তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৬
আশফিয়া হিয়া
চারদিকে বৃষ্টির নরম ছন্দ, আকাশ যেন মাটিকে ছুঁয়ে ভালোবাসা ঝরায়।ভেজা হাওয়ার স্পর্শে মন ভেসে যায়, নিঃশব্দে জেগে ওঠে অজানা অনুভূতি। এই বৃষ্টিমুখর পরিবেশে কফি বা চা খেলে মনে শান্তিই মেলে না। আরু ভীষণ চা পাগলী। চা ছাড়া তার একদিনও চলা সম্ভব নয়। আরু এখন কিচেনে নিজের জন্য চা পানিয়ে এখানেই চা পান করছে সাথে রুদ্ধর জন্য কফি করছে। চা টুকু শেষ করেই রুদ্ধর জন্য কফি নিয়ে তার ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজায় এসে উঁকিঝুঁকি মারল রুদ্ধর অবস্থান জানার সম্পর্কে তবে রুদ্ধকে এখান থেকে তেমন দেখতে পারল না৷ তাই বাইরে থেকে দরজা নক করে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তবে রুদ্ধর কোনো সারাশব্দ পাওয়া গেল না। আরু আবারও একই কাজ করল এবারও রুদ্ধর কোনো সারাশব্দ না পেয়ে হতাশ হয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে যেয়েই দেখল রুদ্র ডিভানে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। তার মানে তার ডাকে ইচ্ছে করেই সারা দেয়নি, কথাটা ভাবতেই আরুর রাগ হলো। রুদ্ধ কেন তাকে পাট্টা দিচ্ছে না বিষয়টা সে একদমই মেনে নিতে পারছে না। আরু রুদ্ধর সামনে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– ” আপনার কফি।”
রুদ্ধর ধ্যান এখনও ল্যাপটপে নিবদ্ধ সে আরুকে দেখেও দেখল না আরু পুনরায় বলল,
– ” কি হলো শুনতে পান নি?”
রুদ্ধর জবাব না পাওয়াতে আরু হতাশ হয়ে তার পাশে বসে বসল। রুদ্ধর কোল থেকে ল্যাপটপ সরিয়ে টেবিলে রেখে দিল। হঠাৎ করে ল্যাপটপ ছিনিয়ে নেওয়ায় রুদ্ধ আরুর দিকে শক্ত চাহনিতে চাইল, যা দেখে আরু ভয় পেলেও প্রকাশ করল না। আরু রুদ্ধর হাত ধরে বলল,
– ” কি হয়েছে ইগনোর করছেন কেনো আমাকে?”
রুদ্ধ তার হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
– ” ইগনোর করা কাকে বলে বুঝিস তুই?”
আরু মাথা নিচু করে বলল,
– ” সরি আমি আপনাকে ইচ্ছে করে ইগনোর করিনি।”
– ” আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি এক্সপ্লানেশন। ”
আরু এবার ডিভানের সামনে রাখা টি টেবিলের ওপর বসে রুদ্ধর মুখোমুখি হলো। রুদ্ধর হাত ধরে বলল,
– ” আমার লজ্জা করছিল।”
– ” হোয়াট? সেই ইন্সিডেন্ট এর জন্য তুই আমাকে দুটোদিন ইগনোর করবি আরু? অথচ তুই সামান্য টু আওয়ার্স আমার ইগনোরেন্স মেনে নিতে পারছিস না।”
আরুর মুখটা চুপসে গেল। সে আসলেই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। রুদ্ধ তাকে দুই ঘন্টা ইগনোর করেছে সেটা সে সহ্য করতে পারছে না। অথচ রুদ্ধকে সে দুটো ইগনোর করেছে, রুদ্ধ সেটা কি করে সহ্য করবে। আরু এবার মুখটা ছোট করে বলল,
– ” সরি বলেছি তো এবারের মতো মাফ করা যায় না?”
রুদ্ধ মুখের ওপর বলল,
– ” না।”
– ” কি করলে আপনার রাগ কমে যাবে? কান ধরে উঠবস করবো?” কথাটা বলেই আরু সত্যি সত্যি কান ধরতে গেলে রুদ্ধ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
– ” নো নিড।”
আরু ঠোঁট উল্টে বলল,
– ” তাহলে?”
রুদ্ধ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
– ” জরিয়ে ধর আমাকে।”
আরু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল,
– ” কিহ।”
– ” জ্বী। হোল্ড মি ফাস্ট নয়তো তুই যেতে পারিস।”
– ” আমি পার..পারবোনা না এটা প্লিজ।”
– ” গেট আউট। ” আচমকা রুদ্ধর চিৎকার শুনে আরু ভীত হলো। তবুও সাহস সঞ্চয় করে বলল,
– ” রুদ্ধ ভা.. ভাই।”
– ” যেতে বলেছি তোকে।”
আরুর গাল দুটো ভয়ে লজ্জায় লাল হয়ে এল। সে এক পা দু পা করে রুদ্ধর দিকে এগিয়ে গেল। রুদ্ধ বুকে হাত গুজে অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছে। আরু রুদ্ধর হাত দুটো দুদিকে মেলে আলতো করে রুদ্ধর বুকে রেখে দু হাতে পিঠ জরিয়ে ধরল। সাথে সাথে রুদ্ধ তাকে দু হাত দিয়ে শক্ত করে নিজ বক্ষমাঝে চেপে ধরল। রুদ্ধ তাকে আরোও একটু শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
– ” আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধর লিটল বার্ড। ”
– ” আস্তে ধরুন ব্যাথা পাচ্ছি।”
– ” আমি আস্তে ধরতে পারি না। যখনই তোকে জরিয়ে ধরবো এভাবে শক্ত করেই চেপে ধরব, নিজেকে প্রিপেয়ার করে নে।”
আরু কিছু বলল না চুপচাপ রুদ্ধর হৃদপিণ্ডের শব্দ শুনতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদেই রুদ্ধ আরুর কপালে শক্ত করে ঠোঁট চেপে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই আরু হাফ ছেড়ে বাঁচল এত শক্ত করে চেপে ধরেছিল মনে হচ্ছিল তার হাড়গোড় সব ভেঙ্গেই ফেলবে।
নিধির মা নিতা বেগম বোনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য আজ শেখ বাড়িতে এসেছেন। দুপুরে খাওয়া – দাওয়া করে দুই বোন একান্তে রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে। দুই বোনের জমানো সকল কথা মন খুলে একে অপরের সাথে ভাগ করে নিচ্ছে। এর মাঝেই নিতা বেগম বলে উঠলেন,
– ” আপা তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম মনে নেই?”
রুমা বেগম ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” কোন কথার কথা বলছিস বল তো?”
– ” রুদ্ধ আর নিধির বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে, মেয়েটার তো বিয়ের বয়স হয়েছে তাছাড়া রুদ্ধরও তো কম বয়স হয়নি ২৮ বছরের তাগড়া যুবক সে এটায় বিয়ের জন্য উপযুক্ত সময়।”
– ” নিধিকে তো আমার বরাবরই পছন্দ। মেয়েটা ভারি মিষ্টি কোনো দিকে কমতি নেই, তবে রুদ্ধ যদি রাজি না হয় আমি এই বিষয়ে আগাতে পারব না বোন। ”
নিতা বেগম আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল,
– ” রুদ্ধ না করতেই পারবে না দেখে নিও তুমি। তুমি রুদ্ধকে কথাটা বলেই দেখ না।
– ” ঠিক আছে আমি আজই রুদ্ধকে বলবো।
নিতা বেগমের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।
আরু, আহি, রুহানি, ইয়াজ ও নিধি সকলে মিলে বিকেলে বাগানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। প্রত্যেকের সামনেই ধোয়াঁ ওঠা চায়ের কাপ রাখা। আহি বলল,
– ” জানো আজ কি হয়েছে ক্লাসের একটা মেয়ে বিয়ে করে নাকি পালিয়ে গেছে। পুরো স্কুলে সেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তার কথা শুনে আরু আফসোসের স্বরে বলল,
– ” আমার জীবনটাই লস্ট প্রোজেক্ট হয়ে যাচ্ছে এখনও একটা প্রেমও করতে পারলাম না।”
তার কথা শুনে নিধি বাদে বাকিরা এমনভাবে চাইল যেটা দেখে আরু থতমত খেয়ে বলল,
– ” ওমা সবাই আমারদিকে এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো? আমি কি প্রেম করছি নাকি?”
রুহানি ভ্রু নাচিয়ে বলল,
– ” করছিস না?”
– ” না, করছিই নাই তো। সেই কপাল কি আর আমার আছে? ”
ইয়াজ আরুর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
– ” তুমি যে ডুবে ডুবে জল খাও এটা আমরা বুঝে গেছি প্রিয়।”
সবাই হেসে ফেলল, তার মুখটা থমথমে হয়ে গেল।
– ” আরু বুঝি প্রেম করছো? তা মানুষটা কে শুনি?”
– ” আরেএএ আপু এদের কথা ধরো না ওরা আমার সাথে মজা নিচ্ছে। ”
আহি হঠাৎ বায়না ধরল,
– ” চলো না সবাই কাঁচা আম মাখা খায়।”
ইয়াজ বলল,
– ” এটার শুধু খায় খায়। খাওয়া ছাড়া তোর কোনো কথা নেই।”
– ” না নেই তুমি চুপ করে থাকো, নয়তো ভেতরে যাও আমাদের মেয়েদের মাঝে তোমার কি?”
ইয়াজ ভাব নিয়ে বলল,
– তোরায় আমাকে ডেকে এনেছিস আমি নিজে থেকে আসিনি বুঝেছিস?”
আহি ভেংচি কাটল তার কথা শুনে।
সন্ধ্যা নামতেই আকাশটা ধীরে ধীরে নরম অন্ধকারে ঢেকে গেল, চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। দূরের আজানের সুর আর হালকা বাতাসে দুলতে থাকা গাছগুলো যেন দিনের সব ক্লান্তি মুছে দিয়ে এক নতুন অনুভূতির গল্প বলতে লাগল। রুদ্ধ নিজের রুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল সেট করছে। বন্ধুদের সাথে মিট করতে বাইরে যাচ্ছে সে। রুমা বেগম রুদ্ধর রুমে এসে বলল,
– ” বাইরে যাচ্ছিস নাকি?”
– ” হ্যাঁ মা কিছু বলবে।”
রুদ্ধ গিয়ে রুমা বেগমের পাশে বসল। তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– ” আমার বাবাটা কত বড় হয়ে গেছে, দুদিন পরে ঘরে বউ আসবে। ”
– ” হঠাৎ এসব কথা বলছ কেনো মা?”
– ” ওমা বিয়ের বয়স হচ্ছে সেটা বলবো না?”
– ” বলবে তো সময় আসুক আমি নিজেই বলব তোমাকে সব।”
– ” আর কবে আসবে সময় বাবা, আমাদেরও তো বয়স হচ্ছে বাবা কখন কি হয়ে…
রুদ্ধর দৃষ্টি দেখে তার কথা বন্ধ করে গেল। রুদ্ধ রাগান্বিত গলায় বলল,
– ” কতবার বলেছি এসব বলবে না। ”
রুমা বেগম মিষ্টি হেসে বলল,
– ” ঠিক আছে বলবো না।” কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বলল,
– ” নিধিকে তোমার কেমন লাগে?”
রুদ্ধ বুদ্ধিমান ছেলে মায়ের কথা কোনদিকে যাচ্ছে সেটা সে ভালো করেই বুঝতে পারছে। তাই কোনো ভনিতা না করেই সরাসরি বলল,
– ” মা নিধিকে আমি নিজের বোনের চোখেই দেখি। অন্যকিছু ভাবা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি প্লিজ এই বিষয়য়ে আর কিছু বলো না।”
রুমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– ” তুই কি কাউকে পছন্দ করিস রুদ্ধ? ”
রুদ্ধ মুখে কিছু বলল না রহস্যময় হাসল। রুমা বেগম তার হাসি দেখেই বুঝে নিল।
– ” মেয়েটাকে জানতে পারি?”
রুদ্ধ সরাসরি বলল,
– ” আরু।”
– ” আরু! রুমা বেগমের কন্ঠে বিস্ময়।
– ” তোমাকে আগেই বলে রাখলাম মা ভবিষ্যৎ এ কিন্তু সবটা তোমাকেই সামলাতে হবে।”
– ” আরু তো খুব ছোট রুদ্ধ বাড়ির কেউ যদি মেনে না নেয় বড়সড় কোনো ঝামেলা হবে না তো।”
রুদ্ধ বেড থেকে উঠে দাঁড়িয়ে রুমা বেগমের মাথাটা বুকে জড়িয়ে নিল।
– ” তুমি এখন এত টেনশন নিও না মা তোমার ছেলে সবটা সামলে নিবে। আরুকে তোমার ছেলের বউ হিসেবে পছন্দ তো মা?”
রুমা বেগম মুচকি হেসে বলল,
– ” খুব পছন্দ আমার মেয়ে আমার ঘরেই থাকবে আমার ছেলের বউ হয়ে আমি আর আমি খুশি হব না?”
রুদ্ধও হেসে ফেলল। রুমা বেগমকে রুদ্ধর ঘরে যেতে দেখে নিধিও তার পিছু নিয়েছিল। রুদ্ধকে তাদের ব্যাপারেই কথা বলবে সেই সম্পর্কে সে নিশ্চিত ছিল তাই রুদ্ধর প্রতিক্রিয়া জানার উদ্দেশ্যে সে এতক্ষণ দরজার বাইরে থেকে মা – ছেলের কথা শুনছিল। কথাগুলো শুনেই হিংসায় তার শরীর জ্বলে উঠল। তার মানে এতদিন সে যেটা ভেবেছিল সেটাই সত্যি হলো। রুদ্ধ ও আরুর মাঝে প্রণয় ঘটিত সম্পর্ক রয়েছে। আর খালামণিও এত সহজে মেনে নিল সবটা, তার কথা একবারোও ভাবল না?
রুদ্ধ গ্যারেজ থেকে নিজের বাইক বের করেছে। বন্ধুদের সাথে মিট করতে গেলেই সে বাইক নিয়ে বের হয়। রুম থেকে রুদ্ধর বাইকের শব্দ পেতেই আরু দৌড়ে নিচে চলে এল। রুদ্ধ তাকে দেখে বলল,
– ” কি চাই?”
– ” কোথায় যাচ্ছেন?”
– ” ফেন্ডসদের সাথে মিট করতে যাচ্ছি।”
– ” আমাকে নিয়ে যাবেন?”
– ” সেখানে গিয়ে তোর কি কাজ?”
– ” আমি বের হতে চাই বাড়িতে ভালো লাগছে না, নিয়ে চলুন না প্লিজ।”
– ” অন্য একদিন নিয়ে যাব আজ নয়।”
আরু জেদ ধরে বলল,
– ” অন্যদিন কেনো, আজ কেনো নয়? আমি আজই যেতে চাই প্লিজ।”
রুদ্ধ এবার না চাইতেও ধমক দিয়ে ফেলল। আচমকা রুদ্ধর ধমক শুনে আরু কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই রুদ্ধকে বলল,
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৫
– ” আপনি আমাকে শুধু ধমকান, একটুও বাইরে নিয়ে যান না, আমি আপনার সাথে কথায় বলতে চাইছি না।” বলেই সে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
রুদ্ধর ভীষন খারাপ লাগল আরুকে কাঁদতে দেখে। ধমকটা সে দিতে চাইনি, তার ফ্রেন্ডসদের মাঝে আরুকে সে এখনিই নিয়ে যেতে চায় না, এমনি তো নাচুনে বুড়ি তার ওপর ঢোলের বাড়ি পড়লে তো কথায় নেই, তাই না চাইতেও ধমক দিয়ে ফেলেছে। ভাবল বাড়িতে এসে ওকে সেদিন রাতের মতো বাইরে নিয়ে যাবে। তাহলেই মেয়েটার সকল অভিমান ভেঙে যাবে। কথাটা ভেবেই রুদ্ধ মৃদ্যু হেসে বাইক স্টার্ট দিল।
