বন্ধুদেরও একই দশা। কিন্তু তালহা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। সে শুধু সবটা চেয়ে চেয়ে দেখে যাচ্ছে। যদিও তার নিজের মনেও কিছু প্রশ্ন আছে, তবে সে তা সরাসরি কেকে’র কাছেই জেনে নিবে। এইমূহূর্তে আর নতুন প্রসঙ্গ টেনে এনে লাভ নেই।
এদিকে সাদ, ফারিস কিংবা জায়ান—তিনজনই হতভম্ব হয়ে কেকের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদের মাথা ভনভন করতে শুরু করেছে। আবারও জ্ঞান হারানোর পথ থেকে সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। কাঁপা কাঁপা স্বরে পাশে বসে থাকা ফারিসের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাই, এই শা’লা কি বলে? মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওর? আমার বোকা সুন্দরী ওর বউ? বিয়ে করা বউ?”
কেকে চুইংগাম চিবানোর ভঙ্গিতে চোয়াল নাড়িয়ে সাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অন্যদিকে ফারিস বিস্ময়ে কোনো উত্তর দিতে পারল না। ততক্ষণে সাদ আবারও বলে উঠল,
“শালাহ, তুই তোর বোনরে কবে বিয়ে করছিস? মিথ্যে বলার জায়গা পাস না? বললেই হলো সুহিন তোর বউ… ”

সাদ নিজের কথা শেষ করতে পারল। সুহিনকে বারবার ‘বোন’ বলায়, কেকে ক্ষিপ্ত গলায় হয়তো দুটো কথা বলত, কিন্তু তার আগেই পাশ থেকে গমগমে সুরে জায়ান ধমকে উঠল। কেকে’র দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“সাদ, জাস্ট শাটআপ! ছাগলের বাচ্চার মতো চেঁচাস না। সুহিন ওর কিসের বোন? ও ওর কোনো বোন-টোন না।…”
জায়ান বলতে বলতেও নিজের ক্রোধে দমে গেল। অদ্ভুত এক রাগ নিয়ে হিসহিস করতে লাগল সে। এক পলকের জন্যও নিজের ক্রোধে রক্তিম হয়ে ওঠা চোখদুটো কেকের উপর হতে সরাল না। ততক্ষণে সাদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জায়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“তুই আবার কি বলছিস? সুহিন ওর বোন না তো কি?”
—“সেটা আমাকে জিজ্ঞেস না করে ওকে জিজ্ঞেস কর!”
সাদ হাবলার মতো মুখ করে কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। কেকে এখনো নিজের মতো নির্বিকার। সে-ও যেন ক্রোধান্বিত জায়ানের দিকে তাকিয়ে, কিছু একটা শোনার অপেক্ষায়। ততক্ষণে জায়ান নিজের রাগ সামলাতে না বলে পেরে উচ্চস্বরে বলে উঠল,

“সুহিন ওর বোন না, ওর মেয়ে হয়। জানো*য়ারটা সব জায়গায় ন*ষ্টামি করে বেড়াচ্ছে।”
একনিমিষেই পুরো পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। কেকে নিজের চোয়াল অতিমাত্রায় শক্ত করে, চোখদুটো নির্লিপ্তে বুঁজে নিল। হয়তো বা নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণেরই এক প্রচেষ্টা।
অন্যদিকে জায়ান রাগে একপ্রকার কাঁপছে। পাশ থেকে ফারিশ তাকে সামলানোর চেষ্টা করলেও,খুব একটা কাজ হচ্ছে না। অন্যদিকে তালহাও কিছুটা অবাক। অথচ সাদ কেবল সবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
এবার সাদ নিজের গা ঝাড়া দিয়ে দাড়িয়ে পড়ল। জায়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমায় কি কেউ বলবে, এখানে ঠিক কি হচ্ছে? আর এই সামিদের বাচ্চা এসব কি বলছে? কেকে’র বয়সই বা কত? ও কি বুড়া নাকি যে, ওর সুহিনের মতো ওতো বড় একটা জলজ্যান্ত মেয়ে থাকবে?”
জায়ান সাদের কথায় হুট করেই আরেকটুখানি চটে গেল। ফারিসের হাত চেপে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“ও ছাগলটাকে কেউ থামা, নয়তো ওটাকেই… ”

—“কি আশ্চর্য, আমি আবার কি করলাম? পাগল-ছাগলের মতো কথা তো তুই বলছিস।”
সাদের নির্বিকার অভিব্যক্তিতে জায়ান রেগেমেগে আরো কিছু করে বসবে,ঠিক তার আগেই হঠাৎ কেকে প্রত্যুত্তর করল। নিজের কপালের একাংশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নির্লিপ্তে চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“তোদের হয়ে গেলে, আমি এখন আসছি। ও অপেক্ষা করছে।”
এই বলেই কেকে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু একপা-ও এগোনোর জো হলো না। তার আগেই হঠাৎ জায়ান উঠে দাঁড়িয়ে, সম্মূখের কাঁচের টেবিলটায় সজোরে লাথি মা’রল। বিশাল-দেহী মানুষটার এক লাথিতেই সেটি উল্টে ছিটকে গিয়ে কেকের পায়ের সামনে ভেঙ্গেচুরে আছড়ে পরল।
কেকে অত্যন্ত ধীরস্থিরে টাউজারের পকেটে দুহাত গুঁজে, শিরদাঁড়া টানটান করে শান্ত-শীতল দৃষ্টিতে জায়ানের দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে রইল। ততক্ষণে জায়ান নিজের সকল রাগ-ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলতে শুরু করেছে,

“কার কাছে যাচ্ছিস? বউয়ের কাছে না বোনের কাছে? নাকি মেয়ের কাছে, হাহ?”
কথাটা ছোট হলেও, এর ওজন যথেষ্ট ভারী ছিল। কেকে জায়ানের দিকে চেয়ে সামান্য তির্যক হাসল। অথচ তার ঘাড় কিংবা পেশীবহুল হাতের নীলচে রগগুলো লালচে হয়ে ফেঁপে উঠেছে। কেকে কাঁচের টুকরো গুলো সামলে ধীরস্থিরে জায়ানের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। ঘাড়টা খানিক উঁচিয়ে শান্ত সুরে বলল,
“আমি জানি, আমি খারাপ। কিন্তু খারাপ হওয়া সত্ত্বেও আমি চাইছি, আমাদের এতোদিনের বন্ডিংটা চিরতরে নষ্ট না হোক। সো, মাথা ঠান্ডা কর আর নিজের লিমিটে থাক।”
জায়ান এবার উল্টো হিসহিসিয়ে উঠল,
“পাগল পেয়েছিস সবাইকে? আমাকে লিমিটে থাকতে বলছিস? হ্যা, আমি জানি সবকিছুর একটা লিমিট আছে। কিন্তু তুই প্রতিবারই সেই সীমাটা অতিক্রম করিস। এবারও ঠিক তাই করেছিস, যার মাত্রা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।”
কেকে এবারও তার কথাটাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের ভ্রু চুলকে বলল,
“কি করেছি আমি?”

কেকে’র ভাবভঙ্গি এমন যেন এখানে জায়ান ঠাট্টা করছে। ফলে মূহুর্তেই রেগে গিয়ে, জায়ান আচমকা কেকের টিশার্টের একাংশ ডানহাতের মুঠোয় শক্ত করে খিঁচে ধরল। কেকে ভ্রু-যুগল কুঁচকে মাথাটা ফিরিয়ে সেই অবস্থানটুকু অবলোকন করল। পরক্ষণেই মুখ ফিরিয়ে জায়ানের চোখে চোখ মেলাল।
—“হামিদ থাম! পাগলামি করিস না।”, জায়ান তার কথা শুনল কি শুনল না—তা অস্পষ্ট। তালহা অবস্থার বেগতিক দেখে দ্রুত কয়েক পা এলিয়ে এলো। কিন্তু তার আগে জায়ান তার পেশীবহুল হাতে কেকে’র সমগ্রদেহটা একবারের জন্য ঝাঁকিয়ে তুলে বলে উঠল,
—“সুহিন সম্পর্কে তোর মেয়ে হওয়ার সত্ত্বেও ওকে বিয়ে করলি কিভাবে? লজ্জা করল না?”
—“না লজ্জা করেনি। কাজি ডেকে বিয়ে করেছি। তখন তখন বাসর করার সুযোগ হয়নি,কিন্তু গতরাতে আমাদের বিয়ের ফাস্ট অ্যানিভার্সারি থাকায়—শুভকাজ রাতেই সেরে ফেলেছি। আর কোনো প্রশ্ন?”
এমন বেখাপ্পা উত্তর পেয়ে জায়ানের মেজাজ আরো বিগড়ে গেল। সে কেকে’র শরীর আবারও ঝাঁকিয়ে তুলল; মুখটা নামিয়ে হিসহিসিয়ে উঠল,

“ফাইজলামি করিস আমার সাথে? নিজের মেয়ে’কে বিয়ে করে ফাঁকা বাড়িতে নষ্টামি করেছিস, আবার জোর গলায় বলেও বেড়াচ্ছিস? ইউ ফা* বাস্টা*…”
হঠাৎ জায়ানের এতো রাগের কারণটা খুব বেশি স্পষ্ট না রইলেও, অকস্মাৎ এরূপ ভাষা প্রয়োগ করে কেকের মুখে ঘুষি মা’রার চেষ্টাটা নিত্যন্তই তার বোকামি ছিল। এতক্ষণ সবটা চুপচাপ সহ্য করলেও, হুট করেই কেকে তার নিজের ক্ষ্যাপাটে রূপে ফিরে এলো। চোখের পলকে কি হতে কি হলো, কেউই বুঝতে পারল না৷ বরং তার আগেই, ফ্লোরের উপর বিছিয়ে থাকা কাঁচ আর সোফার কোণায় আছড়ে ফেলা হলো দীর্ঘদেহীর জায়ানকে। মূহুর্তেই হাত-পা ছিঁলে গেল, মাথাটা একপাশে সজোড়ে চোট লাগল। কিন্তু কেকে থামল না। একযোগে তাকে থামাতে সকলে ছুটে এলেও, সে উন্মাদের ন্যায় জায়ানের উপর ভারসাম্য বজায় রেখে চড়ে বসল। অতঃপর হাতের মুঠোয় জায়ানের জ্যাকেটের কলার খিঁচে ধরে, একের পর এক ঘুষি মা’রতে লাগল তার মুখ বরাবর।
মূহুর্তের মাঝেই তার মুখ থেকে গল-গল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল। জায়ান চেয়েও পারল না তার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। বরং পেছন থেকে কেকে’কে টেনে সরিয়ে নিতে চাওয়া বাদবাকি তিনজনও তখন ব্যর্থ।
অন্যদিকে একের পর এক দৃঢ় আঘাত আছড়ে ফেলতে ফেলতে, কেকে ভারিক্কি গলায় উচ্চস্বরে হিসহিসিয়ে উঠল,

“শালাহ্, ওর বাপ মরেছে এক যুগ আগে। ওকে বিয়ে করায়, কবরে থাকা ওর বাপের কোনো সমস্যা হচ্ছে না—অথচ তোর এতো সমস্যা কেন?”
র’ক্তের স্রোতে মুখ হতে গা ভিজে উঠলেও, জায়ান প্রত্যুত্তর করতে ভুলল না,
“তো কি চাইছিস? তুই ন*ষ্টামি করবি আর ওটা চেয়ে চেয়ে দেখব আমরা? আহ, কতবড় জানো-য়ার রে তুই? লজ্জা করে না এসব করতে? তুই কি ভেবেছিস আমরা কিছু জানিনা? সারাজীবনই এসব সবার থেকে লুকিয়ে রাখবি?… আই নো, তুই সবার চেয়ে আলাদা। কারণ তুই নিজের মতো চলিস, নিজের মনমর্জি কাজ করিস, তোকে থামানোরও কেউ নেই আর তাই তুই শুরু থেকেই একটা উগ্র, বেপরোয়া, উন্মাদ। একইসাথে এক ধূর্ত মাথার সাইকোপ্যাথ। এসব কেনো বলছি জানিস? তুই সবার চোখে ধুলো দিয়ে দিনের পর দিন নিজের খেলাটা খেলে যাচ্ছিস। কাউকে বুঝতে দিচ্ছিস না যে, তুই আসলে ভেতরে ভেতরে কি চাল-টা চালছিস। কিন্তু এভাবে আর কত? সবসময় তোর পাশে থেকেছি, তোর সব কাজে আমরা সাপোর্ট দিয়েছি, শুধু কি এইসব দেখার জন্য?”

রক্তমাখা মুখে এসব বলতে না বলতেই অকস্মাৎ নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কেকে’কে ধাক্কা মেরে পাশে আছড়ে ফেলার চেষ্টা করল সে। কিন্তু তাতেও খুব একটা কাজ হলো না। কেকে কর্মভ্রষ্ট হলেও, হাত দুটো আবারও জায়ানের কলার চেপে ধরার জন্য এগিয়ে এলো। কিন্তু তার আগেই পেছন থেকে তালহা আর ফাসির দুহাতে তার হাত টেনে ধরল। তালহা রাগ ঝেড়ে ভারিক্কী গলায় বলে উঠল,
“নালায়েকের দল! নিজেদের মধ্যে এসব কি শুরু করেছিস? থাম তোরা…”
কিন্তু কার কথা কে শোনে। জায়ান প্রত্যুত্তরে কেকে আরো ক্ষিপ্ত হলো। তবে হাতদুটো বন্ধুদের কবলে থাকায় সাথে সাথে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারল না। বরং কোনোমতে হাতদুটো ছাড়িয়ে নিয়ে, সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। ছোট বেলা হতে তালহার পর সবচেয়ে বিশস্ত বলে সে জায়ানকেই জেনে এসেছে। অথচ আজ সবার মাঝে তার এমন আচরণে কেকে নিজেকে শুরু হতেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেও, শেষে ব্যর্থ হয়েছে।
এই দশায় সেই দুহাতে জায়ানের রক্তাক্ত কালো জ্যাকেটটা টেনে, তারটা মুখটা উঁচিয়ে তুলল। ভেতরের উন্মাদটাকে শান্ত করার প্রচেষ্টায় কয়েকবার ভারী ভারী শ্বাস ফেলল। পরক্ষণেই হাতের মুষ্টি আরেকটু শক্ত করে, জায়ানের দিকে ঝুঁকে পড়ল। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে উঠল,

—“একটা কথা কান খুলে শুনে রাখ…”
বলতে না বলতেই সে হাঁপিয়ে উঠে আবারও থামল। পরমূহুর্তে কন্ঠস্বর কিছুটা শান্ত করে বলল,
—“সুহিন কাহসান চৌধুরী আমার বোন কিংবা মেয়ে নয়—সে আমার বউ, আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমি জীবন, আমার সবকিছু। বুঝেছিস?”
—“মিথ্যে বলছিস তুই। এই মিথ্যে দিয়ে আর কতদিন বাঁচবি? কিভাবে অস্বীকার করবি যে সুহিন তোর মেয়ে নয়, যেখানে ওর মায়ের সাথে তোর…”
কেকে তৎক্ষনাৎ তার হাতের মুষ্টি আরো দৃঢ় করে চেপে ধরল। জায়ানকে থামিয়ে চাপা স্বরে শাসিয়ে বলল,
“জায়াননন! হুঁশশ…ভাই আমার, থেমে যা। আর না৷ কিচ্ছু না। আমি যেটা বলেছি সেটাই, বাকিটা পরে জানাচ্ছি।”
হঠাৎ কেকের কন্ঠে অদ্ভুতপূর্বক আশ্বস্ততা ও শীতলতা পেয়ে জায়ান থমকে গেল। তার আর নতুন করে কিছু বলা বা করার সুযোগ হলো না। ততক্ষণে কেকে নিজেই তার উপর থেকে একাই সরে গিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাতের কবজি দিয়ে চোট লাগা মুখটা মুছে, সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে না বাড়াতেই পেছন থেকে জায়ান আবারও বলল,

“যাহ্, মেনে নিলাম তুই-ই ঠিক। কিন্তু রোজিকে কেন ঠকালি?”
কেকে’র পা-জোড়া থেমে গেল। পেছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে আগের ন্যায় শান্ত সুরে প্রশ্ন করল,
“রোজিকে ঠকিয়েছি? কিভাবে?”
জায়ান বিরক্তি নিয়ে সোফায় ভর দিয়ে নিচ থেকে উঠে দাঁড়াল,
—“কেকে! সবকিছু নিয়ে মজা করিস না। রোজি তোকে সত্যিই ভালোবাসে। এখন অন্তত এটা বলিস না যে, রোজির সাথে তোর…”
—“হ্যাঁ, নেই তো! ওর সাথে আমার কোনোকিছুই নেই।”
জায়ানের কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই আবারও নিরেট স্বরে কেকের প্রত্যুত্তর এলো। সে আবারও থমথমে স্বরে বলতে লাগল,
“রোজি’কে এখানে নিয়ে এসেছিলি তোরা—আমি নই। ওর গ্র্যান্ডফাদার ইতালির মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির নামী-দামী মানুষ বিধায়, তোদের স্বার্থে ওকে প্রয়োজন হয়েছে বলেই আমাদের ব্যান্ডের সাথে ওকে একজন আউটসাইডার হিসেবে যুক্ত করেছিলি। এরপর যদি ওর আমার প্রতি কোনো ভালোলাগা,ভালোবাসা কিংবা অবসেশন তৈরি হয়ে যায়—তার দায়ভার কি আমি নেবো?”
—“আরেহ্ বাহ্, বেশ ভালো বলেছিস তো। এখন সব দোষ আমাদের? রোজিকে আমরা নিয়ে এসেছি, ব্যান্ডও আমাদের, দোষও আমাদের। ব্যান্ড-ট্যান্ড তো আর তোর না! অথচ সেই ব্যান্ডের লিডার কে? তুই! দিনের পর দিন, রোজিকে প্রশ্রয় কে দিয়েছে? ওটাও তুই! তোর মনে মনে যদি এসবই ছিল, তাহলে শুরুতেই ওকে না করিসনি কেনো?”

—“হোয়াট দ্য হেল! আমি কি না করতাম? বারবার বলেছিলাম না আমি, আমাদের টিমে যেন কোনো মেয়ে না আসে। শুনেছিলি সেদিন আমার কথা? যখন বললাম, ওর অতিরিক্ত মেলামেশা আমার পছন্দ হচ্ছে না—তখন তোরাই বলেছিলি, তোদের দিকটা বিবেচনা করে যেন আমি ওর ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করে নেই। আর এখন বলছিস, আমি ওকে প্রশ্রয় দিয়েছি? এসব মিউজিক ব্যান্ড ছাড়াও আমার আরো দুটো পরিচয় আছে। সেক্ষেত্রে এই কেকে’র প্রয়োজন ছিল না যে, একটা ব্যান্ড স্ট্যাবলিশের জন্য নানা-দাদা ওয়ালা অমুক-তমুককে মাথায় তুলে নাচতে হবে।”
ভেতরে যত ক্ষোভ ছিল, তা যেন একবারেই উগড়ে দিল কেকে। কিন্তু পরক্ষণেই ফারিশের একটি কথাই তাকে থমকে দিল,

—“শুরুতে না হয় আমাদের জন্য সুযোগ পাসনি, কিন্তু তোদের বিয়ের যদি একবছর হয়ে থাকে তাহলে এটা গোপনে রাখার মানে কি ছিল? আমাদের তো বলিসই নি, কিন্তু তোর বউ থাকার পরও রোজিকে কেন এই বিষয়টা জানাসনি? অন্তত ওকে জানানোটা তো তোর প্রয়োজন ছিল।”
মূহুর্তেই কেকে স্থির হয়ে দাড়িয়ে রইল। মুখ দিয়ে আর একটা শব্দও বের হলো না তার। এবার সাদ-ই মুখ খুলল; সেও একই কথার রেশ ধরে রেখে বলল,
“হ্যা, সেটাই তো। তুই যদি একবছর আগেই বোকা সুন্দরীকে বিয়ে করে থাকিস, তবে এটা আমাদের জানাসনি কেনো? এভাবে তো তুই সবটাই ধোঁয়াশা করে রাখছিস, কোনোটাই তো বুঝতে পারছি না।”
কেকে’কে দৃঢ় অথচ নিশ্চুপ দেখে, জায়ান কটাক্ষ করে বলে উঠল,
“বলেছিলাম না, এই শালাহ আমাদের ভাবনার চেয়েও অতিমাত্রায় খারাপ। এক ঢিলে দুই পাখি মা’রার পাঁয়তারা করেছিল। আমরা আজ সময়মতো এসে সবটা দেখে না ফেললে, ও আরো কতযুগ এটা গোপনে রেখে কুকীর্তি চালাতো কে জানে!”

Naar e Ishq part 40

জায়ান নিজের কথা শেষ করতে পারল না। বরং তার আগেই হঠাৎ দরজার চৌকাঠে নতুন আগুন্তকের ছায়া পড়তেই সকলেই থমকে গেল। হঠাৎ নারীসুলভ থমথমে বিস্ময় ভরা কন্ঠে, চৌকাঠ হতেই কেউ বলে উঠল,
“ওহ গড,এখানে এসব কি হচ্ছে? তোমরা কি নিয়ে এভাবে কথা বলছো?”

Naar e Ishq part 42

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here