তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৫
আশফিয়া হিয়া
সময় স্রোত কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। দেখতে দেখতে দুদিন কেটে গিয়েছে। সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে আরু লজ্জায় আর রুদ্ধর সামনে যায়নি। রুদ্ধ তার সাথে দেখা করতে চাইলেও সে সুযোগ সে রাখেনি। রুদ্ধ বহুবার ডাকার পরেও সে তার ডাকে সাড়া পর্যন্ত দেয়নি। সকালে রুদ্ধ অফিস যাওয়ার পরে সে রুম থেকে বের হয়। রাতের খাবার সবার আগেই খেয়ে নেয়৷ অজুহাত হিসেবে দেখিয়েছে তার পড়ার এখন অনেক চাপ আগে আগে খেয়ে পড়তে বসতে হবে। মিতা বেগম আর কিছু বলেননি মেয়ের পড়াশুনার প্রতি এতদিন বাদে মন এসেছে এতেই সে খুশি। আজ শুক্রবার হওয়াই বাড়ির সকল পুরুষরা বাড়িতেই রয়েছে রুদ্ধও তার ব্যাতিক্রম নয়। সকালের নাস্তার জন্য নিচ থেকে ডাক পড়েছে। সপ্তাহে এই একটা দিন সকলে মিলে একসাথে নাস্তা করে এইটাই এই বাড়ির নিয়ম। আরু দাঁত দিয়ে চোখ খুটতে লাগল। এতদিন সে রুদ্ধকে ইগনোর করেছে রুদ্ধ আজ তাকে সামলে পেলে কি করবে সেই ভয়তেই সে নিচে যেতে চাইছে না। অনেক ভেবেচিন্তে আরু নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্য ঘর থেকে বের হলো।
ড্রাইয়িং টেবিলে বিভিন্ন নাস্তার আইটেম রান্না ঘর থেকে এনে সাজিয়ে রাখছেন বাড়ির গিন্নিরা। আজ যেহুতু সকলে বাড়িতে আছে তাই আয়োজনটা একটু বেশি করেই করা হয়েছে। রুমা বেগম গরম গরম পরোটাগুলো টেবিলে এনে রাখল। পরোটার সাথে আজ নেহারি ও ডাল ভাজি করা হয়েছে। সবটাই বাড়ির সকলের খুব প্রিয়। বিশেষ করে আরুর এটা ভীষণ পছন্দের খাবার। খাবার ঘ্রাণ নাকে আসতেই আরু বুঝে গেছে আজ কি রান্না করা হয়েছে। সে কোনোদিক না তাকিয়ে তার প্লেট নিয়ে খেতে বসে গেল। তার কান্ড দেখে বাড়ির সকলে হেসে ফেলল। ইয়াজ তার কাহিনী দেখে বলেই ফেলল,
– ” খাদক একটা।” ফলসরুপ সুমিতা বেগম তার মাথায় গাট্টা বসাল। আরু তাকে ভেংচি কাটল। ইয়াজের মার খাওয়া দেখে আহি হিহি করে হেসে ফেলল। ইয়াজ তার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল। আহিও তার দিকে চেয়ে ভেংচি কাটল। সকাল সকাল বাড়ির বাচ্চাদের খুনশুটি খাবার টেবিলের পরিবেশ ভরে উঠল। বড়রা খাবার খাচ্ছে আর তাদের খুনশুটিগুলো দেখে আনন্দ পাচ্ছে। রুমা বেগম নিধিকে টেবিলে বসে পড়তে বললেন কিন্তু সে বসল না। সবাইকে সার্ভ করে দেবে বলে বাইনা ধরল। রুমা বেগম বলল যে যার মতো নিয়ে নিতে পারবে তুই বসে যা তবুও সে শুনল না। শেষমেষ রুমা বেগম তার কাছে হার মানলেন। নিধির এইসব কাহিনী দেখে আরু ভেংচি কাটল। তার মনে নিধিকে নিয়ে সন্দেহ উদয় হয়েছে। আপাতত সে এটা ক্লিয়ার করতে চাইছে। নিধির হাবভাব তার নিকট মোটেই সুবিধার লাগছে না। আসলাম শেখ বললেন,
– ” রুদ্ধ কোথায় এখন উঠেনি সে?”
রুমা বেগম বললেন,
– ” এতক্ষণে তো উঠে পড়ার কথা আমি দেখে আসছি।”
নিধি তড়িঘড়ি করে বলল,
– ” আমি ডেকে আনি খালামনি?”
রুমা বেগম মাথা নেড়ে সায় জানাল। তৎক্ষনাত আরুর খাওরার হাত থেমে গেল। নিধি কেনো যাবে রুদ্ধকে ডাকতে বিষয়টা সে মেনে নিতে পারছে না। তবে নিধির আর রুদ্ধকে ডাকার প্রয়োজন হলো না তার আগেই রুদ্ধ সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। তাকে দেখেই নিধির মুখে হাসি ফুটে উঠল। হাসি মুখেই বলল,
– ” ওইতো রুদ্ধ ভাই চলে এসেছে।”
রুদ্ধকে দেখেই আরুর বুকের ভেতরে ধ্বক করে উঠল। মনে হচ্ছে হৃদপিন্ড বুঝি বেরিয়েই আসবে। সে মাথা নিচু করে চোরে মতো খাওয়ার মনোযোগ দিল। রুদ্ধ আরুর কান্ড দেখে রাগে – বিরক্তিতে মুখ থমথমে করে ফেলল। গটগট পায়ে এসে খালি চেয়ারটাই বসে পড়ল সেটাও আরুর পাশে। আরুর প্রাণ যায় যায় অবস্থা সে খাবে নাকি নিজেকে সামলাবে বুঝে উঠতে পারছে না। তার হাত – পা অসম্ভব কাঁপছে। রুদ্ধ পাশে বসায় সবটায় টের পাচ্ছে। তার ইচ্ছে করল আরুকে টেনে পাশ থেকে উঠিয়ে দিতে। সেটা না পারায় মুখ – চোখ আরও শক্ত করে ফেলল। নিধি রুদ্ধর জন্য প্লেট সাজিয়ে দিল। প্লেটে একপাশে দুটো পরোটা দিল। একপাশে অল্প ডাল ভাজি দিল। নেহারিটা আলাদা বাটিতে বেড়ে প্লেটে সাজিয়ে দিল। রুদ্ধ চুপচাপ খেতে লাগল। নিধি রুদ্ধর পাশে দাঁড়িয়েই রইল। এসব দেখে লজ্জা আরুর ভয় সব একনিমিষেই উধাও হয়ে গেল। তার গা – পিওি সব জ্বলে উঠল। নিধির হাব- ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে বিয়ে করা নতুন বউ স্বামীকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। এটা ভাবতেও আরু তওবা করল। ছিহ ছিহ এসব কি ভাবছে সে রুদ্ধর বউ শুধুমাএ সে হবে। ভাবনাতেও উল্টো পাল্টা জিনিস আনা যাবে না। আরু মুখের খাবারটা গিলে মুখে হাসি ফুটিয়ে নিধিকে বলল,
– ” আপু তুমিও বসে পড়। আমরা খাচ্ছি তুমি দাঁড়িয়ে আছো তোমার ক্ষিদে পেয়েছে না?”
– ” সমস্যা নেই তোমরা খাও আমি খালামণির সাথে খাব।”
রুদ্ধ এবার ইচ্ছে করেই আরুকে শুনিয়ে বলল,
– ” বসে পড়ো নিধি।”
নিধি মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ রুদ্ধর পাশের চেয়ারটাই বসে গেল। সবটা দেখে আরুর রাগে চোখে জল জমতে শুরু করেছে। রাগ উঠলেই তার চোখে পানি চলে আছে এটা কেমন সাইন্স এটা সে আজও বুঝে উঠতে পারেনি। আরু আরও একটা জিনিস খেয়াল করল রুদ্ধ তাকে পাওা দিচ্ছে না মোটেই। তার দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। এতদিন সে এড়িয়ে চলেছে তাই বোধ জয় রাগ করেছে। আরুর খাওয়া শেষ হলেও সে ইচ্ছে করে বসে আছে। সকলেই খেয়ে উঠে পড়েছে। বাড়ির গিন্নিরা এত প্লেট সব গুছিয়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেল। রুদ্ধ দেরিতে খেতে বসায় তার খাওয়া এখন শেষ হয়নি। রুদ্ধর খাওয়া শেষ হতেই আরুও উঠে দাঁড়াল রুদ্ধর পিছু পিছু হাত ধুতে চলল। নিধি তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। রুদ্ধ হাত ধুয়ে পেছনে ফিরতেই আরুকে দেখে পাশ কেটে চলে যেতে নিলে আরু তার সামনে এসে দাঁড়াল। রুদ্ধ আবারও তার পাশ কাটতে গেলেই আরু আবার একই কাজ করল। রুদ্ধ আর সহ্য করল দাঁতে দাঁত চেপে আরুর হাত ধরে তাকে সরিয়ে দিল। আরু পেছন থেকে তার হাত টেনে ধরল।
– ” কি করছো তোমরা।”
নিধিকে দেখে রুদ্ধ কিছু বলল না। তার দৃষ্টি আরুর ধরে রাখা হাতের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে তার মুখ শক্ত হয়ে উঠল। আরু রুদ্ধর হাত ছেড়ে দিল। রুদ্ধ নিধিকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আরু নিজের হাত ধুয়ে চলে যেতে নিলেও নিধির কথা শুনে থমকে দাঁড়াল।
– ” চাচাতো ভাইয়ের সাথে বুঝি কেউ এভাবে বিহেভ করে আরু?”
আরু ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ” মানে?”
নিধি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
– ” মানে এই যে তোমাকে সারাক্ষণ দেখি উনার সাথে কেমন চিপকে থাকো সেদিন গাড়িতেও দেখলাম। তোমাকে বোধ হয় নিজের বোনের মতোই আগলে রাখে তাই না?”
আরু বিরক্ত হয়ে বলল,
– ” নিজের বোন নয় চাচাতো বোন তুমিই তো বললে।”
– ” ওই একই হলো। আজ আমার মা আসছে জানো?”
– ” নাতো কেনো তুমি বুঝি চলে যাচ্ছো?”
নিধি থতমত খেয়ে বলল,
– ” চলে যাবো কেনো? মা খালামনির সাথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে তাই আসছে।”
– ” কি কথা?”
নিধি আরুর গাল টেনে বলল,
– সিক্রেট সেটা আসলেই জানতে পারবে। তবে তোমাকে একটা ক্লু দেয়ায় যায়। খুব তাড়াতাড়ি এ বাড়িতে কারোর বিয়ে হতে যাচ্ছে।” কথা বলেই সে হাত ধুয়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে চলে গেল। আরু তার যাওয়ার দিকে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নিধির কথা তো ঘুরেফিরে একদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সে যেটা ভাবছে যদি সেটা হয় তখন কি হবে?
আহি ছাদের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিল। আজ রুহানি গাছে পানি দেয়নি। তাই সেই দায়িত্ব আজ সে নিজেই নিয়েছে। তার পরনে সাদা – সিধে ঘরের পোশাক। লং টি – শার্ট ও ঢিলে – ঢোলা প্লাজু পড়েছে সে। লম্বা চুলগুলো বেনী করে পেছনে রাখা। দেখতে একদমই পিচ্চি লাগছে। কেউ যে তাকে পর্যবেক্ষন করছে সেদিকে তার ধ্যান নেই। পানি দিচ্ছে আর গান গাইছে,
নয় মিছে আশা, নয় শুধু ভালোবাসা
নই অকারণ প্রেমে অন্ধ
জানি তুমি-আমি আমাদের তরী
আজব এক বন্ধুত্ব
তোমার ছোট তরী, বলো, নেবে কি?
গান গাইতে গাইতে হঠাৎ সামনের দিকে দৃষ্টি যেতেই থমকে গেল সে। ইয়াজ চিলেকোঠার দরজায় হেলান দিয়ে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি আজ সম্পূর্ণ অন্যরকম। এই দৃষ্টি দেখতেই আহির সবটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। ভীষণ ঘাবড়ে যায় সে। ইয়াজ গলা ঝেড়ে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আহির দিকে এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
– ” তোর মনে হঠাৎ এত রঙ এল কোথা থেকে বলতো? প্রেম ট্রেম করছিস না তো?”
আহি সিরিয়াসভাবে বলল,
– ” করতেই পারি এই বয়সটাই তো প্রেমে পড়ার।”
ইয়াজ রেগে তার মাথার চুল খামচে ধরে সামনে টেনে আনল। আহি ব্যাথায় নাক – মুখ কুঁচকে নিল।
– ” খবরদার ছোট আছিস ছোট থাক এইসব প্রেমের সম্পর্কে তোকে যদি জরিয়ে পড়তে দেখি জাস্ট খুন করে ফেলব। কি বলেছি মাথায় থাকবে?”
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ২৪
আহি মাথা নাড়াল। ইয়াজ তাকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
আহি সুযোগ বুঝে বালতি বোঝায় করে রাখা মাটি থেকে এক খাবলা মাটি তুলে ইয়াকের দিকে ছুঁড়ে মেরে দরজার দিকে দৌড় লাগাল। এরপর দরজার কাছে এসে একটু থেমে বলল,
– ” আমি হাজারটা প্রেম করবো তাতে তোর কি ইয়াজের বাচ্চা। নিজে যখন প্রেম করতে চাও তখন? ”
ইয়াজ তার দিকে এগিয়ে আসতে নিলে সে দৌড়ে পালাল।
